আজ না হয় লবঙ্গ আমরা পৃথিবীর যেখানেই থাকি, চাইলেই প্রায় হাতের নাগালের মধ্যে পাই, কিন্তু একটি সময় ছিল যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকায় লবঙ্গ (Syzygium aromaticum) চাইলেই পাওয়া তো যেতই না, বরং চাহিদার তুলনায় বিরল ছিল তার প্রাপ্তি। যার জন্য, শুধু লবঙ্গই নয়, মরীচ, দারচিনি, জায়ফল, মানে আমরা যাকে গরম মশলা বলি, তার বেশ কিছু উপাদান ইউরোপীয়দের পক্ষে পাওয়া কষ্টকর ছিল। কতটা দুর্লভ ছিল, Dumberton Oaks Plant Humanities Initiative এর তরফে লিখতে গিয়ে জেনি ইয়ু নামে জনৈকা গবেষিকা লিখছেন,
"In fifteenth-century Britain, for instance, it would have cost five days’ hard-earned wages for a skilled artisan to purchase a pound of the exotic spice" (১)
এদিকে মশলা না হলেও নয়। পল ফ্রিডম্যান লিখছেন (৫),
"So, why were spices so highly prized in Europe in the centuries from about 1000 to 1500? One widely disseminated explanation for medieval demand for spices was that they covered the taste of spoiled meat. Spices were more expensive than meat, and fresh meat was available, as suggested by extant records of municipal ordinances prohibiting butchers from throwing unwanted animal parts and blood in the streets. Medieval purchasers consumed meat much fresher than what the average city-dweller in the developed world of today has at hand. However, refrigeration was not available, and some hot spices have been shown to serve as an anti-bacterial agent. Salting, smoking or drying meat were other means of preservation.
Most spices used in cooking began as medical ingredients, and throughout the Middle Ages spices were used as both medicines and condiments. Above all, medieval recipes involve the combination of medical and culinary lore in order to balance food's humeral properties and prevent disease. Most spices were hot and dry and so appropriate in sauces to counteract the moist and wet properties supposedly possessed by most meat and fish. Merchant guilds that supplied spices were variously known as "spicers," "apothecaries," or "pepperers." Inventories and account books of pharmacies show that such culinary stalwarts as pepper, cinnamon and ginger were sold in many varieties and in different medical prescriptions."
লবঙ্গ নিয়ে লিখতে গিয়ে জেনি ইয়ু লিখছেন যে তখনকার দিনে লবঙ্গ চাষ করা হত শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শুকনো, ও আর্দ্র মৌসুমি জলবায়ুতে, বিশেষ করে এখনকার ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলোতে। যার জন্য সেই সময়ে লবঙ্গের উৎপাদন ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় মানুষেরা আর ব্যবসার মূলত করতেন আরব ও চীনা বণিকরা। এদের মধ্যে একদল সিল্ক রোড ধরে ইউরোপে, ও আরেক ভারত মহাসাগর হয়ে ইউরোপীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় বাজারে নিয়ে যেতেন। ইউরোপে মশলাবিতরণের উৎস ছিল জেনোয়া। একচেটিয়া ব্যবসা হলে যা হয়, ইতালীয়রা ক্রমাগত মশলার দাম বাড়াচ্ছিল, আবার এদিকে ইউরোপীয় বণিকদের পক্ষে স্থলপথে বাণিজ্য করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছিল কারণ পারসিক ও আরবরা তাদের রাস্তা আটকে রাখতো, সুতরাং ইতালির একচেটিয়া বাজার এবং আধিপত্য খর্ব করে ভারত পৌঁছনোর নতুন সমুদ্রপথের সন্ধান তাদের কাছে ছিল সাংঘাতিক রকম গুরুত্বপূর্ণ। ১৪৮৮ তে বার্থোলোমিউ ডিয়াজ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে উত্তমাশা অন্তরীপ খুঁজে বার করলেন। তার দশ বছর পর ভাসকো ডা গামা এলেন চারখানি জাহাজ আর কিছু উপঢৌকন নিয়ে কালিকটের রাজা জামোরিনের কাছে, এবং জাহাজ ভর্তি করে মশলা সংগ্রহ করে, কিনে নিয়ে ফিরে যাবেন ইউরোপে। এর পরের ইতিহাস রক্তাক্ত, এবং ইউরোপীয় ঔপনিবেশকিতার নির্লজ্জ ইতিহাস, বিশেষ করে মশলার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পর্তুগীজ, মালাবার, আরব আর ডাচদের নিরন্তর সংঘর্ষের কাহিনি। কালক্রমে পর্তুগীজদের আধিপত্য খর্ব হতে হতে শেষে তাদের হাতে রইল ভারতের গোয়া আর দিউ, আর এর মাঝে এল ওলন্দাজ, ইংরেজ, আর ফরাসীদের উপনিবেশ বিস্তারের ভয়ঙ্কর কাহিনি। উৎসাহীরা মশলাকে কেন্দ্র করে রাজ্যবিস্তার আর উপনিবেশ নিয়ে সত্যেন সেনের লেখা মশলার যুদ্ধ পড়ে দেখতে পারেন (২), আমরা আপাতত আমাদের রান্না বান্নার গল্পেই একে সীমাবদ্ধ রাখব। পঞ্চদশ শতকে সেই সময় ইউরোপের মতন ভারতেও ইতিহাসের মোড় ঘুরছে । পর্তুগীজদের সমুদ্রপথে ভারত আবিষ্কারের ২৮ বছরের মাথায়, ১৫২৬ সালের ২০ শে এপ্রিল উত্তর ভারতের পানিপথে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের সূত্রপাত করলেন। পর্তুগীজ এবং ইউরোপীয় উপনিবেশের পত্তনের মত মোগল সাম্রাজ্যও ভারতীয়দের রান্না খাওয়াদাওয়ার সংস্কৃতিতে প্রভাব রেখে গেছে।
গত ৫০০ বছর ধরে ভারতীয় cuisine এ একদিকে ইউরোপীয়, অন্যদিকে পারসিক মধ্যপ্রাচ্যের নানান রকমের প্রভাব পড়েছে যাকে নিয়ে একটু আলাপ আলোচনা করা যায়। তার সূত্র ধরে আরো কয়েকটি বিষয় পর্যালোচনা করে দেখা যাক। একটি রেসিপি দিয়ে শুরু করা যাক। রেসিপিটি রাজা তৃতীয় সোমেশ্বরের লিখিত মানসোল্লাস বই থেকে নেওয়া, দ্বাদশ শতকের মালাবার অঞ্চলের রান্না, তখনো ভারতীয় রান্নায় মোগল বা পর্তুগীজ প্রভাব পড়েনি।
রান্নাটির উল্লেখ Asian Agri History নামে একটি জারনালে পাবেন (৩), আমি আলোচনার সুবিধের জন্য এবং কেউ যদি রান্না করতে চান তাঁর যাতে কাজে লাগে তাই একটু অন্য রকম করে, রেসিপি লেখার ছকে লিখেছি।
উপকরণ
মানসোল্লাসের ফিশ ফ্রাই (১৫৩০-১৫৩১ পংক্তি)
- মাছ: টুকরো করে কাটা মাছ ৩০০ গ্রাম (কি মাছ নিতে হবে লেখা নেই, সাদা মাছ নিন)
- ম্যারিনেড: তেঁতুলের রস নিন যাতে মাছের টুকরোগুলো ডুবিয়ে রাখতে পারেন, ঘন্টাখানেক (অনেকক্ষণ রাখার প্রয়োজন নেই)
- ময়দা
- তেল, যে পাত্রে ভাজবেন তাতে অনেকটা তেল নিন যাতে মাছের টুকরোগুলো স্বচ্ছন্দে ভাজতে পারেন
- বিটনুন (Rock salt), এলাচ গুঁড়ো এবং গোলমরিচ গুঁড়ো, স্বাদ অনুযায়ী
প্রস্তুত প্রণালী
১. মাছগুলো ছোট টুকরো করে কেটে নিন এবং ঠান্ডা জলে ভালো করে ধুয়ে নিন।
২. ম্যারিনেট করুন: মাছের টুকরোগুলোকে তেঁতুলের রসের মধ্যে ডুবিয়ে রাখুন যতক্ষণ না টক স্বাদ মাছের ভেতরে যায়
৩. Breading: রস থেকে মাছগুলো তুলে নিন এবং তার চারপাশে ময়দা দিয়ে ঢেকে দিন, যেন আস্তরণ পড়ে
৪. পাত্রে তেল গরম করুন। আলতো হাতে যত্ন করে মাছের টুকরো গুলো গরম তেলে ছাড়ুন। ময়দার প্রলেপ দেওয়া মাছের টুকরোগুলো গাঢ় সোনালি বাদামী না হওয়া পর্যন্ত ভাজতে থাকুন।
৫. ভাজা হয়ে গেলে তেল থেকে তুলে নিন এবং স্বাদমতো বিটনুন, মশলা ইত্যাদি দিন।
৬. গরম মাছের ওপর এলাচ গুঁড়ো ও গোলমরিচ গুঁড়ো ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।
এ জিনিস কেমন খেতে হবে আমার কোন ধারণা নেই, কিন্তু খাবারটিকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
এই মাছভাজার নমুনাটি এইজন্য দিলাম যে দেখা যাবে আজ থেকে প্রায় ৯০০ বছর আগে ভারতে (দক্ষিণে) মাছকে তেঁতুলের রসে ম্যারিনেট করে নেওয়া হত। শুধু তেঁতুলের রস মানে Tartaric Acid, দিয়ে marinade করার ব্যাপারটি ব্যাক্তিগতভাবে আমার কাছে অভিনব লেগেছে | তেঁতুল দিয়ে marination এর কথায় অবধারিতভাবে পোর্তুগীজ-প্রভাবিত ভারতীয় ভিন্দালু র প্রসঙ্গ আসবে।
---
তথ্যপঞ্জী
(১) Jenny Yu. Cloves: The Spice that Enriched Empires - JSTOR Daily [Internet]. JSTOR Daily. 2024. Available from:
https://daily.jstor.org/cloves-the-spice-that-enriched-empires/(২)
https://www.ebanglalibrary.com/books/মসলার-যুদ্ধ-সত্যেন-সেন/ (৩) Sādhale, N., & Nene, Y.L. (2005). On Fish in Manasollasa (c. 1131 AD).
(৪) P. Arundhati. Royal Life in Mānasôllāsa. 1994.
(5)
https://archive-yaleglobal.yale.edu/content/search-flavors-influenced-our-world(বাকী এর পরবর্তী অংশে )