“নিঃসন্দেহে কাজটা খুব কঠিন ছিল”, আনসেলমো গম্ভীর, “আর বড্ড মমতাময়”।
“ আমরা যা করেছিলাম, তার মধ্যে ওই একটা কাজই বলার মত”, পেছন থেকে এক গম্ভীর স্বর!
“আর তুমি এখানে কী করছ শুনি? নাম-নিতে-নেই এমন বিয়ে-না-করা অসইব্য জিপসির একটি হদ্দ কুঁড়ে, মাতাল, অসইব্য নামগোত্রহীন বেজন্মা বাচ্চা!
কোন কাজটা করছ”?
রবার্ট জর্ডান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেল এক বছর পঞ্চাশের নারীকে; প্রায় পাবলোর মতই বড়সড়, লম্বায় চওড়ায় সমান সমান, পরনে চাষিদের কালো শার্ট আর কোমরবন্ধ।
গোদা পায়ে ভারি উলের মোজা, দড়ির গোড়ালিওলা কালো জুতো, আর গ্র্যানাইট মনুমেন্টের মডেলের মত বাদামিরঙা মুখের চেহারা।
ওর সুন্দর হাতজোড়া বড়সড়, ঘাড় অবধি কোঁকড়ানো কালো চুলে ঝুঁটি বাঁধা।
“কী হল? চুপ করে আছ যে! জবাব দাও”, কথাগুলো অন্যদের উপেক্ষা করে জিপসিকে বলা।
“আমি কমরেডদের সঙ্গে একটু আলোচনা করছিলাম। এই যে ইনি –একজন ডিনামাইটওলা”।
“ওসব আমার জানা আছে”। পাবলোর মেয়েমানুষটির কথায় ঝাঁঝ।
“এখান থেকে ফোট, যাও গিয়ে আন্দ্রেকে ছুটি দাও। ও উপরের দিকে পাহারায় রয়েছে”।
“যাচ্ছি গো যাচ্ছি’, জিপসি কথাটা বলে জর্ডানের দিকে তাকালো, “তোমার সঙ্গে ফের খাবার সময় দেখা হবে”।
“স্বপ্নেও ভেব না। আমার হিসেবে আজ তুমি তিনবার সাঁটিয়েছ। যাও, গিয়ে আন্দ্রেকে পাঠাও”।
“হোলা”!
[1] ও রবার্ট জর্ডানের দিকে হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিল। “কেমন আছ? আর রিপাবলিকের খবর কী”?
“ভাল”, মহিলাটির মজবুত হাতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জোরে চাপ দিতে দিতে রবার্ট জর্ডান বলল, “আমার এবং রিপাবলিকের—দুজনেরই খবর টবর ভাল”।
“আমার খুব ভাল লাগছে”, মহিলা এখন ওর চোখে চোখ রেখে হাসছে। রবার্ট খেয়াল করল ওর ধূসর চোখদুটো বেশ সুন্দর।
“তুমি কি এখানে আর একটা রেলগাড়ি ওড়াতে এসেছ”?
“না, একটা ব্রীজ”। ওকে প্রথম দেখাতেই বিশ্বস্ত আর নির্ভরযোগ্য মনে হয়েছে।
“
[2]নো এস নাদা! ব্রীজ ওড়ানোটা তেমন কিছু না, আরেকটা ট্রেন কাণ্ড কবে হবে? আমাদের তো এখন ঘোড়াও আছে”।
“পরে হবে, ব্রীজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ”।
“মেয়েটা বলল-- তোমার কমরেডটি, যে ট্রেনে হামলার সময় আমাদের এখানে ছিল, মারা গেছে নাকি”?
“হ্যাঁ’।
“আফশোসের কথা, যা একখানা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, অমনটি কখনও দেখি নি। দারুণ প্রতিভাবান ছেলে, আমায় মুগ্ধ করেছিল।
এখন আর একটা ট্রেন ওড়ালে হয় না? এই পাহাড়গুলোতে এখন কত লোক রয়েছে। অনেক অনেক লোক। এত বেশি যে খাবার জোগানোই দায়।
এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে ভাল হয়। আমাদের হাতে এখন অনেক ঘোড়া”।
“আমাদের ব্রীজের কাজটা সেরে ফেলতেই হবে”।
“ওটা কোথায়”?
“খুব কাছে”।
“তাহলে ভালই হয়”। পাবলোর মেয়েমানুষটি বলতে লাগল, “চল, এই এলাকার সব ব্রীজ ট্রিজ উড়িয়ে দিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাই। এই জায়গাটা থেকে আমার ভক্তি চলে গেছে।
এখানে বড্ড বেশি লোকের ভীড়। এসব ভাল নয়। এখানকার আলসেমি আর জড়তা আমার একেবারে পোষায় না।
গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল পাবলো আসছে।
বোররাচো!
মহিলাটি চেঁচিয়ে উঠল-“মাতাল! পাঁড় মাতাল”।
তারপর হাসিমুখে জর্ডানের দিকে ঘুরে বলল, “দেখ, একটা মদের মশক নিয়ে বনের মধ্যে গেছে শুধু একা একা মাল টানবে বলে। এই জীবনে থেকে ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নওজোয়ান! তুমি এখানে আসায় আমি খুব নিশ্চিন্ত হলাম”।
তারপর ও রবার্টের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে উঠল, “আহা! তুমি দেখছি যা মনে হয় তার চেয়ে বেশ বড়সড়”। তারপর মহিলাটি ওর কাঁধের পেশি টিপে দেখল।
ফ্ল্যানেলের জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে টিপেটুপে দেখে বলল, “ চমৎকার! তুমি আসায় সত্যিই ভরসা পেলাম”।
“আমিও”।
“আমরা একে অন্যকে ভালই বুঝতে পারব”। ও তারপর রবার্টকে বলল, “এক পাত্তর চলবে”?
“আমাদের ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার হয়ে গেছে। কিন্তু তুমি নেবে কি”?
“রাত্তিরের খাবারের আগে নয়”। সে ব্যাখ্যা করল, “এতে আমার বুক জ্বালা করে”।
সে আবার পাবলোকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল—"বোরাচো! মাতাল কোথাকার”! তারপর রবার্ট জর্ডানের দিকে ফিরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “আগে ও খুব ভাল ছিল।
এখন ও একেবারে গেছে। আর একটা কথা শোন। মেয়েটার সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার কোরো, ওকে যত্ন কোরো।
মারিয়ার কথা বলছি। ওর খুব খারাপ সময় গেছে। কিছু বুঝলে”?
“ঠিক আছে, কিন্তু এসব আমাকে কেন বলছ”?
“তোমাকে দেখার পর যখন ও গুহায় ফিরে এল ওর হাল দেখলাম তো। গুহা থেকে বেরনোর আগে থেকেই ও তোমার দিকে তাকাচ্ছিল”।
“আমি ওর সঙ্গে একটু ঠাট্টা ক্করছিলাম”।
“আগে ও খুব বাজে অবস্থায় ছিল”, পাবলো’র মেয়েমানুষ বলল, “এখন ওর হাল ফিরেছে, তাই ওর উচিত এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া”।
“বেশ তো, ওকে আনসেলমো’র সঙ্গে লাইনের ওপারে পাঠিয়ে দেয়া যায়”।
“এখানকার ঝামেলা মিটে গেলে তুমি আনসেলমো দুজনে মিলে ওকে নিয়ে যাবে”।
রবার্ট জর্ডান টের পেল যে ওর গলার ব্যথাটা চাগিয়ে উঠছে আর স্বর ভারি। “ঠিক আছে, ওটা হয়ে যাবে”।
পাবলো’র মেয়েমানুষটি মাথা নেড়ে বলে উঠল, “ আরে আরে, সব ব্যাটাছেলেরাই দেখছি একইরকম”।
“কিছু বলিনি তো! তবে মেয়েটা সুন্দর দেখতে, আর তুমি সেটা জান”।
“না, ও সুন্দর নয়, তবে সুন্দর হয়ে উঠছে। এটাই বলতে চাইছ তো”?
পাবলো’র মেয়েমানুষ আরও বলল, “ আরে পুরুষ! আমাদের মেয়েদের লজ্জা যে ওদের আমরাই অমন করে গড়ে তুলি।
নাঃ , ঠিক করে ভেবে বল—এইরকম মেয়েদের মাথা গোঁজবার জন্যে এতবড় রিপাবলিকের কোথাও একটু জায়গা হবে না”?
“আছে তো”। রবার্ট জর্ডান বলল, “ভাল জায়গা। ভ্যালেনসিয়ার সমুদ্র উপকুলের কাছে। অন্য জায়গাতেও আছে। সেখানে ওদের যত্ন করে রাখা হয়।
চাইলে বাচ্চাদের সঙ্গে কিছু কাজ করতে পারে। বাচ্চাগুলো খালি করে দেয়া গ্রামগুলো থেকে এসেছে। ওকে কাজ শিখিয়ে দেয়া হবে”।
“ঠিক এটাই চাইছিলাম”, পাবলোর মেয়েমানুষ খুশি হল,
“পাবলো এর মধ্যেই ওর জন্য খানিকটা ছোঁক ছোঁক করে বেড়াচ্ছে। এই আরেকটা জিনিষ যা ওকে নষ্ট করছে। ওকে দেখলেই ওর রোগটা চাগিয়ে ওঠে।
ওর এখন এখান থেকে চলে যাওয়াই ভাল”।
“এসব মিটে গেলে ওকে নিয়ে যাব’খন”।
“ তুমি ওর যত্ন নেবে তো? আমি কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস করছি। মনে হয় তোমাকে অনেক আগে থেকে চিনি”।
“ যখন দুজন মানুষ একে অন্যকে বুঝতে পারে, তখন এমনই মনে হয়”।
“বসে পড়”, পাবলোর মেয়েমানুষের আদেশ। “দেখ, আমি কক্ষণো কাউকে কোন কিছু দিব্যি করে বলতে, কথা দিতে বলি না। জানি, যা হবার তা হবেই।
যদি তুমি ওকে বাইরে ঘোরাতে না নিয়ে যাও, তবে তোমাকে বলব একটা কথা দিতে”।
“ওকে না নিয়ে গেলে কী হবে”?
“আমি চাই না তুমি চলে গেলে ও পাগল হয়ে যাক। আগে ওকে ওই পাগল অবস্থায় দেখেছি, আর সামলাতে পারব না। ঢের হয়েছে”।
“ব্রীজের কাজটা হয়ে গেলে ওকে নিয়ে যাওয়া যাবে”, রবার্ট বলল, “মানে, ঝামেলার পর যদি আমরা বেঁচে থাকি”।
“এসব কথা আমার একদম পোষায় না”, পাবলোর মেয়েমানুষ উত্তেজিত,”এই ধরণের কথাবার্তা অমঙ্গল ডেকে আনে”।
“আরে, আমি তো কথা দিতে চাই, কথা রাখতে চাই। তাই ওইভাবে কথা বলছি। খামোখা নিরাশার গান গাইব কেন”?
“দেখি তোমার হাতটা”।
রবার্ট জর্ডান হাত বাড়িয়ে দিল।
আর মেয়েমানুষটি ওই হাতের পাতা খুলে নিজের বড়সড় হাতে রেখে খানিকক্ষণ ধরে থাকল। হাতের চেটোতে নিজের বুড়ো আঙুল ঘষল বেশ যত্ন করে,
তারপর একটু সময় মন দিয়ে দেখে হাতটা ছেড়ে দিল। তারপর ও উঠে দাঁড়াল। রবার্ট জর্ডানও উঠে পড়ল। মহিলাটি ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে, মুখে হাসি নেই।
“কী দেখলে বলত? আমি ওসবে বিশ্বাস করি না। কাজেই ভয় খাবো না”।
“কিছু না”, ও বলে দিল,”তোমার হাতে কিচ্ছু দেখতে পাইনি”।
“উঁহু, কিছু তো দেখেছ। আমি খালি জানতে উৎসুক, তাছাড়া বলেছি তো আমি বিশ্বাস করি না”।
“আচ্ছা, কিসে তোমার বিশ্বাস”?
“অনেক কিছুতে, কিন্তু ওটায় নয়”।
“তাহলে কিসে”?
“নিজের কাজে”।
“ হ্যাঁ, সেটা তো দেখলাম”।
“আর কী দেখলে? বলে ফেল”।
“আর কিছু দেখলাম না”। ওর চেহারায় একটা তেতো ভাব। “তুমি বলছিলে না ব্রীজের কাজটা খুব কঠিন”?
“না তো; বলেছি-ওটা খুব গুরুত্বপূর্ণ”।
“কিন্তু এটা কঠিন হতেও পারে তো”?
“তা পারে। এখন ওটাই খুঁটিয়ে দেখতে নীচে যাব। এখানে তোমার কাছে ক’জন লোক আছে”?
“পাঁচজনকে বলতে পার কাজের লোক। জিপসিটা মহা ফালতু, যদিও ভাবনা-চিন্তা ভাল, মনটা ভাল। ইদানীং পাবলোকে আর বিশ্বাস করতে পারছি না”।
“এল্ সর্দোর দলে কাজের লোক ক’টা”?
“বোধহয় জনা আটেক, আজ রাত্তিরেই বোঝা যাবে। ও এখানে আসছে, খুব কাজের। ওর কাছেও কিছু ডিনামাইট আছে, খুব বেশি নয় অবশ্য।
রাত্তিরে তুমি ওর সাথে কথা বলে নিও”।
“তুমি ওকে ডেকে পাঠিয়েছ”?
“ওতো রোজ রাত্তিরে আসে। আমাদের পড়শিও বটে, বন্ধু এবং কমরেডও বটে”।
“ওর সম্বন্ধে তোমার কী ধারণা”?
“ মানুষ হিসেবে খুব ভাল। খুব কাজের। ট্রেনের হামলায় ও যা করেছিল—এককথায় ব্যাপক”।
“ আর অন্য দলগুলোয়”?
“সময় বুঝে পরামর্শ করি, নির্দেশ দিই। মোটামুটি নির্ভরযোগ্য পঞ্চাশজন রাইফেলধারীকে এককাট্টা করা যেতে পারে”।
“কতটা বিশ্বস্ত”?
“সেটা নির্ভর করে অবস্থা কত গম্ভীর তার উপর”।
“আর প্রতি বন্দুক পিছু কার্তুজ কত”?
“ ধরে নাও কুড়িটা। ওটা নির্ভর করছে এই কাজটার জন্য ওরা কতগুলো নিয়ে আসবে তার উপর। যদি ওরা আদৌ এই কাজটার জন্য আসতে রাজি হয়!
খেয়াল কর, ব্রীজের কাজটায় কোন টাকাপয়সার গন্ধ নেই, কোন লুটপাটের সুযোগ নেই। আর তোমার রেখেঢেকে কথা বলায় বিপদের গন্ধ।
তারপর দেখ, কাজটা হওয়ার পর এই এলাকা থেকে সরে যেতেই হবে। আর সেজন্যেই অনেকে ব্রীজের হামলার বিরোধিতা করবে”।
“দেখাই যাচ্ছে”।
“তাহলে খামোকা এটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার দরকার নেই”।
“সম্পূর্ণ একমত”।
“তুমি গিয়ে ব্রীজটা দেখে এস। তারপর তুমি আর আমি এল সর্দোর সঙ্গে রাত্তিরে আলোচনা করব”।
“এখন আনসেলমো’র সঙ্গে নীচে নেমে যাচ্ছি”।
“ওকে ডেকে তোল। তোমার কি একটা কারবাইন লাগবে”?
“ধন্যবাদ”, জর্ডান বলল, “পেলে ভালই হয়। কিন্তু আমি ওটা ব্যবহার করব না। আমি ঝারি করতে যাচ্ছি, ঝামেলা পাকাতে নয়।
তুমি যা বললে তার জন্যে অনেক ধন্যবাদ। তোমার কথাবার্তার ধরণ আমার খুব পছন্দ”।
“আমি খোলাখুলি এবং স্পষ্ট কথাবার্তা পছন্দ করি”।
“তাহলে আমার হাতে কী দেখলে বলেই ফেল”।
“না”, ও মাথা নাড়ল,” আমি কিচ্ছু দেখি নি। এখন যাও তোমার ব্রীজ দেখতে। তোমার জিনিসপত্তর আমি সামলে রাখব”।
“ঢেকে রাখ, কেউ যেন হাত না লাগায়। গুহার ভেতরে রাখার থেকে যেখানে আছে সেটাই ভাল”।
“ঢেকেই রাখা হবে আর কেউ ছোঁবে না”। পাবলো’র মেয়েমানুষ এবার বলল, “যাও এখন তোমার ব্রীজ দেখতে”।
বুড়ো আনসেলমো হাতে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিল। রবার্ট জর্ডান ওর কাঁধে টোকা দিয়ে ডাকল, “আনসেলমো”!
ও সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালো, “ হ্যাঁ, চল, যাওয়া যাক”।
৩
খাড়া টিলার পাইনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, সাবধানে একের পর এক গাছের ছায়ার আড়াল নিয়ে ওরা শেষ ২০০ গজ নেমে এল।
ব্রীজটা এখন মাত্র ৫০ গজ দূরে।
পাহাড়ের বাদামী কাঁধের উপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে শেষ বিকেলের সূর্য।
সেই আলোয় এবং খাড়া টিলার নীচে শুকনো খাদের শূন্যতার পশ্চাদপটে ব্রীজটির চেহারা নিকষ কালো দেখাচ্ছে।
এটা একটা সোজাসাপটা লোহার ব্রীজ আর তার দুই মুড়োয় দুটো সেন্ট্রি বক্স বা পাহারাদারের গুমটি এবং এটা এমন চওড়া যে দুটো গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারে।
ব্রীজটি ইস্পাতের পৌরুষকাঠিন্যে পাহাড়ি খাদটিকে যুক্ত করেছে।
এর নীচে একটি ছোট্ট সাদা জলধারা নুড়ি এবং বড় বড় পাথরের মধ্য দিয়ে লাফাতে লাফাতে গিরিপথের মূল নদীতে মিশেছে।
সূর্যের আলো এখন সোজাসুজি রবার্ট জর্ডানের চোখে পড়ছে। ফলে ব্রীজের শুধু আবছা আকৃতিটুকু দেখা যাচ্ছে।
সূর্য ছোট হতে হতে হারিয়ে গেল। রবার্ট গাছের উঁচু মাথার ফাঁক দিয়ে পাহাড়ের বাদামি গোল চূড়ার দিকে তাকাল। তার আড়ালে সূর্য লুকিয়ে পড়েছে।
টের পেল এখন আর চোখ ঝলসে যাচ্ছে না। পাহাড়ের চড়াই এখন হালকা নরম সবুজ আর চূড়োর নীচে বরফের পুরনো চিহ্ন প্রকট।
আবার ও ব্রীজটার দিকে তাকালো এবং মরে যাওয়া আলোয় ওর গঠন আকার সব স্পষ্ট দেখতে পেল। মনে হচ্ছে ওটাকে উড়িয়ে দেয়ার কাজটা তেমন কঠিন হবে না।
এবার ও বুকপকেট থেকে একটা নোটবুক বের করে দ্রুত হাতে কিছু স্কেচ করে নিল।
আঁকার সময় ও কোথায় কোথায় বারুদ ঠাসতে হবে সেসব বাদ দিয়েছিল। ওগুলো পরে সারবে বলে। এবার ও নোট করা শুরু করল।
– ব্রীজের বিভিন্ন জায়গায় এমন ভাবে বারুদ লাগাতে হবে যাতে ব্রীজের জোড় ভেঙে একটা অংশ খাদের অতলে পড়ে যায়।
তারজন্য জায়গাগুলো এক এক করে চিহ্ন দিয়ে রাখল।
এসব করতে হবে ঠান্ডা মাথায়, সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে, আধ ডজন বারুদ লাগিয়ে এমন করে জুড়তে হবে যাতে একসাথে বিস্ফোরণ হয়।
অথবা অন্য পদ্ধতি আছে। মোটামুটি দুটো বড় বিস্ফোরক লাগালেও কাজটা হতে পারে। তবে সে’দুটো খুব বড় মাপের হতে হবে আর তাদের পাততে হবে দুই মাথায়।
কিন্তু বিস্ফোরণটা একসঙ্গে ঘটা চাই। চটপট স্কেচ করত গিয়ে মনটা খুশি খুশি হয়ে গেল। নাঃ, মামলা ওর হাতের মুঠোয় এসে গেছে।
খুশি আরো এটা ভেবে যে এবার ও সত্যি সত্যি কাজটাতে হাত লাগাতে পেরেছে। ও নোটবুক বন্ধ করে পেনসিলটা চামড়ার বন্ধনীর গায়ে ছোট্ট ফোকরে গুঁজে দিল।
আর নোটবুকটা পকেটে ভরে পকেটের বোতাম আটকে দিল।
ও যখন স্কেচ করছিল, আনসেলমো রাস্তা, ব্রীজ আর পাহারাদারের গুমটির দিকে নজর রাখছিল।
ওর ভয় হচ্ছিল যে স্কেচ করতে করতে ওরা ব্রীজের বড্ড কাছে এসে পড়েছে এবং এটা সুরক্ষার দিক থেকে দেখলে ঠিক নয়।
তাই আঁকা শেষ হতে ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
রবার্ট জর্ডান পকেটের বোতাম বন্ধ করে পাইনগাছের পেছনে মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে আড়াল থেকে ব্রীজটাকে দেখছিল। আনসেলমো ওর কনুই ছুঁয়ে দেয়ায় চোখ এদিকে ঘুরল।
আনসেলমো এবার আঙুল তুলে সামনের দিকে ইশারা করল। রাস্তার উপরে যে সেন্ট্রিবক্স ওদের মুখোমুখি, সেখানে সেন্ট্রি বসে রয়েছে।
ওর বেয়নেট লাগানো রাইফেলটি দুই হাঁটুর ফাঁকে রাখা। সৈনিকটি সিগারেট ফুঁকছে, মাথায় হাতে বোনা টুপি আর গায়ে জড়ানো কম্বলে মত গরম কাপড়।
পঞ্চাশ গজ দূরত্বে ওর চেহারা বোঝা যাচ্ছে না।
জর্ডান ফিল্ড গ্লাস চোখে লাগালো। রোদ্দূর না থাকলেও হাতের তেলো দিয়ে লেন্স আড়াল করল। এখন ব্রীজের রেলিং সাফ দেখা যাচ্ছে, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।
আর পাহারাদারের চেহারা এমন স্পষ্ট যে রবার্ট দেখতে পাচ্ছে ওর চুপসে যাওয়া গাল, সিগারেটের উপর জমা ছাই এবং বেয়নেটের পালিশের চমক।
মুখখানা এক চাষির—উঁচু হনুর হাড়ের নীচে বসা গাল, খোঁচাখোঁচা দাড়ি, মোটা রোমশ ভ্রূ’র নীচে ঢাকাপড়া চোখ, বড় বড় দুই হাতে রাইফেলটা ধরা,
কম্বলের ভাঁজের নীচ থেকে উঁকি দেয়া ভারি বুটজোড়া। সেন্ট্রিবক্সের ভেতর দেয়াল থেকে লটকানো রয়েছে একটা কালচে পুরনো চামড়ার ওয়াইনের বোতল,
আর রয়েছে কিছু খবরের কাগজ। তবে কোন টেলিফোন নেই। তবে ঘরটার যেদিকটা ওদেখতে পারছে না সেখানে একটা থাকলেও থাকতে পারে।
কিন্তু গুমটির ভেতরে কোন তার-টার দেখা যাচ্ছে না। তবে রাস্তার পাশাপাশি একটা টেলিফোন লাইন চলেছে, তারগুলো ব্রীজের ওপার অব্দি চলে গেছে।
সেন্ট্রিবক্সের বাইরে একটা কয়লার উনুন চোখে পড়ছে। ওটা তৈরি হয়েছে একটা পুরনো পেট্রোলের টিন কেটে ওর ওপরটা উড়িয়ে দিয়ে গায়ে ক’টা ফুটো করে।
উনুনটা দুটো পাথরের উপর বসানো, কিন্তু তাতে আগুন নেই। ওর নীচে ছাইগাদার থেকে ক’টা আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া টিনের টুকরো উঁকি মারছে।
রবার্ট ওর পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা আনসেলমো’র হাতে ওর ফিল্ডগ্লাসটা দিল। বুড়ো একটু হেসে মাথা নাড়ল আর একটা আঙুল দিয়ে ওর মাথায় চোখের পাশের জায়গাটায় টোকা দিল।
“আমি ওকে দেখতে পেয়েছি”। ও ঠোঁট না নাড়িয়ে শুধু মুখের সামনের ভাগ দিয়ে কথাটা এমনভাবে বলল যে সেটা ফিসফিসানির থেকেও নীচু পর্দায় শোনাল। ও সেন্ট্রির দিকে তাকিয়ে আছে, রবার্ট ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। ও একটা আঙুল তুলে সেন্ট্রির দিকে ইশারা করল, আর অন্য একটা দিয়ে গলার পাশে আড়াআড়ি টানল। রবার্ট জর্ডান মাথা নেড়ে সায় দিল, কিন্তু বুড়োর মুখে হাসি নেই।
ব্রীজের অন্য মাথার সেন্ট্রি বক্স ওদের দৃষ্টিপথের বাইরে, রাস্তার ঢালের শেষে। ওর ভেতরে কী হচ্ছে সেটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।
রাস্তাটা চওড়া, বেশ মসৃণ এবং ভালভাবে বানানো হয়েছে। ওটা ব্রীজের শেষপ্রান্তে বাঁদিকে ঘুরে নীচে নেমে ডানদিকে একটা বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
এই বিন্দুতে এটা পুরনো রাস্তার থেকে চওড়া হয়েছে। সেটা সম্ভব হয়েছে শুকনো গিরিপথের অন্য দিকটায় কঠিন পাথরের জমাট আকারকে কেটে।
গিরিপথ অথবা ব্রীজের থেকে নীচে তাকালে দেখা যাবে যে খাদের বাঁদিক বা পশ্চিম ধারকে চিহ্নিত এবং সুরক্ষিত করা হয়েছে একসারি খাড়া এবং খণ্ড খণ্ড পাথর দিয়ে।
এইখানে গিরিপথ প্রায় একটা গভীর গিরিখাতের চেহারা নিয়েছে। এখানেই ব্রীজের নীচ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট জলধারাটি গিরিখাতের মূল নদীর সঙ্গে মিশেছে।
“পাহারাদারদের অন্য গুমটি? ওটা কোথায়”? রবার্ট জর্ডানের প্রশ্ন আনসেলমোকে।
“পাঁচশো মিটার নীচে যেখানে রাস্তা বাঁক নিয়েছে। তারপাশে টিলার পাথুরে দেয়াল ঘেঁষে রাস্তা মেরামত করনেওলাদের যে কুঁড়ে ঘর, সেখানে”।
“ক’টা লোক”?
জর্ডান প্রশ্ন করতে করতে চোখে ফিল্ড গ্লাস লাগিয়ে একমনে সেন্ট্রির চলাফেরা লক্ষ্য করছে। সেন্ট্রি গুমটির কাঠের দেয়ালে ঘষে সিগ্রেট বুজিয়ে দিল।
তারপর পকেট থেকে একটা চামড়ার তামাকের থলি বের করে পোড়া সিগ্রেটের কাগজ ছিঁড়ে বাকি মশলাটা ওই থলিতে ঢেলে দিল।
সেন্ট্রি এবার উঠে দাঁড়িয়েছে। রাইফেলটা দেয়ালের গায়ে ঠেকিয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। ফের বন্দুকটা তুলে কাঁধে ঝুলিয়ে গুমটি থেকে বেরিয়ে ব্রীজের দিকে হাঁটতে লাগল।
আনসেলমো জমিতে উপুড় হয়ে শুয়ে একেবারে মাটিতে শরীর মিশিয়ে দিয়েছে।
ওর পাশে শোয়া রবার্ট জর্ডান দূরবীনটা শার্টের পকেটে ভরে পাইনগাছের আড়ালে মাথাটা সরিয়ে নিল।
“ওখানটায় সাতজন সেপাই আর একজন কর্পোরাল”। আনসেলমো রবার্টের কানের গোড়ায় ফিসফিস করে, “আমি জিপসিটার কাছে থেকে খবর নিয়েছি”।
“আমরা এবার যাবো, ব্যাটা একজায়গায় স্থির হলেই”, রবার্ট বলল, “আমরা বড্ড কাছাকাছি এসে পড়েছি”।
“তোমার যা দেখার সব দেখে নিয়েছ তো”?
“হ্যাঁ, যা যা দেখার সব”।
‘সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ঠান্ডা বাড়ছে।আলো কমে আসছে। পাহাড়ের পেছনে রোদের শেষ আভাটুকু মিইয়ে গেছে।
“কেমন দেখলে”? আনসেলমো’র কোমল কন্ঠস্বর। ওরা এখন মন দিয়ে দেখছে-- সেন্ট্রির ব্রীজের অন্য গুমটির দিকে হেঁটে যাওয়া ।
সূর্যাস্তের শেষ আভায় ঝকমক করছে ওর বেয়নেট আর কম্বলমোড়া কোটের আবরণে ওর শরীরটা কেমন বেঢপ দেখাচ্ছে।
“বেশ ভাল”, রবার্ট জোর দিয়ে বলে, “খুব খুব ভাল”।
“শুনে ভাল লাগছে”, আনসেলমো বলল, “আমরা কি এখন রওনা দেব? মনে হয় না আর ও আমাদের দেখতে পাবে”।
ব্রীজের আরেক মাথায় সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে পড়েছে। ওর পিঠটা এদের দিকে ফেরানো। গিরিপথের দিক থেকে নুড়ি্র উপর লাফিয়ে চলা জলধারার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
তারপর সেই শব্দ ছাপিয়ে একটা লাগাতার গো- গোঁ গুনগুন কর্কশ শব্দ শুরু হল। সেন্ট্রি চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালো। ওর হাতে বোনা উলের টুপি মাথার পেছনে হেলে গেছে। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে এরা দুজনও আকাশের দিকে চোখ তুলল। দেখল—সন্ধ্যের আকাশে অনেক উঁচুতে তিনটে মোনোপ্লেন ইংরেজি ভি ফর্মেশনে আসছে।
তখনও এত উঁচুতে সামান্য সূর্যের আলো থাকায় ওদের রূপোলী চেহারাটা ছোট্ট এইটুকু দেখাচ্ছে। ওরা যাচ্ছে আকাশপথে অসম্ভব দ্রুতগতিতে।
ওদের মোটরের নিয়মিত ধপধপ শব্দ এখন স্পষ্ট।
“আমাদের”? আনসেলমো’র প্রশ্ন।
“মনে তো হচ্ছে”, রবার্টের জবাব। যদিও ভাল করেই জানে যে এত উঁচুর প্লেনের ব্যাপারে কিছু ঠাহর করা অসম্ভব। যেকোন পক্ষেরই হতে পারে।
হয়ত সান্ধ্যকালীন নজরদারি করছে। কিন্তু এইসব খবরদারি করা প্লেনের ব্যাপারে ‘আমাদের’ বলাটাই দস্তুর। এতে সবার মনে খানিক আশার সঞ্চার হয়।
তবে বোমারু বিমান হলে আলাদা কথা।
আনসেলমো বোধহয় তাই ভাবছিল। বেশ জোর দিয়ে বলল—ওগুলো আমাদেরই, আমি ঠিক চিনি। ওরা হল ‘মস্কাস’!
“বাঃ”, রবার্ট জর্ডান বলল, “আমারও তাই মনে হচ্ছে। ওগুলো মস্কাসই বটে”।
আনসেলমো ফের বলল, “হ্যাঁ, ওগুলো মস্কাস”।
জর্ডান চাইলে চোখে দূরবীণ লাগিয়ে দেখতে পেত—ওগুলো আসলে কী। কিন্তু ভাবল খুঁটিয়ে না দেখাই ভাল। ওগুলো যাই হোক , আজ রাতে তাতে কিছু আসবে যাবে না।
বুড়ো মানুষটা যদি ওগুলোকে “আমাদের” ভেবে খুশি হয়ে থাকে তাতে বাগড়া দেবার কী দরকার!
এবার ওগুলো সেগোভিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে। উঁহু, এখন ওদের আর সবুজরঙা,নীচু ডানার কোণায় লাল ছিটে, রাশিয়ান প্লেন বলে মনে হচ্ছে না।
যেগুলো আদতে বোয়িং পি-৩২ এর রুশী সংস্করণ আর স্প্যানিশরা বলে মস্কাস।
এতো নীচের থেকে রঙটঙ বোঝা যায় না বটে, কিন্তু গড়ন দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে ওগুলো আসলে ফ্যাশিস্ত প্লেন, রেকি করে নিজেদের আড্ডায় ফিরে যাচ্ছে।
দূরের গুমটিতে সেন্ট্রি এখনও এদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে।
“চল এবার যাওয়া যাক”। রবার্ট জর্ডান আনসেলমোকে বলে চড়াই বেয়ে ওঠা শুরু করল।
সাবধানে সেন্ট্রিদের নজর থেকে নিজেদের আড়াল করে উঠছে, যতক্ষণ না ওদের দৃষ্টিপথের বাইরে চলে যায়।
আনসেলমো ওকে অনুসরণ করছে, তবে ১০০ গজ দূরত্ব বজায় রেখে। যখন এমন জায়গায় পৌঁছে গেল যে সেতু থেকে এদের দেখা যাবে না, কেবল তখনই ও থামল।
আনসেলমো ওকে ধরে ফেলল এবং এখান থেকে ওই আগে, রবার্ট পেছনে। বুড়ো আনসেলমো অন্ধকারেও অনায়াসে গিরিপথের চড়াই বেয়ে উঠছে।
“আমাদের একটা জবরদস্ত বিমানবাহিনী আছে”, আনসেলমোর মুখে খুশি ফুটে উঠেছে।
“বিলকুল”।
“আমরা জিতবই”।
“আমাদের জিততেই হবে’।
“নিশ্চয়ই। আর বিজয়ের পর তুমি এখানে শিকার করতে আসবে”।
“শিকার করতে? কী শিকার করব”?
“কেন? বুনো শুয়োর, ভালুক, নেকড়ে, পাহাড়ি ছাগল—“
“তুমি বুঝি শিকার করতে ভালবাসো”?
“খুব; শিকারের মত জিনিস হয় না। আমাদের গ্রামে আমরা সবাই খুব শিকারে যাই। তোমার ভাল লাগে না”?
“না, আমার বন্যপ্রাণীদের মারতে ভাল লাগে না”। রবার্ট জর্ডনের সোজা সাপটা জবাব।
“আমার ক্ষেত্রে ঠিক উলটো”, বুড়োর গলায় অন্য স্বর, “আমার মানুষ মারতে ভাল লাগে না”।
“ মাথার দোষ না হলে কারোরই ভাল লাগে না। কিন্তু দরকার পড়লে আমার হাত কাঁপে না, মানে যদি কোন মহৎ উদ্দেশ্যের জন্যে করতে হয়”।
‘আমার ব্যাপারটা আলাদা”, আনসেলমো বলতে শুরু করল, “আগে আমার একটা বাড়ি ছিল, আর এখন? নিজের বলতে কোন ঘর নেই। তাতে কী ছিল?
নীচের জঙ্গলে যে দাঁতাল শুয়োরটাকে গুলি করে মেরেছিলাম তার বড় বড় দাঁত, আমার শিকার করা নেকড়েগুলোর চামড়া, শীতকালে বরফের মধ্যে গুলি করে মেরেছিলাম।
একটা ছিল খুব বড়। সেটাকে এক নভেম্বরের রাতে ঘরে ফেরার সময় গাঁয়ের বাইরে সাবড়ে দিয়েছিলাম। আমার ঘরের মেজেতে চারটে নেকড়ের চামড়া বিছানো থাকত।
সেগুলো পায়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে ঝরঝরে হয়ে গেছল; তবু তো নেকড়ের চামড়া!
একটা বিশাল শিংওলা বুনো ছাগল। ওটাকে সিয়েরার পাহাড়ে শিকার করেছিলাম। আর একটা ঈগল, সেটাকে আভিলা’র একটা লোক,
ওই যারা মরা পশুপাখির চামড়া সেলাই করে ভেতরে মশলা ভরে সাজিয়ে রাখে, ওটাকে এমন করে দিয়েছিল যে কী আর বলব! ডানা ছড়িয়ে দেয়া, হলদে চোখ—ঠিক যেন জ্যান্ত ঈগল।
ওটা খুব সুন্দর হয়েছিল। আর ওইসব সুন্দর সুন্দর জিনিসের কথা ভাবলে আমার মনটা খুশিতে ডগমগ করে”।
“ঠিক”, রবার্ট জর্ডান বলল। “আমার গাঁয়ের চার্চের দরজায় একটা ভালুকের থাবা পেরেক দিয়ে গাঁথা ছিল। ওটাকে আমিই মেরেছিলাম । এক বসন্তের দিনে টিলার নীচে বরফের মধ্যে খেলা করছিল। ওই থাবা দিয়েই একটা গাছের গুঁড়িকে উলটে পালটে দিচ্ছিল”।
“এটা কবেকার কথা”?
“প্রায় ছ’বছর আগের। আর যখনই মানুষের হাতের মত ওই থাবাটাকে দেখি, খালি নখগুলো লম্বা আর শুকনো, এবং পেরেক দিয়ে হাতের তেলো ফুঁড়ে চার্চের দরজার গায়ে গাঁথা,-- আমার ভেতরে একটা আনন্দের শিহরণ টের পাই”।
“সেটা কি গর্বের”?
“মানে কিছুটা গর্বের এবং কিছুটা টিলার নীচে সেই বসন্ত দিনে জানোয়ারটার মুখোমুখি হওয়ার আনন্দের স্মৃতির।
কিন্তু যদি মানুষ মারার কথা বল, যে কিনা আমাদেরই মত একজন, তাতে ভাল কিছু মনে থাকে না”।
“হুম, তুমি ওর থাবা পেরেক দিয়ে চার্চের দরজায় গাঁথতে পার না”, রবার্ট জর্ডানের বক্তব্য।
“না, মানছি অমন বর্বরতা ভাবাই যায় না। তবে মানুষের হাত কিন্তু ভালুকের থাবার সঙ্গে মেলে”।
“মানুষের বুকের সঙ্গে ভালুকের বুকেরও তেমনই মিল”, রবার্ট জর্ডানের কথা।“ছাল ছাড়িয়ে নিলে ভালুকের মাসল্ অনেকটা মানুষের পেশির মতই দেখায়”।
“হ্যাঁ, জিপসিরা ভাবে ভালুক আর মানুষ ভাই ভাই”। আনসেলমোর তথ্য।
“আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানরাও তাই ভাবে। ভালুক মারলে পরে ওরা মৃত ভালুকের কাছে মার্জনাভিক্ষা করে। ভালুকের মাথার খুলিটা একটা গাছের মাথায় টাঙিয়ে দেয়।
তারপর চলে আসার আগে ওর কাছে মাফ চায়”। রবার্ট জর্ডান উবাচ।
“জিপসিরা যে ভালুককে মানুষের ভাই ভাবে তার দুটো কারণ। চামড়ার নীচে ভালুক আর মানুষের শরীরটা একই রকম।
তাছাড়া ভালুকও মানুষের বীয়ার খায়, গান ভালবাসে আর নাচতে পছন্দ করে”।
“রেড ইন্ডিয়ানরাও তাই বিশ্বাস করে”।
“রেড ইন্ডিয়ানরাও জিপসি নাকি”?
“না, কিন্তু ভালুকের ব্যাপারে দুজনেরই একরকম বিশ্বাস”।
“বোঝাই যায় জিপসিরা কেন ভালুককে ভাই মনে করে। ভালুকও চুরি করে মজা পায়”।
“তোমার শরীরেও জিপসি রক্ত”?
“না। কিন্তু আমি ওদের ভাল করে জানি। কাছ থেকে দেখেছি, বিশেষ করে আন্দোলন শুরু হবার পর তো অনেক দেখেছি।
এই পাহাড়ে অনেক জিপসি আছে। ওরা নিজেদের সমাজের বাইরে মানুষ খুন করাকে পাপ ভাবে না। ওরা মুখে বলবে না, কিন্তু এটাই সত্যি”।
“মুরদের মত”?
“হ্যাঁ, তবে জিপসি সমাজে অনেক গুপ্ত নিয়মকানুন আছে যেগুলো ওরা স্বীকার করে না। এই যুদ্ধের সময়ে অনেক জিপসি বিগড়ে গিয়ে ঠিক আগের মত হয়ে গেছে”।
“ওরা বোধহয় জানে না কেন এই যুদ্ধ। বোঝে না আমরা কেন লড়াই করছি, কিসের জন্যে”?
“না”, আনসেলমো বলল,”ওরা শুধু এইটুকুই বোঝে যে একটা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মানে, এখন যত ইচ্ছে মানুষ মারো, কোন শাস্তির ভয় নেই—ঠিক পুরনো দিনের মত”।
রবার্ট জর্ডান আর আনসেলমো একটা গোটা দিন এবং এই আঁধার রাত একসঙ্গে কাটিয়েছে। সেই সুবাদে আনসেলমোকে জিজ্ঞেস করল,”তুমি মানুষ মেরেছ”?
হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার। কিন্তু ভালো লাগেনি। আমার মনে হয় মানুষ খুন করলে পাপ হয়, এমনকি ফ্যাসিস্তদের হত্যা করলেও।
যদিও ওদের মারতেই হবে। আমার হিসেবে ভালুক মারা আর মানুষ মারার মধ্যে আকাশপাতাল তাফাৎ।
আর আমি জিপসিদের ওইসব ভালুক ও মানুষের বেরাদরির টোটকা-টাটকায় বিশ্বাস করি না। উঁহু, আমি মানুষ মারার বিরুদ্ধে”।
“তবু তুমি হত্যা করলে”?
“হ্যাঁ, আবার করব”। আনসেলমো বলে,”কিন্তু ভাল লাগেনি। কিন্তু এসব মিটে গেলে যদি বেঁচে থাকি, তাহলে বাকি জীবন এমন ভাবে বাঁচতে চাই যাতে কারও ক্ষতি না হয়।
তাহলে হয়ত ক্ষমা পাব”।
“কে ক্ষমা করবে”?
“কী জানি! এখন তো আমাদের ঈশ্বর নেই, তাঁর পুত্রও নেই, এমনকি পবিত্র ভূতও নেই। তাহলে কে ক্ষমা করবে? আমার জানা নেই”।
“তোমার কোনও ভগবান নেই”?
“না হে; সত্যিই নেই। যদি সত্যিই ঈশ্বর থাকতেন, তাহলে আমি যেসব চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি সেসব উনি হতে দিতেন? ওই ব্যাটারা ঈশ্বরকে রেখে দিক গে’”।
“ওরা তো বলেই যে ঈশ্বর ওদের সঙ্গে”।
“আমি সত্যি ওনাকে খুব মিস্ করি। ধার্মিক আবহাওয়ায় বড় হয়েছি তো। কিন্তু এখন প্রত্যেককে তার নিজের কৃতকর্মের দায়িত্ব নিতে হবে”।
“তাহলে তুমিই মানুষ খুনের পাপের বোঝা থেকে তোমাকে মুক্তি দেবে”।
“এটাই আমার বিশ্বাস”, আনসেলমো বলে। “আর তুমি যখন এমন গুছিয়ে স্পষ্ট করে বোঝালে, আমার মনে হচ্ছে তাই হবে।
তবে ঈশ্বর মানো- না—মানো, আমার মনে হয় কাউকে মেরে ফেলা পাপ। কারো প্রাণ নেয়া বেশ গম্ভীর অপরাধ।
হ্যাঁ, দরকারে আবার মারব, কিন্তু এ নিয়ে পাবলো’র সঙ্গে কোন ইঁদুর দৌড়ে নেই”।
“যুদ্ধ জিততে হলে শত্রুদের হত্যা করতেই হবে। এটাই সনাতন নিয়ম”।
“হ্যাঁ, যুদ্ধে নামলে শত্রুদের মারতে হবে। কিন্তু আমার এ’বিষয়ে কিছু অদ্ভুত ধরণের ভাবনা চিন্তা আছে”।
এখন ওরা অন্ধকারে একে অপরের গা ঘেঁষে চলছে। ওকথা বলছে ধীরস্বরে। মাঝে মাঝে পেছন ফিরে কিছু দেখে নিচ্ছে।
“আমি কিন্তু কোন ধর্মযাজক বা বিশপকে মারতে পারব না। এমনকি কোন ব্যবসাদার বা মালিককেও না।
ওদের দিয়ে প্রত্যেক দিন খেতে কাজ করাবো। যেমনটি ওরা আমাদের দিয়ে করিয়েছে, যেমন করে ওরা পাহাড়ের ওপরে গাছ কাটতে আমাদের ব্যবহার করেছে ।
বাকি জীবন ওদের ওভাবেই কাটাতে হবে। আমরা যেভাবে শুতাম, ওরা তেমনই করে শোবে। যেমন করে খেতাম ওরা তাই খাবে।
সবচেয়ে বড় কথা হল ওদের খেটে খেতে হবে। তবেই ওরা কিছু শিখবে”।
“ওরা টিকে যাবে, তারপর ফের তোমাদের গোলাম বানাবে”।
“ওদের মেরে ফেলে কিছুই শেখাতে পারবেনা”। আনসেলমো বলতে থাকে, “তুমি ওদের একেবারে শেষ করে দিতে পারবেনা।
ওদের বীজ থেকে যারা জন্মাবে তাদের থাকবে বুকভরা ঘৃণা, অনেক বেশি ঘৃণা”।
“এরপরেও তো তুমি ওদের হত্যা করছ”!
“হ্যাঁ, করছি। আরও করব। তবে খুশি মনে নয়, পাপ করছি ভেবেই করব”।
“আর সেন্ট্রি? তুমি তখন সেন্ট্রিকে মেরে ফেলা নিয়ে ইয়ার্কি করছিলে”।
“হ্যাঁ, তবে ওটা নিছক মজা করেই বলেছিলাম। হ্যাঁ, সেন্ট্রিকে মারব, তবে খোলা মনে কর্তব্যবোধে, খুশি মনে নয়”।
“আমরা এই কাজটা তাদের উপর ছেড়ে দেব, মানে যারা মানুষ মেরে আনন্দ পায়।
রবার্ট জর্ডানের বক্তব্য, “আট আর পাঁচ, মোট বারোজন হাতে আছে যারা কাজটা করে আনন্দ পায়”।
“মানুষ মেরে খুশি হয় ওরকম লোক অনেক আছে”। অন্ধকারে আনসেলমোর মুখ দেখা যাচ্ছে না।
“আমাদের কাছেই আছে বেশ কয়জন। বলতে গেলে- যতজন লড়াইয়ের ময়দানে নামতে রাজি, তার চেয়ে বেশি”।
“তুমি কখনও যুদ্ধে গেছ”?
“নাঃ আন্দোলনের গোড়ার দিকে আমরা সেগোভিয়াতে লড়াই করেছিলাম, কিন্তু হেরে পালিয়ে গেলাম। সবার সঙ্গে আমিও দে দৌড়।
আসলে ঠিক কী যে করছি সে নিয়ে আমাদের কোন ধারণা ছিলনা। কীভাবে করা উচিত সেটাও জানা ছিল না।
আমার হাতে ছিল মাত্র একটা শটগান আর ছররা ভরা কার্তুজ। আর ‘সিভিল গার্ড’দের হাতে মাউজার!
একশ’ গজ দূর থেকেও ওদের গায়ে আমার ছররা ভরা গুলি বেঁধেনি, অথচ ওরা মাউজার দিয়ে তিনশ’ গজ দূর থেকে আমাদের যেমন ইচ্ছে নিশানা করছে, যেন খরগোস শিকার!
আমরা ওদের চোখে একটা ভেড়ার পালের চেয়ে বেশি কিছু ছিলাম না”।
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর ও বলল, “কী মনে হয়, সেতুর ওখানটায় একটা লড়াই হবে”?
“সম্ভাবনা তো আছে”।
“আমি না পালিয়ে কোন যুদ্ধ দেখি নি”। আনসেলমো চিন্তিত, “জানি না তখন আমি ঠিক কী করব। বুড়ো হয়েছি। এসব নিয়ে অনেক ভাবি”।
‘তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি”, রবার্ট জর্ডানের কন্ঠস্বর।
“আগে বল, নিজে কখনও কোন লড়াইয়ে ছিলে”?
“অনেকগুলোতে”।
“তাহলে বল এই সেতুর ব্যাপারটা--তোমার ঠিক কী মনে হয়”?
“কী ভাবি? প্রথম কথা, এটা আমার দায়িত্ব। সেতুটাকে উড়িয়ে দেয়া তেমন কঠিন হবে না। তারপরে বাকি কাজগুলো।
এখন এই পর্য্যন্ত। তবে সমস্ত নির্দেশ কাগজে লেখা থাকবে”।
“এখানে কজনই বা পড়তে পারে”? আনসেলমো বলে।
“সবার অবগতির জন্য নির্দেশগুলো লেখা থাকবে, এছাড়া সবাইকে ভাল করে বুঝিয়ে দেয়া হবে”।
“আমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হবে ভাল ভাবে পালন করব”।
আনসেলমো বলে,”কিন্তু সেগোভিয়ার গোলাগুলির অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যদি জবরদস্ত যুদ্ধ হয়, কিছু না হলেও যদি গুলিটুলি চলে,
আমার ইচ্ছে যে কাজটা এমন স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়া হোক যাতে কোন অবস্থাতেই পালাতে না হয়।
মনে আছে, সেগোভিয়াতে আমি যেকোন ছুতোনাতায় খালি পালানোর কথা ভাবতাম”।
“আমরা একসাথে থাকব”, জর্ডান আশ্বস্ত করে,”সব পরিস্থিতিতেই কী করতে হবে তোমায় স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেব”।
“তাহল তো কোন কথাই নেই”, আনসেলমো যেন নিশ্চিন্ত, “যে কাজ দেয়া হবে সব করব”।
“আমাদের জন্য কাজের মত কাজ একটাই—সেতু এবং যুদ্ধ”।
রবার্ট জর্ডানের মনে হল-- অন্ধকারে কথাটা বেশ নাটুকে শোনাচ্ছে, তবে স্প্যানিশ ভাষায় বেশ লাগসই।
“এটা আমার সর্বোচ্চ আগ্রহের বিষয়”। আনসেলমো কথাটা বলল স্পষ্ট এবং আন্তরিক ভাবে, কোন বিশেষ কায়দা ছাড়া।
না ইংরেজদের মিতভাষণের নকল, না স্প্যানিশদের বারফট্টাই। এসব শুনে রবার্ট জর্ডানের মনে হল ওর কপাল ভাল যে এই বুড়োকে ওর পাশে পেয়েছে।
সেতুটা দেখে ও সমস্যাগুলোর সমাধান ছকে ফেলেছে। পাহারাদারদের ঝটিকা আক্রমণে কাবু করে স্বাভাবিক ভাবে সেতুটা উড়িয়ে দিতে হবে।
এখন গোলৎজের আদেশগুলো ওর ক্ষোভ এবং বিরক্তি উৎপাদন করছে। মনে হচ্ছে ওগুলোর কোন দরকার ছিল না।
এটাও মাথায় আসছে যে এই অভিযানের ফল ওদের জন্যে কী হতে পারে এবং বুড়ো মানুষটারও কী হাল হবে!
যারা ওই আদেশগুলোকে কাজে পরিণত করবে তাদের জন্যে এর পরিণাম খুব খারাপই হবে।
কিন্তু এভাবে চিন্তা করা উচিত নয়। এখন শুধু তুমি নও, অন্য কোনও ব্যক্তি নেই যে ঘটনার স্রোতকে আটকাতে পারে।
তুমি বা বুড়ো আনসেলমো কেউই ধর্তব্যের মধ্যে নয়। তুমি শুধু কর্তব্য পালনের সাধনমাত্র। কিছু নির্দেশ এসেছে, তাতে তোমার কি দোষ?
ওতে তোমার কোন হাত নেই। তোমাকে শুধু আদেশ পালন করতে হবে।
সেতুটার কথাই ধর। হয়ত ওই একটা সেতুই গোটা মানবজাতির ভবিষ্যৎ বদলে দেবে।
অবশ্য বিশাল এই যুদ্ধে যা কিছুই ঘটছে সবই ভবিষ্যত সভ্যতার গতিপথ বদলে দেবার জন্য যথেষ্ট।
তোমার উপর শুধু একটা কাজের দায়িত্ব, আর সেটা তোমাকে ভালভাবে করতে হবে, ব্যস্।
শুধু একটা দায়িত্ব? একটিমাত্র কাজ? চুলোয় যাক। ইশ্, যদি একটা সহজ কাজ দেয়া হত! ঢের হয়েছে, এবার যত এলোমেলো ভাবনা-চিন্তা সব কাটিয়ে দাও দিকি।
এখন ও নিজেকেই গাল দিলঃ হতচ্ছাড়া বার খাওয়া বেজন্মা কোথাকার! অন্য কিছু নিয়ে ভাবো।
সুতরাং এবার মারিয়া বলে মেয়েটাকে নিয়ে ভাবা যাক। মারিয়ার মসৃণ ত্বক, ছাঁটা চুল আর চোখ—সব একইরকম সোনালি তামাটে রঙের।
হ্যাঁ, চুলের রঙ একটু গাঢ় বটে, কিন্তু ওর ত্বক আরও রোদেপোড়া হলে চুলটা একটু হালকা মনে হবে। ওর মসৃণ ত্বক ওপরে ওপরে পেলব সোনালি, কিন্তু তলায় গভীরতার আভাস।
পেলব বটে, ওর পুরো শরীরটাই কোমল। ওর চলার ভঙ্গীতে খানিকটা বিব্রতভাব; যেন ওর মধ্যে বা ওর ব্যাপারে একটা কিছু আছে , যা অস্বস্তিকর এবং যেটা সবার চোখে পড়ছে।
আসলে এসব কিছুই নেই, খামকা ওর মাথার ভেতরে জট পাকিয়ে গেছে।
আর জর্ডান যখন ওর দিকে তাকালো ও লজ্জায় গোলাপি হয়ে গেল। ও বসেছিল দু’হাতে হাঁটু জড়িয়ে, শার্টটা গলার দিকে খোলা, স্তনের উর্ধমুখী গোলাইয়ের আভাস শার্টের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। মারিয়াকে নিয়ে ভাবা শুরু করতেই ওর গলা শুকিয়ে বন্ধ হওয়ার জোগাড়, পা ফেলা কঠিন।
বাকি পথটা ও আর আনসেলমো হেঁটে গেল একটাও কথা না বলে।
হঠাৎ বুড়ো মুখ খুলল, “এবার আমরা ওই পাথরের চট্টানগুলোর ফাঁক দিয়ে নীচের দিকে নামব, ক্যাম্প প্রায় এসে গেছে”।
অন্ধকারে বড় বড় চট্টানগুলো পেরোতেই একটা কন্ঠস্বর শোনা গেল—“ হল্ট! কে যায়”?
রাইফেলের বোল্ট খট করে পেছনে টানার এবং কাঠের কুঁদোর সঙ্গে ঘষটে ফের সামনের দিকে টানার শব্দ।
“কমরেডস্”, আনসেলমোর উত্তর।
“কিসের কমরেড”?
“আমরা পাবলোর কমরেডস্। আরে আমাদের চেন না নাকি?”, আনসেলমোর কড়া জবাব।
“চিনি তো, কিন্তু যেমন হুকুম এসেছে”। কন্ঠস্বর নির্বিকার। “আচ্ছা, পাসওয়ার্ড বল”।
“জানিনা, আমরা তো নীচের থেকে আসছি”।
“জানি, তোমরা সেতুর ওখান থেকে আসছ। সবই জানি। কিন্তু অর্ডার তো অর্ডারই হয়।
আমাদের কাজ মেনে চলা। পাসওয়ার্ডের দ্বিতীয় অংশটা বলতেই হবে”।
“আচ্ছা, তাহলে প্রথম অংশটা কি? তুমি বল”? রবার্ট জর্ডানের প্রশ্ন।
“ ভুলে মেরে দিয়েছি”, অন্ধকারে কন্ঠস্বর হেসে ফেলল।“বেশ তোমরা তোমাদের অশ্লীল ডায়নামাইট নিয়ে ক্যাম্পের আগুনের দিশায় একটা ইয়ের মত গুটিগুটি চলে যাও”।
“এই হচ্ছে গেরিলা ডিসিপ্লিন”! আনসেলমো তিতিবিরক্ত, “তোর হাতের ওটার সেফটি ক্যাচ খোল্”।
“খোলাই আছে। আমি বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে চেপে নামিয়ে দিয়েছি”, অন্ধকারে গলার আওয়াজ স্পষ্ট।
“হুঁ, মাউজারের সঙ্গে অমন করবি তো গুলি ছুটে যাবে। ওদের বোল্টের উপর সবসময় খাঁজকাটা থাকে না”।
“এটা মাউজারই”। লোকটা বলতে থাকল, “কিন্তু আমার বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে চাপ দেবার একটা কায়দা আছে। আমি বরাবরই ওভাবে ক্যাচ খুলছি”।
“হুঁ, রাইফেলের মুখ কোনদিকে তাগ করা”? আনসেলমো জমাট বাঁধা অন্ধকারে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
“তোমার দিকে। যখন সেফটি ক্যাচ নামিয়েছি তখন থেকেই। আর তোমরা ক্যাম্পে পৌঁছে চটপট আমার বদলি হিসেবে কাউকে পাঠাও।
আমার অসভ্যের মত খিদে পেয়েছে আর পাসওয়ার্ড গেছি ভুলে”।
“তোমার ডাকনাম”?
কথাটা “অগাস্তিনো”, লোকটা জোর দিয়ে বলল,” আমাকে অগাস্তিনো বলে ডাকা হয় আর আমি একজায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একঘেয়েমির চোটে হেজে গেছি”।
“ঠিক আছে। আমরা খবর পৌঁছে দেব”। কথাটা বলে রবার্ট জর্ডান ভাবতে লাগল-- ‘একঘেয়েমির চোটে হেজে যাওয়া’ কথাটা যেকোন স্প্যানিয়ার্ডের মুখে হরদম শোনা যায়।
“আমার কথা শোন”, অগাস্তিনো এবার রবার্ট জর্ডানের কাছে এসে ওর কাঁধে হাত রাখল এবং চকমকি ঠুকে লাইটার জ্বালিয়ে তার আলোয় রবার্টের তরুণ মুখ ভাল করে নিরীক্ষণ করল।
“তুমি তো দেখছি আগের সেই লোকটার মতই দেখতে, তবে সামান্য তফাৎ আছে। আচ্ছা শোন”।
ও এবার লাইটার নিভিয়ে রাইফেলটা আঁকড়ে ধরে বলল, “ এটা বল, সেতুটার বিষয়ে যা শুনছি, সব সত্যি”?
“সেতুর বিষয়ে কী শুনেছ”?
“শুনেছি আমরা একটা ইয়ে সেতু ইয়ে করে উড়িয়ে দেব। তারপর আমরা নিজেদের ইয়ে করে ইয়ের মতন পাহাড় ছেড়ে কেটে পড়ব”!
“আমার জানা নেই”।
“তোমার জানা নেই? কী বর্বরের মতন কথা! তাহলে এই ডায়নামাইটগুলো কার”?
“আমার”।
“আর তোমারই জানা নেই ওগুলো দিয়ে কী হবে? দেখ, আমাকে ঢপ দিও না”।
“আমি জানি ওগুলো কী আর তুমিও জানতে পারবে, তবে সময় হলে। আপাতত আমরা ক্যাম্পে যাচ্ছি”।
“ইয়ের ইয়েতে যাও। তবে একটা কাজের কথা বলি”?
“বলতে পার, যদি শালার ইয়ের ইয়ে না হয়”, জর্ডান কথা শেষ করতে চাইছে।
এই অগাস্তিনো লোকটা এত খিস্তি করে কথা বলে! প্রত্যেকটি বিশেষ্যের সঙ্গে একটা খিস্তি বিশেষণের মত জুড়ে দেয়,
আবার সেই একই খিস্তি ক্রিয়াপদের জন্যেও ব্যবহার করে! ও কি একটা বাক্যও গুছিয়ে বলতে পারে না?
অগাস্তিনো জর্ডানের মুখে ওর প্রিয় এবং প্রতি বাক্যে হরদম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খিস্তিটা শুনে অন্ধকারে হেসে উঠল।
“আরে ওটা আমার কথা বলার লব্জ। মানছি শব্দটা হয়ত নোংরা, কী জানি! সবাই নিজের অভ্যস্ত ভঙ্গীতে কথা বলে।
শোন, ওই সেতুটা আমার জন্য কিস্যু না। অন্য যেকোন জিনিসের মতই, ব্যস্। আর এই পাহাড়ি জীবন বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে।
তাই এখান থেকে চলে যেতে হলে আমি রাজি। এই পাহাড়গুলোও আমার কাছে ফালতু। এদের ছেড়ে যাওয়াই উচিত।
কিন্তু যেটা বলছি মন দিয়ে শোন। তোমার বিস্ফোরকগুলো সাবধানে আগলে রেখো”।
“ধন্যবাদ”, রবার্ট জর্ডান বললো, “কার থেকে? তোমার থেকে”?
“ না”, অগাস্তিনো বলল,” আমার চেয়েও কম ইয়েওলাদের থেকে”।
“মানে”?
“তুমি তো স্প্যানিশ বোঝো”, অগাস্তিনো এবার গম্ভীর, “তোমার ওই ইয়ের ডিনামাইটগুলোকে চোখে চোখে রাখবে”।
“ধন্যবাদ”।
“ধন্যবাদ-টাদ ছাড়ো! নিজের মাল সামলাও”।
“ওগুলোর কিছু হয়েছে নাকি”?
“এখনও হয়নি। হলে আর কি তোমার সঙ্গে এতক্ষণ বকবক করতাম”!
“ঠিক আছে, তবু ধন্যবাদ। আমরা এখন ক্যাম্পের জন্যে রওনা দেব”।
“বেশ; দেখো যাতে ওরা পাসওয়ার্ড জানা কাউকে পাঠায়”।
“ক্যাম্পে তোমার সঙ্গে দেখা হবে কি”?
“হ্যাঁ দোস্ত, শিগগিরই হবে”।
“চল, যাওয়া যাক”, জর্ডান আনসেলমোকে বলল।
ওরা এখন মাঠের ধার ঘেঁষে হাঁটছে। একটা ধূসর কুয়াশা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। বনের পাইন-কাঁটা বিছানো বনের পথে পায়ের নীচে কোমল ঘাস ।
সেই ঘাসের শিশির ওদের জুতোর দড়ি দিয়ে বোনা গোড়ালি ফুঁড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে ক্যানভাসের জুতো।
রবার্ট জর্ডানের সামনে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা দিল একটি আলোর বৃত্ত। বোঝা যাচ্ছে ওখানেই গুহার মুখ।
“অগাস্তিনো মানুষটা খুব ভালো”, আনসেলমোর মন্তব্য।
“ও নোংরা খিস্তি করে কথা বলে আর সারাক্ষণ ঠাট্টা তামাশা করে বটে, কিন্তু আসলে ও খুব সিরিয়াস ধরণের লোক”।
“তুমি ওকে ভাল করে চেন”?
“অবশ্যই; অনেক আগে থেকে। ওর উপর আমার পুরো ভরসা আছে”।
“আর ও যা বলছিল”?
“ঠিকই বলেছে। ওই পাবলো ব্যাটা বিগড়ে গেছে। তুমি নিজেই দেখলে”।
“তাহলে আমাদের কী করা উচিত”?
“সারাক্ষণ পাহারা দেয়া উচিত”।
“কে দেবে সারাক্ষণ পাহারা”?
“তুমি, আমি, ওই মহিলা এবং অগাস্তিনো। ও বিপদের গন্ধ পায়”।
“তুমি কি ভেবেছিলে যে এখানে অবস্থা, এখন যেমন দেখ্ অতটাই খারাপ হবে”?
“না, বড্ড তাড়াতাড়ি পচন ধরেছে। কিন্তু এখানে আসাটা জরুরি ছিল। এটা পাবলো’র আর ‘এল সর্দো’র এলাকা।
এখানে কিছু করতে হলে আমাদের আগে ওদের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। তবে কাজটা যদি একাই সেরে ফেলার মতন হয় তবে আলাদা কথা”।
“আর ‘এল সর্দো’ লোকটা কীরকম”?
“খুব ভাল। অন্যজন যতটা খারাপ ও ততটাই ভাল”।
“তোমার কি এখন বিশ্বাস হচ্ছে যে অন্যজন পুরোপুরি পচে গেছে”?
“দেখ, আমি সারাদিন এই কথাটা ভাবছি। তারপর এখন যা সব শুনলাম তাতে আর বিশ্বাস না হয়ে উপায় কি”?
“আচ্ছা, যদি অন্য আরেকটা সেতুর কথা বলে এখান থেকে চলে যাই? আর অন্য জায়গার দলগুলো থেকে লোক জুটিয়ে নিই”?
“না, এটা ওর রাজ্য”, আনসেলমো বলল, “ভেবো না তুমি ওর চোখে ধুলো দিয়ে অন্য কোথাও সটকে পড়বে আর ও টের পাবে না।
আমাদের অনেক সাবধানে পা ফেলতে হবে”।
[1] স্প্যানিশ ‘হোলা’= হ্যালো।
[2] স্প্যানিশ ‘নো এস নাদা’=কিস্যু না।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।