পারকাশন ক্যাপওলা মাজল লোডার আঠেরো শো সাতান্নতে যে সব রাইফেল –বন্দুক কোম্পানির বাহিনীতে ব্যবহার হতো সবই ছিল মাজল লোডার । বাটটা তলায় রেখে ব্যারেলের মুখ বা মাজল দিয়ে গুলি ভরার কারণে এই নাম । শুরু হলো ফ্লিন্টের বদলে কার্তুজ আর পার্কাশন ক্যাপের ব্যবহার । সেই বন্দুকের বোরের ভেতর খাঁজ কেটে তৈরি হচ্ছে রাইফেলও । আঠেরোশো সাতান্নর মহাবিদ্রোহের , গদরের সময় পার্কাশন ক্যাপ লাগানো বন্দুক আর রাইফেল দুয়েরই ব্যবহার ছিল। ঘোড়া টিপে একবার ব্যবহারযোগ্য এই পার্কাশন ক্যাপে আঘাত করে ফাটিয়ে দিলে তার মধ্যে থাকা মার্কারি ফুলমিনেট নামক রাসায়নিক ডিটোনেটরের কাজ করে বারুদ ফাটিয়ে দিতো। মুশকিল হচ্ছে প্রতিবার পার্কাশন ক্যাপ না বদলালে বন্দুক / রাইফেল দিয়ে গুলিই ছোঁড়া যেত না। পার্কাশন ক্যাপ ছাড়া বন্দুক অচল ! পুরোনো মাস্কেট বা ফ্লিন্টলক বন্দুকের থেকে উন্নত ধরণের হলো মাজল লোডার যা বন্দুক বা গুলিটাকে ব্যারেলের মধ্যে ঘুরপাক খাইয়ে দিতে খাঁজ কাটা রাইফেলও হতে পারে।মাজল লোডারের মাজল দিয়ে বারুদ ঢেলে নির্দিষ্ট বারুদ চেম্বারে ঢুকিয়ে র্যাম রড দিয়ে তাতে লোহার বলের বুলেট ঠেসে গুলি ছোঁড়া হতো।কার্তুজের ধরণ কার্তুজ দু ধরণের হতো বল সহ বা বল ছাড়া ।কার্তুজের ধরণ অনুযায়ী বল সহ বা বল ছাড়া কার্তুজ ঠাসা বারুদের ওপর ঢুকিয়ে রেখে গুলি ছোঁড়া হতো। ১) প্রথম ক্ষেত্রে খোলা মুখ বারুদ মাজল দিয়ে ঢুকিয়ে আলাদা করে লোহার বল যা বুলেট হিসেবে ব্যবহার হবে তা র্যাম রড দিয়ে ঠেসে দেওয়া হতো ।২) আর কার্তুজের সঙ্গে বল থাকলে বারুদ বার করার পর খোলা মুখ উলটো করে অর্থাৎ যে দিকে বল আছে সে দিকটা বাইরের দিকে রেখে ঢুকিয়ে ঠাসা হতো।বারুদের গ্যাস নিয়ে সমস্যা বল বা বুলেট ঠিকঠাক ভরাটা জরুরি নইলে বারুদ ফাটা গ্যাস পাশ দিয়ে বেরিয়ে বুলেটের ভেদশক্তি কমিয়ে দেবে শুধু নয় ব্যারেল ফাটিয়ে বন্দুকবাজকে মারাত্মক আহত এমনকি মেরেও ফেলতে পারে । পুরনো ধরণের সব গাদা বন্দুকে আকচার এই ব্যারেল ফাটার ঘটনা ঘটতো । বোরে খাঁজকাটা রাইফেলের ক্ষেত্রে এটা আরো সত্যি। সেক্ষেত্রে দুভাবে সমাধান হতো বল ছাড়া কার্তুজের ক্ষেত্রে আলাদা বল / বুলেটের চারপাশে কাপড়ের প্যাচ লাগিয়ে দেওয়া হতো যা ঘোড়া দাবালে সৃষ্ট তাপে গলে গ্রিজের কাজ করে বুলেট বেরনোর সহায়ক হতো । বল লাগানো কার্তুজে যে দিকে বল থাকত সেখানে গ্রিজ লাগানো থাকত । বেরনোর সময় সে দিকটা সামনে থেকে একই ভাবে বুলেটের গমনপথ তৈলাক্ত করতোরাইফেলের বোর খাঁজকাটা হবার কারণে পাল্লা আর লক্ষ্য ভেদের ক্ষমতা বাড়ে বটে কিন্তু গ্যাস বেরনোর অসুবিধে থেকে যায় ।এনফিল্ডে অস্ত্র গবেষণা এই গ্যাস বেরোনোর অসুবিধে দূর করার জন্য ব্রিটিশ সরকার টেমস নদীর উত্তর পাড়ে উত্তর লন্ডনের এনফিল্ড শহরে রয়্যাল স্মল আর্মস ফ্যাক্টরিতে নানা পরীক্ষা চালায়। কী কী বন্দুক –রাইফেলের ব্যবহার হতো ১৮৫৭ এ *সেসময় ব্রিটিশ রাজশক্তি আর তাদের মাফিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চার ধরণের বন্দুক / রাইফেল ব্যবহার করতো।
১) আদি ব্রাউন বেস (Brown Bess) বন্দুক ছিল পুরোনো ফ্লিন্ট লকের উন্নত সংস্করণ। পুরোনো বন্দুকটার ফ্লিন্টের বদলে বারুদে আগুন লাগানোর জন্য এতে ছিল পার্কশন ক্যাপ। এটাই পদাতিক বাহিনীতে সবচেয়ে চালু ছিল।বেঙ্গল আর্মির সেপাইরাও মূলত এই বন্দুক পেত ।
২) বোরে দুবার খাঁজ কাটা ব্রুনউইক (Brunwick) রাইফেলও দেশী পদাতিক সেপাইদের দেওয়া হতো ।
৩) লম্বা বুলেটওলা মিনি (Minie ) রাইফেল সি ই মিনি নামের এক ফরাসি সেনা অফিসারের উদ্ভাবন, ইংরেজরা তার নকল করে । এটার বুলেটের তলার দিকে একটা ধাতব ঢাকনা জাতীয় পরানো থাকত আর বোরের থেকে একটু সরু হওয়ায় সহজেই ভরা যেত । গুলি ছোঁড়ার সময় ঢাকনাটা তাপে প্রসারিত হয়ে বোরের একদম খাপে খাপে হয়ে বেরোত ফলে পাশ দিয়ে গ্যাস বেরোনো আটকে গিয়ে অনেক জোরে আর দূর পাল্লায় গুলি ছোঁড়া যেত। এই বুলেটের ঢাকনাটা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। দেখা গেলো ঢাকনাটা তাপে প্রসারিত হয়ে বুলেটের ভেতর ঢুকে আসছে । এ রাইফেলের ব্যবহার কমই ছিল।
৪ ) এছাড়া ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে ছোট মাপের কারবাইন ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে।
আসল কথা এনফিল্ড রাইফেল আর কড়া করে চর্বি মাখানো কার্তুজ আঠেরো শো তিপ্পান্নতে মিনি রাইফেল আর তার বুলেটের কার্যকারীতার বিষয়ে এনফিল্ড গবেষণাগারে নিবিড় গবেষণা করে কড়া করে চর্বি লাগানো এক কার্তুজ আবিষ্কার করা হলো। ওই ব্যবহার্য চর্বি গরু আর শুওরের গায়ের চর্বির সংশ্লেষ। রাইফেলটারও অনেক উন্নতি করা হচ্ছে প্রিচেট সাহেবের তত্ত্ববধানে তাই নতুন রাইফেলটাকে বলা হচ্ছে এনফিল্ড -প্রিচেট রাইফেল বা প্যাটার্ন ১৮৫৩ এনফিল্ড রাইফেল বা শুধু এনফিল্ড রাইফেল। এখন ওই চর্বির আস্তরণ ভারতের গরম আবহাওয়ায় টেঁকে কিনা সেটা দেখার জন্য ষোলোশো তিপান্নতে ভারতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। সেটা সেপাইদের দেওয়া হলো ব্যবহৃত চর্বির ব্যাপারে কিছু না জানিয়েই , তারা কার্তুজের থলিতে ভরে সেসব ব্যবহার করতো। ওই পরীক্ষা সফল হতে ইংল্যান্ডে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ছাপ্পন্নর শেষ থেকে সাতান্নর শুরুতে , পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে, কোম্পানির দমদম , আম্বালা আর শিয়ালকোট অস্ত্র ডিপোতে এই নতুন রাইফেল ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে । আঠেরোশো সাতান্নর পয়লা জানুয়ারী মীরাটে অবস্থিত ষাটতম কুইন্স রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নে এই রাইফেলের ব্যবহার সংক্রান্ত আদেশনামা জারী হচ্ছে। সারা ভারতে এই রাইফেলের ব্যবহার চালু করা হচ্ছে।এইসব প্রশিক্ষণে সাধারণভাবে এনফিল্ড রাইফেলের ব্যবহারের কায়দা শেখানো হতো। কার্তুজ ভরে গুলি ছোঁড়ার উদাহরণ নেই আর নির্দিষ্টভাবে কার্তুজ ব্যবহারের প্রথম উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে আম্বালায় সতেরোই এপ্রিল কিন্তু গ্রিজ না মাখানো কার্তুজ দেওয়া হয় সেপাইদের। তারা জানা মাখন জাতীয় তৈলাক্ত পদার্থ মাখিয়ে গুলি ছোঁড়ার অভ্যাস করেছিল। মিরাটে ষাটতম রেজিমেন্টের কাছে যখন এনফিল্ড রাইফেল এলো , দেখা যাচ্ছে তাদের কার্তুজ ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে। সে নিয়ে সেপাইরা ক্ষোভ জানালে কলকাতার দমদমের অস্ত্র কারখানায় তৈরি জনপ্রতি দশটা করে আগে থেকে চর্বি লাগানো কার্তুজ তাদের দেওয়া হয়। পরে ওই চর্বি লাগানো কার্তুজের পর্যাপ্ত সরবরাহ হতে থাকে ওই দমদম থেকেই। এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে দমদমের ওই কারখানায় চর্বি লাগানো কার্তুজের উৎপাদন শুরু হয় আগেই কিন্তু সে নিয়ে বিক্ষোভের শুরু কবে থেকে ? এর উত্তর পেতে আর এক গল্পের সাহায্য নিতে হচ্ছে।
- গল্প ?
- হ্যাঁ , গল্পই বটে। তার নানা বয়ান থাকলেও মূল কথাটা একই।
- মূল কথায় আসা যাক।
- যাক।
- কিন্তু সেটা কী নিয়ে।
- লোটা থেকে জল খেতে চাওয়া নিয়ে।
- কিসের লোটা , কার লোটা আর কেইবা জল খেতে চায় ?
- সেটাই তো গল্প।
লোটায় জল খেতে না দেবার গল্প আঠেরোশো সাতান্ন সালের জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দমদম অস্ত্রাগার কাম কারখানার এক নিচু জাতের খালাসি এক ব্রাহ্মণ সেপাইয়ের কাছে বলছে :
- পণ্ডিতজি তেষ্টা পেয়েছে।
- তাতে আমি কী করব শীতকালে এতো তেষ্টা তোর পায়েইবা কেন ?
- বড্ড তেষ্টা পণ্ডিতজি।
- তা আমাকে কী করতে হবে ?
- কিছু না পণ্ডিতজি আপনার লোটা থেকে একটু পানি দেবেন।
- তোর আস্পর্ধা তো বড় কম নয় ! নিচু জাত আমার থেকে জল চাস ! মাদারচোদ !
- আহা , গালাগালি দেন কেন পণ্ডিতজি , আমরা সবাই সমান হয়ে গেছি।
- জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব হারামজাদা !
- আমরা সবাই হারামজাদা পণ্ডিতজি , আপনি আমি সবাই হারামজাদা হয়েছি , হারামখোর।
- বটে !
- হ্যাঁ পণ্ডিতজি আপনি কোম্পানির নেমক খেয়েছেন , আমিও।
- তাতে কী ?
- ওই নেমকে গরুর হাড় ছিল না আপনি দিব্বি করে বলবেন ? কিম্বা শুওর ?
- সালে ! হারাম ঘুষেগা তেরা গাঁড় মে !
- আরো বাকি আছে পণ্ডিতজি যে নয়া কার্তুজ তৈরি হচ্ছে- সব শুওর আর গরুর চর্বি দিয়ে বানানো!
- তুই কোত্থেকে জানলি !
- খালাসীকে সব বইতে হয় হুজুর , সব মাল আমি পিঠে করে দিয়ে আসি , আমাকে সব জানতে হয়। এবার আপনি বলুন আপনার জাত , উঁচা জাত কোথায় কোন গাঁড়ে গিয়ে ঘুষবে ! আপনি কি গাঁড়ে ঘুষিয়ে কার্তুজ কাটবেন , না নিজের দাঁত দিয়ে ! উঁচা জাতের গুমোর আপনার গেলো পণ্ডিতজি ! আপনি কোম্পানির নোকর আর আমিও তাই। চুপচাপ লোটা থেকে জল দেবেন।
কার্তুজ ব্যবহার নিয়ে টানাপড়েন দমদমের বেঙ্গল আর্মির সেপাইদের মধ্যে ফিসফিসানি আর সন্দেহ , ভয়ের উদাহরণ হিসেবে কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন রাইট এই ঘটনাটার উল্লেখ করছেন । তিনি মাস্কেটরি ডিপোর কম্যান্ডিং অফিসার মেজর বন্তেইনের কাছে রিপোর্ট পেশ করলেন। এরপর সেই রিপোর্ট যাচ্ছে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল হারসির কাছে। তিনি মতামত দিলেন যে সন্দেহ নিরসন করতে বাজার থেকে গ্রিজ কিনে সেপাইদের দিয়ে কার্তুজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে, তারপর ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ অর্ডন্যান্স , কর্নেল এবোটের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে পাঠানোর জন্য দিলেন রিপোর্টটা।প্রযুক্তিবিদ এবোট সাহেব ভিন্নমত পোষণ করে লিখেছিলেন চর্বি লাগানো গ্রিজই ব্যবহার করতে হবে এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের জন্য ।নারকেল তেল আর মৌচাকের মোম মোটেই কাজের নয় কারণ তাতে গুদামেই শুখিয়ে কাঠ হবে কার্তুজের গা । তিনি বললেন কোন গ্রিজ ব্যবহার হবে তা সিদ্ধান্ত নিতে এক কমিটি গড়া হোক , ইতিমধ্যে অনুশীলনের জন্য গ্রিজ ছাড়া কার্তুজ বানিয়ে সেপাইদের দেওয়া হোক যার থেকে বোঝা যাবে যে কোন আপত্তিকর গ্রিজ ব্যবহার হচ্ছে না । এভাবে অনেক কাগজ চালাচালির পর সরকারী আদেশনামায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে অনুশীলনের সময় যেন সেপাইরা সব নিজেরাই গ্রিজ লাগিয়ে গুলি ছোঁড়ে । এ আদেশনামা জেনারেল হিয়ারসের কাছে গেলো আর টেলিগ্রাম করে আম্বালা , শিয়ালকোট আর মীরাটে পাঠানো হলো। মীরাটের এডজুটেন্ট জেনারেল কর্নেল চেস্টার উত্তরে টেলিগ্রাম করেন , " মহামান্য স্যার , ছাগলের চর্বি মাখানো কার্তুজই আমরা ব্যবহার করে থাকি। হঠাৎ করে এই আদেশনামার দরকার পড়লো কেন ? কারণ এতে করে আরো সন্দেহ বাড়বে কিছুদিন আগে থেকে ব্যবহার করা চর্বি সম্বন্ধে। '' উত্তর গেলো , "আপনারা যদি ছাগলের চর্বি আর মোম ব্যবহার করে থাকেন তবে আপত্তি নেই। ''
ওপর থেকে আদেশনামা চাপিয়েও যে এনফিল্ডের কার্তুজ সম্বন্ধে সেপাইদের অস্বস্তি কাটছে এটা বুঝতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কম্যান্ডারদের কো নো অসুবিধে হয়নি।দমদম মাস্কুট্রি ডিপোর কম্যান্ডিং অফিসার মেজর বন্তেইন ভাবলেন ,এক কাজ করা যাক দাঁত দিয়ে কার্তুজ কেটে বারুদ বের করার দরকার নেই । প্ল্যাটুন এক্সারসাইজে বলা আছে :
যেই ‘’লোড –গুলি ভরো ‘’ আদেশ পাবে , কার্তুজকে মুখের কাছে নিয়ে যাবে ,তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরবে তখন কার্তুজের বলটা থাকবে হাতে , আর কার্তুজের মাথাটা দাঁতে কাটবে ; কনুই লেগে থাকবে থাকবে শরীরে । মেজর বন্তেইন লক্ষ করলেন বলটা হাতে ধরতে বলা হচ্ছে মানে এটা সেই বস্তাপচা ফ্লিন্ট লক বন্দুকের আমলের ড্রিল ম্যানুয়াল থেকে টোকা যখন বারুদ ভরতে বন্দুকটাকে বাঁ হাত দিয়ে ডান দিকে আনা দরকার পড়ত ।এখন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের সঙ্গেই বল থাকে ।এটা লক্ষ করে তাঁর মাথায় খেলে গেলো , আরে দাঁত দিয়ে কেটে সেই যখন বাঁ হাত দিয়েই কার্তুজ ছিঁড়তে হচ্ছে তখন পুরো কাজটাই হাতে করা যেতে পারে অর্থাৎ বাঁ হাতে কার্তুজ ধরে ব্যারেল ধরে থাকা ডান হাতের কাছে নিয়ে, দু হাত দিয়েই কার্তুজের একদিক খুলে ফেলা যেতে পারে । এইসব ভাবনা মেজর সাহেব চিঠি লিখে মেজর জেনারেল হারসির কাছে পেশ করলেন । তাঁর চিঠির বিষয় নিশ্চয়ই ছিল “দাঁতের বদলে হাত দিয়ে কার্তুজ ছেঁড়ার কায়দা’’।এই চিঠি জেনারেল সাহেব সরকার বাহাদুরে পেশ করার দিনটা যে পাঁচই মার্চ ছিল এটাই শুধু জানা যায়।
- তারপর ?
- তারপর সে চিঠির কী যে হয় ……
- কী হয় ?
- খুব জানতে ইচ্ছে করছে ?
- প্যায়তারা বন্ধ করবে !
- ইতিহাসকার জে এ বি পামার বলছেন হয়ত তা কম্যান্ডার –ইন –চিফ মাননীয় জর্জ আন্সনের কাছে যায় ।
- তারপর ?
কম্যান্ডার –ইন –চিফ জর্জ আন্সন সেসময় দূর দূরান্তে ঘুরছিলেন ।মীরাট থেকে তাঁকে যেতে দেখা যাবে আম্বালা। তাঁর সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর দুই দেশী অফিসার আম্বালার মাস্কুট্রি ডিপো পরিদর্শন করতে গেলো। সেখানেও ক্ষোভের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল। তাই পরিদর্শনে পৌঁছনোর পর সেখানকার এক সেপাইকে বলতে শোনা গেলো ," এই যে খেরেস্তানের বাচ্চারা এলেন !'' অফিসার দুজন কটমট করে তাকাতে না তাকাতে সে চুপ মেরে যায় কিন্তু মিচকে মিচকে হাসতে থাকে। সেই দেখে দুজনে পত্রপাঠ কেটে পড়ার উদ্যোগ করলে পেছন থেকে "খেরেস্তান খেরেস্তান " রব ভেসে আসে আর অন্য সেপাইদের হো হো হাসির আওয়াজ। দুজনের বেইজ্জতির একশেষ হতে এটা নিয়ে রিপোর্ট চালাচালির কথা জানা যাচ্ছে। ব্যাপারটা এতই স্পর্শকাতর যে স্বয়ং কম্যান্ডার -ইন -চিফ আন্সনকে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হলো। উনি সব দেশী অফিসারদের জড়ো করে এক ভাষণ ঝেড়েছিলেন।সেই ভাষণে কোম্পানি বাহাদুর যে কত ভালো আর দয়ালু ,অনুভূতিশীল সেসব কথা থেকে থাকবে তাতে সব দেশী অফিসাররা বলে ,”হুজুর যা বললেন তার ওপর আমাদের কোন কথা বলার যো নেই কিন্তু………
-হ্যাঁ বলো কিসের কিন্তু ?
- হুজুর আমরা না হয় বুঝলাম কিন্তু আমাদের জাতভাই যত দেশী সেপাই আর তাদের গুষ্টি মোটেই বুঝবে না ।ওরা অনবরত আমাদের হ্যাটা করবে ,একঘরে করে দেবে হুজুর !
শুনে টুনে কম্যান্ডার –ইন –চিফ আন্সন সব মাস্কেটরি ডিপো দমদম , আম্বালা আর শিয়ালকোটে এনফিল্ড রাইফেল ছোঁড়ার অনুশীলন বন্ধ করছেন তেইশে মার্চ আঠেরো শো সাতান্নতে । মীরাটের কত্তা দের বললেন একটা রিপোর্ট পাঠাতে । আবার একই দিনে গভর্নর জেনারেল ক্যানিংকে জানালেন যে এনফিল্ড কার্তুজের গ্রিজ একেবারে ঠিকঠাক , মানানসই হয়েছে ।এই দুমখো নীতি নতুন কিছু কি ? সব দেশ কালে কত্তা ব্যক্তিরা এমনটাই করেন একই সঙ্গে ক্ষোভ প্রশমন আর সরকারের গৃহীত নীতি রূপায়ন। মীরাটের থেকে রিপোর্ট এসেছিল কিনা জানা যাচ্ছে না কিন্তু বন্তেইনের সুপারিশ অনুযায়ী এনফিল্ড কার্তুজ দাঁতে না কেটে হাত দিয়ে খোলার নতুন প্ল্যাটুন এক্সারসাইজ চালু হচ্ছে। আটই এপ্রিল সরকারের তরফে কোম্পানির কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে জানানো হচ্ছে কার্তুজ দাঁতে কাটা নিয়ে সেপাইদের জাত খোয়ানোর ভয় থেকে উদ্ভূত ক্ষোভের কথা। কিন্তু মোম বা তেল দিয়ে গ্রিজিং ও অকার্যকর তাই এনফিল্ড কার্তুজের পরীক্ষিত চর্বি দিয়ে গ্রিজিং চালু রাখতেই হচ্ছে । সেজন্য মেজর বন্তেইনের দাঁত ব্যবহার না করে কার্তুজ কাটার সুপারিশ মেনে শুধু এনফিল্ড নয়, ব্যবহৃত সব সাধারণ মাজল লোডার মাস্কেট বা মাস্কেট রাইফেল ভরার আদেশও দেওয়া যেতে পারে ।
কোম্পানির মুম্বাই , মাদ্রাজ , কলকাতা সব প্রেসিডেন্সিতেই গুলি ভরার নতুন কায়দা চালুর আদেশ দিলেও , কুইন্স রেজিমেন্টগুলোকে তো আর আদেশ দেওয়া যায়না তাই তাদের কাছে সংশোধিত প্ল্যাটুন এক্সারসাইজের বই ছ কপি করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু লর্ড ক্যানিং কম্যান্ডার –ইন –চিফকে চিঠিতে গুলি ছোঁড়ার অনুশীলন বন্ধে রাজি হননি। তিনি বলেন এতে উল্টো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে । ওনার তরফে তেরোই এপ্রিল এডজুটেন্ট জেনারেল চেস্টার আবার সর্বত্র গুলি ছোঁড়ার ড্রিল চালু করার আদেশ দিলেন ।স্বভাবতই সেই আদেশে নতুন কায়দায় গুলি ভরা চালু করে সেপাইদের ক্ষোভ প্রশমনের উল্লেখ নেই কারণ ইতিমধ্যে বহরমপুর আর ব্যারাকপুরের ঘটনা ঘটে গেছে তাই সব ঠিক হ্যায় –গোছের অবস্থান ।সেজন্য ওই আদেশে বহরমপুরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সেপাই ইউনিট এন আই ( নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ) সতেরোকে যে ভেঙে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তা সেপাইদের পড়ে শোনানোর কথাও বলা হয়েছিল । যাতে আর কেউ টেন্ডাই মেন্ডাই করতে সাহস না করে সেজন্য কার্তুজ যে নির্দোষ সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার, সেপাইদের জানাতে বলা হচ্ছে এ ব্যাপারে কাউকে যেন জাত খুইয়েছে বলে হ্যাটা না করা হয় । এনফিল্ড কার্তুজ ব্যবহার না করতে চাইলে কঠোর শাস্তি দেবার, কোর্ট মার্শাল করার কথাও লিখলেন চেস্টার। এইভাবে শৃঙ্খলা ফেরানোর নানা পদক্ষেপ নিতে বলা হলো কিন্তু বহরমপুর আর ব্যারাকপুরের পরেও যে বিক্ষোভ বেড়ে বিশাল ব্যাপ্ত এক গদর হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে তা বোধ হয় আন্দাজ করতে পারেননি ওই চেস্টার সাহেব বা স্বয়ং গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংও ।
চর্বি মাখানো কার্তুজ নিয়ে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনে বিক্ষোভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজের প্রেসিডেন্সি ডিভিশনেই এইসব বিক্ষোভগুলো প্রথম দেখা দিচ্ছে আঠেরো শো সাতান্নর ফেব্রুয়ারী থেকে মে মাসের মধ্যে । সময়রেখা মেনে একে একে বিক্ষোভের গল্প করা যাক।
রানীগঞ্জে অগ্নিসংযোগ ব্রাহ্মণ সেপাই আর নিচু জাতের খালাসির বিবাদের ঘটনার পর প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল হারসি বাজার থেকে গ্রিজ কিনে সেপাইদের দিয়ে কার্তুজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন একথা আগেই জানা গেছে ।তবেআঠেরো শো সাতান্নর আঠাশে জানুয়ারী দমদম মাস্কুট্রি ডিপোর জন্য এই আদেশ জারী হয়। একই দিনে হারসি সাহেব একটা চিঠি লিখেছিলেন ভারত সরকারের কাছে যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে : কলকাতার একটা হিন্দু পার্টি সেপাইদের মধ্যে প্রচার করছে যে তাদের জোর করে খ্রিস্টান করার করানোর চেষ্টা চলছে। ইতিহাসকার পামার মনে করেন ধর্ম সভা নামের একটা সংগঠনের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন হারসি । তিনি চিঠিতে আরো জানালেন রানীগঞ্জ অঞ্চলে বিক্ষুব্ধ সেপাইদের আগুন লাগানোর কিছু ঘটনার কথা। কলকাতা থেকে একশো কুড়ি মাইল দূরের এই জায়গা তখনই রেলপথে যুক্ত ছিল আর টেলিগ্রাফও চালু ছিল সেখানে। তখন দু নম্বর নেটিভ ইনফেন্ট্রির একটা অংশ মোতায়েন ছিল ওখানে। বিক্ষুব্ধ সেপাইরা এক সার্জেন্টের বাংলো আর টেলিগ্রাফ অফিস জ্বালিয়ে দেয় এমনটাই জানাচ্ছেন জেনারেল হারসি। সেপাইরা টেলিগ্রাফের সংকেতের মানে সব বোঝে না তবে কোম্পানির ফৌজের অঙ্গ হয়ে গেলে যা হয় আরকি।
- কী হয় ?
- সব বুঝে যায় ।
- কীভাবে ?
- কোম্পানি যেমন সেপাইদের সকাল থেকে রাত কঠিন রুটিনে বেঁধে ফেলে তাদের পুরো শরীরের দখল নিচ্ছে , সেপাইরাও তেমনি ……
- কী ?
- সাহেবদের মনে ঢুকে যাচ্ছে ।তাদের ভাবনা জেনে ফেলছে সেপাইরা ।সেই ভাবনা তারা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে চালাচালি করে তার অনেক কিছু বুঝে ফেলছে ।
- অনেক কিছু ?
- হ্যাঁ সব কিছু নয় , অনেক কিছু বুঝে ফেলছে তাই তারা রানীগঞ্জে টেলিগ্রাফ অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছিল কারণ তাতে খবর হবে আর তা ছড়িয়ে গেল কলকাতা থেকে পাঞ্জাব সর্বত্র।
জেনারেল হারসি পত্রপাট রানীগঞ্জের দু নম্বর নেটিভ ইনফেন্ট্রির বেয়াড়াদের ব্যারাকপুরের হেড কোয়ার্টারে তুলে এনে ওই ঘটনার ব্যাপারে একটা কোর্ট অফকোর্ট অফ ইনকোয়ারি বসাচ্ছেন সেপাইদের ক্ষোভের শুনানি করতে।পরিবর্ত হিসেবে সিউড়িতে থাকা সেপাইরা রানীগঞ্জে যাচ্ছে । ছয়ই ফেব্রুয়ারি ওই ইনকোয়ারি বসবে আর তার রিপোর্ট পেশ হবে পরের দিন। সেখানে দশজন দেশী অফিসার , সেপাইয়ের শুনানি হবে। দেখা যাচ্ছে সেখানে দেশীদের অভিযোগের উত্তর দিতে হারসি সাহেবের ছেলে এনফিল্ড স্কুল অফ প্র্যাকটিসের থেকে পাস করা লেফট্যানেন্ট জে হারসি ছিলেন। অভিযোগের তীর প্র্যাকটিসের এনফিল্ড বুলেটের গ্রিজের দিকে নয় বরং কার্তুজের শক্তপোক্ত কড়া আস্তরণ মারা কাগজের দিকে। একজন সাক্ষীর কথায় সেই কাগজ নিয়ে অসন্তোষের উৎস দমদম অস্ত্রকারখানার খালাসীরা , তারাই আগের কাগজের তুলনায় নতুন কাগজের কাঠিন্য আর চকচকে ভাব দেখে বলে থাকবে হারামের জিনিস গরু -শুওরের চর্বি দিয়ে সেসব বানানোর কথা। চকচক করলে সোনা তো হচ্ছেই না উল্টে বিদ্রোহ হয়ে যাচ্ছে !
ছয়ই ফেব্রুয়ারির বার্তা ওই ছয়ই ফেব্রুয়ারি সন্ধেবেলা ব্যারাকপুরের চৌতিরিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সেপাইয়ের কথা অনুযায়ী চার চারটে রেজিমেন্টের মধ্যে জাত –ধম্ম খোয়ানোর আশংকায় একটা সম্ভাব্য বিদ্রোহের খবর আসছে ফিরিঙ্গীদের কাছে। কথা চালাচালির পর লেফট্যানেন্ট এলেন পুছতাজের দায়িত্ব পেলেন কিন্তু কোথায় কী ! সব ভোঁভাঁ ! অবশেষে চৌতিরিশ নম্বর রেজিমেন্টের এক জমাদার মুখ খোলে দিন চারেক পর দশই ফেব্রুয়ারি। সে বলল .....
- কী বলল !
- তর সইছে না যে।
- কী করে সইবে।
জমাদার বলে ," সাহেব। ঘটনাটা সত্যি। ''
- সত্যি ?
- হ্যাঁ হুজুর।
- হ্যাঁ ?
- পাঁচই ফেব্রুয়ারি সত্যিই এক মিটিং হয় হুজুর। সেখানে ঠিক হয় ....
-কী ?
- ঠিক হচ্ছে যে ছয়ই ফেব্রুয়ারি সন্ধেবেলা ধম্ম খোয়ানোর বিরুদ্ধে এক গদর হবে।
- তারপর ?
- তারপর কিছু হচ্ছে না হুজুর।
- কেন ?
- সেকি ! হলে কী হতো হুজুর !
হলে কী হতো সেটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কত্তাদের জানা ছিল না তাই রহস্যটা রহস্যই থেকে গেছে আরকি। ইতিহাসকার পামার বলছেন হয়ত আগে থেকে খবর দিয়ে সাহেবদের সঙ্গে একটা স্নায়ু যুদ্ধ শুরু করেছিল সেপাইরা , টোকা মেরে দেখে নিলো আর তারপর চুপ মেরে যায়।
চাপা একটা ক্ষোভের ধোঁওয়া ঠিকই দেখছেন জেনারেল হারসি ।তিনি নয়ই ফেব্রুয়ারি পুরো ব্রিগেডটাকে কাতারে দাঁড় করিয়ে চোস্ত হিন্দুস্থানিতে বক্তিমে দিয়েছিলেন যে সেপাইদের জাত –ধম্ম খোয়ানোর কোনো কাজ করবে না কোম্পানি । বক্তিমে দিয়ে হারসি খুশ ,সরকার বাহাদুরও আপাত নিশ্চিন্তই রইল।
বহরমপুরে রাত বিরেতে ক্যাঁচাল ব্যারাকপুরের জানুয়ারির ক্ষোভের প্রকাশ যদি রাণীগঞ্জে আগুন জ্বালায় তবে
তার হাওয়া উত্তরে গঙ্গা বেয়ে ফিরফিরতি উজানে একশো কুড়ি মাইল দূর বহরমপুরের সেনা ছাউনিতে লাগবে না এ কেমন কথা ? গদরে র হাওয়া যা সাহেবদের কাছে ক্যাঁচাল, সেই হাওয়া স্বাধীন নিজামতের কেন্দ্রে থাকা মুর্শিদাবাদে মুর্শিদকুলি –আলিবর্দি –সিরাজের সমাধির আনাচে কানাচে একলাটি দাঁড়িয়ে থাকা রুখা শুখা খেজুর গাছে মিঠে বাতাসই হবার কথা । যদিও খেজুর গাছে হাওয়া দিলে গাছ নড়ে না। তবু বহরমপুরের খবর পলাশীর মাঠ হয়ে তার কাছে অবশ্যই পৌঁছে থাকবে। গাছ বাতাসপানে মুখ করেই দাঁড়িয়েছিল আরকি। দমদমের অস্ত্রাগার থেকে এগারোই ফেব্রুয়ারি কিছু গোলা বারুদ বহরমপুরে নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ঊনিশের অস্ত্রাগারে পৌঁছনোর খবর জানা যায়। ফিরিঙ্গী অফিসাররা জানতে পারে যে যেই কিনা। কী ছিল সেই গোলা বারুদের চালানটায় ? জানা যায় বারুদ আর দমদমে নির্মিত কার্তুজ গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে বহরমপুরের ফিরিঙ্গী অফিসাররা খবর পেলো যে দমদম থেকে শুধু গোলা বারুদই এসেছে এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই।
-তবে ?
- রিপোর্ট আসছে দমদমের দ্বিতীয় নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির থেকে এক কাসিদ-বার্তাবাহকও নাকি তেরো তেরোই ফেব্রুয়ারি পৌঁছে যায়। ...
- কোথায় ?
- বহরমপুরে ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সেপাইদের কাছে।
- কী বার্তা নিয়ে আসে সেই কাসিদ ?
- সেটাই তো লাখ টাকার কথা।
- কী কথা ?
সে মালুম হতে আরো দিন পনেরো পেছিয়ে যেতে হয়। ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির কম্যান্ডিং অফিসার লেফ্টেন্যান্ট কর্নেল ডব্লিউ সেন্ট এল মিচেল পরের দিন সকালে গুলি ছোঁড়ার প্র্যাকটিস প্যারেডের হুকুম জারী করছেন। সেজন্য সেপাই পিছু পনেরো রাউন্ড ফাঁকা গুলি ধার্য হলো। রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার থেকে ওই সংখ্যক গুলি এনে ডিভিশনের অস্ত্রাগার বা বেল অফ আর্মসে রাখা হয়। প্রথা মতো আগের দিন সন্ধের রোল কলে বারুদ ফাটানোর ডিটোনেটর মার্কারি ফুলমিনেট ভরা পার্কাশন ক্যাপ বিলি করার কথা যা ছাড়া গুলিই ছোঁড়া যায় না। কিন্তু ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি সন্ধে ছটার রোল কলে সেপাইরা ওই পার্কাশন ক্যাপ নিতে অস্বীকার করে।তাদের যুক্তি যতক্ষণ না সন্দেহ নিরসন হচ্ছে তারা কার্তুজ নেবেই না।এক দেশী অফিসার ,সুবেদার মেজর শেখ মুরাদ বক্স তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে সন্দেহ নতুন কার্তুজ নিয়ে আর সেপাইদের গুলি ছুঁড়তে বলা হয়েছে আগেকার কার্তুজে।সেপাইরা শুনবে না , তাদের যুক্তি দুরকমের কার্তুজই আছে ,কলকাতা থেকে আনা কার্তুজই যে ব্যবহার করতে হবে না তার গ্যারান্টি কোথায় । সুবেদার মেজর ডিভিশনের অস্ত্রাগার থেকে সব কার্তুজ আনালেন কিন্তু সেপাইরা দুধরণের কার্তুজের আলাদা আলাদা কাগজ নিয়ে বা অন্য অনেক কিছু নিয়ে তফাৎ করতে থাকে । যত মিলিয়ে দেখে ততো সন্দেহ বাড়ে তাদের । বেগতিক দেখে সুবেদার অন্য দেশী অফিসারদের বলেছিলেন , “সকাল আটটার রোল কলের আগে কথা বলে সব মিটিয়ে আসবে।“
সবাই সেলাম ঠুকে চলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করতে থাকে ।বহরমপুরের ছাউনির দেশী সেপাই ব্যারাকগুলো ছুড়ে গুজগুজ ফুসফুস ক্রমে বাড়তে বাড়তে গুনগুন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে আর দিন ঢলে রাতের কোলে যেতে না যেতে দেখা যাচ্ছে সবাই এক জলাধারের চারপাশে জড় হয়েছে । দেশী সেপাইদের বড় অংশটাই উচ্চ বর্ণের হিন্দু ।পলাশীর পর থেকে ইংরেজরা যত কূট আর আগ্রাসী হয়েছে ততোই তারা দেশী ফৌজের জোগাড় বাড়ায় বাংলা –বিহারের সীমানা ছাড়িয়ে অওধ অঞ্চল –পূর্ব উত্তর প্রদেশের, লখনৌয়ের আশপাশের জেলাগুলো থেকে রাই বেরিলি , সালোন প্রতাপগড় ,সুলতানপুর ,উন্নাও , ফৈজাবাদ , গোরাখপুর আর বাহরাইচ।দিন ঢলে রাতের দিকে এগোচ্ছে , গোধূলির আলো এসে পড়ছে সেই জলাধারের চারপাশে যেখানে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা মাইয়ার জল এসে জমে আর এক গঙ্গা মাইয়ার প্রতিরূপ সে , তার জলও লাল হয়ে উঠেছে ।সবাই ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছে সেখানে ।কেউ একজন বলে উঠলো,” সবাই ব লো ! গঙ্গা মাইয়ার জল ছুঁয়ে ব লো , কসম খাও কৌ মের ,আমারা সেপাইরা , কোম্পানির সেপাইরা কেউ জাত –ধম্ম খোয়াবোনা। সকলে বলো। '' সকলে সমস্বরে বলে উঠলো ," কিছুতেই না ,কার্তুজ নেবো না। '' একটা গদর –মহাবিদ্রোহের আভাস গোধূলির আলোতে পষ্ট ফুটে উঠছে । এরপর বহরমপুরের ছাউনির আশেপাশে আধো অন্ধকারে একের পর এক পঞ্চায়েত বসতে থাকে কীভাবে কী করা যায় আর তার খবর কি দেশি অফিসাররা জানতে পারে না ? পুরোটা গোপন থাকেনি ।ঠিক খবর চলে গিয়েছিল অ্যাডজুটান্ট লেফট্যানেন্ট ম্যাকঅ্যান্ড্রু সাহেবের কাছে আর তিনি তক্ষুনি মিচেল সাহেবকে রিপোর্ট করেন। সাত থেকে আটটার মধ্যে কমান্ড্যান্ট মিচেল সাহেব দেশী অফিসারদের ধরে পড়লেন ," শোনো , যে কার্তুজ কাল দেয়া হবে , সব আগে এখানে যারা ছিল, এক বছর আগে ছিল , সেই সাত নম্বর নেটিভ ইনফেন্ট্রির সেপাইদের মধ্যে থেকে বাছাই কারিগররা বানিয়েছে। তাদের চেনো না তোমরা।''
- হ্যাঁ স্যার। বিলকুল চিনি।
- তবে ?
