এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা   বিবিধ

  • নজরুল ও মিথ্যা প্রচারণা 

    দীপ
    আলোচনা | বিবিধ | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১ বার পঠিত
  • নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও শাশুড়িকে নিয়ে সাম্প্রদায়িক কুপ্রচারণা আমরা কম বেশি শুনে থেকেছি। স্ত্রী ও শাশুড়ি হিন্দু ছিলেন; এটাই সম্ভবত অপরাধ। এ প্রসঙ্গে কবি জসিমউদ্দীনের লেখা ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ থেকে তুলে ধরছি-
     
    “একদিন বেলা একটার সময় কবিগৃহে গমন করিয়া দেখি খালা আম্মা (গিরিবালা দেবী) বিষণ্ন বদনে বসিয়া আছেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার মুখ আজ বেজার কেন? খালা আম্মা বলিলেন, জসিম, সব লোকে আমার নিন্দা করে বেড়াচ্ছে। নুরুর (নজরুল ইসলামকে গিরিবালা এই নামে ডাকতেন) নামে যেখান থেকে যত টাকা পয়সা আসে, আমি নাকি বাক্সে বন্ধ করে রাখি। নুরুকে ভালো মত খাওয়াই না, তার চিকিত্সার ব্যবস্থা করি না। তুমি জানো আমার ছেলে নেই, নুরুকেই আমি ছেলে করে নিয়েছি। আর আমিই বা কে! নুরুর দুটি ছেলে আছে- তারা বড় হয়ে উঠেছে। আমি যদি নুরুর টাকা লুকিয়ে রাখি, তারা তা সহ্য করবে কেন? তাদের বাপ খেতে পেলো কিনা, তারা কি চোখে দেখে না? নিজের ছেলের চাইতে কি কবির প্রতি অপরের দরদ বেশী? আমি তোকে বলে দিলাম জসিম, এই সংসার থেকে একদিন আমি কোথাও চলে যাবো। এই নিন্দা আমি সহ্য করতে পারিনে...।
     
    এই বলিয়া খালা আম্মা কাঁদিতে লাগিলেন। আমি বলিলাম, খালা আম্মা, কাঁদিবেন না একদিন সত্য উদ্ঘাটিত হবেই।
     
    খালা আম্মা আমার হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া গেলেন, যে ঘরে নজরুল থাকিতেন সেই ঘরে। দেখিলাম, পায়খানা করিয়া কাপড়-জামা সমস্ত অপরিস্কার করিয়া কবি বসিয়া আছেন। খালা আম্মা বলিলেন, এই সব পরিস্কার করে স্নান করে আমি হিন্দু বিধবা তবে রান্না করতে বসব। খেতে খেতে বেলা পাঁচটা বাজবে। রোজ এইভাবে তিন-চার বার পরিস্কার করতে হয়। যারা নিন্দা করে তাদের বলো, তারা এসে যেন এই কাজের ভার নেয়। তখন যেখানে চক্ষু যায় আমি চলে যাবো।" (ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়, জসিম উদ্দীন, পৃষ্ঠা ১৭১-১৭২)।
     
    সত্যি সত্যি প্রবল অভিমানে গিরিবালা দেবী একদিন বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। কোথায় গেলেন তার আর কোন খবর কোনদিন পাওয়া যায়নি। শুধু একবার একটা চিঠি প্রমীলা দেবীকে লিখেছিলেন, সে যেন তার জন্য কোন চিন্তা না করে...। এই শেষ, গিরিবালার কোন খবর কোনদিন পাওয়া যায়নি।
     
    হয়ত প্রাসঙ্গিক নয়, তবু নজরুল ইসলামের স্ত্রী প্রমীলা দেবীর কথা যদি এখন একটু না বলি স্বস্তি পাবো না। নজরুল অসুস্থ হবার আগেই প্রমীলা দেবী প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে যান। তার নিন্মাঙ্গ পুরোপুরি অবশ হয়ে গিয়েছিল। বাকী জীবন তাঁকে বিছানায় শুয়ে কাটাতে হয়েছে। গিরিবালা দেবী নজরুল ও প্রমীলা দুজনকেই দেখাশোনা করতেন। গিরিবালা দেবী নিরুদ্দেশ হবার পর অথৈ সাগরে পড়লো পুরো পরিবারটি। গিরিবালা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার সময় নজরুল পুত্র সব্যসাচীর বয়স মাত্র ১৮। কাজেই অল্প বয়সী দুই পুত্র ও পুরোপুরি নির্জীব কবিকে নিয়ে পঙ্গু প্রমীলা দেবী তারপর যা করলে তা কেবল কল্পনাতেই সম্ভব। বিছানায় শুয়ে শুয়েই তিনি পুরো সংসার নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলেন। বিছানায় শুয়েই তরকারি কুটতেন, আধশোয়া হয়ে মাছ কুটতেন। কেউ এলে হেঁচড়ে হেঁচড়ে চা করতে যেতেন। কবির দেখাশোনা করা, খাওয়া দাওয়া রান্না সবই করতে লাগলেন নিপুণভাবে। এতে লোক প্রয়োজন হলো বেশি, টাকাও দরকার হলো বেশি। কিন্তু সংসারটা ধ্বংস হতে দিলেন না। মুজাফফর আহমদ লিখেছেন, প্রমীলা দেবী এতকাল তার মাযের ছায়ার নিচে থেকেছিলেন। সেদিন একা তিনি যখন পুরো সংসারটা সামলাতে শুরু করলেন তখনই তার ব্যক্তিত্বের প্রখরতা সকলের সামনে উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিলো। প্রমীলা নজরুলের জীবনে আর্শীবাদ ছিলেন।
     
    এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন প্রমীলা দেবীর প্রয়াণের পর তার মৃতদেহ কবর দেয়া হবে নাকি দাহ করা হবে সেই বিতর্ক ওঠে। প্রমীলা দেবী অসুস্থ থাকা অবস্থায় নজরুল পুত্র সব্যসাচী কবি বন্ধু মুজাফফর আহমদের কাছে জানতে চান, মাকে কি করা হবে, কবর নাকি দাহ করা হবে? মুজাফফর আহমদ বলেন, তোমাদের মা তো ধর্মান্তরিত হননি, কাজেই তাঁকে দাহ করা হবে। কিন্তু নজরুলের বাসায় কাজ করতো একটি হিন্দু ছেলে। তার কাছে প্রমীলা বলে গিয়েছিলেন, তিনি মারা গেলে তাকে যেন নজরুলের কববের পাশেই কবর দেয়া হয়। প্রমীলা দেবীর ধারণা ছিল নজরুল ইসলামই হয়ত আগে মারা যাবেন। নজরুল প্রমীলা থেকে দশ-বারো বছরের বড় ছিলেন। প্রমীলার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে তাই কবর দেয়া হয়। চুরুলিয়া থেকে নজরুলের ভাইপোরা এসে বলল, কাকীমাকে চুরুলিয়াতেই কবর দিতে চায়। তাদের ইচ্ছা কবিকেও চুরুলিয়াতে কবর দেয়া হবে। তারা হয়ত ভেবেছিল নজরুলের কবর চুরুলিয়াতে হলে চুরুলিয়া হয়ে উঠবে কবিতীর্থ। কবিকে ঘিরে চুরুলিয়া সর্বত্র কবির নামে স্থাপনা নির্মাণ হবে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু নজরুলকে কিছুদিনের জন্য অতিথি করে নিয়ে আসেন। কবি পরিবার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে কবিকে দেখাশোনা করার ব্যবস্থা ছিল কবি পরিবারের জন্য স্বস্তির। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কবি পরিবারকে বাড়ি দিয়েছিল আর কবিকে দেয়া হয়েছিল ভাতা। তাতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে চলা সম্ভব ছিল না। ফলে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে তারা খুশিই হয়েছিল। কিন্তু কবি মারা গেলে তড়িঘড়ি করে নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে কবর দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি তখন বিচারপতি সায়েম। যদিও দেশ চালাতেন জিয়াউর রহমান। তারাই কবি পরিবারকে না জানিয়ে দ্রুত কবর দিয়ে দেন। ফলে প্রমীলার শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়িত করা যায়নি।
     
     
    লিখেছেন সুষুপ্ত পাঠক।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন