“ওইটা একটা ঘোড়া বটে”! রবার্ট আঙুল তুলে একটা বাদামি ঘোড়ার দিকে ইশারা করল। মস্ত জোয়ান ঘোড়া, কপালে সাদা চাঁদ আর সামনের একটা পায়ে সাদাটে ছোপ।
সুন্দর ঘোড়াটি যেন ভ্যালেস্কোয়ার কোন পেইন্টিং থেকে বেরিয়ে চরে বেড়াচ্ছে।
“সবগুলিই বেশ ভাল’, পাবলো পালটা দিল, “তুমি ঘোড়া চেন”?
“হ্যাঁ”।
“বটে বটে, এদের মধ্যে কোন খুঁত চোখে পড়ছে”?
রবার্ট জর্ডান বুঝল এবার আসল পরীক্ষা। নিরক্ষর লোকটা এইভাবে তাকে বাজিয়ে দেখছে।
ঘোড়াগুলো এখনও মাথা তুলে ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রবার্ট আস্তাবলের বেড়ার দড়িদড়ার ফাঁক দিয়ে গলে ভেতরে ঢুকল।
তারপর মাখনরঙা ঘোড়াটার পাছায় দুটো চাপড় মারল। এখন ও বেড়ার দড়ির গায়ে হেলান দিয়ে গোলগোল ঘুরতে থাকা ঘোড়াগুলোকে মন দিয়ে দেখছে।
“লালচে ঘোড়াটার পেছনে একটা ঠ্যাং খোঁড়া।
ও পাবলোর দিকে না তাকিয়ে বলে চলল,” ঘোড়াটার খুর ভাঙা, তবে ঠিকমত নাল পরিয়ে নিলে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু শক্ত পাথুরে মাটির উপর বেশিক্ষণ চললে ও পারবে না”।
“ নিয়ে আসার সময়ই ওর খুর ওরকম ছিল”, পাবলো বলল।
“তোমার সেরা ঘোড়া হচ্ছে ওই বাদামী চাঁদকপালে জোয়ান ঘোড়াটা। কিন্তু ওর সামনের পায়ের শিনের হাড়ের উপরের দিকে একটা ফোলা মতন দেখতে পাচ্ছি—ওটা ভাল নয়”।
“ওটা কিছু নয়”, পাবলো বলল, “এটা তিনদিন আগের চোট। কিছু হবার হলে অ্যাদ্দিনে হয়ে যেত”।
এবার ও ত্রিপল সরিয়ে জিন আর রেকাব দেখাতে শুরু করল। দুটো সাধারণ পশুপালকদের জিন-- অনেকটা আমেরিকানদের ব্যবহৃত জিন আর রেকাবের মত, আর ভারী এবং জমকালো ভ্যাকেরো জিন যাতে কারিগরের হাতে যত্ন করে তৈরি চামড়ার ঢাকনাওলা রেকাব রয়েছে।
বাকি দুটো কালো চামড়ার মিলিটারি জিন।
“একজোড়া সিভিল গার্ডকে মেরেছিলাম”, পাবলো দুটো মিলিটারি জিনের ব্যাপারটা খোলসা করে।
“বড় শিকার”!
“ ওরা সেগোভিয়া আর সান্তা মারিয়া দেল রিগালের পথের মাঝে ঘোড়া থেকে নেমেছিল, একটা ঠেলাওয়ালার কাগজ পরীক্ষা করবে।
আমরা ঘোড়াগুলোর কোন ক্ষতি না করেও ওদের মারতে সফল হয়েছিলাম”।
“অনেক সিভিল গার্ড মেরেছ নাকি”? রবার্ট জর্ডানের কৌতুহল।
“বেশ ক’টা। তবে শুধু এই দুটোর বেলায় ঘোড়াগুলো অক্ষত রয়েছে”, পাবলো জানায়।
‘পাবলোই আরেভালোতে ট্রেন উড়িয়ে দিয়েছিল”, আনসেলমোর গর্বিত উক্তি- “এই হচ্ছে আমাদের পাবলো”।
“ আমাদের সঙ্গে একজন বিদেশি ছিল। বিস্ফোরণটা ওর কীর্তি”, পাবলো বলে, “তুমি চেন নাকি”?
“নামটা কী”?
“আমার মনে নেই। একটু অন্যরকমের নাম”।
“দেখতে কেমন”?
“তোমার মত ফর্সা, তবে এতটা লম্বা না। বড় বড় হাত, ভাঙা নাক”।
“কাশকিন”, রবার্ট জর্ডানের ঘোষণা—‘নির্ঘাৎ কাশকিন”।
“ঠিক”, পাবলো সায় দেয়”, “বোধহয় ওই রকম একটা বিরল নাম। কী হল তার”?
“এপ্রিল নাগাদ মারা গেছে”।
“সবার সঙ্গে এরকমটাই হচ্ছে”, পাবলো ফের গোমড়ামুখো- “আমাদের সবারই এই হাল হবে”।
“সব মানুষই এভাবে একদিন মারা যায়”, আনসেলমো বলে, “সবারই একদিন অন্ত হয়। তোমার হয়েছেটা কী বল দেখি! কিসে পেট কামড়াচ্ছে”?
“ওদের শক্তি অনেক বেশি”। পাবলো যেন নিজেকেই শোনাচ্ছে।
এবার ঘোড়াগুলোর দিকে তাকিয় বলএ লাগল, “ওদের কত শক্তি তা নিয়ে তোমার কোন ধারণা নেই। আমি দেখতে পাচ্ছি যে যত দিন যাচ্ছে, ওদের শক্তি বাড়ছে, আগের চেয়ে আরও বেশি অস্ত্র, আরও রসদ, আরও গোলাবারুদ।
আর এখানে আমি কী করছি? ঘোড়াগুলো নিয়ে অপেক্ষায় আছি। কীসের অপেক্ষা? কীসের ভবিষ্যৎ?
শিকারীর তাড়া খাওয়া জন্তুর মত পালানো এবং মরে যাওয়া। আর কিছু নয়”।
“তুমি খালি শিকার হবে কেন, তুমিও তাদের শিকার করবে”, আনসেলমো বলে।
“না”, পাবলো উত্তর দেয়, “আর নয়। এবার যদি এই পাহাড় ছে ড়ে সরে পড়তে হয়, কোথায় যাব? আর কোনও জায়গা আছে? জবাব দাও”।
“স্পেনে পাহাড়ের কমতি নেই। এখান থেকে বেরোলে সিয়েরা দে গ্রেদোসে যাওয়া যেতে পারে”।
“ আমাকে ওসব বলে লাভ নেই”, পাবলোর গলায় বিষাদের ঢেউ, “আমি শিকার শিকার খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। এখানে আমরা বেশ আছি।
এখন তুমি যদি একটা ব্রীজ উড়িয়ে দাও, ওরা আমাদের শিকারী কুকুরের মত তাড়া করে বেড়াবে।
যদি টের পায় যে আমরা এখানে আছি আর যদি প্লেন দিয়ে হামলা করে তাহলে ঠিক খুঁজে পাবে।
যদি ওরা আফ্রিকান মুরদের আমাদের পেছনে লেলিয়ে দেয়, তাহলেও ঠিক খোঁজ পাবে আর আমরা খাল্লাস হয়ে যাবো।
আমি এসব দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। শুনছ”?
এবার ও জর্ডানের দিকে ফিরল। “তুমি একটা বিদেশি। তোমার কী হক আছে এখানে এসে আমার উপরে হুকুম চালাবার? আমাকে কী করতে হবে সেটা তুমি বলে দেবে”?
রবার্ট জর্ডান বলে, “তোমাকে কী করতে হবে সে নিয়ে আমি একটা কথাও বলি নি”।
“বল নি, কিন্তু পরে বলবে। এটাই তো খারাপ”।
ও দুটো ঝোলার দিকে ইশারা করল, যেগুলো ঘোড়াদের পরীক্ষা করার সময় রবার্ট জর্ডান নামিয়ে রেখেছিল। ঘোড়াদের দেখার পরে ওর মনে এইসব চিন্তা চাগিয়ে উঠেছে,
আর যেই বুঝল যে জর্ডান ঘোড়ার ব্যাপারে জানে টানে, অমনই ওর মুখ গেছে খুলে ।
ওরা তিনজন এখন দড়ি দিয়ে ঘেরা আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে। বাদামী তেজি ঘোড়াটির মসৃণ চামড়ায় রোদ্দুরের টুকরো চকচক করছে।
পাবলো ওটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর পা দিয়ে ঝোলা দুটো ঠেলে দিয়ে বলল—“এগুলোই খারাপ ব্যাপার”।
“আমি শুধু কর্তব্য পালন করতে এসেছি”, রবার্ট পাবলোর দিকে তাকালো, “যারা যুদ্ধটা পরিচালনা করছে আমি শুধু তাদেরই আজ্ঞাধীন। তোমার কাছে সাহায্য চাইলে তুমি না করতে পার। তখন অন্য লোক খুঁজে নেব। এখনও তোমার কাছে কিছু চাইনি। আমাকে যে কাজটা করতে বলা হয়েছে সেটা আমাকে করতেই হবে। এবং কাজটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ সেটা নিয়ে আমি তোমার সামনে কসম খেতে পারি।
ঠিক আছে যে আমি বিদেশি, কিন্তু সেটা কি আমার দোষ? এখানে জন্মালেই ভাল হত”।
“আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এখানে কোন উপদ্রব না করা।
পাবলো মুখ খুললো,”আমার কর্তব্য শুধু আমার সঙ্গে যারা রয়েছে তাদের জন্যে, এবং আমার নিজের জন্যে”।
“হ্যাঁ, তোমার নিজের জন্যে তো বটেই”, আনসেলমোর তেতো স্বর, “বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছি তোমার চিন্তা শুধু নিজেকে নিয়ে আর ওই ঘোড়াগুলোকে নিয়ে।
যতদিন তোমার কাছে কোন ঘোড়া ছিল না, ততদিন তুমি আমাদের সাথী ছিলে, যেই ঘোড়ার মালিক হয়েছ অমনই তোমার হাবভাব বদলে গেল।
তুমি এখন একজন পুঁজিপতির থেকে আলাদা কিছু নও”।
“এটা অন্যায় অভিযোগ”, পাবলোর প্রতিবাদ, “আমি সবসময় ঘোড়াগুলোকে আমাদের উদ্দেশ্য পালনে এগিয়ে দিই”।
“এই এত্তটুকু’, আনসেলমোর বিদ্রূপ। “আমার হিসেবে রত্তিভর।
চুরি করতে? হ্যাঁ, খাবার লুঠতে? হ্যাঁ, হ্যাঁ। খুন করতে? হ্যাঁ। লড়াই করতে? না না”।
“বুড়ো হয়েছ, বেশি মুখ চালালে বিপদে পড়বে”।
“আমি এমন বুড়ো যে কাউকেই ভয় পাই না”। আনসেলমো আরও বলে,”এমন বুড়ো যে ঘোড়ার মালিক নয়”।
“তুমি এমন বুড়ো যার আয়ু বেশি নেই”।
“আমি এমন বুড়ো যে যতদিন না মরব ততদিন বেঁচে থাকব’, আনসেলমোর জবাব, “আর আমি খ্যাঁকশেয়ালদের ভয় পাই না”।
পাবলো চুপচাপ ঝোলা উঠিয়ে নিল।
“নেকড়েদেরও না”, আনসেলমো অন্য ঝোলাটা তুলে নিতে নিতে ফুট কাটে, “অবশ্যি তুমি নেকড়ে হলে”।
“মুখটা বন্ধ রাখ”, পাবলো খিঁচিয়ে ওঠে, “বুড়ো, তুমি বড্ড বকবক কর”।
“হ্যাঁ, তুমি যা বলবে যা করবে-- সে’তো মানতেই হবে”, বোঝার ভারে ঝুঁকে পড়া আনসেলমো বলে।
“কার এবার খিদে পেয়েছে, জলতেষ্টা পেয়েছে? ওহে গেরিলা লীডার, এগিয়ে চল। আমাদের কোন খাবারের জায়গায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাও”।
উঁহু, শুরুটা ভাল হল না। রবার্ট জর্ডান ভাবে। তবে আনসেলমো একটা লোক বটে। এরা ভাল হলে খুবই ভাল। যখন ভাল হয় তখন এদের মত কেউ নয়।
আবার যখন খারাপ হয় তখন এদের মত এত খারাপ আর কেউ হতে পারে না। আনসেলমো যখন আমাদের এখানে নিয়ে এল তখন নিশ্চয়ই জানত যে ও ঠিক কী করছে।
কিন্তু আমার কোন কিছু ভাল লাগছেনা। একটুও না।
তবে একটা ভাল লক্ষণ বলতে হবে যে পাবলো নিজে মোট বইছে আর আমাকে ওর বন্দুকটা দিয়েছে।
হয়ত লোকটা বরাবরই এরকম। গোমড়া মুখ করে থাকাটাই বোধহয় এর স্বভাব।
না, রবার্ট নিজেকে সাবধান করল, চোখ ঠেরে লাভ নেই। আগে ও কিরকম ছিল তার তুমি কী জান! কিন্তু এটা দেখতে পাচ্ছ যে ও ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে আর সেটা এখনও লুকোনোর চেষ্টা করছে না। লুকোতে শুরু করলেই বুঝতে হবে যে ও একটা সিদ্ধান্ত নি য়ে ফেলেছে—এটা যেন মনে থাকে।
প্রথমবার বন্ধু বন্ধু ভাব দেখাবে, মানে ও একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
আহা, চমৎকার সব ঘোড়া! খুব সুন্দর। অবাক লাগছে, তখন কেন মনে হল যে ঘোড়াগুলো পাবলোকে অনুভূতিপ্রবণ করে তোলে? বুড়োর কথাই সত্যি।
ঘোড়াগুলো পেয়ে পাবলো হয়েছে রঈস, তখন থেকেই তাকে জীবনকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগের চিন্তা পেয়ে বসেছে।
শিগগিরই ওর কষ্ট হবে—কেন ঘোড়দৌড়ের জকি হতে পারছে না ভেবে।
বেচারা পাবলো! একটুর জন্য জকি হতে পারেনি।
এই চিন্তাটা ওকে বেশ তৃপ্তি দিল। বনের মধ্যে দুটো ঝুঁকে পরা পিঠ আর দুটো ভারি বোঝার ক্রমাগত এগিয়ে চলা দেখতে দেখতে ওর মুখে হাসি ফুটল।
দিনের মধ্যে একবারও নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা তামাসা করেনি, এখন করার পর মন হালকা হয়ে গেছে।
ধ্যাৎ , তুমি নিজেও অন্যদের মত হয়ে যাচ্ছ—গোমড়ামুখো!
সেনাপতি গোলজের সামনে ও নিঃসন্দেহে গম্ভীর এবং গোমড়ামুখো হয়েছিল। এই কাজের দায়িত্বের ভার ওকে খানিক অভিভূত করে দিয়েছিল।
হ্যাঁ, খানিকটা নয় অনেকটা। গোলজ্ হচ্ছে স্ফুর্তিবাজ, আমুদে স্বভাবের। রওনা হওয়ার আগে রবার্টকেও খানিকটা হাসিখুশি করতে চেয়েছিল, পারেনি।
একটু ভাবলে খেয়াল হয় --যত সেরা লোকজন সবাই বেশ আমুদে, হাসিখুশি। স্ফুর্তিবাজ হওয়াই ভাল, আর এটা একটা অন্য জিনিসেরও লক্ষণ।
মানে, যতক্ষণ বেঁচে রইলে ততক্ষণ তুমি অমরত্বের স্বাদ পেলে। এবার বোধহয় একটু জট পাকিয়ে গেল। আমুদের মধ্যে অনেকেই আর বেঁচে নেই।
শুধু হাতেগোণা ক’টা হতচ্ছাড়া এখনও টিকে আছে। আর খোকা, এখন থেকেই যদি এই লাইনে ভেবে চল তাহলে তুমিও আর বেশি দিন নেই।
ওহে বহুদিনের সাথী, ওহে কমরেড! এবার এইসব ভাবনাচিন্তার ঘরে তালা লাগাও।
তুমি এখন ব্রীজ ওড়াতে এসেছ, নাকি চিন্তা করতে! উফ্ বড্ড খিদে পেয়েছে। মনে হয় পাবলো ব্যাটা ভালো খায় দায়।
২
এরা ঘন জঙ্গল এবং গাছের সারি পেরিয়ে এবার একটি পেয়ালার আকারের উপত্যকায় এসে পড়েছে।
রবার্ট বুঝতে পারল যে গেরিলা শিবির নিশ্চয়ই গাছের মাথার উপর দিয়ে জেগে থাকা খাড়া শিলাখন্ডের নিচে হবে।
হ্যাঁ এটা একটা শিবির বটে, ভাল শিবির। এমন যে একেবারে ওর সামনে গিয়ে হাজির হলে তবেই দেখতে পাবে, তার আগে নয়। আকাশ থেকে নজর করাও সম্ভব নয়।
ওপর থেকে এর কোন হদিস পাওয়া যাবে না, যেন ভালুকের গুহা। তবে সুরক্ষা ব্যবস্থা একটু ভাল।
উপত্যকার গায়ে খাড়া উঠে যাওয়া শিলাখণ্ডের দেয়ালের মাঝে একটি গুহামুখ দেখা যাচ্ছে। সেই দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে একটা লোক পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে।
বন্দুকটা পাথুরের দেয়ালের গায়ে ঠেকিয়ে রাখা। ও ছুরি দিয়ে একটা গাছের ডাল চেঁছে সাফ করতে মগ্ন। তিনজনের দলটা কাছে পৌঁছে গেলে ও মাথা তুলে এক পলক দেখে ফের চাঁছতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
“হ্যালো, এরা কারা”?
“ বুড়ো আর ডিনামাইট-ম্যান”। পাবলো ওকে জবাব দিয়ে গুহার মুখে পিঠের বোঝা নামিয়ে দিল। আনসেলমোও তাই করল এবং রবার্ট জর্ডান পিঠের কার্বাইন নামিয়ে পাথরে দেয়ালে ঠেকিয়ে রাখল।
“গুহার এত কাছে ওগুলো রেখো না”, চাঁছতে ব্যস্ত লোকটার কালো আলসে সুন্দর জিপসি চেহারায় একজোড়া নীল চোখ।
ওর গায়ের রঙে রোদে পোড়া চামড়ার আভাস, “ভেতরে আগুন জ্বলছে যে”।
“ওঠ দেখি, নিজে হাত লাগিয়ে বোঝাটাকে সরাও। ওই গাছটার নীচে রাখো”। পাবলোর গলায় হুকুমের সুর। জিপসি না নড়ে ছাপার অযোগ্য কিছু শব্দ উচ্চারণ করল।
তারপর বলল,”ওখানেই থাক, নিজেকে বিস্ফোরণে উড়িয়ে দাও”। তারপর একটু অলস ভঙ্গিতে বলল, “হতে পারে এতে তোমার অসুখ-বিসুখ সব সেরে যাবে”।
রবার্ট জিপসির পাশে বসে আলাপ জুড়ল, “কী বানাচ্ছ গো”?
জিপসি দেখাল—চার অক্ষরের আকারে একটা ফাঁদ। ও তখন ফাঁদের উপরের আড়কাঠিটা চেঁছে তৈরি করছিল।
“শেয়াল ধরার ফাঁদ, ওপরের এই কাঠটা গর্তের মধ্যে পড়ে ওদের পিঠ ভেঙে দেবে”। ও জর্ডানকে দেখে দাঁত বের করে। “এই দেখ, এমনই করে”। ও হাতের ভঙ্গিতে দেখিয়ে দিল কেমন করে ফাঁদের মুখ বন্ধ হবে আর ভারি কাঠটা শিকারের পিঠে পড়বে। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে হাতটা টেনে নিল, তারপর দু’হাত ছড়িয়ে দিয়ে বোঝাল ফাঁদে পড়া খ্যাঁকশিয়ালের ভাঙা পিঠ। “খুব প্র্যাকটিক্যাল, বুঝলে”!
আনসেলমো তাচ্ছিল্যের ভাবে বলল, “ও ব্যাটা একটা জিপসি। যদি খরগোস ধরে তো বলবে শেয়াল। আর যদি সত্যিই শেয়াল ধরে তো বলবে ফাঁদ পেতে হাতি ধরেছি”।
“আর যদি হাতি শিকার করি, তাহলে”? জিপসি তার সাদা দাঁত দেখিয়ে হাসল এবং রবার্ট জর্ডানকে চোখ মারল।
“তাহলে ব্যাটা বলবে যে একটা ট্যাংককে ঘায়েল করেছে”, আনসেলমোও ছাড়ার পাত্র নয়।
“ আমি এবার একটা ট্যাংকই ধরব”, জিপসি উবাচ, “ট্যাংককে বন্দী করব, তখন তোমার যা ইচ্ছে বলে দিও”।
“জিপসিগুলো কেবল বাক্যবাগীশ, কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা”, আনসেলমো বলল।
জিপসি ফের রবার্ট জর্ডানকে চোখ মেরে ডালটা চাঁছতে লেগে গেল।
পাবলোকে দেখা যাচ্ছেনা। ও এখন গুহার ভেতরে। রবার্টের আশা, নির্ঘাৎ খাবারের ব্যবস্থা করতে গেছে। ও জিপসির পাশে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে রইল।
বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলো গাছের মাথা ছাপিয়ে ওর লম্বা করে মেলে দেয়া পায়ে উষ্ণ আরাম দিচ্ছে। গুহার ভেতর থেকে খাবারের গন্ধ আসছে।
তেলের গন্ধ, পেঁয়াজের গন্ধ এবং মাংস ভাজার গন্ধ ওর পেটের ভেতর খিদের অনুভূতিকে চাগিয়ে তুলল।
“আমরা একটা ট্যাংক দখল করতেই পারি, এমন কিছু কঠিন কাজ নয়”।
“ এইগুলো দিয়ে”? জিপসি জবাবে জর্ডানকে ঝোলাগুলোর দিকে ইশারা করে।
“হ্যাঁ, আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব”। জর্ডান জিপসিকে উৎসাহিত করে, “একটা ফাঁদ বানালেই হবে। তোমার পক্ষে এমন কিছু নয়”।
“শুধু তুমি আর আমি”? জিপসি অবাক।
“হ্যাঁ, কেন নয়”? জর্ডান অবিচলিত।
“হেই”, জিপসি আনসেলমোকে বলে, “ওই ঝোলাদুটো নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাও; শুনতে পাচ্ছ? ওগুলো খুব কাজের”।
আনসেলমো ঘোঁত ঘোঁত করে রবার্টকে বলে, আমি যাচ্ছি মদ খেতে”।
রবার্ট জর্ডান উঠে পড়ে এবং ঝোলাদুটোকে গুহামুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে সাবধানে গাছের গায়ে দু’দিক থেকে ঠেকিয়ে রেখে দেয়। ও ভালকরেই জানে ঝোলাদুটোর মধ্যে কী আছে? তাই দুটোকে কাছাকাছি রাখা ওর মনঃপুত নয়।
জিপসি ওকে বলে, “আমার জন্যে এক কাপ নিয়ে এস”।
রবার্ট ফের জিপসির পাশে বসে পড়ে, “ভেতরে ওয়াইন আছে নাকি”?
“কেন থাকবে না? অনেক। একটা ভিস্তি পুরো ভর্তি। অন্ততঃ আদ্দেকটা তো হবেই”।
“আর খাবারদাবার, আছে তো”?
“ সব আছে; আরে আমরা জেনারেলের মত খাওয়াদাওয়া করি”, জিপসির জবাব।
“আচ্ছা, এই যুদ্ধে জিপসিরা কী করে, ওদের ভূমিকা কী”? রবার্টের প্রশ্ন।
“ কী আবার! ওরা জিপসিগিরি করে”।
“তা বেশ, ওটাও বড় কাজ”।
“সবচেয়ে বড় কাজ”, জিপসি বলে, “আচ্ছা, ওরা তোমায় কী নামে ডাকে”?
“রবার্তো, আর তোমাকে”?
“রাফেল। আচ্ছা, ওই ট্যাংকের কথাটা—সত্যি তো”?
“নিশ্চয়ই, কেন নয়”?
গুহার মুখে আনসেলমোর উদয়, হাতে লাল মদ ভর্তি একটা পাথরের বড়সড় বাটি। হাতের আঙুল থেকে ঝুলছে তিনটে কাপ।
“দেখ, ওদের কাছে কাপ-টাপ সবই রয়েছে”।
ওর পেছন পেছন এল পাবলো।
‘খাবার জলদি আসছে”, ও বলল, “তোমার কাছে তামাক আছে”?
রবার্ট জর্ডান একটা ঝোলা খুলে তার ভেতরের পকেট হাতড়ে রাশিয়ান সিগারেটের একটা চ্যাপটা বাক্স বের করল। এগুলো ও গোলজের হেডকোয়ার্টারে পেয়েছিল।
ঢাকনার ধারে বুড়ো আঙুলের নখ চেপে ও বাক্সটা খুলে পাবলোর দিকে বাড়িয়ে দিল।
পাবলো ওর বিশাল থাবায় ছ’টা সিগারেট তুলে নিয়ে একটা আলোর দিকে তুলে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সরু লম্বাটে সিগারেট, ঠোঁটে লাগানোর জায়গায় পেস্টবোর্ডের ফাঁপা ফানেলের মত।
“এগুলোতে তামাক কম, হাওয়া বেশি’, পাবলো বলল, “আমি আগে দেখেছি। ওই যে অদ্ভূত নামের বিদেশি এসেছিল –ওর কাছে”।
“কাশকিন”, রবার্ট জর্ডান উত্তর দিয়ে আনসেলমো এবং জিপসি’র দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিল। ওরা একতা করে তুলে নিল। জর্ডান “আরও নাও’ বলায় ওরা আর একটা করে নিল।
তখন জর্ডান ওদের দুজনকে আরো চারটে করে দিল। ওরা সিগারেট ধরা হাতে দু’বার মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদনের ভঙ্গিতে ধন্যবাদ দিল।
“হ্যাঁ , ওই নামটি কদাচিৎ শোনা যায়”, পাবলোর অভিমত।
আনসেলমো পাথরের জামবাটিতে কাপ ডুবিয়ে জর্ডানকে দিয়ে বলল,”এই নাও মদ, ধর”। তারপর বাকি দুটো কাপ ডুবিয়ে একটা জিপসিকে দিয়ে আর একটা নিজে নিল।
পাবলো জিজ্ঞেস করল, “আমার জন্যে নেই নাকি”?
আনসেলমো ওকে নিজের কাপটা দিয়ে উঠে গিয়ে ভেতরে থেকে আর একটা নিয়ে এল। তারপর মদের বাটিতে কাপটা ডুবিয়ে বুড়ো পুরো ভরে নিল।
তারপর সবাই মিলে কাপ ঠোকাঠুকি পর্ব সারল।
মদটি ভালো। সামান্য ছাগলের চামড়ার মদের বোতলের গায়ের এবং রেজিনের গন্ধ , কিন্তু চমৎকার হালকা মদ। জিভের ডগায় তাজা স্বাদ।
রবার্ট জর্ডান ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছিল। ওর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীরে পানীয়ের ক্রমশঃ ছড়িয়ে পরা উষ্ণতাটি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল।
“খাবার এক্ষুণি আসবে”, পাবলো জানিয়ে দিল,”আর ওই অদ্ভূত নামের বিদেশিটি, ও কেমন করে মারা গেল”?
“ও ধরা পড়ে যায়, তারপর আত্মহত্যা করে”।
“কীভাবে ঘটল”?
“ও আহত হয়েছিল। কিন্তু বন্দী হতে চায়নি, তাই --”।
“আমি সব খুঁটিনাটি জানতে চাই”।
“আমি ঠিক জানি না”, রবার্ট মিথ্যে কথা বলল। ও সবই জানত, খুঁটিনাটি সমেত। কিন্তু এখন এসব বলা উচিত হবেনা।
“ও আমাদের দিয়ে দিব্যি গালিয়ে নিয়েছিল যে যদি সেই ট্রেন ওড়ানোর মামলাটায় ও ঘায়েল হয়, পালাতে না পারে তাহলে আমরা যেন ওকে গুলি করে মেরে ফেলি”।
পাবলো বলতে থাকে,”ওর কথাবার্তা ধরণ একটু অস্বাভাবিক ছিল”।
রবার্ট জর্ডান ভাবছিল—ও বোধহয় তখন থেকেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটত;-- আহা বেচারা কাশকিন!
“ওর কিন্তু নিজেকে মেরে ফেলার ব্যাপারে অনেক কুসংস্কার ছিল’, পাবলো বলল,”হ্যাঁ, আমাকে বলেছিল। এছাড়া ধরা পড়ার পর যন্ত্রণা পাওয়ার কথা ভেবে ওর খুব আতংক হত”।
“ও কি তোমাকে এটাও বলেছিল”? রবার্টের প্রশ্ন।
“হ্যাঁ”, জিপসি বলল, “এই ধরণের কথা ও আমাদের সবাইকে বলে বেড়াত”।
“তুমিও কি ওই ট্রেনের ব্যাপারটায় ছিলে”?
“হ্যাঁ, আমরা সবাই ট্রেনেরটায় ছিলাম”।
“ও কিছু অদ্ভূত কথা বলত বটে, কিন্তু খুব সাহসী ছিল”, পাবলো’র মন্তব্য।
আহা বেচারা কাশকিন! এখানে এসে ও বোধহয় ভাল’র চেয়ে মন্দ বেশি করেছে।
ও যে এত আতংকে ভুগছে আর ছটফট করছে-- এটা যদি আগে জানতে পেতাম! ওকে আগেই ফেরত নেয়া উচিত ছিল। এধরণের কাজে এসে তুমি ওই ধরণের কথা বলে বেড়াতে পার না। লড়াইয়ের ময়দানে এমন সব লোক চারপাশে থাকবে—এটা ভাবা যায়না।
এইধরণের কথা যারা অনবরত বলতে থাকে তারা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্বটি ভাল করে সমাধা করলেও শেষমেশ ক্ষতি বেশি করবে।
“হ্যাঁ, একটু অদ্ভূত, আর মনে হয় একটু ক্ষ্যাপাটে গোছের,” জর্ডান বলে।
“কিন্তু বিস্ফোরণ ঘটানোয় খুব নিপুণ”, জিপসীর মত, “আর দারুণ সাহসী”।
“কিন্তু ক্ষ্যাপাটে”, জর্ডান গুছিয়ে বলে, “দেখ, এই ধরণের কাজে মাথা খাটাতে হয় বেশি। আর মাথাটা ঠান্ডা রাখা খুব দরকার। এসব কী কথাবার্তা”?
‘বেশ, এবার তুমি বল”, পাবলো একটু তেতো, “যদি ব্রীজের ব্যাপারটায় তুমি ভালরকম আহত হও, তাহলে বলবে আমাকে ছেড়ে চলে যাও, তাই তো”?
“শোন”, রবার্ট জর্ডান জবাব দেয়ার আগে সামনে ঝুঁকে আর এক কাপ মদের বাটিতে ডুবিয়ে নিল, “মন দিয়ে শুনে নাও, যদি তোমাদের কারও কাছে কখনও কোন ভিক্ষে চাই, তবে সেটা ওইরকম সময়েই চাইব”।
“চমৎকার”, জিপসির গলায় প্রশংসার সুর,” এই হল গে’ সাচ্চা মানুষদের কথা বলার ধরণ! আহা, ওই যে আসছে”।
“তোমার খাওয়া তো হয়ে গেছে”, পাবলো বলল।
“তাতে কি! আমি আরও দু’বার খেতে পারি”। জিপসির গলায় উল্লাস,”আরে দেখ, কে নিয়ে আসছে”?
মেয়েটি লোহার ভারি রান্নার পরাতটি নিয়ে গুহার মুখ থেকে বেরোতে গিয়ে একটু নীচু হয়েছে।তখনই রবার্ট জর্ডানের চোখে পড়ল মেয়েটির মুখের একটি বিশেষ ভঙ্গী এবং একটা অদ্ভূত ব্যাপার। মেয়েটি হেসে বলল, “হোলা! কমরেড”! জর্ডান উত্তর দিল, “স্যালুদ”!
[1]জর্ডান সতর্ক ছিল যেন ওর মুখের দিকে প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে না থাকে, অথবা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে না নেয়। মেয়েটি ওর সামনে লোহার চ্যাপ্টা থালাটা নামিয়ে রাখল।
জর্ডান দেখল ওর বাদামী হাতজোড়া বেশ সুন্দর । এবার মেয়েটি ওর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসল। ঝকঝকে সাদা দাঁতের পাটি বাদামি ময়ূখে বেশ মানিয়েছে।
ওর গালের চামড়া আর চোখজোড়া একই রকম রোদে পোড়া বাদামি। ওর হনুর হাড় উঁচু, চপল চোখ আর লম্বাটে মুখে স্ফুরিত অধর।
ওর চুলের রঙ সোনালি কিন্তু তাতে রোদে পোড়া খেতের ফসলের মত কালো ছোপ। তবে মাথা জুড়ে ন্যাড়া করার চেষ্টায় ভোঁদড়ের চামড়ার রোঁয়ার মত লাগছে।
ও জর্ডানের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে নিল। তাতে চুলগুলো একবার সমান হয়ে ফের খাড়া হয়ে গেল।
রবার্ট জর্ডান ভাবল-মেয়েটার মুখটা খুব সুন্দর, মাথা ন্যাড়া না করলে আরও সুন্দর হত।
“এভাবেই আমার চুল আঁচড়াই”, মেয়েটা হেসে উঠল, “নাও, খেতে শুরু কর। আমার দিকে অমন করে চেয়ে থেকো না।
চুলের ছাঁট ভাল্লাদোলিদে ওদের কীর্তি। মাথা মুড়িয়ে দিয়েছিল, এখন একটু গজাতে শুরু করেছে”।
মেয়েটি এখন ওর মুখোমুখি বসেছে, হাতদুটো হাঁটুর উপর ভাঁজ করে রাখা। জর্ডান ওর দিকে তাকিয়ে হাসল, মেয়েটি মুচকি হেসে জবাব দিল। ফুলপ্যাণ্ট থেকে বেরিয়ে আসা লম্বাটে পা-জোড়া পরিষ্কার।
ও দুহাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে ধরায় জর্ডান ধূসর শার্টের আড়ালে ওর ছোট এবং উর্ধমুখী স্তনের আভাস ভালরকম টের পাচ্ছে।
যতবার রবার্ট জর্ডান ওর দিকে তাকায়, গলার ভেতরে কিছু একটা দলা পাকিয়ে ওঠে।
আনসেলমো বলল, “আলাদা করে প্লেট-টেট পাবে না। তোমার ছুরিটা তুলে নিয়ে হাত চালাও”।
মেয়েটি আগেই লোহার থালার গায়ে চারটে কাঁটা সাজিয়ে দিয়েছে, তবে কাঁটার দিকটা নামিয়ে। ওরা থালা থেকে খেতে শুরু করল।
স্প্যানিশ নীতি মেনে কেউ কথা বলছে না। খাবার বলতে পেঁয়াজ এবং সবুজ গোলমরিচ দিয়ে রান্না করা খরগোসের মাংস, সঙ্গে মটরশুঁটি দেয়া লাল মদ।
রান্নাটা খাসা হয়েছিল। হাড়ের থেকে মাংস সহজে আলগা হচ্ছে। সসও চমৎকার।
রবার্ট জর্ডান খেতে খেতে আর এক পেয়ালা মদ মেরে দিল। মেয়েটি খাবার সময় ওকে সারাক্ষণ নজরে রেখেছিল। অন্যেরাও ওর খাওয়া আর খাবার কায়দাটা মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
জর্ডান ওর পাতের সসের শেষ চিহ্নটুকু রুটির একটা টুকরো দিয়ে চেঁছেপুঁছে নিল। খরগোসের হাড়গুলো একদিকে জড়ো করল, সস যেখানে লেগে ছিল সেখানটা পরিষ্কার করল।
তারপর রুটি দিয়ে কাঁটা সাফ করল, ছুরিটা মুছে সরিয়ে রাখল, শেষে রুটির ওই টুকরো খেয়ে ফেলল। ফের ও মদের হাঁড়িতে নিজের কাপটা ডুবিয়ে ভরা কাপ ঠোঁটে ঠেকাল।
আদ্দেকটা খালি করে ফেলল।
মেয়েটা তখনও ওকে অপলক দেখছে। কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলতে জর্ডানের গলায় আবার কিছু একটা আটকে গেল।
“তোমায় কী নামে ডাকে”?
ওর গলার আওয়াজে পাবলো চমকে মাথা তুলে তাকাল, তারপর উঠে চলে গেল।
“মারিয়া; আর তোমার”?
“রবার্তো। এই পাহাড়ি অঞ্চলে অনেকদিন হল”?
“তিন মাস”।
“তিন মাস”? জর্ডান অবাক হয়ে ওর চুলের দিকে নজর দিল। মেয়েটি লজ্জায় আবার তার ছোট করে ছাঁটা ঘন চুলে হাত বোলালো।
এবার তারা নড়ে উঠল যেন পাহাড়ের গায়ে ফসলের মাঠে এক ঝলক দমকা হাওয়ার সরসর।
“ন্যাড়া করে দিয়েছিল। ভল্লাদোলিদের জেলে নিয়ম করে প্রত্যেক মাসে ন্যাড়া করে। তিনমাসে এইটুকু বেড়েছে।
আমি ট্রেনে ছিলাম। ওরা আমাকে দক্ষিণের অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছিল। ট্রেনে বিস্ফোরণ ঘটার পর অনেক বন্দীকে ওরা আবার ধরে ফেলে।
আমি বেঁচে যাই, এদের সঙ্গে পালিয়ে আসি”।
“আমি ওকে আবিষ্কার করি, কয়েকটা বড় পাথরের খাঁজে লুকিয়েছিল”, জিপসি উবাচ,
“যখন আমরা ফিরে আসছিলাম, সেই সময়। মাগো, কী কুচ্ছিত দেখতে! নিয়ে তো এলাম, কিন্তু অনেকবার ভেবেছি একে ছেড়ে যেতে হবে”।
“কিন্তু আরেকজন! যে ওই ট্রেনের কাছে ছিল”? মারিয়ার জিজ্ঞাসা, “মানে, সোনালি চুলের, বিদেশি! সে কোথায়”?
“মারা গেছে”, রবার্টের জবাব,”গত এপ্রিলে”।
“এপ্রিলে? কিন্তু ট্রেনের হামলাটাও তো এপ্রিল মাসেই---“?
“হ্যাঁ, ও মারা যায় ট্রেনের ঘটনাটার দশদিন পরে”।
“আহা বেচার!” মারিয়ার গলায় সহানুভূতির সুর, “খুব সাহসী ছিল, আর তুমি? তুমিও বুঝি ওইসব কর”?
“হ্যাঁ”।
“কখনও রেলগাড়ি উড়িয়ে দিয়েছ”?
“হ্যাঁ, তিনটে ট্রেন”।
“এখানে”?
“এস্ত্রেমাদুরায়। এখানে আসার আগে এস্ত্রেমাদুরায় ছিলাম। ওখানে আমাদের জবরদস্ত কাজ চলছে। আমাদের অনেকে এখনও এস্ত্রেমাদুরায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে”, রবার্টের কথা।
“কিন্তু এখন এই পাহাড়ি এলাকায় কেন এসেছ”?
“আমি এসেছি ওই সোনালি চুলের জায়গায়। এছাড়া, এই অঞ্চলটাকে আমি আন্দোলন শুরু হবার আগে থেকেই চিনি”।
“ভাল করে চেন”?
না, খুব ভাল করে নয়। তবে আমি চটপট শিখে ফেলতে পারি। আমার কাছে একটা ভাল ম্যাপ আছে, একজন ভাল গাইড আছে”।
“ওই বুড়োটা তো”? মারিয়া ঘাড় হেলায়,”বুড়োমানুষটি বড্ড ভাল”।
“ধন্যবাদ”, আনসেলমো বলে মারিয়াকে। হঠাৎ রবার্ট জর্ডানের সম্বিৎ ফেরে। এখানে খালি মারিয়া আর ও রয়েছে এমন তো নয়, আরও লোকজন আছে।
এটাও টের পায় যে মেয়েটার দিকে সোজাসুজি তাকাতে কষ্ট হচ্ছে, কারণ অমন করলেই ওর গলার স্বর পালটে যায়।
এছাড়া ও স্প্যানিশ লোকজনের সঙ্গে মেলামেশার দ্বিতীয় নিয়মটি ভঙ্গ করেছে! সেটা হলঃ
পুরুষদের দাও তামাক, মেয়েরা যেখানে চায় যাক।
হঠাৎ খেয়াল হয় যে এসব নিয়ে ওর কোন চাপ নেই। কুছ পরোয়া নেহি! এমন অনেক জিনিস আছে যা নিয়ে ও কেয়ার করেনা।
তাহলে এটা নিয়েই বা কেন মাথা ঘামাবে?
“তোমার মুখশ্রী বড় সুন্দর”, ও মারিয়াকে বলে,”যদি তোমাকে চুলকাটার আগে দেখার কপাল হত”!
“চুল ঠিক হয়ে যাবে। ছ’মাসেই এমন লম্বা হবে যে—“, মারিয়া বলে।
“হ্যাঃ , যখন ট্রেন থেকে ওকে এনেছিলাম তখন যদি দেখতে! এমন কুছিত যে তোমার গা গুলিয়ে উঠত”!
“ত্তুমি এখন কার সঙ্গে আছ”? জর্ডান কথা ঘোরাতে দেবে না। “পাবলো’র”?
মারিয়া হেসে উঠে জর্ডানের হাঁটুতে চাপড় মারল।
“পাবলো? তুমি পাবলোকে দেখেছ”?
“তাহলে কি জিপসি রাফেলের? ওকে তো দেখেছি”।
“রাফেলেরও না”।
“ও কারোর নয়”। জিপসি বলল, “অদ্ভূত মেয়েছেলে। কারোরই নয়। তবে রান্নার হাতটা দারুণ”!
“সত্যি কারও নও”? রবার্ট এবার মারিয়াকে সোজাসুজি প্রশ্ন করে।
“আমি কারোর নই। কেউ নেই। ঠাট্টা করেও না, সিরিয়াস হয়েও কারও না। এমনকি তোমারও না”।
“না বলছ”? রবার্ট ফের জিজ্ঞেস করে আর গলার ভেতর পাকিয়ে ওঠা দলাটা টের পায়।
“বলে দিয়ে ভাল করলে। আমারও কোন মেয়েমানুষের জন্যে সময় নেই। সত্যি বলছি”।
“পনের মিনিটও নয়”? জিপসি চিমটি কাটে। “একঘন্টার চারভাগের একভাগও না”?
রবার্ট উত্তর দেয় না। মারিয়ার দিকে চোখ তুলে তাকায়। কিন্তু আবার গলার ভেতর এমন করে ডেলা পাকিয়ে ওঠে যে কিছু বলতে সাহস পায় না।
মারিয়া ওকে দেখে হেসে ফেলে ফের লজ্জায় রাঙা হয়ে যায় কিন্তু চোখ সরায় না।
রবার্ট বলল, “তুমি তো দেখছি লজ্জা পাচ্ছ । এরকম হরদম হয় নাকি”?
“কক্ষণো না”।
“এই তো আবার লজ্জায় লাল হলে”!
“তাহলে আমি গুহায় চলে যাচ্ছি”।
“একটু থাকো মারিয়া”!
“না”, মারিয়া এবার হাসছে না। “গুহায় চললাম”। মারিয়া এঁটো লোহার থালা, চারটে কাঁটা তুলে নিয়ে গুহার দিকে হাঁটা দিল।
ওর চলার ভঙ্গি খানিকটা বাচ্চা ঘোড়ার মত, তাতে মিশে আছে ছোট্ট পশুর কমনীয়তা।
“ তোমার আর কাপ লাগবে”? ও জিজ্ঞেস করল। জর্ডান এখনও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মারিয়া ফের লজ্জায় লাল হল।
“অমন কর না। আমাকে এমন অস্বস্তিতে ফেলছ—না, আমি এসব ভালবাসি না”।
“কাপগুলো রেখে যাও”, জিপসি বলে উঠল।
“এই নাও”। একটা কাপ মদের পাত্রে ডুবিয়ে তুলে ও জর্ডানের দিকে বাড়িয়ে দিল। জর্ডান কিন্তু দেখছে মারিয়া কেমন ভারি লোহার এঁটো থালা তুলে নিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে গুহার ভেতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে।
এবার রবার্ট জর্ডান জিপসিকে বলল, ”ধন্যবাদ”। মেয়েটি চলে যেতেই ওর গলার স্বর স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
“এই কিন্তু শেষবার। অনেক বেশি খাওয়া হয়ে গেছে”।
জিপসি উত্তর দিল, “ আরে আমরা এই পাথরের বাটিটা চেটেপুটে সাফ করে দেব। আরও আছে, আদ্দেক মশক ভর্তি মদ-- আমরা একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে রেখেছিলাম”।
“ওটাই পাবলোর শেষ অভিযান”, আনসেলমো মুখ খুলেছে, “তারপর থেকে শ্রীমান কিস্যু করেনি”।
“আচ্ছা, তোমরা মানে কয়জন”? জর্ডানের প্রশ্ন।
“আমরা সাত আর দু’জন নারী”।
“দু’জন”?
“হ্যাঁ, পাবলো’র মেয়েমানুষ”।
“ও; কোথায়”?
“গুহার মধ্যে। মেয়েটা কাজ চালানোর মত রান্না জানে। আমি তখন ওর রান্নার তারিফ করেছিলাম বটে, তবে সেটা ওকে একটু খুশি করার জন্যে।
আসলে ও ঘরোয়া কাজে পাবলোর মেয়েমানুষটিকে সাহায্য করে, এইটুকুই”।
“তা তিনি কেমন? মানে ওই যে পাবলোর মেয়েমানুষ”?
“সে একটি নমুনা”, জিপসি মিচকি হাসে, “বুনো স্বভাবের। একেবারে জঙলী। তুমি ভাবছ পাবলো কী কুৎসিৎ! যদি ওর মাগীকে দেখতে? তবে হ্যাঁ, হিম্মত আছে বলতে হবে!
পাবলোর থেকে একশ’গুণ সাহসী। কিন্তু স্বভাবটা ভারি বুনো”।
“ গোড়ার দিকে পাবলো খুব সাহস দেখিয়েছিল”। আনসেলমো বলে, “প্রথম দিকে ও খুব সিরিয়াস ছিল”।
“কলেরায় যত মরে তার চেয়ে অনেক বেশি লোক ও মেরেছে”, জিপসি’র বকবকানি শুরু হয়, “আন্দোলনের প্রথম দিকে ও টাইফয়েড মহামারিতে যত মরে, তার চেয়ে বেশি মেরেছে”।
“কিন্তু অনেক দিন হল ও কুঁড়ে আর ঢ্যামনা হয়ে গেছে। ওর মধ্যে মরার ভয় বাসা বেঁধেছে”।
‘তার কারণ ও শুরুতেই ঢের ঢের মানুষ মেরেছে”, জিপসি’র দার্শনিক ভঙ্গি, “ বিউবোনিক প্লেগে যত লোক মরেছিল তার চেয়ে বেশি পাবলোর হাতে মরেছে”।
“সে তো বটেই, তারসঙ্গে জুটেছে সম্পত্তির লোভ”, আনসেলমো বলে, “আজকাল মাল টানাও বেড়ে গেছে। এখন ও নামজাদা মাতাদোরের মত অবসর নেবার কথা ভাবছে।
হ্যাঁ, বুল-ফাইটার! কিন্তু অবসর নেয়া ওর কম্মো নয়”।
“ও যদি দল ছেড়ে লাইনের ওপারে ওদের সঙ্গে ভিড়ে যায়, ওরা ওর ঘোড়াগুলো কেড়ে নিয়ে ওদের ফৌজে যোগ দিতে বাধ্য করবে”।
জিপসি বলে চলেছে, “যদি আমার কথা ধর, ফৌজ নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই”।
“সে তো সব জিপসিরই মনের কথা”। আনসেলমো ফোড়ন কাটে।
“কেন হবে না? কোন ব্যাটা ফৌজে যেতে চায়”!
জিপসি ফের শুরু করে, “আমরা কি ফৌজে যোগ দেব বলে বিপ্লব করছি ? আমি লড়তে ভয় পাই না, লড়তে চাই। কিন্তু ফৌজে যোগ দিয়ে নয়”।
“আর সবাই কোথায়”? জর্ডান জানতে চায়। ওর বেশ আরাম লাগছে। ওয়াইন কাজ করছে, চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে।
বনভুমির জমিতে গা ঢেলে দিয়ে ও উঁচু গাছগুলোর মাথার ফাঁকে দেখতে পেল— পাহাড়ের সন্ধ্যার মেঘের দল অনেক উঁচুতে স্প্যানিশ আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে।
রবার্ট জর্ডানের কৌতুহল নিবৃত্ত করতে জিপসি বলতে শুরু করল, “ বাকিদের দু’জন গুহার ভেতর ঘুমুচ্ছে। দু’জন ওপরের ধাপে যেখানে আমাদের বন্দুকগুলো রাখা আছে, পাহারা দিচ্ছে। একজন নীচের ধাপে পাহারায় রয়েছে। তবে এখন বোধহয় সবাই ঘুমুচ্ছে”।
রবার্ট গড়িয়ে ওর দিকে পাশ ফিরল।
“বন্দুক? কী ধরণের”?
“একটা বিরল ধরণের বন্দুক। এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। ওটা একটা মেশিনগান”।
নিশ্চয়ই কোন অটোম্যাটিক বন্দুক—জর্ডান ভাবে।
“ওটার ওজন কত হবে”?
“একজন বইতে পারে বটে, তবে বেশ ভারী। এর তিনটে ঠ্যাং, যেগুলো ভাঁজ করে মুড়ে রাখা যায়। শেষ বড়সড় হামলার সময় ওটা পেয়েছিলাম, মানে ওই ওয়াইন লুটের আগেরটায়”।
“ তোমাদের কাছে এর জন্যে কত রাউন্ড গুলি আছে”?
“অনন্ত”, জিপসির বাগাড়ম্বর। “একটা অসম্ভব ভারী কেস’।
জর্ডান ভাবল, মনে হচ্ছে পাঁচশো রাউন্ড হবে।
“ওটায় গুলির বেল্ট লাগে, নাকি একটা গোলচাকা মত কেস”?
“একটা বড় লোহার চাকতি মত কেস যেটা বন্দুকের উপর চড়াতে হয়”।
আরে! রবার্ট জর্ডান ভাবল-- এটা একটা লুইস গান!
“মেশিনগানের বিষয়ে কিছু জান”? বুড়োটাকে জিজ্ঞেস করল।
“নাদা”! আনসেলমো উত্তর দিল, “কিস্যু না”!
“আর তুমি”? এটা জিপসিকে।
“জানি যে ওর থেকে দ্রুত অনেকগুলি গুলি বেরোয় আর নল এত গরম হয় যে ছুঁলে হাত পুড়ে যায়”, জিপসির গর্বিত উক্তি।
“ধুস্ এটুকু তো সবাই জানে”, আনসেলমোর গলায় তাচ্ছিল্যের সুর।
“হয়ত তাই”, জিপসি বলল, “কিন্তু ও তো আমার কাছে জানতে চাইছিল যে মেশিনটার ব্যাপারে কী জানি। যা জানি সব বলে দিলাম, ব্যস”।
তারপর আরও জুড়ে দিল, “এছাড়া, ওটা আরেকটা ব্যাপারে সাধারণ রাইফেলের থেকে আলাদা। তুমি যতক্ষণ ট্রিগারে আঙুলের চাপ দেবে, ততক্ষণ গুলি বেরোতেই থাকবে”।
“হুঁ, যদি জ্যাম না হয়, গুলি না ফুরিয়ে যায় বা খুব গরম হয়ে গলে না যায়”। এটা জর্ডান ইংরেজিতে বলল।
“কী বললে”? আনসেলমো’র প্রশ্ন।
“কিচ্ছু না। আমি ইংরেজিতে ভবিষ্যৎ গণনা করছিলাম”।
“এটা তো কদাচিৎ শুনেছি—ইংরেজিতে ভবিষ্যৎ গোণা”! জিপসি অবাক, “আচ্ছা, তুমি হাত দেখতে জান”?
“নাঃ”, জর্ডান আরেকবার মদের পেয়ালা ভরে নিল। “তুমি জানলে আমার হাত দেখে বলে দাও আগামী তিনদিনে কী কী ঘটতে পারে”।
“পাবলো’র মাগীটা হাত দেখতে জানে”, জিপসির উত্তর। ‘কিন্তু ওর এমন তিরিক্ষি মেজাজ, এমন জংলী যে তোমার হাত দেখবে কিনা বলতে পারছি না”।
রবার্ট উঠে বসল, পেয়ালাতে একটা চুমুক দিয়ে বলল,”চল, পাবলো’র মেয়েমানুষকে দেখে আসি। যদি মামলা এতটাই খারাপ হয় তো আগেভাগে সেরে নেয়া ভাল”।
“না বাবা, আমি ওকে বিরক্ত করব না”, রাফায়েলের বলল, “ও আমায় দু’চক্ষে দেখতে পারে না”।
“কেন”?
“ওর হিসেবে আমি একজন অকম্মার ধাড়ি”!
“কী অন্যায়! কী অন্যায়!” আনসেলমো’র বিদ্রূপ।
“আসলে ও জিপসিদের সহ্য করতে পারে না”।
“ইস্, কী ভয়ানক গলতি”! আনসেলমো চালিয়ে যায়।
“মেয়েছেলেটার ধমনীতে জিপসি রক্ত বইছে। ও জানে ও কী বলছে”। এবার রাফায়েল দাঁত বের করল, “কিন্তু ওর কথাবার্তা গায়ে বিছুটির জ্বালা ধরিয়ে দেয়। জিভ চলে চাবুকের মত।
সেটা দিয়েই ও গায়ের ছাল ছাড়িয়ে নিতে পারে। ফালা ফালা করে, হুঁ”।
“মারিয়ার সঙ্গে ওর কেমন পটে”? রবার্ট জর্ডনের কৌতুহল।
“ভালই; ওমেয়েটাকে পছন্দ করে। আগলে আগলে রাখে। কেউ একবার ওর কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করলে—“, জিপসি মাথা নেড়ে জিভ দিয়ে চকাস করে শব্দ করে।
“মেয়েটার সঙ্গে ওর ব্যভার খুবই ভাল”, আনসেলমো সায় দেয়। “ভাল করে দেখাশুনো করে”।
“যখন ট্রেনের হামলাটার সময় আমরা মেয়েটাকে উদ্ধার করি ওর আচরণ ছিল ভারি অদ্ভুতরকমের”,
জিপসি ফের শুরু করে, “কারও সঙ্গে কথা বলত না, খালি কাঁদত আর কেউ ছুঁলে জলে ভেজা নেড়ি কুকুরের মত থরথর করে কাঁপত। মাত্র ক’দিন হল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
হ্যাঁ, ইদানীং অনেকটাই স্বাভাবিক। আজকে ওর ব্যবহার বেশ ভাল ছিল। আর তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় তো ভারি চমৎকার।
ট্রেনের ঘটনার সময় আমরা ভেবেছিলাম যে ওকে ফেলেই চলে আসব। অমন দুঃখ দুঃখ ভাব, কুৎসিত চেহারা আর কোন কাজের নয়।
এমন একটা মেয়ের জন্য দেরি করার কোন মানে হয় না। কিন্তু বুড়ি মেয়েছেলেটা কোমরে দড়ি বেঁধে ওকে টেনে নিয়ে চলল।
যখন মেয়েটা ভাবছে যে আর এগোতে পারবে না, তখন বুড়ি ওকে দড়ির গিঁট দিয়ে এমন পেটাত যে ও ফের চলতে শুরু করত।
তারপর একসময় ও সত্যিই চলতে পারল না, তাতে কি, বুড়ি ওকে কাঁধে তুলে চলা শুরু করল। যখন বুড়ি হাঁফিয়ে পড়ল, আমি মেয়েটাকে কাঁধে তুলে চলতে লাগলাম।
আমরা বুক সমান উঁচু চড়াই ভেঙে চড়ছিলাম। যখন আমার দম ফুরিয়ে গেল, তখন পাবলো ওকে তুলে নিল। কিন্তু আমরা নিজে থেকে করি নি।
ওই মেয়েমানুষটা পাবলোকে আর আমাকে হুকুম দিয়ে আর মুখ চালিয়ে কাজটা করিয়ে নিল”।
ওই দিনগুলোর স্মৃতি মনে পড়ায় ও মাথা ঝাঁকালো।
“এটা ঠিক যে মেয়েটার পা দুটো বেশ লম্বা। কিন্তু এমন কিছু ভারি নয়। পাতলা হাড়, তাই ওজন কম।
কিন্তু যখন গুলি চালাতে চালাতে ওকে বইতে হত, নামিয়ে দিয়ে গুলি চালিয়ে আবার কাঁধে তুলে নিতে হত, তখন ওর বোঝা বেশ ভারি মনে হত।
ওদিকে ওই মাগীটা পাবলোকে দড়ি দিয়ে ক্রমাগত পিটছে, ওর বন্দুক নিজে বইছে, পাবলো মেয়েটাকে নামিয়ে দিলে ওর হাতে বন্দুক ধরিয়ে দিচ্ছে, আবার মেয়েটাকে তুলে নিতে বাধ্য করছে এবং গাল দিতে দিতে নিজেই পাবলোর বন্দুকে গুলি ভরে দিচ্ছে।
ওর থলে থেকে গুলি বের করে বন্দুকের ম্যাগাজিনে ভরে দিচ্ছে আর ওকে গাল পাড়ছে।
তখন সন্ধ্যা নামল। রাত্রি ঘনিয়ে এলে সব ঠিক হয়ে গেল। তবে কপাল ভাল যে দুশমনদের কোন অশ্বারোহী বাহিনী ছিল না”।
“ট্রেনের কাজটা সত্যি খুব কঠিন ছিল। আমি ওটায় ছিলাম না”। আনসেলমো রবার্ট জর্ডানকে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে থাকে।
“পাবলোর দল ছিল, আর ছিল এল্ সর্দো, তার দলবল সমেত। ওর সঙ্গে আজ রাতে দেখা হবে। আর ছিল আরও দুটো পাহাড়ি যোদ্ধার দল। আমি গেছলাম লাইনের ওপারে”।
“আরও ছিল, ওই সোনালী চুলের ছেলেটা”, জিপসি তাল দেয়, “কী যেন ওর অদ্ভুত নাম”?
“কাশকিন”।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ; নামটা কিছুতেই রপ্ত করতে পারছি না। আমাদের মেশিনগানওলা দুটো দল ছিল। ওদেরও আর্মিই পাঠিয়েছিল।
ওরা মেশিনগানগুলো সরাতে পারেনি। তাই ওগুলো আমাদের লোকসানের খাতায় চড়ল। দিব্যি গেলে বলছি ওটার ওজন এই মেয়েটার থেকে বেশি না।
ওই বুড়ি যদি ওদের সঙ্গে থাকত তাহলে মেশিনগানটা পাক্কা উদ্ধার করে আনত”।
সেই দিনের কথা ভেবে ও মাথা নাড়ল, ফের বলতে শুরু করল।
“ওই বিস্ফোরণ ! যা ঘটল জীবনে অমন কিছু দেখিনি কো। দেখ, ট্রেন সোজা এগিয়ে আসছে। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি।
উত্তেজনায় আমার শরীরটা যে কেমন করছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। দেখলাম রেলগাড়ির বাষ্প বেরোচ্ছে। তারপর হুইসিলের আওয়াজ।
তারপর সেই চু-চু-চু আওয়াজ—বাড়ছে বাড়ছে বেড়ে চলছে। হঠাৎ বিস্ফোরণ!
সেই মুহুর্তে ইঞ্জিনের সামনের চাকাগুলো শূন্যে উঠে গেল আর সমস্ত পৃথিবী যেন কেঁপে উঠে বিরাট কালো মেঘের রাশি হয়ে গর্জন করে উঠল।
ইঞ্জিন ধুলোর মেঘে উঁচুতে উঠল। কাঠের পাটাতনগুলো শূন্যে উড়ে গেল, যেন স্বপ্ন দেখছি। তারপর ইঞ্জিনটা একটা বিশাল আহত জন্তুর মত একদিকে কাত হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল। তারপর আগের বিস্ফোরণের ধূলো, মাটির ঢেলাগুলো আমাদের উপর আছড়ে পরার আগেই আবার বিস্ফোরণ! সাদা ধোঁয়ার মেঘে ঢেকে গেল সব।
এবার মেশিনগান কথা বলতে শুরু করল—টা-ট্যাট্ -ট্যাট-টা”! জিপসির মুখে শব্দ করে দু’হাত ঝাঁকাচ্ছে। মুঠো করা দু’হাত, বুড়ো আঙুল ওপরে তোলা, দু’হাত ওপর নীচ ওপর নীচ করে চলছে আর কাল্পনিক মেশিনগান চালাচ্ছে—“টা! টা! ট্যাট! ট্যাট! ট্যাট! টা”!
ও উত্তেজিত। “জীবনে এমন দৃশ্য দেখি নি। ট্রেন থেকে সৈন্যের দল লাফিয়ে নামছে, মেশিনগান ওদের লক্ষ্য করে গর্জে উঠছে, সৈন্যরা কচুকাটা হয়ে মাটিতে পড়ছে।
ঠিক তখনই আমি উত্তেজনায় মেশিনগানের নল চেপে ধরলাম আর টের পেলাম যে হাত পুড়ে যায়।
সেই মুহুর্তে বুড়িটা আমার গালে এক চড় কষিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—গুলি চালা! গুলি চালা বোকারাম! নইলে এক লাথিতে তোর মাথার ঘিলু বের করে দেব।
আমি গুলি চালাতে শুরু করলাম, কিন্তু হাতটা স্থির রাখা বেশ মুশকিল। সৈন্যের দল তখন পালাচ্ছে, দূরের টিলার পেছনে লুকিয়ে পড়ছে। শেষে আমরা যখন নীচে নেমে ট্রেনের কাছে দেখতে গেলাম --নেওয়ার মত আর কি আছে, তখন ওদের কম্যাণ্ডার পিস্তল দেখিয়ে কিছু সৈন্যকে ফিরে এসে আমাদের দিকে তাড়া করতে পাঠালো।
আমরা ওকে তাগ করে গুলি চালাচ্ছিলাম, কিন্তু একটাও ওর গায়ে লাগল না। তারপর কিছু সৈন্য মাটিতে শুয়ে আমাদের দিকে গুলি চালাতে শুরু করল।
আর অফিসারটি পিস্তল উঁচিয়ে ওদের সামনে পেছনে যাচ্ছিল আর আসছিল। তবু আমরা ওকে গুলি করতে ব্যর্থ হলাম।
আবার মেশিনগান থেকেও ওকে নিশানা করে গুলি চালানো যাচ্ছিল না। কারণ, রেলগাড়িটা একটা অদ্ভুত অ্যাঙ্গেলে দাঁড়িয়েছিল।
দুটো সৈন্য মাটিতে পড়েছিল, নড়েনি। অফিসারটি তাদের ভয় দেখাতে গুলি করল। তবু ওরা উঠল না।
শেষে ও খিস্তি করতে শুরু করায় কিছু উঠতে শুরু করল—একজন দু’জন করে। তারপর ওরা আমাদের আর ট্রেনের দিকে ধেয়ে এল।
ফের কিছু সৈন্য মাটিতে শুয়ে আমাদের দিকে গুলি চালাতে শুরু করল। তারপর আমরা সরে এলাম। মেশিনগান আমাদের কভার করে অগ্নিবৃষ্টি করে যাচ্ছিল।
তখন মেয়েটাকে দেখতে পেলাম। ও ট্রেন থেকে পালিয়ে এসে পাহাড়ের পাথুরে খাঁজের মধ্যে লুকিয়ে ছিল।
ও এবার আমাদের সঙ্গে দৌড়তে লাগল। ওই সৈন্যগুলো রাতভর হন্যে হয়ে আমাদের খুঁজে বেড়িয়েছিল”।
[1] স্প্যানিশ ভাষার সম্বোধন। হোলা= হ্যালো। সল্যুদ= তোমার সুস্বাস্থ্য কামনা করি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।