কিভাবে ভিন্ডালু রান্না করতে হয়

(১৮৫৩ সালে তখনকার দিনের স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত ভিন্ডালুর বিজ্ঞাপন, সৌজন্য © Glyn Hughes 2022, ৩)
এবারের লেখা ভিন্ডালুর আধুনিক রেসিপি দিয়ে শুরু করা যাক। আমরা যে রেসিপিটি থেকে রান্না করব, সেই রেসিপিটি ভারতীয়-ব্রিটিশ শেফ রাঘবন আইয়ারের "On the Curry Trail" নামে রান্নার বই থেকে নেওয়া (১)| আমাদের আলোচনার সুবিধার জন্য আমি এর বাংলা অনুবাদ করে পেশ করছি। আমার আর্জি আপনারা রান্নাটি নিজেরা করে দেখুন | ইনি পর্ক ব্যবহার করেছেন, আপনি যে কোন রকমের প্রোটিন দিয়ে রান্নাটি করতে পারেন। আপনি মাছ, মাংস, পনির এমনকি সবজি দিয়েও করে দেখতে পারেন, বস্তুত ভিন্দালু নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে ।
এখন প্রশ্ন ওঠা সঙ্গত যে ভিন্দালু, যার উৎস "carne de vinha d'alhos" – ভিনিগার বা ওয়াইনে আর রসুন দিয়ে রান্না করা মাংস – সে খাবার নিতান্তই পর্তুগীজ আর গোয়ার খাবার, তার সঙ্গে বিলেতের কি সম্পর্ক? রাঘবন আইয়ার লিখছেন যে ১৭৯৭ সালে ব্রিটিশরা নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের সময় পর্তুগীজদের হাত থেকে গোয়ার অধিকার নেয় (আসলে ১৭৯৯ সাল হবে, ২ এবং পনেরো বছর পর ইঙ্গ পর্তুগাল চুক্তির সময় ইংরেজরা গোয়া পর্তুগালকে ফিরিয়েও দেয়), এবং সে অধিকার নেবার পর, তারাই নাকি "ভিন্দালু" খাবারটি "আবিষ্কার" করে। এর সঙ্গে নিশ্চিতভাবে আমাদের বাঙালীদের একটি সম্পর্ক রয়েছে, কেননা ১৮১০ সালে বিলেতে শেখ দীন মোহম্মদ নামে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর এক "charming Bengali traveller, surgeon, entrepreneur, and captain in the British East India Company,", প্রথম "কারি হাউজ" খোলেন। কারি তার আগে ইংরেজ খেয়ে থাকতে পারে, কিন্তু ভিণ্ডালু , "কারি", সে সব সুখাদ্যকে সর্বসমক্ষে রীতিমত দোকান খুলে নিয়ে আসার কৃতিত্ব বাঙালীর! তো কাপ্তেন "Hindoostane Dinner and Hooka Smoking Club" নাম দিয়ে খাবারের দোকান খুলে ব্যবসা শুরু করলেন বটে, কিন্তু বছর কুড়ির মাথায় সে দোকান অর্থাভাবে লাটে ওঠে। সে যাই হোক,উনবিংশ শতকে ইংরেজদের এহেন ভিন্দালু প্রেমের নেপথ্যের কারণ হিসেবে রাঘবন আইয়ারের বক্তব্য ছিল যে সে কৃতিত্ব পর্তুগীজদের গোয়ানিজ রাঁধুনিরদের। এঁরা হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে ধর্মান্তরীকরণ হবার পর আর পর্ক বা বিফ রান্না নিয়ে বিধিনিষেধ ছিল না বলে পর্তুগীজ খাবারটির "ভারতীয়করণ" করে তারা ইংরেজদের খাওয়ায়। ইতিমধ্যে গঙ্গা ও টেমস দিয়ে বহু শতাব্দীর জল গড়িয়েছে, আপাতত একবিংশ শতকে রান্নাটি নিম্নলিখিত রূপ পেয়েছে, করে দেখুন:
ভিন্ডালু রান্নার প্রণালী
উপকরণ:- ১ টেবিল চামচ গোটা ধনে
- ১ টেবিল চামচ গোটা জিরে (Cumin seeds)
- ১ চা চামচ কালো বা হলুদ সরষে দানা (Black or yellow mustard seeds)
- ১ চা চামচ মেথি দানা (Fenugreek seeds)
- ½ চা চামচ গোটা গোলমরিচ (Black peppercorns)
- ২ বা ৩টি বড় এলাচ (Seeds from black cardamom pods)
- ৮টি শুকনো লঙ্কা
- ২ টুকরো দারচিনি, ছোট টুকরো করে নেবেন
- ১ চা চামচ সৈন্ধব নুন (Coarse Sea Salt), আমি Himalayan Pink Salt ব্যবহার করে দেখেছি, তবে এমনি সাদা নুন দিলে একটু কম করে দিতে পারেন, স্বাদ অনুযায়ী, যত কম দেওয়া ততই ভাল
- ১ চা চামচ কাশ্মীরি লঙ্কা
- ½ চা চামচ গুঁড়ো হলুদ
- ½ কাপ ভিনিগার (সাদা ভিনিগার দিতে পারেন, Apple Cider Vinegar )
- ২ টেবিল চামচ সাদা তেল
তার সঙ্গে নিন- ১ পাউন্ড (৪৫০ গ্রাম) বোনলেস মাংস (আপনি মাংসের জায়গায় অন্যপ্রোটিন দিয়ে দেখতে পারেন), ১ ইঞ্চি কিউব করে কাটা
- ২ টেবিল চামচ আদা কুচি
- ৮ কোয়া মাঝারি রসুন কুচি
- ১টি Serrano Chile (আপনি কাঁচালঙ্কা দিতে পারেন, তবে বীজসুদ্ধ দিতে বলছেন ইনি, যেহেতু লঙ্কার ঝাল তার বীজের মধ্যেই মূলত, এবং এরা যতটা ঝাল পারে দিতে চায়)
- ২ টেবিল চামচ ধনেপাতা কুচি
এর পর- একটি spice grinder বা পরিষ্কার কফি গ্রাইন্ডার নিয়ে তাতে ধনে, জিরে সরষে, মেথি, গোলমরিচ, এলাচ দানা, শুকনো লঙ্কা, এবং দারচিনি একসঙ্গে নিয়ে মিহি করে গুঁড়ো করুন। (আমি সাধারণত হামান দিস্তে ব্যবহার করি, তবে গ্রাইণ্ডারেও কাজ হবে) এই বলে রাঘবন আইয়ার লিখছেন, ঢাকনার গায়ে লেগে থাকা মশলা ঝরিয়ে বাটির ভেতরে ফেলে দিন। এবার এই গুঁড়ো মশলা একটি ছোট বাটিতে ঢেলে নিন এবং এতে নুন, কাশ্মীরিগুঁড়ো লঙ্কা, ও হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে দিন।
- মশলার এই মিশ্রণের ওপর ভিনিগার ঢালুন এবং একটি ঘন মিশ্রণ তৈরি করুন; একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবেন ভিনিগার যেন কোন Metallic বাসন (লোহা,তামা, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি)তাতে নেবেন না।
- একটি মাঝারি পাত্র নিয়ে মাঝারি-উচ্চ তাপে তেল গরম করুন।
- তেল যখন গরম হবে, তখন এতে মাংস, আদা, রসুন এবং কাঁচালঙ্কা দিয়ে দিন। তেল গরম হওয়ার ক্ষেত্রে আমি একটা থার্মোমিটার দিয়ে দেখে নিই আনুমানিক ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ যেন ওঠে, না হলে চোখের আন্দাজে দেখবেন তেল "ঝিলমিল" করবে | এসব ক্ষেত্রে প্রথমে বাসন গরম করে তারপর তেল দিলে দেখবেন সুবিধে হবে।
- ঢাকনা খুলে ১০ থেকে ১২ মিনিট ভাজুন, যতক্ষণ না মাংসের বাইরের অংশ ভাজা ভাজা হবে, আদা-রসুন হালকা বাদামী রঙ ধারণ করে এবং লঙ্কা সামান্য ভাজা হয়ে ফুলে ওঠে।
- তারপর মাংসে মশলার সেই আগে থেকে করে রাখা মিশ্রণটি দিয়ে মিশিয়ে নিন।
- তাপ কমিয়ে মাঝারি আঁচে আনুন। পেস্টের ভেতরে থাকা ভিনিগার বাষ্পীভূত হতে শুরু করবে এবং মশলাগুলো ভাজা হবে।
- পাঁচ থেকে আট মিনিটের মধ্যে তেল ছাড়তে শুরু করবে (বা, দেখুন কতক্ষণে তেল ছাড়ে)
- তেল ছাড়তে শুরু করলে এতে আধ-কাপ জল দিন এবং মশলা ইত্যাদি ঘষে তুলে নিন।
- আঁচ আরো কমিয়ে মাঝারি-নিম্ন (medium-low) করুন
- ঢাকনা দিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রান্না করুন, যতক্ষণ না মাংস নরম হয়ে সেদ্ধ হয়।
- শেষে ধনে পাতা কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন
রান্নাটা শুনতে অনক খানি, তবে সে যে খুব ঝামেলার তা নয়, এখানে দু একটি ব্যাপার খেয়াল করুন।
প্রথমত, রান্নাটিতে পেঁয়াজ ব্যবহার করা হল না, শুধু রসুন ব্যবহার করা হয়েছে, মূল পর্তুগীজ রান্নাটিতেও তাই;
দ্বিতীয়ত, ইনি ভিনিগার দিতে বলেছেন, রান্নাটিতে ভিনিগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কেন ভিনিগার?
এর একটি কারণ পর্তুগীজরা যখন সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে দীর্ঘকাল পথ চলতে চলতে এই রান্না করত, তারা শুকনো শুয়োরের মাংসে ভিনিগার দিয়ে বা ভিনিগারের মতন একটি অম্ল বা অ্যাসিড দিয়ে তাকে জারিত করত, কারণ তা না হলে উপায় ছিল না, তখন তো আর ফ্রিজ আবিষ্কার হয়নি। আগের বার লিখেছিলাম যে অ্যাসিড, নুন, ফ্লেভার, আর তেল, এদের সংমিশ্রণে যে ম্যারিনেড বা emulsion তৈরী হয়, তাই দিয়ে মাংস (বা প্রোটিন ) জারিত করা হয়, এতে করে মাংসকে বা প্রোটিন ফাইবারকে denature করার জন্য বা নরম করার জন্যই এই সংমিশ্রণের প্রয়োজন।
মেলাবেন, তিনি মেলাবেন
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে অ্যাসিড, যাতে জল রয়েছে, আর তেল, তাদের মধ্যে এতটুকু সখ্যতা নেই, তারা মিশ খায় না।

(চিত্র ১)
সে সমস্যা আজকের নয়। তখনকার দিনে পর্তুগীজদের জাহাজেও যেমন পর্তুগীজ পাচকেরা ভুগেছিলেন, ভারতের পাচকদের কাছেও ততটাই সমস্যার ছিল। মাংস ম্যারিনেড করবেন কিভাবে? বিশেষ করে ভিনিগারকে (যেখানে acetic acid, বা ধরুন wine, যার মধ্যে tannic acid) সে জিনিস জলে দ্রবীভূত, আর তেল, যাতে রান্না করা হবে, তাদের মিলিয়ে দেবে কীভাবে?
এই জায়গাটিতেই রসুনের তাৎপর্য। রসুনের মধ্যে এমন কয়েকটি পদার্থ রয়েছে (Garlic Water Soluble Compounds GWSC), যার একদিক তেলের মলিকিউলগুলোকে ধরে রাখে, অন্য দিকে জলের মলিকিউলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যার জন্য তেল, জল, আর রসুন দিয়ে নানান রকমের emulsion তৈরী করা সম্ভব। কীভাবে কি হত, আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে তখনকার দিনে ততটা গভীর ভাবে জানা ছিল না, তাকে এখন আমরা "কিছুটা" জানছি, উৎসাহী পাঠকেরা Bravo-Núñez Á প্রভৃতির লেখা গবেষণা পত্রটি পড়ে দেখলে দেখবেন যে রসুনের মধ্যে যে প্রোটিন ও অন্যান্য জিনিস একদিকে তেল ও অন্যদিকে জলের সঙ্গে মিশে emulsion তৈরী করে (চিত্র ১, ৪)।
শুধু রসুন নয়, ডিম (সাদা অংশ ও কুসুম), সোয়াবিন থেকে বা ডাল থেকে লেসিথিন, সরষেবাটা, আটার গোলা, এরকম আরো নানান রকমের জিনিস দিয়ে stable emulsion তৈরী করা যায়। শুধু তাই নয়, একে তৈরী করতে গেলে একদিকে যেমন নানান রকমের জিনিস মেশাতে হবে, তার সঙ্গে তাদের কিছু একটা দিয়ে না নাড়িয়ে চাড়িয়ে দিলে কিন্তু ইমালশন তৈরী হবে না, তার ওপরে কিছুটা তাপ দিয়ে মেশালে ইমালশন তৈরী হবে।
রান্নায় ইমালশন তৈরীর কৃৎকৌশল ইউরোপীয় ও ভারতীয় পাচকেরা বিলক্ষণ জানতেন, তবে তাঁদের পথ এক ছিল না। ইওরোপে যেমন, বিশেষ করে দক্ষিণ ইউরোপের এবং লেভান্ত অঞ্চলের দক্ষ পাচকেরা রসুন, আর জলপাইয়ের তেল (অলিভ অয়েল) দিয়ে আয়োলি (Aioli) করতেন, রুটি প্রভৃতি দিয়ে খাবার জন্য অতীব উপাদেয় (৬)। ভারতের পাচকরাও বিলক্ষণ ইমালশন করতেন, তবে তাঁরা অন্যভাবে করতেন, আমরা এর আগে মানসোল্লাসে দেখেছি তেঁতুলের জল আর গম ভেঙে মাছ ভাজা, এরকম আরো বিবিধ খাদ্য, যেখানে ইমালশনের ব্যবহার, যেমন হলুদ এবং ডাল (lecithin) ।
এখন ভিন্ডালু রান্নায় আমরা সাবেক পর্তুগীজ carne de vinha de alhos (রসুন আর ভিনিগার দিয়ে মাংস রান্না) তার কৃৎকৌশল আর সাবেক মালাবারের ভারতীয় পাচকদের রান্নার অভিনবত্বের একটি মেলবন্ধন দেখলাম। সে আবার কেমন ব্যাপার? লিজি কলিংহ্যামের বইতে তিনি বলছেন ভারতে আসার পর পর্তুগীজরা দেখলেন স্থানীয় পাচকেরা রান্নায়, ভিনিগার বা সির্কা ব্যবহার করেন না। ভিনিগারের জায়গায় দক্ষিণ ভারতীয় পাচকেরা তেঁতুল জল ও গোলমরিচ/মরিচ মিশিয়ে অনেকটা একই রকম টক-ঝাল স্বাদযুক্ত খাবার তৈরি করতেন। এদিকে পর্তুগীজ পাচকদের ভিনিগার চাই।
আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখন ইউরোপে ক্যাথলিক প্রবল, তদুপরি
inquisition এর আমল, ফলে প্রতি জাহাজে ম্লেচ্ছজাতি, হিদেনদের "সৎপথে" আনার অভিপ্রায়ে যাজক থাকতেন, এনাদের হাত ধরে ইউরোপ ওয়াইন তৈরী শিখেছে। ভারতে এসে পর্তুগীজ যাজকরা পাম গাছের রস থেকে তৈরি করলেন মদ, মানে ‘নারকেলের তাড়ি’ (coconut toddy), এবং তাকে গেঁজিযে ভিনিগার করে পাচকদের ভিনিগারের অভাব জনিত সমস্যার সমাধান করলেন। তার সঙ্গে বিশুদ্ধ ভারতীয় মতে মিশল তেঁতুলের রস, এবং প্রচুর পরিমাণে রসুন। সে জিনিসে পর্তুগিজ "মেস্ত্রে কোজিনারা" মহাখুশী। তার ওপর ভারত নামের দারচিনির আর মশলার দেশে তেনারা গোলমরিচ, দারচিনি এবং লবঙ্গ দিয়ে গরম মশলা যোগ করেছিলেন। সে না হয় হল, ভিন্দালুর এই সসটিতে ম্যাজিক নিয়ে এল মরিচ, মানে লঙ্কা। ততদিনে ভারতে পর্তুগিজরাও লঙ্কা বা মরিচের তীব্র স্বাদের ভক্ত, এবং কলিংহ্যাম লিখছেন, কিছু রেসিপিতে ২০টির মতো লাল লঙ্কা ব্যবহারের কথা বলা আছে (৭)।
ভিন্ডালু নিয়ে লিখতে গিয়ে এই ধান ভানতে শিবের গীতের মতন কিস্সা, তাতে যে কথাটা বিশেষ করে ওঠে সেটি ভারতীয় পাচকদের অভিনবত্ব । একটা ব্যাপার আমার কাছে অবাক মনে হয়, যে পর্তুগীজরা পশ্চিম ভারতে ভিন্ডালু আর ভিনিগারে রসুন দিয়ে মাংস রান্না শেখাল, তারাই যখন পূর্ব ভারতে ঘাঁটি গড়ল, তখন আমরা তাদের হাত ধরে ছানা আর ব্যাণ্ডেল চীজের মতন চমৎকার উপাদেয় খাবার পেলাম, বাংলায় আলাদা করে ভিণ্ডালু ধরণের খাবার আমরা পাইনি। মনে রাখা ভাল, এ ষোড়শ শতাব্দীর কথা, তখনও ভারতে মোগল আমলের সূচনা সবে হচ্ছে, বাবর সবে লোদী সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়েছেন।
তার আরো তিন সাড়ে তিনশো বছর পরে, ১৮৫০ এরও পর, বাংলায়ও কিন্তু আমরা বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের বর্ণনা থেকে দেখছি বাংলায় বাঙালী পাচকেরা কিভাবে ভিন্ডালু রান্না করতেন। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় লিখছেন,
"*পর্ত্তুগিজ ভিন্ডালু।
ছাগল, মেষ এবং পক্ষী প্রভৃতি সকল প্রকার মাংসেই ভিন্ডালু প্রস্তুত হইতে পারে। তবে যে সকল মাংসে চর্ব্বির ভাগ থাকে, সেই প্রকার মাংসেই উহা উত্তম হয়।
উপকরণ ও পরিমাণ।—মাংস এক সের (আজকের হিসেবে ৯৩৩ গ্রাম), ঘৃত তিন ছটাক (১৮০ গ্রাম), রসুন-ছেঁচা এক কাঁচ্চা (৩০ গ্রাম), রসুন-বাটা এক কাঁচ্চা (৩০ গ্রাম), আদা-বাটা এক কাঁচ্চা (৩০ গ্রাম), লঙ্কা-বাটা এক কাঁচ্চা (৩০ গ্রাম), ভাজাধনের গুঁড়া আধ কাঁচ্চা (১৫ গ্রাম), ভাজা জীরার গুঁড়া সিকি কাঁচ্চা (সাড়ে সাত গ্রাম), তেজপত্র চারিখানি, গোলমরীচ ৮।১০টী, ভাজা-লবঙ্গ (গুঁড়া) ৪।৫টি, ছোট-এলাচ (গুঁড়া) ছয় আনা (তিন গ্রাম), দধি এক পোয়া (২৫০ মিলিলিটার), লবণ আড়াই তোলা (৩০ গ্রাম) ** তেজপাতা ও গোল-মরীচ ব্যতীত সমুদায় মসলা দধির সহিত মিশাইয়া, তাহাতে মাংস মাখিয়া রাখ। পর্ত্তুগিজেরা অধিক-ক্ষণ পর্য্যন্ত এই অবস্থায় রাখিয়া, রাঁধিবার সময় উহাতে আদৌ জল ব্যবহার করে না।
কিন্তু যাঁহারা তত সময় অপেক্ষা করিতে পারেন না, তাঁরা অন্ততঃ দুই ঘণ্টা ঐ-রূপ অবস্থায় রাখিয়া রন্ধন করিতে পারেন।
এই জায়গাটি বিশেষ ভাবে নজর করুন। বিপ্রদাসবাবু ভিনিগারের জায়গায় দই এবং ল্যাকটিক অ্যাসিড দিতে বলছেন। বলে লিখছেন,
"নিয়মিত সময় অতীত হইলে, একটি পাক-পাত্র মৃদু জালে চড়াইয়া, তাহাতে সমুদায় ঘৃত ঢালিয়া দিবে, এবং পাকিয়া আসিলে, তেজপাতা ও গোল-মরীচ ফোড়ন দিয়া, পূর্ব্ব-রক্ষিত মাংস ঢালিয়া নাড়িয়া দিবে। অনন্তর, পাক-পাত্রের মুখ ঢাকিয়া দিয়া মৃদু জালের উপর রাখিলেই মাংস পাক হইবে।
পর্ত্তুগিজ ভিন্ডালুর ঝোল থাকে না; জালে এবং অধিক-ক্ষণ দধিতে ভিজান থাকাতে, উহা সু-সিদ্ধ হইয়া, এক-এক-খানি মাংস অতি উপাদেয় আস্বাদনের হইয়া থাকে। মসলা সমুদায় অল্প ভাজিয়া লওয়াতে এক-প্রকার সু-গন্ধ বাহির হইতে থাকে।
যাঁহারা অধিক-ক্ষণ দধিতে ভিজাইয়া রাখিতে অপেক্ষা করিতে পারেন না, তাঁহারা রাঁধিবার সময় তাহাতে অল্প পরিমাণে জল দিতে পারেন; কারণ, অধিক-ক্ষণ দধিতে ভিজান না থাকিলে, সিদ্ধ হইতে একটু জলের আবশ্যক হইয়া থাকে।
আর একটি কথা, পর্ত্তুগিজেরা দধির পরিবর্তে ভিনিগার অর্থাৎ সিরকা দিয়া থাকেন। দধি অপেক্ষা যে, সিরকা অধিক জারক, তাহা বোধ হয়, অনেকে-ই অবগত আছেন। তবে সিরকাতে এক-প্রকার গন্ধ হইয়া থাকে; সুতরাং, অনেকের রসনায় তাহা তত আদরণীয় হয় না। তবে যাঁহারা খাইয়া থাকেন, তাঁহারা দধির পরিবর্তে উহা ব্যবহার করিতে পারেন।*" (পাক-প্রণালী, বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়)
এই কথাটিও সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য, কারণ ভিনিগার acetic acid, তার pH 2.4, সে তুলনায় দই ল্যাকটিক অ্যাসিড, সে অপেক্ষাকৃত কম অ্যাসিডিক ("জারক"), যে কারণে বিপ্রদাসবাবু লিখছেন "অধিক-ক্ষণ দধিতে ভিজাইয়া রাখিতে" | এই যে ভারতীয় পাকশাস্ত্রীরা ভিনদেশী খাবারকে নিজেদের মত করে আত্তীকৃত করে, যাকে আজকের যুগে modernise করে নেওয়া বলে, করতেন, এবং অতি উমদা খাবার নির্মাণ করতেন, বিশেষ করে আমাদের রসনার তৃপ্তিতে, যে কারণে, আজও, তাঁদের হাতে নির্মিত, বহু খাবার একই কায়দায় রান্না করে খেলে বড় আনন্দ হয়, এ সামান্য নয়, সহজ ছিল না, এ রীতিমতন রান্নার শিল্প ও বিজ্ঞান। তাঁদের কুর্ণিশ!
আমরা দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের খাবার কিছুটা আলোচনা করলাম। পর্তুগীজদের সমসাময়িক কালে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরেও দেখছি পালাবদল চলছে। আমরা মোগলদের সূত্রে "মোগলাই খানা " পেয়েছি বটে, কিন্তু মুঘলদের ভারতে আগমনের আগে কি ধরণের খাবার দাবার খাওয়া হত? মোগলরাই বা কতটা আমাদের খাবার আর রান্নাকে প্রভাবিত করেছিল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলুন দেখি প্রাক মোগল যুগের ভারতের খাবার দাবারের খোঁজ করি, যাই আরেকটি উৎস সন্ধানে | এবার মধ্যভারতের মালওয়ায়।
মাণ্ডু এবং নিমতনামা
(বাজবাহাদুর ও রূপমতী, India Office Library, Colour Prints, No. 17: Provincial Mughal Painting: Baz Bahadur and Rupmati. Scan by FWP, Sept. 2001, ১০)
আমার আবার "ক"য়ে কৃষ্ণের মত মাণ্ডুর নাম শুনলেই বুদ্ধদেব গুহের লেখায় মালওয়ার সুলতান বাজ বাহাদুর আর তাঁর প্রেয়সী রূপমতীর গল্প মনে পড়ে যায় | এও সেই মাণ্ডুরই কাহিনি, এবং বাজবাহাদুরের পূর্বসুরীকে নিয়েই। চতুর্দশ শতক শেষ হয়ে আসছে, ১৩৯৮ সাল, বাবরের পূর্বপুরুষ তৈমুর খান দিল্লি আক্রমণ করলেন। তৈমুরের আক্রমণের পর মালওয়ার সুবেদার দিলওয়ার খান ঘোরি মালওয়াকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। এঁর পৌত্রই গিয়াস শাহী, ১৪৬৯ সালে রাজ্যভার নেন, এবং ৩০ বছর রাজ্ত্ব করার পর পুত্র নাসির শাহের হাতে রাজ্যভার সঁপে দিয়ে স্থির করেন বাকী জীবন ভোগ বিলাসে কাটাবেন। গিয়াস শাহী এমনিতেও ভারি ভোগ-বিলাস প্রিয় রাজা ছিলেন, এবং তাঁর শাসনকালে মাণ্ডুকে শাদিয়াবাদ ('আনন্দের শহর') বলে বলা হত।
সে যাই হোক, রাজামশাইয়ের জীবনযাত্রা বিলাসবহুল তো ছিলই, তাঁর ভোগবিলাসের অন্যতম একটি বিষয় ছিল খানাপিনা। তা সে খানাপিনার আর তাদের রান্নাবান্নার তদারক তিনি নিজেই করতেন, এবং সে সব নিয়ে ১৪৯৫ থেকে ১৫০৫ সালের মধ্যে একটি বই লিখিয়েছিলেন, আজকে যাকে সে আমলের খানাপিনার (আক্ষরিক অর্থে) এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যেতে পারে।

(সুলতান গিয়াৎশাহীর দরবারে খাবার রান্নার দৃশ্য; নিমত মহল বই থেকে নেওয়া চিত্র, মাঝের বিচিত্র গোঁফধারী ব্যক্তি স্বয়ং গিয়াৎশাহী, রান্নার তদারক করছেন )
বইটি ফারসি ভাষায় লেখা। কয়েকশ রেসিপি রয়েছে এবং বিভিন্ন খাবার তৈরির প্রস্তুতির দৃশ্য সম্বলিত ৫০টি চমৎকার ছবির প্লেটও দেখতে পাবেন। কেতাবটি শেষ পর্যন্ত সুলতান গিয়াৎ শাহ স্বচক্ষে প্রকাশিত হতে দেখে যেতে পারেন নি অবশ্য, সে কাজ, তার উত্তরসূরী, পুত্র, নাসির শাহ সম্পন্ন করেছিলেন।
নিমতনামা শুরু হচ্ছে এই বলে যে,
"হে আরোশোলারাজ! দয়া করুন। আমার এই রন্ধনশৈলীর নিবেদনটি খেয়ে ফেলবেন না; এতে রয়েছে বিভিন্ন খাবার, মিষ্টি, মাছ, এবং গোলাপ জলের সুগন্ধি তৈরির পদ্ধতি" ।
হঠাৎ আরশোলাদের রাজার প্রতি এত অনুনয় কেন কে জানে? হয়ত, আরশোলাদের কাগজ পত্র কাটার দু্র্মতি জেনেশুনে তাদের রাজাদের কাছে আর্তি হলেও হতে পারে। আরশোলাদের রাজামশাই যে গিয়াৎ শাহ কে রেয়াত করে তাঁর কথা রেখেছিলেন এবং আমরা কেতার অক্ষুন্ন অবস্থায় আমাদের জমানায় পেয়েছি, এ আমাদের অশেষ সৌভাগ্য।
রেসিপিগুলোতে মূলত গিয়াৎ শাহের যে সমস্ত খাবার প্রিয়, তাদের বর্ণনা দেওয়া আছে, অবশ্য শুধু তাই নয়, সে দেশের গরীবগুর্বো মানুষ যা খেতেন, সে সবের রেসিপিরও চমৎকার সব বর্ণনা দেয়া। একেকটি খাবারের যেমন "সামোসার", একাধিক বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু মুশকিল হল, লেখাগুলো পড়ে বোঝার উপায় নেই কোন খাবারের পরে কোন খাবার আসছে, সব খাবার এলোমেলো ইতস্তত বিচ্ছিন্ন করে লিখে রাখা। এর পরের পর্বে একে নিয়ে আলাপ আলোচনা করব ।
তথ্যপঞ্জী- (১) Iyer R. On the Curry Trail. Workman Publishing Company; 2023.
- (২) https://www.bhsportugal.org/uploads/fotos_artigos/files/BritishInvasionofGoa.pdf
- (৩) Hughes G. Foods of England - Vindaloo [Internet]. Foods of England - Home. 2022 [cited 2026 Jan 7]. Available from: https://foodsofengland.info/vindaloo.html
- (৪)Bravo-Núñez Á, Golding M, Gómez M, Matia-Merino L. Emulsification Properties of Garlic Aqueous Extract: Effect of Heat Treatment and pH Modification. Foods. 2023 Oct 10;12(20):3721. doi: 10.3390/foods12203721. PMID: 37893614; PMCID: PMC10606844.
- (৫) An Q, Zhao S, Zhao C, Wei R, Zhang L, Li J, et al. Identification of the key emulsifying components from the byproducts of garlic oil distillation. Food Hydrocolloids. 2022 Jan;122:107043.
- (৬) Milligan C. The First Known Aioli Sauce Can Be Traced Back To Roman Times [Internet]. Mashed. 2024 [cited 2026 Jan 8]. Available from: https://www.mashed.com/1618417/first-aioli-sauce-roman-times/https://www.mashed.com/1618417/first-aioli-sauce-roman-times/
- (৭) Collingham EM. Curry : a tale of cooks and conquerors. Oxford: Oxford University Press; 2006.
- (৮)Wikipedia. Acetic acid [Internet]. Wikipedia. Wikimedia Foundation; 2019. Available from: https://en.wikipedia.org/wiki/Acetic_acid
- (৯) Titley, N.M. (2004). The Ni'matnama Manuscript of the Sultans of Mandu: The Sultan's Book of Delights (1st ed.). Routledge. https://doi.org/10.4324/9780203330920
- (১০) Pritchett F. bazrupmati [Internet]. Franpritchett.com. 2026 [cited 2026 Jan 8]. Available from: https://franpritchett.com/00routesdata/1400_1499/mandu/bazrupmati/bazrupmati.html
(পরবর্তী অংশ পরের পর্বে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।