[ গতবছর থেকে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখাপত্তর কপিরাইট মুক্ত হয়েছে।
আমি জয় গুরু! বলে ওঁর স্পেনের ফ্যসিবিরোধী গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস "ফর হুম দ্য বেল টোলস্" এর অনুবাদ শুরু করলাম। আমার প্রিয় উপন্যাস। হেমিংওয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্জাত এই রচনা। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হোল এই উপন্যাস ধর্মযুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। হরদম যে কথাটা হিংসার সপক্ষে শোনা যায়--কোল্যাটারাল ড্যামেজ-- সেটা যে মানবমূল্যের হনন, এটা দেখাবে। প্রতি সাপ্তাহিক কিস্তিতে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার শব্দ থাকবে।]
কার জন্যে ঘন্টা বেজে যায়!
“ মানুষ কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। আমরা সবাই এক মহাদ্বীপের অংশমাত্র। ইউরোপের কোন ভুখন্ড যদি সমুদ্রে ডুবে যায়, তাতে গোটা ইউরোপের ক্ষতি। ------
যে কোন মানুষের মৃত্যু আমায় বিচলিত করে, কারণ আমি সমগ্র মানবজাতির কথা ভাবি।
কাজেই প্রশ্ন কোর না কার জন্যে এই ঘন্টাধ্বনি। জেনে রাখ, ও বেজে চলেছে তোমার জন্যে”।
জন ডান (ইংরেজ কবি)
১
ও বুকে ভর দিয়ে পাঁশুটে পাইন- কাঁটা বিছানো জমিতে সটান শুয়ে আছে। ওর থুতনির ভর ভাঁজ করা হাতের উপর, উঁচিয়ে রাখা মাথা।
হাওয়া বইছে অনেক উঁচুতে পাইনগাছের মাথা ছুঁয়ে। ও যেখানে শুয়ে রয়েছে তার পাশেই পাহাড়ের হালকা ঢাল।
কিন্তু সেটা নীচের দিকে বড্ড খাড়া হয়ে নেমেছে। গিরিপথ দিয়ে এঁকেবেকে যাওয়া ঝাঁ -চকচকে কালো রাস্তাটা এখান থেকে বেশ দেখা যাচ্ছে।
রাস্তার পাশাপাশি একটা নদী বয়ে চলেছে। আর অনেক দূরে খানিকটা ঢালু পথের বাঁকে নদী’র পাশে একটি কারখানা চোখে পড়ছে।
ঝরছে বাঁধের জল, - গ্রীষ্মের রোদে একেবারে ধবধপে সাদা।
“ওটাই কি সেই কারখানা”? ওর প্রশ্ন।
“হ্যাঁ”।
“কই, আমার তো মনে পড়ছে না”!
“তুমি যাওয়ার পর তৈরি হয়েছে। পুরনো মিল আরেকটু নেমে, গিরিপথ থেকে অনেকটা নীচে”।
ও মিলিটারি ম্যাপের ফটোস্ট্যাট কপিটি বনভূমির মাটিতে ভাল করে বিছিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। বুড়ো লোকটা ওর ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে দেখতে লাগল।
বুড়ো বেঁটেখাটো শক্তপোক্ত গড়নের। পরনে চাষিদের কালো জোব্বা আর কড়া ইস্ত্রিকরা ধূসর রঙের প্যান্ট। পায়ে দড়ির শুকতলাওলা জুতো।
চড়াই ভেঙে ওঠার পরিশ্রমে ওর হাঁফ ধরেছে। হাত রেখেছে পিঠে বয়ে আনা দুটো বস্তার উপর।
“তাহলে তো ব্রিজটা এখান থেকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়”।
“না”, বুড়ো মুখ খুলল, “এটাই গিরিপথের সহজ সমতল এলাকা, এখানে জলের স্রোত মন্থর। নীচে, যেখানে রাস্তাটা বাঁক নিয়ে গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়েছে ,
তারপরই আচমকা ঢালু পথ আর একটা মস্ত খাই আর ঘাট—“।
“এবার মনে পড়ছে”।
“ ব্রিজটা ওই খাঁড়ির উপরে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে আছে”।
“আর সেন্ট্রিরা? ওরা কোথায়”?
“যো কারখানাটা দেখতে পাচ্ছ, ওইখানে ওদের একটা ঘাঁটি রয়েছে”।
যুবকটি এলাকাটা খুঁটিয়ে দেখছে। সে এবার রঙওঠা খাকি ফ্ল্যানেল শার্টের পকেট হাতড়ে একটা দূরবীন বের করল।
রুমাল দিয়ে কাঁচ পরিষ্কার করে স্ক্রুগুলো টাইট করতে থাকল যতক্ষণ না দূরের কারখানাটির অবয়ব ফুটে ওঠে ।
এখন সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সব কিছু-- বন্ধ দরজা আর তার পাশে পাতা কাঠের বেঞ্চ, কারখানার শেডের নীচে গোল করাত, তার মাথা ছাড়িয়ে ওঠা কাঠের গুঁড়োর বিশাল স্তুপ, নদীর ওপারের পাহাড়তলি থেকে গাছের গুঁড়ি ভাসিয়ে নিয়ে আসার জন্যে খোঁড়া নালাটার একটা কোণ—সবকিছুই।
দূরবীনের কাঁচে স্রোতটি স্বচ্ছ ও মসৃণ । তার নীচে বাঁধে আছড়ে পড়ছে ফেনিল জলধারা, হাওয়ায় উড়ছে কুচি কুচি জলকণা।
“কোন সেন্ট্রি নেই মনে হচ্ছে”।
“কারখানার গায়ের বাড়িগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছে, দড়ি থেকে কিছু কাপড়জামা ঝুলছে’, বুড়ো লোকটা বলে।
“ওসব তো আমিও দেখছি, কিন্তু কোন পাহারাদার কই”?
“হয়ত কারখানার শেডের নীচে রয়েছে”, বুড়ো লোকটা ফের টিপ্পনি কষে,” বাইরে বড্ড গরম, ওবোধহয় কারখানার ছায়ায় আরাম করছে।
শেষের ওই কোণাটায়—ওটা এখান থেকে দেখা মুশকিল”।
“তা হবে; কিন্তু পরের সেন্ট্রি পোস্ট কোথায়”?
“ব্রিজের নীচে, গিরিপথের মাথার থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটা রাস্তা মেরামত করনেওয়ালাদের ঝুপড়ির নীচে”।
“ওখানে কয়জন ”? তরুণটি কারখানার দিকে আঙুল তুলে ইশারা করে।
“সম্ভবতঃ চারটে সেপাই আর একজন কর্পোরাল”।
“আর নীচের পোস্টে”?
“আরও কয়েকজন; আমি খোঁজ নিয়ে বলব”।
“আর নদীর উপরের ব্রিজটায়”?
“সবসময় দুটো লোক, একটা এ’মুড়োয়, আর একটা ও’মুড়োয়”।
“আমাদের বেশ ক’জন লোক চাই। তুমি ক’টা লোক জোগাড় করতে পারবে”? তরুণের প্রশ্ন।
“তোমার যত চাই’। বুড়োর গলায় আত্মবিশ্বাস। “আজকাল পাহাড়ে অনেক লোকের আড্ডা”।
“ঠিক কতজন”?
“একশোর বেশি, তবে ওরা সব ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়। তোমার ক’জন লাগবে?”
“ব্রিজটা নিয়ে ভাল করে তত্ত্বতালাশ করার পর বলতে পারব”।
“এখনই করতে চাও”?
“না না, আগে আমাকে যেতে হবে এমন কোথাও, যেখানে বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখলে ঠিক সময়ে হাতে পাওয়া যাবে।
সুরক্ষিত জায়গাটা এই ব্রিজটার থেকে আধঘন্টার বেশি দূরে হলে চলবে না। এমন জায়গা পাওয়া যাবে”?
“এটা কোন সমস্যা না”, বুড়ো আশ্বস্ত করে,”যেখানে আমি নিয়ে যাচ্ছি সেটা ব্রীজ থেকে অনেকটা ঢাল ধরে নীচের দিকে।
কিন্তু ওখানে যেতে এখন আমাদের অনেকটা চড়াই ভেঙে উঠতে হবে। তোমার খিদে পেয়েছে”?
“হ্যাঁ”, তরুণের উত্তর। “কিন্তু সে পরে হবে’খন। তোমার নামটা কী যেন? ভুলে গেছি”। এই ভুলে যাওয়া ব্যাপারটা ওর কাছে একটা অশুভ লক্ষণ।
“আনসেলমো”, বুড়োর জবাব, “আমাকে সবাই আনসেলমো বলে ডাকে। আমি এসেছি বার্কো দে অ্যাভিলা থেকে।
দাঁড়াও তোমায় ভারি বোঝাটা সামলাতে একটু হাত লাগাই”।
লম্বা ছিপছিপে যুবকটির সুন্দর চুলগুলো রোদেপোড়া, মুখের রঙ রোদ-হাওয়ায় তামাটে, গায়ের ফ্লানেলের শার্টটি রোদ খেয়ে ফ্যাকাসে, পরনে চাষিদের পাৎলুন আর দড়ির হিলওলা জুতো।
ও এখন ঝুঁকে চামড়ার ব্যাগের স্ট্র্যাপের মধ্যে হাত গলিয়ে এক ঝটকায় ব্যাগটা কাঁধে তুলে ফেলল। তারপর অন্য স্ট্র্যাপের ভেতর হাত গলিয়ে ব্যাগের ওজনটা পিঠের উপর চাপিয়ে ঠিক করে নিল। শার্টের পিঠটা বেশ ঘামে জবজবে।
“হয়ে গেছে”, ওর প্রশ্ন, ‘কীভাবে যেতে হবে”?
“চড়াই ভাঙতে হবে”, আনসেলমোর সিধে জবাব।
পিঠের বোঝার চাপে ঝুঁকে, পাহাড়ে ছাওয়া পাইনবনের ভিতর দিয়ে ওরা চড়াই বেয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে চলতে শুরু করল।
যুবকটি কোন পায়ে- চলা পথের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছে না। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে যে ওরা পাহাড়টাকে গোল করে ঘিরে একটু একটু করে উঁচুতে উঠছে।
এখন ওরা একটা ছোট জলধারা পেরিয়েছে, বুড়ো লোকটা অনায়াসে নদীগর্ভের পাথুরে ধার ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছে। এবার চড়াই আরও খাড়া এবং বেশ কঠিন।
হঠাৎ চোখে পড়ল যে নদীটা অনেকটা উঁচুতে পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা একটা বড় গ্র্যানাইট পাথরের উপর দিয়ে নীচে লাফিয়ে পড়েছে।
আর বুড়োটা ওই পাথরের কোণায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে-- যুবকের উপরে উঠে আসার জন্যে!
“আরে, কী করে ওখানে চড়লে? আচ্ছা, ঠিক আছে”। যুবক ভীষণ ঘামছে, ওর উরুর পেশিগুলো খাড়া ওপরে ওঠার পরিশ্রমে থরথর করে কাঁপছে।
“আমি যতক্ষণ না বলি, ওইখানেই থাক। আগে গিয়ে ওদের সতর্ক করে আসি, নইলে খামোকা গুলি খাবে।
পিঠে ওই বোঝা নিয়ে নিশ্চয়ই সেটা চাও না”?
“পাগল নাকি”? যুবকের উত্তর, “আচ্ছা, অনেকটা দূর”?
“উঁহু, খুব কাছে। তোমাকে ওরা কী বলে ডাকে”?
“রোবের্তো”, যুবকটি উত্তর দিয়ে পিঠের ব্যাগ নামিয়ে নদীখাতের পাশে দুটো বড় পাথরের চাঁইয়ের ফাঁকে নামিয়ে রাখে।
“তাহলে, রোবের্তো, এখানেই অপেক্ষা কর। আমি এলাম বলে”।
“বাঃ, কিন্তু তুমি কি এখান থেকে নীচে নেমে ব্রীজের পাশ দিয়েই যাবে”?
“না, আমরা যখন ব্রীজের দিকে যাব তখন অন্য একটা পথ ধরব—শর্টকাট এবং সহজ”।
“এইসব মালপত্তর আমি ব্রীজের থেকে বেশি দূরে রাখতে চাই না”।
“দেখে নিও, তোমার যদি পছন্দ না হয়, তাহলে অন্য ব্যবস্থাও আছে”।
“দেখব’খন”, যুবক বলল।
ও ব্যাগের পাশে বসে দেখতে লাগল কেমন করে বুড়ো পাথরের চট্টানে চড়ছে। মনে হল এটা খুব একটা কঠিন নয়।
যেভাবে বুড়ো একবারও না হাতড়ে পাথরের খাঁজে হাত রাখার জায়গা পেয়ে যাচ্ছে তার থেকে বোঝা যাচ্ছে ও এই পথে অনেকবার যাতায়াত করে।
তবে যারাই এই পথটা ব্যবহার করে তারা খুব সতর্ক, যাতে কোন চিহ্ন না থাকে।
যুবকের আসল নাম রবার্ট জর্ডান, ওর বড্ড খিদে পাচ্ছে। তাছাড়া ওর একটু চিন্তা হচ্ছে। এর আগে বহুবার ও খিদের জ্বালা টের পেয়েছে, কিন্তু কখনও এমন আশংকা হয়নি।
তার কারণ, ও কখনও নিজের কী হবে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাত না। এছাড়া অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিল যে এদেশের গ্রামাঞ্চলে শত্রুপক্ষের লাইনের পেছনে চলাফেরা করা বেশ সহজ।
শুধু লাইনের পেছনে যাতায়াতই নয়, ওদের ব্যুহ ভেদ করে চলাফেরাও বেশ সরল—হ্যাঁ, একজন ভাল গাইড থাকা চাই।
চিন্তার কথা হল ধরা পড়লে তোমার কী হবে, আর কাকে কাকে বিশ্বাস করা যায়! যাদের সঙ্গে কাজ করছ, হয় তাদের পুরো বিশ্বাস কর, অথবা একদম নয়।
এবং এই বিশ্বাস করা- না-করার সিদ্ধান্তটা তোমাকেই নিতে হবে। তবে এসব নিয়ে ও মোটেই মাথা ঘামাচ্ছে না। আরও অনেক ব্যাপার রয়েছে।
এই আনসেলমো লোকটা গাইড হিসেবে বেশ ভাল। পাহাড়ি এলাকায় চলাফেরা করতে ওস্তাদ। রবার্ট জর্ডান নিজেও ভালরকম হাঁটতে সক্ষম।
তবে সকাল থেকে পেছন পেছন হেঁটে ওর বিশ্বাস হয়েছে যে বুড়োটা ওকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে মেরে ফেলতে পারে। রবার্ট জর্ডানের এখন পর্য্যন্ত লোকটাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে,
তবে ওর নির্ণয় বা সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার ব্যাপারে এখনই কিছু বলা মুশকিল।
যাই হোক, সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তো ওর নিজের।
নাঃ , আনসেলমো আর ব্রিজের ব্যাপারটা নিয়ে ওর একটুও মাথাব্যথা হচ্ছে না। ও জানে কী করে কোন ব্রীজ উড়িয়ে দিতে হয়।
এর আগে ও বেশ কয়েকটি বিভিন্ন মাপের এবং নানান রকম ডিজাইনের ব্রীজ ধ্বংস করেছে।
ওর দুটো ব্যাগে যে পরিমাণ বিস্ফোরক এবং দরকারি যন্ত্রপাতি মজুদ রয়েছে তা এই ব্রীজটা উড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট।
আনসেলমো যেরকম বলেছে ব্রীজটা যদি তার থেকে দ্বিগুণ বড় হয় তাতেই বা কী! ব্রীজের মাপ নিয়ে ওর খানিকটা আন্দাজ রয়েছে,
কারণ ও ১৯৩৩ সালে লা গ্রাঞ্জা পায়ে হেঁটে যাবার পথে এই ব্রীজ পেরোতে হয়েছে।
তাছাড়া পরশু রাত্তিরে এসকোরিয়াল শহরের উপকণ্ঠে একটি দোতলা বাড়িতে কম্যাণ্ডার গোলজ্ ব্রীজটার মাপ-নকশা সব ওকে পড়ে শুনিয়েছে।
“ব্রীজটা উড়িয়ে দেয়া কোন ব্যাপার নয়”, গোলজ্ বলছিল। ওর ক্ষতে ভরা চকচকে কামানো মাথায় লম্প’র শিখা নাচছে, আর ও একটা বড় ম্যাপ বিছিয়ে একটা ছুঁচলো পেনসিল উঁচিয়ে ওকে বোঝাচ্ছিল। “কিছু বুঝলে”?
“হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি”।
“কিচ্ছু বোঝনি। শুধু একটা ব্রীজ উড়িয়ে দেয়া মানে আমাদের ব্যর্থতা”।
“হ্যাঁ, কমরেড জেনারেল”।
“ব্রীজটা ওড়াতে হবে একটা নির্দিষ্ট সময়ে, আর সেই সময় নির্ধারিত হবে হামলা যখন হবে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এসব তো তুমি ।
গোলজ্ পেনসিলের ডগার দিকে তাকাল এবং সেটা দিয়ে নিজের দাঁতে টোকা দিতে থাকল। রবার্ট জর্ডান কিছু বলল না।
“ তুমি তো ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছ আর এটা ঠিক ভাবে করা হল তোমার কাজ”, গোলজ্ বলতে থাকল আর ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে লাগল।
তারপর পেনসিল দিয়ে ম্যাপে টোকা দিতে দিতে বলল,”আমি এভাবেই কাজটা করতে চাই। আর আমরা চাইলেও করতে পারছি না”।
“কেন কমরেড জেনারেল”?
“কেন”? গোলজের গলায় রাগ আর হতাশা। “ক’টা হামলা তুমি দেখেছ যে আমাকে প্রশ্ন করছ ‘কেন’? আমার আদেশগুলো যে খারিজ করা হবে না তার কী গ্যারান্টি?
আক্রমণের সিদ্ধান্তই যে বাতিল হবে না তার কী গ্যারান্টি? হামলার ব্যাপারটা যে আচমকা স্থগিত হবে না তার কী গ্যারান্টি?
কী গ্যারান্টি যে আক্রমণটা যখন শুরু হবার কথা তারপর ছ’ঘন্টা গড়িয়ে গেলেও শুরু হবে না?
আজ অব্দি কোন আক্রমণ যেমন ভাবে হওয়া উচিত তেমনটি হয়েছে”?
“আপনার নেতৃত্বে আক্রমণ হলে সেটা ঠিক সময়ে হবেই”, রবার্ট জর্ডান বলে।
“ একটাও আমার নয়”, গোলজের কথায় ঝাঁঝ।
“আমি পরিচালনা করি বটে কিন্তু একটাও আমার হিসেবে হয় না। গোলন্দাজ বাহিনী আমার নয়।
আমি কতবার বলেছি, কিন্তু যেটা চাই সেটা কখনও দেয় না,-- এমনকি ওদের কাছে থাকলেও না। তবে এটা তো কিছুই না, আরও অনেকও কিছু আছে।
ওরা কেমন লোক সেটা তোমার ভালই জানা আছে। সবকিছু নিয়ে ফের প্যাচাল পারা অর্থহীন। সবসময় কিছু একটা হয়। সবসময় কেউ না কেউ বাগড়া দেবে।
আশা করি এখন খানিকটা বুঝতে পেরেছ”।
“আচ্ছা, পুলটা কখন ওড়াতে হবে”? রবার্ট জর্ডানের প্রশ্ন।
‘হামলা শুরু হলেই, তার আগে নয়। যাতে আক্রমণের সময় ওপাশের রাস্তা থেকে কোন সাহায্য না আসে”। ও ফের পেনসিল দিয়ে ম্যাপে চিহ্ন দেখায়।
“আমাকে নিশ্চিত হতে হবে যে আমাদের হামলার সময় এই রাস্তাটা দিয়ে কিছুই আসতে পারবে না”।
“বেশ, তা হামলাটা কখন হচ্ছে”?
“আমি তোমাকে জানিয়ে দেব। তবে জেনে রেখ, তারিখ আর ঘন্টা একটা সম্ভাবনার ইঙ্গিত মাত্র, তার বেশি নয়। তোমাকে ওই সময়ের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে।
আক্রমণ শুরু হতেই তুমি পুলটা বিস্ফোরণ করে উড়িয়ে দেবে। এখানে দেখ”, ও ফের পেনসিল দিয়ে জায়গাটা দেখায়।
“ওটাই একমাত্র রাস্তা যেখান দিয়ে ওদের কাছে কোন সাহায্য পৌঁছে যাবে। ওটাই রাস্তা যেখান দিয়ে ওদের ট্যাংক, কামানবাহিনী চলে আসতে পারে।
আমরা গিরিপথে আক্রমণ চালালে ওরা ওইখান দিয়ে একটা ট্রাক এনে রাস্তা আটকে দিতে পারে। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে ব্রীজটা গেছে। আগে করলে চলবে না।
কোন কারণে হামলা স্থগিত হলে ওরা ব্রীজটা সারিয়ে নেয়ার সুযোগ পাবে।
“ না না, এটাকে অবশ্যই আক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উড়িয়ে দিতে হবে এবং আমাকে জানাতে হবে যে ওটা আর নেই। ওখানে মাত্র দুটো সেপাই রয়েছে।
যে লোকটা তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে সে ওখান থেকেই এসেছে। শুনেছি লোকটা খুব বিশ্বস্ত আর ভরসা করা যায়। তুমি দেখে নিও।
পাহাড়ে ওর অনেক চেনা লোকজন আছে। যত লোক দরকার চেয়ে নিও।
কম লোককেই কাজে লাগাবে, তবে ভাল করে রগড়ে কাজ করিয়ে নেবে। এসব তোমাকে বলতে হবে কেন”?
“কিন্তু কী করে বুঝব যে আমাদের আক্রমণ শুরু হয়েছে”?
“একটা গোটা ডিভিসন হামলা চালাবে। তার আগে বোমারু বিমান থেকে হামলা হবে। আশা করি তুমি কালা নও”।
“তাহলে প্লেনগুলো বোমা ফেলতে শুরু করলেই ধরে নিতে হবে যে আক্রমণ শুরু হয়েছে, তাই তো”?
“সবসময় ও’রম ধরে নিও না”। গোলজ্ মাথা নাড়তে থাকে। “তবে হ্যাঁ , এটার সময় ধরতে পার। কারণ, এই হামলাটা হবে আমার পরিচালনায়”।
“বুঝেছি, তবে আমার খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না”। রবার্ট জর্ডান গম্ভীর।
“আমারই কি পছন্দ হচ্ছে? তুমি যদি কাজটা করতে না চাও, তো এখনই বলে দাও। যদি মনে হয় তোমার দ্বারা হবে না, তাহলে এখনই বলে দেয়া ভালো”।
“আমি করতে পারব, ভালো করেই করব”, রবার্ট জর্ডান হামি ভরে।
“ব্যস্ এটুকু জানলেই যথেষ্ট”, গোলজের স্বস্তির নিঃশ্বাস। “ব্রীজের উপর দিয়ে কিছু আসবে যাবে না, তাহলেই হল। এটাই শেষ কথা”।
“বুঝেছি”।
“ আমি এইধরণের কাজ কাউকে দিয়ে এভাবে করাতে পছন্দ করি না”, গোলজ বলতে থাকে,” আমি তোমাকে হুকুম করতে পারিনা। আমি এই কাজের খুঁটিনাটি ভাল করে ব্যাখ্যা করে তোমাকে এর সম্ভাব্য অসুবিধেগুলো বলে দিচ্ছি যাতে এমন না মনে হয় যে জোরজবরদস্তি করে তোমাকে বাধ্য করা হচ্ছে।
এতে তুমি কাজটার গুরুত্ব এবং বাধাগুলোর ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকবে”।
“আচ্ছা, সেতুটা উড়িয়ে দিলে তোমরা লা গ্রাঞ্জার দিকে কী করে এগোবে”?
“আমরা তৈরি হয়ে যাব, যাতে গিরিপথের হামলা সফল হলে সেতুটা আবার মেরামত করে নেয়া যায়। এটা একটা জটিল এবং সুন্দর অপারেশন হবে।
সর্বদা যেমন জটিল এবং সুন্দর হয়ে থাকে! আক্রমণের পরিকল্পনাটি মাদ্রিদে বসে তৈরি। এটি ভিনসেন্তে রোজোর মস্তিষ্কপ্রসূত ।
এক অসফল অধ্যাপকের আর একটি মাস্টারপিস আর কি! তবে আমি যখন দায়িত্ব নিই তখন আক্রমণ হবেই, যদিও পর্যাপ্ত রসদ এবং গোলাবারুদ পাবো না।
তবু বলছি, অপারেশনটা সফল হতে পারে, এতসব সত্ত্বেও।
আমি এবার অন্যসব বারের চেয়ে বেশি খুশি। সেতুটা না থাকলেই আক্রমণ সফল হবে। আমরা সেগোভিয়া দখল করে নেব। এস, তোমায় দেখাচ্ছি কীভাবে সম্ভব হবে।
দেখছ? আমরা গিরিপথের শিখরে হামলা করছি না। ওটা আটকে দিয়ে – এই দেখ-- এই জায়গাটায়। অনেকটা পেছনে—দেখ, এই রকম, এই ভাবে”।
“আমার না জানাই ভালো”, জর্ডান পাশ কাটাতে চায়।
“বেশ, তাহলে তোমাকে ওপারে যাওয়ার সময় তোমার বোঝাটা হালকা হবে, ঠিক?”
“দেখুন, আমি কখনই এসব আগে থেকে জানতে চাই না। তাহলে কোন কিছু ঘটলে আমার দোষ হবে না। কেউ বলবে না যে আমি ফাঁস করে দিয়েছি”।
“ঠিক; বেশি না জানাই ভালো”। গোলজ্ পেনসিল দিয়ে টাক চুলকোতে থাকে।“আমি নিজেই কতবার ভেবেছি যে বেশি জেনে দরকার নেই।
তবে এটা তো ঠিক যে সেতুটার ব্যাপারে তোমার সবকিছু জেনে রাখা উচিৎ”?
“হ্যাঁ, সেটা জানি”।
“ আমারও মনে হয় তুমি এসব জান। তাহলে তোমাকে আর লম্বাচওড়া বক্তিমে ঝাড়ছি না। চল, একপাত্তর হয়ে যাক। কমরেড হোর্ডান!
এত কথা বললে আমার গলা শুকিয়ে আসে, বড্ড তেষ্টা পায়। কমরেড হোর্ডান, স্প্যানিশ ভাষায় তোমার নামটা বেশ মজার শোনায়”।
“স্প্যানিশে গোলজ্ কেমন করে উচ্চারণ করে, কমরেড জেনারেল”?
“ হোটজ্”, গোলজ্ হাসে।
ওর গলার ভেতর থেকে উঠে আসা উচ্চারণ শুনে মনে হয় কেউ যেন গলায় বিচ্ছিরি ঠান্ডা লাগায় খ্যাঁকখেঁকিয়ে কেশে কফ তুলছে।
“হোটজ”, ও ব্যাঙের ডাকের মত আওয়াজে বলে—“কমরেড হেনারেল হোটজ্। আগে জানলে যুদ্ধে আসার আগে অন্য একটা ভাল নাম নিতাম।
ভেবেছিলাম আমি তো একটা ডিভিসনের কম্যাণ্ডার। তাহলে তো যে কোন নাম নিতে পারি। তাই নিলাম গোটজ্। স্প্যানিশে কমরেড হেনারেল হোটজ্।
এখন বদলানোর পক্ষে দেরি হয়ে গেছে। আচ্ছা, পার্টিজান কাজকর্ম কেমন লাগছে”?
‘পার্টিজান’ হল শত্রু লাইনের পেছনে গেরিলা যুদ্ধের রাশিয়ান নাম।
খুব ভালো লাগছে। খোলা হাওয়ায় শরীর ভাল থাকে”, রবার্ট দাঁত বের করে।
“তোমার মত বয়সে আমারও খুব ভাল লাগত”, গোলজ্ বলে,” ওরা বলে তুমি নাকি ব্রীজ ওড়ানোর ব্যাপারে ভারি ওস্তাদ! একেবারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কর।
অবশ্য এসব শোনা কথা। নিজের চোখে তোমাকে এখনও বিশেষ কিছু করতে দেখিনি। বোধহয় বাস্তবে অমন কিছুই ঘটেনি।
আচ্ছা, তুমি সত্যি সত্যি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্রীজ উড়িয়ে দাও”?
ও এবার রবার্টের পেছনে লাগছে। “নাও, এটা খেয়ে ফেল দেখি”। ও রবার্ট জর্ডানকে এক গেলাস স্প্যানিশ ব্রাণ্ডি বাড়িয়ে দেয়।
“হ্যাঁ গো, সত্যিই ওড়াও”?
“কখনও সখনও” ।
“শোন, এই ব্রীজটার ব্যাপারে ওইসব ‘কখনও সখনও’ একদম চলবে না। নাঃ, ব্রীজ নিয়ে আর কথা নয়। তুমি ব্যাপারটা ভাল করে বুঝে নিয়েছ।
আমরা খুব সিরিয়াস, তাই এসব তেতো এবং হালকা রসিকতা করতে থাকি। ভাল কথা, তোমার কি শত্রু লাইনের ওপারে অনেক মেয়েবন্ধু আছে”?
“নাঃ , মেয়েছেলে নিয়ে ভাবার মত সময় কোথায়”!
“মানতে পারলাম না। যত এলোমেলো পেশা, তত এলোমেলো জীবন। তোমার পেশাও বড্ড এলোমেলো। আর চুলটা এবার কাটা দরকার”।
“আমার চুলের ছাঁট আমার হিসেবে ঠিক আছে”। হুঁঃ, গোলজের মত ন্যাড়া মাথা করবে নাকি!
“আমার এখন অনেক চিন্তা। মেয়েদের নিয়ে না ভাবলেও চলবে”। জর্ডান এবার গোমড়ামুখো।
“তারচেয়ে বলুন কী ধরণের ইউনিফর্ম পরতে হবে”?
“কিস্যু না’, গোলজ্ জবাব দেয়। “তোমার চুলের ছাঁট ঠিক আছে। আমি একটু মজা করছিলাম।
তুমি বাপু আমাদের মত নও”, এই বলে গোলজ্ ফের গেলাস ভরে দিল।
“তুমি শুধু মেয়েদের নিয়ে বেশি ভাব-টাব না। আমি তো কোনকিছু নিয়েই ভাবি না। কেন ভাবতে যাব? আমি হলাম খাঁটি সোভিয়েত মার্কা জেনারেল।
আমাদের ভাবতে নেই। খবর্দার যদি আমাকে প্যাঁচ কষে ভাবতে বাধ্য করেছ”!
ওর একজন স্টাফ চেয়ারে বসে ড্রয়িংবোর্ডে একটা ম্যাপ লাগিয়ে কাজ করছিল। সে মাথা তুলে গোলজ্কে কিছু বলল, কিন্তু তার ভাষা রবার্টের অজানা।
“শাট্ আপ”! গোলজ্ ইংরেজিতে চেঁচিয়ে উঠল, তারপর জর্ডানকে বলল, “আমার যখন ইচ্ছে ইয়ার্কি করব, তুমি বলার কে! আমি খুব সিরিয়াস, তাই মজা করে কিছু বলি।
এখন গেলাসটা খালি কর, তারপর বিদেয় হও, বুঝেছ”?
“হ্যাঁ, একদম বুঝে ফেলেছি”, রবার্ট জর্ডান বলল। রবার্ট গোলজের সঙ্গে করমর্দন সেরে স্যালুট করে বেরিয়ে গেল। স্টাফ কারে বুড়ো আনসেলমো ঘুমোচ্ছিল।
ওরা ওই গাড়িতে করে গুয়াদাররামা পেরিয়ে গেল, বুড়ো তখনও গভীর ঘুমে। তারপর নভাসেরাদা রোড বেয়ে হাজির হল আলপাইন হাট।
সেখান থেকে রওনা দেবার আগে জর্ডান ঘন্টা তিনেক ঘুমিয়ে নিল।
গোলজের সঙ্গে ওর সেই শেষ দেখা।
কিন্তু স্মৃতিতে রইল ওর তীক্ষ্ণ শিকারী বাজের মত চোখ, বড় নাক, পাতলা ঠোঁট, ক্ষতচিহ্ন এবং আঁকিবুকি ভরা ন্যাড়া মাথা, আর মুখের অদ্ভুত ফর্সা রঙ যা রোদে পুড়ে বদলায়নি।
আগামীকাল রাতের আঁধারে ওরা এই পথেই এসকোরিয়ালের সীমানায় পৌঁছে যাবে। এখানে এখন ট্রাকের লম্বা লাইন, তাতে ভরা হচ্ছে পদাতিক সৈন্য।
ওরা ট্রাকে উঠছে, কাঁধে ভারি বোঝা । মেশিনগান বাহিনী তাদের অস্ত্রগুলো সাবধানে তুলছে। ট্যাংক বহন করার ট্রাকগুলো বেশ লম্বা।
তাতে পাটাতন লাগিয়ে ট্যাংক তোলা হচ্ছে। গিরিপথে পৌঁছে হামলা চালানোর জন্যে গোটা ডিভিসন রাতেই রওনা দিচ্ছে।
কিন্তু ওর বয়ে গেছে এসব নিয়ে ভাবতে। এটা ওর কাজ নয়, গোলজের কাজ। ওর একটাই দায়িত্ব, ওকে শুধু সেই কাজটা নিয়েই চিন্তাভাবনা করা উচিত।
শুধু তাই নয়, ওকে মাথা সাফ রাখতে হবে, যখন যা ঘটবে সে সব সামলে নিতে হবে। বেশি ভাবলে চলবে না।
অতিরিক্ত ভাবনাচিন্তা ভয় পাওয়ারই সামিল। এর ফলে সবকিছু খামোখা কঠিন হয়ে যায়।
ও এখন জলের ধারে বসে বড় বড় শিলাখন্ডের ফাঁক দিয়ে বইতে থাকা নির্মল জলধারাকে দেখছে। হঠাৎ চোখে পড়ল জলস্রোতের পাড় ঘেঁষে বেশ খানিকটা কলমিশাকের ঘন ঝোপ গজিয়ে উঠছে। রবার্ট উঠে জলের ধার পেরিয়ে গেলে দুমুঠো জলজ শাক তুলে জলের স্রোতে ডুবিয়ে শেকড়ের কাদামাটি ধুয়ে ফেলল। তারপর নিজের ঝোলার পাশে বসে পরিষ্কার এবং ঠান্ডা সবুজ পাতাগুলো কচকচিয়ে চিবুতে শুরু করল। ঝাঁঝালো স্বাদের মুচমুচে ডাঁটিও বাদ গেল না।
এবার ও জলের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। কোমরের বেল্টে আটকানো অটোমেটিক পিস্তলটি পিঠের দিকে ঘুরিয়ে দিল যাতে জল না লেগে যায়।
তারপর দুটো বড় পাথরের উপর হাতের ভারসাম্য রেখে জলের উপর ঝুঁকে জল খেতে শুরু করল। জলটা একেবারে সিরসিরানি লাগানো ঠান্ডা।
দু’হাতে চাপ দিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই দেখতে পেল বুড়ো আনসেলমোকে-- উঁচু শিলাখণ্ডের উপর দিয়ে হেঁটে আসছে, সঙ্গে আরেকজন।
লোকটির পরনে চাষিদের কালো জোব্বা এবং গাঢ় বাদামি পাৎলুন। এটা বোধহয় এই অঞ্চলের সবার ইউনিফর্ম।
এর জুতোর গোড়ালিটা দড়ির, কাঁধে ঝুলছে একটা কার্বাইন জাতের বন্দুক। তবে লোকটা মাথা ঢাকেনি। দুজনে পাহাড়ের গা বেয়ে ছাগলের মত হড়বড়িয়ে নেমে আসছে।
ওরা কাছে আসতে রবার্ট জর্ডান উঠে দাঁড়ালো।
‘স্যালুদ কামারাদা”! কার্বাইনধারী লোকটিকে সম্বোধন করে কথাটা বলে ও একটু হাসল। লোকটি জবাব দিল ‘স্যালুদ’, যেন নিতান্ত অনিচ্ছায়।
জর্ডান লোকটির খোঁচাখোঁচা দাড়িওলা ভারি মুখটাকে ভাল করে দেখতে লাগল। গোলমত থোবড়া, মাথাটাও গোলাকার ঘাড়েগর্দানে।
কুতকুতে চোখদুটোর মধ্যে বেশ খানিকটা ফাঁক।
ছোট ছোট কানদুটো মাথার সঙ্গে লেপটে রয়েছে। গাঁট্টাগোট্টা, পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি লম্বা; তবে হাত আর পা’ দুটো বেশ বড়সড়।
ভাঙা নাক আর মুখের এক কোণায় কাটা দাগ। উপরের ঠোঁট আর নীচের চোয়ালের কাটা দাগ দাড়ির জঙ্গলের ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে।
বুড়ো আনসেলমো লোকটার দিকে মাথা নাড়িয়ে মুচকি হাসল। “ওই কিন্তু এখানকার বস্”।
তারপর হাতের গুলি ফুলিয়ে ঠাট্টা ও প্রশংসা মিলিয়ে বলল “ গায়ে খুব জোর”।
“সে তো দেখতেই পাচ্ছি”, রবার্ট জর্ডান আবার হাসল। ওর নতুন লোকটাকে একেবারে পছন্দ হয়নি। আর ভেতরে ভেতরে হাসির নামগন্ধ ছিল না।
“তোমার পরিচয়-পত্র বলতে কিছু আছে”? কার্বাইনধারীর প্রশ্ন।
জর্ডান পকেটের ভেতরে একটা সেফটিন পিন খুলে ওর ফ্ল্যানেল শার্টের বাঁদিকের বুকপকেটের ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে লোকটার হাতে দিল। লোকটা ভাঁজ খুলে সন্দেহের চোখে কাগজটাকে একপলক দেখে এদিক ওদিক উলটে পালটে নাড়াচাড়া করতে লাগল।
রবার্ট বুঝে গেল ও পড়তে জানেনা।
“সীলমোহরটা দেখে নাও”।
বুড়ো আঙুল দিয়ে সীলটা কোথায় দেখিয়ে দিল। লোকটা ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ দেখে বলল, “এটা কিসের সীল”?
“আগে কখনও দেখনি”?
“উঁহু”।
“দুটো সীল”, রবার্ট মুখ খুলল, “ একটা হল ‘এস আই এম’, মানে সার্ভিস অফ দ্য মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, অন্যটা জেনারেল স্টাফ”।
“হ্যাঁ, আগে দেখেছি বটে, কিন্তু এখানে শুধু আমার হুকুম চলে”, ও গোমড়ামুখে কথাটা জানিয়ে দিল। “ওই থলেগুলোতে কী আছে”?
“ডিনামাইট”, বুড়োর গর্বিত উত্তর।
“কাল রাতের অন্ধকারে আমরা শত্রুশিবির পেরিয়ে ঢুকে পড়েছি। তারপর দিনের বেলায় পাহাড় টপকে ডিনামাইট বয়ে এনেছি।
“ডিনামাইট আমার কাজে লাগবে”। কার্বাইনধারী কথাটা বলে কাগজ ফেরত দিয়ে রবার্ট জর্ডানকে আপাদমস্তক দেখে বলল, “হ্যাঁ, ডিনামাইট আমার চাই, তা’ আমার জন্যে কতটা আনলে”?
“তোমার জন্যে তো আনি নি”, জর্ডনের সমান তালে জবাব।
“ডিনামাইট অন্য কাজের জন্য, তোমার নামটি”?
“যাই হোক, তাতে তোমার কী”?
“ও হল পাবলো”, আনসেলমো বলল।
কার্বাইনধারী গোমড়ামুখ করে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
“বেশ, তোমার নাম তো খুব শুনেছি”, রবার্ট জর্ডান বলল।
“ আমার সম্বন্ধে কী শুনেছ”?
“শুনেছি, তুমি একজন দারুণ গেরিলা নেতা। আর তুমি রিপাবলিকের প্রতি বিশস্ত, তার প্রমাণ তোমার কাজ। তুমি যেমন কাজের, তেমনি সাহসী।
আমি রিপাবলিকের জেনারেল স্টাফের থেকে তোমার জন্য অভিনন্দন- বার্তা বয়ে এনেছি”।
“এসব কোথায় শুনেছ, কার কাছে”?
রবার্ট জর্ডান খেয়াল করল যে এই বান্দা খোসামোদে গলে যাওয়ার পাত্তর নয়।
“বুইত্রাগো থেকে এসকোরিয়াল পর্য্যন্ত তোমার খ্যাতি শুনেছি”। জর্ডান চটপট পাহাড়ের ওপারে গোটা এলাকার নাম আউড়ে দিল।
“আমি বুইত্রাগো বা এসকোরিয়ালের কাউকে চিনি না”, পাবলো দৃঢ় ভাবে জানিয়ে দিল।
“আজকাল পাহাড়ের ওপারে নানারকম নতুন লোকজন এসেছে। তাই হয়ত চেন না। তুমি কোথাকার পাবলো”?
“আভিলা। ডিনামাইট দিয়ে কী করবে”?
“ একটা ব্রীজ উড়িয়ে দেব”।
“কোন ব্রীজ”?
“সেটা আমার ব্যাপার”।
“এই এলাকায় কিছু ঘটলে সেটা আগে আমার ব্যাপার। তুমি কক্ষনো নিজের থাকার জায়গার কাছে কোন ব্রীজ ওড়াতে পার না। থাকতে হয় এক জায়গায়, অপারেশন অন্য জায়গায়।
আমি নিজের কাজ ঠিক বুঝি। যে এমন সময়ে এক বছর ধরে বেঁচে রয়েছে, সে নিজের কাজটা ভালই জানে”।
“এটা আমার কাজ’, রবার্ট জর্ডান বলল, “শোন, এসব আমরা দুজনে মিলে আলোচনা করে ঠিক করে নেব। এখন বল, তুমি কি বোঝাগুলো বয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে”?
“না”, পাবলো মাথা নাড়ে।
হঠাৎ বুড়ো লোকটা পাবলোর দিকে ঘুরে এক অপরিচিত স্থানীয় ভাষায় দ্রুত রাগতভাবে কিছু বলল।
আনসেলমো প্রাচীন কাস্তিলিয়ান উপভাষায় যা বলছিল তার মানে করলে মোটামুটি এ’রকম শোনাবেঃ
“তুমি কি বর্বর? নাকি জানোয়ার? হ্যাঁ, কখনও কখনও তাই বটে! তোমার মাথায় ঘিলু বলে কিছু আছে, না নেই? বুঝতে পারছি—নেই!
আমরা এসেছি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু করতে আর তুমি ভাবছ তোমার থাকার জায়গায় যেন আঁচ না লাগে! মানবতার স্বার্থ আগে, নাকি তোমার শেয়ালের গর্ত?
তোমার নিজের মানুষদের কথা ভাববে না?
তোর বাপের ইয়েতে আমি ইয়ে করি! আর তোর ইয়েতেও ইয়ে! শিগগির ঝোলা তোল বলছি”!
পাবলো চোখ নামাল।
“যে যেটা ভাল করে করতে পারে, তার সেটাই করা উচিত; হ্যাঁ, কায়দামাফিক”। পাবলো বলতে শুরু করে, “আমি থাকি এখানে আর অপারেশন করি সেগোভিয়ায়।
যদি এখানে কোন ঝামেলা পাকাও, ওরা আমাদের তাড়া করে পাহাড় এলাকা থেকে খেদিয়ে দেবে। আমরা এখানে টিকে আছি কী করে?
এইখানে কিছু না করে, চুপচাপ মাথা গুঁজে।এটাই শেয়ালের কায়দা”।
“হ্যাঁ, এটা শেয়ালের কায়দা বটে”, আনসেলমোর তিক্ত স্বর, “কিন্তু আমাদের এখন দরকার নেকড়ে বাঘ”।
“বেশি কপচিও না। আমি তোমার চেয়ে ঢের বড় নেকড়ে”।
রবার্ট জর্ডান নিশ্চিত হল যে পাবলো এবার বোঝাটা কাঁধে নেবে।
“হে হে, তুমি আমার চেয়ে বড় নেকড়ে! আর আমার বয়েস আটষট্টি”। আনসেলমো ধিক্কারের মত মাথা নেড়ে মাটিতে পিচ করে থুতু ফেলল।
“তোমার বয়েস আটষট্টি! সত্যিই”? রবার্ট জর্ডান দেখল ওষুধ ধরেছে, কাজ হয়ে যাবে। তাই পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা।
“আসছে জুলাইয়ে আটষট্টি হবে”।
“যদি জুলাই অব্দি বেঁচে থাক বুড়ো’!
পাবলো এবার রবার্টকে বলল, “একটা বোঝা আমি নিচ্ছি, আরেকটা বুড়োটাকে দাও”।
ওর চেহারায় এখন গোমড়াভাবটা চলে গিয়ে একটা বিষণ্ণ ভাব, “বুড়োর গায়ে অনেক তাগদ”।
“ওটা আমি নেব”, রবার্টের উত্তর।
“না না, এটা বরং এই দ্বিতীয় শক্তিশালী লোকটার জন্যে ছেড়ে দাও”, বুড়ো নিজের কথায় দৃঢ়।
“থাক না, আমিই নিচ্ছি”।
পাবলোর গলায় স্পষ্ট বিষাদের সুর। এই বিষাদ রবার্টের খুব চেনা। এই সুর ওকে চিন্তায় ফেলল।
“তাহলে আমায় কার্বাইনটা দাও”, রবার্ট বলায় পাবলো ওকে দিয়ে দিল। সে বন্দুকটা পিঠে ঝুলিয়ে চলতে শুরু করল।
ওর আগে দুজন ভারি মাল বয়ে পাহাড়ে উঠছে, গ্র্যানাইট পাথরের খাঁজ বেয়ে মাল টেনে শিখরচুড়ো পেরিয়ে চলেছে সেই দিকে,
যেখানে বনে ঢাকা অনেকখানি সমতল খোলা জায়গা রয়েছে। ওরা ছোট্ট মাঠের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলল, পেছনে রবার্ট জর্ডান
। ওর কাঁধে এখন কোন চিপচিপে ঘামে ভেজা বোঝা নেই, শুধু পিঠে বন্দুকটা, তাই লম্বা লম্বা পা ফেলে চলছে।
ওর চোখে পড়ল যে কোথাও কোথাও ঘাস ছেঁটে ফেলা হয়েছে এবং পাহারাদারদের মাটিতে পোতা পথের দিকনির্দেশের চিহ্নও রয়েছে।
ঘাসের ঝোপের ভেতরে ঘোড়াদের নদীতে জল খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ে আসার পদচিহ্ন চিনতে ভুল হচ্ছে না। এমনকি একাধিক ঘোড়ার গু’য়ের তাজা চিহ্নও দেখা যাচ্ছে।
ও ভাবল—ঘোড়াগুলোকে বোধহয় রাত্তিরে এখানেই চরাতে নিয়ে আসে আর দিনের বেলায় জঙ্গলের ভিতর লুকিয়ে রাখে। পাবলোর কাছে ক’টা ঘোড়া আছে? মনে পড়ল, পাবলোর পাতলুন হাঁটুর আর উরুর কাছটায় ঘসা লেগে পাতলা চকচকে যেন সাবান দিয়ে মাজা। এর তাৎপর্য তখন খেয়াল হয়নি।
ওর কি ঘোড়ায় চড়ার বুটজুতো আছে, নাকি আলপারগাতাস গোছের দেশি হালকা জুতো পরে ঘোড়ায় চড়ে?
কিন্তু ওর মুখের ওই গোমড়া ভাব আমার একটুও পছন্দ হচ্ছেনা। এই বিষণ্ণ ভাবটা ভালো লক্ষণ নয়। এই গোমড়া ভাবটা মানুষকে দল ছাড়ার বা বিশ্বাসঘাতকতা করার আগের স্তর।
এই ভাবটা যখন মানুষকে পেয়ে বসে তখনই সে বেইমানি করে।
ওদের সামনের গাছপালার ভেতর থেকে একটা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
পাইনগাছের মাথা ছুঁয়ে পাতার ঘন আস্তরণ ভেদ করে সূর্যের সামান্য আলোয় এবার চোখে পড়ল-- গাছের বাদামি কাণ্ডে দড়ি দিয়ে বেঁধে তৈরি ঘোড়ার আস্তাবল ।
মানুষের চেহারা দেখে ঘোড়াগুলো মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে রইল। ওদের জিন আর রেকাব আস্তাবলের বাইরের একটা গাছের নীচে একজায়গায় ডাঁই করে ত্রিপল দিয়ে ঢাকা।
আস্তাবলের কাছে এসে বোঝা বইতে থাকা দু’জন থেমে পড়ল। রবার্ট জর্ডান বুঝল—এবার ওর পালা, ঘোড়াগুলোর তারিফ করতে হবে।
“হ্যাঁ, ঘোড়াগুলো ভারি সুন্দর তো”! তারপর পাবলোকে বলল,” তোমার তো দেখছি পুরো অশ্বারোহী বাহিনী তৈরি”।
আস্তাবলে পাঁচটি ঘোড়া, তিনটে বাদামি, একটা লালচে আর একটা হালকা মাখনরঙা।
রবার্ট জর্ডান ওদের খুঁটিয়ে দেখতে লাগল; প্রথমে একসঙ্গে, তারপর একটা একটা করে। ওদের গুণ পাবলো আর আনসেলমোর ভাল করেই জানা আছে।
পাবলো এখন আর বিমর্ষ নয়, বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে ওদের দেখছে, দৃষ্টিতে রয়েছে অগাধ ভালবাসা।
আর আনসেলমো এমন ভাব করছে, যেন ও নিজেই হঠাৎ করে এক পরমাশ্চর্যের জন্ম দিয়েছে।
“এদের কেমন দেখছ”? রবার্টের প্রশ্ন।
“ এগুলো আমি জিতে এনেছি”। পাবলোর গলায় গর্বের সুর রবার্টের ভাল লাগল।
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।