দেখা না দেখায় মেশাঃ পর্ব ১৪
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না।
দশ সেকেন্ড। তারপর দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে শুকনো গলায় বলি—ভেতরে আসুন।
ওরা ঠিক আমার অনুমতির তোয়াক্কা করেনি।
আমি মুখ খোলার আগেই ওরা চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে এসে গেছে। সোফায় গা ঠেলাঠেলি করে বসে পড়েছে। হাসিহাসি মুখগুলোয় কনফিডেন্স উপচে পড়ছে।
শুধু চতুর্থ ব্যক্তি—চশমা পড়া বয়স্ক ব্যক্তিটি-- যেন অপ্রস্তুত। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বললেন না, দাঁড়িয়ে রইলেন।
--মেশোমশায়, ইলেকশনের আগে ভোটার লিস্ট ঝাড়াই বাছাই হওয়া দরকার। কে কোভিডের সময় মায়ের ভোগে গেছে আর কে ঘরবাড়ি বেচে অন্য রাজ্যে বা বিদেশে চলে গেছে সেগুলো চেক করে নাম কাটতে হবে। আবার যাদের এ’বছর আঠেরো বছর পূর্ণ হোল সেইসব নতুন ভোটারদের নাম লিস্টিতে তুলতে হবে।
আশা করি, আপনার থেকে সবরকম সহযোগিতা পাব।
এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা বলে ছেলেটি হাঁফাতে থাকে, এদিক ওদিক তাকায়, ঠোঁট চাটে।
ছেলেটার বয়েস কম, মনে হয় আঠেরো পেরিয়েছে অল্পদিন আগে। কিন্তু কথাবার্তার ভঙ্গিতে কেমন একটা অশালীন ভাব।
আমি ভেবে নিই যে এদের সংগে কোনরকম কথা কাটাকাটিতে যাওয়া উচিত হবে না।
--জল খাবে?
--হ্যাঁ মেসোমশায়। একই কথা এতগুলো বাড়িতে বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গেছে।
আমি কথা না বাড়িয়ে ফ্রিজ থেকে একটা জলের বোতল বের করে আনি আর দুটো গেলাস খাওয়ার টেবিল থেকে তুলে নিই। ওগুলো ওদের সামনে কফি টেবিলে রেখে তাকাই। অর্থাৎ যার দরকার সে জল খেতে পারে।
ছেলেটা চোঁ চোঁ করে এক গেলাস জল খায়। তারপর আমার দিকে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে বলে—আরে আপনি কেন এত কষ্ট করতে গেলেন?
ঘরে আর কেউ নেই? কোন কাজের মাসি? এই বয়সে হাত পুড়িয়ে খান! কেন? আমার চেনাজানা লোক আছে, বিশ্বস্ত। ওর দিদি আমাদের বাড়িতে রান্না করে।
দরকার হলে বলবেন। মাইনে সবাই যা দেয় তাই দেবেন।
--ঠিক আছে, দরকার হলে বলব’খন। এবারে বল—তোমরা কী কী ইনফর্মেশন চাও। আমি ভোটার কার্ড নিয়ে আসছি। তাতে এপিক নম্বর দেয়া আছে।
সেটা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট খুললে যা যা দরকার সব খুঁটিনাটি তথ্য পেয়ে যাবে।
তোমাদের খাতায় গত ইলেকশনের পোলিং বুথের সেন্টার, পার্ট নম্বর যা লেখা তার সংগে মিলিয়ে নিও। নামের বানান, বাবার নাম, জন্মতারিখ সব দেখে নিও।
ছেলেটা কিছু ভেবে বয়স্ক ভদ্রলোককে বলে—আরে, মিহিরদা! দাঁড়িয়ে কেন? বসে পড়ুন। আপনার খাতা খুলে এ’পাড়ার ভোটারদের লিস্টি বের করুন।
মেসোমশায় একেবারে লাইনের কথা বলছেন। চেক করার কাজটা আপনাকেই করতে হবে।
আমি উঠতে যাব এমন সময় তৃতীয় ছেলেটি বাধা দেয়। --তাড়া কিসের? আরেকটু বসুন। আপনাকে একটা কথা বলি। পটলার কথায় কান দেবেন না।
ওদের বাড়ির ঝিয়ের মেয়েকে কাজে লাগাবার আগে দু’বার ভাববেন। ওরা দশ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। এখনও এদেশের নাগরিকত্ব পায় নি।
পরে ঝামেলা হতে পারে।
--মানে?
--মানে ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা, মধ্যিখানে চর। তারই মাঝে বসে আছেন শিব সদাগর’। আপনি হলেন সেই শিব সদাগর।
ভালমানুষ, সহজে সবাইকে বিশ্বাস করেন। চারদিকে কী চলছে তার খবর রাখেন না।
--কী চলছে?
--দেখুন, ওপার থেকে সমানে লোকজন এপারে চলে আসছে। ইছামতী নদী পেরিয়ে বনগাঁ বসিরহাট দিয়ে ঢুকে পড়ছে। দশ রকমের লোক, দশ রকম ধান্ধা।
গরু পাচার, চোরা কারবার, ইধার কা মাল উধার। কেউ আসছে চিকিৎসা করাতে। পোসেনজিতের শঙ্খচিল সিনেমা দেখেন নি?
বাইপাসের ধারে একটা হাসপাতাল তো ওদের চিকিৎসার জন্যে আলাদা বুকিং কাউন্টার খুলে দিয়েছে—সে’খবর রাখেন?
এবার কায়দা করে চুল ছাঁটা একটু ভাল জামাকাপড় পরা ছেলেটি মুখ খোলে।
-- হ্যাঁ মেসোমশায়। শুধু গরুপাচার, চোরাচালান আর হাসপাতালে ডাক্তার দেখানো নয়। আজকাল নানারকম লোক কাজ খুঁজতে আসে।
পুরুষমানুষ মেয়েমানুষ সব। ইছামতী বনগাঁর কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে। আর তাদের সহজ শিকার আপনার মত একা থাকা বয়স্ক মানুষেরা।
এরা ভালো ব্যবহার দেখিয়ে বয়স্ক মানুষের মন দুর্বল করে। তারপর রাত্তিরে বাড়ির কর্তা ঘুমিয়ে পড়লে ভেতর থেকে দরজা খুলে দেয়। সুপারি নেয়া কিলার ঢোকে।
তারপর যা হয় আর কি! মালকড়ি হাতিয়ে নদী পেরিয়ে পগার পার। এমন কেস খুব কম নয়। আকছার হচ্ছে”।
আমি কিছু বলার আগেই ছেলেটা হাত তুলে বাধা দেয়।
“জানি আপনি কী বলবেন—অত সহজ নয়। আজকাল কেউ পুলিশ ভেরিফিকেশন না করে নতুন কাউকে কাজে লাগায় না। কিন্তু ভেবে দেখুন পুলিশ কী ভেরিফাই করবে? আধার কার্ড, প্যান কার্ড আর খাতায় নাম উঠেছে কিনা—এই তো? এগুলো তৈরি করা কি খুব কঠিন? তাই নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে ওগুলো ধরা হয় না”।
--ভাই, তুমি তো দেখছি অনেক কিছু জানো? জি কে বেশ স্ট্রং। কোন সর্বভারতীয় পরীক্ষার জন্যে তৈরি হচ্ছ?
ছেলেটি হাসে।
“না মেশোমশায়। আমার মামাবাবু আপনাদের থানার বড় অফিসার-- মিঃ হালদার। চেনেন নাকি”?
আমার চমকে ওঠা ওর নজর এড়ায় নি। এদের মতলবটা কী?
খানিকক্ষণ সবাই চুপ। বয়স্ক ভদ্রলোকটি আর একটি কাঁচের গেলাসে জল ভরে চুমুক দিতে দিতে তাঁর খাতার পাতায় ঝুঁকে পড়েছেন।
ছেলে তিনটে কিন্তু একদৃষ্টিতে আমাকে দেখছে।
--এবার আমার কথা শোন। তোমার মামাবাবুর সংগে আমার ভালরকম জানপহচান আছে। উনি একবার আমার বাড়িতে এসে চা খেয়ে গেছেন।
ওনাকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবে আমার বাড়িতে কোন কাজের লোক নেই- মেয়ে অথবা পুরুষ। আর রাত্তিরে আমি একা থাকি।
তাই দরজা খুলে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
খানিকক্ষণ সবাই চুপ।
চশমা পরা ভদ্রলোক খাতা থেকে মুখ তুলে একটা কাঁচের গেলাসে জল ঢেলে দুটো চুমুক দিয়ে ফের খাতার দিকে তাকিয়ে আছেন। গেলাসটা হাতে ধরা রয়েছে।
তখন দ্বিতীয় ছেলেটি বলে—রেগে যাচ্ছেন মেসোমশাই? বল্টুদা যা বলছে তা আপনার ভালোর জন্যেই। ঠিক আছে, কাজের কথাই হোক।
কই মিহিরদা, খাতা খুলেছ? মেসোমশাই নিয়ে আসুন আপনার ভোটার কার্ড।
আচ্ছা, একটু দাঁড়ান।
একটা নাম বোধহয় কাটতে হবে। রীমা মাসিমা বোধহয় প্রায় দু’বছর আগে দেহ রেখেছেন। আপনি নাম কাটার জন্যে এই ফর্মটা ভরুন। না না, ইংরেজি নয়, বাংলায়।
আপনাদের নাম আগে অন্য রাজ্যে ছিল, পরে ট্রান্সফার করিয়েছেন; ঠিক বললাম?
