এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  • ইরান - আমেরিকা ইজরায়েল সংঘাত - একটি প্রেক্ষাপট পর্যালোচনার প্রয়াস

    Tuhinangshu Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ০৭ মার্চ ২০২৬ | ১২০ বার পঠিত
  • ১৯৪৫-পরবর্তী ইহুদি নিরাপত্তা চেতনা ও ফরাসি সংযোগ

    ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় দর্শনের এবং তাদের সমকালীন প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল উৎসটি নিহিত রয়েছে ১৯৪৫-পরবর্তী ইউরোপের ভস্মস্তূপ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ‘হোলোকাস্ট’-র অভিজ্ঞতার মধ্যে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবস্থাকে ‘অস্তিত্ববাদী ভীতি’ (Existential Anxiety) হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় থেকেই তাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই অটল বিশ্বাসটি দানা বেঁধেছিল যে, আন্তর্জাতিক কোনো জোট বা বাহ্যিক ‘ত্রাতা’র ওপর পূর্ণ নির্ভরতা শেষ বিচারে আত্মঘাতী হতে পারে। এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটিই ইসরায়েলকে ‘টোটাল সেলফ-রিলায়েন্স’ বা নিরঙ্কুশ স্বনির্ভরতার পথে চালিত করেছে।

    এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ১৯৫০-এর দশকে ফ্রান্সের সঙ্গে ইসরায়েলের যে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিসাম্য নির্ধারণে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রশ্ন জাগতে পারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন নয়, বরং ফ্রান্স কেন তখন ইসরায়েলের প্রধান সহায়ক হয়ে উঠল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তৎকালীন ফরাসি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের (Algerian War of Independence) প্রেক্ষাপটে। ১৯৫০-এর দশকে ফ্রান্স আলজেরিয়ায় তাদের ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখতে মরিয়া ছিল। অন্যদিকে, মিশরের গামাল আবদেল নাসের তাঁর ‘প্যান-অ্যারাবিজম’ মতবাদের মাধ্যমে আলজেরীয় বিপ্লবীদের (FLN) অস্ত্র ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন। ফ্রান্সের কাছে নাসের ছিলেন এক ‘সাধারণ শত্রু’, যিনি উত্তর আফ্রিকায় ফরাসি সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছিলেন।

    ফ্রান্সের নীতিনির্ধারকরা তখন মনে করেছিলেন যে, নাসেরের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে একটি শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করা জরুরি। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের প্রাক্কালে সম্পাদিত গোপন ‘সেভয়ে প্রোটোকল’ (Protocol of Sèvres) ছিল এই পারস্পরিক স্বার্থের চূড়ান্ত প্রতিফলন। ফরাসি সহায়তায় নেগেভ মরুভূমিতে ‘ডিমোনা’ (Dimona) পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং আকাশপথে আধিপত্য বিস্তারের জন্য অত্যাধুনিক ‘মিরাজ’ (Mirage) যুদ্ধবিমানের সরবরাহ ইসরায়েলকে এক অনন্য ‘প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব’ (Qualitative Military Edge - QME) প্রদান করে। তৎকালীন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী গি মোলে-র (Guy Mollet) প্রশাসনের এই সহায়তা ইসরায়েলকে এমন এক ‘পয়েন্ট অফ ইমিউনিটি’ বা অপ্রতিরোধ্যতার স্তরে পৌঁছে দেয়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গভাবে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র হওয়ার বহু আগেই সুনিশ্চিত হয়েছিল। সুতরাং, বর্তমানের মার্কিন-ইসরায়েল সুগভীর সামরিক সম্পর্কের যে রূপ আমরা দেখি, তার আদি ও অকৃত্রিম ভিত্তিপ্রস্তর আসলে স্থাপিত হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকের এই ফরাসি-ইসরায়েলি সংযোগের মাধ্যমেই, যা মূলত ছিল ফরাসি ঔপনিবেশিক স্বার্থ এবং একটি অস্তিত্ব সংকটে থাকা জাতির প্রযুক্তিগত বর্ম নির্মাণের এক মেলবন্ধন।

