
ক্রাবি ও ফুকেট (থাইল্যান্ড) - স্ট্রীটফুড
-----------------------
ভিয়েতনামি খাবার নিয়ে আমি যেমন প্রায়শঃই লিখি যে ওই দেশের খাবার বেশ আন্ডাররেটেড, কিন্তু থাই খাবার নিয়ে সেটা বলার উপায় নেই। আজকাল প্রায় সারা বিশ্বেই থাই খাবারের পরিচিতি দারুণ এবং বেশ জনপ্রিয়। যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে ভারতের উত্তরের এবং দক্ষিণের খাবারের ভিন্নতার মত না হলেও থাইল্যান্ডের উত্তরের এবং দক্ষিণের খাবারের পার্থক্য বেশ। থাইল্যান্ডের দুই প্রান্তেই স্ট্রিট ফুড মানেই জিভে জল আনা এক জম্পেশ ব্যাপার। কিছুদিন আগে উত্তরের চিয়াং-মাই এর স্ট্রীট ফুড নিয়ে লিখেছিলাম – কিন্তু সেখানকার স্ট্রীট ফুড হিসেবে প্যাড থাই খেয়েই যদি আপনার মনে হয় থাইল্যান্ডের প্রতিনিধি খাবার খেয়ে নিলাম, তাহলে বলতেই হয় – একটু রোককে বন্ধু! সেই ভাবে দেখতে গেলে প্রকৃতি খাবারের ধরণ এবং রকমকে প্রভাবিত করে বহু হাজার বছর ধরে এবং থাইল্যান্ডও তার ব্যতিক্রম নয়! থাইল্যান্ডের উত্তর আর দক্ষিণ প্রান্তের খাবারের মধ্যে তফাৎটা ঠিক যেন উত্তরের শান্ত পাহাড় আর দক্ষিণের উত্তাল সমুদ্রের মতো।
প্রথমেই একটু দেখে নেওয়া যাক উত্তরের 'কালচারাল ক্যাপিটাল' চিয়াং মাই এর সাথে দক্ষিণের সৈকত সুন্দরী ক্রাবি বা ফুকেট-এর খাবারের প্রধান পার্থক্যগুলি কি। চিয়াং মাইয়ের স্ট্রিট ফুডে মশলার দাপট কম, কিন্তু স্বাদের গভীরতা অনেক। উত্তর থাইল্যান্ডের আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল। এখানে রান্নায় তেলের ব্যবহার বেশি হয়। বিশেষ করে শুকরের চর্বি বা লার্ড ব্যবহার করে মশলা কষানোর প্রবণতা এখানে প্রবল। এই অঞ্চলে নারকেল গাছ কম জন্মায় তুলনামূলক, তাই ট্র্যাডিশনাল নর্দান কারিগুলোতে নারকেলের দুধের ব্যবহার কম। এখানকার মশলার পেস্ট বা 'নাম প্রিক' তৈরিতে শুকনো মরিচ ব্যবহার করা হয় বেশি। এর ফলে খাবারের রঙ কিছুটা কালচে বা গাঢ় লাল হয়। এখানে রান্নায় লেমনগ্রাস এবং গালাঙ্গালের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ভেষজ বা 'হার্বস' ব্যবহার করা হয় যা রান্নায় একটা মেটে ঘ্রাণ আনে। উত্তরের রান্নায় 'ফেরমেন্টেশন' বা গাঁজন প্রক্রিয়ার খুব সুন্দর ব্যবহার দেখা যায়। যেমন— 'থুয়া নাও' বা গাঁজানো সয়াবিন। এখানে রান্নায় অনেক সময় নোনতা ও তেতো স্বাদের ব্যালেন্সে চলে। অনেক রান্নায় তেতো স্বাদের জন্য বিভিন্ন বুনো শাক ব্যবহার করা হয় মিষ্টির ব্যবহার বেশ কম।
অন্যদিকে দক্ষিণের ফুকেট বা ক্রাবিতে পা রাখা মানেই হলো মশলার বিস্ফোরণ! এখানকার খাবারে নারকেলের আধিক্য বেশি, কিন্তু সেটা মোটেও মিষ্টি হওয়ার জন্য নয়, বরং ঝালকে ব্যালেন্স করার জন্য। এখানে রান্নায় তেলের চেয়ে নারকেলের ঘন দুধ ব্যবহার করে মশলা ফোটানো হয়, যা কারিকে অনেক বেশি রিচ এবং ক্রিমি টেক্সচার দেয়। দক্ষিণের রান্নায় হলুদ হলো অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার কারি পেস্টে প্রচুর কাঁচা হলুদ ব্যবহারের কারণে ঝোলগুলো উজ্জ্বল হলুদ বা কমলা রঙের হয়। এছাড়া 'গ্যালাঙ্গালের' পরিবর্তে এখানে বড় আদা বা 'ক্রাচাই' ব্যবহার করা হয় যা সামুদ্রিক খাবারের আঁশটে গন্ধ কাটাতে সাহায্য করে। তেঁতুল বা লেবুর রসের ব্যবহার এখানে প্রচুর। এখানকার রান্নায় ঝালের মাত্রা এতটাই বেশি থাকে যে তা ব্যালেন্স করতে অনেক সময় পাম সুগার ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণের রান্নার প্রাণ হলো 'কাপি' বা শ্রিম্প পেস্ট। সমুদ্রের ধারে হওয়ায় এখানে টাটকা মাছ এবং সামুদ্রিক খাবারের আধিক্য থাকে। রান্নার টেকনিকে এখানে উচ্চ তাপে গ্রিল করার আধিক্য বেশি দেখা যায় উত্তরের তুলনায় যেখানে রান্না ধীর লয়ে করা হয় তুলনামূলক।

যেকোন জায়গার এখনকার খাবারের বৈশিষ্ট বা প্রকার বুঝতে হলে, বিশেষ করে স্ট্রীট ফুডের, সেখানকার ইতিহাস একটু হালকা করে জেনে নেওয়া ভালো – কারণ বলাই বাহুল্য জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের বিবর্তনের সাথে সাথে স্ট্রীট ফুডও বিবর্তিত হয়েছে। এই যেমন আজকের দিনে ক্রাবি বা ফুকেট যেমন টুরিষ্ট স্পটে পরিণত হয়েছে, এমনটা কিন্তু খুব বেশী দিন আগেও ছিল না। গত শতাব্দীর সত্তর-আশির দশক পর্যন্তও ফুকেট ছিল মূলত টিন খনির খনি আর ক্রাবি ছিল এক শান্ত মাছধরা গ্রাম - চারপাশে চুনাপাথরের পাহাড়, জঙ্গল আর ম্যানগ্রোভ । কিন্তু যত বাড়ল মানুষের আনাগোনা, ছবির বদল ঘটে লাগলো তত দ্রুত। পশ্চিম উপকূলের সমুদ্র সৈকতগুলো ৮০–৯০-এর দশকে হঠাৎই “পার্ল অফ দ্য আন্দামান” ট্যাগলাইন পেয়ে পাঁচতারা হোটেল আর নাইটলাইফের পীঠস্থান হয়ে যায়, আর সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাথ, গলিঘুঁজির দোকানগুলোও রাতের বেলা রান্নাঘরে বদলে যায়।

তাই আজকের দিনের ফুকেট বা ক্রাবির স্ট্রিট ফুডে কিন্তু কেবল থাই প্রভাব নেই - এর সাথে জড়িয়ে গেছে চীনা-মালয় মিশ্রিত সংস্কৃতি। ফুকেট আর ক্রাবি – দু’জায়গাই দক্ষিণ থাইল্যান্ড, এখানে থাই বৌদ্ধদের সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করছেন মুসলিম সম্প্রদায়, আর ফুকেটে আবার হোক্কিয়ান চীনা বংশোদ্ভূতদের প্রভাবও প্রচুর। কয়েকশ বছর আগে খনিতে কাজ করতে আসা চীনা শ্রমিক আর স্থানীয় মালয়দের মেলামেশায় জন্ম নিয়েছিল এক নতুন ঘরানা, যাকে বলা হয় ‘বাবা-নিওনিয়া’। আর ক্রাবিতে যেহেতু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রভাব বেশি, তাই সেখানকার খাবারে দক্ষিণ ভারতীয় বা মালয় মশলার ছোঁয়া স্পষ্ট। চীনারা নিয়ে এসেছে হাঁড়ি-ওক, স্টির-ফ্রাই, নুডলস আর সয়া সসের সংস্কৃতি; প্যাড সি ইও, ফুকেটের হোক্কিয়ান নুডলস, কাও মান গাই
মালয়-মুসলিম প্রভাব বোঝা যায় ক্রাবির ঝোলঝাল কারি আর বিরিয়ানিতে – হলুদ, লংকা, জিরা, ধনে, নারকেলের দুধ মিলে যে “সাউদার্ন কারি” তৈরি হয়, তার গন্ধ বড়ই মনোহর। আর ইউরোপীয় বণিকরা, বিশেষ করে পর্তুগিজ, চিলি, টমেটো, আলুর মতো নতুন ফসল এনে থাই রন্ধনশৈলীতে বিপ্লব ঘটায়, তার হাত ধরেই আজকের সেই “চিলি-লেবু-ফিশ সস” ভিত্তিক ঝাঁঝালো রাস্তাঘাটের রান্না।
উপনিবেশবাদ এখানে ব্রিটিশ বা ফরাসীদের মতো সরাসরি না হলেও, পর্তুগিজ নাবিকদের আনা মশলা আর ইউরোপীয় পর্যটকদের চাহিদায় খাবারের বিবর্তন ঘটেছে নিরন্তর। স্ট্রিট ফুড কিন্তু এখানে আর কেবল সস্তা খাবার হিসবে ব্ববচিত হয় না – বরং এটা মিশে গেছে জীবনদর্শনের সাথে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মত থাইরা মনে করেন, ঘরে বসে একা খাওয়ার চেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাঁচজনের সঙ্গে মিলেমিশে খাওয়ার মজা অনেক বেশী।

তাহেলে এবার দেখে নেওয়া যাক ক্রাবি-ফুকেট গেলে কি কি স্ট্রীট ফুড মাষ্ট ট্রাই এর দলে আসবে!
মি হোক্কিয়েন – এই ডিসটিকে বলা হয় ফুকেটের গর্ব এবং সেই হিসেবে সবথেকে জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। চ্যাপ্টা হলুদ নুডলস, চিংড়ি, শুয়োরের মাংস এবং স্কুইড দিয়ে মাখোমাখো করে রান্না করা হয়। এর ওপর একটি হাফ-বয়েল্ড ডিম ভেঙে দেওয়া হয়, যা স্বাদকে আরও সমৃদ্ধ করে। ইতিহাস দেখতে গেলে এর বিবর্তন মূলত ১৯শ শতাব্দীর টিন খনির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। যখন চীনের ফুজিয়ান প্রদেশ থেকে প্রচুর মানুষ ফুকেটের খনিতে কাজ করতে আসেন, তারা সাথে করে নিয়ে আসেন এই হলুদ চ্যাপ্টা নুডলস। স্থানীয় সামুদ্রিক মাছ এবং চিংড়ির সাথে মিশে এটি এক নতুন রূপ পায়।
মু হং – ফুকেটের ‘ওল্ড টাউন’ এলাকার একটি সিগনেচার ডিশ হলো মু হং বা ব্রেজড পর্ক বেলি। দারুচিনি, এলাচ এবং গোলমরিচের ঘন ঝোলে শুয়োরের চর্বিযুক্ত মাংস দীর্ঘক্ষণ সেদ্ধ করা হয়, যতক্ষণ না তা মাখনের মতো নরম হয়ে যায়। এই খাবারেও চীনা ঘরানার প্রভাব দেখা যায় - এটিও হোক্কিয়েন চীনাদের হাত ধরে থাইল্যান্ডে এসেছে। তবে বিবর্তনের ধারায় এতে যোগ হয়েছে প্রচুর থাই গোলমরিচ এবং রসুন। ফুকেটের মালয় এবং চীনা সংস্কৃতির মিশ্রণের এটি একটি অন্যতম নিদর্শন।
মু পিং - গ্রিল করা শুয়োরের মাংসের শিক এ জিনিস, দেখতে খুব সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে চীনা অভিবাসনের ইতিহাস। চীনা শ্রমিকরা থাইল্যান্ডে নিয়ে এসেছিল গ্রিল করা মাংসের অভ্যাস। থা ই রান্নাঘরে ঢুকে তাতে যোগ হলো নারকেল দুধ, ফিশ সস আর পাম সুগার। ফলে জন্ম নিল এমন এক স্বাদ, যা একসাথে মিষ্টি, নোনতা আর ধোঁয়াটে। আজ ক্রবি ও ফুকেটে দুই জায়গাতেই আপনি এ জিনিস পেয়ে যাবেন।
ও-এও – গরমের দুপুরে ফুকেটের রাস্তায় আইসক্রিমের বদলে সবাই যেটির খোঁজ করেন, তা হলো ও-এও। বরফ কুচির ওপর লাল সিরাপ, মিষ্টি শিম এবং ওই বিশেষ জেলটিন দিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়। এর প্রধান উপাদান হলো এক ধরণের জেলটিন যা কলার শাঁস এবং এক ধরণের ছোট শিম থেকে তৈরি হয়। ফুকেটের বাইরে এটি আপনি খুবই কম পাবেন। এটিও আদতে চীনা বংশোদ্ভূত।
থাই রোটি - ক্রাবিতে গেলে দেখবেন রাস্তার ধারে প্রায়শঃই দেখবেন টিনের তাওয়াতে পরোটা ভাজা হচ্ছে, যাকে বলা হয় থাই রোটি। ক্রাবিতে মুসলিম জনসংখ্যার আধিক্য বেশি আর এই জিনিস ক্রাবির মুসলিম ঐতিহ্য হিসেবেই ধরে নিতে পারেন আপনি। ময়দার পাতলা পরোটার ভেতর কলা বা ডিম দিয়ে ভেজে তার ওপর কনডেন্সড মিল্ক এবং চিনি ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ক্রাবিতে ‘ব্যানানা রোটি’ পর্যটকদের কাছে সবথেকে প্রিয় – আর আপনি পেয়ে যাবেন সব নাইট মার্কেটেই – হইহই করে পাবলিক খাচ্ছে দেখবেন। ‘ব্যানানা চকলেট রোটি’ এখন মার্কেটে সবচেয়ে বেশী চলছে। ক্রাবির আও নাং নাইট মার্কেটের পিছনের দিকে একটা ‘হালাল’ সেকশন আছে যেখানে দেখবেন বোরখা পরা কিছু মুসলিম ভদ্রমহিলা এই ধরণের রুটি বিক্রী করছে। খেতে হলে এদের কাছে খান – কারণ এদের হাতের রুটি সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী। এই রোটি সংস্কৃতি মূলত ভারত এবং মালয়েশিয়া থেকে আসা ব্যবসায়ীদের হাত ধরে এখানে প্রবেশ করে। তবে সেই আগের দিনের মত এটি এখন আর কেবল নোনতা রুটি জাতীয় খাবার নয় খাবার নয়, বরং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ডেজার্ট বা মিষ্টি পদে পরিণত হয়েছে।
প্লা পাও - যা হল গিয়ে লবণের আস্তরণে ঢাকা মাছ। ক্রাবি বা ফুকেটের সমুদ্র সৈকতে হাঁটলে কাঠকয়লার আগুনে এক ধরণের সাদা রঙের আস্তরণ ঢাকা মাছ পুড়তে দেখা যায়। আস্ত রেড স্ন্যাপার বা তেলাপিয়া মাছের গায়ে লবণের একটা মোটা স্তর লাগিয়ে তার পেটে লেমনগ্রাস ও আদা গুঁজে দেওয়া হয়। এরপর তা পোড়ানো হয়। আগুনের তাপে লবণের স্তরটি মাছের রসালো ভাব ধরে রাখে এবং ভেতরে একটি ধোঁয়াটে সুবাস তৈরি করে। সাথে সবুজ লঙ্কার চাটনি – একদম ডেডলি কম্বিনেশন। ঐতিহাসিক ভাবে এটি থাইল্যান্ডের প্রাচীন উপকূলীয় রন্ধনশৈলী। সমুদ্র থেকে সরাসরি মাছ ধরে তা টাটকা খাওয়ার পদ্ধতি থেকেই এর জন্ম। আজকালকার ব্লগারদের রিভিউতে সবথেকে বেশি নম্বর পায় এই আইটেমটি।
প্যাড থাই – থাইল্যান্ডের যেখানকারই স্ট্রীট ফুড নিয়ে আপনি লিখুন, তাতে প্যাড থাই থাকবে না, সে কি আর হয় নাকি! চালের সরু নুডলস, ডিম, চিনেবাদাম, লেবুর রস এবং বিশেষ সস দিয়ে তৈরি হয় এই টক-মিষ্টি-ঝাল খাবার। ক্রাবি এবং ফুকেটে সামুদ্রিক চিংড়ির আধিক্যের কারণে, সেই চিঙড়ি মেশানো প্যাড থাই আরো মারাত্মক ভাবে জনপ্রিয় হয়েছে – খেতেও গোলা! এর একটা গুরুত্বপূর্ণ থাই ইতিহাসও আছে - ১৯৩০-এর দশকে থাইল্যান্ডে জাতীয়তাবাদ প্রচারের অংশ হিসেবে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী পিবিউন সংক্রাম এই পদটিকে ‘জাতীয় খাবার’ হিসেবে ঘোষণা করেন। চীনা নুডলসের ওপর ভর করে তৈরি হয় প্যাড থাই —কিন্তু তেঁতুল, ফিশ সস আর পাম সুগারের ছোঁয়ায় সেটি পুরোপুরি থাই হয়ে ওঠে। ক্রবি আর ফুকেটে এসে এই খাবার সমুদ্রকে পায় —চিংড়ি, স্কুইড, কখনও কাঁকড়া। ফলে প্যাড থাই এখানে আর শুধু নুডলস নয় , একরকম উপকূলীয় ছোটগল্প যাকে বলে।
সোম তাম - কাঁচা পেঁপের এই সালাদটি মূলত উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের (ইসান অঞ্চল) খাবার হলেও এখন ক্রাবি ও ফুকেটের স্ট্রিট ফুডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে দরিদ্র কৃষিজীবী মানুষ কাঁচা পেঁপে, মরিচ আর লেবু দিয়ে বানাতো এই ঝাল স্যালাড। পরে এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আর দক্ষিণে এসে বদলে যায় চরিত্র। দক্ষিণের সমুদ্র সংলগ্ন এলাকাগুলিতে এই ডিসে প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক কাঁকড়া বা শুঁটকি মাছের সস ব্যবহার করতে দেখা যায়, যা একে উত্তর-পূর্বের মূল ‘ইসান’ স্টাইল থেকে আলাদা করে। এটি লঙ্কা এবং রসুনের ঝাঁঝে জিভ বেশ জ্বালিয়ে দেবে – কিন্তু যাদের ঝাল ভালো লাগে তাদের ভালো লাগবে গ্যারান্টিড প্রায়।
ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস – এই নিয়ে আর আলাদা করে কিছু বলছি না, কারণ এ জিনিস হল থাইল্যান্ডের জাতীয় ডেজার্ট হলো। সব জায়গাতেই আপনি পাবেন – আমের স্বাদের রকমফের বা হালকা আলাদা ভাবে প্রস্তুত করার জন্য স্বাদের রকমফেরও হয়। জানেনই তো এই চালটা আঠালো, আর তার ওপর ঢেলে দেওয়া হয় নারকেলের ঘন দুধ। পাশে থাকে হিমসাগরের মতো মিষ্টি থাই আম। যখন ভাত, দুধ আর আম একসঙ্গে মুখে পড়ে, তখন মনে হয় থাই ভাষায় এই নিয়ে কি কিছু গান বা নিদেন পক্ষে কবিতা লেখা হয় নি!
গ্রিলড স্কুইড - কাঠি কাবাবের সামুদ্রিক রূপ। রাস্তার দুধারের দোকানে কাঠিতে গাঁথা স্কুইড ঝুলে থাকতে দেখবেন। পাবলিক এখানকার স্কুইড বা অক্টোপাসের ‘স্মোকি’ ফ্লেভারের খুব ভক্ত। বিশেষ করে স্কুইডের ডিম ভাজা বা গ্রিল — যা নাকি ক্রাবি এলাকার অন্যতম সেরা স্ন্যাকস। তবে এ জিনিস টাটকা খাওয়া দরকার, একটু দেখে নেবেন সেই ব্যাপারটা।
গ্রিলড স্কিউয়ার আর বি বি কিউ করা মাংস – এটা আও নাং নাইট মার্কেটের এর অন্যতম হট সেলার। বিভিন্ন ধরনের পোক, মুরগির স্কিউয়ার, সসেজ, সীফুড স্কিউয়ার—এসবকে সাধারণত চিলি-সয় সস বা মধু-লেবুর টুইস্ট দিয়ে পরিবেশন করা হয় ।
টম ইয়াম - ঝাল-ঝাল চিংড়ি স্যুপ, যা গরম, টক আর সুগন্ধে ভরা। যদিও এ জিনিস রেস্টুরেন্টেই বেশি খাওয়া হয়, কিন্তু বহু স্টলেই স্ট্রীট স্টাইল টম ইয়াম পাওয়া যায়।
অয়েষ্টার অমলেট – সাধারণ মনে হলেও, লেয়ারের পাতলা অমলেটের মধ্যে সামুদ্রিক অয়েষ্টার তো মিশে থাকে — আর ফলে খেতে একেবারেই অন্যরকম মনে হয়।
তাজা ফল এবং তাদের দিয়ে বানানো স্মুথি – এটা আর একটি জনপ্রিয় জিনিস স্ট্রীট ফুড হিসেবে সব জায়গাতেই। বিশেষ করে নাইট মার্কেট গুলোতে তো এ জিনিস হইহই করে বিক্রী হচ্ছে। এদের ফ্রেশ ট্রপিক্যাল ফলের শেক—কাঁচা আম, আনারস, তরমুজ, নারকেল — সবই খুব জনপ্রিয় ।

থাইল্যান্ডের অন্যজায়গার মতই ফুকেট বা ক্রাবি তেও নাইট মার্কেটের রমরমা। রাত হলেই যেন জেগে ওঠে শহরের সেই প্রান্ত গুলি – আসলে দিনের বেলা গরমের জন্যই মনে হয় রাতের স্নিগ্ধতা আরো বড় বেশী ভালো লাগে। নাইট মার্কেট তো বেশ কয়েকটা আছে, তার মধ্যে মনে হয় সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘লাদ ইয়াই’ বা ফুকেটের ওল্ড টাউন সানডে ওয়াকিং স্ট্রিট মার্কেট আর ওদিকে ক্রাবিতে আও নাং নাইট মার্কেট। এই দুই মার্কেটে ঘুরলেই বুঝতে পারবেন স্ট্রিট ফুড এখানে কতটা বর্ণময়। আরো আছে ক্রাবি নাইট মার্কেট, নাকা মার্কেট।
ফুকেটের ‘চিলভা মার্কেট’ ও বেশ বিখ্যাত। এই মার্কেটের ভাজা পোকা বা ‘ইনসেক্ট ফ্রাই’ বেশ অন্যরকম - সিল্ক ওয়ার্ম বা ঘাসফড়িং ভাজা। খেতে অনেকটা আমাদের আলুভাজার মতো মুচমুচে, শুধু ভেতরটা একটু ক্রিম টাইপের। এর পাশাপাশি আপনি তো স্যাতে পাবেনই। এই স্যাতে কে আপনি কাঠি কাবাবও বলতে পারেন। চিকেন বা বিফ সাতায়-এর সঙ্গে যে পিনাট সস বা চিনাবাদামের চাটনিটা দেওয়া হয়, ওটাতেই আসল জাদুমন্ত্র লুকানো থাকে।
যদি আপনি অ্যাডভেঞ্চারাস টাইপের হন, তাহলে খুঁজে নিতে পারেন ‘লোবা’ যা ফুকেটের আরেক অদ্ভুত খাবার। শুয়োরের কান, নাড়িভুঁড়ি এসব মশলা দিয়ে মেখে কড়া করে ভাজা। শুনতে একটু খটমোটো লাগলেও, এর স্বাদ কিন্তু দিব্যি। তবে খটোমটোই বলবো কেন, আমাদের বাঙলাতেও অনেক জায়গায় এখনো ভুঁড়িচচ্চড়ি ব্যপক জনপ্রিয়।

আও নাং নাইট মার্কেটে যদি না, তাহলে সেখানে কুমীরের মাংস কি আর একবার ট্রাই করবেন না! এতদিন যে কুমিরকে আমরা চিড়িয়াখানায় বা সুন্দরবনের খাঁড়িতে দেখে সমীহ করেছি, তাকেই এখন লঙ্কা-মশলা মাখিয়ে কাঠকয়লার ওপর দিব্যি সেঁকা হতে দেখা যাচ্ছে! অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, তবে কি ক্রাবির সমুদ্র থেকে কুমির ধরে এনে খাওয়ানো হচ্ছে? উত্তর হলো — একেবারেই না। থাইল্যান্ডে কুমির চাষ বা ‘ক্রোকোডাইল ফার্মিং’ একটি অত্যন্ত সংগঠিত এবং বৈধ ব্যবসা। মালয়েশিয়ার অনেক জায়গাতেও কুমীর ফার্মিং আছে। থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে (যেমন নাখন পাথম বা সামুত প্রাকান প্রদেশ) কয়েক হাজার কুমিরের খামার রয়েছে। থাইরা কুমিরের চামড়া দিয়ে নামী দামী ব্র্যান্ডের ব্যাগ আর জুতো তৈরি করে, আর সেই প্রক্রিয়ার বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে আসে এই মাংস। সরকার অনুমোদিত এই খামারগুলো থেকেই ক্রাবি বা ফুকেটের বাজারে কুমিরের মাংস সরবরাহ করা হয়।

আও নাং নাইট মার্কেটে কুমিরের মাংস সাধারণত দুই ভাবে পরিবেশন করা হয় - ক্রোকোডাইল স্কিউয়ার এবং ব্ল্যাক পেপার ক্রোকোডাইল ফ্রাই। এর মধ্যে ক্রোকোডাইল স্কিউয়ার সবথেকে জনপ্রিয়। কুমিরের মাংসের ছোট ছোট টুকরো প্রথমে ম্যারিনেট করা হয়। ম্যারিনেশনে থাকে প্রচুর পরিমাণে রসুন, আদা, লেমনগ্রাস, ধনেপাতার শিকড় এবং থাই সয়া সস। অনেকে এতে সামান্য হলুদ আর গোলমরিচও মেশান। এরপর কাঠি বা স্কিউয়ারে গেঁথে মাঝারি আঁচে কয়লায় পোড়ানো হয়। মাঝে মাঝে ব্রাশ করে দেওয়া হয় মধু বা বিশেষ বার্বিকিউ সস, যা মাংসের ওপরটা মচমচে আর ভেতরটা নরম রাখে। অন্যদিকে ব্ল্যাক পেপার ক্রোকোডাইল ফ্রাই মূলত থাই ঘরানার ‘প্যাড প্রিক থাই ডাম’। কড়াইতে প্রচুর রসুন, কাঁচা লঙ্কা এবং কালো গোলমরিচ দিয়ে মাংসের টুকরোগুলো চটজলদি ভেজে নেওয়া হয়। এর ঝাঁঝালো স্বাদ কুমিরের মেটে গন্ধকে ঢেকে দেয়।
এবার প্রশ্ন যদি জাগে মনে – আচ্ছা ভাই এই কুমীরের মাংস খেতে কেমন? মোটামুটি সাধারণ মত হল কুমিরের মাংসের স্বাদ অনেকটা ‘মুরগি আর মাছের সংকর’। এটি মুরগির মাংসের মতোই শক্ত, কিন্তু এর মধ্যে একটা সমুদ্রের নোনতা বা মাছের মতো টেক্সচার আছে। যারা জীবনে প্রথমবার কুমির খাচ্ছেন, তাঁরা চোখ বন্ধ করে খেলে মনে হবে আপনি একটু চিবোতে কষ্ট হয় এমন কড়া করে ভাজা চিকেন খাচ্ছেন। তবে এর সবথেকে বড় গুণ হলো, এতে চর্বি প্রায় নেই বললেই চলে এবং এটি উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ। আও নাং মার্কেটের এই স্টলগুলোর সামনে পর্যটকদের ভিড় মূলত কৌতূহল থেকেই হয়। তবে একবার খেয়ে দেখার পর অনেকেই এর ভক্ত হয়ে যান।
তাহলে কি দাঁড়ালো? ক্রাবি আর ফুকেট দু’জায়গাতেই সন্ধ্যের পর জমে ওঠা নাইট মার্কেট গুলি স্ট্রীট ফুডের স্বর্গ। সমুদ্রের নোনতা হাওয়া আর রাস্তার ধোঁয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে লেবু, ফিশ সস আরো কত জানা অজানা গন্ধ। ফলে প্রতিটি প্লেট হয়ে উঠছে যেন ছোট্ট ইতিহাসের বই – যেখানে মিশে যাচ্ছে টিনের খনিতে কাজ করতে আসা চীনা শ্রমিকদের ঘাম, মালয় গায়কদের সুর, পর্তুগিজ বণিকদের লঙ্কা বাণিজ্য, ট্যুর অপারেটরের ব্রোশিওর, খানিক আগে জল থেকে উঠে আসা মানব-মানবী।
তবে কি এত না ভাবলেও চলবে – ক্রাবি-ফুকেটের দিকে গেলে নাইট মার্কেটগুলিতে যান খুচরো টাকা নিয়ে – আর স্টল গুলি ঘুরে দেখে যা ভালো লাগবে খেতে থাকুন সেদিনের মত পেট ভরে না যাওয়া পর্যন্ত!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।