

অলংকরণ: রমিত
গুণে গুণে সিঁড়ির তেতাল্লিশটা ধাপ পেরিয়ে ছাদের শেষ ল্যান্ডিংএ পা রাখেন কমলিনী। একটু জিরিয়ে নেন। বয়স অনেকটা হলেও শরীরে তেমন কোনো অসুবিধা নেই। এই বয়সেও বেশ তরতরিয়ে হেঁটে চলে বেড়িয়ে বেড়ান পিঠ সটান রেখে। ছাদের চিলে কোঠার ঘরেই এ বাড়ির ঠাকুরঘর। সেখানেও যেতে হবে। বুড়ি মানুষ, ঠাকুর দেবতা নিয়ে থাকেন না শুনলে লোকজন নির্ঘাত নিন্দেমন্দ করবে। তবে এনিয়ে তেমন ভ্রূক্ষেপ নেই, কোনো কালেই অবশ্য তেমন ছিলোনা।
এবছরের জব্বর শীতের সুড়সুড়ির পর, গরমের রগড়ানি শুরু হবার মাঝে, দোদুল বসন্তের দিনগুলো একটু অন্যরকম স্বস্তি দিয়ে যায় সকলকে। না ঠান্ডা, না গরমের এক মনোহারী ককটেল। মনে মনে দিনক্ষণের হিসেব করে নিজেই নিজেকে বলেন – “ওরে কমলি! নব্বইটা বসন্ত তো পার করে দিলি! আর কতো দিন?”
সেই ছোটবেলা থেকেই কমলিনীর বড়ো প্রিয় এই ছাদ। নিজের বাপের বাড়ির ছাদ ছিল দৈর্ঘ্য প্রস্থে খেলার মাঠ। সেখানেই দশে মিলে হৈচৈ, হুল্লোড়, মেলামেশা। বিয়ের পর অম্বরীশদের বাড়িতে গিয়েও বাপের বাড়ির অভ্যেস ছাড়তে পারেননি কমলিনী। এবাড়িতে সারাদিনের কাজকর্ম বলতে তেমন কিছু ছিলোনা। বাড়ির একমাত্র ছেলের বউ হয়ে এসেছিল কমলিনী। আদরের কমলিকে এমন পরিবারে বিয়ে দেবার ব্যাপারে বাবা কমলেশের একটু আপত্তি অবশ্য ছিল। নিজে ছিলেন ভারি আমুদে মানুষ, লোকজন নিয়ে হৈ হৈ করে দিন কাটাতে ভালোবাসতেন। মেয়ে কমলিও হয়েছে বাপের ধাঁচের ; এমন মেয়ে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে একাএকা থাকতে পারবে তো? এই ছিল কমলেশের চিন্তা। প্রথমবারের জন্য অম্বরীশদের বাড়িতে এসে বিশাল বড়ো ছাদ দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে কমলিকে সে কথা বলতেই মেয়ের চোখ চকচক করে উঠেছিল। সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরি হয়নি কমলেশের। শুভস্য শীঘ্রম – আপ্তবাক্য মাথায় রেখেই চারহাত এক করে দিলেন।
ছাদের ল্যান্ডিং এর একপাশে নাতজামাই প্রিয়াংশুর বাগানের সাজসরঞ্জাম একটা কাঠের তাকের মধ্যে রাখা – খুরপি, নিড়ানি, হাত বেলচা, কাঁচি, কাটার, দস্তানা… আরও কত কি!
ছাদের আলসে বরাবর দিব্যি লোহার খাঁচা তৈরি করা। তার মধ্যেই সব গাছের সমারোহ। শীতের জাঁক খানিকটা ম্লান হয়ে এলেও ফুলের বাহার এখনও তেমন কমেনি। নাতজামাই প্রিয়াংশু একেবারে গাছপাগল ছেলে। পুজোর পর্ব মিটতে না মিটতেই শুরু হয়ে যায় তাঁর উদ্যান চর্চার পর্ব। এই বয়সেও দিদি শাশুড়ি কমলিনীর আগ্রহ প্রিয়াংশুকে চাগিয়ে রাখে এই কয়েকটা মাস। মাঝে মাঝে সে ঠাট্টা করে কমলিনীকে বলে – “দিদা, আপনার নাতনিটিকে এসব শেখাননি কেন? এতোদিন ধরে ফুলেদের নামগুলো শিখিয়ে দিচ্ছি, অথচ তার কিছুই মনে থাকেনা। আপনি একবার চেষ্টা করে দেখুন তো”! কমলিনী উত্তর দেননা, খালি মুচকি হাসেন। মনে মনে অবশ্য বলেন - যার হয়না আটে, তার হয়না আশিতে।
দরজা খুলে ছাদে এসে দাঁড়াতেই দেখা হয়ে যায় বসুধার সঙ্গে। একেবারে পাশের বাড়ি। বসুধা দময়ন্তীর বয়সি, বেশ মিশুকে স্বভাবের। “ দিদা,আজ এতো সকাল সকাল! আপনাকে দেখে ভারি ভালো লাগে। ঝিরি কয়েকদিন ধরেই বলছে, মা ওই দিদানকে আমাদের বাড়িতে একবার নিয়ে এসোনা। গল্প শুনবো। আপনি দমু দির দিদা শুনে ঝিরিতো খুব অবাক। আপনি টিঙ্কা পিঙ্কার মায়ের দিদিমা মানে ওদের থেকে তিন যুগ আগের মানুষ। দমু দিদির দারুন ভাগ্য যে আপনি এখনও সতেজ আছেন, বুড়িয়ে যাননি।” – বসুধা হাসতে হাসতে কমলিনীর উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে। কমলিনীও হেসে হেসেই উত্তর দেন,” ওরে নাতনি, তোরাই তো নেচে কুদে বলিস বয়স কোনো ব্যাপার নয়, ওটা একটা সংখ্যা মাত্র। তাহলে আমার বেলায় অন্য নিয়ম হবে কী করে?”-- কমলিনীর কথায় হাসির তুফান ওঠে দুই ছাদে।
“ও বড়ো দিম্মা, তুমি এখানে? আমিতো হয়রান হয়ে সারা বাড়ি তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। আসগর আঙ্কেল তোমার সঙ্গে দেখা করবে বলে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে।”--
টিঙ্কার কথায় যেন হুঁশ ফিরে আসে কমলিনীর। ওমা! তাই? আসগর এসেছে? তাহলে তো যেতেই হবে।”
রবিবার। প্রিয়াংশুর আজ ছুটি। সকাল সকাল সে বেরিয়ে পড়েছে। আজ সেই রাজারহাটের শিকারপুর গিয়েছে গরমের গাছ দেখতে। পিঙ্কাও বাবার সঙ্গে বাইকে চেপে বসেছে। রাজারহাটের দিকে অনেক নার্সারি। মুখার্জি ভাইদের খুব রমরমা ওখানে। ছাদের পিটুনিয়াগুলো এখনও সতেজ,রোজই নতুন নতুন কলি ফুটে চালি টবগুলোকে ভরিয়ে রাখছে। একটু যত্ন আত্তি করলে বোশেখ মাস পর্যন্ত দিব্যি ফুলেল থাকবে। রঙের বাহারে একে অপরকে ছাপিয়ে যাবার খেলায় মেতে উঠেছে যেন। শুকিয়ে যাওয়া ফুলগুলোকে ছিঁড়ে দিতে হয়। বীজ ধরতে শুরু করলে গাছের ফুল কমে যায়। এসব কথা প্রিয়াংশুর কাছ থেকেই শেখা। শেখার ব্যাপারে কমলিনীর কোনো আপত্তি নেই, কোনোকালেই ছিলোনা। টিঙ্কা পিঙ্কা বড়ো দিদিমার এমন আগ্রহ দেখে খুব অবাক হয়ে যায়। দময়ন্তী দিদিমার এই গুণটা ঠিক পায়নি। প্রিয়াংশুতো মাঝে মাঝেই দমুকে খোঁচা দিয়ে বলে, – “এ সিম্পল কেস অফ জেনারেশন গ্যাপ। দিম্মাকে দেখে তোমার, তোমাদের শেখা উচিত। কি উৎসাহ! সবসময় ফুট কড়াইয়ের মতো টগবগিয়ে ফুটছেন যেন!” প্রিয়াংশুর কথায় এতটুকুও রাগেনা দময়ন্তী, বরং মনে মনে খুব খুশিই হয় নিজের দিম্মাকে নিয়ে। মা বাবার চলে যাওয়ার পর দিম্মাই তাঁদের একমাত্র অবলম্বন। দময়ন্তী চায় দিম্মার এই অফুরান প্রাণশক্তির স্রোত টিঙ্কা পিঙ্কার মধ্যেও প্রবাহিত হোক, নিজেদের দিদা, দাদুকে ওরা সেভাবে পায়নি, বড়ো দিম্মাই ওদের কাছে সব।