- হ্যাঁ স্যার , বিলকুল হুজুর।
- তবে সবাইকে গিয়ে বলবে, যা জান পেহচান লোকেদের হাতে বানানো, সেই কার্তুজ হারাম হবে কী করে ?
- সচ বাত হুজুর।
- এটাই বোঝাবে সবাইকে। যে নিতে অস্বীকার করবে তার কপালে দুঃখ আছে।
- হ্যাঁ স্যার।
- কপালে দুঃখ আছে যে প্রথম নিতে অস্বীকার করবে তার , কোর্টমার্শাল হবে। চীন বা মালয়ের জঙ্গলে পাঠিয়ে দেব। ডিসপার্স।
মিচেলের তড়পানির সময় কিছু সেপাই চারপাশে জড়ো হতে শুরু করেছিল , তাদের শক্ত শক্ত চোয়ালের দিকে চেয়ে দেশী অফিসাররা সাহেবের চারপাশে সুরক্ষা বলয় তৈরি করে হুজুর মাই –বাপ করতে করতে সরিয়ে নিয়ে যায়।রেগে লাল লেফ্টেন্যান্ট কর্নেল ডব্লিউ সেন্ট এল মিচেল তড়পাতে তড়পাতে চলে গেলেন শুধু নয় অ্যাডজুটান্টকে আদেশ করলেন এগারো নম্বর ইররেগুলার ক্যাভেলারির প্রধান ক্যাপ্টেন ডব্লু সি আলেক্সান্ডারকে খবর দিতে যে তিনি যেন তার ঘোড়সওয়ার দল নিয়ে পরের দিন সকালের প্যারেডে ঊনিশ নম্বর ইনফ্যানট্রির প্যারেডের মাঠে ভোর ছটার মধ্যে হাজিরা দেন আর সঙ্গে থাকুক সেনা ছাউনির কামানগুলো।
এই সব আদেশের কথা ইতিমধ্য টগবগ করে ফুটতে থাকা সেপাই ব্যারাকগুলোতে পৌঁছলে যা হবার তাই হলো। ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি রাত দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির ডিভিশনের অস্ত্রাগার -বেল অফ আর্মস সেপাইদের দখলে চলে যাচ্ছে , তারা তালা ভেঙে বন্দুক রাইফেল নিয়ে পজিশন নিয়ে বসে গেলো। হৈহৈ রব আর মিলিটারি ড্রামের আওয়াজ সাহেবদের বাংলো অবধি পৌঁছল।শুরু হচ্ছে তৎপরতা, মিচেল আর আলেক্সান্ডারের ঘোড়সওয়ার দল আর কামান নিয়ে ইনফ্যানট্রির প্যারেডের মাঠ ঘিরে ফেলতে মাঝরাত হচ্ছে ।সেপাইদের অস্ত্রসংবরণ করতে বললে তারা ঘোড়সওয়ার দল আর কামান সরিয়ে নেবার শর্ত দেয়। মিচেল সেপাইদের দিকে তেড়ে যাবার উপক্রম করলে দেশী অফিসররা টেনে ধরে বলে ,”কী করছেন হুজুর ! গুলি করে দেবে ।“ শুনে সাহেবের সম্বিৎ ফেরে ।শেষে ঘোড়সওয়ার দল আর কামান সরিয়ে নিলে উত্তেজনা কমে,সেপাইরা একে একে বন্দুক রাইফেল জমা দেয় ।এক উত্তেজক রাত কেটে আসে পরের দিন সাতাশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন সাধারণ রেজিমেন্টাল প্যারেডে গুলির ভাণ্ডার থেকে কার্তুজ নিয়ে তা খুলে দেখিয়ে বোঝাতে গিয়ে মিচেল ব্যর্থ হলেন সেপাইরা সেই আবার দুরকম কার্তুজের কাগজের তফাৎ নিয়ে তাদের সন্দেহের যুক্তিতে অটল। সাতাশ আর আঠা শে ফেব্রুয়ারি দুদিন ধরে সেপাইরা বেল অফ আর্মস ঘিরে বসে তবে ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করেনি ।
মিচেল সাহেব নিজের হাতে না রেখে কলকাতায় রিপোর্ট পাঠিয়ে সাতাশ তারিখেই কোর্ট অফ ইনকোয়ারি বসিয়েছিলেন যারা মাথা করা হচ্ছে আলেক্সান্ডার সাহেবকে , সে ইনকোয়ারির কাজ চলে সাতই মার্চ অবধি। সেখানে লেফট্যানেন্ট কর্নেলের সাহেবের মাথা গরম করে তড়পানি ,ঘোড়সওয়ার আর কামান আনার প্ররোচনায় সেপাইদের উত্তেজনা -এসব আলোচনা হলে কী হয় পুরো দোষটা পড়ে সেপাইদের ঘাড়ে। তবে বোঝা যাচ্ছে এনফিল্ড কার্তুজের ব্যবহার নিয়ে সেপাইদের অসন্তোষ ধিকি ধিকি জ্বলতে শুরু করে বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই , লোটায় জল খাওয়া নিয়ে খালাসি আর ব্রাহ্মণের ক্যাঁচালের অনেক আগেই। শিগ্রি সিদ্ধান্তের মোড় ঘুরতে শুরু করবে :যতই হোক ,মিচেল আর আলেক্সান্ডার কোম্পানির তরফে তাদের মাই বাপ , তাঁরা কী করবেন , কী বলবেন তাতে নেমকহারাম সেপাইদের কী ? তারা আড়ি পেতে শুনে যা করলো তার মাপ নেই !
ব্যারাকপুর আর কলকাতার কোম্পানি বাহাদুরের কর্তারা ঠিক করলেন গোটা ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রিকে ভেঙে দেওয়া হোক। সেটা করতে গেলে তাদের কুচ করিয়ে ব্যারাকপুরে এনে চারপাশে অন্য রেজিমেন্টের সতর্ক পাহারা লাগিয়ে সর্বসমক্ষে করতে লাগে। জোগাড়যন্ত্র করে সেপাইদের বহরমপুর থেকে রওনা করিয়ে ব্যারাকপুরে আনা হচ্ছে একত্রিশে মার্চ।
কলকাতার গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের তরফে তাদের আসার পথেই মার্চের সাতাশ তারিখ ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল সেপাইরা ব্যারাকপুরে পৌঁছলে , অন্য রেজিমেন্টের সব সেপাইদের উপস্থিতিতে এক ত্রিশে মার্চ পড়ে শোনানো হয়েছিল ভেঙে দেওয়ার খবর। সেপাইরাও বোধ হয় ফিরিঙ্গী উর্দি ছেড়ে বাঁচে তবে বহরমপুর থেকে আসার রাহাখরচ তারা পেয়েছিল বলেই জানা যাচ্ছে ।আগেই জানা গেছে ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি খবর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভারতের অন্য সমস্ত নেটিভ সেপাইদের রেজিমেন্টগুলোয় প্রচারের ব্যবস্থা হয়েছিল।
ব্যারাকপুরের ঘটনা –মঙ্গল পাণ্ডের শাহাদতআওয়াজ আর শব্দের সংকেতের মতো মঙ্গল পাণ্ডের শাহাদাতের সাংকেতিক তাৎপর্য আছে বলে গদরের সেনানী আর ফিরিঙ্গী দমনকারী সবাই মানে। তাঁর নামের অপভ্ৰংশ -পান্ডি বলতে সাহেবরা সাধারণভাবে বিদ্রোহী সেপাই বোঝাচ্ছে। তাই মঙ্গল পাণ্ডে এক নন। লাখো মঙ্গল আছে , তারা শহীদ হয় বা হয়না।
- মঙ্গল পাণ্ডেরা ?
- হ্যাঁ।
- তালেগোলে বীর নয় তো ?
- তাতে কী এলো গেলো তাঁর যে সংকেত হয়ে রয়ে যায়।
- তবে বলছো বিপ্লবী শহীদ মঙ্গল পাণ্ডে ?
ইতিহাসকার জন উইলিয়াম কে হুগলী নদীর পাড়ে কোম্পানি ফৌজের প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কেন্দ্র এক স্নিগ্ধ,আনন্দময়,বসবাস উপযোগী সেনা ছাউনি হিসেবে ব্যারাকপুরের বর্ণনা করলেন। কলকাতা শহরের ধুলো আর চিৎকার চেঁচামেচির ষোল মাইল দূরে ওখানে দুদণ্ড শান্তিতে কাটাতে অসামরিক সাহেব –মেমও আসে ফুর্তির লোভে।ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুদিনের মাথায় সেই সাহেবি গ্যারিসন টাউন বদলে গেলো।
সেদিন সকাল থেকে সব যখন ঠিকঠাকই চলছে হঠাৎই বিকেল চারটে নাগাদ চৌত্রিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির জনৈক সেপাই মঙ্গল পাণ্ডেকে তলোয়ার -মাস্কেটে রণসাজে সেজে ,ভাঙে চুরচুর হয়ে রেজিমেন্ট্যাল ময়দানে দেখা যাবে। ফিরিঙ্গী ফৌজি উর্দি গায়ে চাপিয়ে পাতলুনের বদলে ধূতি পরেই তিনি চলে এসেছেন আর নিজেই কম্যান্ডারের মতো হুকুম করছেন প্যারেডের ব্যান্ড বাজাতে আর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন মাঠময়। ব্যান্ডবাদক বুঝতেই পারে না কিসের ব্যান্ড বাজবে আর তার আদেশ এক দেশী সেপাইবা দিতে যাবে কেন , এক নেটিভ সেপাই, যার কাজ হলো সাহেবদের হুকুম তামিল করা সে হঠাৎ হুকুম দেবে কেন ? সেসব তো গেলো ছবির কথা ,সম্ভাব্য যা দেখা গিয়েছিল সেদিন কিন্তু মঙ্গল পাণ্ডে কী কিছু বলছিলেন , বলেই চলেছিলেন যার মানে আছে, নইলে আর হুমুকবরদারি হবে কী করে ? মঙ্গল পাণ্ডে যা বলেছিলেন তার লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট, তার লক্ষ্য ছিল দেশী সেপাইরা ,
’’ সামনে আয়, ব্যাহেনচোতরা, সাহেবরা আসছে ! তোদের ধম্মের কসম ! ওই কার্তুজ কাটলে জাত -ধম্ম সব যাবে ! তৈয়ার হো ! বেরিয়ে আয় সব্বাই ! তোরা আমাকে তাতালি ব্যাহেনচোতরা, নিজেরা কেটে পড়বি !’’ "সামনে আও রে ব্যাহেনচোদওয়া, সাহেব লোগ আইল হই! তোর ধরম কসম! ওই কার্তুজ কাট দিলে জাত-ধরম সব নাস্ত হো যাই! তৈয়ার হো যা রে! সব বাহার নিকল আও! তোরা হামারে তাতালি ব্যাহেনচোদ বোলতা, আপনা কাট কে পলাই যাইহা!"
মঙ্গল পাণ্ডেজির আহ্বান ব্যারাকপুর সেনা ছাউনির তৈরি করা সাহেবী কেতা ,কলোনির কেতাকে পেড়ে ফেলতে লাগে।আর সাহেবরা ছেড়ে দেবে কেন? আশপাশের পাহারায় যে সেপাইরা ছিল তারা কেউ কিছু বলছে না মঙ্গল পাণ্ডেকে কিন্তু তাঁর সঙ্গে ভিড়ে যাবারও কোনো লক্ষণ দেখা যায় না সেপাইদের মধ্যে।এ ধরণের খুল্লাম খুল্লা চেতাবনি দেওয়া সেপাইদের পক্ষে অত্যন্ত গর্হিত এরকমও মনে করে থাকবে কেউ কেউ আর তাদেরই একজন জনৈক নায়েক গিয়ে সার্জেন্ট মেজর হিউসন কে রিপোর্ট করে ,” স্যার এক ভয়ানক কাণ্ড!’’
- কী ?
- সেপাই মঙ্গল ভাঙ খেয়ে মিউটিনির কল দিচ্ছে হুজুর।
- - কিসের কল ?
- - মিউটিনির কল হুজুর , সে এক হুজ্জুতি কাণ্ড স্যার তলোয়ার -বন্দুক তাক করছে আর চেঁচাচ্ছে।
- - সব্বনাশ ! কী বলছে ?
- - বারবার বলছে স্যার !
- - কিসের কথা ?
- - কার্তুজের কথা , জাত যাবার কথা হুজুর।
- - আর তোমরা দাঁড়িয়ে দেখছো ! ডরপুক ! চলো দেখি !
ফৌজি ধরাচুড়ো পরে হাতিয়ারবন্দ হয়ে হিউসন সাহেব চললেন প্যারেডের মাঠে। সেখানে প্রথমে তিনি কোম্পানির জমাদারকে ধরেন ,'' এক্ষুনি পাকড়াও বেয়াদবকে !'' জমাদার আমতা আমতা করতে থাকে ," আমি কী করব হুজুর ! নায়েক গেছে এডজুট্যান্ট সাহাবের কাছে ,হাবিলদার গেছে ফিল্ড অফিসার সাহেবের কাছে। আমি কী একা ধরতে যাবো হুজুর ?" হিউসন জমাদারকে সশস্ত্র সেপাই নিয়ে পিছু পিছু আসতে বলে এগোলেন। পরে তিনি বলছেন সেপাইরা আসতে গাঁইগুঁই করতে থাকে আর জমাদারও তাদের হুকুম করেনি গুলি ভরে সাহেবকে কভার করতে। এই কভার ছাড়া এগোনোর ফল হলো মারাত্মক ,বেপরোয়া মঙ্গোল পাণ্ডের ছোঁড়া গুলি তাঁর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় , সাহেব শিউরে উঠে বেল অফ আর্মসের আড়ালে কভার নিলেন। টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিছু সেপাই মঙ্গল পাণ্ডেকে অস্ত্রসংবরণ করার কথা বোঝাতে গিয়ে গালি খাচ্ছে। এইসময় সেখানে এডজুট্যান্ট লেফট্যানেন্ট বাউ ঘোড়ায় চড়ে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি আরো ঘোরালো হয়ে উঠলো। বাউ চিৎকার করতে করতে আসছিলেন ,’’ লোকটা কোথায়! লোকটা কোথায়!” আড়াল নেওয়া হিউসন তাঁকে বলতে থাকেন ,” আপনার বাঁয়ে স্যার! বায়ে! ডান দিকে আসুন , মারা পড়বেন যে! সেপাইটা গুলি করে দেবে!’’ হিউসন যা ভাবছিলেন তাই হ লো , মঙ্গল পাণ্ডের গুলি গিয়ে লেগেছিল বাউয়ের ঘোড়ার গায়ে আর সে সওয়ার নিয়ে উল্টে পড়ে। বাউ ঘোড়ার জিনের সঙ্গে লাগানো হোলস্টার থেকে একটা পিস্তল নিয়ে ছুটলেন গুলি ভরায় ব্যস্ত মঙ্গলের দিকে ।বাউ কুড়ি গজের মধ্যে পৌঁছে গুলি চালালে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।তখন তিনি তলোয়ার বের করে তেড়ে গেলেন । অর্ধেক যেতে না যেতে মঙ্গলকেও তলোয়ার বার করে তেড়ে আসতে দেখা গেলো। বিপদ বুঝে বাউ পেছনে তাকিয়ে হোলস্টারের আর একটা পিস্তল নেবার মতলব করতে গিয়ে দেখেন ঘোড়া ছুটে পালিয়েছে। মুখোমুখি তলোয়ারের লড়াই লেগে যায় আর সেই দেখে হিউসনও খোলা তলোয়ার নিয়ে সাহায্যে এগিয়ে আসেন। পরের ঘটনা কী ঘটে তা হিউসন আর বাউয়ের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়। মঙ্গলের তলোয়ারবাজির ওস্তাদিতে হিউসন এক আলতো খোঁচা খাচ্ছেন কিন্তু জোরে নয় সে আঘাত। মারটা খেললেন বাউ। তারপর আরেক খোঁচা খাচ্ছেন হিউসন , সেসময় কোনো অজানা এক সেপাই তাঁকে মাস্কেটের কুঁদো দিয়ে বার দুই ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় তার পরনে ছিল রেজিমেন্ট্যাল উর্দি। তারপর হিউসন ছুটে গিয়ে মঙ্গলের কলার ধরলে তলোয়ার মারামারি শুরু হচ্ছে আর তখন আবার তাঁকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। বাউ সাহেব বাঁ হাতে রীতিমতো অবশ করা কোপ খেয়েছিলেন ফলে এক হাতেই তাঁকে লড়তে হচ্ছিল। আবার তিনি গলায় জোরালো কোপ খাচ্ছেন আর পেছন থেকে কেউ তাঁকে মাস্কেটের কুঁদো মেরে মাথায় আঘাত করছে। দুই সাহেব হয়তো মারাই পড়তেন যদি না শেখ পল্টু বলে এক সেপাই পেছন থেকে মঙ্গল পাণ্ডেকে পাঁজাকোলা করে টেনে ধরতো। সুযোগ বুঝে ওঁরা পালিয়ে বাঁচেন। পল্টুর হাত থেকে মঙ্গলকে ছাড়ানোর জন্য তার কানের গোড়ায় রীতিমতো বন্দুক ঠেকাতে হয়।
ইতিমধ্যে বেল অফ আর্মসের আশপাশে অন্য রেজিমেন্টের সেপাইরাও ভিড় করে এসেছের। মেজর জেনারেল হারসির কাছে খবর হতে তিনি চৌত্রিশ নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির , মঙ্গল পাণ্ডে যার সঙ্গে যুক্ত তার কম্যান্ডিং অফিসার লেফট্যানেন্ট কর্নেল হুইলারকে আদেশ দিচ্ছেন অবিলম্বে বাগী সেপাইকে গ্রেফতার করতে অন্যথায় গুলি করে মারতে। হুইলার জমাদারকে আদেশ করলে প্রথমে সে বলে ," কেউ রাজি হবে না স্যার।'' তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আবার অর্ডার করতে জমাদার ঠেলেঠুলে সেপাইদের পাঠালে তারা মাঝপথে গিয়ে আবার বেঁকে বসছে।হুইলার সাহেব পরে কোর্ট অফ এনকোয়ারির সামনে জানিয়েছিলেন যে তিনি এক উর্দি না পরা নেটিভ সেপাইয়ের কাছে জানেন যে মঙ্গল পাণ্ডে ব্রাহ্মণ হওয়ায় কেউ ব্রহ্মশাপের ভয়ে ব্রহ্মহত্যার অখণ্ড নরক বাসের ভয়ে তাঁকে ধরতে এগোয়নি কারণ এগোলেই সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। হুইলার আ রো জানাচ্ছেন যে কোনো মারমুখী সেপাইয়ের সামনে ইউরোপীয়কে পাঠিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে তিন চাননি। অতএব কম্যান্ডিং অফিসার হয়ে পড়েন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
এরমধ্যে হাতে পায়ে রক্তমাখা অবস্থায় এক লেফট্যানেন্ট ,হয়ত ঘোড়ার চড়েই হবে, হাঁফাতে হাঁফাতে আসে জেনারেল হারসির কাছে। তার অবস্থা দেখে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে হারসির মাখায় গেলো খুন চেপে। তিনি অন্য নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির দুই অফিসার ,তাঁর দু ছেলেকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে অকুস্থলে চলে এলেন। সেখানে তখন ব্রিগেডিয়ার চার্লস গ্র্যান্ট , স্টেশন কম্যান্ডার মেজর রস সহ সব হোমড়াচোমড়ারা দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোচ্ছেন। জেনারেলকে বলা হচ্ছে সেপাইরা রাজি না হওয়ায় মঙ্গলকে গ্রেফতার করা যায়নি। এইসব দেখে ও শুনে হারসির মেজাজ নিশ্চয়ই আরো বিগড়ে গিয়ে থাকবে তিনি নিজেই পিস্তল হাতে সেপাইদের দিকে এগোচ্ছেন ,'' দেখি কে কথা না শোনে!" বলতে বলতে ।কেউ একজন তাকে পেছন থেকে বলেছিল ," স্যার ,ওর মাস্কেটে গুলি ভরা আছে!" হারসি বললেন ,"মারো গুলি !" তাঁর এক ছেলে সাবধান করলো ," বাবা , তোমার দিকে নল তাক করছে কিন্তু !' উত্তরে সাহেব বলে উঠেছেন ," জন , আমাকে আগে গুলি করলে ওকে নিকেশ করবি তুই !'' এই বলে হারসি সোজা জমাদারের দিকে পিস্তল ধরে বলছেন ,''প্রথম যে আমার আদেশ অমান্য করবে যার জান যাবে!কুইক মার্চ !''এই বলে হারসি মঙ্গল পান্ডের দিকে এগোচ্ছেন আর দেখা গেলো অন্য সেপাইরা তাঁকে কভার করতে এসে গেছে। তার দুই ছেলে জমাদারকে কভার করেছিল। টানটান উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গল পাণ্ডের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা গেলো যা হাসির বর্ণনা থেকে পরে জানা যাচ্ছে।আর উপায়ন্তর না দেখে মঙ্গল পাণ্ডে হাতের মাস্কেট নিজের বুকেই ঠেকিয়ে গোড়ালি দিয়ে ঘোড়া টিপে দিতে দড়াম করে গুলি বেরিয়ে বন্দুকটা ঘুরে গুলি গিয়ে বুক থেকে কাঁধ গলা ফুঁড়ে বেরিয়ে তাঁকে পেড়ে ফেলে।তাঁকে ঘিরে তখন চারপাশে এক ব্যূহ আর সেই ব্যূহ থেকে আওয়াজ ওঠে ," নিজেকে গুলি করেছে। " এক শিখ সেপাই মঙ্গলের রক্তাক্ত দেহের তলা থেকে সাহেবদের খুনে রাঙা তলোয়ারটা বার করে নিয়ে আসে। মঙ্গল পাণ্ডের তলোয়ার। তবে ওই আঘাতে মঙ্গল মরেননি,তাঁকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয় । যথারীতি সুস্থ করে তুলে এক অনুষ্ঠানিক বিচারে মঙ্গলের ফাঁসি হচ্ছে আটয়ই এপ্রিল বা মতান্তরে ছয়ই এপ্রিল আঠেরোশো সাতান্ন। যে জমাদারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে , যে খানিকটা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল মঙ্গল আর সাহেবদের মধ্যে, আরেক পূর্বাইয়া ব্রাহ্মণ সেই ঈশ্বরী পাণ্ডেরও বিচারে ফাঁসি হয় একুশে এপ্রিল।
ততক্ষণে মঙ্গল পাণ্ডের মতো আরো অনেক অনেক সেপাই নিজের কৌমের জন্য, জাত -ধম্মের জন্য হলেও ,গোটা দেশের সব কৌমের এক মোর্চা বানিয়ে ফিরিঙ্গী শাসনের খেলাপ মহাবিদ্রোহের ব্রতে সামিল হতে সংকল্প করে ফেলেছে গোটা উত্তর ভারত জুড়ে যার কথাই হতে থাকবে শুধু।আর হতে থাকবে বেগম –রানী- কম্যান্ডারদের কথা।
অতিরিক্ত তথ্যসূত্র
১) The Year of Blood , Essays on the Revolt of 1857, Professor Rudrangshu Mukherjee.২) The Mutiny Outbreak at Meerut ,in 1857, JAB Plamer.৩) Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India, Professor Ranajit Guha