

অলংকরণ: রমিত
— ছাড়ো তো! যেও না, এত সত্য জানার তো কোনও প্রয়োজন নেই আমাদের...
— তবুও সত্যকে জানতে হয় বৈশালী! তুমি তাকে অস্বীকার করতে পারো না...
— আমি অস্বীকার করছি না... কিন্তু জেনেও কোনো লাভ নেই... বরং আজ তুমি মাগুর মাছটিকে মেরে কেটে পরিস্কার করে দাও... আমার কাজ একটু হালকা হয়! বাচ্চাদের কিছু দেশি মাছ খাওয়ানো উচিত।
— কিন্তু আমাদের বাচ্চাদের বিষয়ে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত... ভবিষ্যৎ গুছাতে সহজ হবে...
— না... না... তুমি আজ কোথাও যাবে না! এসো না আজ আমরা ছুটি উপভোগ করি। বাচ্চারা যা যা খেতে পছন্দ করে বানাই... তুমি আমি কতদিন হয়ে গেল সময় কাটাই না... ব্যস্ততা আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে... কেড়ে নিচ্ছে!
বৈশালী সেদিন আমাকে যেতে না দিলেও, তার কয়েকদিন পর চামড়া ফ্যাক্টরি থেকে ফেরার পথে, আমি আমার কৌতুহলকে গুরুত্ব দিয়ে একবার ঢুকে পড়ব ভাবলাম...
আমার মধ্যে এত সাহস ছিল না যে একা একা যাই। এতবড় মহাপুরুষ, যার হাতে এই দুনিয়ার জন্ম-মৃত্যু নির্ভর করছে...একা যেতে ভয় করেই...তাই আমি ক'দিন আগে থেকেই জয়রামকে বলে রেখেছিলাম, যাতে সে একটু বুধবারের সন্ধেটা ফাঁকা রাখে! এবং সময় বের করে সে আমার জন্য খানিকটা সময় অপেক্ষা করে। আমার ফ্যাক্টরি তার গুদামঘরের কাজের চেয়ে পরে বন্ধ হয়। জয়রাম খুব একটা না বলেনি। শুধু প্রথম প্রথম হ্যাঁ — না এর দোলাচলে সে খানিকটা ঝুঁকে পড়েছিল বটে! খানিকটা ভয়ও যে পায় নি তা নয়! কিন্তু তার মনেও প্রচুর কৌতুহল ছিল!
— বিজু, তুই বল... এভাবে আগে থেকে জেনে নেওয়াটা আমাদের কি স্বস্তিতে থাকতে দেবে!?
— বৈশালীও আমাকে এই কথাটাই বলেছিল, কিন্তু আমার মনে হয় ঠিক উল্টোটা!
— কীরকম?
— ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে পারলে আমাদের কাজ কমে যাবে, ভাবনাও....শেষ সময়টা জানতে পারলে যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে না... ঠিক ততদিনের জন্যই আমরা আমাদের গুছিয়ে রাখব!
জয়রাম আমার কথায় খুব একটা যে আশ্বস্ত হল, তেমনটা নয়। কিন্তু আমার কথা শুনে যতটা না তার মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি হয়েছিল আশেপাশের মানুষের ক্রমাগত খবর শুনে শুনে।
চারপাশে অন্য কোনও খবর ছিল না। যদিও বা কেউ জেনে-বুঝে অন্য কিছু দিয়ে কথা আরম্ভ করত, যেমন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, শালীর বিবাহ, আত্মীয়স্বজনদের নিন্দা-চর্চা কিন্তু একটা সময় পরে দেখা যেত তারা সেই অলৌকিক পুরুষের বিচারধারা নিয়েই কথা শুরু করে দিয়েছে। এবং সম্ভাব্য তারিখ!
সারাদিনের এই হাড়ভাঙা খাটুনির পর, চামড়া ফ্যাক্টরির দুর্গন্ধ পেরিয়ে এসে, আমাদের হাতে বেঁচে থাকার মতো খুব বেশি সময় ছিল না। কিংবা জীবন সম্পর্কে এত আগ্রহও না! দিনের ক্ষিদে দিনেই মিটে যেত বটে! কিন্তু পরের দিনের চিন্তায় রাতে ভালো ঘুমটুকু পর্যন্ত হত না। ফলে সে জন্ম হোক কিংবা মৃত্যু বেশি কিছু চিন্তা না এলেও মৃত্যু সম্পর্কে একটা ভয় সবসময়ই মাথার ভেতর কাজ করত।
তারপর আবার শোনা যাচ্ছিল এসআইআর শুরু হল বলে! এবং সমস্ত টিভি চ্যানেলগুলো চিৎকার চেঁচামেচি করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ওপর তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। এত এত আগের বছরগুলোতে, মা-বাবার পরিচয় সংগ্রহ করে রাখা, না-রাখার উপর আমাদের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া বড় সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। ফলে, কোনও অনিশ্চিত পরিবেশে পরিচয়হীন হয়ে জীবন কাটানোর ভয় আমাদের ক্রমাগত অস্থির করে রাখত। আর সে সময়ই অলৌকিক পুরুষের এই মহান ভবিষ্যৎ বাণী...
'জিতে হি মর জানা' ব্যক্তির ভেতর আর কীভাবে মৃত্যু ভয় ঢোকানো যায়, না ভাবলেও আমাদের চলত, তার চেয়েও অধিক চিন্তার বলয় সবসময় মাথার ওপর চক্কর চালাত ক্রমাগত।
এসব ভাবতে ভাবতে আমাদের সামান্যতম সুরক্ষার জন্য আমরা একটা বলয় তৈরি করে নিয়েছিলাম— আকণ্ঠ মদপান। কিন্তু বৈশালীকে বিয়ের পর, আমার সেই অভ্যাসটাও বন্ধ হয়ে গেছিল বৈশালীর শরীরের উত্তাপে। মদের চেয়েও বৈশালী বেশি নেশা ধরিয়ে দিতে পেরেছিল আমাকে। আর সেই নেশা হোক কিংবা উত্তাপ— ইয়ান এবং জোহরা এসে গেছিল আমাদের ঘরে। আমরা জীবনকে নিয়ে খুশি ছিলাম। এবং এখুনি কিছুতেই মৃত্যুর মতো কঠিন বিচ্ছেদকে চাইতাম না।