এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো  ইদবোশেখি

  • বার্বিডল

    দময়ন্তী
    গপ্পো | ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫৬ বার পঠিত
  • ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি | বানপ্রস্থ | বার্বিডল

    অলংকরণ: রমিত



    (১)

    চোখ খুলে মনে হল বেশ বেলা হয়েছে। হাত বাড়িয়ে সাইড টেবল থেকে ফোনটা তুলেই আঁতকে ওঠে অরণি। আঃ আজকেও অ্যালার্ম শুনতে পায় নি, পৌনে নটা বাজে। সাড়ে নটায় ওর প্রেজেন্টেশান। ভেবেছিল সকালে উঠে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেবে তথ্য উপাত্তগুলোতে। কি যে হয়েছে কদিন ধরে, অ্যালার্ম আপনমনে বেজে বেজে থেমে যায় ওর ঘুম ভাঙেই না। মা’র ওপরেই রাগ হতে থাকে। রোজ রাতে ফোন করলেই একগাদা প্যানপ্যান শুরু করে, অমুকের এই অসুবিধে, তমুকের সেই সমস্যা। শুনতে শুনতে মাথা এত গরম হয়ে যায় যে ঘুম আসতে আসতে রাত সাড়ে তিনটে চারটে রোজ হচ্ছে। ঘুমোবার আগে ফোন করার অভ্যেস সেই বাড়ি ছাড়ার পর থেকেই। বাবা যতদিন ছিল তাও নানারকম গপ্পোগাছা হত। মা বরাবরই ঘরের চেয়ে বাইরের লোকের সমস্যা নিয়ে বেশী ব্যস্ত থাকে। দিদাই বলত ‘তর মা হইল ঘর জ্বালানি পর ঢলানি।‘ এটা শুনলেই মায়ের ঠোঁটদুটো কেমন চেপে বসে মুখের দুপাশে সরু দুটো রেখা তৈরী করত।

    বাবা হঠাৎ চলে যাওয়ার পর থেকে মা যেন আরো উড়নচন্ডী হয়ে গেছে, তৈরী হতে হতে ভাবছিল অরণি। আজ আর প্রাতরাশ করার সময় নেই। দুটো এনার্জিবার ব্যাগে ঢুকিয়ে ঝড়ের বেগে জানালা বন্ধ করে দরজা লক করে লিফটের বোতাম টেপে। অফিসে নিজের ডেস্কে যখন পৌঁছালো তখন ঘড়িতে নটা ছাব্বিশ। ল্যাপটপ অন করে মিটিঙে ঢুকতে গিয়ে দেখল অফিস৩৬৫ ওকে রিঅথেন্টিকেট করতে বলছে। বুকটা ধড়াস করে ওঠে, তবে কি চাকরিটা …। তাড়াহুড়ো করে ঢোকার সময় খেয়াল করে নি, এখন দেখে আশেপাশের অধিকাংশ কিউবিকলই ফাঁকা। ওই কোণে চাইনিজ ছেলেটা বসে আছে আর মার্কের কেবিনে আলো জ্বলছে। এমনিতে সাড়ে আটটার মধ্যেই এসে যায় সবাই। কোনোমতে কাঁপা হাতে সব ভরেটরে দেখল লগিন সাকসেসফুল। যাক বাবা! হাঁফ ছেড়ে মিটিঙের শব্দ সক্রিয় করে সবাইকে সুপ্রভাত জানিয়ে দেড় মিনিট দেরীর জন্য ক্ষমা চায় বারেবারে। মার্ক ওকে থামিয়ে বলে ও ঠিক আছে, আজ তো ঠিক স্বাভাবিক দিন নয়, তুমি শুরু করো।

    প্রেজেন্টেশান ভালই হল। ব্রাজিল থেকে একটি মেয়ে বেশ ভাল প্রশ্ন করেছিল দুটো আর সুইডেন, ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা বেশ কিছু নতুন পয়েন্ট যোগ করে। সব মিলিয়ে অরণির বেশ ভাল লাগছিল, সকালের টেনশান ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে মাথা থেকে। মিটিং শেষ করে কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে বসে থাকে অরণি, তারপর একটা এনার্জি বার বের করে আউটলুক খোলে। কোন কারণে সার্ভার স্লো বোধহয়, ডাউনলোড হচ্ছে খুব ধীরে। ‘চলো লাঞ্চ করে আসি’ মার্কের গলার আওয়াজে মাথা তুলে দেখে ওর কিউবিকলের বাইরে দাঁড়িয়ে মার্ক আর জেফ। হ্যাঁ তা সাড়ে বারোটা বাজে, সকাল থেকে পেটে কিছুই পড়ে নি। স্ক্রিন লক করে উঠে দাঁড়ায় অরণি আর আবারো বুকটা ধড়াস করে ওঠে। একশো ফিট বাই পঞ্চাশ ফিটের এই বিশাল হলে সাকুল্যে দশজন বসে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আর গোটা ফ্লোরে ও ছাড়া কোন মেয়ে নেই। মার্ক চলতে চলতেই বলে ‘চলো তোমাদের দুজনের সাথে কিছু কথা আছে।‘

    (২)

    মৌরিতানিয়া মৌরিতানিয়া বিড়বিড় করে আওড়াতে থাকে অনিতা। নামটা যেন জিভের মধ্যে আদরে আরামে গলে যায়। সেই কোন উনিশশো কংগ্রেস আমলে ইস্কুলের ম্যাপবইতে নামটা দেখেই ভারী পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে ঠিক করেছিল বড় হয়ে চলে যাবে সেখানে। আটলান্টিক মহাসাগর আর সাহারা মরুভূমির মাঝের সে দেশ না জানি কেমন অপরূপ হবে। একটু বড় হওয়ার পরে অবশ্য দেশটার সম্পর্কে আরেকটু জানাশোনা বাড়লে ওখানে চলে যাওয়ার ইচ্ছেটা কমতে কমতে মিলিয়েই যায়। কিন্তু নামের মোহটা ছাড়তে পারে নি। মেয়ে হওয়ার পরে ভেবেছিল নাম রাখবে মৌরিতানিয়া। অঞ্জন হেসেই উড়িয়ে দিল, ‘পাগল নাকি তুমি? মেয়েটাকে স্কুলে কিরকম খেপাবে ভেবে দেখেছ?’ শেষে ওই ডাকনাম মৌরি রইল। এ নামটা অবশ্য দুই বাড়ির সকলেরই খুব পছন্দ হয়েছিল। অনিতার সব পছন্দই সারাজীবন একটু কেটেছেঁটে মানিয়ে নিতে হয়েছে। পুতুলখেলার সময় যেমন ছোট ছোট থালাবাটি দিয়ে ধুলোর পায়েস আরে লুচিপাতার লুচি বানাত সেইরকম।

    ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হওয়ার। তখনো তো সাংবাদিকেরা এমন ক্ষমতার পা চাটা ফেকলুপার্টি হয়ে যায় নি। এক একটা ঘটনার পরে অন্তর্তদন্তমূলক রিপোর্ট করত যারা, বিভিন্ন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে গিয়ে সরাসরি রিপোর্ট করত যারা, তাদের আলাদা সম্মান ছিল। কিন্তু ওই যে চ্যাটার্জিকাকু এসে বাবাকে বলে গেল মেয়েদের জন্য এসব চাকরি নিরাপদ নয়, ব্যাসস। কিছুতেই আর বুঝিয়ে উঠতে পারল না। এখন মনে হয় কী হত কথা না শুনলে? বাড়ি থেকে বের করে দিত? তা নাহয় দিতই। অনিতা তো বেশ কটা টিউশানি করত তখনই, কোনমতে একটা হোস্টেল টোস্টেল কিছু পেয়েই যেত। অবশ্য তাই বলে বাড়িতে অনিতার উপরে কোন অনাদর বা অত্যাচার হত না। বরং অতিরিক্ত আদরেই ছিল ও। কিন্তু শেকল সোনার তৈরী হলেও তা তো শেষপর্যন্ত শেকলই থাকে। মা বাবার ওই দমবন্ধ করা যত্নের থেকে বাঁচতেই ঝটপট অঞ্জনের সাথে বিয়েটা সেরে নিয়েছিল ও। তা অঞ্জন ওর অনেক ইচ্ছেকেই প্রশ্রয় দিয়ে গেছে সারাজীবন।

    ইস্কুলের চাকরির সাথে সাথেই কিছু ছেলেমেয়েকে বিনা পয়সায় পড়াতে শুরু করেছিল অনিতা। তারপর সেই বাচ্চাগুলোকে সাথে নিয়ে কখনো রাস্তা ঝাঁট দিয়ে ময়লা পরিস্কার, কখনো নর্দমা খুঁচিয়ে বর্ষার জল বের করে দেওয়া কখনো বা কটা টগর কামিনী কলকের চারা রাস্তার পাশে পাশে লাগানো, সেই থেকেই গড়ে উঠল ‘ভূমির টানে’ সংস্থা। ‘মাসিইইইই তুমি কোতাআআয়?’ তীক্ষ্ণ চীৎকারে চমকে ওঠে অনিতা। তাড়াতাড়ি চটিটা পায়ে গলিয়ে বেরোয়। দরজায় তালা লাগাতে লাগাতেই দেখে নানাবয়সী মহিলা পুরুষের দলটা ঠিক উল্টোদিকের চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সকলের হাতেই প্ল্যাস্টিকের মধ্যে বা ব্যাগে তাড়া তাড়া কাগজ। ও তাকাতেই কাঠির মত রোগা একটা হাত তুলে মলিন জিন্স আর রঙওঠা টিশার্টের ছেলেটা একইরকম তীক্ষ্ণ গলায় বলে ‘আরে চলো চলো এতক্ষণে মস্ত লাইন হই গেচে ওকেনে।‘ উত্তম, সবচেয়ে কইয়ে বলিয়ে আর সবচেয়ে বেশী ভাগ্যের মার খাওয়া এই ছেলেটার ওপর অনিতার বড্ড মায়া।

    (৩)

