এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • বেগম -রানী -কম্যান্ডার 

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • | |
    পরিচ্ছেদ তিন
    গদর আর তার শুরুয়াত
    মিউটিনি না যুদ্ধ , নেশন না কৌম
    জন উইলিয়াম  কে হিস্ট্রি অফ সিপাই  ওয়ার ইন ইন্ডিয়া ১৮৫৭-৫৮ লিখবেন আঠেরোশো সত্তর সালে। তিন খণ্ডের বই।
    - জন উইলিয়াম কে সেপাই লিখেছিলেন ?
    - ওই হলো।
    - না।
    - তবে ?
    - সেপোয়( Sepoy )  লিখলেন।
    - একই।
    - না কলোনির প্রভুদের উচ্চারণ তুমিও করবে -সেপোয়।
    - বাংলা জিভে যা আসে তাই করব।  কে সাহেব ওয়ারের কথা বলেছেন। সেই ওয়ারের প্রেক্ষিতের কথা বলেছেন তারপর সেপাইদের ক্ষোভের কথা বলেছেন, আফগান যুদ্ধে  ব্রিটিশদের পরাজয়ের প্রভাবের  কথা বলেছেন ।
    - তারপর ?
    - শেষ খণ্ডে ..
    - কী ?
    - সেপাই মিউটিনির বিবরণ দিয়েছেন সাত অধ্যায়ে ।
    - শেষ খণ্ডে কলোনির প্রভুদের উচ্চারণ করলেন ?
    - জন উইলিয়াম কে বললেন গদর নয় , ওয়ার-যুদ্ধ নয় ,  মিউটিনির কথা।  
    - কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঝানসির রানী প্রবন্ধ লিখছেন ষোলো বছর বয়সে।
    - তাতে কী ?
    - সেই প্রবন্ধে তিনি সেপাই যুদ্ধের কথা বলছেন।
    - মিউটিনির কথা বলছেন না,  গদরের কথাও বলছেন না।  বলছেন এক যুদ্ধের কথা যা হয়েছিল। 
     - হয়ত রবীন্দ্রনাথ সেপাই যুদ্ধের কথাটা তাঁর বই পড়েই জেনেছিলেন।
    - দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের মিউটিনি কথাটায় আপত্তি ছিল,  গৌরবময় এক যুদ্ধের কথা বললেন রবীন্দ্রনাথ।
    - সে যুদ্ধ,  সাহেবের ভাষায় মিউটিনি , কোথায় কোথায় হয়েছিল জানাচ্ছেন  জন উইলিয়াম কে। ব্যারাকপুরের কথা বললেন। 
    - ব্যারাকপুর ?
    - ব্যারাকপুরের আগে বললেন বাজারের গুল্পর কথা ( ‘The lies of the bazar,’ John W Kaye , Sepoy War, vol 1,  page , 492)
    - বাজারের গুল্প ?
    - সংকেতও বটে ।
    - কিসের ?
    - ভয়ানক খারাপ কিছুর ।ধর্ম আর বর্ণ-জাত  গেল বলে !  কৌমের ভয়ানক বিপদের সংকেত !
    - কৌমের ?
    - নেশনের-জাতির  নয় ।
    - নয় ?
    - কৌমের । নেশনের ধারণা প্রেসিডেন্সির ভদ্রলোকের মাথায় আসবে , কংগ্রেস তৈরি হচ্ছে ঊনিশ শো পঁচাশিতে । কংগ্রেস দিকে দিকে ছড়াবে অনেক পর,  নেশনের ধারণাও ।  
    - আর মুম্বাই –মাদ্রাজ –কলকাতা প্রেসিডে ন্সির বাইরে , সেসব নতুন নতুন ইংরেজ কসমোপলিসের বাইরের দূর দূর এলাকায় ?

