এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরীঃ পর্ব ১ 

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৪ বার পঠিত
  • পর্ব ১
    ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরী



    কাল রাত্তিরে আমাকে পুলিশে ধরেছিল। আমার অপরাধ? রাত বারোটায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাইরে পিচের রাস্তার ওপারে ঘাসের মধ্যে শাল মুড়ি দিয়ে বসে থাকা।
    আমার চেহারাটাও সরেস। চারদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, দু’পাশের দুটো দাঁত পড়ে যাওয়ায় তোবড়ানো গাল, আধময়লা জীন্সের প্যান্ট ও রঙওঠা পাঞ্জাবি।
    পায়ে একটা বেল্ট লাগানো শস্তা জুতো চার সবদিকে হাওয়া লাগার বন্দোবস্ত।

    ওদের দোষ নেই। এত রাতে কুয়াশাঘেরা ফাঁকা মাঠে একটা খেঁকুরে লোক বসে আছে — ওদের হিসেব মিলছিল না। ভাবল মেয়ের দালাল বা চোরাই ড্রাগসের সাপ্লায়ার।
    কিন্তু মেয়ের দালাল হলে মেয়ে ও খদ্দের? তারা কোথায়? সন্ধ্যেবেলা এখানে দুষ্টুমিষ্টুদের দেখা যায়, তখন ওদের সময়।
    এখন তো সবাই বড় রাস্তার ওপারে নিরাপদ ডেরায়। ঠান্ডা বেড়ে গেছে যে!
    আর ড্রাগস সাপ্লাইয়ের জন্যে ছোটেলালের পান গুমটি আর বৃন্দা মাসির তেলেভাজার দোকান তো রয়েছে।
    এই খোলা মাঠে লোকটা বুদ্ধদেবের মত ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে কেন?

    উঁহু এটা অন্য কেস, বড় কোন কেস। এত মাথা না ঘামিয়ে ব্যাটাকে তুলে নিলেই হয়।
    থানায় বড় অফিসাররা এর ঠিকুজি কুষ্ঠি বিচার করবেন’খন।

    এইসব কথাবার্তার পর ওরা বেশি সময় নষ্ট করেনি। ময়দানের খোলা হাওয়ায় শীতের কাঁপন।
    আমাকে একজন ওপর ওপর থাবড়ে, পকেট হাতড়ে কালো গাড়িতে তুলে নিল। গাড়ির মধ্যে মাত্র একজন মহিলা, মাঝবয়েসি।
    প্যাট প্যাট করে আমাকে দেখছে আর পিচ করে থুতু ফেলছে প্রায় পায়ের কাছেই। আমার গা গুলিয়ে উঠল।

    মহিলাটি আমার অস্বস্তি দেখে মুচকি হেসে বলল — কী কেস?
    -- মানে?
    -- কোন ধারা লাগিয়েছে? ২০ নম্বর নাকি ২৭? গাঁজা, চরসের পুরিয়া রাখা? নাকি মাগীর দালালি?
    আমি চুপ করে থাকি।
    ও আমাকে শুনিয়ে বলে — চিন্তা কোর না বাবু। আমার চেনা উকিল আছে, কাল জামিন পেয়ে বেরিয়ে যাবে, মাক্কালী। একটা বড় পাত্তি খরচা হবে, ব্যস।

    আমি কথা না বাড়িয়ে জালের ফাঁক দিয়ে রাত্তিরের কুয়াশা ঘেরা অন্ধকার কোলকাতাকে দেখতে থাকি।
    থানা এসে গেল। বেশ আলো ঝলমল। তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। আমাকে খানিকক্ষণ বারান্দায় একটা লম্বা বেঞ্চিতে বসিয়ে রাখল।