আচ্ছা, মাসিমার ডেথ সার্টিফিকেট? হুঁ, লোক্যাল ডাক্তার আর বোড়াল শ্মশানের কাগজ দেখছি। এগুলো যথেষ্ট নয়।
এগুলোর কপি জমা করে স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটি বা পঞ্চায়েতের থেকে পাকা সার্টিফিকেট নিতে হয়, তিন কপি। সেসব কই?
--নেই, করাই নি।
--কেন? করান নি কেন?
--মনের অবস্থা ভাল ছিল না। ভেবেছিলাম এগুলোই যথেষ্ট। এ নিয়ে কোন কথা উঠবে ভাবি নি।
--ভাবা উচিত ছিল। নইলে প্রশ্ন ওঠে।
--কিসের প্রশ্ন?
অন্ধকার ঘর থেকে রীমার কন্ঠস্বর ভেসে আসে—উচিত ছিল! উচিত ছিল! প্রশ্ন ওঠে! প্রশ্ন ওঠে!
ছেলেগুলো লাফিয়ে ওঠে। কফি টেবিল কাত হয়ে যায়। মিহিরবাবুর হাত থেকে জল ভরা গেলাসটা ছিটকে পড়ে। মেজেয় জল আর ভাঙা কাঁচের টুকরো!
ফের রীমার গলা—সত্যনাশ! সত্যনাশ! গন্দী আদত! গন্দী আদত!
ছেলে তিনটের চোখ বড় বড়, চেহারায় ভয়ের ছাপ। একজন আরেকজনের হাত খিমচে ধরেছে।
আমি চেঁচিয়ে উঠি—হে সিরি! স্টপ ইট!
সারা বাড়ি নিস্তব্ধ।
ওরা সোফায় বসে পড়ে।
--কে অমন চেঁচাচ্ছিল? বাড়িতে কে লুকিয়ে আছে?
--কেউ লুকিয়ে নেই। এটা আইপড, অ্যাপল কোম্পানির তৈরি গান শোনার যন্ত্র। এতে অনেক গান লোড করা থাকে। মালিকের হুকুম মেনে বেজে ওঠে, বন্ধ হয়।
ওটা ছিল আমার স্ত্রী রীমার। ও হিন্দি ও নানারকম ইংরেজি গান শুনতে ভালবাসত।
-- ঢপ দিচ্ছেন? গান কোথায়, ও তো আমাদের ধমকাচ্ছিল। আর কেউ আদেশ দেয় নি তো! নিজে নিজে--।
--ওর মালকিন ছিল রীমা। ও রীমার গলার স্বর কপি করত, ওটা ওদের স্বভাব বা ফীচার। কখনও কখনও অন থাকলে তোতাপাখির মত লাগসই বুলি আওড়ে দেয়, ব্যস।
আর মেসোমশায় বলে ডাকছ, আবার বলছ –ঢপ দিচ্ছেন! এটা কী রকম কথা বলার ছিরি! বাড়িতে বড়দের সংগে এভাবেই কথা বল নাকি?
--সরি মেসোমশাই। এই ছেলেটা স্কুলের বেড়া ডিঙোয় নি। ওকে মাফ করে দিন। আচ্ছা, একটা কথা। ওই মর্জিমাফিক গান শোনানো মেশিনটা একবার দেখাবেন?
ভাল লাগলে আমরাও একটা কিনে নেব না হয়।
--টাইটানিক সিনেমা দেখেছিলে? ওর গান শুনিয়ে দিচ্ছি।
আমি এখান থেকেই জোরে বলি—হে সিরি! প্লে টাইটানিক থিম সং। লাউডার।
একটি পুরুষ কন্ঠস্বর কিছু বলে। তারপর এক কিন্নরীর কন্ঠে গোটা বাড়িতে গমগমিয়ে ছড়িয়ে পড়ে –এভরি নাইট ইন মাই ড্রিম, আই সি ইউ, আই ফীল ইউ!
ছেলেগুলো চমৎকৃত।
আমি হালদারের ভাগ্নেকে বলি—কিনে নিও। তবে ২০২২ সাল থেকে অ্যাপল কোম্পানি নতুন কেনাবেচা বন্ধ করে দিয়েছে। মোবাইলে চেক কর। অনলাইনে সেকেন্ড হ্যান্ড কিনতে পারবে।
ঘরের হাওয়া বেশ স্বাভাবিক। আমি আলমারি থেকে ভোটার কার্ড আনতে পা বাড়াই। কিন্তু চটির তলায় কচকচ করে গুঁড়িয়ে যায় ভাঙা কাঁচের টুকরো।
আসলে মেজেয় জল পড়ে থাকায় ওগুলো দেখা যাচ্ছিল না।
ছেলেগুলো একটু অপ্রস্তুত।
আমি ফের গলা চড়াই, “শোন মোহিনী, ঘরটা সাফ করতে হবে। জল আর ভাঙা কাঁচ। কিছু একটা চটপট নিয়ে এস। নইলে কারও পা কাটতে পারে”।
ছেলেগুলো অবাক হওয়ার সময় পেল না। দ্রুত পায়ে ঘরে এসেছে মোহিনী। হাতে একটা ছোট বালতি মত আর ঘর মোছার লম্বা ডান্ডাওলা ওয়াইপার।
এসেই যন্ত্রের মত মেজে পরিষ্কার করতে লাগল। বাকি চারজনকে যেন দেখেও দেখছে না। ওরা এখন মোহিনীর চোখে নেই হয়ে গেছে।
সব সাফ করে চলে যাবার আগে আমাকে বলল --অবিনাশ স্যার। কোন কফি খাবেন? নেসক্যাফে না দেক্যাফ?
ওর গলার স্বর কি একটু কাঁপছে, নাকি আমারই মনের ভুল?
তাহলে ও বিপদের গন্ধ পেয়েছে। এটা সেই কোড! তবে ফার্স্ট ওয়ার্নিং। আমি ইশারা করলে গিয়ে ৯১১ ডায়াল করবে।
কিন্তু আগে এই ওয়ার্নিং কোড ও যান্ত্রিক গলায় বলত, স্বরে কোন ওঠানামা হত না। কোন আবেগ নেই।
যেন শেয়ালদা স্টেশনে অ্যামপ্লিফায়ারে শুনছি—লালগোলা আপ প্যাসেঞ্জার ন’টা বেজে কুড়ি মিনিটে প্ল্যাটফর্ম নাম্বার চার থেকে ছাড়বে।
কিন্তু এখন গলার স্বরে একটা কিছু ফুটে উঠছে। কী বলব তাকে? আশংকা? ভয়? উৎকন্ঠা?
ধ্যাৎ! ও কোন মানবী নয়, ওসব অনুভূতি কোত্থেকে আসবে? ওর জন্মদাতা প্রযুক্তিবিদ ওকে ওইসব দেন নি। যাক গে, ভালই করেছেন। নইলে আমার মুশকিল ছিল।
জানি, আমার রোবো সঙ্গিনী মোহিনী আমার থেকে দশ বা কুড়ি মিটার বৃত্তের মধ্যে আসা লোকের সম্বন্ধে আমাকে গন্ধ শুঁকে সতর্ক করে দেবে। কিছু কোড ওয়ার্ড বলবে। মনে মনে একবার আউড়ে নিইঃ
যেমন যদি বলে --কোন কফি খাবেন? নেসক্যাফে না দেক্যাফ?
তাহলে বুঝতে হবে লোকটা সুবিধের নয়। কোন বাজে মতলবে এসেছে।
যদি বলে -- আপনাকে উঠতে হবে না, আমি দেখে নিচ্ছি—তাহলে বুঝতে হবে আগন্তুক শারীরিক ক্ষতি করতে চায়। আমার উচিত এক্ষুণি উঠে একটা ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি দেয়া। যদি সেটা করি, তাহলে মোহিনী তক্ষুণি পুলিশের কন্ট্রোল রুমে ফোন করবে।
সে না হয় হল, জানি আমার তেমন কোন বিপদ হবে না। কিন্তু যদি হয়, তাহলে? মোহিনী রোবো পুলিশ ডাকল, কিন্তু পুলিশ আসতে আসতে যদি দফারফা হয়ে যায়? আর কোন প্রোটেকশন?
আছে। সাধারণ কেসে ও দুষ্টু লোকটার চোখে পেপার স্প্রে ছিটিয়ে দেবে।
বদমাসদের সংখ্যা একাধিক হলে বা তাদের হাতে কোন অস্ত্র থাকলে মোহিনী দুর্বৃত্তের পাঁচ মিটারের মধ্যে এসে ওকে আচমকা একটা হাই ভোল্টেজ শক দেবে, সঙ্গে আগুনের ফুলকি, যেমনটি ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপে দেখা যায়।
না, লোকটার কোন ক্ষতি হবে না।
কিন্তু আচমকা এই কাউন্টার হামলায় দুষ্টু লোক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, সম্ভবতঃ, পালিয়ে যাবে।
এদের সংগে কী করা উচিত? এখনও এমন কিছু করে নি যে বুঝতে হবে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, এবার হামলা হবে।
কিন্তু ওরা কি হামলার আগে জানিয়ে দেবে—এবার কিন্তু হামলা করব মেসোমশাই। আপনাকে অ্যাটাক করব!
ধ্যাৎ! ওদের বয়ে গেছে। কিন্তু আমি ওদের কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি? মোটিভ কী?
তবে ছেলেগুলো ওকে দেখে এবং ওর আমার জন্যে কফি বানিয়ে আনার প্রস্তাবে চমকে গেছে।
ওদের চোখ বারবার ঘুরে যাচ্ছে –মোহিনী থেকে অবিনাশবাবু, ফের অবিনাশ থেকে মোহিনী।
আমিই কি খানিক অপ্রস্তুত হইনি? চাইনি মোহিনী ওদের সামনে আসুক। কাঁচের গেলাস ভেঙে জলশুদ্ধু মেজেতে না পরলে হয়ত ডাকতামই না।
ফর্ম ভরা হলে ওদের বিদেয় করে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিতাম।
আমি দাঁড়িয়ে থাকা মোহিনীকে বলি—না না, এখন কফি খাব না। তুমি যাও।
কিন্তু মোহিনী সরে না।
ও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হালদারবাবুর ভাগ্নে বলে পরিচয় দেওয়া ছেলেটির দিকে। ছেলেটারও বলিহারি! একবারও চোখ সরায় নি মোহিনীর থেকে—সমানে সমানে চলছে।
অন্য ছেলেটি মিহিরবাবুকে বলে—এই বাড়ির ভোটার লিস্টে এনার নাম আছে? মানে স্বর্গবাসী রীমা মাসিমার নাম ছাড়া কোন মহিলার নাম?
মিহিরবাবুর গলা দিয়ে একটা অস্ফুট নেতিবাচক শব্দ বেরোয়।
--তাহলে? এনার নাম ঠিকানা? কই মেসোমশায়! এনার আইডি ও অ্যাড্রেস প্রুফ? একেই লুকিয়ে রেখেছেন?
আপনার আগের কাজের মাসি ও পাড়ার লোকজন খুব ভুল বলে নি তাহলে? মামণি আমাদের দেশে এসেছেন কোন ফাঁক গলে?
বেনাপোল-পেট্রাপোল? নাকি অন্য কোন জায়গা দিয়ে?
আমার আগের সব সতর্কতা উপে যায়। এরা ইতর!
--শোন, এর নাম মোহিনী। এ হচ্ছে রোবো নারী, কোন মামণি নয়। এর কোন পাসপোর্ট ভিসা, আধার কার্ডের প্রশ্ন অবান্তর।
হালদারবাবু নিজে এসব দেখে সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন। ওনার বস তাঁর রিপোর্টে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছেন। লোকের গসিপ নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। তোমরা এবার ওঠ।
পঞ্চায়েত থেকে অন্য কেউ আসুন। নইলে ফালতু কথা ছেড়ে মিহিরবাবুকে ওনার কাজ করতে দাও।
আমার এপিক নম্বর দেয়া আছে। রীমার নাম কাটার ফর্মে সাইন করে দিয়েছি। মিহিরবাবু অফিসে গিয়ে বাকি কাজ কম্পিউটারে করে নেবেন’খন।
আমার ওষুধ খাবার সময় হয়েছে।
কিন্তু ওরা ওঠে না, ভাগ্নে এখনও মোহিনীর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রয়েছে।
ওই অবস্থাতেই বলে—আচ্ছা, এই পুতুলটা দিয়েই আপনি হালদার মামার হাতের আঙুল মটকে দিয়েছিলেন?
--এসব বাজে কথা। আমি কি পাগল? খামোখা কেন ওনার আঙুল মটকে দিতে বলব? উনি দেখতে চেয়েছিলেন সিকিউরিটি হিসেবে এই রোবো নারী কতটুকু কাজে আসতে পারে।
ওনার হাতে বরফ দিয়ে ম্যাসাজও মোহিনীই করে দিয়েছিল।
--তাই নাকি? তাহলে আমার সঙ্গেও একহাত হয়ে যাক। দেখা যাবে—মানুষ বড় না যন্ত্র! খালি আপনি চুপ করে থাকবেন। ওকে কোন কম্যান্ড দেবেন না।
আমি হতভম্ব, কী বলব বুঝতে পারছি না। ছেলেটা পকেট থেকে একজোড়া দস্তানা মত বের করে দু’হাতে পরে নিয়েছে। তাতে স্টিলের নাকলস্।
ও কি বক্সার, না পাতি গুন্ডা? মামার অপমানের বদলা নিতে চায়? বোকা ছেলে।
ও কফি টেবিলের উপর ওর ডানহাতের কনুই রেখে পাঞ্জাকুস্তির ভঙ্গি করে। আমি কিচ্ছু বলছি না। দেখি, মোহিনী কী করে!
মোহিনীর চোখের পাতা ফরফর করে।
ও এগিয়ে এসে টেবিলের দিকে ঝুঁকে ছেলেটার ডানহাত চেপে ধরে। তারপর ওর হাত মোচড়াতে থাকে।
একী! এত পাঞ্জা লড়ানোর নিয়ম নয়। মোহিনী দ্রুত চাপ বাড়িয়ে চলে।
কিন্তু ছেলেটা বোধহয় ন্যাটা। ইচ্ছে করে ডানহাত, মানে ওর দুর্বল হাত মোহিনীর দিকে এগিয়ে দিয়েছিল।
ওর বাঁহাত মোহিনীর চোয়ালে একটা লেফট হুক কষায়, তারপর চমকে ওঠে।
কারণ মোহিনীর লৌহকঠিন গালে ওর পাঞ্চ কোন প্রভাব ফেলেনি, বরং ছেলেটার হাতে যন্ত্রণা শুরু হয়। ও কঁকিয়ে ওঠে।
তাই দেখে বাকি দুটো মোহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একজন পেছন থেকে ওকে চেপে ধরে মাটিতে পেড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
লাভ হোল না।
মোহিনী লোহার হাত অনায়াসে ওদের দুজনের কলার ধরে তুলে আছাড় মারে। ওরা চেঁচিয়ে উঠে পাছা ঘষটে ঘষটে দরজার দিকে সরতে থাকে।
মিহিরবাবু খাতা ছেড়ে সোফার পেছনে লুকোবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু হালদার বাবুর ভাগ্নে এসে আমাকে পেছন থেকে জাপটে ধরেছে,
ওর হাতে উঠে এসেছে একটা ছোট ধারালো ছুরি!
এতো পুরো বোম্বাইমার্কা শস্তা ফিলিম!
ওর মুখে একটা বাঁকা হাসি।
ছুরিটা আমার গলায় ঠেকিয়ে ও মোহিনীকে বলে-- চুপচাপ পেছোতে থাক। এক পা এক পা! কিচেনে ঢুকে ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে দাও। নইলে এই বুড়োর গলার নলি দু’ফাঁক!
কোন চালাকি কোর না।
মোহিনী নড়ছে না, বরং স্ট্যাচু হয়ে গেছে। ওর চেহারা নির্বিকার, যেন একটা মুখোস পরে আছে।
ছেলেটা ধমকে ওঠে।
--কী হল? পিছিয়ে যাও! চটপট।
মোহিনীর চোখের মণি একটু বড় হয়। চোখের পাতা আবার ফরফর করে। ও পিছোয় না, এগিয়ে আসে দু’পা। তারপর হাঁটু মুড়ে মেজেতে বসে বজ্রাসনে।
দুই হাত যুক্ত হয় প্রার্থনার মুদ্রায়—যেন জল চাইছে, নাকি ভিক্ষা?
কেউ কিছু ভাবার সময় পায় নি। একটা সাদা ম্যাগনেশিয়াম আলোর ঝলক! বাড়িঘর দুলছে।
জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ার সময় কানে এল রীমা হাসছে, হাততালি দিচ্ছে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।