২০২৪ সালে শারীরবিদ্যায় ইগ নোবেল পেলেন একদল জাপানি ও মার্কিন গবেষক তাঁদের এই আবিষ্কারের জন্য যে বহু স্তন্যপায়ী প্রাণী আসলে মলদ্বার দিয়েও অক্সিজেন নিতে পারে! গল্পের আছে একটা মাছ। লোচ নামে একরকম তলার-দিকে-থাকা মাছ আছে, যারা কম-অক্সিজেনের ঘোলা জলে দিব্যি বেঁচে থাকে। কীভাবে? তারা মাঝেমধ্যে জলের উপরে উঠে এসে খানিকটা বাতাস গিলে নেয়, আর সেই বাতাসের অক্সিজেন তাদের অন্ত্রের দেয়াল দিয়ে সরাসরি রক্তে মিশে যায়। ফুলকা যতটুকু দিতে পারে না, অন্ত্র সেটুকু পুষিয়ে দেয়। এই 'অন্ত্র দিয়ে শ্বাস' ব্যাপারটা কেবল লোচেরই একচেটিয়া নয় - সমুদ্র-শশা আর কিছু কচ্ছপের ক্ষেত্রেও একই কৌশল দেখা যায়। প্রকৃতি এই সমাধানটা একাধিকবার আলাদা আলাদা করে বার করেছে। ... ...
প্রচলিত কথায় আছে 'সৌন্দর্য দর্শকের চোখে', অর্থাৎ কে সুন্দর, তা নাকি নিতান্তই আমাদের সংস্কৃতি, শিক্ষা আর অভ্যাসের ব্যাপার। বিজ্ঞাপন যাকে সুন্দর বলে শেখায়, আমরা তাকেই সুন্দর ভাবি। ২০০৩ সালের জীববিজ্ঞানের ইগ নোবেল এই ধারণাটায় একটা ছোট্ট অথচ অস্বস্তিকর ধাক্কা দেয়, আর ধাক্কাটা দেয় একদল মুরগি! গবেষণাটার নাম 'চিকেনস প্রেফার বিউটিফুল হিউম্যানস', অর্থাৎ 'মুরগিরা সুন্দর মানুষ পছন্দ করে'। ছাপা হয়েছিল হিউম্যান নেচার পত্রিকায়, ২০০২ সালে। ... ...
বাইবেলের ‘বুক অফ ড্যানিয়েল’-এ একটা চমৎকার স্বপ্নের বর্ণনা আছে কোথায় যেন শুনেছিলাম। ব্যাবিলনের রাজা নেবুচাদনেজার স্বপ্নে দেখলেন এক প্রকাণ্ড মূর্তি, মাথাটা খাঁটি সোনার, বুক রুপোর, পেট পিতলের, আর পা দুটো লোহায় মেশানো কাদামাটির। একটা ছোট্ট পাথর এসে সেই কাদার পায়ে লাগতেই গোটা মূর্তি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। ইংরেজিতে ‘ফিট অফ ক্লে’ কথাটা এসেছে ওখান থেকেই আর আমার মনে হয়, মানুষের তৈরি যাবতীয় ঠাকুর-দেবতার এর চেয়ে ভালো বর্ণনা আজও কেউ দিতে পারেনি। সোনার মাথা আমরা সবাই দেখি, মানে সেই দেবতাদের করা গোলটা, বিখ্যাত সমীকরণটা, যুগান্তকারী কবিতাটা। কাদার পা-টা দেখা যায় না, কারণ ওটা ঢাকা থাকে মালায়, ধূপের ধোঁয়ায়, আর আমাদের নিজেদের না-দেখতে-চাওয়ায়। ... ...
২০১৭ সালের পদার্থবিদ্যার ইগ নোবেল পেলেন ফরাসি পদার্থবিদ মার্ক-আঁতোয়ান ফারদাঁ, এক অমর প্রশ্নের মীমাংসা করে - বিড়াল কি একই সঙ্গে কঠিন এবং তরল হতে পারে? গল্পটার শুরু ইন্টারনেটে। আপনি কি দেখেছেন সেই সব ছবি যেখানে বিড়াল বয়ামের ভেতর ঢুকে বয়ামের আকার নিয়েছে, সিঙ্কের মধ্যে গলে গিয়ে সিঙ্কের আকার নিয়েছে, ওয়াইন গ্লাসে বসে গ্লাসের আকার নিয়েছে? এই ছবিগুলো নিয়ে ইন্টারনেটে রসিকতা চলছিল, 'বিড়াল আসলে তরল' আর সেই রসিকতা চোখে পড়েই ফারদাঁ প্রথমে হেসেছিলেন। তারপর, পদার্থবিদ হিসেবে, ভেবেছিলেন, আচ্ছা, প্রশ্নটাকে যদি সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে দেখি? ... ...