    নাসেরের প্যান-অ্যারাবিজম, আরব বিশ্বের বিভাজন এবং মার্কিন আধিপত্যের অনুপ্রবেশ

    ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে মিশরের গামাল আবদেল নাসেরের নেতৃত্বে ‘সর্ব-আরববাদ’ বা প্যান-অ্যারাবিজম (Pan-Arabism) এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছিল। সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাসেরের এই উত্থান ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এক সম্মিলিত আরব চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খালের জাতীয়করণ (Nationalization of Suez Canal) ছিল সেই সার্বভৌমত্বের এক অনন্য প্রতীক, যা নাসেরকে আরব বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সময়েই আরব বিশ্বে একটি সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একদিকে নাসেরের নেতৃত্বাধীন ‘প্রগতিশীল’ বা সমাজতান্ত্রিক ঘরানার প্রজাতন্ত্রগুলো (যেমন সিরিয়া ও ইরাক), যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) ঘনিষ্ঠ ছিল; অন্যদিকে পশ্চিমাপন্থী রক্ষণশীল রাজতন্ত্রগুলো (যেমন সৌদি আরব ও জর্ডান), যারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এক শক্তিশালী রক্ষাকর্তার সন্ধান করছিল।

    এই সংঘাতের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৬৭ সালের ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ (Six-Day War) এবং ১৯৭৩ সালের ‘ইয়ম কিপুর’ (Yom Kippur War) যুদ্ধে। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের হাতে সোভিয়েত-অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত আরব দেশগুলোর শোচনীয় পরাজয় আমেরিকার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। আমেরিকা বুঝতে পারে যে, মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাব রুখতে এবং ইসরায়েলের ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত’ করতে হলে তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ১৯৬৮ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনের আমলেই আমেরিকা ইসরায়েলকে আধুনিক ‘এফ-৪ ফ্যান্টম’ (F-4 Phantom) যুদ্ধবিমান সরবরাহের মাধ্যমে নিজেকে ইসরায়েলের প্রধান অস্ত্রদাতা হিসেবে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে।

    এই মার্কিন অনুপ্রবেশের ফলে আরব বিশ্ব আরও খণ্ডিত হয়ে পড়ে। সৌদি আরবের মতো রাজতন্ত্রগুলো নাসেরের ‘বিপ্লবী’ মতাদর্শকে তাদের রাজবংশীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে যখন আরব দেশগুলো ‘তৈল অস্ত্র’ (Oil Weapon) বা তৈল অবরোধ (Oil Embargo) ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্বকে কোণঠাসা করে দেয়, তখন আমেরিকার অর্থনীতি এবং বিশ্বব্যবস্থা এক চরম সংকটের মুখে পড়ে। এই সংকট থেকেই আমেরিকার কূটনীতি এক নতুন কৌশল গ্রহণ করে—যাকে ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) ব্যবস্থার পূর্বশর্ত বলা যেতে পারে। ওয়াশিংটন বুঝতে পারে যে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা কেবল সামরিক নয়, বরং বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলস্বরূপ, আমেরিকা সৌদি আরবের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সমঝোতায় পৌঁছায়, যা আরব সংহতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় এবং ডলারকে বিশ্বের একমাত্র ‘জ্বালানি মুদ্রা’ হিসেবে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।

    পেট্রোডলার ব্যবস্থা: সৌদি-মার্কিন কৌশলগত মৈত্রীর শর্তাবলি এবং বৈশ্বিক মুদ্রার একাধিপত্য

    ১৯৭৩ সালের তৈল সংকটের (Oil Crisis) পর বিশ্ব অর্থনীতিতে যে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মার্কিন ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) ব্যবস্থা। সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘বৈশ্বিক মুদ্রাগত সাম্রাজ্যবাদ’ (Global Monetary Imperialism), যা পরবর্তী পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করেছে। ১৯৭৪ সালে মার্কিন অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম সাইমন এবং সৌদি রাজতন্ত্রের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ও গোপন সমঝোতা হয়, তার শর্তাবলি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং দূরপ্রসারী:

    চুক্তির মূল শর্তাবলি :

    ১. একচেটিয়া মুদ্রা লেনদেন (Monopoly in Pricing): সৌদি আরব বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক হিসেবে অঙ্গীকার করে যে, তারা তাদের প্রতিটি ব্যারেল তেল কেবল এবং কেবলমাত্র মার্কিন ডলারের (USD) বিনিময়ে বিক্রি করবে। এর ফলে বিশ্বের যে কোনো রাষ্ট্রকে—সেটি জাপান হোক বা ভারত—তেল কিনতে হলে প্রথমে তাদের নিজস্ব মুদ্রা বিক্রি করে মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে বাধ্য করা হয়।

    ২. পেট্রোডলার রিসাইক্লিং (Petrodollar Recycling): সৌদি আরব তাদের তেল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত উদ্বৃত্ত অর্থের (Surplus Revenue) একটি বিশাল অংশ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড (US Treasury Bonds) এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে সম্মত হয়। এর ফলে আমেরিকার ঋণের বোঝা বহন করার জন্য একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়।

    ৩. সামরিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা (Security Guarantee): বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজতন্ত্রকে যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা বহিঃশত্রুর আক্রমণ (বিশেষ করে নাসেরপন্থী বা পরবর্তীতে ইরানি প্রভাব) থেকে রক্ষা করার পূর্ণ সামরিক নিশ্চয়তা প্রদান করে। আমেরিকার সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র এবং সামরিক প্রযুক্তি কেবল সৌদি আরবের জন্যই উন্মুক্ত করা হয়।

    এই ব্যবস্থার ফলে মার্কিন ডলার একটি ‘কাগুজে স্বর্ণ’ (Paper Gold)-এর মর্যাদা লাভ করে। যেহেতু পৃথিবীর প্রতিটি দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর জন্য জ্বালানি অপরিহার্য, সেহেতু ডলারের চাহিদা হয়ে দাঁড়ায় চিরস্থায়ী। এটি আমেরিকাকে এক অনন্য সুযোগ দেয়—তারা কোনো উৎপাদন ছাড়াই কেবল ‘ডলার ছাপিয়ে’ বিশ্বের সম্পদ ক্রয় করার ক্ষমতা লাভ করে। ২০২৪ সালের ৯ জুন এই ৫০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেছে। সৌদি আরব এই চুক্তি নবায়ন না করার যে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা কেবল একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং আমেরিকার এককেন্দ্রিক আধিপত্যের (Unipolar Dominance) ওপর এক জোরালো আঘাত। সৌদি আরব এখন আর কেবল ডলারে তেল বিক্রি করতে বাধ্য নয়। তারা এখন চিনা ইউয়ান (Yuan), ইউরো (Euro), এমনকি ডিজিটাল মুদ্রায় (যেমন বিটকয়েন) লেনদেনের পথে হাঁটছে। এই ‘মাল্টি-কারেন্সি’ বা বহু-মুদ্রা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বিশ্ববাজারে ডলারের কৃত্রিম চাহিদা হ্রাসের এক প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

    সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে সৌদি আরব এখন আর আগের মতো আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং তারা চিনের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। বিশেষ করে চিনের ‘ব্রিক্স’ (BRICS) জোটে সৌদি আরবের যোগদান এবং চিনের সাথে প্রযুক্তিগত ও পরিকাঠামো উন্নয়নের যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা ওয়াশিংটনের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেট্রোডলারের এই চিড় ধরার ফলে আমেরিকার সবথেকে বড় ভয় হলো—যদি তেল বিক্রির জন্য ডলারের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা ধসে পড়তে পারে। এটি আমেরিকার ঋণগ্রস্ত অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ২০২৬-এর এই তেহরান সংকট বা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আসলে এই পেট্রোডলারের ক্ষীয়মাণ শক্তিকে পুনরায় চাঙ্গা করারই এক মরিয়া চেষ্টা হতে পারে। ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অনেকটা ভেঙে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও ডলারের একচ্ছত্র ভীতি ও আধিপত্য সুনিশ্চিত করাই এই সামরিক পরিকল্পনার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হতে পারে কি না, তা বর্তমানে সমাজতাত্ত্বিক মহলে এক আলোচ্য বিষয়। ইরান যখন ইউয়ান (Yuan) বা বিকল্প মুদ্রায় তেল বিক্রির মাধ্যমে এই ‘একচেটিয়া’ বাজার ভাঙার চেষ্টা করে, তখন তা সরাসরি ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হানে। আগামী দশকগুলোতেও এই আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে হলে আমেরিকাকে নিশ্চিত করতে হবে যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যেন ডলারের বলয় থেকে বেরিয়ে না যায়।

