

অলংকরণ: রমিত
একটা ব্যাপার মোটামুটি ধরে নেওয়া হয়ে থাকে যে উপনিবেশগুলির অবসান জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই সম্পূর্ণ হয়েছিল। অর্থাৎ, উপনিবেশগুলির অবসান শুধুমাত্র একটি জাতীয় সমাজ বা সম্প্রদায় নির্মাণ করে নি, এর মধ্যে দিয়ে একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক সত্তা বা রাষ্ট্রের গঠনও সাধিত হয়েছিল। আমরা এমন একজন ব্যক্তির চিন্তাভাবনা নিয়ে আজ কিছু আলোচনা করব যিনি উপনিবেশ-বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও জাতি-রাষ্ট্র ধারণার অন্যতম কঠোর সমালোচক ছিলেন। ব্যক্তির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একটা ব্যাপার আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, বিংশ শতাব্দীর মধ্যেই স্বাধীনতার উদ্দেশ্য হিসেবে জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা ঔপনিবেশিক বিশ্বে সামগ্রিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিংশ শতাব্দীর এই সাধারণ ঐক্যমত্যের বিরুদ্ধে ছিলেন। বলা-বাহুল্য, এখন অধিকাংশ প্রাক্তন উপনিবেশই জাতি-রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এই জাতি-রাষ্ট্রের গঠন ও খোদ রাষ্ট্রের ভাবনাটিকেই ক্রিটিক করেছিলেন। ঠাকুর পরিবারের প্রসিদ্ধি শুধুমাত্র বিত্তের জন্য ছিল না, সামাজিক-ধার্মিক ব্রাহ্ম-সমাজ আন্দোলনও এর পরিচিতিকে বহুগুণে বর্ধিত করেছিল। বস্তুত, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশী আন্দোলনের একজন অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। স্বদেশী আন্দোলন ছিল প্রথম মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে উপনিবেশ-বিরোধী বৃহত্তর গণ-আন্দোলন, শুরুর দিকে যার অন্যতম প্রধান ছিলেন রবি ঠাকুর। সাহিত্যিক পরিচয়টা প্রধান হলেও, এটা ঘটনা যে একদা ঔপনিবেশায়িত ভারত ও বাংলাদেশ নামক অধুনা দুটি জাতি-রাষ্ট্রের দুটিরই জাতীয়-সঙ্গীত তাঁরই রচিত। তিনি বেঁচে থাকলে এই নির্বাচনে কতটা সম্মতি থাকত ভাবলে বেশ কৌতূহল জাগে, কেননা জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশানালিজম নিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল, “Nationalism is a great menace. It is the particular thing which for years has been at the bottom of India’s troubles.”। এই উক্তিটি নেওয়া হয়েছে তাঁর ‘Nationalism in India’ নিবন্ধ থেকে। এর সঙ্গে আরো দুটি নিবন্ধ ‘Nationalism in Japan’ এবং ‘Nationalism in the West’-কে একত্র করে ১৯৭১ সালে ‘Nationalism’ নামে পুস্তকটি প্রকাশিত হয়। এই তিনটিই প্রাথমিকভাবে বক্তৃতা হিসেবে প্রদত্ত হয়েছিল।
আমরা জাতীয়তাবাদ নিয়ে এই নিবন্ধগুলিকে প্রেক্ষাপটে রেখে রবি ঠাকুরের জাতীয়তাবাদ-বিরোধী মৌলিক অবস্থানের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি একটু বোঝার চেষ্টা করব। একটা ব্যাপার আমাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন, মহাত্মা গান্ধীর উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদের ধারণা যা ১৯০৯ সালে ‘হিন্দ স্বরাজ’ পাওয়া যায় তা তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদের ভাবধারার সঙ্গে রবি ঠাকুরের সম্পর্ক বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। ১৯০৫ থেকে ১৯০৭ সময়কালটিকে একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে ধরা যায়, কারণ এই সময়েই রবীন্দ্রনাথ উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তথা স্বদেশী আন্দোলনে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনের পূর্ববর্তী সময়, অর্থাৎ ১৯০৫ সালের আগের বছর গুলিকে তাঁর জাতীয়তাবাদ-সমর্থনকারী পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু ১৯০৭-র পরের সময়কালে যখন স্বদেশী আন্দোলন থেকে তিনি স্বেচ্ছায় সরে এসেছেন (স্বদেশী আন্দোলন তার পরেও চলেছিল), সেই সময়ের তাঁর লেখা-পত্রে আমরা এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পাই, যিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা সম্পর্কেই গভীরভাবে বিমুখ হয়ে পড়েছেন। তথাপি বলা প্রয়োজন, তিনি স্বদেশী বিপ্লবী বা সন্ত্রাসবাদীদের (এই নামটি যদিও বিভ্রান্তিকর) প্রতি আজীবন ছিলেন স্নেহশীল। চোরা-গোপ্তা গুপ্ত-হত্যার পথকে কিছুকাল পড়েই তাঁর মনে হয়েছিল কানাগলি, যেখানে আত্মবিনাশই একমাত্র অন্তিম পরিণতি। ‘চার অধ্যায়’-এর শেষে আমরা যেটা দেখতে পাই। কিন্তু নির্ভীক এই সব তরুণদের আত্মবলিদানকে তিনি চিরকাল অত্যন্ত উঁচুতে স্থান দিয়ে এসেছেন এবং উল্টোদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ বিপ্লবীদের চোখে কোন উচ্চতায় ছিলেন তার বিস্তারিত আলেখ্য পাওয়া যায় চিন্মোহন সেহানবীশের রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবীসমাজ গ্রন্থের ‘রবীন্দ্রনাথের চোখে বিপ্লবী’ ও ‘বিপ্লবীদের চোখে রবীন্দ্রনাথ’ অধ্যায় দুটিতে। এই বইটিতেই পাচ্ছি, “মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় (অবনীন্দ্রনাথের দৌহিত্র) তাঁর ‘দক্ষিণের বারান্দা’য় লিখেছেনঃ “বাঙালি বিপ্লববাদীদের আনাগোনা ছিল ঠাকুরবাড়িতে, তবে খুব কম লোকেই জানতেন এঁদের কথা। এঁদের চিনতেন, এঁদের কথা জানতেন সুরেন্দ্রনাথ [সত্যেন্দ্রনাথের পুত্র এবং রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র] আর গগনেন্দ্রনাথ। এই দুই ভাইয়ের কাছে আসতেন সন্ত্রাসবাদীরা। সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গেই ছিল এঁদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আর তিনি এঁদের গগনেন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে আসতেন। গগনেন্দ্রনাথ এঁদের লুকিয়ে লুকিয়ে চাঁদা দিয়েছেন।…বারীন ঘোষ এসেছেন, উল্লাসকর এসেছেন, খুব সম্ভবত রাসবিহারী…ও অরবিন্দ ঘোষও এসেছেন। আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন যারা তাঁদের প্রায় সকলেরই যোগাযোগ ছিল সুরেন ও গগনের সঙ্গে।” অর্থাৎ, শুধু রবি ঠাকুর নন, স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল গোটা ঠাকুর পরিবার। বিপ্লবের মূল হোতাদের অনেককেই কাছ থেকে দেখার সুবাদেই হয়তবা রবীন্দ্রনাথের এঁদের ভোগ-বিলাসী জীবন-যাপন, তরুণদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জীবন কাটানো ও কারো কারো ক্ষেত্রে নারী-লোলুপতা নিয়ে বিশেষ সমালোচনা ছিল। না হলে ‘চার অধ্যায়’-র ইন্দ্রনাথ বা ‘ঘরে বাইরে’-র সন্দীপ সৃষ্টি হয় না। রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি সমর্থক ছিলেন সম্মুখ-সমরে যুদ্ধের, যা ছিল নেতাজী সুভাষ বোসের পথ।
যাই হোক, ১৯১৭ সালের ‘জাতীয়তাবাদ’ বিষয়ক প্রবন্ধগুলো সাধারণত এই পরবর্তী রবীন্দ্রনাথ—অর্থাৎ ১৯০৭ পরবর্তী রবীন্দ্রনাথের জাতি-ধারণা এবং তার অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলিকে নিয়ে রচিত সবচেয়ে বিশদ আলোচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনার পূর্বে, আমাদের জানা দরকার তিনি ‘জাতি’ কে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। অর্থাৎ, এখানে প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথের মতে ‘জাতি’ কী? ‘Nationalism in India’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তাঁর আপত্তি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা দেশের প্রতি নয়, বরং তাঁর আপত্তি সব জাতির সাধারণ ধারণার প্রতি। তিনি ‘জাতি’-কে সংজ্ঞায়িত করেছেন, “The aspect of a whole people as an organized power.” হিসেবে। তার মানে, রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘জাতি’ শুধু একটা সম্প্রদায়বোধ বা একটা পারস্পরিক সহমর্মিতার অনুভূতিকে বোঝায় না, প্রকারান্তরে এটি সেই সংগঠিত ক্ষমতার কাঠামোকেও নির্দেশ করে যা একটি জাতীয় সম্প্রদায় নিজের জন্য অর্জন করতে চায়। সুতরাং, যখন একটি জাতীয় সম্প্রদায় নিজের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার সমস্ত উপকরণ ও কাঠামো অর্জন করে, তখন জাতি ও রাষ্ট্রের এই সমন্বিত রূপকেই আমরা ‘জাতি-রাষ্ট্র’ নামে চিনি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, তাঁর কাছে ‘জাতি’ মানে সবসময়ই ‘জাতি-রাষ্ট্র’। তাঁর এই নিবন্ধ গুলি পাঠ করলে দেখা যাবে তিনি ‘জাতি’ শব্দটিই ব্যাবহার করেছেন, কোথাও ‘জাতি-রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যাবহার করেন নি। কিন্তু তাঁর সমালোচনাকে বুঝতে হলে এই বিষয়টি উপলব্ধি করা জরুরি যে, রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘জাতি’প্রায় সর্বদাই ‘জাতিরাষ্ট্র’-র সমার্থক বা তার সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এখন জাতিকে জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার ব্যাপারটা আরো সুস্পষ্ট হয় যদি আমরা তাঁর আরেকটি নিবন্ধ ‘Nationalism in the West’ থেকে উদ্ধৃত করি, “A nation, in the sense of the political and economic union of a people, is that aspect which a whole population asumes when organized for a mechanical purpose.”। কাজেই, তাঁর মতে, জাতি শুধুমাত্র মানুষের সম্মিলন নয়, জাতি হল মূলগত ভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্য। অন্য ভাবে বললে, এটাই হল রাষ্ট্র।
এখন প্রশ্ন হল তিনি জাতি-রাষ্ট্রকে এক ধরনের যান্ত্রিক উদ্দেশ্যে সংগঠিত হিসেবে ভাবছেন কেন? জাতি ও জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনাকে বুঝতে গেলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি প্রায়শই ‘যন্ত্র’-র রূপক ব্যবহার করেছেন এবং ‘যান্ত্রিক’ বিশেষণটি বারবার প্রয়োগ করেছেন জাতির ধারণাকে আক্রমণ করার জন্য। ‘যন্ত্র’ কী? যন্ত্র এমন কিছু, যা একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তৈরি করা হয়। তাই একটা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্য সবকিছু সেই একটিমাত্র নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের অধীনস্থ হয়ে পড়ে, যন্ত্রটি নিখুঁতভাবে যার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে। একই ভাবে, রবীন্দ্রনাথের মতে জাতি-রাষ্ট্রও একটি যন্ত্রের মতো কাজ করে, যা একটি বিশেষ উদ্দেশ্যের জন্য সুসংগঠিত ও সূক্ষ্মভাবে নির্মিত। সেই বিশেষ উদ্দেশ্যটি তাঁর চোখে সর্বাধিক অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জন করা। কাজেই দেখা যাচ্ছে, এই সংজ্ঞায় জাতি-রাষ্ট্র নামক রাজনৈতিক সত্তাটিকে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে এবং তার মুনাফা-কেন্দ্রিক তাগিদের সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। এই সংযোগ স্থাপনে রবীন্দ্রনাথ তেমন ভুল করেন নি, কারণ আধুনিক পাশ্চাত্যে জাতি-রাষ্ট্রের উত্থান পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অতএব, রবীন্দ্রনাথ কেবল জাতি-রাষ্ট্রকে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে নয়, যুক্ত করছেন পাশ্চাত্যের সঙ্গেও। সেই সূত্রেই তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটি যেহেতু পাশ্চাত্যজাত, একটি পশ্চিমা আমদানি - তাই এটি আমাদের ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খায় না। তাঁর মতে, এদেশে জাতি-রাষ্ট্রের এই বহিরাগত ধারণা মানবসমাজকে বস্তুগত উৎপাদন ও মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে সংগঠিত করে ব্যক্তিমানুষকে একমাত্রিক সত্তায় রূপান্তরিত করে। তার অস্তিত্বের একমাত্র অর্থ হয়ে দাঁড়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা। তাঁর ভাষায়, “…the national machinery of commerce and politics turns out neatly compressed bales of humanity which have their use and high market value.” (Nationalism in the west)। এর ফলে একাধিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।
প্রথমত, যন্ত্র হিসেবে ‘জাতি’, মানুষের সেই সব দিককে উপেক্ষা করে, যেগুলি মুনাফা অর্জনের ধারণার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের স্বাভাবিক পরোপকারিতা বা আত্মত্যাগের প্রবণতাকে জাতি-রাষ্ট্রের যন্ত্রচালিত কাঠামো উপেক্ষা করে। রবীন্দ্রনাথের মতে, কারণ আত্মত্যাগ মুনাফা-উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নয়। অথচ পরোপকারিতা ও আত্মত্যাগই মানুষের উচ্চতর মানবিক সত্তার পরিচায়ক। দ্বিতীয়ত, জাতীয় যন্ত্রের মধ্যে মানুষের অবস্থান মানুষ ও যন্ত্রের স্বাভাবিক সম্পর্ককে উল্টে দেয় এবং তার স্বাধীনতাকে প্রসারিত করার পরিবর্তে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ মানুষের সঙ্গে মোটরগাড়ির সম্পর্কের উদাহরণ দিয়েছেন। একটি মোটরগাড়ি মানুষকে চলাচলের স্বাধীনতা দেয়, কারণ মানুষ সেটিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে সক্ষম। কিন্তু একটি যন্ত্র হিসেবে মোটরগাড়ি নিজে এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি গাড়িটিকে পরিচালনা করা মানুষের মন নিজেই স্বাধীন না হয়, তাহলে সেই গাড়ি তার স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে পারবে না। জাতি-রাষ্ট্র, মানুষকে কেবলমাত্র উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদক ও ভোক্তা হিসেবে প্রাসঙ্গিক করে তোলার মাধ্যমে প্রকৃতপ্রস্তাবে পরাধীন করে ফেলে। কারণ, এই অবস্থায় মানুষের অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে জাতীয় যন্ত্রই, মানুষ নয়। অর্থাৎ, মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে সংগঠিত এবং সেই উদ্দেশ্যে পরিচালিত জাতীয় যন্ত্রই মানবস্বভাবকে রূপান্তরিত করে এবং মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, উল্টোটা নয়। স্বাভাবিক হল, আমারাই মোটরগাড়ির গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করব, কিন্তু হল উল্টো, মোটরগাড়িই আমাদের গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করল। তৃতীয়ত, মুনাফা অর্জনের জন্য সূক্ষ্মভাবে নির্মিত একটি যন্ত্র হিসেবে ‘জাতি’ মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্রে থাকা যে ভারসাম্যবোধ, তাকে ব্যাহত করে। রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি, “In all our physical appetites we recognize a limit. […] But in the economic world our appetites follow no other restrictions but those of supply and demand which can be artificially fostered, affording individuals opportunities for indulgence in an endless feast of grossness.” (Nationalism in India)। অতএব, জাতীয় যন্ত্র এই অর্থনৈতিক ক্ষুধাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সমস্ত নৈতিক সীমাবোধকে বিলুপ্ত করে দেয় এবং ফলস্বরূপ একজন ব্যক্তিকে তার উচ্চতর মানবিক সত্তা থেকে নীচের দিকে টেনে তাকে এক অসম্পূর্ণ মানুষে পরিণত করে।
এই যান্ত্রিক স্বভাবের পাশাপাশি, রবীন্দ্রনাথ জাতি ও জাতি-রাষ্ট্রের ধারণায় অন্তর্নিহিত যে আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতার প্রবণতা রয়েছে, তার দিকেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মানবসমাজকে জাতি-রাষ্ট্রের কাঠামোয় সংগঠিত করা, যার লক্ষ্য ক্রমাগত অধিকতর বস্তুগত মুনাফা অর্জন, তাঁর ভাষায় – “…goads all its neighbouring societies with greed of material prosperity, and consequent mutual jealousy, and by the fear of each other’s growth into powerfulness. The time comes when it can stop no longer, for the competition grows keener, organization grows vaster, and selfishness attains supremacy.” (Nationalism in the west)। এর অর্থ, এমন এক বিশ্ব যেখানে দেশে দেশে ক্রমবর্ধমান সংযোগ প্রতিদিন মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছে, সেখানে যদি জাতি-রাষ্ট্র তার আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতামূলক প্রবণতা নিয়ে মানবসমাজকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে, তবে তার পরিণতি একমাত্র অস্ত্র প্রতিযোগিতায় গিয়ে পৌঁছবে! এ শেষ পর্যন্ত একপ্রকার আত্মবিনাশী মহাবিপর্যয়ে পর্যবসিত হতে বাধ্য। আজকের রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসন, আজকের ইস্রাইল-আমেরিকার ইরানে আগ্রাসন, আজকের ইস্রাইলের গাজায় নরসংহার যজ্ঞ ও এযাবৎ ঘটে যাওয়া ইতিউতি আরো অজস্র আগ্রাসনকে কী মনে হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের অভাবনীয় দূরদৃষ্টিরই প্রতিফলন নয় কী! রবীন্দ্রনাথের ‘জাতীয়তাবাদ’ বিষয়ক প্রবন্ধগুলো আমরা যদি মনোযোগ দিয়ে পড়ি, তবে দেখতে পাব যে তাঁর সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, কারণ মুনাফা অর্জনের ধারণা এবং আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতার ধারণা—উভয়ই শেষ পর্যন্ত সেই অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গেই যুক্ত। বলা-বাহুল্য পুঁজিবাদকে তিনি খুব সরাসরি ভাবে আক্রমণ করেছেন এরকম নয়, কিন্তু তাঁর নিবন্ধগুলির অন্তরে কিন্তু এই ভাবনাটাই অন্তঃসলিলা বলে মনে হয়।
আরেকটি প্রণিধানযোগ্য বিষয় হল, রবি ঠাকুরের জাতীয়তাবাদ নিয়ে এই গভীর চিন্তার অন্দরেই রয়েছে জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধের তফাতের জায়গাটা। তিনি দেখেছিলেন জাতীয়তাবাদের ঊষাকালটিকে। কালে কালে উত্তর-ঔপনিবেশিক, গোলোকায়ন উত্তর ও সর্বশেষ ধর্ম-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের করাল থাবা যার মূল কথাই হল এ-দেশ একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের! সংকীর্ণ হতে হতে এই ধর্ম-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এই দেশ শুধুমাত্র হিন্দুদের ও এই দেশের রাষ্ট্র ভাষা হিন্দি এই মর্মে হিন্দু ও হিন্দুত্ব-কে এক করে ফেলে। দেশাত্মবোধ কিন্তু হিন্দু-জাতি বোধ নয়। দেশাত্মবোধ হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টান, বৌদ্ধ সকল নির্বিশেষে দেশের সঙ্গে একাত্মবোধ (তবে বলা বাহুল্য, বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রেই বুঝবেন ক্রিকেট নিয়ে আপামর ক্ষ্যাপামি বা ঐ জাতীয় সস্তা জোলো ব্যাপার দেশাত্মবোধ নয়)। কাজেই দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ মিউচুয়ালই এক্সক্লুসিভ। যারা বলেন দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কিছু সময়ের জন্য হলেও জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন তাঁরা জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধের মধ্যে তফাৎটা গুলিয়ে ফেলেন। বিরোধীতা যদি করতে হয় জাতীয়তাবাদের করুন, হিন্দুত্ব নামক ধর্মান্ধতার করুন, মোল্লাতন্ত্র নামক ধর্মান্ধতার করুন। দেশাত্মবোধকে সমর্থন করুন। হিন্দু ও হিন্দুত্বকে এক করে দেখা বন্ধ করুন। মুসলমান ও আরো আরো অনেক সংখ্যা-লঘুদের বিরোধীতা করা বন্ধ করুন।
ঋণস্বীকারঃ-
১) Nationalism – Rabindranath Tagore
২) রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবীসমাজ - চিন্মোহন সেহানবীশ