    আমি স্কুলে পড়ার সময় একবার থানায় গেছলাম। কড়েয়া থানা। আমরা দশজন। অপরাধ -- রাস্তায় ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পাশের দোতলা বাড়ি জানলার কাঁচ ভাঙা।
    আরও ছিল – ওই বাড়ির মেয়েদের বিরক্ত করা। কথাগুলো ঠিক। কিন্তু যারা করেছিল তারা পুলিশের গাড়ি গলিতে ঢোকামাত্র হাওয়া হয়ে গেছল।
    কয়েকজন নিজেদের হাওয়াই চটি ফেলে। ওরা বড় ছেলের দল, ক্লাস নাইন টেন।

    তখন আমি ফাইভে পড়ি; দুধভাত। খেলতে নিত না, চক দিয়ে ফুটপাতে স্কোর লিখতে লাগিয়ে দিত।
    তাই গাড়িটা দেখেও পালাই নি। বুঝতেই পারি নি কেন পালাতে হবে।
    থানায় অফিসার আমাদের বকুনি দিলেন। আর জানলার কাঁচ কার হিটে ভেঙেছে? পালের গোদা কে? কারা মেয়েদের বিরক্ত করে জিজ্ঞেস করলেন।

    আমার কপাল ভাল, আগে আমার থেকে বড় কয়েকজনকে জেরা করতেই ওরা এক এক করে সবার নাম বদলে দিল।
    তখন সবাইকে চুপচাপ বাড়ি যেতে বলা হল।
    আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমাকে বললে নাম বলে দিতাম, কিন্তু খুব খারাপ লাগত।
    আমি যে দুধভাত হলেও অপেক্ষায় আছি -- একবার আমাকে বল করতে দিক। খালি এক ওভার। রবারের বলে খুব ভাল অফ ব্রেক করাতে পারি।
    পার্কসার্কাস বাড়ির ছাদে খুব প্র্যাকটিস করি, বাচ্চুদার সঙ্গে। এখন পুলিশের কাছে নাম বলে দিলে কোন মুখে ফের ওদের খেলার সময় হাজির হতাম!

    কিন্তু এই থানা আর পুরনো কড়েয়া থানার মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ।
    কোথায় টালির ছাদ আর ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকা মান্ধাতার আমলের পাখা আর কোথায় এই আধুনিক থানা, যেখানে টেবিলে টেবিলে কম্পিউটার, কেবিনে এসি লাগানো, শীতকাল বলে বন্ধ রয়েছে। দেয়ালে একটা বড় টিভি। একটা জল খাবার কুলার, বাঃ!

    দেখামাত্র আমার এই শীতের রাতেও তেষ্টা পেল। আসলে খুব ভয় পেয়েছি। থানায় নাকি খুব মারে! আমাকেও মারবে নাকি?
    কড়েয়া থানায় গিয়েছিলাম বাচ্চা বয়সে, কিন্তু এখন তো আমি সিনিয়র সিটিজেন! থানায় কি এজন্য কোন রেহাই পাওয়া যায়? কী জানি!
    আমার ডাক এল।

    ভেতরে গিয়ে একটা টেবিলের সামনে দাঁড়াতে বলল। ওই মহিলা এবং আরও কয়েকজনের আগে জেরা চলছিল।
    ওদের এবার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে একটা লোহার বড় বড় রড লাগানো ঘুপচি ঘরে বন্ধ করে দিল, মহিলাকে আলাদা একটা রুমে।
    সে যাবার আগে আমাকে চোখ টিপল। সেটা পুলিসের চোখ এড়ায়নি।

    আমাকে পেশ করার পর জিজ্ঞেস করা হোল আমার কাছে কী কী পাওয়া গেছে।
    সঙ্গের পুলিশ বলল — কিচ্ছু না। চুপচাপ আলোয়ান মুড়ি দিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পাঁচিলের বাইরে খোলা মাঠে বসেছিল।
    স্যার, মনে হচ্ছে বাঞ্চোৎ বুড়ো বড় খেলুড়ে। চুতিয়া সেজে কেটে পড়ার ফিকির। কিন্তু রহিমন বিবি লক আপে ঢোকার আগে ওকে চোখ মারল — আমি নিজে দেখেছি।
    আজ রাতের মত লক আপে ঢুকিয়ে দিই?