    ইরানি বিপ্লব এবং বিকল্প ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ: খোমেইনি ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের বৈরিতা

    ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভূগোলে এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতন মার্কিন ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার জন্য ছিল প্রথম বড় আঘাত। শাহ ছিলেন আমেরিকার ‘আঞ্চলিক প্রহরী’ এবং ইসরায়েলের এক গোপন কিন্তু ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাঁর পতনের পর আয়াতুল্লাহ খোমেইনি যখন ক্ষমতায় আসীন হলেন, তখন থেকেই ইরানের অবস্থান মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের জন্য এক চরম ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

    খোমেইনি কেবল একটি ধর্মীয় বিপ্লব করেননি, বরং তিনি ‘না পশ্চিম, না পূর্ব’ (Neither East, nor West)—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলেন। এটি ছিল সরাসরি মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জ। ইরান যখন ডলারকে অস্বীকার করে নিজস্ব অর্থনীতি ও তেল বাণিজ্যের পথ খোঁজা শুরু করে, তখন তা পেট্রোডলারের একচেটিয়া আধিপত্যের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করে। ইসরায়েল ও আমেরিকার যে সুগভীর ‘টেকনো-মিলিটারি নেটওয়ার্ক’ রয়েছে, তা মূলত প্রযুক্তির মাধ্যমে আরব বা মুসলিম দেশগুলোর ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার ওপর নির্ভরশীল। ইরান এই ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ (Qualitative Military Edge) ভাঙার জন্য এক ভিন্ন পথ অবলম্বন করে—যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric Warfare) বলা হয়। খোমেইনি পরবর্তী সময়ে ইরান তার নিজস্ব ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন প্রযুক্তি (যেমন শাহেদ ড্রোন) এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা কোটি কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে (যেমন আয়রন ডোম বা প্যাট্রিয়ট) অর্থনৈতিকভাবে কম আকর্ষণীয় এবং ব্যবহুল করে দিচ্ছে। ইরান কেবল পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেই আমেরিকা বা ইসরায়েল ভীত নয়; বরং তাদের প্রধান ‘অ্যালার্ম’ বা আশঙ্কার জায়গা হলো ইরানের ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ (Axis of Resistance)। লেবাননের হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে ইয়েমেনের হুথি—এই প্রতিটি গোষ্ঠী ইরানের প্রযুক্তি ও আদর্শিক মদতে মার্কিন-ইসরায়েল বলয়কে এক মরণকামড় দিচ্ছে। ২০২৬-এর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং আয়াতুল্লাহ খামেনেই-এর মৃত্যু নিশ্চিত করার যে মরিয়া প্রচেষ্টা, তা আসলে এই ‘ইরানি কাউন্টারপার্ট’ বা প্রতিপক্ষকে সমূলে উপড়ে ফেলারই এক চেষ্টা এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ বর্তমান।

    ইসরায়েলের কাছে ইরানের এই প্রযুক্তিগত ও সামরিক অগ্রগতি কেবল একটি সীমান্ত সংঘাত নয়, বরং এটি একটি অস্তিত্ববাদী হুমকি (Existential Threat)। কারণ, ইরান যদি পারমাণবিক ছাতার নিচে এই ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তি আরও উন্নত করতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অস্ত্র লবির বাজার এবং ইসরায়েলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি—উভয়ই ধসে পড়তে পারে। সুতরাং, খোমেইনি থেকে খামেনেই—এই দীর্ঘ ধারাটি আমেরিকার ‘পেট্রোডলার’ এবং ইসরায়েলের ‘মিলিটারি কমপ্লেক্স’-এর জন্য এক চিরস্থায়ী কাঁটা হিসেবে রয়ে গেছে।

    মার্কিন-ইসরায়েল কৌশলগত আন্তঃনির্ভরশীলতা

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্তমান সম্পর্ককে কেবল একটি সাধারণ ‘মৈত্রী’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে; সমাজতাত্ত্বিক ও সামরিক বিশ্লেষণে একে একটি Symbiotic Integration বা জৈবিক আন্তঃনির্ভরশীলতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সম্পর্কের গভীরতা এতটাই যে, অনেক সময় ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণে তেল আবিবের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে।

    মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থির অঞ্চলে আমেরিকার ‘চোখ ও কান’ হিসেবে কাজ করে ইসরায়েলের মোসাদ (Mossad) এবং ইউনিট ৮২০০ (Unit 8200)। আমেরিকার উপগ্রহ প্রযুক্তি থাকলেও, ইরানের অভ্যন্তরে বা হিজবুল্লাহর গোপন সুড়ঙ্গে কী ঘটছে, সেই ‘হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’ (HUMINT) বা মানব-গোয়েন্দা তথ্যের জন্য সিআইএ-কে (CIA) ইসরায়েলের ওপর চরমভাবে নির্ভর করতে হয়। এই তথ্য আদান-প্রদান এতটাই নিবিড় যে, কোনো একটি পক্ষ তথ্য সরবরাহ বন্ধ করলে অন্য পক্ষটি মধ্যপ্রাচ্যে কার্যত ‘অন্ধ’ হয়ে পড়তে পারে।

    আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আজ ইসরায়েলি সামরিক সহায়তার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রায় ২.৫ লক্ষেরও বেশি আমেরিকান নাগরিকের কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। আমেরিকার প্রায় ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে এমন সব কারখানা রয়েছে যারা ইসরায়েলের জন্য যন্ত্রাংশ তৈরি করে। এই ‘অস্ত্র-অর্থনীতি’র শিকড় এতটাই গভীরে যে, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইসরায়েল বিরোধী অবস্থান নেওয়া মানে নিজের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।

    ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ বা ‘অ্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আজ কেবল ইসরায়েলের নয়, বরং মার্কিন সামরিক কৌশলেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসরায়েলি উদ্ভাবন এবং মার্কিন অর্থায়নে তৈরি এই প্রযুক্তিগুলো আজ একে অপরের পরিপূরক। এই একীভূতকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরায়েল আজ আমেরিকার কেবল একটি মিত্র নয়, বরং একটি ‘ভার্চুয়াল অঙ্গরাজ্য’ বা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এক ‘অবিনাশী রণতরী’ (Unsinkable Aircraft Carrier)

    ২০২৬-এর এই নিৰ্দিষ্ট সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা এবং তাঁর প্রশাসনের ওপর বিভিন্ন প্রভাবশালী লবির (যেমন AIPAC বা খ্রিষ্টান জায়োনিস্ট গ্রুপ) চাপ এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এটি একটি বহুল আলোচিত বিশ্লেষণ যে, ট্রাম্পের বর্তমান ‘মরিয়াভাব’ আসলে তাঁর মেয়াদের এক অদৃশ্য ‘ঘড়ি’র সাথে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। মার্কিন সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী ট্রাম্পের পক্ষে ২০২৮-এ পুনরায় নির্বাচনে দাঁড়ানো আইনত অসম্ভব। লবিস্টদের কাছে এটি একটি ‘নাউ অর নেভার’ পরিস্থিতি। অর্থাৎ, ট্রাম্পের এই শেষ চার বছরের মধ্যেই ইরানের ক্ষমতার পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ করা যেতে পারে বা নিদেনপক্ষে এমন কিছু অবস্থান নিতে ইরান কে নিতে বাধ্য করা যেতে পারে যা কার্যত ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে অসম্ভব হয়ে পড়বে। কুর্দি দের উসকিয়ে ইরানে ঝামেলা আরো বাড়াবার প্রচেষ্টা ও দেখা যেতে পারে। ২০২৬-এর ১ মার্চ আয়াতুল্লাহ খামেনেই-এর ওপর এই ভয়াবহ হামলা কি তবে সেই ‘তাড়াহুড়ো’রই প্রতিফলন?

    রাজনৈতিক মহলে একটি গুঞ্জন রয়েছে যে, ট্রাম্প লবি হয়তো কোনো সাংবিধানিক ফাঁকফোঁকর বা যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধির চেষ্টা করতে পারে। যদিও মার্কিন গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যে এটি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর সাফল্যের সম্ভাবনা খুবই কম, তবুও এই ‘সম্ভাব্যতা’র প্রচারই লবিটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাহস জোগাচ্ছে।

    সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পকে এই ‘নির্ধারক’ অভিযানের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কারণ তিনি এমন একজন নেতা যিনি ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেন না। লবিগুলো হয়তো আশঙ্কা করছে যে, ২০২৮-এ যদি কোনো ‘শান্তিবাদী’ ডেমোক্র্যাট বা ভিন্ন মেজাজের রিপাবলিকান ক্ষমতায় আসে, তবে ইরানের ওপর এই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা চূড়ান্ত আঘাতের সুযোগ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। সুতরাং, খামেনেই-এর মৃত্যু এবং ইরানের সামরিক কাঠামো ধ্বংস করা কি তবে এক সুপরিকল্পিত ‘শর্ট-টার্ম গোল’, যা দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন-ইসরায়েল আধিপত্যকে নিশ্ছিদ্র করার জন্য করা হয়েছে? বিশেষত এই রকম সময়ে যখন ডি ডলারাইজেশন ক্রমশই একটি বাস্তব প্ৰচেষ্টা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিচ্ছে!

    রাষ্ট্রপুঞ্জের সীমাবদ্ধতা:

    বর্তমান তেহরান সংকটে জাতিসংঘ (United Nations)-এর ভূমিকা এবং এর কাঠামোগত অসারতা এক তীব্র সমাজতাত্ত্বিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১৯৪৫ সালে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল—অর্থাৎ বৃহত্তর শক্তির আস্ফালন রোধ এবং বিশ্ব শান্তি রক্ষা—তা আজ কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। ১ মার্চ, ২০২৬-এর অভিযানে যেভাবে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতাকে নিধন করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের (International Law) ভাষায় ‘বেআইনি’ বা ‘অবৈধ’ (Illegitimate) হিসেবে গণ্য করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

    রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার ‘ভেটো’ ক্ষমতা এবং তাদের বিশাল আর্থিক অনুদান এই সংস্থাকে প্রায়শই ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির এক ‘প্রসারণ’ (Extension) হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কাউন্সিল বা আইএইএ (IAEA)-র রিপোর্টগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যাতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর সামরিক হামলাকে ‘বৈধতা’ দেওয়া যায়। রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদে(UN Charter) কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার যে কড়া নির্দেশ রয়েছে, তা বৃহৎ শক্তিগুলোর সামরিক কৌশলের কাছে বারবার নতিস্বীকার করছে। তেহরানে এই ‘হত্যাকাণ্ড’ বা সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপুঞ্জের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা কি তবে এই বৈশ্বিক ব্যবস্থারই চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ?

    এদিকে আবার ইউরোপীয় দেশগুলো বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিচারিতার শিকার। তাদের কাছে এই অভিযানটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী মনে হলেও, তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলো (যেমন জার্মানি বা ফ্রান্স) সামরিক নিরাপত্তার জন্য ন্যাটোর মাধ্যমে আমেরিকার ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, ওয়াশিংটনের কোনো ভুল বা চরম সিদ্ধান্তকেও তারা প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এটি তাদের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy)-কে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

    তেহরান সংকটের ফলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্য আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা ও তার ফলে ইউরোপের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এক মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তেলের দাম বাড়লে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাজারে যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে, তা জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। ইউরোপের কাছে এই অপারেশনটি ‘অবৈধ’ মনে হলেও, ইসরায়েলি লবি এবং মার্কিন চাপের মুখে তারা কেবল ‘উদ্বেগ প্রকাশ’ করেই নিজেদের দায় সারছে। এইযদিও সাম্প্রতিক স্পেন এর উদাহরণ নিঃসন্দেহে খানিক ব্যতিক্রম বটে। তবুও এই সীমাবদ্ধতা কি ইউরোপকে বিশ্বরাজনীতির একটি ‘গৌণ শক্তি’তে পরিণত হতে বাধ্য করছে না? ইউরোপ এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের এই নীরবতা বা কার্যকর পদক্ষেপের অভাব কি তবে এক নতুন বৈশ্বিক আইন-এর সূচনা করছে, যেখানে কেবল শক্তির অধিকারই একমাত্র আইন? যুদ্ধ কালীন পরিস্থিতি তে বিশ্ব বাজারে তেল এবং গ্যাসের দাম কি কি ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে চলেছে ?
    এই সব প্রশ্নই আপাততঃ সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পর্যালোচনার বিষয়।

    বিকল্প ক্ষমতায়নের হাতছানি - অনিশ্চয়তা

    সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখনই কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা তার আধিপত্য হারানোর সংকটে পড়ে, তখনই তার প্রতিক্রিয়া হয় তীব্র এবং প্রায়শই সহিংস।

    পেট্রোডলারের চিরাচরিত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলোর (যেমন চিন, রাশিয়া বা ভারত) নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা এই সামরিক উত্তেজনার ফলে থমকে যাবে না কি আরও বেগবান হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ডলারের এই ‘অস্ত্রায়ন’ (Weaponization of Currency) বিকল্প অর্থনৈতিক মেরু গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন-ইসরায়েল ‘টেকনো-মিলিটারি’ নেক্সাস-এর জন্য এক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    তেহরান সংকটে রাষ্ট্রপুঞ্জের অকার্যকারিতা কি শেষ পর্যন্ত এই বিশ্ব সংস্থার আমূল সংস্কারের দাবিকে জোরালো করবে? বৃহৎ শক্তিগুলোর ‘ভেটো’ ক্ষমতার দাপটে আন্তর্জাতিক আইনের যে ক্ষয়িষ্ণু রূপ আমরা দেখছি, তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব কি আবারও প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জঙ্গল-রাজ এর দিকে ফিরে যাবে—এমন এক আশঙ্কা অনেক সমাজবিজ্ঞানীর মনে দানা বাঁধছে।

    ১৯৪৫-এর ইউরোপীয় ধ্বংসস্তূপ থেকে ২০২৬-এর তেহরানের ধোঁয়া—এই দীর্ঘ পরিক্রমায় ক্ষমতার বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আসলে সম্পদ, প্রযুক্তি এবং মুদ্রার এক জটিল রসায়ন। তবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কি সত্যিই কোনো পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করার জন্য, নাকি এটি পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে পুনরায় উজ্জীবিত করার একটি মহড়া—তা বোঝা বিরাট জটিল কিছু না।

    ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ‘ডেডলাইন’ এবং লবিস্টদের দ্বারা তাঁর সম্ভাব্য তৃতীয় মেয়াদের যে অনিশ্চিত প্রচার, তা আসলে ক্ষমতার একটি সুগভীর ‘অ্যাংজাইটি’ বা উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। এই তাড়াহুড়ো হয়তো একবিংশ শতাব্দীর নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে রুখে দেওয়ার শেষ চেষ্টা মাত্র। তবে ইতিহাস সাক্ষী যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে সব সময় আটকে রাখা যায় না। ইউরোপের দ্বিধা, রাষ্ট্রপুঞ্জের নীরবতা এবং বিকল্প শক্তিগুলোর চাপা গর্জন—সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সুরঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে। আয়াতুল্লাহ খামেনেই-এর মৃত্যু ইরানে কোনো স্থায়ী গণতন্ত্র আনবে, নাকি এই অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী ‘ম্যানেজড ক্যাওস’ বা নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলার চক্রে আবদ্ধ করবে ইরাক বা আফগান অঞ্চলের মতন—তার উত্তর সময়ের গর্ভে নিহিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, ১৯৪৫-পরবর্তী যে বিশ্বব্যবস্থার ইতিহাস আমরা জেনেছি পড়েছি, তা আজ বেশ বড় রকম পরীক্ষার সম্মুখীন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ০৭ মার্চ ২০২৬ | ১২০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন