দেখা না দেখায় মেশাঃ পর্ব ১৩
“পাঠান ভাবে রাজপুতানির দেহে,কোথাও কি নেইকো কোমলতা”?
কয়েকটা দিন বড় অস্বস্তিতে কাটল। সুপ্রিয়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি না হলেই ভাল হত। ও কি আবার খুঁচিয়ে বন্ধ হওয়া কেস খোলাবে? নতুন স্টেটমেন্ট দিয়ে আমাকে মুশকিলে ফেলবে? খবরের কাগজে কায়দা করে একটা খবর ছাপাবে?
“রীমা হত্যাকাণ্ডে নয়া মোড়! স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু শ্মশানে মৃতদেহটির মুখ দেখতে পান নি”।
অপমানের বদলা নেবে! ধ্যাৎ কিসের অপমান? মোহিনীর হাত ধরে টানল কেন? নইলে চড় খেত না।
আমি তো মোহিনীকে কোন ইন্সট্রাকশন দিইনি, ও তো জানে মোহিনীর নিজস্ব ডিফেন্স মেকানিজম কাজ করে।
আরে, হালদার বাবুর অবস্থা তো ওর চোখের সামনেই ঘটল, তারপরেও? পেটে অ্যালকোহল পড়লে বাঙালি--।
কিন্তু কত বেশি? তিন পেগ? এটুকু ওর মাথায় চড়ে যাওয়ার মত নয়তো!
অপমান কোথায় হল? মনে পড়েছে।
ও চাইছিল আমি যেন মোহিনীকে বলি ওর ব্যবহারের জন্য সুপ্রিয় স্যারের কাছে ক্ষমা চাইতে। কিন্তু আমি বলি নি।
কেন ? বললে কী ক্ষতি হত? আমারও অমন জেদ চড়ে গেল কেন?
এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছি। সুপ্রিয়ের কথা মেনে চললে আজ কোন ঝামেলা হত না। ব্লাড প্রেশার ওঠানামা করত না।
সুপ্রিয় ঠিক বলেছিল। মোহিনী একটি নিষ্প্রাণ যন্ত্র মাত্র, কোন আবেগ নেই, কোন অনুভূতি নেই।
দেয়াল ঘড়ি যেমন মেকানিজমের দৌলতে ঘন্টায় টুং টাং করে সময়ের জানান দেয়, ও তেমনই কম্যান্ড মেনে আদেশ পালন করে।
যদি বলতাম তাহলে মোহিনী যান্ত্রিক গলায় ক্ষমা চাইত, রাগ করত না, অপমানিত বোধ করত না। এর প্রমাণ তো আমি আগেও পেয়েছি।
ওকে কিনতে যাবার আগে লাইভ ডেমো দেখতে “আশ্চর্য প্রদীপ” অফিসে যখন শেষবারের মত গিয়েছিলাম, তখনই দএখেছিলাম।
১=২ প্রুফ নিয়ে সামান্য তর্কাতর্কি হওয়ায় ও বিহারী ম্যানেজারের কথায় আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। তার জন্যে ভবিষ্যতে ওর আমার সঙ্গে ব্যবহারে কোন ফারাক দেখি নি।
এবারও নাহয় তাই হত। নিশ্চয়ই হত। ক্ষমা চাওয়ার পরমূহুর্তে আমার আদেশ শুনে কফি বানিয়ে দিত। তাহলে আমি কেন ভুল করলাম?
একটা নিষ্প্রাণ মেশিনের জন্য ছোটবেলার বন্ধুকে তাড়িয়ে দিলাম!
নাঃ আই মাস্ট মেন্ড মাই ওয়েজ! কথাটা বেশ জোর দিয়ে বললাম, নিজেকে ভরসা যোগাতে। হঠাৎ টেবিলের পাশ থেকে শোনা গেলঃ
“ইয়েস ইয়েস। মাস্ট মেন্ড মাই ওয়েজ”, তার সঙ্গে সঙ্গে অসহ্য হ্যা হ্যা হাসি।
মনে হল ওটাকে তুলে আছাড় দিই। কিন্তু ওটা যে রীমার শখের জিনিস!
তাই তেড়ে গিয়ে ধমকে উঠলাম—হে সিরি! স্টপ ইট নাও।
হাসি থেমে গেল।
নাঃ, ওকে ডেকে আনি। মোহিনীকে বলি ক্ষমা চাইতে। মোবাইল তুলে ফোন করলাম। লাগল না, ও আমাকে যা বলেছিল তাই করেছে।
আনফ্রেণ্ড করেছে, নম্বর মুছে দিয়েছে।
আমার ভেতরের আমোদগেঁড়ে দ্বিতীয় সমাদ্দার বলে উঠল—সেধে বাঁশ পোঁদে নিয়েছ, নিজেই টেনে বের কর।
যাও, সল্ট লেকে ওর বাড়ি গিয়ে নেমন্তন্ন করে এস। ছোটবেলার বন্ধু, রাগ পড়ে যাবে।
বিকেলের দিকে গেলাম সল্ট লেকে। ওর বাড়িটা একটু ভেতরের দিকে, একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের পাশে। লিফটে উঠে বেল টিপলাম। খানিকক্ষণ পরে পায়ের শব্দ।
কেউ দরজার গায়ের কাঁচলাগানো ফুটো দিয়ে আমাকে দেখছে। কিন্তু দরজা খুলল না, পায়ের শব্দ ফিরে গেল।
ধৈর্য হারিয়ে ফের ঘন্টি বাজালাম। এবার দরজা খুলল –চৌকাঠে চেনা মুখ প্রতিমা, কাজের মাসি। কিন্তু অন্যদিনের মত হাসিমুখে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল না।
কোন কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি অপ্রস্তুত। কনফিডেন্স উধাও। যা যা বলব ভেবে মনে মনে রিহার্সাল দিয়ে এসেছিলাম সব গুলিয়ে গেছে।
যেন প্রথম বার এসেছি সেইভাবে বললাম—সুপ্রিয় বাবু আছেন? একটু দরকার ছিল।
--দাদাবাবু বৌদি কেউ বাড়িতে নেই। কখন ফিরবে জানি না।
--ঠিক আছে, ফিরলে বোলো সমাদ্দার এসেছিল।
আমার চিন্তা বেড়ে গেল। রাত্তিরে বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। বন্ধু যদি দুশমন হয় তাহলে বড় মুশকিল। ও আমার সাত সতেরো সবকিছু জানে। তায় উকিলের বুদ্ধি।
ওই তো আমাকে থানা থেকে বাঁচিয়ে আনল, নইলে। বুঝতে পারছি, ওকে ছাড়া আমার নাজেহাল অবস্থা।
ঠিক আছে, আমিও দেখব কত ধানে কত চাল! ওই কেস যদি ফের শুরু হয় তাহলে আমাকে বুদ্ধি দিতে কোন সুপ্রিয় আসবে না।
আমাকেই ভেবে রাস্তা বের করতে হবে।
সকাল বেলায় ঘুম ভাঙছিল না। মোহিনীর লোহার দস্তানা মার্কা হাতের ঠেলায় উঠে পড়লাম।
--অবিনাশ স্যার, উঠুন, থাইরয়েড ক্যাপসুল খেয়ে ব্রাশ করে এসে চা খাবেন।
চা খেতে খেতে ভাবছিলাম এই সময় রীমা থাকলে আমায় বুদ্ধি দিত। জট ছাড়িয়ে বেরোনোর রাস্তা বাৎলে দিত। এখন ওসব ভেবে কী হবে? ও নেই।
হঠাৎ মাথায় টিউবলাইট জ্বলে উঠল। রীমা নেই তো কি! মোহিনী আছে। মানে অনেক কঠিন সমস্যার অনেক অংকের ধাঁধার উত্তর দেয়, কিন্তু এই ব্যাপারটা? যদি না পারে?
আহা, চেষ্টা করে দেখ না। যদি পারে? খামোকা মাথায় মাকড়সার জাল বুনে কী লাভ? ওর সমাধান পছন্দ না হলে অন্য কিছু ভাববে। ব্যাক টু স্কোয়ার এ।
চেষ্টা করে দেখতে তো পয়সা লাগে না।
আরে, হুবহু এই কথাগুলো কোথায় শুনেছিলাম? কবে শুনেছিলাম? ওহে অবিনাশ নাম্বার ওয়ান, মনে পড়ছে কিছু?
‘চেষ্টা করে দেখতে পয়সা লাগবে না’ আর ‘পছন্দ না হলে চলে আসবেন”।
ইহা কে কাহাকে বলিয়াছিল, কবে এবং কোথায় ? মনে পড়ছে?
তা কেন পড়বে না! সেই যে তিরিশ বছরের অবিনাশবাবু কোন একটা কমিউনিটি হলে বাদল সরকারের নাটক দেখে ঘরে ফিরছিলেন। রাত প্রায় নটা ।
কিন্তু অফিস ফেরত বাদুড়ঝোলা ভীড়ের ঠ্যালায়, সরকারি বা বা মিনি, কোন বাসে উঠতে না পেরে হাঁটতে শুরু করেছিলেন।
ভেবেছিলেন একটা দুটো স্টপের পর ভীড় পাতলা হবে।
তখনও মেট্রো চালু হয়নি। ওয়ান ওয়ে সিস্টেমের কথা কেউ শোনে নি। কিন্তু পার্ক স্ট্রিট সদর স্ট্রিট এসেও কোন চান্স পেলেন না।
তবে একটি ন্যাড়ামাথা রোগাটে রিকশাওলা পেছন পেছন ঘ্যান ঘ্যান করে এঁটুলির মত গায়ে লেগে রইল।
দোষের মধ্যে যেই রিকশাওলা বলেছে যাবেন নাকি বাবু? অবিনাশ ছত্তিশগড় বাসের অভ্যাসে হিন্দিতে উত্তর দিয়ে ফেলেছে—নহীঁ ভাই, নহীঁ জানা।
ব্যস্ হিন্দি বলয় থেকে আসা দেহাতি রিকশাওলা যেন হাতে চাঁদ পেল। দেশোয়ালি ভাইকে পটাতে বলতে লাগল—বৈঠ জাইয়ে মেরে রিকশ মেঁ।
আপনাকে নিয়ে যাব জন্নতে। অ্যাংলো, বিহারী, চাইনিজ সবরকম মাল পাবেন। চলুন দেখে নিন।
অবিনাশ মাছি তাড়ানোর মত করে না না বলতে বলতে পা চালালো। একটা বাস এলেই উঠে পড়বে, ফাঁকা না হলেও।
কপাল খারাপ, একটাও বাস আসছে না। স্টপেজে অনেক লোক অপেক্ষায়।
নাছোড়বান্দা রিকশাওলা বোঝাতে চাইল—দেখনে মেঁ ক্যা জাতা? দেখ তো লীজিয়ে।
পছন্দ না হলে আমি আপনাকে রিকশা করে ফিরিয়ে এনে এইখানে নামিয়ে দেব, একটা পয়সাও লাগবে না।
বিরক্ত অবিনাশ ঝাঁঝিয়ে উঠল—অন্য খদ্দের দেখ। কেন খালিপীলি সময় খারাপ করছ?
আর তক্ষুণি একটা মিনি বাস, পার্কস্ট্রিট- বেকবাগান, এসে ব্রেক কষল।
মোহিনী একপট চা আর ছোট প্লেটে চারটে মারি বিস্কিট নিয়ে কফি টেবিলে নামিয়ে রাখল।
--শোন মোহিনী, সামনের চেয়ারে বসে পড়।
মোহিনী লক্ষ্মী মেয়ের মত বসে পড়ল। তবে ওর নিজস্ব যান্ত্রিক কায়দায় । আমি সাহস পাচ্ছিলাম না। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবতে লাগলাম।
ওকে বলব, নাকি বলব না। ফের মনে পড়ল—দেখনে মেঁ ক্যা জাতা?
তখন দেখতে যাই নি। আজ নাহয় দেখে নি আলাদীনের ক্ষমতার কত জোর। কেউ তো বলুক -খুল যা সিম সিম!
মনে মনে কথা গুছোতে থাকি—কীভাবে বললে ওর বোধগম্য হবে?
দু’বার চুমুক দিয়ে ওর দিকে তাকালাম। একী! একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
যেন প্যাথো ল্যাবে কেউ মাইক্রোস্কোপের লেন্সে চোখ লাগিয়ে রক্তের ফোঁটায় সূক্ষ্ম কণিকা আর ব্যাকটেরিয়ার চলাফেরা দেখে যাচ্ছে।
অস্বস্তিতে চোখ নামাই, বিস্কুটে কামড় দিই।
--অবিনাশ স্যার, আমায় কিছু বলবেন?
কী করে জানল? ও কি মাইন্ড রীডার? এটাও কি প্রোগ্রামে আছে? অস্বস্তি বাড়ছে। কিন্তু ও জিজ্ঞেস করায় আমার জন্যে কাজটা সহজ হয়ে গেল।
--ও হ্যাঁ, আজকের বৌদ্ধিক সেশন এখন থেকেই শুরু করতে চাই। মানে, জলখাবারের আগেই।
না ঠিক সেশন নয়, কোন জামাই ঠকানো প্রশ্ন নয়। একটা বাস্তব সমস্যা, একদম রিয়েল। এতে আমার ক্ষতি হতে পারে। তাই তোমার কাছে পরামর্শ চাইছি।
মানে তুমি যদি সমস্যাটার জট খুলে এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ বলে দিতে পার। তাই বলছিলাম কি--।
--অবিনাশ স্যার, প্রবলেমটা বলুন।
গলার স্বর কেমন পালটে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে সেই গল্পটা ওকে শোনাতে থাকি। রীমাকে নিয়ে বাগনান হাসপাতালে যাওয়া। সেদিন থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামে, চারদিন ধরে চলে।
ফেরার পথে রীমার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, সম্ভবতঃ জোলো হাওয়া লেগে। সারা রাস্তা শালমুড়ি দিয়ে কাঁপছিল।
ঘরে এসে প্যারাসিটামল দিই, জ্বর কমে, কিন্তু পুরোপুরি ছাড়ে না। রীমা হাসপাতালে যেতে চায় না, বলে ভাইরাল ফিভার, সাতদিনে এমনই ছেড়ে যাবে।
আমি আমার বন্ধু ডাক্তার সজল রুদ্রকে ফোন করি। উনি ওই বাগনান হাসপাতালের সি এম ও। উনি বলেন কোন নতুন ইনফেকশন, চটপট রক্ত পরীক্ষা করাতে।
সময় পাওয়া যায় নি, পরের দিন সকালে টের পেলাম ও ঘুমের মধ্যে চলে গেছে।
এখন পুলিশ বলছে আমরা যেদিন গেছলাম সেদিনই নাকি হাসপাতালের মর্গ থেকে একটি অল্পবয়েসি মেয়ের লাশ গায়েব হয়ে যায়।
দেড় বছরেও খোঁজ পাওয়া যায় নি। ওরা বলছে আমিই ওখান থেকে লাশ গায়েব করে এখানে নিয়ে এসেছি।
ড্রাইভার নাকি স্টেটমেন্ট দিয়েছে যে ফেরার পথে গাড়িতে শালে মোড়া একটি শরীর ছিল। সেটা বৌদিমণি কিনা বলা কঠিন।
আর গাড়িতে একটা কড়া ওষুধের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। মনে হয় ফর্মালিন।
সন্দেহ, আমি নাকি রীমা মারা গেছে বলে আসলে ওই মর্গের মড়াকে বোড়ালের শ্মশানে জ্বালিয়ে দিয়েছি।
ওখানে কেউ আগে রীমাকে দেখে নি। শুধু সুপ্রিয় দেখেছিল।
কিন্তু সেদিন সুপ্রিয় দেরিতে শ্মশানে যাওয়ায় ডেডবডির মুখ দেখতে পায় নি।
এত কথা বলে আমি হাঁফাতে থাকি, জল খাই। মোহিনী উঠে দাঁড়ায়। বলে—নাস্তার সময় হয়ে গেছে। আমি নিয়ে আসছি।
আপনি নাস্তা করে পরের দুটো ট্যাবলেট খেয়ে নিন। তারপরে আমরা আলোচনা করব।
পেটে খাবার ঢোকায় একটু ভাল লাগছে। এবার আমি মোহিনীর দিকে একভাবে তাকিয়ে আছি।
জানি, কোন মহিলার দিকে ওরকম ভাবে হাঁ করে তাকাতে নেই, আজকের দুনিয়ার রীতিতে এগুলো হ্যারাসমেন্ট, অপরাধ। কিন্তু ও যন্ত্রমানবী, কোন মহিলা নয়।
ওর চেহারায় কোন বিকার নেই। শুধু চোখের পাতা ফরফর করছে।
--অবিনাশ স্যার; আপনার সমস্যাটা কঠিন নয়। পুলিশের গল্পে অনেক ফ্যালাসি আছে। এক এক করে বলছি।
উরিত্তারা! আমার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠেছে। সমস্ত ইন্দ্রিয় একাগ্র করে ওর কথা শুনতে থাকি।
--প্রথমে কিছু প্রশ্ন। বাগনান হাসপাতালে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালিয়ে কেন গেছলেন?
--সি এম ও ডক্টর সজল রুদ্র আমার ছোটবেলার বন্ধু। ক’মাস বাদে রিটায়ার করছিল। সেদিন ওর জন্মদিন ছিল। আমাকে সস্ত্রীক যেতে বলেছিল।
আমরা গেছলাম হাসপাতালে নয়, ওর গায়ে লাগা কোয়ার্টারে। সেখানে ও আমাদের লাঞ্চ খাইয়েছিল।
--ওখানে ক’জন ছিলেন?
--শুধু আমরা তিনজন। ওর স্ত্রী কয়েক বছর আগে গত হয়েছিলেন।
--কতক্ষণ ছিলেন?
--মেরেকেটে দু’ঘন্টা।
--তাহলে রীমা বৌদিকে জীবিত অবস্থায় শেষ কে কে দেখেছিল, আপনি ছাড়া?
--ডঃ রুদ্র। ওনাকে পুলিশ জিজ্ঞেস করেনি।
--কেন ড্রাইভার? যখন বৌদি গাড়িতে উঠলেন তখন? ও কেন স্টেটমেন্ট দিয়েছে যে ওকে খালি শালে মোড়া একটি শরীর দেখেছে, সেটা কে ও জানে না!
ও কি মিথ্যে বলছে?
-- ঠিক মিথ্যে বলা যায় না। ডঃ রুদ্রের কোয়ার্টারেই রীমার শীত শীত করছিল, জ্বর জ্বর লাগছিল। সজল ওকে এক স্ট্রিপ প্যারাসিটামল দেয়।
ড্রাইভার চা খেতে গেছল, একটু দূরে। চাবি আমাকে দিয়ে গেছল। আমি রীমাকে নিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় ওকে ফোন করি।
ও যখন এল তখন রীমা শাল দিয়ে মাথা ঢেকে ফেলেছে। ও ধরে নিয়েছিল বৌদিই হবে। আমি বললাম খুব জ্বর এসেছে, কাঁপুনি দিয়ে।
হ্যাঁ, দু-আড়াই ঘন্টার মোটরযাত্রায় রীমা কোন কথা বলেনি।
--আর ফরমালিনের গন্ধ?
--দূর! ও ব্যাটা ফরমালিনের কী জানে! রীমা নাকে ও গলায় খুব করে ভিক্স ভেপোরাব মালিশ করেছিল। বন্ধ গাড়িতে তারই গন্ধ সবার নাকে লাগছিল; আমারও।
==আপনার আর কিছু বলার আছে?
উঃ যেন উকিল নাকি জাস্টিস মোহিনীর জেরা! কিন্তু সমস্যার সমাধান?
--অবিনাশ স্যার। শুনুন, পুলিশের গল্পে অনেক ফ্যালাসি। প্রথম হোল ডেড বডির সংখ্যা।
--মানে?
--দেখুন, আপনার মতে গাড়িতে একজন মহিলা ছিল। বৌদিকে নিয়ে গেছলেন, ফেরত নিয়ে এসেছেন।
কিন্তু পুলিশ বলছে দুটো বডির গল্প। একটা রীমা সমাদ্দারের, আরেকটা গায়েব হওয়া লাশের। আপনি নিয়ে গেছেন প্রথম জনকে, ফেরত এনেছেন দ্বিতীয় বডিটা।
তাহলে প্রথম জন কোথায় গেল?
গাড়িতেওঠার আগে হত্যা? কোথায়, ডঃ রুদ্রের কোয়ার্টারে? যেখানে হরদম কাজের মাসি রান্নার লোক, হেডনার্স, ড্রেসার এদের অবাধ যাতায়াত?
আর দু’ঘন্টার মধ্যে খুন করে লাশ গায়েব? আপনার পক্ষে সম্ভব? একা? এই বুড়ো বয়সে? পুলিশ ডাক্তার রুদ্রের স্টেটমেন্ট নেয় নি কেন?
আপনার মোটিভ কী? যদি বাসি মড়া হত, তাহলে কি যে ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছেন তিনি টের পেতেন না?
উনি তো স্টেথো লাগিয়ে এবং ছুঁয়ে চোখ টেনে পরীক্ষা করেছিলেন। কয়েকশ’ টাকার লোভে চেপে যাবেন?
আমি উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠি।
--দারুণ বিশ্লেষণ! অকাট্য যুক্তি।
--বসে পড়ুন, সমাদ্দার স্যার। আরও আছে। সবচেয়ে বড় ইস্যু মর্গ থেকে গায়েব হওয়া লাশ।
কতদিনের পুরনো লাশ? কবে থেকে মর্গে ছিল? গায়েব হয়েছে কবে জানা গেল?
মানে আপনি যেদিন বাগনান সরকারি হাসপাতালে গেছলেন সেদিন জানা গেল? হয়ত আগেই গায়েব হয়েছিল।
আর আপনি একটা পুরনো লাশ এনে বাড়িতে তিনদিন রেখে দাহ করলেন। কীভাবে রেখেছিলেন?
আপনার ফ্রিজে কি একটি পূর্ণ বয়স্কার লাশ ঢোকানো যায়? ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ও সহায়ক এবং বোড়াল শ্মশানের স্টাফ কেউ গন্ধ পেল না?
দেখে সন্দেহ করল না যে মড়াটা অনেকদিনের বাসি?
অবিনাশ স্যার, এই গল্প নিয়ে পুলিশ আবার এলে এসব প্রশ্নগুলো করবেন। দরকার হলে কমপ্লেন করে ক্ষতিপূরণ চাইবেন।
আমার শরীরে বিদুৎ খেলে যায়।
লাফিয়ে উঠে মোহিনীকে জড়িয়ে ধরি,--“মোহিনী! মোহিনী! তুমি আমায় বাঁচালে। তোমায় কী বলে যে—“।
তারপরই ছিটকে সরে আসি। শক্ত কড়া বুক পিঠ কোমর-- যেন লোহার মূর্তিকে আলিঙ্গন করেছি। আর তারপর ভয়ে কেঁপে উঠি।
--প্লীজ প্লীজ মোহিনী! আমায় মেরো না। সরি, ইচ্ছে করে কিছু করি নি। সত্যি বলছি। কেমন করে হয়ে গেল।
আবারও বলছি –সরি! আর কখনও হবে না। এবারকার মত মাফ করে দাও। মেরো না, প্লীজ মেরো না।
মোহিনীর ইস্পাতকঠিন দু’হাতের আঙুল আমার কাঁধে চেপে বসেছে। এইবার! এইবার! ভয়ে চোখ বুঁজে ফেলি।
ও আমাকে ঠেলছে, নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিল। চোখ খুলে দেখলাম ওর ডান হাত লম্বা হচ্ছে। কুঁকড়ে গিয়ে চোখ বুঁজে ফেলি।
আমার দু’হাত অজান্তেই আমার গালের দু’পাশে—যতটুকু আটকানো যায়।
--অবিনাশ স্যার, চোখ খুলুন। জল খান।
ওর ডান হাত উঠেছিল কফি টেবিল থেকে জলের গেলাস তুলতে। এখন সেই গেলাস ও বাড়িয়ে দিয়েছে আমার মুখের কাছে, পরম মমতায়।
যেমন করে রোগীকে নার্স জল খাওয়ায়।
--আমায় আমায় ক্ষমা করে দিয়েছ? মারবে না তো?
--অবিনাশ স্যার! আপনি আমার প্রভু। আমার কাজ আপনার আদেশ পালন করা, গায়ে হাত তোলা নয়। কোনও অবস্থাতেই নয়।
জল খাই। ওর হাত আমার মাথায়।
--আরেকবার গরম কফি দিচ্ছি। আপনি একটু পরে স্নান করে নিন। তারপর খেতে দেব। আজ আরাম করুন। দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিন।
রীমার গলার স্বর কথা বলে—খেতে দেব, খেতে দেব। আরাম কর, আরাম কর। ঘুমিয়ে নাও, ঘুমিয়ে নাও।
আমার মুখে হাসি ফোটে। আহা বলুক, বলুক। রীমার গলা শুনতে চাই। ওকে আমি খুন করি নি। ভালবাসতাম, এখনও বাসি।
হঠাৎ সিরিকে বড় আপন মনে হয়।
মোহিনী কিচেনে গেছে। আমি কফিতে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছি। সারা শরীর জুড়ে অদ্ভূত প্রশান্তি। একটু পরে স্নানে যাব। ভাত খেয়ে ঘুমোব।
সুপ্রিয় নেই তো কী হয়েছে? মোহিনী আছে।
ঘরের গৃহিণী সচিব সখি তো বটেই। কিন্তু একটা কথা কানে খট করে লেগেছিল।
যুক্তি সাজাতে গিয়ে বলেছিল আমার মত বুড়ো মানুষের পক্ষে দু’ঘন্টার মধ্যে খুন করে লাশ গায়েব করা সম্ভব নয়।
বুড়ো মানুষ! কথাটা সত্যি, কিন্তু আমার খারাপ লাগছে কেন? কত বুড়ো আমি?
একটু ঝিমুনি এসেছিল। দরজায় খটখট আওয়াজে সোজা হয়ে বসলাম। কে এল?
ফের খটখট। আচ্ছা, এত অধৈর্য কেন? আর দরজার পাশে দেয়ালের গায়ে কলিং বেলের বাটন চোখে পড়ছে না?
বিরক্ত মুখে উঠে দরজা খুলতে যাই।
চার আগন্তুক। তিনটে কমবয়েসি ছেলে, আর একজন চশমা চোখে মাঝবয়েসি, বগলে একটা খাতা।
আমি কিছু বলার আগে সবচেয়ে ছোটটি কলকলিয়ে ওঠেঃ
“মেশোমশায়, আমরা পঞ্চায়েত অফিস থেকে আসছি। সামনে নির্বাচন। আপনার বাড়িতে ভোটার লিস্টের নামগুলো যাচাই করব”।
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।