    ওসি সাহেবের চোখ ছোট হল। আমাকে খানিক দেখে বলল — নাম? সাকিন?
    -- বঙ্কিম সান্যাল। পার্কসার্কাস বাজারের সামনে।
    -- সেকী? হিন্দু ঘরের! তায় বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। কিন্তু রহিমন বিবিকে কবে থেকে চেন?
    -- আজ কালো গাড়িতে চড়ে আসার সময় থেকে।
    -- আগে কখনও দেখ নি?
    -- না।
    -- তাহলে তোমাকে চোখ মারল কেন?
    -- আমি কী করে বলব স্যার? ওই বিবিকেই জিজ্ঞেস করুন।

    পাশের সেপাই গালে আচমকা একটা চড় কষাল। ব্যথার চেয়েও অবাক হলাম বেশি।
    -- অ্যাই খানকির ছেলে! সাহেবের সঙ্গে ভাল করে কথা বল।
    আচমকা অমন ঝন্নাটেদার চড় খেয়ে মাথা ঝিমঝিম করছিল, তায় মা তুলে গালি! আমার একটাই দুর্বল জায়গা।
    কোত্থেকে একটা বিচ্ছিরি বেয়াড়া রাগ শিরদাঁড়া পাকিয়ে মাথায় উঠতে লাগল।

    ওসিকে বললাম — অফিসার! অ্যাম স্পীকিং টু ইউ, স্যার; নট টু দিস সিলি পার্সন। কাউন্ডলি টেল ইয়োর সিপয় টু বিহেভ। আরেকবার যদি আমার মা তুলে কিছু বলে-- ।
    এটুকু বলে আমি হাঁফাতে লাগলাম।
    অন্য সেপাইরা মজা দেখতে চলে এল।
    একজন বলল — মা তুললে তুই কি করবি রে বুড়ো? মারবি? ওর সঙ্গে বক্সিং লড়বি?
    সবাই হেসে উঠল। রাতদুপুরে থানার ভেতরে রঙ্গ জমেছে মন্দ নয়!
    -- আমি আ — মি ওর গায়ে থুতু ছিটিয়ে দেব। যে অন্যের মাকে অসম্মান করে সে নিজের মাকেও সম্মান দিতে জানে না।

    কিন্তু ইংরেজি বলার সুফল ফলল, স্বাধীনতার এতদিন পরেও। মেকলেকে ধন্যবাদ।
    অফিসার একটা চেয়ার দেখিয়ে আমাকে বসতে বললেন। অন্য সেপাইগুলোকে একটু সরে দাঁড়াতে বলে রাইটার বা মুন্সীজিকে ডাকলেন।
    সে একটা প্যাড আর পেন নিয়ে আমার পাশের চেয়ারে বসল।
    এবার আমার জেরা শুরু।

    -- পার্কসার্কাস বাজারের সামনে? ওটা তো পুরো মুসলিম এলাকা। আপনি ওখানে থাকেন? কেন?
    -- আমি ওখানেই জন্মেছি, বড় হয়েছি। স্কুলে গেছি।
    -- নাম ঠিকানা ঠিক বলছেন? বঙ্কিম সান্যাল? বাকাউল্লা বা সুলেমান না? মিথ্যে বললে নিজেই ভুগবেন।
    -- বাবার নাম?
    -- স্বর্গীয় শশাংকশেখর সান্যাল।
    -- শশাংকশেখর মানে কি?

