বিদ্যাসাগর ঝাঁপ দিলেন। মুখ সোজা ওপারের দিকে, স্রোতের সাথে কোন লড়াই নেই। মাঝ নদীতে একবার মনে হল আর বোধহয় পারবেন না - হাত পা ভারী হয়ে আসছে, ভেজা পশম গায়ে যেন লোহার বর্ম। ঠিক তখনই কানে বাজল অক্ষয়ের গলা - “আসল কথা ভাসা নয় ঈশ্বর, আসল কথা টান!” কোঁচা নেই, পাল নেই, পিছনে টান নেই। এক হাত, তারপর আরেক হাত, বীরসিংহের পুকুরে শেখা সেই অ-ইউরোপীয় কায়দা। বিদ্যাসাগর মনে মনে একবার ‘দুর্গা’ বললেন, তারপর অক্ষয়ের সমীকরণটা মনে পড়তে আরেকবার বললেন ‘শূন্য’ - যাতে দুজনের কারো মনেই দুঃখ না থাকে। তারপর দাঁতে চটি আরো জোরে চেপে হাত চালাতে লাগলেন। ... ...
বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় মজাটা বোধহয় এখানেই। যে তাচ্ছিল্য একদিন এক তরুণ গবেষককে অপমানে অসুস্থ করে দিয়েছিল, সেই তাচ্ছিল্যই তাকে ঠেলে দিয়েছিল এমন এক আবিষ্কারের দিকে যা মানবসভ্যতাকে অনাহারের কিনারা থেকে টেনে তুলবে। ‘বাতাস থেকে রুটি’ (Brot aus Luft) – উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠেছিল সেকালের জার্মানরা। আজ পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ যে দুবেলা খেতে পায়, তার পেছনে রয়েছে এই এক আবিষ্কার। ... ...
তেল-গ্যাস ইন্ডাষ্ট্রিতে কাজ করতে ঢুকে ইস্তক এই একটা ব্যাপার আমাকে বরাবর ভাবিয়েছে। ভাবুন একবার – একটা অয়েল ওয়েল (মানে তেলের কূপ) থেকে যেখানে তেল ওঠে, আর যেখানে সেটা পরিশোধিত হয়ে আমাদের গাড়ির ট্যাঙ্কি কিংবা রান্নার চুলা পর্যন্ত পৌঁছায়, এই দুইয়ের মাঝখানে প্রায়ই থাকে হাজার হাজার কিলোমিটার লম্বা পাইপলাইন। শেল, এক্সনমোবিল, বিপি, শেভরন, টোটাল - নামজাদা আন্তর্জাতিক কোম্পানি হোক বা এক-একটা দেশের নিজস্ব রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি, সবার হাতেই এমন বিস্তীর্ণ পাইপের জাল। এই ধরুণ ভারতেই আমাদের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস অর্গানাইজেশন (ONGC) প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটারের বেশী পাইপলাইন অপারেট করে। তাছাড়া আছে GAIL এর প্রায় ১৭ হাজার, Indian Oil প্রায় ২০ হাজার, HPCL প্রায় ৫ হাজার, Oil India প্রায় ১২০০ কিলোমিটার পাইপলাইন। এই পাইপ কখনও মরুভূমির বুক চিরে, কখনও জঙ্গলের তলা দিয়ে, কখনও নদী-খাঁড়ির নিচ দিয়ে চলে যায় নিঃশব্দে। আর ঠিক এইখানেই তেল চুরির গল্পের শুরু। হাজার হাজার কিলোমিটার পাইপ আপনি কী করে পাহারা দেবেন! ... ...
তিন তাসের জুয়ার কথা ভাবুন। মাটিতে বসে একজন তিনটে তাস উল্টেপাল্টে সাজায়, লাল টেক্কাটা কোথায় ধরতে পারলেই দ্বিগুণ টাকা। এখানে হাতের কারসাজি, মানে যে "থ্রো"-তে চোখের সামনে দিয়ে তাস বদলে যায় সেটা আসলে “বিভ্রান্তির সূত্র”: আপনি যা দেখতে চাইছেন সেই দিকেই চোখ আটকে থাকে, আর ঠিক তখনই আসল কাজটা হয়ে যায় আড়ালে। ভিড়ের ভেতর থেকে যে লোকটা বারবার জিতে যায়, সে সাজানো খেলুড়ে, মানে “পালের সূত্র”: "অন্যরা তো জিতছে, তবে আমি নই কেন?" আপনার নিজের যে লোভটা আপনাকে টেবিলের দিকে টানে, সেটা “প্রয়োজন-ও-লোভের সূত্র”। আর মজার ব্যাপার, অনেক সময় খেলুড়ে আপনাকে ফিসফিস করে বলে, চলুন দুজনে মিলে আসল লোকটাকে ঠকাই, অর্থাৎ আপনাকেই সামান্য অসৎ হতে প্ররোচিত করা হয়, যাতে ঠকে যাওয়ার পর লজ্জায় পুলিশের কাছে যেতে না পারেন। এটাই “বেআইনি-সংসর্গের সূত্র”, ঠকবাজের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বর্ম। ... ...
দৃশ্যটা এখন প্রায় ঘরোয়া হয়ে উঠেছে। কোনো এক অলস দুপুরে ফোন বাজে, ওপারে ভারী, দাপুটে গলা, ঠিক যেন সরকারি দপ্তরের বড়বাবু। "আপনার আধারের সঙ্গে যুক্ত একটা পার্সেল মুম্বই কাস্টমসে আটক হয়েছে। তাতে পাসপোর্ট, কয়েকটা এটিএম কার্ড, আর কিছু নিষিদ্ধ জিনিস পাওয়া গেছে। বিষয়টা এখন নার্কোটিক্স বিভাগে চলে গেছে। আপনি কি এখন একা, কথা বলার মতো জায়গায় আছেন?" যিনি ফোনটা পান, তিনি হয়তো জীবনে মুম্বইতে কোনো পার্সেল পাঠাননি, পাসপোর্টটা দিব্যি ড্রয়ারে শোয়ানো আছে। তবু "কার্ড", "নার্কোটিক্স", "আটক" শব্দগুলো কানে ঢোকামাত্র শরীরের ভেতরটা যুক্তির অপেক্ষা না করেই একবার ঠান্ডা স্রোত পাঠিয়ে দেয়। বুদ্ধি ফিরতে সময় লাগে বড়জোর কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু ওই কয়েক সেকেন্ডই এই গোটা গল্পের বীজ যাকে বলে। সেই সরু ফাঁকটা, যেটা দিয়ে যুক্তিকে টপকে ঠকবাজ সোজা বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে। ... ...
২০২৪ সালে শারীরবিদ্যায় ইগ নোবেল পেলেন একদল জাপানি ও মার্কিন গবেষক তাঁদের এই আবিষ্কারের জন্য যে বহু স্তন্যপায়ী প্রাণী আসলে মলদ্বার দিয়েও অক্সিজেন নিতে পারে! গল্পের আছে একটা মাছ। লোচ নামে একরকম তলার-দিকে-থাকা মাছ আছে, যারা কম-অক্সিজেনের ঘোলা জলে দিব্যি বেঁচে থাকে। কীভাবে? তারা মাঝেমধ্যে জলের উপরে উঠে এসে খানিকটা বাতাস গিলে নেয়, আর সেই বাতাসের অক্সিজেন তাদের অন্ত্রের দেয়াল দিয়ে সরাসরি রক্তে মিশে যায়। ফুলকা যতটুকু দিতে পারে না, অন্ত্র সেটুকু পুষিয়ে দেয়। এই 'অন্ত্র দিয়ে শ্বাস' ব্যাপারটা কেবল লোচেরই একচেটিয়া নয় - সমুদ্র-শশা আর কিছু কচ্ছপের ক্ষেত্রেও একই কৌশল দেখা যায়। প্রকৃতি এই সমাধানটা একাধিকবার আলাদা আলাদা করে বার করেছে। ... ...
প্রচলিত কথায় আছে 'সৌন্দর্য দর্শকের চোখে', অর্থাৎ কে সুন্দর, তা নাকি নিতান্তই আমাদের সংস্কৃতি, শিক্ষা আর অভ্যাসের ব্যাপার। বিজ্ঞাপন যাকে সুন্দর বলে শেখায়, আমরা তাকেই সুন্দর ভাবি। ২০০৩ সালের জীববিজ্ঞানের ইগ নোবেল এই ধারণাটায় একটা ছোট্ট অথচ অস্বস্তিকর ধাক্কা দেয়, আর ধাক্কাটা দেয় একদল মুরগি! গবেষণাটার নাম 'চিকেনস প্রেফার বিউটিফুল হিউম্যানস', অর্থাৎ 'মুরগিরা সুন্দর মানুষ পছন্দ করে'। ছাপা হয়েছিল হিউম্যান নেচার পত্রিকায়, ২০০২ সালে। ... ...
বাইবেলের ‘বুক অফ ড্যানিয়েল’-এ একটা চমৎকার স্বপ্নের বর্ণনা আছে কোথায় যেন শুনেছিলাম। ব্যাবিলনের রাজা নেবুচাদনেজার স্বপ্নে দেখলেন এক প্রকাণ্ড মূর্তি, মাথাটা খাঁটি সোনার, বুক রুপোর, পেট পিতলের, আর পা দুটো লোহায় মেশানো কাদামাটির। একটা ছোট্ট পাথর এসে সেই কাদার পায়ে লাগতেই গোটা মূর্তি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। ইংরেজিতে ‘ফিট অফ ক্লে’ কথাটা এসেছে ওখান থেকেই আর আমার মনে হয়, মানুষের তৈরি যাবতীয় ঠাকুর-দেবতার এর চেয়ে ভালো বর্ণনা আজও কেউ দিতে পারেনি। সোনার মাথা আমরা সবাই দেখি, মানে সেই দেবতাদের করা গোলটা, বিখ্যাত সমীকরণটা, যুগান্তকারী কবিতাটা। কাদার পা-টা দেখা যায় না, কারণ ওটা ঢাকা থাকে মালায়, ধূপের ধোঁয়ায়, আর আমাদের নিজেদের না-দেখতে-চাওয়ায়। ... ...
২০১৭ সালের পদার্থবিদ্যার ইগ নোবেল পেলেন ফরাসি পদার্থবিদ মার্ক-আঁতোয়ান ফারদাঁ, এক অমর প্রশ্নের মীমাংসা করে - বিড়াল কি একই সঙ্গে কঠিন এবং তরল হতে পারে? গল্পটার শুরু ইন্টারনেটে। আপনি কি দেখেছেন সেই সব ছবি যেখানে বিড়াল বয়ামের ভেতর ঢুকে বয়ামের আকার নিয়েছে, সিঙ্কের মধ্যে গলে গিয়ে সিঙ্কের আকার নিয়েছে, ওয়াইন গ্লাসে বসে গ্লাসের আকার নিয়েছে? এই ছবিগুলো নিয়ে ইন্টারনেটে রসিকতা চলছিল, 'বিড়াল আসলে তরল' আর সেই রসিকতা চোখে পড়েই ফারদাঁ প্রথমে হেসেছিলেন। তারপর, পদার্থবিদ হিসেবে, ভেবেছিলেন, আচ্ছা, প্রশ্নটাকে যদি সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে দেখি? ... ...
ভদ্রলোকের নাম জুলিয়ান সাইমন - ইনি কিন্তু গোদা, বাঁধা-ছকের অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। নিজেকে বলতেন ‘অপ্রথাগত অর্থনীতিবিদ’, আর মজা করে স্বীকার করতেন যে জীবনে ডেমোগ্রাফির একটাও ক্লাস করেননি, আর অর্থনীতির ক্লাস করেছেন সাকুল্যে দুটো! স্নাতক স্তরে তাঁর বিষয় ছিল মনোবিজ্ঞান, ডক্টরেট বিজনেস অ্যাডমিনিষ্ট্রেশনে। নিউ ইয়র্কে খানিকদিন বিজ্ঞাপনের ব্যবসা, তারপর ডাকযোগে জিনিসপত্র বেচার (মেল-অর্ডার) কারবার চালিয়ে শেষে তিনি এসে পড়েছিলেন অধ্যাপনায়। এই এলোমেলো, নানা-লাইনে-ঘোরা জীবনটাই বোধহয় তাঁকে বাঁধা ছকের বাইরে ভাবতে শিখিয়েছিল। বাজার আর মানুষের আচরণ - এই দুটো তিনি বুঝতেন বেশ ভালো ভাবে। সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি, ১৯৬৫ কি ১৯৬৬। এক পার্টিতে সাইমন কারও মুখে একটা দুঃখের কাহিনি শুনছিলেন - কীভাবে ভদ্রলোককে হঠাৎ প্লেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর তার ফলে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। সেই আমলে ব্যাপারটা এমনই ছিল - প্লেনে বেশি লোক হয়ে গেলে এয়ারলাইন্স নিজের খেয়ালখুশি মতো কিছু যাত্রীকে বেছে নিয়ে বলত, “আপনি আজ যেতে পারবেন না।” কোনও দর-দাম নেই, কোনও রফা নেই - নেহাত কপাল খারাপ। পরদিন সকালে দাড়ি কামাতে কামাতে সাইমনের মাথায় হঠাৎ একটা কথা খেলে গেল - এর চেয়ে ভালো উপায় নিশ্চয়ই আছে। জোর করে কাউকে নামানোর দরকারটাই বা কী? এমন একটা বাজার তো বসানো যায়, যেখানে অপেক্ষা করতে যাঁর সবচেয়ে কম আপত্তি, তিনিই স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াবেন। ... ...