    - প্রেসিডে ন্সির বাইরের খেত খলিহানে ,মূল বাসীদের বসবাসের অরণ্যে –পাহাড়ে ,  জবরদস্তি দখল করা আওধ–বিথুর -ঝাঁসি  সহ নানা রাজ্যের  বিস্তীর্ণ এলাকায় , নানাভাবে অপদস্ত মোঘল দরবারের সূত্রে সামন্তদের মধ্যে , পেশাচ্যুত কারিগর , জমিহারা রায়ত সবার মধ্যে ফিরিঙ্গীদের কায়দাবাজিতে ধর্ম আর বর্ণ গেল , গেল রব ।
    ছড়িয়ে পড়া সংকেত আর বাজারের গুল্প
    বিদ্রোহ , সে কৃষকের হোক বা ব্যারাকের ছটফটিয়ে মরা ফৌজের , তাকে কলোনির প্রভুরা মারাত্মক সংক্রমণ মনে করে এসেছে । সেই সংক্রমণের উৎস  কী আর কী ভাবে তা ছড়াচ্ছে  সেটা ফিরিঙ্গীরা বুঝতে পারেনি,  এই তাদের আফসোস । আহা, সহজ সরল মূলবাসী কৃষকরা অত্যাচার আর শোষণে কেন যে ক্ষেপে ওঠে ।আঠেরোশো বত্তিরিশে কোল বিদ্রোহে ছোট নাগপুর কেঁপে উঠলো তাদের সঙ্গে অন্য মূলবাসী চেরো , মুণ্ডা , খারবাররা জড়িয়ে পড়ে । তাদের একজোট হওয়াটা একটা রোগ কারণ সেটা ফিরিঙ্গী শাসনের পক্ষে মারাত্মক,  তাই এক মারাত্মক রোগই বটে । এর পেছনে কে আছে সেটা কলোনির এক বিরাট জিজ্ঞাসা ।কে আছে,  কে কে আছে খুঁজে বার কর , করতেই হয় - খুঁজে বার করতে ।নিশ্চয়ই ‘হাবাগোবা কোলদের’  কেউ একজন ক্ষেপিয়েছে যে বেশ প্রভাবশালী । সত্যিই তো প্রভাবশালী না হলে ক্ষেপাবে কেমন করে ? জনৈক রাসেল সাহেব কোনো এক ব্রাডন সাহেবকে লিখলেন ,’’ এটা নিশ্চিত যে এতো বড়সড় এক মাতব্বর ( ছোট নাগপুরের  রাজার মাপের  ) বিদ্রোহীদের না উস্কলে আর সাহায্য না করলে ,  বিদ্রোহ এমন ব্যাপক আর স্বতঃস্ফুত হতো না ।‘’ ( Elementary aspects of Peasant Insurgency in Colonial india ,Ranajit Guha page 226) এসব বলে রোগের আসল কারণ দেশ জুড়ে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র –সরকারের নির্মাণ আর তার সঙ্গে স্থানীয় ভূস্বামী –সুদখোর মহাজনে মিলে  অত্যাচারের চক্র  আর শোষণকে আড়াল করা চলতে থাকে ।তবে একের পর এক মূলবাসী –কৃষক বিদ্রোহ হয়েই চলে হিন্দুস্থানের এ কোণে , সে কোণে আর তাতে অন্য কৌমের লোকেরাও প্রভাবিত হতে থাকে , হতে পারে ।
    অবশ্য উল্টোটাও হয়, আঠেরোশো  পঞ্চান্নর উনিশে আগস্ট সাঁওতাল বিদ্রোহের কম্যান্ডার সিধুকে ধরে নিয়ে আসে ফিরিঙ্গীদের নোকর বনে যাওয়া ভাগনা আর তার চেলা মেঝিয়া মাঝি । দড়ি দিয়ে বেঁধে আনা সিধুর ছবি কেমন দেখায় কে জানে । দায়িত্বে থাকা মেজর শাকবার্গ  ভাবলেন এরপর ওরা নিশ্চয়ই কানু , চাঁদ আর ভৈরবকেও বা বীরাঙ্গনা ফুলো আর ঝানুকে   সহজে পাকড়াবে, সবাই নোকর বনে যাবে তাড়াতাড়ি কিন্তু সে হয়না। কানুদেরও যে সেপাই দল তৈরি হয়েছে , তারাও একটা ব্যবস্থা বানিয়েছে , এটা কলোনির প্রভুরা কিছুতেই বুঝবে না।  কানু  তাঁর দারোগা –সেপাইসালার , দমনকে বলেন  ," মারাংবুরু আদেশ দিয়েছে এবার !''
    - কী আদেশ ওনয়েনদু - প্রিয় নেতা আমার।
    - তুমি যাবে দমন দারোগা।
    - আর ভাগনা মাঝির ?  
    - মুন্ডুটা কেটে আনবে।
    - আর মেজিয়া মাঝির ?
    - কী করা উচিত যারা সিধুকে ধরায় !  
    - সবার মুন্ডু মারাংবুরুকে দিতে হয় হে নওয়াচিনেকে - ঈশ্বর প্রেরিত।
    - যাও দমন দারোগা, মারাংবুরু যা চাইছেন তাই করো গে যাও।  
    দমন আদেশ পালন করেন। মজার হলো তাঁর মুন্ডুও কাটা পড়ল। পাল্টা এক লড়াইয়ের পর, ভাগনা মাঝির জামাই বিজনাথ দমনের কাটা মুন্ডুটা নিয়ে সিভিলিয়ান  প্রশাসক ডাব্লিউ জে মুনির কাছে  চলে এসেছিল। কৃষক বিদ্রোহ আর কলোনির নোকর বনে যাওয়া পাশাপাশি চলে আর অবশেষে অনেক লড়াই দিয়ে সিধুও ধরা পড়লেন।
    দ্রুত ছড়ানো শব্দ আর দৃশ্যের সংকেত
    এ গেল না হয় বিদ্রোহের টানাপোড়েনের কথা , যার মধ্যে চলতে চলতে কলোনির কত্তারা অন্য একটা জিনিস লক্ষ্য করলো যা বিদ্রোহ আর তার দমনে কম গুরুত্বের নয়।সেটা হচ্ছে অশিক্ষিত –অর্ধ শিক্ষিত কৃষকরা  বিদ্রোহের বার্তা এতো দ্রুতবেগে ছড়াচ্ছে কেমন করে ?  সাহেবরা আবিষ্কার করছে যে  অতি দ্রুতবেগে কিছু সংকেত বিনিময় করছে ওরা  যার মানে তারা   জানেই  না, যা ভাষার  ঊর্ধ্বে, অনেক ঊর্ধ্বে কিছু আদিম সংকেত।কখনো তা শব্দের আবার কখনো দেখার কিছু। ফিরিঙ্গীরা নানা মানে বার করতে থাকে সংকেতের , কত দ্রুত তা ছড়াচ্ছে সে নিয়ে নানা অনুমান করতে থাকে । আঠেরোশো পঞ্চান্নর সাঁওতাল বিদ্রোহে শিকার উৎসবের নাগারা – বড় ড্রামের ডুবুডুবু  , সিঙ্গার  টু টু টু টু আর বাঁশির  শ্রং শ্রং  ডাকে লোক জড় করে হুলে  সামিলের কায়দা নেওয়া হয় ।সাঁওতাল  হুল শুরুর দিন চারেকের মধ্যে আঠেরো শো পঞ্চান্নর জুলাই মাসে মেজর বারোস ভাগলপুরের কমিশনারকে লিখলেন ,” খবর পাচ্ছি বিদ্রোহীরা খুব ছোট দলে ঘোরে  কিন্তু তাদের ড্রামের আওয়াজে দলে দলে ভাগ হয়ে দশ হাজার লোক জোটে লুটপাট করতে ।‘’ We hear that the insurgents move about in very small parties but on their drums sounding they assemble in parties up to 10000 men each for the purpose of plundering. ( Elementary aspects of Peasant Insurgency in Colonial india ,Ranajit Guha page 229 )
    সাহেবদের মধ্যে তক্কাতক্কি লেগে গেলো সাঁওতালদের প্রথাগত অস্ত্র তীর , ধনুক , তলওয়ার ,টাঙ্গীর সঙ্গে ড্রাম আর সিঙ্গে-বাঁশিও নিষিদ্ধ করা যায় কিনা ।এসময় ধূর্ত কলোনির প্রশাসক  ওয়ার্ড  সাহেব বারণ করেন স্থায়ী ভাবে অরণ্যচারী ‘ট্রাইবালদের’ জীবন ধারণ উপযোগী দেশি হাতিয়ার কেড়ে নেওয়ার । সাহেব বলেন ,” যখন ত্যানড়াই ম্যানডাই করবে তখন ছেড়ে কথা  কইবে না।
    - কী করব স্যার ?  
    - তখন তুমিও বেয়াদবী রুখবে।
    - পারব ?
    -আলবাত, তখন মার্শাল ল জারি  করবে।
    -মার্শাল ল ?
    - হ্যাঁ, মার্শাল ল জারি হলে সিভিলিয়ন ধানাই পানাই বন্ধ হবে।   
    - হবে ?
    এইভাবে ফিরিঙ্গীরা ছোটনাগপুর জুড়ে মার্শাল ল বসিয়ে দেয় আঠেরো শো পঞ্চান্নতে , সেই শুরু । যখন মার্শাল ল জারি থাকে তখন সামরিক অভিযানে  মূলবাসীদের জীবনধারণের  কথা বড় থাকে কি ?  তাই প্রথাগত অস্ত্র তীর, ধনুক, তলওয়ার,টাঙ্গীর সঙ্গে ড্রাম আর সিঙ্গে-বাঁশিও  নিষিদ্ধ হতে থাকে , সব সরকারের কাছে জমা করার ফরমান জারি হলো ।
    শুধু সাঁওতাল হুলের সময় নয় , কোল বিদ্রোহ ,  পরে  ভগবান বিরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে উলগুলানের সময় বা তারও আগে আঠেরোশো সাতান্নর গদরের সময় উত্তরপ্রদেশের গ্রামে আর মীরাটেও লোক জড় করতে ড্রামের ব্যবহার হয়।
    শোনার সংকেত ছাড়াও দেখার সংকেত সাহেবদের তাড়া করছে । কোল বিদ্রোহের সময় সেই যে এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে বিদ্যুতবেগে  তীর চালাচালি করে বার্তা ছড়ানো শুরু হয়েছিল এই সংকেতের বাহক থাকতে লাগে আর তারা এখান থেকে সেখান তীর পৌঁছে দেয় ।  গদরের সময়ও অরণ্যভূমে এই তীরের সংকেত পাঠানো  জারি থেকে যাচ্ছে । এছাড়া আম , কাঁঠাল বা শাল পাতা, তেল –সিঁদুর  চালাচালি করেও কোল বা সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় বার্তা পাঠানো হচ্ছে।
    রহস্যময় চাপাটি
    এসব দৃশ্যমান সংকেত  তবু সাহেবরা বুঝতে পেরে অনেক রিপোর্টে লিখে গেছে কিন্তু এক সংকেতের মানে তারা কিছুতেই বোঝেনি ।
    আঠেরো শো ছাপ্পান্ন –সাতান্নর শীতে , দমনের মুখে সবে সাঁওতাল বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে এসেছে , সরকারের কাছে খবর এলো গোটা উত্তর –পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গ্রামে গ্রামে ডাক হরকরাদের ব্যবহার করে দ্রুতবেগে চাপাটি বিলি হচ্ছে ।আগ্রার কমিশনার জর্জ হারভে আঠেরো সাতান্নর গোড়ায় তাঁর খাস তাঁবুর বাইরে বসে বিকেলের চা খাচ্ছেন এই সময় খবর আসে জনাকয়েক জমিদার তাঁর সাক্ষাতপ্রার্থী ।এরা মাঝে মধ্যে এভাবে আসে কিন্তু খবর থাকে আগে থেকে । এবার হঠা ৎ কী  যে না বলে কয়ে এসে পড়ল ।সাহেব প্রথমে হাঁকিয়ে দিচ্ছেন কিন্তু ওরা পেড়া পে ড়ি করতে থাকে , তাছাড়া দামী দামী ভেটও এনেছে। এবার সাহেবের মন গলতেই হয়। সাহেব অনুমতি দিচ্ছেন জমিদারের দলকে সাক্ষাতের। ওরা হাতজোরকরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আর কমিশনার সাহেব আরাম কেদারায় গড়গড়া খাচ্ছেন এরকম কিছুক্ষণ চলল। আর থাকতে না পেরে একজন জমিদার গলা খাঁকরি দিয়ে বলে ওঠে ," হুজুর কমিশনার। ''
    সাহেব পরিস্কার হিন্দুস্থানি ভাষায় বললেন ,” বলুন ।“
    • হুজুর কমিশনার বাহাদুর ।
    • কিছু বলার থাকলে বলুন ।
    • একটা ঘটনা ঘটছে হুজুর ।
    • সে তো রোজই ঘটে ।
    • কিন্তু এটা এক বিশেষ ঘটনা ।
    • আগে ক খ নো হয়নি ?