আসগর তার বাগানের একঢাল সবজি এনে হাজির করেছে ব্যাগ ভর্তি করে। নতুন কচি পটল, সজনে পাতা, সজনে ফুল, বেগুন, টসটসে পাকা লাল টমেটো আরও কতো কি! আসগরের আব্বাজান আফসরের সঙ্গে প্রিয়তোষের খুব খাতির ছিল। সেই দোস্তির ধারা এখনও বজায় আছে দেখে টিঙ্কা, পিঙ্কা অবাক হয়ে যায়। এখন রমজানের রোজা চলছে আসগরের, তাই এ বাড়ির কিছুই মুখে তোলার উপায় নেই। দময়ন্তী এ ব্যাপারে কোনো পিড়াপিড়ি করে না। সে আসগরের ব্যাগে কমলিনীর হাতে তৈরি নারকেলের নাড়ু, নিমকি, মোয়া, তক্তি – ভরে দেয়, ইফতারের সময় খাবার জন্য। আসগর বিদায় নিতেই কমলিনী সজনে ফুল নিয়ে বসেন। আজ পোস্ত দিয়ে সজনে ফুল রান্না করবেন কমলিনী।
দুদিন বাদেই দোল। টিঙ্কা পিঙ্কাতো ভীষণ উত্তেজিত। এবার বড়ো দিদা আছেন তাই সকলের মধ্যেই চাপা উত্তেজনার স্রোত বইছে যেন। বাড়ির কাজের দিদি করবীতো ঘোষণা করে দিয়েছে দোলের দিন তার মেয়ে স্নেহাকে এখানেই পাঠিয়ে দেবে। ও বেচারি একা একা রঙ্ খেলবে কার সঙ্গে? এখানে এলে তবুও সবার সঙ্গে হৈ হৈ করে কাটাবে।
টিঙ্কা পিঙ্কার খুব ইচ্ছে বাড়িতে এবার ন্যাড়া পোড়ানোর আয়োজন করার। বসুধা আন্টির দুই ছেলে মেয়ে তাতাই আর তিন্নি, গোঁসাই বাড়ির অন্বেষা….. সমবয়সী বন্ধু বান্ধবতো নেহাৎ কম নেই এ পাড়ায়! সবাই মিলে হৈচৈ করার সুযোগ তো সহজে মেলেনা। তাই….।
বড়ো দিদার কাছে নেড়া পোড়ানোর কথা বলতেই কমলিনী খানিকটা সময় চুপ করে বসে রইলেন। তারপর বললেন, “এমন একটা অনুষ্টানের আয়োজন ছোটোখাটো করে করা যেতেই পারে, তবে একটা কথা ভাববারও আছে…..।” “ভাবনার আবার কি?” – টিঙ্কা পিঙ্কা একসাথে প্রশ্ন করে। দুই পুতনির এমন আগ্রহ দেখে কমলিনী মৃদু হেসে ওঠেন, তারপর খুব শান্ত কন্ঠে বলেন, “ আমাদের নেড়াপোড়া মানেতো কিছু শুকনো ডাল পাতা পুড়িয়ে একরাশ ধোঁয়া তৈরি করা। এই ধোঁয়া কোথায় যাবে তা ভেবেছিস?” “ কে …কেনো? বাতাসে মিশে যাবে ব্যস! – টিঙ্কা উত্তর দেয়। আবারো মুচকি হেসে ওঠেন কমলিনী, ওদের বড়ো দিদিমা। “হাসছো কেনো? আমরা কি কিছু ভুল বললাম!”-- পিঙ্কার প্রশ্ন।
– না না, তোমরা কিছুমাত্র ভুল বলনি। ধোঁয়া বাতাসে মিশলে ক্ষতি কার বলতো? ক্ষতি কিন্তু আমাদের। - গলায় রহস্যের সুর।
– কেন? আমাদের ক্ষতি হবে কেন? - কৈফিয়ৎ চায় টিঙ্কা।
– তার কারণ হলো, এই বাতাস থেকেই আমরা শ্বাসবায়ু গ্রহণ করি। সেই প্রাণবায়ু ধোঁয়া,ধুলোয় ভরে উঠলে যে আমাদেরই ক্ষতি। তাইনা?- কমলিনী জবাব দেন।
– ওমা! তাইতো বড়ো দিদা। আমরা বইতে এসব পড়েছি বটে, তবে কখনোই এসব নিয়ে আলাদা করে ভাবিনি। তুমিই আমাদের ভাবতে শেখালে। ইউ আর গ্রেট।
– এই মুহূর্তে আমাদের দেশের হিমালয় পর্বতের ওপর প্রকৃতির বহ্নুৎসব চলছে।– কমলিনী বলে চলেন।
– ব.. বহ্নুৎসব কী গো বড়ো দিদা? এই ওয়ার্ডটা তো আগে শুনেছি বলে মনে….
– এই জন্যই তো বললাম পুতনিরা। বহ্নি মানে হলো আগুন। এই যে তোরা নেড়াপোড়ার কথা বলছিলি,ওটাও যে বহ্নুৎসব। আমাদের হিমালয় পর্বতের ওপর থাকা হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, অরুণাচল আর সিকিমে বিরাট এলাকা জুড়ে দাবানলের আগুনে জঙ্গল ঝলসে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। এরপরেও কি সংস্কারের নামে আমাদের নেড়া পোড়ানোর আয়োজন করা উচিত বলে মনে হয় তোদের? বড়ো দিদার এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্ন শুনে টিঙ্কা পিঙ্কাতো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। এসব কথা তো তাদের জানাই ছিলোনা।
– আরও একটা বিষয় খুব ভাবনার।
– এর থেকেও বড়ো ভাবনা ভাবতে হবে? সেটা কী রকম ?
– কাঠ কুটো সব জ্বালিয়ে নিকেষ করে দিলে পাখপাখালিরা তাদের বাসা বাঁধবে কী দিয়ে ? এই তো কাল সকালে দেখছিলাম, ও বাড়ির নিমগাছের মগডালে বাসা বাঁধবে বলে শ্রীমান কাক্কেশ্বর কুচকুচে তোদের বাবার ছেঁটে দেওয়া বেলিফুল গাছের শুকনো ডালগুলো মুখে করে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু ও একা নয় বুলবুলি, ঘুঘু দম্পতি, পুঁচকে চড়াইপাখিরাও তোদের বাবার ওই এক চিলতে জমির বাগান থেকে কাঠ কুটো নিয়ে যাচ্ছে। আরও একদল অতিথি আসছে এখানে একই উদ্দেশ্য নিয়ে। ছয় ছোট্ট চেহারা তাদের চকচকে সাদাকালো জার্সি গায়ে, দেখেছিস তাদের?
– কই, না তো! তুমিই বলো।– দুই বোনের বিস্মিত প্রশ্ন।
– ওদের নাম শাঁখারি মুনিয়া। নতুন বাসা বানাচ্ছে সদর গেটের দুপাশে থাকা বাহারি দেবদারু গাছের ঝোপালো পাতার আড়ালে। ভাগ্যিস তোদের এদিকটায় এখনো আকাশঝাড়ু বাক্স বাড়ির বাড়বাড়ন্ত হয়নি, তাহলে এসবের দেখা পেতাম না।
এমন সময় ঘরের ভেতরে ঢোকে প্রিয়াংশু। হাততালি দিয়ে সে বলে ওঠে, “ সাবাস! এই নাহলে আমার দিদি শাশুড়ি! দময়ন্তী দেখে যাও তোমার দিম্মাকে। এমন ভাবনায় সবাই ডুবে যেতে পারলে তবেই হবে বিপন্ন ধরিত্রীর রাহুমুক্তি।” প্রিয়াংশু এগিয়ে এসে কমলিনীর পায়ের ধুলো নেয়। চিবুকে হাত রেখে কমলিনী ওরফে গ্র্যান্ড দিদিমা বলে ওঠেন –” চির আয়ুষ্মান ভব।”