    -- ওটা শিবের আর একটা নাম। মানে যার মাথার জটায় শশাংক বা চাঁদ রয়েছে। চন্দ্রচুড় মানেও তাই। বহুব্রীহি সমাস।
    -- হুম্‌ তা সান্যাল মশায়, চাঁদ-তারা মসজিদ বা দরগার মাথাতেও থাকে। সবুজ রঙা রেশমি পতাকায়।
    -- তা থাকে স্যার। চন্দামামা সবার মামা।

    -- বেশ। আবার জিজ্ঞেস করছি। ওই পাড়াটা হিন্দু বামুনের থাকার মত নয়। রাস্তাঘাট বড্ড নোংরা। তবু আপনি ওখানে পড়ে আছেন, কেন?
    -- আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাই।
    -- মানে? হেঁয়ালি না করে সোজাসুজি বলুন।

    -- বলছি স্যার। আমার তিনকুলে কেউ নেই। বাবা মা’র একমাত্র সন্তান। দু’জনেই গত হয়েছেন। আমি বিএ পাশ করে প্রাইভেট স্কুলে মাস্টারি করতাম।
    পঞ্চান্ন বছরে রিটায়ার। জমাপুঁজি নেই। বাবা সামান্য রেখে গেছেন। তা দিয়ে খাওয়া পরা এবং ডাক্তারের খরচ নমো নমো করে হয়ে যায়।
    এই বাড়িটার ভাড়া এখনও ষাট টাকা, এত বার বাড়িওলা বদলে গেছে যে কেউ জানে না মালিক কে। ভাড়া দিতে হয় না।
    কারণ কর্পোরেশন সবাইকে এই ভাঙাচোরা বাড়িটা ছেড়ে দিতে বলছে।
    আমি ছাড়ি নি। যতদিন আছি এখানেই মাথাগুঁজে থেকে যাব।

    -- আপনার বাবা কী করতেন?
    আমার হাসি পায়। সেটা লুকিয়ে গলার স্বর বদলে নিয়ে বলি — বাবা ল্যান্স নায়েক এস এস স্যানিয়েল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন।
    আটচল্লিশে কাশ্মীর ফ্রন্টে লড়েছেন।

    নিস্তব্ধতা ।

    -- কাগজ আছে? বাবার রিটায়ারমেন্টের?
    -- ফোর্ট উইলিয়ামে সব আছে। আমার কাছে নেই। কোনদিন দরকার হবে ভাবি নি।
    -- আপনি কী করেন?
    -- কিছু না। এই বয়সে কোন কিছু করার উৎসাহ পাইনে।
    -- সে কী! তাহলে এই শীতের রাতে ভিক্টোরিয়ার কাছে খোলা মাঠে বসেছিলেন কী করে? এর এনার্জি এল কোত্থেকে?
    -- সেটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যার।

    -- এটা কোন ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। আপনি নিজের ঘরের ছাদে নয়, পাবলিক প্লেসে বসেছিলেন।
    আমি কিছু বলার আগে আরেক জন একটা ফাইল নিয়ে আসে। সেটায় চোখ বুলিয়ে সাইন করতে করতে অফিসার জিজ্ঞেস করেন — কিছু পেলে?
    -- না স্যার। কোলকাতা পুলিসের রেকর্ডে এই লোকটার বা বঙ্কিম সান্যাল নামে কারও কোন কেস পেলাম না।

    -- ওকে। শুনুন সান্যাল। সত্যি কথা বলুন। রাত অনেক হয়েছে। উত্তর স্যাটিসফ্যাক্টরি হলে আপনাকে আটকাব না। বাড়ি যেতে পারেন।
    না হলে আজকের রাতটা এখানেই লক আপে থাকতে হবে। এবার বলুন, খোলা মাঠে আলোয়ান মুড়ি দিয়ে কেন বসেছিলেন?

    খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে ফেলি — পরীর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।
    -- পরী? কোন পরী? বেন্টিংক স্ট্রিটের পরীবানু?
    -- স্যার, ওরকম কাউকে চিনি না।
    -- বেশ, যাকে চেনেন তার কথা বলুন। এই বয়সে কোন পরীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন? এত রাতে? তার নাম ঠিকানা?