    • আজ্ঞে , দুর্ভিক্ষয়ের সময় অশুভ শক্তির ছেয়ে আসার…
    • কী ছেয়ে আসার? 
    • অশুভ শক্তির হুজুর যা দুর্ভিক্ষ ঘটায় ।
    • ওঃ।
    • তখন আগেভাগে এরকমভাবে জরুরি বার্তা পাঠাতে হয় ।
    • কোথায় দুর্ভিক্ষ ,?
    • দুর্ভিক্ষ নেই হুজুর।
    • তবে কিসের বার্তা ?
    • জানিনা হুজুর ।
    • যাচ্চলে ! কী ঘটছে বলুন। চটপট বলুন।
    জমিদারদের কাছ  থেকে শুনলেন আগ্রার কমিশনার , মন দিয়ে শুনলেন । ঠিক তার পরের বছর ষোল শো আটান্নর একুশে ডিসেম্বরে ‘ আগ্রা ডিভিশনে গোলমাল শুরু আর কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার বিষয় ‘ শীর্ষক সরকারি নথিতে সেসব  লিখে রাখালেন তিনি। জর্জ হারভে লিখছেন ,’’মইনপুরি জেলা দিয়ে কুচ করার সময় রাস্তার ধারের  স্থানীয় গ্রামের জমিদাররা রহস্যময় চাপাটি বিলির কথা বলে , আশ্চর্য দ্রুত গতিতে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে যাচ্ছিল তা ।  যাদের কাছ থেকে চাপাটি পাচ্ছে তারা আরো  পাঁচটা রুটি বানিয়ে আগের গ্রামে ছড়ানোর কথা বলেছে এর বেশি কিছু বাহকরা জানে বলে মনে হয়নি। ‘ ওসব কাজে লাগবে ‘ , এরকমই তাদের বলা  হয়েছিল , এভাবে চাপাটি আর আরো নতুন বানানো চাপাটি ছড়িয়ে যাচ্ছিল এক রাতে একশো ষাট অথবা দুশো মাইল ।আমি দেখলাম মইনপুরির এ ট ওয়ার দিকে বিলি হওয়া চাপাটি পরের দিন এ ট ওয়ার আর আলীগড়ের  সীমায় চলে গেছে …… গমনপথ দেখে মালুম হয় বুন্দেলখণ্ড বা নাগপুর থেকে বিলির শুরু ।‘’( The Mutiny outbreak at Meerut in 1857 by JAB Palmer edition 2008 ,page 1 )
    হারভে সাহেব আর কোন মুখে কারা বাহক ছিল তা বলেন। কারণ বাহক যে সরকারি চৌকিদাররাই, তাই সরকারি রিপোর্টে বেমালুম চেপে যাওয়া হচ্ছে সেসব কথা । যে গতির কথা সাহেব বলছেন তাও বাড়াবাড়ি, তবে ডাক হরকরাদের গতিতে বিলি চাপাটি বিলি হয় ধরে নিলে সেটাও রাতে একশো মাইলের মতো ।তবে কি সরকারি ডাক হরকরারাও এই বিলিতে যুক্ত ছিল ? ওঁর রিপোর্ট থেকে শুধু গতি নয় চাপাটি  বিলির দিক নির্দেশও মালুম হয় আর তা হলো দক্ষিণ –পূর্ব থেকে উত্তর –পশ্চিমের দিকে অথবা হয়ত পূর্ব থেকে পশ্চিম ভারতে ।
    চাপাটিগুলোর রহস্য আজও জানা যায়না ঠিকঠাক। তারা রাস্তার নুড়ির মতো , পড়ে থেকে , জমে থেকে রাস্তা হয় বটে কিন্তু আলাদা একটা নুড়ি তুলে ধরে পথের আভাস পাওয়া নামুমকিন।  কেন তাদের বিলি  করা হয় কে জানে ? চাপাটিরা নিজেরা কথা কইতে পারে কি ? কইলে কী বলতো তারা ? এসব জানতে না পেরে ইতিহাসকার বলেন - সেপাই বিদ্রোহের আগে ঘটেছে তাই এ নিশ্চয়ই মহাবিদ্রোহের সংকেত । এমন জোর দিয়ে বলার যুক্তিটা আসছে  কিন্তু জন উইলিয়াম কে সাহেবের বলে যাওয়া ‘বাজারের গুল্প ‘ থেকে  যার থেকে বোঝা যায় হিন্দুস্থানের সব কৌমের লোক ফিরিঙ্গীদের ওপর কীভাবে আর কেনইবা এতো ক্ষেপে ছিল ।
    হাড়ের গুঁড়ো
    লখনৌতে কর্মরত এক ব্রিটিশ অফিসার এম আর গুব্বিনস লিখলেন ,'' লোকে বলছে সরকার গরুর গাড়ি  , নৌকো বোঝাই করে হাড়ের গুঁড়ো পাঠাচ্ছে , সেসব ময়দা আর মিষ্টির সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে বিক্রি হবে ,যাতে দেশসুদ্ধ সবার জাত মারার ব্যবস্থা হয়। শুনে লোকে ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হচ্ছে ।একদিন সুলতানপুরের সেনাছাউনিতে খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে যে গোমতী নদীর কোনো এক ঘাটে হাড়েরগুঁড়ো বোঝাই এক নৌকো ভিড়েছে , সেপাইদের বোঝানো দায় হয়ে পড়ে। কয়েকদিন পরে সালোন সেনাশিবিরে , দুটো উটের পিঠে চাপিয়ে গুলি-বারুদ এলো কমান্ড্যান্ট  ক্যাপ্টেন থম্পসনের বাড়িতে। গুজব ছড়িয়ে গেলো বস্তাবন্দি করে হাড়ের গুঁড়ো এসেছে আর সেনাছাউনি জুড়ে আতংকের সঞ্চার হয়। শুধু সেনাছাউনির সেপাইরা নয় , সাহেব বাংলোর নোকর, আর জুড়ে থাকা গ্রামের লোক আর দরবারে আসা জমিদার সব সিঁটিয়ে ওঠে। রান্না করা খাবারদাবার কেউ ছুঁয়েও দেখে না , গোটা দিন অভুক্ত থাকে তারা। লখনৌতে পরের পর গুজব ছড়াতে থাকে , লোকের মনে সারাক্ষণ অস্থিরতা । আজ এই দোকান তো কাল অন্য দোকানে , হাড়ের গুঁড়ো এলো , এমনটা দিব্বি করে বলা হয়। ওই আতংকের মধ্যে ওসবের বিরোধিতা পাত্তা পাচ্ছিল না।‘’ ( The Year of Blood , Essays on the Revolt of 1857, Rudrangshu Mukherjee,edition 2016,page 126)
    সেপাইদের আস্থা টলোমলো
    ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নানা কৌ মে বিভক্ত একটা বিশাল দেশে , নানা ছোট বড় রাজা আর সামন্তদের ভূমিতে জাতি রাষ্ট্র বানাতে লেগে পড়েছিল । সেই ঔপনিবেশিক সরকার লুটপাটের আর দমনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সে কথা ঠিক তবে তাতেও আস্থার বনেদ লাগে । পেটের দায়ে যেসব চাষি কোম্পানির সেপাই উর্দি চাপিয়েছে তার দেহখানির মালিক হয়ে ওঠে কোম্পানি নিজে । সে ঘুম থেকে ওঠা ইস্তক বিলিতি ফৌজি কম্যান্ড মেনে চলে আর রাতে ঘুমতে যায় সেও কম্যান্ড মেনে ।এভাবে সে সেপাই হয়ে ওঠে কিন্তু তারও গ্রামের ঘর আছে , গ্রামের নিয়মে সেখানকার পঞ্চায়েতি অনুশাসনে সে জাত –ধর্ম –বর্ণ সব বজায় রাখে হিন্দু –মুসলিম –শিখ –ইশাহি সব্বাই ।সেনাছাউনির সেপাইরা সাহেবের ঘরে জল কর্ম করে বা নুন খেয়েও জাত বাঁচিয়ে রাখবে এমনটা আস্থা ছিল , এইসব অনবরত ছড়ানো গুল্পে সেই আস্থা টলে যায় যায় হয়ে পড়ে । হেনরি ল রেন্স ছিলেন অওধের চিফ কমিশনার তিনি শোনেন বাজারের গুল্পের কথা আর যাচাই করতে লেগে পড়লেন ।তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীর এক অনুগত জমাদার ছিল । অনেক যুদ্ধের সময় সে কখনো পেছিয়ে আসেনি , বরাবর সামনের সারিতে থাকা ওই অনুগত দেশী সেপাই কেমন ভাবছে এই ছিল লরেন্স সাহেবের প্রশ্ন ,’’ এই যে এতো গুজব রটে বাজারে , তোমার কানে আসে জমাদার ?’’
    -কোনটা হুজুর ?
    -হাড়ের  গুঁড়োর গুজব ।
    -আসে হুজুর তবে …
    -কী ?
    -গুজব মনে হয় না হুজুর ।
    - কী মনে হয় ।
    - তা বললে নেমক হারামি হবে হুজুর ।
    - কেন ?
    - কারণ আমি কোম্পানি বাহাদুরের নেমক খেয়েছি হুজুর ।                        
    - তবু বলো ।
    - হুজুর কোম্পানির ধর্ম আমাদের নয় হুজুর ।
    - কোম্পানির  ধর্ম ?
    - হ্যাঁ হুজুর ।খ্রিষ্টান ধর্ম,  তা দেশী লোকের ধর্ম নয় ।
     - আর কোম্পানির সেপাইদের ?
    লরেন্স তাকিয়ে ছিলেন । জমাদার মাথা নিচু করে থাকে ।তার দৃষ্টি মাটিতে ।খুবই অনুগত এই জমাদার দক্ষ গোলন্দাজ , তার ছোঁ ড়া গোলা অনেকদূর যাবে তবে কতদূর যেতে পারে তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কিন্তু তার হাতে নেই। ছোট , মাঝারি আর বড় কামানের ধরণের ওপর গোলা  কতদূর যাবে তা নির্ভর করছে আর সেটা ঠিক করবেন লরেন্স , ঠিক করে দেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কম্যান্ডাররা, সেক্ষেত্রে জমাদারের কিছুই করার থাকে না। সে মাটির দিকে তাকিয়ে ছিল তারপর আস্তে আস্তে মুখটি তুলে লরেন্সের দিকে সোজা তাকালো। সাহেব দেখলেন আধস্তন সেপাইয়ের দৃষ্টি স্থির যা দেখতে তিনি অভ্যস্থ  নন। সেপাই অনেক কথা সাহেবকে বলেছিল। সে তার গ্রামের কথা বলল। প্রাচীন  গ্রাম সমাজের অনুশাসনের কথা বলল।  আসলে সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কৌমের কথা বলছিল যা তার চেতনায় পুরনো বট পাকুড়ের মতো আশ্রয় হয়ে রয়েছে। সে জাত ধর্মের কথা বলছিল।
    - কোম্পানির যা ধর্ম এমনকি  তা কোম্পানির নেমক খাওয়া সেপাইদেরও নয়।
    - তাই নাকি ?
    -  তাই লোকে ভাবে হুজুর, গ্রামের পঞ্চায়েতে আলোচনা হয়  অনেকদিন ধরে , দশ বছর ধরে …… কোম্পানি আমাদের জাত মারতে চাইছে ।
    - কেন বলছ ?
    - পঞ্চায়েত বলে কোম্পানির নোকরি করলে জাত যাবে ।
    - আর তুমি কী ভাবো ?
    - পঞ্চায়েত বললে আমাকেও মানতে হয় হুজুর ।
    বিশ্বস্ত সেপাইয়ের এই বদ্ধমূল ধারণার কথা গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংয়ের কাছে জানালেন হেনরি লরেন্স ।নাড়াচাড়া পড়ে গেলো কত্তা ব্যক্তিদের মধ্যে ।
    অনেকদিন ধরে যে কোম্পানির দেশী সেপাইরা নিজের নিজের কৌমের অস্তিত্ব খোয়ানোর জাত –ধম্ম খোয়ানোর রাগে দুঃখে ধিকিধিকি জ্বলছে এ ব্যাপারে জেনেও পরিস্থিত হাতের বাইরে  যাওয়া  আটকাতে ব্যর্থ হলেন  লর্ড ক্যানিং যার কারণ এনফিল্ড রাইফেলের চর্বি লাগানো কার্তুজ ।
    চর্বি লাগানো কার্তুজ
    নানান ধরণের বন্দুক / রাইফেল
    বন্দুকের বিবর্তনের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বন্দুকে বারুদ ফাটানোর কায়দা ক্রমশ বদলেছে ।

    ম্যাচ লক
    বাইরে থেকে দেশলাই দিয়ে আগুন লাগানো হ তো বারুদে। সেই বিস্ফোরণে গুলি  ছোঁড়া হ তো এই প্রথম যুগের বন্দুকে ।
     
    ফ্লিন্ট লক
    ভেতরেই আগুন লাগানোর জন্য ফ্লিন্ট ব্যবহার হতো । ঘোড়া টিপলে  সূঁচালো পাথরে তৈরি ফ্লিন্ট দিয়ে লোহার পাত বা ফ্রিজেনে ঠুকে দিলে তার থেকে সৃষ্ট ফুলকি দিয়ে বারুদ ফাটিয়ে গুলি ছোঁড়া হতো।   
     
    পারকাশন ক্যাপওলা মাজল লোডার       
    আঠেরো শো সাতান্নতে যে সব রাইফেল –বন্দুক কোম্পানির বাহিনীতে ব্যবহার হতো  সবই ছিল  মাজল লোডার । বাটটা তলায় রেখে ব্যারেলের মুখ বা মাজল দিয়ে গুলি ভরার কারণে এই নাম । শুরু  হলো ফ্লিন্টের বদলে কার্তুজ আর পার্কাশন ক্যাপের ব্যবহার । সেই বন্দুকের বোরের ভেতর খাঁজ কেটে তৈরি হচ্ছে রাইফেলও । আঠেরোশো সাতান্নর মহাবিদ্রোহের , গদরের সময় পার্কাশন ক্যাপ লাগানো বন্দুক আর রাইফেল দুয়েরই ব্যবহার ছিল। ঘোড়া টিপে একবার ব্যবহারযোগ্য এই পার্কাশন ক্যাপে আঘাত করে ফাটিয়ে দিলে তার মধ্যে থাকা মার্কারি ফুলমিনেট নামক রাসায়নিক ডিটোনেটরের কাজ করে বারুদ ফাটিয়ে দিতো। মুশকিল হচ্ছে প্রতিবার পার্কাশন ক্যাপ না বদলালে বন্দুক / রাইফেল দিয়ে গুলিই ছোঁড়া যেত না। পার্কাশন ক্যাপ ছাড়া বন্দুক অচল !
    পুরোনো মাস্কেট বা ফ্লিন্টলক বন্দুকের থেকে উন্নত ধরণের হলো  মাজল লোডার যা বন্দুক বা গুলিটাকে ব্যারেলের মধ্যে ঘুরপাক খাইয়ে দিতে  খাঁজ কাটা   রাইফেলও হতে পারে।
    মাজল লোডারের  মাজল  দিয়ে বারুদ ঢেলে নির্দিষ্ট বারুদ চেম্বারে ঢুকিয়ে র‍্যাম রড দিয়ে তাতে লোহার বলের বুলেট ঠেসে গুলি  ছোঁড়া হতো।

    কার্তুজের ধরণ
    কার্তুজ দু ধরণের হতো বল সহ বা বল ছাড়া ।
    কার্তুজের ধরণ অনুযায়ী বল সহ বা বল ছাড়া কার্তুজ ঠাসা বারুদের ওপর ঢুকিয়ে রেখে গুলি ছোঁড়া হতো।

    ১) প্রথম ক্ষেত্রে খোলা মুখ বারুদ মাজল দিয়ে ঢুকিয়ে আলাদা করে লোহার বল যা  বুলেট হিসেবে ব্যবহার হবে তা র‍্যাম রড দিয়ে ঠেসে দেওয়া হতো ।

    ২) আর কার্তুজের সঙ্গে বল থাকলে বারুদ বার করার  পর খোলা মুখ উলটো করে অর্থাৎ যে দিকে বল আছে সে দিকটা বাইরের দিকে রেখে  ঢুকিয়ে ঠাসা হতো।
    বারুদের গ্যাস নিয়ে সমস্যা
    বল বা বুলেট ঠিকঠাক ভরাটা জরুরি নইলে বারুদ ফাটা গ্যাস পাশ দিয়ে বেরিয়ে বুলেটের ভেদশক্তি কমিয়ে দেবে শুধু নয় ব্যারেল ফাটিয়ে বন্দুকবাজকে মারাত্মক আহত এমনকি  মেরেও ফেলতে পারে । পুরনো ধরণের সব গাদা বন্দুকে আকচার এই ব্যারেল ফাটার ঘটনা ঘটতো ।
    বোরে  খাঁজকাটা রাইফেলের ক্ষেত্রে এটা আরো সত্যি। সেক্ষেত্রে দুভাবে সমাধান হতো বল ছাড়া কার্তুজের ক্ষেত্রে আলাদা  বল / বুলেটের চারপাশে কাপড়ের প্যাচ লাগিয়ে দেওয়া হতো যা ঘোড়া দাবালে সৃষ্ট তাপে গলে গ্রিজের কাজ করে বুলেট বেরনোর সহায়ক হতো  । বল লাগানো কার্তুজে যে  দিকে বল থাকত সেখানে গ্রিজ   লাগানো থাকত । বেরনোর সময় সে  দিকটা সামনে থেকে একই ভাবে বুলেটের গমনপথ তৈলাক্ত করতো

    রাইফেলের বোর খাঁজকাটা হবার  কারণে পাল্লা আর লক্ষ্য ভেদের ক্ষমতা বাড়ে বটে কিন্তু গ্যাস বেরনোর অসুবিধে থেকে যায় ।
    এনফিল্ডে অস্ত্র গবেষণা

    এই গ্যাস বেরোনোর অসুবিধে দূর করার জন্য ব্রিটিশ সরকার টেমস নদীর উত্তর পাড়ে উত্তর  লন্ডনের এনফিল্ড শহরে রয়্যাল স্মল আর্মস ফ্যাক্টরিতে নানা পরীক্ষা চালায়।

    কী কী বন্দুক –রাইফেলের ব্যবহার হতো ১৮৫৭ এ
    *সেসময় ব্রিটিশ রাজশক্তি আর তাদের মাফিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চার ধরণের বন্দুক /  রাইফেল ব্যবহার করতো।
     ১) আদি ব্রাউন বেস (Brown Bess) বন্দুক ছিল  পুরোনো ফ্লিন্ট লকের উন্নত সংস্করণ। পুরোনো বন্দুকটার ফ্লিন্টের বদলে বারুদে আগুন লাগানোর জন্য এতে ছিল পার্কশন ক্যাপ। এটাই পদাতিক বাহিনীতে সবচেয়ে চালু ছিল।বেঙ্গল আর্মির সেপাইরাও মূলত এই বন্দুক পেত ।
    ২) বোরে দুবার খাঁজ কাটা ব্রুনউইক (Brunwick) রাইফেলও দেশী পদাতিক সেপাইদের দেওয়া হতো ।
    ৩)  লম্বা বুলেটওলা মিনি (Minie ) রাইফেল সি ই মিনি নামের এক ফরাসি সেনা অফিসারের উদ্ভাবন, ইংরেজরা তার নকল করে । এটার বুলেটের তলার দিকে একটা ধাতব ঢাকনা জাতীয় পরানো থাকত আর বোরের থেকে একটু সরু হওয়ায় সহজেই ভরা যেত । গুলি ছোঁড়ার সময় ঢাকনাটা তাপে প্রসারিত হয়ে বোরের একদম খাপে খাপে হয়ে বেরোত ফলে পাশ দিয়ে গ্যাস বেরোনো আটকে গিয়ে অনেক জোরে আর দূর পাল্লায় গুলি ছোঁড়া  যেত। এই বুলেটের ঢাকনাটা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। দেখা গেলো ঢাকনাটা তাপে প্রসারিত হয়ে বুলেটের ভেতর ঢুকে আসছে । এ রাইফেলের ব্যবহার কমই ছিল।
    ৪ ) এছাড়া ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে ছোট মাপের কারবাইন ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে।
    আসল কথা এনফিল্ড রাইফেল আর কড়া করে চর্বি মাখানো কার্তুজ
    আঠেরো শো তিপ্পান্নতে মিনি রাইফেল আর তার বুলেটের কার্যকারীতার বিষয়ে এনফিল্ড গবেষণাগারে নিবিড় গবেষণা  করে কড়া করে চর্বি লাগানো এক কার্তুজ আবিষ্কার করা হলো। ওই ব্যবহার্য চর্বি গরু আর শুওরের গায়ের চর্বির সংশ্লেষ। রাইফেলটারও অনেক উন্নতি করা হচ্ছে  প্রিচেট সাহেবের তত্ত্ববধানে তাই নতুন রাইফেলটাকে বলা হচ্ছে এনফিল্ড -প্রিচেট রাইফেল বা প্যাটার্ন ১৮৫৩ এনফিল্ড রাইফেল বা শুধু এনফিল্ড রাইফেল। এখন ওই চর্বির আস্তরণ ভারতের গরম  আবহাওয়ায় টেঁকে কিনা সেটা দেখার জন্য ষোলোশো তিপান্নতে ভারতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। সেটা সেপাইদের  দেওয়া হলো ব্যবহৃত চর্বির ব্যাপারে কিছু না জানিয়েই , তারা কার্তুজের থলিতে ভরে সেসব ব্যবহার করতো। ওই পরীক্ষা সফল হতে ইংল্যান্ডে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ছাপ্পন্নর শেষ থেকে সাতান্নর শুরুতে ,  পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে, কোম্পানির দমদম , আম্বালা আর শিয়ালকোট অস্ত্র ডিপোতে এই নতুন রাইফেল ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে । আঠেরোশো সাতান্নর পয়লা জানুয়ারী মীরাটে অবস্থিত ষাটতম কুইন্স রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নে এই রাইফেলের ব্যবহার সংক্রান্ত আদেশনামা জারী হচ্ছে। সারা ভারতে এই রাইফেলের ব্যবহার চালু করা হচ্ছে।এইসব প্রশিক্ষণে সাধারণভাবে এনফিল্ড রাইফেলের ব্যবহারের কায়দা শেখানো হতো। কার্তুজ ভরে গুলি ছোঁড়ার উদাহরণ নেই আর নির্দিষ্টভাবে কার্তুজ ব্যবহারের প্রথম উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে আম্বালায় সতেরোই এপ্রিল কিন্তু গ্রিজ না মাখানো কার্তুজ দেওয়া হয় সেপাইদের। তারা জানা মাখন জাতীয় তৈলাক্ত পদার্থ মাখিয়ে  গুলি ছোঁড়ার অভ্যাস করেছিল। মিরাটে ষাটতম রেজিমেন্টের কাছে যখন এনফিল্ড রাইফেল এলো , দেখা যাচ্ছে তাদের কার্তুজ ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে। সে নিয়ে সেপাইরা ক্ষোভ জানালে কলকাতার দমদমের অস্ত্র কারখানায় তৈরি জনপ্রতি দশটা করে আগে থেকে চর্বি লাগানো কার্তুজ তাদের দেওয়া হয়। পরে ওই চর্বি লাগানো কার্তুজের পর্যাপ্ত সরবরাহ হতে থাকে ওই দমদম থেকেই। এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে দমদমের ওই কারখানায় চর্বি লাগানো কার্তুজের উৎপাদন শুরু হয় আগেই কিন্তু সে নিয়ে বিক্ষোভের শুরু কবে থেকে ? এর উত্তর পেতে আর এক গল্পের সাহায্য নিতে হচ্ছে।
    - গল্প ?
    - হ্যাঁ , গল্পই বটে। তার নানা বয়ান থাকলেও মূল কথাটা একই।
    - মূল কথায়  আসা যাক।
    - যাক।
    - কিন্তু সেটা কী নিয়ে।
    - লোটা থেকে জল খেতে চাওয়া নিয়ে।
    - কিসের লোটা , কার লোটা আর কেইবা জল খেতে চায় ?
    - সেটাই তো গল্প।
    লোটায় জল খেতে না দেবার  গল্প
    আঠেরোশো সাতান্ন সালের জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দমদম অস্ত্রাগার কাম কারখানার এক নিচু জাতের খালাসি এক ব্রাহ্মণ সেপাইয়ের কাছে বলছে :
    - পণ্ডিতজি তেষ্টা পেয়েছে।
    - তাতে আমি কী করব শীতকালে এতো তেষ্টা তোর পায়েইবা কেন ?
    - বড্ড তেষ্টা পণ্ডিতজি।
    - তা আমাকে  কী করতে হবে ?
    - কিছু না পণ্ডিতজি আপনার লোটা থেকে একটু পানি দেবেন।
    - তোর আস্পর্ধা তো বড় কম নয় ! নিচু জাত আমার থেকে জল চাস ! মাদারচোদ !
    - আহা , গালাগালি দেন কেন পণ্ডিতজি , আমরা সবাই সমান হয়ে গেছি।
    - জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব হারামজাদা !
    - আমরা সবাই হারামজাদা পণ্ডিতজি , আপনি আমি সবাই হারামজাদা হয়েছি , হারামখোর।
    - বটে !
    - হ্যাঁ পণ্ডিতজি আপনি কোম্পানির নেমক খেয়েছেন , আমিও।  
    - তাতে কী ?
    - ওই নেমকে গরুর হাড় ছিল না আপনি দিব্বি করে বলবেন ? কিম্বা শুওর ?
    - সালে !  হারাম ঘুষেগা তেরা  গাঁড় মে !
    - আরো বাকি আছে পণ্ডিতজি যে নয়া কার্তুজ তৈরি হচ্ছে- সব শুওর আর গরুর চর্বি  দিয়ে বানানো!
    - তুই কোত্থেকে জানলি !
    - খালাসীকে সব বইতে হয় হুজুর , সব মাল আমি পিঠে করে দিয়ে আসি , আমাকে সব জানতে হয়। এবার আপনি বলুন আপনার জাত , উঁচা জাত কোথায় কোন গাঁড়ে গিয়ে ঘুষবে ! আপনি কি গাঁড়ে ঘুষিয়ে কার্তুজ কাটবেন , না নিজের দাঁত দিয়ে !  উঁচা জাতের গুমোর আপনার গেলো পণ্ডিতজি !  আপনি কোম্পানির নোকর আর আমিও তাই। চুপচাপ লোটা থেকে জল দেবেন।
    কার্তুজ ব্যবহার নিয়ে টানাপড়েন
     দমদমের বেঙ্গল আর্মির সেপাইদের মধ্যে  ফিসফিসানি আর সন্দেহ , ভয়ের উদাহরণ হিসেবে কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন রাইট এই ঘটনাটার উল্লেখ করছেন । তিনি মাস্কেটরি ডিপোর কম্যান্ডিং অফিসার  মেজর বন্তেইনের কাছে রিপোর্ট পেশ করলেন। এরপর সেই রিপোর্ট যাচ্ছে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল হারসির  কাছে। তিনি মতামত দিলেন যে সন্দেহ নিরসন করতে বাজার থেকে গ্রিজ কিনে সেপাইদের দিয়ে কার্তুজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে, তারপর ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ অর্ডন্যান্স , কর্নেল এবোটের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে পাঠানোর জন্য  দিলেন রিপোর্টটা।প্রযুক্তিবিদ এবোট সাহেব ভিন্নমত পোষণ করে লিখেছিলেন চর্বি লাগানো গ্রিজই ব্যবহার করতে হবে এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের জন্য ।নারকেল তেল আর মৌচাকের মোম মোটেই কাজের নয় কারণ তাতে  গুদামেই  শুখিয়ে কাঠ হবে কার্তুজের গা । তিনি বললেন কোন গ্রিজ ব্যবহার হবে তা সিদ্ধান্ত নিতে এক কমিটি গড়া হোক , ইতিমধ্যে অনুশীলনের জন্য  গ্রিজ ছাড়া কার্তুজ বানিয়ে সেপাইদের দেওয়া হোক যার থেকে বোঝা যাবে যে কোন আপত্তিকর গ্রিজ ব্যবহার হচ্ছে না । এভাবে অনেক কাগজ চালাচালির পর সরকারী আদেশনামায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে অনুশীলনের সময় যেন সেপাইরা সব নিজেরাই গ্রিজ লাগিয়ে গুলি ছোঁড়ে । এ আদেশনামা  জেনারেল হিয়ারসের কাছে গেলো আর টেলিগ্রাম করে আম্বালা , শিয়ালকোট আর মীরাটে পাঠানো হলো। মীরাটের এডজুটেন্ট জেনারেল কর্নেল চেস্টার উত্তরে টেলিগ্রাম করেন , " মহামান্য স্যার , ছাগলের চর্বি মাখানো কার্তুজই আমরা ব্যবহার করে থাকি। হঠাৎ করে এই আদেশনামার দরকার পড়লো কেন ?  কারণ এতে করে আরো সন্দেহ বাড়বে কিছুদিন আগে থেকে ব্যবহার করা চর্বি সম্বন্ধে। '' উত্তর গেলো , "আপনারা যদি ছাগলের চর্বি আর মোম ব্যবহার করে থাকেন তবে আপত্তি নেই। ''
     ওপর থেকে আদেশনামা চাপিয়েও যে এনফিল্ডের কার্তুজ সম্বন্ধে সেপাইদের অস্বস্তি কাটছে এটা বুঝতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কম্যান্ডারদের কো নো অসুবিধে হয়নি।দমদম মাস্কুট্রি ডিপোর কম্যান্ডিং অফিসার  মেজর বন্তেইন ভাবলেন ,এক কাজ করা যাক দাঁত দিয়ে কার্তুজ কেটে বারুদ বের করার দরকার নেই ।  প্ল্যাটুন এক্সারসাইজে  বলা আছে :
    যেই ‘’লোড –গুলি ভরো ‘’ আদেশ পাবে , কার্তুজকে মুখের কাছে নিয়ে যাবে ,তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরবে তখন কার্তুজের বলটা থাকবে হাতে , আর কার্তুজের মাথাটা দাঁতে কাটবে ; কনুই লেগে থাকবে থাকবে শরীরে ।
    মেজর বন্তেইন লক্ষ করলেন বলটা হাতে ধরতে বলা হচ্ছে মানে এটা সেই বস্তাপচা ফ্লিন্ট লক বন্দুকের আমলের ড্রিল ম্যানুয়াল থেকে টোকা যখন বারুদ ভরতে বন্দুকটাকে বাঁ হাত দিয়ে ডান দিকে আনা দরকার পড়ত ।এখন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের সঙ্গেই বল থাকে ।এটা লক্ষ করে তাঁর মাথায় খেলে গেলো , আরে দাঁত দিয়ে কেটে সেই যখন বাঁ হাত দিয়েই কার্তুজ ছিঁড়তে হচ্ছে তখন পুরো কাজটাই হাতে করা যেতে পারে অর্থাৎ বাঁ হাতে কার্তুজ ধরে ব্যারেল ধরে থাকা ডান হাতের কাছে নিয়ে, দু হাত দিয়েই  কার্তুজের একদিক খুলে ফেলা যেতে পারে । এইসব ভাবনা মেজর সাহেব চিঠি লিখে মেজর জেনারেল হারসির কাছে পেশ করলেন । তাঁর চিঠির বিষয় নিশ্চয়ই ছিল “দাঁতের বদলে হাত দিয়ে কার্তুজ ছেঁড়ার কায়দা’’।এই চিঠি জেনারেল সাহেব সরকার বাহাদুরে পেশ করার দিনটা যে পাঁচই মার্চ ছিল এটাই শুধু জানা যায়।
    • তারপর ?
    • তারপর সে চিঠির কী যে হয় ……
    • কী হয় ?
    • খুব জানতে ইচ্ছে করছে ?
    • প্যায়তারা বন্ধ করবে !
    • ইতিহাসকার জে এ বি পামার বলছেন হয়ত তা কম্যান্ডার –ইন –চিফ মাননীয় জর্জ আন্সনের কাছে যায় ।
    • তারপর ?
     কম্যান্ডার –ইন –চিফ  জর্জ আন্সন সেসময় দূর দূরান্তে ঘুরছিলেন ।মীরাট থেকে তাঁকে যেতে দেখা যাবে আম্বালা। তাঁর সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর দুই দেশী অফিসার আম্বালার মাস্কুট্রি  ডিপো  পরিদর্শন করতে গেলো। সেখানেও ক্ষোভের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল। তাই পরিদর্শনে পৌঁছনোর পর সেখানকার এক সেপাইকে বলতে শোনা গেলো ," এই যে খেরেস্তানের বাচ্চারা এলেন !'' অফিসার দুজন কটমট করে তাকাতে না তাকাতে সে চুপ মেরে যায় কিন্তু মিচকে মিচকে হাসতে থাকে। সেই দেখে দুজনে পত্রপাঠ কেটে পড়ার উদ্যোগ করলে পেছন থেকে "খেরেস্তান খেরেস্তান " রব ভেসে আসে আর অন্য সেপাইদের হো হো হাসির আওয়াজ।  দুজনের বেইজ্জতির একশেষ হতে এটা নিয়ে রিপোর্ট চালাচালির কথা জানা যাচ্ছে। ব্যাপারটা এতই স্পর্শকাতর যে স্বয়ং কম্যান্ডার -ইন -চিফ আন্সনকে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হলো। উনি  সব দেশী অফিসারদের জড়ো করে এক ভাষণ ঝেড়েছিলেন।সেই ভাষণে কোম্পানি বাহাদুর যে কত ভালো আর দয়ালু ,অনুভূতিশীল সেসব কথা থেকে থাকবে তাতে সব দেশী অফিসাররা বলে ,”হুজুর যা বললেন তার ওপর  আমাদের কোন কথা বলার যো নেই কিন্তু………
    -হ্যাঁ বলো কিসের কিন্তু ?
    - হুজুর আমরা না হয় বুঝলাম কিন্তু আমাদের জাতভাই যত দেশী সেপাই আর তাদের গুষ্টি মোটেই বুঝবে না ।ওরা অনবরত আমাদের হ্যাটা করবে ,একঘরে করে দেবে হুজুর !
    শুনে টুনে কম্যান্ডার –ইন –চিফ আন্সন সব মাস্কেটরি ডিপো দমদম , আম্বালা আর শিয়ালকোটে এনফিল্ড রাইফেল ছোঁড়ার অনুশীলন বন্ধ করছেন তেইশে মার্চ আঠেরো শো সাতান্নতে । মীরাটের  কত্তা দের বললেন একটা রিপোর্ট পাঠাতে । আবার একই দিনে গভর্নর জেনারেল  ক্যানিংকে জানালেন যে এনফিল্ড কার্তুজের গ্রিজ একেবারে ঠিকঠাক , মানানসই হয়েছে ।এই দুমখো নীতি নতুন কিছু কি ? সব দেশ কালে কত্তা ব্যক্তিরা এমনটাই করেন একই সঙ্গে ক্ষোভ প্রশমন আর সরকারের গৃহীত নীতি রূপায়ন। মীরাটের থেকে রিপোর্ট এসেছিল কিনা জানা যাচ্ছে না কিন্তু বন্তেইনের সুপারিশ অনুযায়ী এনফিল্ড কার্তুজ দাঁতে না কেটে হাত দিয়ে খোলার নতুন প্ল্যাটুন এক্সারসাইজ চালু হচ্ছে। আটই এপ্রিল সরকারের তরফে কোম্পানির কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে জানানো হচ্ছে কার্তুজ দাঁতে কাটা নিয়ে সেপাইদের জাত খোয়ানোর ভয় থেকে উদ্ভূত ক্ষোভের কথা।  কিন্তু মোম বা তেল দিয়ে গ্রিজিং ও অকার্যকর তাই এনফিল্ড কার্তুজের পরীক্ষিত চর্বি দিয়ে গ্রিজিং চালু রাখতেই হচ্ছে । সেজন্য মেজর বন্তেইনের  দাঁত ব্যবহার না করে কার্তুজ কাটার সুপারিশ মেনে শুধু এনফিল্ড নয়, ব্যবহৃত সব সাধারণ মাজল লোডার মাস্কেট বা মাস্কেট রাইফেল ভরার আদেশও দেওয়া যেতে পারে  । 
      কোম্পানির মুম্বাই , মাদ্রাজ , কলকাতা সব প্রেসিডেন্সিতেই গুলি ভরার নতুন কায়দা চালুর আদেশ দিলেও , কুইন্স রেজিমেন্টগুলোকে তো আর আদেশ দেওয়া যায়না তাই তাদের কাছে সংশোধিত প্ল্যাটুন এক্সারসাইজের বই ছ কপি করে  পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু লর্ড  ক্যানিং কম্যান্ডার –ইন –চিফকে চিঠিতে গুলি ছোঁড়ার অনুশীলন বন্ধে রাজি হননি। তিনি বলেন  এতে উল্টো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ।   ওনার তরফে তেরোই এপ্রিল এডজুটেন্ট জেনারেল চেস্টার আবার সর্বত্র গুলি ছোঁড়ার ড্রিল  চালু করার আদেশ দিলেন ।স্বভাবতই সেই আদেশে নতুন কায়দায় গুলি ভরা চালু করে  সেপাইদের ক্ষোভ প্রশমনের  উল্লেখ নেই কারণ ইতিমধ্যে বহরমপুর আর ব্যারাকপুরের ঘটনা ঘটে গেছে তাই সব ঠিক হ্যায় –গোছের অবস্থান ।সেজন্য ওই আদেশে  বহরমপুরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সেপাই ইউনিট এন আই ( নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ) সতেরোকে যে ভেঙে দেওয়া হয়েছে  সেই বার্তা সেপাইদের পড়ে শোনানোর কথাও বলা হয়েছিল । যাতে আর কেউ টেন্ডাই মেন্ডাই করতে সাহস না করে সেজন্য কার্তুজ যে  নির্দোষ সেটা  বুঝিয়ে দেওয়ার, সেপাইদের জানাতে বলা হচ্ছে এ ব্যাপারে  কাউকে যেন জাত খুইয়েছে বলে হ্যাটা না করা হয় ।  এনফিল্ড কার্তুজ ব্যবহার না  করতে চাইলে কঠোর শাস্তি দেবার, কোর্ট  মার্শাল করার কথাও লিখলেন  চেস্টার। এইভাবে শৃঙ্খলা ফেরানোর নানা পদক্ষেপ নিতে বলা হলো কিন্তু  বহরমপুর আর ব্যারাকপুরের পরেও যে বিক্ষোভ বেড়ে বিশাল ব্যাপ্ত এক গদর হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে তা বোধ হয়  আন্দাজ করতে পারেননি ওই চেস্টার সাহেব বা স্বয়ং গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংও ।  

    চর্বি মাখানো কার্তুজ নিয়ে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনে বিক্ষোভ
    ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজের প্রেসিডেন্সি ডিভিশনেই এইসব বিক্ষোভগুলো প্রথম দেখা দিচ্ছে আঠেরো শো সাতান্নর ফেব্রুয়ারী থেকে মে মাসের মধ্যে । সময়রেখা মেনে একে একে বিক্ষোভের গল্প করা  যাক।
    রানীগঞ্জে অগ্নিসংযোগ
    ব্রাহ্মণ সেপাই আর নিচু জাতের খালাসির বিবাদের ঘটনার পর প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল হারসি বাজার থেকে গ্রিজ কিনে সেপাইদের দিয়ে কার্তুজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন একথা আগেই জানা গেছে ।তবেআঠেরো শো সাতান্নর আঠাশে জানুয়ারী  দমদম মাস্কুট্রি ডিপোর জন্য এই আদেশ জারী হয়। একই দিনে হারসি সাহেব একটা চিঠি লিখেছিলেন ভারত সরকারের কাছে যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে : কলকাতার একটা হিন্দু পার্টি সেপাইদের মধ্যে প্রচার করছে  যে তাদের জোর করে খ্রিস্টান করার করানোর চেষ্টা চলছে।  ইতিহাসকার পামার মনে করেন ধর্ম সভা নামের একটা সংগঠনের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন হারসি । তিনি চিঠিতে আরো জানালেন রানীগঞ্জ অঞ্চলে বিক্ষুব্ধ সেপাইদের আগুন লাগানোর কিছু ঘটনার কথা। কলকাতা থেকে একশো কুড়ি মাইল দূরের এই জায়গা  তখনই রেলপথে যুক্ত ছিল আর টেলিগ্রাফও চালু ছিল সেখানে। তখন দু নম্বর নেটিভ ইনফেন্ট্রির একটা অংশ মোতায়েন ছিল ওখানে। বিক্ষুব্ধ সেপাইরা এক সার্জেন্টের বাংলো আর টেলিগ্রাফ অফিস জ্বালিয়ে দেয় এমনটাই জানাচ্ছেন জেনারেল হারসি। সেপাইরা  টেলিগ্রাফের সংকেতের মানে সব বোঝে না তবে কোম্পানির ফৌজের অঙ্গ হয়ে গেলে যা হয় আরকি।  
    - কী হয় ?
    - সব বুঝে যায় ।
    - কীভাবে ?
    - কোম্পানি যেমন সেপাইদের সকাল থেকে রাত কঠিন রুটিনে বেঁধে ফেলে তাদের পুরো শরীরের দখল নিচ্ছে , সেপাইরাও তেমনি ……
    - কী ?
    - সাহেবদের মনে ঢুকে যাচ্ছে ।তাদের ভাবনা জেনে ফেলছে সেপাইরা ।সেই ভাবনা তারা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে চালাচালি করে তার অনেক কিছু বুঝে ফেলছে ।
    - অনেক কিছু ?
    - হ্যাঁ সব কিছু নয় , অনেক কিছু বুঝে ফেলছে তাই তারা রানীগঞ্জে টেলিগ্রাফ অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছিল কারণ তাতে খবর হবে আর তা ছড়িয়ে গেল কলকাতা থেকে পাঞ্জাব সর্বত্র।   
    জেনারেল হারসি পত্রপাট রানীগঞ্জের দু নম্বর নেটিভ ইনফেন্ট্রির বেয়াড়াদের ব্যারাকপুরের হেড কোয়ার্টারে তুলে এনে ওই ঘটনার ব্যাপারে একটা কোর্ট অফকোর্ট অফ ইনকোয়ারি বসাচ্ছেন  সেপাইদের ক্ষোভের শুনানি করতে।পরিবর্ত হিসেবে সিউড়িতে থাকা সেপাইরা রানীগঞ্জে যাচ্ছে । ছয়ই ফেব্রুয়ারি ওই ইনকোয়ারি বসবে আর তার রিপোর্ট পেশ হবে পরের দিন। সেখানে দশজন দেশী অফিসার , সেপাইয়ের শুনানি হবে। দেখা যাচ্ছে সেখানে দেশীদের অভিযোগের উত্তর দিতে হারসি সাহেবের ছেলে এনফিল্ড স্কুল অফ প্র্যাকটিসের থেকে পাস করা লেফট্যানেন্ট জে হারসি ছিলেন। অভিযোগের তীর প্র্যাকটিসের এনফিল্ড বুলেটের গ্রিজের দিকে নয় বরং কার্তুজের  শক্তপোক্ত কড়া আস্তরণ মারা কাগজের দিকে। একজন সাক্ষীর কথায় সেই কাগজ নিয়ে অসন্তোষের উৎস দমদম অস্ত্রকারখানার খালাসীরা , তারাই আগের কাগজের তুলনায় নতুন কাগজের  কাঠিন্য আর চকচকে ভাব দেখে বলে থাকবে হারামের জিনিস গরু -শুওরের চর্বি দিয়ে সেসব বানানোর কথা। চকচক করলে সোনা তো হচ্ছেই না উল্টে বিদ্রোহ হয়ে যাচ্ছে !  
    ছয়ই ফেব্রুয়ারির বার্তা
    ওই ছয়ই ফেব্রুয়ারি সন্ধেবেলা  ব্যারাকপুরের চৌতিরিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সেপাইয়ের কথা অনুযায়ী চার চারটে রেজিমেন্টের  মধ্যে জাত –ধম্ম  খোয়ানোর আশংকায় একটা সম্ভাব্য বিদ্রোহের খবর আসছে ফিরিঙ্গীদের কাছে। কথা চালাচালির পর লেফট্যানেন্ট  এলেন পুছতাজের  দায়িত্ব পেলেন কিন্তু কোথায় কী ! সব ভোঁভাঁ ! অবশেষে চৌতিরিশ নম্বর রেজিমেন্টের এক জমাদার মুখ খোলে দিন চারেক পর দশই ফেব্রুয়ারি। সে বলল .....
    - কী বলল !
    - তর সইছে না যে।
    - কী করে সইবে।
     জমাদার বলে ," সাহেব। ঘটনাটা সত্যি। ''
    - সত্যি ?
    - হ্যাঁ হুজুর।
    - হ্যাঁ ?
    - পাঁচই ফেব্রুয়ারি সত্যিই এক মিটিং হয় হুজুর। সেখানে ঠিক হয়  ....
    -কী ?
    - ঠিক হচ্ছে যে ছয়ই ফেব্রুয়ারি সন্ধেবেলা ধম্ম খোয়ানোর বিরুদ্ধে এক গদর হবে।  
    - তারপর ?
    - তারপর কিছু হচ্ছে না হুজুর।
    - কেন ?
    - সেকি ! হলে কী হতো হুজুর !
    হলে কী হতো সেটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কত্তাদের জানা ছিল না তাই রহস্যটা রহস্যই থেকে গেছে আরকি। ইতিহাসকার পামার বলছেন হয়ত আগে থেকে খবর দিয়ে সাহেবদের সঙ্গে একটা  স্নায়ু যুদ্ধ শুরু করেছিল সেপাইরা , টোকা মেরে দেখে নিলো আর তারপর চুপ মেরে যায়।
    চাপা একটা ক্ষোভের ধোঁওয়া ঠিকই দেখছেন জেনারেল হারসি ।তিনি নয়ই ফেব্রুয়ারি পুরো ব্রিগেডটাকে কাতারে দাঁড় করিয়ে চোস্ত হিন্দুস্থানিতে বক্তিমে দিয়েছিলেন যে সেপাইদের জাত –ধম্ম খোয়ানোর কোনো কাজ করবে না কোম্পানি । বক্তিমে দিয়ে হারসি খুশ ,সরকার বাহাদুরও আপাত নিশ্চিন্তই রইল।                                       
    বহরমপুরে রাত বিরেতে  ক্যাঁচাল 
    ব্যারাকপুরের জানুয়ারির ক্ষোভের প্রকাশ যদি রাণীগঞ্জে আগুন জ্বালায় তবে তার হাওয়া উত্তরে গঙ্গা বেয়ে ফিরফিরতি উজানে একশো কুড়ি মাইল দূর বহরমপুরের সেনা ছাউনিতে  লাগবে না এ কেমন কথা ? গদরে র হাওয়া যা সাহেবদের কাছে  ক্যাঁচাল, সেই  হাওয়া স্বাধীন নিজামতের কেন্দ্রে থাকা মুর্শিদাবাদে মুর্শিদকুলি –আলিবর্দি –সিরাজের সমাধির আনাচে কানাচে একলাটি দাঁড়িয়ে থাকা রুখা শুখা খেজুর গাছে মিঠে বাতাসই হবার কথা । যদিও খেজুর গাছে হাওয়া দিলে গাছ নড়ে না। তবু বহরমপুরের খবর পলাশীর মাঠ হয়ে তার কাছে অবশ্যই পৌঁছে থাকবে। গাছ বাতাসপানে মুখ করেই দাঁড়িয়েছিল আরকি। দমদমের অস্ত্রাগার থেকে এগারোই ফেব্রুয়ারি কিছু গোলা  বারুদ বহরমপুরে নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ঊনিশের  অস্ত্রাগারে পৌঁছনোর খবর জানা যায়। ফিরিঙ্গী অফিসাররা জানতে পারে যে যেই কিনা। কী ছিল সেই গোলা বারুদের চালানটায় ? জানা যায় বারুদ আর  দমদমে নির্মিত কার্তুজ গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে বহরমপুরের ফিরিঙ্গী অফিসাররা খবর পেলো যে দমদম থেকে শুধু গোলা বারুদই এসেছে এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই।  
    -তবে ?
    - রিপোর্ট আসছে দমদমের দ্বিতীয় নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির থেকে এক কাসিদ-বার্তাবাহকও নাকি তেরো তেরোই ফেব্রুয়ারি পৌঁছে যায়। ...
    - কোথায় ?
    - বহরমপুরে ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সেপাইদের কাছে।
    - কী বার্তা নিয়ে আসে সেই কাসিদ ?
    - সেটাই তো লাখ টাকার কথা।
    - কী কথা ?
    সে মালুম হতে আরো দিন পনেরো পেছিয়ে যেতে হয়। ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির কম্যান্ডিং অফিসার লেফ্টেন্যান্ট কর্নেল ডব্লিউ সেন্ট এল মিচেল পরের দিন সকালে গুলি ছোঁড়ার  প্র্যাকটিস প্যারেডের হুকুম জারী করছেন। সেজন্য সেপাই পিছু পনেরো রাউন্ড ফাঁকা গুলি ধার্য হলো। রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার থেকে ওই  সংখ্যক গুলি এনে ডিভিশনের অস্ত্রাগার বা বেল অফ আর্মসে রাখা হয়। প্রথা মতো আগের দিন সন্ধের রোল কলে বারুদ ফাটানোর ডিটোনেটর মার্কারি ফুলমিনেট ভরা পার্কাশন ক্যাপ বিলি করার কথা যা ছাড়া গুলিই ছোঁড়া যায় না। কিন্তু ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি সন্ধে ছটার রোল কলে সেপাইরা ওই পার্কাশন ক্যাপ  নিতে অস্বীকার করে।তাদের যুক্তি যতক্ষণ না সন্দেহ নিরসন হচ্ছে তারা কার্তুজ নেবেই না।এক দেশী অফিসার ,সুবেদার মেজর শেখ মুরাদ বক্স তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে সন্দেহ নতুন কার্তুজ নিয়ে আর সেপাইদের গুলি ছুঁড়তে বলা হয়েছে আগেকার কার্তুজে।সেপাইরা শুনবে না , তাদের যুক্তি দুরকমের কার্তুজই আছে ,কলকাতা থেকে আনা কার্তুজই যে ব্যবহার করতে হবে না তার গ্যারান্টি কোথায় । সুবেদার মেজর ডিভিশনের অস্ত্রাগার থেকে সব কার্তুজ আনালেন কিন্তু সেপাইরা দুধরণের কার্তুজের আলাদা আলাদা কাগজ নিয়ে বা অন্য অনেক কিছু নিয়ে তফাৎ করতে থাকে । যত মিলিয়ে দেখে ততো সন্দেহ বাড়ে তাদের । বেগতিক দেখে সুবেদার অন্য দেশী অফিসারদের বলেছিলেন , “সকাল আটটার রোল কলের আগে কথা বলে সব মিটিয়ে আসবে।“
     সবাই সেলাম ঠুকে চলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করতে থাকে ।বহরমপুরের ছাউনির দেশী সেপাই ব্যারাকগুলো ছুড়ে গুজগুজ ফুসফুস ক্রমে বাড়তে বাড়তে গুনগুন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে আর দিন ঢলে রাতের কোলে যেতে না যেতে দেখা যাচ্ছে সবাই এক জলাধারের চারপাশে জড় হয়েছে । দেশী সেপাইদের বড় অংশটাই উচ্চ বর্ণের হিন্দু ।পলাশীর পর থেকে ইংরেজরা যত কূট আর আগ্রাসী হয়েছে ততোই তারা দেশী ফৌজের জোগাড় বাড়ায় বাংলা –বিহারের সীমানা ছাড়িয়ে অওধ অঞ্চল –পূর্ব উত্তর প্রদেশের, লখনৌয়ের আশপাশের জেলাগুলো থেকে রাই বেরিলি , সালোন প্রতাপগড় ,সুলতানপুর ,উন্নাও , ফৈজাবাদ , গোরাখপুর আর বাহরাইচ।দিন ঢলে রাতের দিকে এগোচ্ছে , গোধূলির আলো এসে পড়ছে সেই জলাধারের চারপাশে যেখানে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা মাইয়ার জল এসে জমে আর এক গঙ্গা মাইয়ার প্রতিরূপ সে , তার জলও লাল হয়ে উঠেছে ।সবাই ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছে সেখানে ।কেউ একজন বলে উঠলো,” সবাই ব লো ! গঙ্গা  মাইয়ার জল ছুঁয়ে ব লো , কসম খাও কৌ মের ,আমারা সেপাইরা , কোম্পানির সেপাইরা কেউ জাত –ধম্ম খোয়াবোনা। সকলে বলো। '' সকলে সমস্বরে বলে উঠলো ," কিছুতেই না ,কার্তুজ নেবো না। '' একটা গদর –মহাবিদ্রোহের আভাস গোধূলির আলোতে পষ্ট ফুটে উঠছে । এরপর বহরমপুরের ছাউনির আশেপাশে আধো অন্ধকারে একের পর এক পঞ্চায়েত বসতে থাকে কীভাবে কী করা যায় আর তার খবর কি দেশি অফিসাররা জানতে পারে না ? পুরোটা গোপন থাকেনি ।ঠিক  খবর চলে গিয়েছিল অ্যাডজুটান্ট লেফট্যানেন্ট ম্যাকঅ্যান্ড্রু সাহেবের কাছে আর তিনি তক্ষুনি মিচেল সাহেবকে রিপোর্ট করেন।  সাত থেকে আটটার মধ্যে কমান্ড্যান্ট মিচেল সাহেব দেশী অফিসারদের ধরে পড়লেন ," শোনো , যে কার্তুজ কাল দেয়া হবে , সব আগে এখানে যারা ছিল, এক বছর আগে ছিল , সেই সাত নম্বর নেটিভ ইনফেন্ট্রির সেপাইদের মধ্যে থেকে বাছাই কারিগররা বানিয়েছে। তাদের চেনো না তোমরা।''
    - হ্যাঁ স্যার। বিলকুল চিনি।  
    - তবে ?
    - হ্যাঁ স্যার , বিলকুল হুজুর।
    - তবে সবাইকে গিয়ে বলবে, যা জান পেহচান লোকেদের হাতে বানানো, সেই কার্তুজ হারাম হবে কী করে ?
    - সচ বাত হুজুর।  
    - এটাই বোঝাবে সবাইকে। যে নিতে অস্বীকার করবে তার কপালে দুঃখ আছে।
    -  হ্যাঁ স্যার।  
    - কপালে দুঃখ আছে যে প্রথম নিতে অস্বীকার করবে তার , কোর্টমার্শাল হবে।  চীন বা মালয়ের জঙ্গলে পাঠিয়ে দেব। ডিসপার্স।
    মিচেলের তড়পানির সময় কিছু সেপাই চারপাশে জড়ো হতে শুরু করেছিল , তাদের শক্ত শক্ত চোয়ালের দিকে চেয়ে দেশী অফিসাররা সাহেবের চারপাশে সুরক্ষা বলয় তৈরি করে হুজুর মাই –বাপ করতে করতে সরিয়ে নিয়ে যায়।রেগে লাল লেফ্টেন্যান্ট কর্নেল ডব্লিউ সেন্ট এল মিচেল তড়পাতে তড়পাতে চলে গেলেন শুধু নয় অ্যাডজুটান্টকে আদেশ করলেন  এগারো নম্বর ইররেগুলার ক্যাভেলারির প্রধান ক্যাপ্টেন ডব্লু সি আলেক্সান্ডারকে খবর দিতে যে তিনি যেন  তার ঘোড়সওয়ার দল নিয়ে পরের দিন সকালের প্যারেডে ঊনিশ নম্বর ইনফ্যানট্রির প্যারেডের মাঠে ভোর ছটার মধ্যে হাজিরা দেন আর সঙ্গে থাকুক সেনা ছাউনির কামানগুলো।
    এই সব আদেশের কথা ইতিমধ্য টগবগ করে ফুটতে থাকা সেপাই ব্যারাকগুলোতে পৌঁছলে যা হবার তাই হলো। ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি রাত দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির ডিভিশনের অস্ত্রাগার -বেল অফ আর্মস সেপাইদের দখলে চলে যাচ্ছে , তারা তালা ভেঙে বন্দুক রাইফেল নিয়ে পজিশন নিয়ে বসে গেলো। হৈহৈ রব আর মিলিটারি ড্রামের আওয়াজ সাহেবদের বাংলো অবধি পৌঁছল।শুরু হচ্ছে তৎপরতা, মিচেল আর আলেক্সান্ডারের ঘোড়সওয়ার  দল আর কামান নিয়ে    ইনফ্যানট্রির প্যারেডের মাঠ ঘিরে ফেলতে মাঝরাত হচ্ছে ।সেপাইদের অস্ত্রসংবরণ করতে বললে তারা ঘোড়সওয়ার দল আর কামান সরিয়ে নেবার শর্ত দেয়। মিচেল সেপাইদের দিকে তেড়ে যাবার উপক্রম করলে দেশী অফিসররা টেনে  ধরে বলে ,”কী করছেন হুজুর ! গুলি করে দেবে ।“ শুনে সাহেবের সম্বিৎ ফেরে ।শেষে ঘোড়সওয়ার দল আর কামান সরিয়ে নিলে উত্তেজনা কমে,সেপাইরা একে একে বন্দুক রাইফেল জমা দেয় ।এক উত্তেজক রাত কেটে আসে পরের  দিন সাতাশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন সাধারণ রেজিমেন্টাল প্যারেডে গুলির ভাণ্ডার থেকে কার্তুজ নিয়ে তা খুলে দেখিয়ে বোঝাতে গিয়ে মিচেল ব্যর্থ হলেন সেপাইরা সেই আবার দুরকম কার্তুজের কাগজের তফাৎ নিয়ে তাদের সন্দেহের  যুক্তিতে অটল।  সাতাশ আর আঠা শে ফেব্রুয়ারি দুদিন ধরে সেপাইরা বেল অফ আর্মস ঘিরে বসে তবে ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করেনি ।
    মিচেল সাহেব নিজের হাতে না রেখে কলকাতায় রিপোর্ট পাঠিয়ে সাতাশ তারিখেই কোর্ট অফ ইনকোয়ারি বসিয়েছিলেন যারা মাথা করা হচ্ছে আলেক্সান্ডার সাহেবকে  , সে ইনকোয়ারির কাজ চলে সাতই মার্চ অবধি। সেখানে লেফট্যানেন্ট কর্নেলের সাহেবের মাথা গরম করে তড়পানি ,ঘোড়সওয়ার আর কামান আনার প্ররোচনায় সেপাইদের উত্তেজনা -এসব  আলোচনা হলে কী হয় পুরো দোষটা পড়ে  সেপাইদের ঘাড়ে। তবে বোঝা যাচ্ছে এনফিল্ড কার্তুজের ব্যবহার নিয়ে সেপাইদের অসন্তোষ ধিকি ধিকি জ্বলতে শুরু করে বেশ কয়েক মাস  আগে থেকেই ,  লোটায় জল খাওয়া নিয়ে খালাসি আর ব্রাহ্মণের ক্যাঁচালের অনেক আগেই। শিগ্রি সিদ্ধান্তের মোড় ঘুরতে শুরু করবে :যতই হোক ,মিচেল আর আলেক্সান্ডার কোম্পানির তরফে তাদের মাই বাপ , তাঁরা কী করবেন , কী বলবেন তাতে নেমকহারাম সেপাইদের কী ? তারা আড়ি পেতে শুনে যা করলো তার মাপ নেই !
    ব্যারাকপুর আর কলকাতার কোম্পানি বাহাদুরের কর্তারা ঠিক করলেন গোটা ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রিকে ভেঙে দেওয়া হোক। সেটা করতে গেলে তাদের কুচ করিয়ে ব্যারাকপুরে এনে চারপাশে অন্য রেজিমেন্টের সতর্ক পাহারা লাগিয়ে সর্বসমক্ষে করতে লাগে। জোগাড়যন্ত্র করে  সেপাইদের বহরমপুর থেকে রওনা করিয়ে ব্যারাকপুরে আনা  হচ্ছে একত্রিশে  মার্চ।
    কলকাতার গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের তরফে  তাদের আসার পথেই মার্চের সাতাশ তারিখ  ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয় । আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল সেপাইরা ব্যারাকপুরে পৌঁছলে , অন্য রেজিমেন্টের সব সেপাইদের উপস্থিতিতে এক ত্রিশে মার্চ পড়ে শোনানো হয়েছিল ভেঙে দেওয়ার খবর। সেপাইরাও বোধ হয় ফিরিঙ্গী উর্দি ছেড়ে বাঁচে তবে বহরমপুর থেকে আসার রাহাখরচ তারা পেয়েছিল বলেই জানা যাচ্ছে ।আগেই জানা গেছে ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি খবর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভারতের অন্য সমস্ত নেটিভ সেপাইদের রেজিমেন্টগুলোয় প্রচারের ব্যবস্থা হয়েছিল।

    ব্যারাকপুরের ঘটনা –মঙ্গল পাণ্ডের শাহাদত
    আওয়াজ আর শব্দের সংকেতের মতো মঙ্গল পাণ্ডের শাহাদাতের সাংকেতিক তাৎপর্য আছে বলে গদরের সেনানী আর ফিরিঙ্গী দমনকারী সবাই মানে। তাঁর নামের অপভ্ৰংশ -পান্ডি বলতে সাহেবরা সাধারণভাবে বিদ্রোহী সেপাই বোঝাচ্ছে। তাই মঙ্গল পাণ্ডে এক নন। লাখো মঙ্গল আছে , তারা শহীদ হয় বা হয়না।
    - মঙ্গল পাণ্ডেরা ?
    - হ্যাঁ।
    - তালেগোলে বীর নয় তো ?
    - তাতে কী এলো গেলো তাঁর যে সংকেত হয়ে রয়ে যায়।  
    - তবে বলছো বিপ্লবী শহীদ মঙ্গল পাণ্ডে ?
    ইতিহাসকার জন উইলিয়াম কে হুগলী নদীর পাড়ে কোম্পানি ফৌজের প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের  কেন্দ্র এক স্নিগ্ধ,আনন্দময়,বসবাস উপযোগী সেনা ছাউনি হিসেবে ব্যারাকপুরের বর্ণনা করলেন। কলকাতা শহরের ধুলো আর চিৎকার চেঁচামেচির   ষোল মাইল দূরে ওখানে দুদণ্ড শান্তিতে  কাটাতে অসামরিক সাহেব –মেমও আসে ফুর্তির লোভে।ঊনিশ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি  ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত  নেওয়ার দুদিনের মাথায় সেই সাহেবি গ্যারিসন টাউন বদলে গেলো।
    সেদিন সকাল থেকে সব যখন ঠিকঠাকই চলছে  হঠাৎই বিকেল চারটে নাগাদ চৌত্রিশ নম্বর নেটিভ   ইনফ্যান্ট্রির জনৈক সেপাই মঙ্গল পাণ্ডেকে তলোয়ার -মাস্কেটে রণসাজে সেজে ,ভাঙে চুরচুর হয়ে রেজিমেন্ট্যাল ময়দানে দেখা যাবে। ফিরিঙ্গী ফৌজি উর্দি গায়ে চাপিয়ে পাতলুনের বদলে ধূতি পরেই তিনি চলে এসেছেন আর  নিজেই কম্যান্ডারের মতো হুকুম করছেন প্যারেডের ব্যান্ড বাজাতে আর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন মাঠময়।  ব্যান্ডবাদক বুঝতেই পারে না কিসের ব্যান্ড বাজবে  আর তার আদেশ এক দেশী সেপাইবা দিতে যাবে কেন , এক নেটিভ সেপাই, যার কাজ হলো সাহেবদের হুকুম তামিল করা সে হঠাৎ হুকুম দেবে কেন ? সেসব তো গেলো ছবির কথা ,সম্ভাব্য যা দেখা গিয়েছিল সেদিন কিন্তু মঙ্গল পাণ্ডে কী কিছু বলছিলেন , বলেই চলেছিলেন যার মানে আছে, নইলে আর হুমুকবরদারি হবে কী করে ? মঙ্গল পাণ্ডে যা বলেছিলেন তার লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট, তার লক্ষ্য ছিল দেশী সেপাইরা ,’’ সামনে আয়, ব্যাহেনচোতরা, সাহেবরা আসছে ! তোদের ধম্মের  কসম ! ওই কার্তুজ কাটলে জাত -ধম্ম সব যাবে ! তৈয়ার হো ! বেরিয়ে আয় সব্বাই ! তোরা আমাকে তাতালি ব্যাহেনচোতরা, নিজেরা কেটে পড়বি !’’ "সামনে আও রে ব্যাহেনচোদওয়া, সাহেব লোগ আইল হই! তোর ধরম কসম! ওই কার্তুজ কাট দিলে জাত-ধরম সব নাস্ত হো যাই! তৈয়ার হো যা রে! সব বাহার নিকল আও! তোরা হামারে তাতালি ব্যাহেনচোদ বোলতা, আপনা কাট কে পলাই যাইহা!"
    মঙ্গল পাণ্ডেজির আহ্বান ব্যারাকপুর সেনা ছাউনির তৈরি করা সাহেবী কেতা ,কলোনির কেতাকে পেড়ে ফেলতে লাগে।আর সাহেবরা ছেড়ে দেবে কেন? আশপাশের পাহারায় যে সেপাইরা ছিল তারা কেউ কিছু বলছে না মঙ্গল পাণ্ডেকে কিন্তু তাঁর সঙ্গে ভিড়ে যাবারও কোনো লক্ষণ দেখা যায় না সেপাইদের মধ্যে।এ ধরণের খুল্লাম খুল্লা চেতাবনি দেওয়া সেপাইদের পক্ষে অত্যন্ত গর্হিত এরকমও মনে করে থাকবে কেউ কেউ আর তাদেরই একজন জনৈক নায়েক গিয়ে সার্জেন্ট মেজর হিউসন কে রিপোর্ট করে ,” স্যার এক ভয়ানক কাণ্ড!’’
    • কী ?
    • সেপাই মঙ্গল ভাঙ খেয়ে  মিউটিনির কল দিচ্ছে হুজুর।
    • - কিসের কল ?
    • - মিউটিনির কল হুজুর , সে এক হুজ্জুতি কাণ্ড স্যার তলোয়ার -বন্দুক তাক করছে আর চেঁচাচ্ছে।
    • - সব্বনাশ ! কী বলছে ?
    • - বারবার বলছে স্যার !
    • - কিসের কথা ?
    • - কার্তুজের কথা , জাত  যাবার কথা হুজুর।
    • - আর তোমরা দাঁড়িয়ে দেখছো ! ডরপুক ! চলো দেখি !
    ফৌজি ধরাচুড়ো পরে হাতিয়ারবন্দ হয়ে হিউসন সাহেব চললেন প্যারেডের মাঠে। সেখানে প্রথমে তিনি কোম্পানির জমাদারকে ধরেন ,'' এক্ষুনি পাকড়াও বেয়াদবকে !'' জমাদার আমতা আমতা করতে থাকে ," আমি কী করব হুজুর ! নায়েক গেছে এডজুট্যান্ট সাহাবের  কাছে ,হাবিলদার গেছে ফিল্ড অফিসার সাহেবের কাছে। আমি কী একা ধরতে যাবো হুজুর ?" হিউসন জমাদারকে সশস্ত্র সেপাই নিয়ে  পিছু পিছু আসতে বলে এগোলেন। পরে তিনি বলছেন সেপাইরা আসতে গাঁইগুঁই করতে থাকে আর জমাদারও তাদের হুকুম করেনি গুলি ভরে সাহেবকে কভার করতে। এই কভার ছাড়া এগোনোর ফল হলো মারাত্মক ,বেপরোয়া মঙ্গোল পাণ্ডের ছোঁড়া গুলি তাঁর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় , সাহেব শিউরে উঠে বেল অফ আর্মসের আড়ালে কভার নিলেন। টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিছু সেপাই মঙ্গল পাণ্ডেকে অস্ত্রসংবরণ করার কথা বোঝাতে গিয়ে গালি খাচ্ছে। এইসময় সেখানে এডজুট্যান্ট লেফট্যানেন্ট বাউ ঘোড়ায় চড়ে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি আরো ঘোরালো হয়ে উঠলো। বাউ চিৎকার করতে করতে আসছিলেন ,’’ লোকটা কোথায়! লোকটা কোথায়!” আড়াল নেওয়া হিউসন তাঁকে বলতে থাকেন ,” আপনার বাঁয়ে স্যার! বায়ে! ডান দিকে আসুন , মারা পড়বেন যে! সেপাইটা গুলি করে দেবে!’’ হিউসন যা ভাবছিলেন তাই হ লো , মঙ্গল পাণ্ডের গুলি গিয়ে লেগেছিল বাউয়ের ঘোড়ার গায়ে আর সে সওয়ার নিয়ে উল্টে পড়ে। বাউ ঘোড়ার জিনের সঙ্গে লাগানো হোলস্টার  থেকে একটা  পিস্তল নিয়ে ছুটলেন গুলি ভরায় ব্যস্ত মঙ্গলের দিকে ।বাউ কুড়ি গজের মধ্যে পৌঁছে গুলি চালালে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।তখন তিনি তলোয়ার বের করে তেড়ে গেলেন । অর্ধেক যেতে না যেতে মঙ্গলকেও তলোয়ার বার করে তেড়ে আসতে দেখা গেলো। বিপদ বুঝে বাউ পেছনে তাকিয়ে হোলস্টারের আর একটা পিস্তল নেবার মতলব করতে গিয়ে দেখেন ঘোড়া ছুটে  পালিয়েছে। মুখোমুখি তলোয়ারের লড়াই লেগে যায় আর সেই দেখে হিউসনও খোলা তলোয়ার নিয়ে সাহায্যে এগিয়ে আসেন। পরের ঘটনা কী ঘটে তা হিউসন আর বাউয়ের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়। মঙ্গলের তলোয়ারবাজির ওস্তাদিতে হিউসন এক আলতো খোঁচা খাচ্ছেন কিন্তু জোরে নয় সে আঘাত। মারটা  খেললেন বাউ। তারপর আরেক খোঁচা খাচ্ছেন হিউসন ,  সেসময় কোনো অজানা এক সেপাই  তাঁকে মাস্কেটের কুঁদো দিয়ে বার দুই ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় তার পরনে ছিল রেজিমেন্ট্যাল উর্দি। তারপর হিউসন ছুটে গিয়ে মঙ্গলের কলার ধরলে  তলোয়ার মারামারি শুরু  হচ্ছে আর তখন আবার তাঁকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। বাউ সাহেব বাঁ হাতে রীতিমতো অবশ করা কোপ খেয়েছিলেন ফলে এক হাতেই তাঁকে লড়তে হচ্ছিল।  আবার তিনি  গলায় জোরালো কোপ খাচ্ছেন আর পেছন থেকে কেউ তাঁকে মাস্কেটের কুঁদো মেরে মাথায় আঘাত করছে। দুই সাহেব হয়তো মারাই পড়তেন যদি না শেখ পল্টু বলে এক সেপাই পেছন  থেকে মঙ্গল পাণ্ডেকে পাঁজাকোলা করে  টেনে ধরতো। সুযোগ বুঝে ওঁরা পালিয়ে বাঁচেন। পল্টুর হাত থেকে মঙ্গলকে  ছাড়ানোর জন্য তার কানের গোড়ায় রীতিমতো বন্দুক ঠেকাতে হয়।
    ইতিমধ্যে বেল অফ আর্মসের আশপাশে অন্য রেজিমেন্টের সেপাইরাও ভিড় করে এসেছের। মেজর জেনারেল হারসির কাছে খবর হতে তিনি চৌত্রিশ নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির , মঙ্গল পাণ্ডে যার সঙ্গে যুক্ত তার কম্যান্ডিং অফিসার লেফট্যানেন্ট কর্নেল হুইলারকে আদেশ দিচ্ছেন অবিলম্বে বাগী সেপাইকে গ্রেফতার করতে অন্যথায় গুলি করে মারতে। হুইলার জমাদারকে আদেশ করলে প্রথমে সে বলে ," কেউ রাজি হবে না স্যার।'' তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আবার অর্ডার করতে জমাদার ঠেলেঠুলে সেপাইদের পাঠালে তারা মাঝপথে গিয়ে আবার বেঁকে বসছে।হুইলার সাহেব পরে কোর্ট অফ এনকোয়ারির সামনে জানিয়েছিলেন যে তিনি এক উর্দি না পরা নেটিভ সেপাইয়ের কাছে জানেন যে মঙ্গল পাণ্ডে ব্রাহ্মণ হওয়ায় কেউ ব্রহ্মশাপের ভয়ে ব্রহ্মহত্যার অখণ্ড নরক বাসের ভয়ে তাঁকে ধরতে এগোয়নি কারণ এগোলেই সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। হুইলার আ রো জানাচ্ছেন যে কোনো মারমুখী সেপাইয়ের সামনে ইউরোপীয়কে পাঠিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে তিন চাননি। অতএব কম্যান্ডিং অফিসার হয়ে পড়েন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
    এরমধ্যে হাতে পায়ে রক্তমাখা অবস্থায় এক লেফট্যানেন্ট ,হয়ত ঘোড়ার চড়েই হবে, হাঁফাতে  হাঁফাতে আসে জেনারেল হারসির কাছে। তার অবস্থা দেখে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে হারসির  মাখায় গেলো খুন চেপে। তিনি অন্য নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির দুই অফিসার ,তাঁর দু ছেলেকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে অকুস্থলে চলে এলেন। সেখানে তখন  ব্রিগেডিয়ার চার্লস গ্র্যান্ট , স্টেশন কম্যান্ডার  মেজর রস সহ সব হোমড়াচোমড়ারা দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোচ্ছেন। জেনারেলকে বলা হচ্ছে  সেপাইরা  রাজি না হওয়ায় মঙ্গলকে গ্রেফতার করা যায়নি। এইসব দেখে ও শুনে  হারসির মেজাজ নিশ্চয়ই আরো বিগড়ে গিয়ে থাকবে তিনি নিজেই পিস্তল হাতে সেপাইদের দিকে এগোচ্ছেন ,'' দেখি কে কথা না শোনে!" বলতে বলতে ।কেউ একজন তাকে পেছন থেকে  বলেছিল ," স্যার ,ওর মাস্কেটে গুলি ভরা আছে!" হারসি বললেন ,"মারো গুলি !" তাঁর এক ছেলে  সাবধান করলো ," বাবা , তোমার দিকে নল তাক করছে কিন্তু !' উত্তরে সাহেব বলে উঠেছেন ," জন , আমাকে আগে গুলি করলে ওকে নিকেশ করবি তুই !'' এই বলে হারসি সোজা জমাদারের  দিকে পিস্তল ধরে বলছেন ,''প্রথম যে আমার আদেশ অমান্য করবে যার জান যাবে!কুইক মার্চ !''এই বলে হারসি মঙ্গল পান্ডের দিকে এগোচ্ছেন আর দেখা গেলো অন্য সেপাইরা তাঁকে কভার করতে এসে গেছে। তার দুই ছেলে জমাদারকে কভার করেছিল। টানটান উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গল পাণ্ডের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা গেলো যা হাসির বর্ণনা থেকে পরে জানা যাচ্ছে।আর উপায়ন্তর না দেখে মঙ্গল পাণ্ডে হাতের মাস্কেট নিজের বুকেই ঠেকিয়ে গোড়ালি দিয়ে ঘোড়া  টিপে দিতে দড়াম করে গুলি বেরিয়ে বন্দুকটা ঘুরে গুলি গিয়ে  বুক থেকে কাঁধ গলা ফুঁড়ে বেরিয়ে তাঁকে পেড়ে ফেলে।তাঁকে ঘিরে তখন চারপাশে এক ব্যূহ আর সেই ব্যূহ থেকে আওয়াজ ওঠে ," নিজেকে গুলি করেছে। " এক শিখ সেপাই মঙ্গলের রক্তাক্ত দেহের তলা থেকে সাহেবদের খুনে রাঙা  তলোয়ারটা বার করে নিয়ে আসে। মঙ্গল পাণ্ডের তলোয়ার। তবে ওই আঘাতে মঙ্গল মরেননি,তাঁকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয় । যথারীতি সুস্থ করে তুলে এক  অনুষ্ঠানিক বিচারে  মঙ্গলের ফাঁসি হচ্ছে আটয়ই  এপ্রিল বা মতান্তরে ছয়ই এপ্রিল আঠেরোশো সাতান্ন। যে জমাদারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে , যে খানিকটা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল মঙ্গল আর সাহেবদের মধ্যে, আরেক পূর্বাইয়া ব্রাহ্মণ  সেই ঈশ্বরী পাণ্ডেরও বিচারে ফাঁসি হয় একুশে এপ্রিল।
     ততক্ষণে  মঙ্গল পাণ্ডের মতো আরো অনেক অনেক সেপাই নিজের কৌমের জন্য, জাত -ধম্মের জন্য হলেও  ,গোটা দেশের  সব কৌমের এক মোর্চা বানিয়ে ফিরিঙ্গী শাসনের খেলাপ মহাবিদ্রোহের ব্রতে সামিল হতে সংকল্প করে ফেলেছে গোটা উত্তর ভারত জুড়ে যার কথাই হতে থাকবে শুধু।আর হতে থাকবে বেগম –রানী- কম্যান্ডারদের কথা।  

    অতিরিক্ত তথ্যসূত্র

    ১) The Year of Blood , Essays on the Revolt of 1857, Professor Rudrangshu Mukherjee.
    ২) The Mutiny Outbreak at Meerut ,in 1857, JAB Plamer.
    ৩) Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India, Professor Ranajit Guha

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                       

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | |
  • ধারাবাহিক | ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে প্রতিক্রিয়া দিন