বাংলার এক মেয়ের আত্মকথা______________________________________________
“উনিশশো একাত্তর। তখন আমার কলেজ জীবন সবে শুরু হয়েছে।
ঢাকা তখন অগ্নিগর্ভ। সদ্যই জেনারেল ইলেকশন গেছে। বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া সত্বেও আমাদের সরকার গড়তে দেওয়া হয়নি। অসুস্থ, দুর্বল সোহরাওয়ার্দী মুজিবের হাতে দায়ভার সঁপে দিয়েছেন। দেশের মানুষ নতুন করে আলো দেখছে।
এই নৃশংস নরপশুদের মতো শাসক আগে এই বাংলা কোনোদিন দেখেনি। এরা বাঙালির স্কুলে যেতে দেয় না। বাঙলা ভাষায় কথা বলতে দেয় না। চিরাচরিত পোশাক-আশাক ব্যবহার করতে দেয় না। খাবারের ক্ষেত্রে ভালো-মন্দের বিচার করে না। সর্বত্র ‘না’ আরোপ করে এরা আমাদের প্রায় অতিষ্ঠ করে ফেলছিল। নারীদের আব্রু নেই। ভালোভাবে কথা বলার স্বাধীনতা নেই। কাঁহাতক এ জিনিস সহ্য করা যায়? তাই আমরা তৈরি হচ্ছিলাম এক নতুন স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য। বেতারে, লিফলেট ছড়িয়ে, কথা বলে সর্বত্র মানুষ সংগঠিত হচ্ছিল সেই লড়াইয়ের জন্য।
আমার স্কুলমাস্টার বাবা তখন ঘরে-বাইরে ছেলেদের তাতিয়ে বেড়ান। মা দুপুরবেলায় সমিতিতে যান। আমরা দুই বোন পূর্ণলতা আর আশালতা পড়াশোনাই করতাম। তবে রেডিওয় মুজিবের কথা শুনে তখন আমরাও কায়মনোবাক্যে চাইছি একটাই জিনিস— মুক্তি।
ফেব্রুয়ারি থেকেই আমরা বিপদের আশঙ্কা করছিলাম। কিন্তু আমরা বুঝিনি যে শয়তানটাও দিনে বিশ্বাস করে। উনিশশো উনসত্তর সালের পঁচিশে মার্চ— দু’বছর আগের এই দিনটাতেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে লোকটা শপথ নিয়েছিল। একাত্তর সালের সেই দিনেই ইয়াহিয়া খান আগুন জ্বালিয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল অপারেশন সার্চলাইট।
একরাতের মধ্যে জগন্নাথ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা কালীবাড়ি— সব ধুলোয় মিশে গেল। মুজিব গ্রেপ্তার হলেন। হত্যার সঙ্গে চলতে লাগল ধর্ষণ। যে মেয়েরা পাশের ঘরের কাকিমা, বউদি, মেয়ে, বউমা ছিল, তারাই রাতারাতি হয়ে গেল গনিমতের মাল।
বাবা বসে ছিলেন না। ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন অ্যাকশন কমিটি। গ্রামে-গ্রামে ঘুরে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তারপর একদিন রাতে বাবাদের ডাক এল।
সেই সন্ধ্যায় বাবা শেষবারের মতো আমাদের দুই বোনের কপালে চুমো দিলেন। তারপর ঠাকুরদার পায়ে হাত ঠেকিয়ে চলে গেলেন অগ্যস্তযাত্রায়। এদিক-ওদিক থেকে সাতদিন খোঁজ পেয়েছিলাম; তারপর আর জানি না। বাবা হারিয়ে গেলেন।
বরিশালের বানারিপাড়া কাগজের কানার মতো— আগুনের প্রথম শিখাটা ওকেই ধরল। তারপর দাউদাউ করে পুরো বরিশাল জ্বলে উঠল।
গ্রাম থেকে কয়েকশো গজ দূরে পলতার ব্রিজের ওপর গাড়ি রেখেছিল সেনারা। সারা রাত আমরা দরজা দিয়ে বসে ছিলাম। ঠাকুরদা দরজার কাছে বিছানাপত্র, চেয়ার দিয়ে দরজা আড়াল করে রইল। কিন্তু কিছু হল না। শুধু বুটের শব্দ শুনলাম। পরদিন সকালে উঠে দেখা গেল, খান সেনারা অনেক দূরে তাঁবু ফেলেছে। তিন দিন কিচ্ছু হল না। আক্রমণ এল চতুর্থ দিন।
ভোরবেলা ঘরে ঢুকেছিল ওরা। পথ দেখিয়ে এনেছিল রাজাকার আব্বাস— আমাদের পেয়ারা বাগানে কাজ করত। ঠাকুরদা বাধা দিয়েছিলেন। দরজার কাছেই তাঁর দেহটা পড়েছিল।
আমি বেঁচে গেলাম, কারণ আমি তখন বাইরে ছিলাম। বুড়ো হালি কামিরুদ্দিন চাচার ঘরে দুধ আনতে গেছিলাম, সেখানেই রয়ে গেলাম। চাচা তাও ঝুঁকি নেয়নি; আমাকে নিয়ে পুকুরের জলে পদ্মের মৃণাল মুখে ডুবে ছিল। সন্ধ্যায় জল থেকে উঠলাম; কিন্তু সেটা বুঝি আর পুণ্যলতা ছিল না।
চাচা আমাকে বাড়িতেই ঠাঁই দিল। পাঁচদিন পর ঘরে গেলাম। গোটা গ্রামটাই শ্মশান হয়ে ছিল। ঘর আছে, কিন্তু দুয়ার নেই। কপাট ভাঙা ঘরের ভিতর শিয়াল-কুকুরের ভিড় লেগেছিল আমারই দাদা, মা আর দিদির দেহ ঘিরে।
ভাবতে পার বাবা, যন্ত্রণার রূপ কেমন হয়?
সে-রাতে কামিরুদ্দিন চাচা আর ওর ছেলে এসে চুপিচুপি সবাইকে গোর দিলে। ভাবছ হিঁদুর ঘরে আবার গোর! কী করতাম? আগুন জ্বালানোর উপায় ছিল না যে। তাছাড়া শরীরের মাটি পাওয়া নিয়ে কথা। কোথায় হিন্দু আর কোথায় মুসলিম— আগুনে তো সবাই পুড়ছে।
পরের হপ্তায় রাজাকারের দল জানতে পারল, আমার কথা। চাচার বাড়ি আক্রমণ হল। কোনওমতে সে যাত্রাও রক্ষা পেলাম। সাত বিল আর মাইলের পর মাইল পেরিয়ে মিঞা পুরের বাদায় এসে উঠলুম। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল আমায় উদ্ধার করে সে যাত্রা।
শরীরে সাড় ছিল না। তিন দিন বেহুঁশ পড়েছিলাম। এইখানে এক মানুষ পেয়েছিলাম বটে— খন্দকার আবু তালেব চৌধুরী। খন্দকর সাহেবের গোটা পরিবারটা শেষ করেছিল খান সেনারা। অপরাধ, কামরুদ্দিন চাচার মতো তিনিও তাঁর হিন্দু প্রজাদের তাঁর ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে আর বউমাকে নগ্ন করে বেঁধে রেখেছিল বিলের বটগাছে— যাতে গোটা গ্রাম দেখতে পায় অপরাধীর সাজা কী।
খন্দকর সাহেবের চোখের জল কেরোসিন তেলের মতো অগ্নিস্রাবী হয়ে গিয়েছিল। উনি বিপ্লবী তৈরী করতে শুরু করেন বতার পরেই। তাঁর প্রক্রিয়াটি ছিল ভারি সুন্দর। প্রথমে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের সুযোগ করে দেন। তারপর দেশের জন্য বৃহত্তর স্বার্থে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেন।
খন্দকর সাহেবই আমাকে স্টেন গান আর রাইফেল চালানোর শিক্ষা দিয়ে হাতে ধরিয়ে দিলেন আব্বাসের ঠিকানা। সেই আমার দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো বাড়ি যাওয়া। হতবাক আব্বাসের বুকের ওপর পিস্তলটা রেখে ফাঁকা করেছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে বাড়িতে ঘুরে আসার অনুমতি দিয়েছিল। একখানা প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে এসেছিলাম মা-দাদার কবরে।
ব্যস! স্বাধীনতার লড়াইয়ের সঙ্গেই মালা-বদল হয়ে গেল। এরপর একের পর এক এনকাউন্টার। কড়া তাতে ভেপে যাওয়া দিন।
তারপর এল অন্যরকম লড়াই। আমার মা ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন; ফলে আমিও কম সুন্দরী ছিলাম না। এটাকেই কাজে লাগাতে নির্দেশ এল। আমার সমস্যা ছিল না; দেশের কাছে সবই তুচ্ছ।
আমার সবচেয়ে বড় একশন ছিল বক্সী মানিকগঞ্জ। দুই প্লেটুন খান সেনার ছাউনি ছিল। ওদের ক্যাপ্টেন ফজলে ইমাম ছিল মারাত্মক দুশ্চরিত্র মানুষ। আমার কাজ ছিল ওকে বশ করা। দিনের পর দিন অভিনয় করে গেছি। চোখের সামনে আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের অত্যাচার দেখে গেছি শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায়।
একরাতে একজন গর্ভবতী নারীকে এনেছিল ওরা। আর সহ্য করতে পারিনি। সেই রাতে ধরা পড়ে গেলাম। আমিটাও ছেড়ে গেল। শুধু সবচাইতে জড় যেটা, সেই প্রাণটাই রয়ে গেল।
একহপ্তা, জানিস বাপ! পুরো একহপ্তা খেতে দেয়নি আমায়। অথচ ওরা আমায় মুখশুদ্ধির মতো খেত। তুই আমার পোলাডার মতো। তোরে আর কী ক’মু।”
“ইয়ে, বেশ তো পরিষ্কার বাংলায় বলছিলে।” কোনোমতে বলেছিলাম। পূর্নলতা তখন আমায় বশ করে ফেলেছে, কথা নয়, এক অদ্ভুত অস্থিরতা পেড়ে ফেলেছে আমায়।
“হ, বুঝসি। তুই এ দ্যাশি। ঘটি! বেশ, তাই বলব।
মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল না আমার; কিন্তু পেয়ে গেলাম। এক হপ্তা পর মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল এল। কী বলব রে বাপ! এমন অ্যাকশন কেউ দেখেনি। বক্সি মানিকগঞ্জের আকাশ লাল হয়ে গেল। সেই রাতে প্রথম দেখলাম তাঁকে। কী তেজ, বাপ, কী তেজ!”
“কার কথা বলছ?”
“মণি সিংহ— নাম শুনেছিস বাপ? আমাগো দেশের বাম নেতা, সিপিবির মুখ্য, গরিলা যুদ্ধের মূল কাণ্ডারি। আমারে বুইন ডেকেছিল। ওর ক্যাম্পেই এরপর আমার চিকিৎসা হয়েছিল। তারপর পাঠিয়ে দিল এদেশে। এখানে তাঁর অনেক বন্ধু–বান্ধব ছিল যে।
অভাগী পূর্ণলতা একরাশ অপূর্ণতা নিয়ে একদিন এই কলকাতা শহরটায় এসে পৌঁছল। মনে আর কোনো আশা ছিল না। কচুরিপানার মতো ভাসতে-ভাসতে এসেছিলাম তো।”