    -- আপনারা চেনেন তাকে। সে আমার কাছে বিজয়া, ইতিহাসের পাতায় তার নাম অ্যাঞ্জেল অফ ভিক্টরি।
    জন্ম ১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের চেল্টেনহ্যামে। বাবার নাম লিন্ডসে ক্লার্ক, একজন ইংরেজ ভাস্কর। মা রোমের যুদ্ধ ও শান্তির দেবী ভিক্টোরিয়া।
    ও বাবার সংগে জাহাজে চড়ে কোলকাতায় আসে। ওর হাইট ১৬ ফুট, ওজন সাড়ে তিন টন। ঘাবড়াবেন না, সত্যি বলছি ওর সারা শরীর ব্রোঞ্জের, ডান হাতে বিউগল, বাঁ হাতে পুষ্পহার।

    ওর রয়েছে উড়ে যাবার জন্যে একজোড়া ডানা। ও যে পরী। ইচ্ছেমত রাত্তিরে উড়ে বেড়ায় ও গোটা কোলকাতাকে রক্ষা করে, বলা ভাল দেখাশোনা করে।
    হাওয়ার গতি যদি ঘন্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি হয়, অমনি ও নড়ে ওঠে। হাওয়ার দিকবদল দেখিয়ে দেয়।
    -- ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরী?
    -- ঠিক ধরেছেন।
    -- বলছেন সে ডানায় ভর দিয়ে উড়ে মাঝরাতে খোসগল্প করতে আসে?
    আমি মাথা নাড়ি।

    -- অ্যাই, এই পাগলাচোদাকে পাশের ঘরটায় নিয়ে গিয়ে ভাল করে বানা, কম্বলে মুড়ে। আমার সঙ্গে রাতদুপুরে দিল্লাগি!
    ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। কী করব? কিছুই মাথায় আসছে না। দুই যমদূত আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

    -- স্যার ! স্যার! ভুল করছেন। ভুল করছেন। আরেকটু শুনে যান। স্যার, আমি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ, পৈতে আছে।
    আজ যদি আপনার যমদূতগুলো আমার গায়ে হাত তোলে তাহলে কাল রাত্তির নাগাদ মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে।
    একবার গায়ে হাত দেয়া হয়ে গেছে তো, কোটা শেষ। আর আপনিও রেহাই পাবেন না। কাস্টডিয়াল ডেথ! অনেক ধারা লাগবে, এমনকি সাসপেন্ড হতে পারেন।
    আপনার বাবা মায়ের বয়েস নিশ্চয়ই আমার কাছাকাছি হবে, স্যার।

    সেপাইদের কড়া হাত নরম হয়। ওদের চোখে ভয়। ওরা ইতস্ততঃ করে।
    অফিসার বিরক্ত। কী হোল?
    একজন মাঝবয়েসি সেপাই বলে — স্যার, আমি নমশূদ্র, পদবি বিশ্বাস। বাবা শিবভক্ত, চাঁদসী ডাক্তার। আমি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণের গায়ে হাত তুলতে পারব না।
    ঘরে বৌ-বাচ্চা আছে, যদি কিছু হয়ে যায়। আপনিও একটু ভাবুন স্যার।

    অফিসারের কপালে অনেকগুলো ভাঁজ, কিন্তু মুখের ভাব তেমনই কড়া। সম্বোধন আপনি থেকে তুমি হয়ে গেছে।
    -- এদিকে এস। আরেকটা চান্স দিচ্ছি। গাঁজাখুরি গপ্পো না ফেঁদে সত্যি কথা বল। পরীর সাথে কথা হয়? কী কথা? পরী তোমার কাছে কী শুনতে চায়?
    -- কবিতা স্যার।
    -- ক-বি-তা?
    -- হ্যাঁ স্যার। আমি ওকে কবিতা শোনাই। সপ্তাহে এক দিন।
    -- ঢপ দিচ্ছ? টের পেলে তোমার চামড়া গুটিয়ে নেব।
    -- না স্যার।
    -- তুমি কবিতা লেখ?
    -- না স্যার। অন্য কবিদের কবিতা শোনাই। বাংলা কবিতা। আর ও কখনও সখনও মুডে থাকলে আমাকে ইংরেজি কবিতা শোনায়।
    -- আচ্ছা! একটা শোনাও দেখি? কীরকম কবিতা শুনিয়ে পরী নামিয়ে আন তার নমুনা? ধর প্রথম দিন কী কবিতা শুনিয়েছিলে?
    -- কাউকে এক গেলাস জল দিতে বলবেন স্যার? গলা শুকিয়ে গেছে।

    জল খেয়ে আমি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করি।

    “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
    যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
    যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই
    পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
    যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
    এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
    মহত্‍‌ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
    শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়”।

    শেষ করে আরও একঢোঁক জল খাই। তারপর পড়া মুখস্থ বলা সুবোধ ছাত্রের মত অফিসারের দিকে তাকাই।
    চোখে একটু আশা -- নীল ডাউন করবে নাকি বেঞ্চিতে বসতে বলবে?
    -- এ কবিতাটা কে লিখেছে? তুমি?
    -- না স্যার, ওটা জীবনানন্দ দাশ বলে একজনের লেখা।

    -- কিন্তু “যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা” লাইনটার মানে কী? অন্ধ হলে আবার চোখে দেখে কী করে? এর মধ্যে কোন পলিটিক্যাল ইয়ার্কি নেই তো?
    -- আমি কী করে বলব স্যার! লাইনটা কবি লিখেছিলেন গত শতাব্দীতে, কোলকাতায় বসে। উনি কী ভেবে লিখেছিলেন তা উনিই জানেন।
    কী জানেন স্যার, ভাল কবিতা, মানে যেটা সময় পেরিয়েও টিকে যায় তার অর্থ একেক জন পাঠকের কাছে একেক রকম।
    কবিতা হোল বীজ, পাঠকের মনের মাটিতে তার অংকুর বেরোয়, পাতা বেরোয়।

    -- ব্যস ব্যস্‌ তুমি কি বাংলার টিচার? মাথা ধরিয়ে দিলে। কবির নামটা কী যেন? জীবন দাশ?
    -- না স্যার, জীবনানন্দ দাশ।
    -- দাশ মানে নমশূদ্র?
    -- না স্যার, উনি বরিশালের বদ্যি — আসলে দাশগুপ্ত। বদ্যিদের নিয়েও অন্যরা কবিতা লেখে, শুনবেন?

    আমি মরিয়া; আড়ংধোলাই খাবার ভয়ে মাথা কাজ করছে না। যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছি — উদ্দেশ্য এদের ভোঁতা করে দেয়া, ক্লান্ত করে দেয়া। আমাকে থামলে চলবে না। খেলাটা শেষ অব্দি খেলতে হবে। তাই ওনার অনুমতির অপেক্ষা না করে শুরু করিঃ

    “কহ ভাই কহরে, অ্যাঁকাচোরা শহরে,
    বদ্যিরা কেন কেউ আলুভাতে খায় না?
    লেখা আছে কাগজে, আলু খেলে মগজে
    ঘিলু যায় ভসকিয়ে বুদ্ধি গজায় না”।

    আমার রণকৌশল সফল! সেপাই থেকে সাহেব — সবার মুখে হাসি ফুটেছে, নানারকম মাপের হাসি।
    কিন্তু অফিসার আমায় ছাড়েন না।

    -- এটা কোন কবিতা? যা খুশি কিছু একটা বলে দিলেই হল?
    -- না স্যার, যা খুশি নয়। এটা ছড়া, আবোল তাবোলে আছে।
    -- সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’?
    -- হ্যাঁ স্যার।
    -- বুড়ো বাঞ্চৎ, এবার ক্যালানি খাবে। আবোলতাবোল আমি পড়েছি, বাড়িতে আছে। এরকম কোন ছড়া ওতে নেই।
    -- আছে স্যার, সত্যি বলছি।
    -- আমি মোবাইলে পিডিএফ ডাউনলোড করছি। এই দেখ আবোলতাবোলের সূচীপত্র। কোথায় তোমার ছড়া?
    -- সূচীপত্র না, সূচীপত্র না। আপনি পাতাগুলো উলটে দেখুন। এরকম কয়েকটা ছড়া মার্জিনের উপরের খালি জায়গায় ছোট হরফে আছে। একটু দেখুন স্যার।
    অফিসার মোবাইলটা রাইটারের হাতে দিয়ে চেক করতে বললেন।
    -- কিন্তু আগে বল তুমি কী মানে ভেবে ওই কবিতাটা তোমার পরীকে শোনাচ্ছিলে। অন্ধ কে? সে আবার অন্যদের থেকে চোখে বেশি দেখে?
    -- বদ্যি কবি কী ভেবেছিলেন তা বলতে পারব না। তবে কী জানেন স্যার, নানারকম দেখা আছে। একজন নামকরা গায়ক ছিলেন না কে সি দে?
    মান্না দে’র কাকা? কায়স্থ সন্তান। উনি অন্ধ গায়ক, লোকে বলত কানা কেষ্ট। আমার ঠাকুমা তাঁর ফ্যান ছিলেন, তাঁর ভজন কীর্তন সব গাইতেন।
    এটা শুনুন, “ও তাঁরে দেখবি যদি নয়ন ভরে এ দুটো চোখ কর রে কানা”!

    দেখছেন তো, দেখতে পাওয়াও নানারকম। সবটা চোখ দিয়ে হয় না। বাইরের দেখা, ভেতরের দেখা — আলাদা আলাদা।
    রবীন্দ্রনাথের একটা নাটকে শাপগ্রস্ত যক্ষ কুরূপ হোল। রাণী তাকে বাইরের থেকে দেখল — কুরূপ, বেতালা।
    যেদিন ভেতরের চোখ ফুটল সেদিন দেখল ও কত সুন্দর।
    অফিসার হাত তুলে আমাকে চুপ করতে বললেন। কারণ, রাইটার বাবু ওনার কানে ফিসফিস করছে। উনি মাথা নাড়লেন।

    বললেন — ওকে, ছড়াটা বইয়ে আছে। আপনি বাড়ি যান। আচ্ছা, কীভাবে যাবেন?
    -- কেন স্যার, হেঁটে। এইটুকু তো পথ। আমি হেঁটেই মেরে দেব।
    -- এই ঠান্ডায় মাঝরাতে হেঁটে? দাঁড়ান, একটা পি সি আর ভ্যান যাচ্ছে, কড়েয়া থানার দিকে। আপনাকে থানার সামনে নামিয়ে দিলে চলবে?
    পুত্রসম ওসি’র বিচার বিবেচনায় আমি গলে জল।

    শুনতে পেলাম উনি একজন পুলিশকে বলছেন আমাকে আগে কড়েয়া থানায় নিয়ে গিয়ে ওখানকার অফিসারকে চেহারাটা দেখিয়ে দিতে।
    উনি যেন ওনার এলাকায় এই পাগলাটে বুড়োর চলাফেরার প্রতি একটু নজর রাখেন।

    মুখের স্বাদ তেতো হয়ে গেল

    ( চলবে )
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১
  • ধারাবাহিক | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ৪ - albert banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb91:4c8e:d999:69a4:7922:1e0b:***:*** | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:১৭738376
  • বেশ, চলুক। পড়ছি। তবে 'দেখা না দেখায় মেশা' মাঝপথে পরিত্যক্ত হলো না আশা করি?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন