দেখা না দেখায় মেশাঃ পর্ব ৮
এস, এস আমার ঘরে এস
আজ সল্টলেকে সুপ্রিয়ের বাড়িতে আড্ডা। ওর গিন্নি গেছে মেয়ের বাড়িতে, শরীরটা একটু খারাপ শুনে দেখতে গেছেন।
খালি বাড়ি, বন্ধুর উদার আহ্বান। ফ্রায়েড রাইস, চিকেন কষা, স্যালাড--- সব সুপ্রিয় রেঁধেছে।
আরও আছে--- বলরাম মল্লিকের মাখা সন্দেশ আর মিষ্টি দই। ওর হাতে স্বাদ আছে। এমনকি ওদের বিবাহবার্ষিকীতেও বিশেষ পদগুলো ওই রাঁধে।
অন্য মহিলারা ওর বৌকে রীতিমত ঈর্ষা করে।
--কচি বয়েস থেকে শিবের মাথায় জল চড়িয়ে আসছে, বাবা তারকনাথ, বৈদ্যনাথ সব করেছে।
তবে না এমন বর পেয়েছে। বৌকে একেবারে চোখে হারায়!
--সবার কপাল কি আর সমান হয়। আমার কত্তাটিকে দেখ। চাকরি থেকে রিটায়ার করেছে, আমার তো হয়নি।
উলটে ওভারটাইম করতে হচ্ছে।
--হ্যাঁ রে, সারা সকাল বাড়িতে বসে কাগজ পরা, টিভি দেখা আর ঘন্টায় ঘন্টায় চায়ের ফরমাশ।
আবার রোজ একরকম জলখাবার হলে মুখে রোচে না, প্লেট ঠেলে সরিয়ে দেয়।
আড্ডা জমে ওঠে।
একটা জিনের বোতল খোলা হয়েছে। চিকেন পকোড়ার প্লেট সামনে। আমি গেলাস সরিয়ে দিই।
--সে কী? ওহ্ ডাক্তারের বারণ। দূর! তোর সুগারের সমস্যা নেই, লিভারে পচন ধরেনি, গল ব্লাডারে স্টোন নেই, তবে?
ক্লোরোস্টেরল একটু বেড়েছে? ছাড় তো , এক আধদিন নিয়ম ভাঙলে কিস্যু হবে না।
সত্যি কথা বল অবিনাশ—এখন তো রীমা ভাবীজি নেই। কে বারণ করবে?
তুই বাড়িতে একা, আপনা হাত, জগন্নাথ। তা তুই কি মাঝে মাঝে জিন বা ভোদকা? ধর মাসে এক আধবার?
সত্যি না? একেবারে ছেড়ে দিয়ে রামদেব বাবা হয়ে গেলি? শরীর শরীর করে মাথা খারাপ?
নাকি তোর ভেতরে ভয় ঢুকেছে? কিসের এত ভয়? তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, সংসারের দায়িত্ব শেষ।
সবাইকে শালা একদিন উপরে যেতে হবে। চিত্রগুপ্তের দরবারে হাজির হয়ে নিজের লেজার চেক করাতে হবে। কী কৈফিয়ৎ দিবি?
আমি হাসি, জবাব দিই না। কিন্তু সুপ্রিয় খোঁচাতে থাকে।
--বল না, কিসের ভয়? কোন বিগ ব্রাদার তোকে চোখে চোখে রাখছে? বিগ ব্রাদার নয়? বিগ মাদার? কোন পড়োশিনী?
কী বলব ভেবে পাই না। গল্পটা ব্রাদার মাদার নয়—একেবারে আদার।
কাউকে বলার জন্যে জিভ চুলকোচ্ছে, এমন একটা নতুন জীবন! কেউ ভেবেছিল?
কে বিশ্বাস করবে?
মানুষ নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে কিছু হলে হেসে উড়িয়ে দেয়।
প্রথম যখন কলের গাড়ি চলে, বাষ্পশকট লোহার লাইনের উপর ভুক ভুক করে কালো ধোঁয়া ছেড়ে দৌড়য়,
আকাশে ডানা মেলে বিমান উড়ে যায়—সব ফক্কিকারী।
চাঁদে মানুষ কি সত্যি নেমেছিল নাকি আমেরিকা গুছিয়ে গোটা দুনিয়াকে বোকা বানাচ্ছে?
এ নিয়ে এখনও অনেকের সন্দেহ আছে।
এমনকি আত্মা, ভূত, ভগবান –এ নিয়েও কেউ কেউ পরশুরামের গল্পের ম্যাথসের প্রফেসরের মত ভাবেঃ
ভূত=জিরো, ভগবান= স্কোয়ার রুট অফ জিরো।
কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ আজ বিশ্বাস করে।
দুটো কারণে। এক কলের নৌকো, কলের গাড়ি, রেলগাড়ি, এরোপ্লেন—এগুলো এখন অসংখ্য মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অঙ্গ।
কিন্তু ভূত আর ভগবান?
এটা সেই চন্দ্রযানের মতন—অথরিটি বললে লোকে বিশ্বাস করে। যেমন তেমন নয়, জবরদস্ত অথরিটি—ইসরো কিংবা নাসা।
রকেট ওড়ার সময় দিনের বেলা একগাদা লোক চর্মচক্ষে দেখতে পায়।
তারপর গোটা দুনিয়া আজ তার লাইভ টেলিকাস্ট দেখে, কোন এক আধজনের ব্যক্তিগত অভিঞ্জতার কিসসা নয়।
ভূত কিন্তু দিনের বেলা দেখা যায় না। একসাথে সবাই দেখতে পায় না।
রাত্তিরে কোন কোন ভাগ্যবানে দেখিবারে পায় !
তারা বিনা চশমাতে দেখে --পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা জ্যোৎস্নায় খেলে বেড়াচ্ছে!
তবে স্বামী অভেদানন্দের “মরণের পারে” বইতে বিদেহী আত্মার ধোঁয়া ধোঁয়া ছবি আছে।
ভগবানের ব্যাপারেও সেই অথরিটির প্রশ্ন।
ঠাকুর বিবেকানন্দকে বলেছিলেন যে উনি ভগবানকে দেখেছেন, ‘তোকেও দেখাতে পারি’!
এরপর কোন কথা চলে না।
বরং ডাকঘরের ঠাকুর্দার মত বলতে ইচ্ছে করে—চুপ কর অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না।
সাতপাঁচ ভেবে ভাবি –বলেই দিই। সুপ্রিয় আমার অন্যরকম বন্ধু—একেবারে রাজদ্বারে শ্মশানে চ।
বলতে শুরু করি।
সুপ্রিয় মনোযোগ দিয়ে শোনে। জিনের বোতল খোলা হয় না। তবে সুপ্রিয় একপ্যাকেট সিগ্রেট শেষ করে।
কথা একসময় শেষ হয়। সব বলেছি। কিছুই বাদ দিইনি।-- সেই ফিবোনাচ্চি নাম্বার সিকোয়েন্স থেকে শুরু করে, ডেমো, কন্ট্র্যাক্ট,
এবং অন্য সব অভিজ্ঞতা, মেডিক্যাল প্রেস্ক্রিপশন, সিকিউরিটি কোড—কিচ্ছু না।
চিকেন পকোড়ার প্লেট খালি হয়েছে। সুপ্রিয় কফি বানাতে গেছে। আমি নিজের ভাবনায় ডুবে আছি।
কাজটা কি ঠিক করলাম? করে কী লাভ হল?
--লাভ তো হয়েছে, বুক হালকা হয়েছে। নইলে তোমায় রোজ অ্যান্টাসিড খেতে হত।
আরে, বোকচন্দর! ক্ষতি কী হয়েছে সেটা ভাব। ব্যাপারটা একজন বন্ধুর নলেজে থাকলে সময়ে অসময়ে কাজে আসতে পারে।
--কোন কাজে?
--আরে ধর মোহিনীর শরীর খারাপ হল?
--দূর হাবা! মোহিনীর কেন শরীর খারাপ হবে? ওতো রোবো, রীমা নয়।
--বেশ, ধর যদি তোরই খারাপ হল? বয়েস হয়েছে, শরীরের কলকব্জা মাঝে মাঝে সার্ভিসিং চাইবে।
--সে তো আমি ডাক্তারের কাছে যাব, ওষুধ কিনে আনব। নইলে হাসপাতালে ভরতি হব।
--সেটাই তো বলছি। তখন খালি বাড়িতে মোহিনীকে কে দেখবে?
--আবার সেই গান্ডুমার্কা কথা! ওকে কারও দেখার দরকার হয় না।
--রেগে না গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাব দু’নম্বর। তুমি ধর চারদিন সল্ট লেকের হাসপাতালে রইলে।
ওদিকে নিউ টাউনে তোমার বাড়িতে কয়েক ঘন্টা পাওয়ার কাট হল বা শর্ট সার্কিট হল।
তখন এমসিসি বক্স খুলে সুইচ ইত্যাদির ঝামেলা কে পোয়াবে?
---তাতে মোহিনীর কী? আমি যেদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে আসব ---
--ঠিক, ততদিন চার্জিং না হওয়ায় মোহিনী ডেড! তাই তো?
--ফের উলটো পালটা কথা! ডেড আবার কি? আমি এসে লাইন এনে আবার চার্জ করিয়ে দেব।
--আচ্ছা, আশ্চর্য প্রদীপ কোম্পানির দেয়া মেন্টেন্যান্স ব্রোশার ভাল করে দেখেছিলি?
কতদিন অব্দি মোহিনী, থুড়ি নারী-রোবো, চার্জ ছাড়া অচেতন হয়ে থাকতে পারে?
মানে কতদিনের গ্যাপের পর চার্জ দিলে ফের ও সক্রিয় হবে?
আমার কাছে এর জবাব নেই, সত্যিই দেখি নি।
নতুন সঙ্গিনী পাওয়ার আনন্দ ও উত্তেজনায় এত সব সম্ভাবনার কথা ভাবি নি।
এমনি সময় সুপ্রিয় দু’মগ কফি হাতে ঢোকে।
তারপর বলে –শোন, তুই যা বললি তাতে অবিশ্বাসের কারণ দেখছি না। একুশ শতকে সবই সম্ভব।
আমার মোবাইলে এই ভিডিওটা দেখ, কয়েকমাস আগে মেয়ে জামাই ইউরোপ বেড়াতে গেছল। ওরা পাঠিয়েছে—ওই রোবো’র ব্যবহার নিয়ে।
একটা দেশের রাজধানীর উপকন্ঠে জনবিরল পাড়ায় সাতদিন ছিল।
সেখানে একটা মুদি দোকান নিয়ম করেছে যে বিশ ইউরো’র কমে অর্ডার দিলে হোম ডেলিভারি করতে মানুষ আসবে না, ওরা রোবো পাঠাবে।
এইবার ভিডিওটা দেখ। এই রোবো এসেছে তিন কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে।
ডেলিভারি দিয়ে ফিরে যাবার সময় জামাই ভিডিও করেছে।
দেখতে ছোট একটা কেকরুটিওলার বাক্সের মত, সাড়ে তিনফুট হাইট, নীচে দুটো স্টিলের চাকাওলা পায়া, ব্যস্।
কোন নাক-চোখ-মুখ নেই। হ্যাঁ, ভাল করে দেখ—গায়ে একটা গেরুয়া পতাকা উড়ছে, যাতে রাস্তা পার হবার সময় গাড়িঘোড়া ওকে দেখতে পায়।
ও কথা বলে। মানে হ্যালো বলার পর ও হ্যালো বললে মোবাইল দেখে দোকানের পাঠানো কোড বলে দিতে হবে।
তখন ওর পেছনের ডালা খুলে যাবে। সেখান থেকে ওই কোড লেখা প্যাকেট তুলে নিয়ে ওদের ভাষায় ‘থ্যাংক ইউ ‘ বলতে হবে।
তখন ও অ্যাবাউট টার্ন করে হেঁটে হেঁটে রাস্তা পেরিয়ে তিন কিলোমিটার দূরের দোকানে ফিরে যাবে।
ভাবতে পারিস”?
ভিডিও দেখতে দেখতে আমি ব্যাপারটা কল্পনা করার চেষ্টা করি। একটা খুদে বাক্স, গায়ে একটা পতাকা –
একা একা লম্বা রাস্তা পেরোচ্ছে, ফুটপাতে উঠছে নামছে , বাঁক নিচ্ছে—এ যেন লীলা মজুমদারের গল্প ভানুমতীর খেল!
কফি খেতে খেতে সুপ্রিয় একটু ঘনিষ্ঠ হয়।
“শোন, একটা কথা ভাবছি। আমাকে একবার দেখাতে পারিস? মানে ওই মোহিনী দেবীকে?
যাঁর নাক-চোখ-র াআছে। শাড়ি পরেন –বাক্স-টাক্সো নন, কথা বলেন। পঞ্চাশ রকম রেসিপি জানেন।
খাবার এনে টেবিলে সার্ভ করেন—অথচ –অথচ তিনি মেশিন।
সেই মিঃ ইন্ডিয়া সিনেমায় অন্নু কাপুর শ্রীদেবীকে বলেছিলেন না? আছে, কিন্তু তাঁকে দেখা যায় না!
“আমি একটু ওনার সঙ্গে আলাপ করতে চাই। অংক, জিকে এসব নিয়ে কুইজ করতে চাই।
একটা কথা বল—মোহিনী দেবীর একটা সিম্পল বিরিয়ানি আর দই দিয়ে স্যালাড বানিয়ে সার্ভ করতে কতক্ষণ লাগে?
আধঘন্টা? পঁয়তাল্লিশ মিনিট? আচ্ছা একঘন্টাই সই।
একটা আইডিয়া এসেছে।
চল, তোর বাড়ি যাই। দুপুরের খাওয়াটা ওখানেই সারব নাহয়। শোন, দই আর সন্দেশের প্যাকেট তুলে নে, সঙ্গে নিয়ে যাব।
আর বাকি সব রান্না আমি ফ্রিজে তুলে দিচ্ছি , এতে আমার রাতের ডিনার এমনকি কালকের লাঞ্চও হয়ে যাবে।
তারপর আমি গাড়ি বের করছি। সন্ধ্যে নাগাদ ফিরে আসব’খন।
কী বলিস, আপত্তি আছে? নইলে বলে দে; আফটার অল, তোর মোহিনী!”
আপত্তি কিসের? আমার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা আমোদগেঁড়ে অবিনাশ ফের জেগে উঠছে। দেখিই না কী হয়!
এতদিন ত মোহিনী আমার পরিচিত কারও মুখোমুখি হয় নি। দেখি, অন্য লোকের সামনে ওর কেমন প্রতিক্রিয়া হয়!
বাঁধাগতের কম্যান্ডের বাইরে নিজে থেকে স্বতঃস্ফুর্ত কিছু করে যদি! দেখনে মেঁ ক্যা হ্যায়?
মোহিনী আসার পর থেকে কাউকে বাড়িতে ডাকিনি, সুপ্রিয়কেও নয়।
ও কিন্তু বাগান ফুল এসব না দেখে সোজা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি তালা খুলে ওকে নিয়ে ভেতরে গেলাম। পাখা চালিয়ে দিয়ে ওকে সোফায় বসতে বললাম।
তারপর গলা তুলে বললাম—শোন মোহিনী, দু’ গেলাস জল দিয়ে যাও।
মোহিনী একটা ট্রেতে দু’গেলাস জল নিয়ে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মন দিয়ে সুপ্রিয়কে দেখছে।
আমার সব ইন্দ্রিয় সজাগ। মোহিনী কি কোন বিপদ সংকেত পেয়েছে?
সুপ্রিয় ও মোহিনী—দুজনেই একে অপরকে অপলকে দেখছে।
সুপ্রিয়’র চেহারায় বিস্ময়। মোহিনীর চোখে যেন শিকারীর সতর্কতা।
শেষে এই অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে সুপ্রিয় কথা বলে—নমস্কার মোহিনী দেবী।
মোহিনীর চোখের পাতা নড়ছে না। ও যেন স্ট্যাচু খেলছে। আমার চোখ ঘুরছিল একবার মোহিনীর দিকে, একবার সুপ্রিয়’র।
এবার আমি বলি—শোন মোহিনী, ইনি সুপ্রিয় স্যার। আমার খুব ভাল বন্ধু।
মোহিনী কফি টেবিলের উপর জলের ট্রে নামিয়ে রেখে দু’হাত তুলে নমস্কার করে—নমস্কার সুপ্রিয় স্যার।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে—কিছু স্ন্যাক্স দেব?
আমি কিছু বলার আগে সুপ্রিয় বলে—না না, বেলা হয়ে গেছে। দুপুরের খাওয়া্র সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
আপনি একটা সাদামাটা বাঙালি ঘরের বিরিয়ানি আর দই শসা পেঁয়াজ দিয়ে রায়তা বানিয়ে আনুন। তাহলেই হবে।
ঘরে মাটন আছে? আধা কিলো মতন?
মোহিনী কোন উত্তর দেয় না। আমার দিকে তাকায়। আমিও আমার কোড “শোন মোহিনী” বলে কথা শুরু করে একই প্রশ্ন করি।
মোহিনীর চোখের পাতা দু’বার নড়ে। তারপর বলে—মাটন নেই, কিন্তু বোনলেস চিকেন আছে আড়াইশো গ্রামের মত।
চিকেন বি্রিয়ানি করে দিচ্ছি, রায়তা হয়ে যাবে। হাফ অ্যান আওয়ার!
আমি ওকে দইয়ের হাঁড়ি আর মিষ্টির প্যাকেট ভেতরে নিয়ে যেতে বলি।
সুপ্রিয় বিস্ফারিত চোখে আমাদের দু’জনকে দেখছিল।
ও চলে গেলে নীচু গলায় বলল—ব্যাপারটা কী বলত? আমার একটা কথারও রেসপন্স দিল না।
তুই বলার পর নমষ্কার করল। কেসটা কী?
ও কি আমার উপরে রাগ করেছে? আমি কি হ্যাংলার মত তাকিয়ে ছিলাম?
আমি মনে মনে ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করি।
--সে তো তুই মেয়েছেলে দেখলেই অমনই করে তাকাস। আজ নতুন কথা কী?
--বাজে কথা বলবি না, রীমা ভাবী কখনও আমাকে নিয়ে কিছু বলেছে? বরং আমার সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিয়েছে।
--দূর! ইয়ার্কিও বুঝিস না? শোন, মোহিনী রাগ করতে পারে না। রাগ কেন, খুশি হওয়া , দুঃখ পাওয়া ওর কপালে নেই।
হাসেও না, কাঁদেও না। ও কোন মেয়ে নয়, দেবী টেবী নয়—একটা মেশিন, নিষ্প্রাণ অনুভূতিহীন।
আর ও আমি ছাড়া অন্য কারও কথা বা আদেশ মানবে না। এটা ওর হাতে নেই, এভাবেই ওকে প্রোগ্রাম করে দিয়েছে।
--তুই তাহলে এক যন্ত্রমানবীকে স্লেভ বানিয়ে রেখেছিস, ভুল বললাম, একলক্ষ টাকা দিয়ে বাজার থেকে দাসী কিনেছিস।
সেই আংকল টমস্ কেবিনের দিন কি ফিরে এল?
--উম্ খালি একটাই তফাৎ--ওরা ছিল রক্তমাংসের মানুষ, এ হচ্ছে অনুভূতি আবেগহীন যন্ত্র।
-- সেটা চার শতাব্দীর তফাত বলে। আম্রিকার ভার্জিনিয়ায় প্রথম শেকলে বাঁধা দাস আসে, আফ্রিকা থেকে ১৬১৯ সালে।
কিন্তু বেসিক তফাত ছিল কি? দাস মালিকদের চোখে আংকল টমেরা ছিল তুলোর খেতে কাজ করার যন্ত্র মাত্র।
তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করে যাও। ওদের কোন চাহিদা, কোন আবেগ বা অনুভূতি থাকতে পারে কেউ ভাবে নি।
বিকল হলে, মানে মরে গেলে --কবর দাও, নতুন দাস নিয়ে এস।
তোর এখানেও তাই। বিগড়ে গেলে ফেলে দিয়ে আরেকটা আনবি।
আমাদের তর্কাতর্কির মাঝখানে কলিংবেল বেজে ওঠে। একটু বিরক্তির সঙ্গে দরজা খুলে অবাক হই।
দাঁড়িয়ে আছে নির্মলা, আমাদের পুরনো কাজের মাসি। আমাকে নমস্কার করে। তারপর আঁচলের খুঁট ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, এদিক ওদিক তাকায়।
কিছু একটা বলবে বলবে করেও বলতে পারছে না।
কিন্তু আমার অত সময় নেই। খিদেও পেয়েছে। কী চায় নির্মলা? কোন আর্থিক সাহায্য? অসুখ-বিসুখ?
--কী ব্যাপার নির্মলা, কী হয়েছে?
ও চোখ তুলে তাকায়। তারপর এক নিঃশ্বাসে বলতে থাকে—“মেসোমশায়, আমি আপনাদের এত বছরের পুরনো লোক।
মাসিমা যেমন যেমন বলেছেন তেমনই তেমনই কাজ করেছি। কোনদিন কাজে না বলেছি?
আজকালকার অন্য মেয়েদের মত যখন তখন না জানিয়ে ছুটি নিয়েছি?
--না তো, এসব কথা কেন?
--তাহলে আপনি আমাকে খবর না করে হঠাৎ অন্য কাজের মাসি নিয়েছেন কেন? আমি তো বলেছিলাম। একা মানুষ, হাত পুড়িয়ে করে খাচ্ছেন।
কিন্তু আমি আছি। যখন বলবেন তখন এসে যাব, আমরা পুরনো লোক।
--দাঁড়াও, দাঁড়াও। এসব কী বলছ? কাজের মাসি নিয়েছি? কই, না তো। আগে যা ছিল, এখনও তাই ।
--আপনি কাউকে কাজে লাগান নি মেসোমশায়? ঠিক বলছেন?
আমার রাগ হয়ে যায়।
--শোন, এসব বাজে কথা কোথায় শুনলে? আমি কেন খামোখা মিথ্যে বলব? কাউকে কাজে লাগাই নি।
এবার তুমি যাও। দরকার হলে খবর দেব।
--আপনি রাগ করছেন মেসোমশায়? আমি যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা বলে যাই।
পাড়ায়, দোকানে, সব জায়গায় কথা উঠেছে আপনি একজন অল্পবয়েসি মেয়েকে কাজে লাগিয়েছেন।
ঠিকে নয়, সবসময়ের জন্যে। সে নাকি আবার আপনার বাড়িতেই থাকে।
আমি বিশ্বাস করি নি।পোড়ারমুখোদের সাথে ঝগড়া করেছি। বলেছি মেসোমশায়কে তোরা চিনিস, কি আমি চিনি?
কিন্তু আজ এই একটু আগে রাস্তা থেকে দেখলাম একজন মেয়েছেলে আপনার রান্নাঘরে কাজ করছে।
নিজের চোখকে অবিশ্বাস করি কী করে! ভাল থাকবেন।
আমি বাজপড়া তালগাছের মত দাঁড়িয়ে থাকি। সুপ্রিয় উঠে এসে দরজায় ছিটকিনি দিয়ে আমাকে সোফায় বসায়; জলের গেলাস এগিয়ে দেয়।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।
খাওয়ার টেবিলে প্লেট লেগে গেছে একেবারে ঘড়ি ধরে আধঘন্টা পরে। আমরা কোন কথা না বলে চুপচাপ খেতে থাকি।
দই এবং সদেশ পাতে পড়লে সুপ্রিয় বলে—রান্না ভালই। তুই বাড়িয়ে বলিস নি।
হাতমুখ ধরে সোফায় এসে বসার পর সুপ্রিয় সিগ্রেট ধরায়। কিন্তু এক কশ নেয়া মাত্র মোহিনী যেন উড়ে এল।
--প্লীজ স্যার, এ ঘরে সিগ্রেট খাওয়া মানা। আপনি চাইলে বারান্দায় বা বাগানে গিয়ে খেয়ে আসুন।
সুপ্রিয় রাগতে গিয়ে হেসে ফেলে।
তারপর আমায় বলে –জুটিয়েছিস ভাল। এ বাড়ির কে যে মালিক বোঝা দায়।
ঠিক আছে, অংক নিয়ে গোটা কয় প্রশ্ন করব।
যেমন – কমন লগারিদম আর নেপেরিয়ান লগারিদমের তফাৎ কী? ইমাজিনারি নাম্বারের সিম্বল কী?
আর ধর 1+ w + w^2= ?
কিন্তু আমি যখন মোহিনীকে সেশনের জন্য সোফায় বসালাম তখন সুপ্রিয় একেবারে অন্য গোত্রের প্রশ্ন করতে লাগল।
--ফুটবলে হ্যাটট্রিক মানে কী?
মোহিনীর কাছে এসব মনে হয় জলভাত। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর—একই প্লেয়ারের পর পর তিনটে গোল করা।
--পারফেক্ট হ্যাটট্রিক?
-- একই প্লেয়ার তিনটে গোল করবে, কিন্তু একটা বাঁ পায়ে, অন্যটা ডান পায়ে এবং আরেকটা মাথা দিয়ে হেড করে।
আমি ব্যোমকে যাই। এটার উত্তর আমার জানা ছিল না।
সুপ্রিয় ম্লান হাসে।
--নাঃ অংকের প্রশ্ন টশ্ন আরেকদিন হবে। আজ আসি। পরিচয় হয়ে গেছে। এখন আমরা বন্ধু তো? কী বল মোহিনী?
-- আপনি সমাদ্দার স্যারের বন্ধু।
আমি ওর অপ্রস্তুত অবথা কাটাতে গিয়ে বলি—শোনো মোহিনী, দু’কাপ কফি নিয়ে এস। সুপ্রিয়, লাস্ট একটা কফি খেয়ে যা।
মোহিনী কিচেনে চলে যায়। কিন্তু আমাদের আর কফি খাওয়া হয় না।
ডিং ডং বেজে উঠল। আবার কে?
আমি একটু ওয়াশরুমে যাচ্ছিলাম। তাই সুপ্রিয় দরজা খোলে।
একটা ভারী স্বরে প্রশ্ন—অবিনাশ সমাদ্দার?
--না, উনি আমার বন্ধু। ওই যে, আসছেন।
--ওনাকেই দরকার।
কোন কথা না বলে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে দুজন খাকি পোশাকের লোক।
একজনের কাঁধের পট্টিতে দুটো স্টার লাগানো। অল্প বয়েসির কাঁধে কোন চিহ্ন নেই।
দুজনের বুকের উপর নেমপ্লেট লাগানো। কোমরে হোলস্টারে রিভলবার। আর জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা পুলিশের জীপ।
আমার বাড়ির সামনে সুপ্রিয়র গাড়ির উলটো দিকে দাঁড়িয়ে।
ওরা এসে বিনা ভণিতায় বলে-- পদমপুর থানা থেকে আসছি। আপনাকে একটু আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
--কোথায়?
--থানায়। ওসি স্যার ডেকে পাঠিয়েছেন।
--কী ব্যাপার বলুন তো?
--ওখানে গিয়ে শুনবেন।
--তাহলে যাব না। পদমপুর থানার নাম তো শুনি নি। ওয়ারেন্ট আছে?
ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হেসে ওঠে।
--আরে না না। আপনি কি ক্রিমিন্যাল নাকি?
শুনুন, এই থানাটা মাত্র ছ’মাস আগে খোলা হয়েছে। তাই নাম শোনেন নি। আপনাদের পাড়াটা এখন পদমপুর থানার আন্ডারে।
আর আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করে ছেড়ে দেয়া হবে। একটু পরেই ফিরে আসবেন।
আপনি আপনার গাড়ি নিয়ে আমাদের পেছন পেছন আসুন।
--আমার গাড়ি নেই। বাইরে ওটা আমার এই বন্ধুর।
--ঠিক আছে; বন্ধুর সঙ্গেই আসুন।
--বেশ, কিন্তু কেসটা কী? একটু বলুন না প্লীজ!
--বছর দেড়েক আগে সরকারি হাসপাতালের মর্গ থেকে একটা লাশ গায়েব হয়েছিল। অল্পবয়েসি মেয়ের লাশ।
তদন্তের ফাঁকে আপনার নাম উঠে আসায় স্যার একটু জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, আর কিছু নয়।
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।