    এই অঞ্চলে ঠান্ডা মার্চের শেষ পর্যন্ত তো থাকেই, কোন কোন বছর মে মাসেও বরফ পরে অফুরান। তবে আজকের দিনটা ভারী সুন্দর। সকালে ঘুম ভেঙেছে সাড়ে ছটায়, তখনই দেখে আকাশ পরিস্কার, সূর্য উঠছে। এই সময়টায় পৃথিবী বড় সুন্দর হয়ে থাকে। তাড়াতাড়ি এক কাপ কফি বানিয়ে বাইরে এসে ডেকে বসে। আজ একটা গোল্ডফিঞ্চ এসে নাচানাচি করছে। অলসভাবে কফিতে চুমুক দিতে দিতেই ঠিক করে ফেলে আজ আর অফিস করবে না অরণি। বরং কোথাও থেকে টুক করে ঘুরে আসা যাক। সাড়ে আটটা কি নটার বাস ধরে পোর্ট অথরিটি চলে যাবে, তারপর ঠিক করবে কোনদিকে যাওয়া যায়। শুক্রবার বাসে খুব বেশী ভীড় হবার কথা নয়। অনেকেই আজকাল চারদিনেই চল্লিশ কি পঁয়তাল্লিশ ঘন্টা ক্লক করে শুক্রবার আর অফিসে যায় না, অথবা বাড়ি থেকে কাজ করে। এমনিতে পিটার প্যানের বাসগুলো চলে বেশ ঘন ঘন। তবে সবকটাতেই মোটামুটি ভীড় হয়।

    স্নান সেরে এসে চারটে ডিম, টমেটো কড়াইশুঁটি, ঝিরিঝিরি করে কোরানো মোজারেলা চিজ আর কুচিকুচি করে কাটা পর্ক সসেজ দিয়ে মোটাসোটা ফুলোফুলো ওমলেট বানাতে বানাতে আজকের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখছিল অরণি। আজ কাল পরশু কোন তুষারপাতের পূর্বাভাস নেই, রৌদ্রোজ্জ্বল দিন আর কনকনে ঠান্ডা থাকবে। বাইরের তাপমাত্রা এখন মাইনাস চার, রাতের দিকে মাইনাস দশ এগারো হবে। তা হোক মাইনাস কুড়ি পঁচিশে না গেলেই হল। এমনিতে কানেটিকাটে শীত বেশ ভালই পড়ে। তবে হার্টফোর্ডের ডাউনটাউনের কাছে ঠান্ডাটা সাবার্বের থেকে কম। সাবার্ব মানে মফস্বল, অরণি আপনমনে ফিকফিক করে হাসে। ওর দাদাই দিদাইয়ের বাড়ি ছিল মফস্বলে, হাওড়া স্টেশান থেকে লোকাল ট্রেনে চেপে যেত ওরা। মাখন ডিম চিজ আর সসেজের মেশানো একটা গন্ধ আসছে, তার সাথে মিশে যাচ্ছে অ্যারাবিকা রোস্টেড কফির সুবাস। অনেকদিন পরে মনের মধ্যে একটা খুশীর ঝলক টের পায় অরণি।

    আটটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়ায় এগারোটা নাগাদ পোর্ট অথরিটি পৌঁছে টিউব ধরতে এগোল অরণি। মোটামুটি আবছা ধারণা আছে নিউ জার্সির কোন একটা ছোট শহরে সমুদ্রের ধারে দুদিন থাকবে। কোথায় সেটা এখনো জানে না। পেন স্টেশানে পৌঁছে দেখে টিকিট ভেন্ডিং মেসিনের সামনেটা একদম খালি। নর্থ জার্সি কোস্টাল লাইনের টিকিট নিতে নিতেই ট্রেন ঢোকে, দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে ওঠে। জানলার ধারে বসে ফোন বের করে র‍্যুটটা দেখতে থাকে। এই বেরিয়ে পড়াটা খুব দরকার ছিল ওর। চাকরিটা আপাতত বেঁচে গেছে বটে তবে কোম্পানি আদৌ কতদিন টিঁকবে বোঝা যাচ্ছে না। জমানো টাকা যা আছে সবই ইক্যুইটিতে লাগানো। মা অবশ্য বারেবারে বলে দেশে কিছু ফিক্সড ডিপোজিট, আরো কী কী সব যেন আছে তাতে টাকা রাখতে। তাতে নিরাপত্তা বেশী। ধুউর অত নিরাপত্তা দিয়ে করবে কী যদি ইচ্ছেমত টাকা বের করতে না পারে। কোনওকিছুতেই কোনওরকম বাঁধাবাঁধি ওর সহ্য হয় না। হঠাৎ একটা স্টেশানের নামে চোখ আটকে যায় অরণির।

    (৪)

    ‘অসীম মন্ডল, পিতা রসিককুমার মন্ডল বয়স ৬৩। একি! বাপের নামে কোথাও কুমার নেই এটা তোমারই বাপ তো?’
    ‘হ্যাঁ সার। এই যে বাপের ভোটার কার্ডে রসিক মন্ডল আছে আর আধার কার্ডে রসিককুমার’।
    ‘তা নামটা কী? কবে এসেছ বাংলাদেশ থেকে?’
    ‘বাংলাদেশ?? সে কি কথা স্যার আমরা তিনপুরুষে এই কলোনীর রেসিডেন। একখানা ঘর ঠাকুর্দা তুলেছিল, বাপে আমার পুরো বাড়িখানা করে।‘
    ‘হুঁহ রেসিডেন এয়েছে! তা ঠাকুদ্দা কোত্থেকে এয়েছিল?’
    ‘সে তো সেই মুর্শিদাবাদের কোথায় যেন ছিল। গঙ্গায় আমাদের ভিটেমাটি খেয়ে নেয়, তারপরেই ঠাকুদ্দা কলকেতা চলে আসে, বাপ তখন কুড়ি বচ্ছরের। ‘
    ‘কই দেখি সেই ভিটের কাগজ দেখি?’
    ‘সে ভিটের কাগজ কোথায় পাবো স্যার? সেসব কিচ্ছু নেইকো। এক রাত্তিরে গঙ্গায় সব গিলে নিইছিল। বাপের কাছে শুনিছি পরনের জামাকাপড়টুকু ছাড়া আর কিচ্ছু ছিল না। তারপরে গে …‘
    ‘আচ্ছা হয়েছে আর পাঁচালি খুলে বসতে হবে না। ওই টেবলে এই কাগজ কটার জেরক্স রেখ যাও আজকে। ডকুমেন্ট চাইলেই সব গপ্প ফাঁস হয়ে যায়।‘
    ‘গপ্পো নয় স্যার কলোনীর অনেকে জানে। আপনি জিগ্যেস করুন। আমার নামটা থাকবে তো স্যার?‘
    ‘আরে যাও না বাপু বললাম তো ওই টেবলে জমা করে বাড়ি যাও।‘

    ‘বিলাসীবালা দাস, পিতা হরেন মন্ডল, বয়স ৩৩। তোমার বয়স তেত্রিশ!? হ্যাঁ গো বুড়িমা তেত্রিশ বয়স তোমার? আর মন্ডলের মেয়ে তুমি দাস?’
    ‘কি জানি বাবা তেত্রিশ কি চৌত্রিশ হবেনে। দাস নয় গো দাসী ছিলাম তো দাস কে বানালে?’
    পাশাপাশি দুটো টেবলের উপর দিয়ে হাসির লহর বয়ে যায়। ‘যে কোনদিন চিতায় উঠবে এখনো বয়স কমাচ্ছে দেখো।‘
    ‘ঠাকমা কত সনে জন্মেছিলে মনে আছে? ইস্কুলে গেছিলে? কাগজপত্র আছে কিছু?’
    ‘সন … ওই তো যেবারে খুব ঝামেলা হল, পাশের বস্তিতে কারা আগুন দিল, সব টেরাম বাস বন্ধ হয়ে গিছিল সেই সময় নাকি মায়ের আমার ব্যথা উঠলো। বাপে কোত্থেকে এক হিন্দুস্তানি রিস্কাওলা ডেকে …’
    ‘উফফ হয়েছে হয়েছে অত কাহন বাদ দাও। কোথায় কী কার্ড কাগজ আছে সব দাও।‘
    ‘একিই শুধু ভোটার কার্ড দিয়েছ, তাতে বিলাসীবালা দাস, স্বামী হরেন মন্ডল। আরে হরে হরেন তোমার বাপ না সোয়ামী?’
    ‘হরেন্দরনাথ মন্ডল আমার বাপের নাম। সোয়ামী তো … এঁ এঁ ইলেকটিরি দাস’

    ভেতরে একটা তুমূল গোলমাল, কান্নার আওয়াজ শুনে পর্দা সরিয়ে অনিতা ভেতরে ঢুকে দেখে বিলাসী মাটিতে বসে হাপুসচোখে কাঁদছে আর চেয়ারে বসে ইআরও ভদ্রলোক অত্যন্ত বিরক্তমুখে কী সব বলছেন। পাশের টেবলের অল্পবয়সী মেয়েটি হাঁ হাঁ করে ওঠে ‘আরে আপনি ঢুকছেন কেন? ডাকবো আমরা।‘ বিলাসী মুখ তুলে দেখেই আরো জোরে কেঁদে ওঠে ‘ও দিদিমনি গো এঁয়ারা বলচেন আমার নাম সোয়ামীর নাম সব বদলে দেচে কোন মুখপোড়া। ওগো তোমার জামাইয়ের কাগজ আমি কোথায় পাবো গোও।‘ ইআরও হাত তুলে অল্পবয়সী মেয়েটিকে থামিয়ে অনিতাকে সামনের চেয়ারে বসতে ঈঙ্গিত করেন। ‘আপনি ওর সাথে এসেছেন? দেখুন ওর তো কোন কাগজপত্রই নেই, আর বয়স লেখা তেত্রিশ, এদিকে স্বামীর নামও বলতে পারছে না।‘ বিলাসীবালা ফুঁসে ওঠে ‘বললুম তো ইলেকটিরি দাস।‘ অনিতা হেসে ফেলে বলে ‘বিদ্যুৎ দাস।‘ শেষপর্যন্ত বিলাসীর কাগজ জমা নিল বটে তবে ভরসা খুব একটা নেই বোঝাই গেল। এখনো আরো তেরো জনের বাকী।

    (৫)

    পাথরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে একটা পাথরের ওপরে চুপ করে বসেছিল অরণি। সামনে ছোট ছোট ঢেউ এসে ভেঙে সাদা ফেনায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু সীগ্যাল ওড়াউড়ি করছে, কখনো কখনো দেওয়ালের ওপরে এসেও বসছে। গোটা সৈকতে আর একজনও মানুষ নেই। এই সৈকতটা কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, সাধারণের জন্যই। যে দেওয়ালে হেলান দিয়ে ও বসেছে সেটা এক বিখ্যাত হোটেলের। খুব খেয়াল করে দেখলে তাদের নিজস্ব সৈকতের ওইপ্রান্তে অনেকটা দূরে দু একজনকে দেখা যাচ্ছে। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। শনিবারের শেষ বিকেলে সমুদ্র সৈকতে একটাও মানুষ না থাকাটা একটু অদ্ভুত। তবে আটলান্টিকের ধারে ধারে অনেকগুলো ছোটবড় জনপদ থাকায় হয়ত ভীড় কোথাও তেমন হয় না। আর এই স্প্রিং লেক জায়গাটা ভারী শান্ত, চুপচাপ, একদম ছবির মত। নামটা ভাল লেগে যাওয়ায় কাল এখানেই নেমে পড়েছিল ও, নাহলে কোস্টাল লাইনের শেষ স্টেশান অবধি যাবার ইচ্ছে ছিল।

    স্টেশান থেকে বেরিয়ে গুগল ম্যাপ অন করে সৈকত লক্ষ করে হাঁটতে হাঁটতেই একটা বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট রেন্টাল চোখে পড়ে। সেখানেই দুরাতের জন্য বুক করে নেয়। মালকিন মাম্মাস্টেলা বেশ আলাপী আমুদে মা মাসি ধরণের মানুষ। প্রথমেই বলে নিয়েছেন আমাকে বাপু তুমি মাম্মা বলে ডেকো। রাতের খাবারটাও স্টেলাই বানিয়ে দিয়েছেন। পাঁচ ডলারে একপ্লেট স্যালাড আর রোটিসেরি চিকেন কোথায়ই বা পেত অরণী। হোটেলে আর একটি রুমে এক বয়স্ক দম্পতি আছেন, আপস্টেট নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছেন এক সপ্তাহ ছুটি কাটাতে। সকালে প্রাতরাশের সময় আলাপ হয়েছিল, টুকটাক দু একটা কথা আবহাওয়া ডিমের দাম এইসব। এখানে সমুদ্র সৈকত বেশ বড় বড় পাথরে ভর্তি। কোথাও কোথাও তো রীতিমত বোল্ডারের ওপর দিয়েই হেঁটে আসতে হল। বসে বসে নিজের জীবনটার কথা ভাবছিল অরণি। পড়াশোনায় মোটামুটি মাঝারি ছিল, গ্র্যাজুয়েশান করে যখন পরিবেশ নিয়ে কাজ করবে ঠিক করল তখন কোত্থাও চাকরি পায় নি।

    শুরু করেছিল একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ানো দিয়ে। তারপর তো এদিক ওদিক ঠেলা ধাক্কা খেয়ে খেয়ে শেষে ডেটা অ্যানালিটিক্সে ঢুকে গিয়ে আস্তে আস্তে থিতু হয়। সেই থেকেই চাকরি নিয়ে বাইরে আসা। কী যেন বলে? হ্যাঁ বডি শপিং। ওর বডি শপ করেছিল যে কোম্পানি, তার দাসত্বের শেকল ছিঁড়তে ওর পাঁচ পাঁচটা বছর লেগেছিল। তারপরে এদেশে পাকাপাকি থাকার কাগজপত্র হল তো এই আড়াইবছর। দেশের নাগরিকত্ব এখনো ছাড়ে নি মায়ের প্যানপ্যানানির জ্বালায়। অবশ্য এদেশের যা অবস্থা তাতে স্যুইডেন বা ফিনল্যান্ডের দিকে চলে গেলেও মন্দ হয় না। এই সীগ্যালগুলোর মতই ওর জীবনটাও উড়ে উড়ে বেড়িয়েই কাটবে। কোথাও স্থায়ীভাবে থাকা বোধহয় হবে না জীবনে। অথচ ভেবেছিল এদেশে থিতু হলেই রশ্মিকে নিয়ে আসবে এখানে। আহ রশ্মির কথা মনে পড়লেই হৃৎপিন্ডটা মুঠোয় চেপে ধরে কে যেন। কথা ছিল … কথা ছিল … ছটফট করে উঠে পড়ে অরণি। আকাশ সমুদ্র লাল গোলাপী কমলায় রাঙিয়ে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। কটা ছবি তুলে হোটেলের পথ ধরে।

    (৬)

    আলমারিটা খুলে সামনে চুপ করে বসে আছে অনিতা। ডিগ্রি সার্টিফিকেট, ইস্কুলের নিয়োগপত্র, অভিজ্ঞতার শংসাপত্র, পেনশানের কাগজ, অঞ্জনের কাগজপত্র, মৌরির ছোটবেলার জামা, প্রিস্কুলে মৌরির আঁকা তিনটে ছবি, কটা রুমাল, মৌরি যখন দুই বিনুনী করত তখনকার দুটো লাল ফিতে আর … আর দুটো পুতুল। একটা পুতুলের একটা হাত একটা পা নেই, মৌরি টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল। আর একটা আস্তই আছে, লাল টুকটুকে জামা পরানো, কাঠি কাঠি হাত পা, এইটুকু কোমর, তীক্ষ্ণ বুক, নীল চোখ। অনিতা চুপি চুপি নাম রেখেছিল মৌরিতানিয়া, পুতুলটাই লুকিয়ে রেখেছিল কত বছর। এই এক বাতিক ছিল অনিতার, রোগা রোগা পুতুল কিনে জমানো। মৌরি ভালবাসত গাড়ি, ট্রেনসেট, মেকানো সেট, লেগো এইসব। ফুলো ফুলো ট্যাপাটোপা পুতুল হাতে পেলে ওটা দিয়ে পেটাপেটি খেলত। মৌরির নাম করেই প্রথমদিকে পুতুল কিনত অনিতা, এই পুতুলটার হাত পা ছিঁড়ে ফেলার পরে ওই পুতুলটা কিনে লুকিয়ে রেখেছিল শাড়ি জামার মধ্যে।

    ছোটবেলায় মৌরি ভালই ছবি আঁকত, পরে কেন যেন কিছুতেই আর আঁকতে চাইত না। অনিতা যা যা নিয়ে প্রশংসা করেছে, গর্ব করেছে প্রতিটা জিনিষ মৌরি ছেড়ে দিয়েছে, দক্ষতা, ক্ষমতা আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে গেছে অবহেলায়। অথচ মেয়ে এমনিতে খুব বাধ্য ছিল, কোনোদিন কোন কথা অমান্য করে নি, কোনো অনুরোধ ফেলে নি শুধু অনিতার পছন্দের কাজগুলো জিনিষগুলো নষ্ট করেছে চুপচাপ। সুখের সংসারই তো ছিল ওদের, মৌরির এই অদ্ভুত আচরণের কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না অনিতা। অঞ্জন বেঁচে থাকতে ওর সামনে মেয়েকে জিজ্ঞাসাও করেছে কয়েকবার, মেয়ে কিছুই বলে নি। হয় না বোঝার ভান করেছে নয় চুপ করে থেকেছে। অঞ্জন পাত্তা দেয় নি, ও ছেলেমানুষী বলে উড়িয়ে দিয়েছে। শুধুই ছেলেমানুষী নয় তা অনিতা জানে। কোথায় কী ভুল হয়েছিল সেইটা যদি বুঝতে পারত একটু। মৌরিতানিয়ার লাল জামাটা একটু রঙচটা হয়ে গেছে। জামায়, কাঠি কাঠি হাত পায়ে আস্তে আস্তে আঙ্গুল বোলায়, আঙুলের ডগায় উঠে আসে জামার টুকরো।

    এইসব টুকরো টাকরার মধ্যেই মিশে থাকে জীবনের টুকরো। ওই যে লাল চিকচিকে কুচির মধ্যে হালকা হয়ে ভেসে আছে অঞ্জনের ঈষৎ তাচ্ছিল্য মেশা প্রশ্রয়ের হাসি। ঠিক যেমন হাসত অনিতা বাচ্চাদের নিয়ে রাস্তার ধারে কিংবা পার্কে গাছ লাগিয়ে ফিরলে। এই যে হাতের মধ্যে মচমচ করে গুঁড়ো হয়ে গেল ফ্যাকাশে লাল টুকরোটা এইটে মৌরির ওই অতি পাকা বন্ধুটা বেরিয়ে যাওয়ার পরে মেয়ের চুপচাপ উঠে নিজের ঘরের দরজাটা দুম করে বন্ধ করে দেওয়া। হ্যাঁ ওই বন্ধুটাকে অনিতা একদম সহ্য করতে পারত না, একে তো কিরকম কাঠখোট্টা কথাবার্তা, অসভ্য নয় তবে নরমসরম বাধ্য টাইপেরও নয়। তায় ওকে দেখলেই মৌরির মুখে যে আলোটা ফুটে ওঠে, চোখটা যেমন অর্ধেক গলে যাওয়া মোমবাতির শিখার মত তিরতিরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সেটাও অসহ্য লাগত। রাগের সাথে আতঙ্কও হত। এসব কি আমাদের সমাজে চলে নাকি! ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মেয়েকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছে। মেয়ে ভান করেছে কিচ্ছু বোঝে নি। মায়ের মন, অনিতা জানে ওদের চোখের ভাষা পড়তে ওর একটুও ভুল হয় নি।

    (৭)

    কমন লাউঞ্জের সোফায় বসে ওর এক লিটারের মগে কফি নিয়ে আস্তে আস্তে চুমুক দিতে দিতে টিভি দেখছিল অরণি। প্রাতরাশ এখনো তৈরী হয় নি, মাম্মাস্টেলার নড়াচড়া, পেয়ালা পিরিচের টুং টাং আওয়াজ ওমলেট আর বেকনভাজার গন্ধ আসছে পাশের রান্নাঘর থেকে। কাল রাত্রে একঝাঁক তুষারপাত হয়ে গেছে, রাস্তায় হালকা সাদা পাউডারের পরত দেখা যাচ্ছে জানলা দিয়ে। স্টেলা এসে প্রাতরাশ এখানেই দেবে কিনা জিজ্ঞাসা করে টিভির চ্যানেল বদলে দেয়। আজকে ফিরতে হবে, তার আগে যতটা পারা যায় আরাম করে নেওয়া যাক ভেবে এখানেই দিতে বলে দেয়। স্টেলা একটা ট্রলিতে সুন্দর করে সাজিয়ে প্রাতরাশ নিয়ে আসে। বয়স্ক দম্পতিও নেমে এসে লাউঞ্জেই বসেন। আইপ্যাডটা নিয়ে আনমনে রেডিট ঘাঁটছিল অরণি। রেডিটের পেটি রিভেঞ্জ আর অ্যাম আই দ্য অ্যাসহোল এই দুটো সাবরেডিট ওর খুব পছন্দের। মিডওয়েস্টে এক জায়গায় বাচ্চাদের পার্কের উল্টোদিকে বাড়ির এক ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত পার্কিং অবিরাম দখল হয়ে যাওয়া ঠ্যাকানোর গল্প পড়তে পড়তে হঠাৎই স্টেলা আর অ্যানির ‘ওহ মাই গশ!, ‘ওহ নোওওও।‘ শুনে চমকে ওঠে অরণি।

    অ্যানির বর সোজা তাকিয়ে আছেন টিভির দিকে চোয়াল শক্ত। স্টেলার দুই হাত ক্রস করে বুকে রাখা আর অ্যানি দুইহাত মুখে চাপা দিয়ে তাকিয়ে আছেন টিভির দিকে। আলোর ঝলকানি, সাইরেন আর অনেকটা ভাঙাচোরা বাড়ি দেখাচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ডে, সংবাদপাঠক গম্ভীর, প্রায় ভেঙেপড়া মুখে জানাচ্ছেন আমেরিকা ইরান আক্রমন করে একটি বাচ্চা মেয়েদের স্কুল ধ্বংস করে দিয়েছে। সম্ভবত একজনও বেঁচে নেই। নিজের চোখ কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে অরণি চ্যানেলের নামটা পড়ার চেষ্টা করে, আল জাজিরা। স্টেলা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে চলেছে। অ্যানি খুব ধীরে ধীরে বলেন গতকাল রক্সবারিতে ইমিগ্রেশান এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসভা ছিল। হোমল্যান্ড পুলিশ এসে যথেষ্ট বলপ্রয়োগ করেছে, গ্রেপ্তার হয়েছে বহু। অরণি মনে মনে ভাবে ভারতে হলে হয়ত দু-চারটে লাশই পড়ে যেত আর তাই নিয়ে শুরু হত দলগুলোর মধ্যে কামড়াকামড়ি। অ্যানির বর দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করেন ‘উই অ্যাজ আ নেশান ফাকড আপ মিজারেবলি।‘

    কথাটা বলেই ভদ্রলোক উঠে হনহন করে বেরিয়ে যান লাউঞ্জ থেকে। অ্যানি বসে বসে দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ওঠেন শব্দ করে। অরণি অবাক হয়ে যায়। টিভির পর্দায় ততক্ষণে কচি কচি ফুলের মত মুখের ছবি সারিসারি। মাম্মাস্টেলা উঠে অ্যানির পাশে বসে জড়িয়ে ধরেন। অরণিরও খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু … কিন্তু প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলার মত নয়। কান্নার মধ্যে জড়িয়ে জড়িয়ে অ্যানি বলে যেতে থাকেন তাঁদের ছেলের কথা। একমাত্র ছেলে, পড়াশোনায় চৌকশ, কলেজে ঢোকার আগেই আর্মিতে গেল। সেখান থেকে আফগানিস্তান। সপ্তাহে একদিন কখনো দশদিনে একদিন ফোন করতে পারত। বডি ব্যাগে করে ফিরেছিল ছেলে, ভেতরে মাথাটা ছিল না, বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরীরটুকু শুধু। এইসময়ই অরণির ফোনটা কাঁপতে শুরু করে, এখন ফোন ধরা মুশকিল, আঙুলে চেপে থামিয়ে দেয়। ফোন থামে না, আবার কাঁপতে শুরু করে, আবার থামায়, আবার কাঁপে। বাধ্য হয়ে ফোন হাতে তুলে দেখে মা কলিং। আশ্চর্য এই সময় তো মা করে না কখনো।

    (৮)

    ফোনটা নিয়ে বাইরে চলে আসে অরণি, ‘হ্যাঁ বল, এখন কী ব্যপার?’
    ‘দেখেছিস খবরটা? অতগুলো বাচ্চা … উহ তাকানো যাচ্ছে না। তোরা কিছু শুনেছিলি?’
    ‘হ্যাঁ এইমাত্র দেখলাম। না না এখানে কোন খবর তো ছিল না।‘
    ‘বাচ্চা মেয়েগুলো বাড়িতে ওদের পুতুল খেলনা রেখে ক্লাসে এসেছিল … আর তো খেলবে না।‘
    অরণি একটু চুপ করে থেকে সাবধানে বলে ‘তুমি এইজন্য ফোন করলে? তোমার শরীর ঠিক আছে?’
    ‘হ্যাঁ … না মানে তোর কথা বড্ড মনে হল। হ্যাঁরে এখন এদিকে আসবি না নারে?’
    ‘কি যে বলো না। এখন ছুটি কোথায় পাবো? তাছাড়া কোম্পানি অনেক লোক ছাঁটাই করেছে, ফলে আমাদের এক একজনকে তিন থেকে চারজনের কাজ করতে হচ্ছে। কাজের চাপ ভীষণ।‘ বলেই মনে মনে জিভ কাটে অরণি। এহ মা-কে ছাঁটাইয়ের কথাটা না বললেই হত, বেকার টেনশান করবে। এতদিন তো বলেও নি, আজই দিনটা এমন বাজে শুরু হল।

    মা কথাটা খুব একটা খেয়াল করেছে বলে মনে হল না। আপনমনেই বলতে লাগল, ‘আহ বাচ্চাগুলো, ফুলের মত বাচ্চাগুলো, ওই ছোট ছোট কবরগুলো যে বড্ড ভারী, বইবে কী করে ওদের মা বাবারা?’ তারপরেই গলায় বেশ খুশী খুশী ভাব এনে জিজ্ঞাসা করে ‘হ্যাঁরে তোর সেই বন্ধুর খবর কী? কোথায় আছে এখন? কী করছে?’ অরণির গলা আটকে যায়। মা রশ্মির কথা জিজ্ঞাসা করছে কেন? মা যদি রশ্মিকে নিয়ে অত টিকটিক না করত তাহলে অরণি হয়ত আরেকটু সময় পেত গুছিয়ে নেবার। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে মা বলে ‘হ্যাঁরে এখনো রেগে আছিস? বলবি না কেমন আছে মেয়েটা?’ অরণি একটা শ্বাস ফেলে বলে ‘ভালই আছে। তবে আমার সাথে আর যোগাযোগ রাখে না।‘ দুজনেই চুপ করে থাকে একটু। অরণি দেখে রাস্তা দিয়ে দুই একজন মানুষ চলাচল করছে। ভেতরে অ্যানির কান্না থেমেছে, মাম্মাস্টেলা গুনগুন করে কী যেন বলে যাচ্ছেন। অরণি আবার জিজ্ঞাসা করে ‘তোমার শরীর কেমন? ওষুধ খাচ্ছ ঠিকঠাক?’

    ওদিক থেকেও একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে। ‘জানিস এখানকার প্রায় সবার নাম বাদ গেছে, চুড়ান্ত তালিকা এখনো বেরোয় নি, কিন্তু নাম বাদ গেছে এটা জানা গেছে। ‘
    ‘কিসের নাম? কোত্থেকে বাদ গেল?’ অরণির গলায় নিখাদ বিস্ময়।
    ‘আরে ভোটার লিস্ট কারেকশান হচ্ছে বলেছিলাম না।‘ ওহ হ্যাঁ মা বলেছিল বটে। কিন্তু এ তো সাধারণ ব্যপার, মাঝে মাঝেই হয়। তাতে বাদ যায় কী ভাবে? অরণি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কী বলবে বুঝতে পারে না। অনিতা খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস করে ডাকে ‘মৌরি মৌরিই’ অরণি চমকে উঠে বলে ‘হ্যাঁ বল’।
    ‘বিলাসীর তো নাম থাকবে না বুঝেইছিলাম। বিদ্যুৎ, উত্তম, রমলা, আশরাফ, মুহিত, রহিমা, নুরুন্নেসা কারুর নাম নেই। আর … আর আমার নামও ওরা ডিলিট করে দিয়েছে।
    ‘মা আ কী বলছ! তোমার নাম ডিলিট কী করে হবে? কেন? কীভাবে? কোথায় গিয়ে তুলতে হবে?’
    অনিতা চোখ বন্ধ করে ফেলে। কত কত্ত বছর বাদে মেয়েটা মা বলে ডাকল। আআঃ এখন সব কেড়ে নিক, জেলে ভরে দিক আর তেমন কষ্ট হবে না ওর। আবার ফিসফিস করে বলে ‘মৌরি, আমায় যদি জেলে বা ডিটেনশান সেন্টারে নিয়ে যায় আমার আলমারিতে দেখিস লালজামা পরা একটা পুতুল আছে। ওটা নিয়ে তোর যা ইচ্ছে করিস।‘
    অরণি তখনো বলে যাচ্ছে ‘কীসব বলছ? জেলে নেবে কেন? তোমার নাম ডিলিট কী করে হল? কেন? কীভাবে? কোথায় গিয়ে তুলতে হবে?’ বলতেই থাকে … বারবার।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি | বানপ্রস্থ | বার্বিডল
  • গপ্পো | ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫৬ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ঘ - শর্মিষ্ঠা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন