

অলংকরণ: রমিত
- ঘুমোচ্ছেন নাকি ?
পৃথিবীতে এক ধরণের লোক থাকে যারা সুন্দর, সাজানো গোছানো কোনও জিনিস সহ্য করতে পারে না। সাদা ঝকঝকে ইউরিনালের সবুজ ঝাঁঝরিতে এরা গোলাপি চেবানো চুইং গাম ফেলে আসে। নতুন রং করা দেওয়াল দেখলে এদিক ওদিক তাকিয়ে নাকের ময়লা খুঁটে বা বুড়ো আঙুলের কালচে ছাপ সেই দেওয়ালে লাগিয়ে দেয়।
- সমুদ্রের তলায় যেখানে কোনোদিন সূর্যের আলো পৌঁছয়নি, সেখানে একরকম জীব বাস করে যাদের নাকের সামনে একটা ডুম আলো থাকে। এমনিতে নেভানো আলোটা সামনে কোনো মাছ চলে এলে চোখ ধাঁধানোর জন্য জ্বালিয়ে দেয়। তারপর স্তম্ভিত মাছটাকে গিলে ফেলে। সেই জন্তুটাকে দেখেছেন, ছবি?
সাঁতার শেখার জায়গা ছিল এক স্কুলের মধ্যে। স্কুলের নাম আমেরিকান স্কুল। কিন্তু আমেরিকা এখান থেকে অনেক দূর। সেই ইনডোর সাঁতার পুকুরের চারপাশে পায়ের নিচে সর্বত্র ধূসর জালিকাটা ধূসর প্লাস্টিকের মাদুর বিছানো যা মেঝেতে পৌঁছনোর আগেই শুষে নিত সব জল। সেই যেখানে সুতো দিয়ে জোড়া অসংখ্য ভাসমান বল দিয়ে আলাদা করা থাকে সাঁতারগলিগুলো। হাওয়ায় পাউডারের গন্ধ আর শাওয়ারে আধা গরম জল। লকার রুমে ভিড়। পুলে নামার সিঁড়ির সামনে বেগুনি জলে পা ডোবানোর জায়গা। মাঝখানে উচুঁ মইয়ের ওপর জীবন গার্ড বসে চারদিকে নজর রাখে আর পিঁপিঁ করে বাঁশি বাজায়। একদিকে পায়ের তলার নীল জমি ঢাল হতে হতে একসময় লুপ্ত। সাঁতার না জানলে প্রথমেই সেদিকে যাওয়া বারণ কারণ সেই অনেকখানি জলের ভেতর গেলে সমস্ত আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে যায়। তখন শ্বাস ফুরিয়ে আসা মানে ডুবে যাওয়া। অনেকদিন কেটে গেলে স্মৃতিরা এইরকম কুয়াশাঘেরা সাঁতার পুকুর হয়ে যায়। যেন মাঝসমুদ্রে ভেঙে পড়া উড়োজাহাজের কংকাল সমুদ্রের তলায় শুয়ে থাকার মত কুয়াশাঘেরা অতল সাঁতারপুকুরে এদিক ওদিক করা সমুদ্রের ছবি। সবুজ হলুদ রাবারের ভেলায় ভর করে সে পুকুরে সাঁতার শিখতে শিখতে উল্টো ভেসে যাওয়া।
- একি বাংলা বই মোবাইলে পড়ছেন ?
বাড়িতে আমি এমনিতে অনেকগুলো ছাপানো বই একসঙ্গে পড়ি। সেরকম প্রায় পাঁচ-ছটা বই আমার খাটের পাশের ছোট কফি টেবিলে ডাঁই করা থাকে। ঘুম থেকে ওঠার পর আর ঘুমোনোর আগে যে কোনো একটা তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করি। ধীরে ধীরে পাতা মার্কার অবস্থান বদলায়। এছাড়া আর বেশিরভাগ ইবই মোবাইলে পড়ি প্লেনে যাতায়াতের সময়। কিন্তু এখন কিছুদিন সবই বিস্বাদ লাগছে বলে সাঁতার পুকুরের পলকা গল্পটা ওল্টাচ্ছিলাম। পাশ থেকে এত প্রশ্নের ঠেলায় আপাতত ইবই পড়ার স্ক্রিন লক করে আমেরিকান স্কুলকে আমি আমার মাথার ভেতরের দেওয়ালেই পিন দিয়ে আটকে দিই।
আমার সঙ্গে নয়ন সান্যালের এভাবেই পরিচয় হয়েছিল এক বিরাট লম্বা উড়ানে। খুব অবাক হয়ে গেছিলাম কারণ তিনি প্লেনের ইকনমি ক্লাসে ছিলেন। আমার পাশের আসনে। সঙ্গে নিজের হাঁটুর বয়সী এক মেয়ে। তার নাম কী বলেছিল সে অবশ্য ভুলে গেছি। যদ্দূর মনে পড়ছে কোনো এক খটোমটো নাম যাদের কোনো মানে অভিধানে পাওয়া যায় না।
এমনিতে প্লেন ধরতে গেলেই আমার অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার ভয় থাকে। চেকিংয়ের সময় নানান ট্রেতে ব্যাগের সব জিনিস বের করে সাজিয়ে রাখতে হয়। বেল্ট জুতো খুলতে হয়। তারপর সব আবার গুছিয়ে ব্যাগে ভরে ফেলতে হয়। তারপরেও শুধু মনে হয় পেছনে ফেলে আসা ট্রেতে অদৃশ্য কিছু রয়ে যাচ্ছে। তার ওপর পৃথিবীর সবথেকে লম্বা এই উড়ানে ঠিক উনিশ ঘন্টা কুড়ি মিনিট লাগে। মাঝে কোথাও থামে না। অথচ এই প্লেনটা ওড়ার আগে অনেকক্ষণ ধরে ট্যাক্সিওয়েতে গড়াচ্ছিল। যেন শুধু চাকায় ভর করে গড়িয়ে গড়িয়েই অতদূর চলে যাবে।
মেঘ ফুঁড়ে সূর্যের কাছাকাছি যাবার সময় প্রতিবার আমার হালকা চোখ বন্ধ হয়ে আসে আর কানে তালা ধরে যায়। তারপর সূর্যের মুখ দেখা গেলে সিট বেল্ট খোলার সংকেত মুছে দেওয়া হয়। তার আগে পর্যন্ত গরম চা কফি দেওয়া বারণ।
এযাত্রায় পাশের এনাকে প্রথম থেকেই আমার খুব চেনা চেনা লাগছে অবশ্য। মাথা ঘোরাতেই মুচকি হেসে বললেন -"চিনতে পারছেন? আমার নাম সান্যাল। নয়ন সান্যাল।"
এবার মনে পড়ে গেল। ইনি তো বিখ্যাত লোক। আগে বিজ্ঞানী ছিলেন কিন্তু এখন দু তিনটি দামী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা, তার মধ্যে একটি হাইড্রোজেন ব্যাটারি বানায়। সে ছাড়াও অনেক উঠতি জায়গায় দেবদূত বিনিয়োগকারী, ভেঞ্চার পুঁজিবাদী, বোর্ড অফ ডিরেক্টরের কেউকেটা। কিন্তু এনার তো আলাদা কেবিন ভাড়া করে প্রথম ক্লাসে যাবার কথা। নিদেনপক্ষে ব্যক্তিগত জেটে।
- আপনাকে বাংলায় বই পড়তে দেখে কথা বলেই ফেললাম। আমিও বই লিখি জানেন তো?
- সেলফ হেল্প বই, না?
- একেবারে ঠিক। কীভাবে দশমাসে কোটিপতি হবেন এইসব।
- সত্যি হওয়া যায়?
- আরে না, ওরম বলতে হয়। লোকে মিথ্যে শুনতে ভালবাসে। বাস্তব তো আসলে লাইফ হ্যাক। নিজে নিজেই শিখতে হবে, কোনো বইতে লেখা থাকে না, কেউ বলে দেবে না।
- কিন্তু বিক্রি তো হয় অনেক?
- বহু। আপনার কোনো ধারণাই নেই। গল্প উপন্যাসের থেকে অনেক বেশি। তবে আপনাকে একটা কথা বলি।
আপাতত চারপাশে সবাই অকাতর ঘুমে। অনেকে প্লেনে ঘুমোতে সবুজ রঙের অশ্বক্ষুরাকৃতি ঘাড় বালিশ ব্যবহার করে আর চোখে কালো রঙের ঠুলি। ওতে নাকি ঘুম ভাঙলেও চারিদিক অন্ধকার, ভেড়া না গুনেও আবার ঘুম ফেরত চলে আসে। ঘুমপাড়ানি মাসি পিসিদের মত এয়ার হোস্টেসদের নিঃশব্দ চলাফেরা। সামনে ডিভাইস চার্জারের পোর্টের ভেতর নীল আলো। প্লেনের একদিকের জানলাগুলো দিয়ে গলিত সূর্যের আলো ঢুকছিল। জানলার পাশে বসা কোনো কোনো বাচ্চা সেই আলো আয়না দিয়ে ঝলকাচ্ছিল প্লেনের ছাদে। পাশে বসা তাদের বাবা মারা বিরক্ত হয়ে জানলার পর্দা নামিয়ে দিচ্ছিলেন। আর এদিকের জানলা দিয়ে তাকালে নীল ঝকঝকে আকাশে সাদা মুদ্রার মত চাঁদ।
- সেলফ হেলপ লেখার আগে, কোটিপতি হবারও আগে আমি কিন্তু একসময় গল্প উপন্যাস লিখতাম। তবে বেনামে।
অন্যপাশের সেই মেয়েও নয়ন সান্যালের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার এককানে একটা সাদা ডাঁটি গোঁজা। গান শুনছে মনে হয়। বা গল্প। এখন অনেকে গল্প শোনে, পড়ে না। সেটা প্রশ্ন না। স্ট্র্যাটোসফিয়ারেও অবিরত ইন্টারনেট আসে আজকাল?
- ধনকুবের হবার পরেও গল্প লেখার পিছনে যে অসুখ, তা এখনো আমাকে ছেড়ে চলে যায়নি। এক্ষুনি একটা গল্প বানিয়ে ফেললাম। বলব?
- বলুন।
- জানতাম আপনি শুনতে চাইবেন। আমার গল্পের পৃথিবীতে এক জঙ্গলের মধ্যে এক হ্রদ ছিল। সেখানে বাঘে গরুতে একসঙ্গে জল খেতে আসত। জঙ্গল থেকে বহুদূরে শহরে এক ছেলে আর এক মেয়েও থাকত। মেয়েটি বাড়ি বানায়। মরুভূমিতে বা খাঁ খাঁ মাঠের মাঝখানে। মাটির ওপরে নয়, মাটির নীচে। বেসমেন্টে। মাটির ওপর জেগে থাকে শুধু হালকা কাঁচের জানলা। সেখান দিয়ে যাবতীয় সূর্যালোক আসে। মেয়েটি সঙ্গে ট্যাব নিয়ে ঘোরে বড় বড় ধনকুবেরদের কাছে। ট্যাব সরিয়ে সরিয়ে সেসব নির্জন বাড়ির ছবি দেখায়। আসলে এগুলো বাঙ্কার। বাকি পৃথিবীতে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও ওখানে বেঁচে থাকা যাবে।
- আর ছেলেটা?
- সে ছিল মহাকাশচারী। মাঝে মাঝেই পৃথিবীর বাইরে গিয়ে থাকত বলে জানত মহাকাশ থেকে এই নীল রঙের গ্রহকে কেমন দেখতে লাগে। কথায় কথায় একদিন মেয়েটাকে বলেছিল সে পাথরের নিচে থাকতে খুব ভালবাসে। তাই বাকি জীবন মাটির নিচে কাটিয়ে দিতে চায়। আপনি কি একটা কথা জানেন, মহাকাশে গিয়ে থাকলে পৃথিবীর তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি বয়স বেড়ে যায়? এই ধরুন আমার বয়স কত আন্দাজ করুন দেখি?
নয়নবাবুর মাথায় ধবধবে সাদা চুল আছে, কিন্তু মুখের বা হাতের সব ত্বক টানটান। বাজারে কানাঘুষো শোনা যায় উনি নাকি বয়স আটকে রাখার জন্য প্লাজমা থেরাপি করান।
- দেখলে তো মনে হয় আপনার বয়সের গাছ পাথর নেই।
নয়ন সান্যাল কিছুক্ষণ ধরে কীসব ভান করে হাতের কর গুনলেন, তারপর বললেন - "ধুর হিসেব ভুলে গেছি। বয়স তো সত্যি কম হল না। হ্যাঁ কম করে দুহাজার বছর তো হবেই।"
একথা শুনে আমার ভুরু দুটো অবাক হবার মত উঠে গেছিল নিশ্চয়। সেটা দেখে উনি হেসে বলেছিলেন - "না না। তবে বয়েস হয়েছে। দেখে বোঝা যায় না জানি। তবে আপনাকে বয়সের আসল কথাটা বলি। এটা কোনও গল্প না, একটা সেলস পিচ ছিল। আমার ঢালা টাকায় একটা প্রকল্প তৈরী হয়েছে যার নতুন প্রোডাক্টের এখনো পাবলিক লঞ্চ হয়নি। পেটেন্ট আবেদন করেছি।"
- কী জিনিস ?
- আমরা একটা যন্ত্র বানিয়েছি যেটা যে কারুর আয়ু বলে দেবে। এই চিপটায় শুধু কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে মেশিনে ঢুকিয়ে দিতে হয়। তাহলে কিছুক্ষণ বাদে জটিল হিসেব করে রিডিংটা স্ক্রিনে বলে দেবে। চিপ, মেশিন, সুঁচ সব আমার সঙ্গেই আছে। একবার পরখ করে দেখবেন নাকি?
দোনামোনা করছিলাম বলে নয়নবাবু বললেন - "চাপ নেই। আমি নিজেরটা আগেই দেখে নিয়েছি। তবে কী জানেন? এটা শুধু শরীরের মৃত্যু ধরতে পারে, মনের মৃত্যু পারে না। এর পরের ধাপে মন মরে যাওয়া বোঝার মত যন্ত্র বানানোর স্টার্টআপে টাকা ঢালব। এখন রাজি থাকলে আপনার বুড়ো আঙুলের ডগায় পিন ফুটিয়ে রক্ত দিয়ে এখানে টিপসই করে দাসখত লিখে দিন। এতেও চাপ নেবেন না, আপনিই প্রথম নন। কেউ কেউ আমাকে আগেও লিখে দিয়েছে। সরি দাসখত কথাটা মনে হয় পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট। ওটা বদলে মুচলেকা করে দিতে হবে।"
সুঁচে দু ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে চিপে পড়ে। চিপ শুদ্ধ মেশিনে বাফারিং হচ্ছিল। স্ক্রিনে অনেকগুলো আধখাওয়া নীল সরলরেখা ঘুরে ঘুরে আবছা বৃত্তের মত কিছু তৈরী করছিল।
- এই হতচ্ছাড়া ইন্টারনেট। যখন দরকার ঠিক তখনই...
হালকা আলোয় হঠাৎ এক সেকেন্ডের জন্য আমার মনে হয়েছিল নয়নবাবুর জিভের মাঝখানটা চেরা। মানুষের জিভ ওরকম হয় না। তবে আমার চোখের দেখায় ভুলও হতে পারি। এদিকে তখনো বাফারিং হচ্ছে। হঠাৎ করে খুব ক্লান্ত লাগছিল আর মাথা ঘুরছিল। নয়নবাবু বকবক করে লোক ঠকান কিনা ভাবছিলাম।
- দু ফোঁটা রক্ত দিলে একটু ঘুম তো পাবেই। এক কাজ করুন ঘুম পেলে আপনি মুখটা খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়ুন …
ঘুম থেকে উঠে দেখলাম মাঝখানের সিট ফাঁকা। উড়ন্ত জাহাজ থেকে কেউ নেমে যেতে পারেনা। তাহলে নিশ্চিত নয়ন সান্যাল হাঁ মুখ দিয়ে আমার শরীরের ভেতর ঢুকে পড়েছেন। আমার হাতে সেই নাম মনে না পড়া মেয়েটির হাত ঘুমিয়ে ন্যাতা হয়ে আছে। আমার কাঁধে পাতা তার মাথার ভেজা চুলে গাঢ় ক্লোরিনের গন্ধ, যেরকম সাঁতার পুকুরের জলে থাকে।
এসময় আচমকা প্লেন খুব কাঁপছিল যেন সূর্যের এত কাছে ওড়ার অপরাধে তার ডানাদুটো মুড়মুড়িয়ে ভেঙে যাচ্ছে। একেই মনে হয় ভালো ভাষায় টারবুলেন্স বলে। কিন্তু তাতে আদৌ ভয় পাচ্ছিলাম না কারণ আমি জানি প্লেনে আসনের নিচেই রাখা থাকে হলুদ জীবন জ্যাকেট। জলে পড়ে গেলে যার লাল নলে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে নিতে হয়।
কাঁপুনি আরো বাড়তে পিং শব্দ করে সিট বেল্ট বাঁধার সংকেতে আলো জ্বলে উঠেছিল এবং কিছু বলা হচ্ছিল স্পিকারে। সম্ভবত "আবহাওয়া খারাপ হবার জন্য পাইলট সিট বেল্ট বাঁধার সংকেত অন করে দিয়েছেন। তাই নিজেদের সিটে ফেরত যান ও বেল্ট বেঁধে নিন। এই সময় গরম চা কফি দেওয়া বন্ধ থাকবে।"
কিন্তু আমি আর সেসব কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না। কারণ, অনেকখানি জলের ভেতর গেলে সমস্ত আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে যায়।
kk | 2607:fb91:4c1f:4fcc:6d14:a4e5:c6a6:***:*** | ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪৭739840
dc | 2402:e280:2141:1e8:3053:3758:ef84:***:*** | ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪৮739841