ভদ্রলোকের নাম জুলিয়ান সাইমন - ইনি কিন্তু গোদা, বাঁধা-ছকের অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। নিজেকে বলতেন ‘অপ্রথাগত অর্থনীতিবিদ’, আর মজা করে স্বীকার করতেন যে জীবনে ডেমোগ্রাফির একটাও ক্লাস করেননি, আর অর্থনীতির ক্লাস করেছেন সাকুল্যে দুটো! স্নাতক স্তরে তাঁর বিষয় ছিল মনোবিজ্ঞান, ডক্টরেট বিজনেস অ্যাডমিনিষ্ট্রেশনে। নিউ ইয়র্কে খানিকদিন বিজ্ঞাপনের ব্যবসা, তারপর ডাকযোগে জিনিসপত্র বেচার (মেল-অর্ডার) কারবার চালিয়ে শেষে তিনি এসে পড়েছিলেন অধ্যাপনায়। এই এলোমেলো, নানা-লাইনে-ঘোরা জীবনটাই বোধহয় তাঁকে বাঁধা ছকের বাইরে ভাবতে শিখিয়েছিল। বাজার আর মানুষের আচরণ - এই দুটো তিনি বুঝতেন বেশ ভালো ভাবে। সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি, ১৯৬৫ কি ১৯৬৬। এক পার্টিতে সাইমন কারও মুখে একটা দুঃখের কাহিনি শুনছিলেন - কীভাবে ভদ্রলোককে হঠাৎ প্লেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর তার ফলে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। সেই আমলে ব্যাপারটা এমনই ছিল - প্লেনে বেশি লোক হয়ে গেলে এয়ারলাইন্স নিজের খেয়ালখুশি মতো কিছু যাত্রীকে বেছে নিয়ে বলত, “আপনি আজ যেতে পারবেন না।” কোনও দর-দাম নেই, কোনও রফা নেই - নেহাত কপাল খারাপ। পরদিন সকালে দাড়ি কামাতে কামাতে সাইমনের মাথায় হঠাৎ একটা কথা খেলে গেল - এর চেয়ে ভালো উপায় নিশ্চয়ই আছে। জোর করে কাউকে নামানোর দরকারটাই বা কী? এমন একটা বাজার তো বসানো যায়, যেখানে অপেক্ষা করতে যাঁর সবচেয়ে কম আপত্তি, তিনিই স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াবেন। ... ...
১৯৭৯ সালে এক গবেষণার ফল বের হল যা দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল! তাঁরা দেখলেন, ম্যানেজারিয়াল পদের জন্য দরখাস্ত করলে সুন্দরী মহিলা প্রার্থীরা কম সুন্দরী প্রার্থীদের চেয়ে খারাপ মূল্যায়ন পাচ্ছেন। পুরুষদের বেলায় ঠিক উল্টো - সুন্দর পুরুষ সব পদেই সুবিধে পাচ্ছেন। এই ব্যাপারটার নাম হয়ে গেল 'বিউটি ইজ বিস্টলি', সৌন্দর্যই হিংস্র! পরে আরও পরিষ্কার দেখা গেল, সুন্দরী মহিলারা বিপদে পড়েন বিশেষত সেইসব চাকরির ক্ষেত্রে যেগুলো সমাজের চোখে 'পুরুষালি' এবং তখন তাঁদের ঘাড়ে চাপানো হয় একগুচ্ছ বিদঘুটে বিশেষণ: ধূর্ত, স্বার্থপর, ঝগড়াটে, ছলনাময়ী। তাহলে দাঁড়ালো গিয়ে সৌন্দর্য একই সঙ্গে কোথাও ঢোকার টিকিট আবার ফাঁদ! কোন দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, তার ওপর নির্ভর করে ঠিক হবে ওটা আপনাকে ঢুকতে দেবে নাকি ঠেলে বার করে দেবে। ... ...
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে গ্রিসের পেলোপনেসাস উপদ্বীপ। মাইসিনীয় সভ্যতার কারিগরেরা ব্রোঞ্জের একটা তার বাঁকিয়ে এমন একটা জিনিস বানালেন, যেটা দেখতে অবিকল আজকের দিনের সেই জিনিসটার মত যার গল্প আজকে করব। একটা সূচালো মাথা, একটা কুণ্ডলী-স্প্রিং, আর একটা আঁকশি যেখানে মাথাটা আটকে থাকে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা একে বলেন 'ফিবুলা'। প্রথম ধরনটার নাম 'ভায়োলিন-বো ফিবুলা', কারণ বাঁকটা বেহালার ছড়ের মতো চ্যাপ্টা। ... ...
ওদিকে চেহারার বাজারদর মাপার কাজটা করেছেন অর্থনীতিবিদরা। ড্যানিয়েল হ্যামারমেশ প্রায় গোটা কেরিয়ার এই নিয়ে খরচ করেছেন – ‘পালক্রোনমিক্স’ বলে ইয়ার্কি করে ডাকা হয় জিনিসটাকে, সৌন্দর্যের অর্থনীতি। তাঁর হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় এক জন সুশ্রী মানুষ গোটা কর্মজীবনে গড়ে প্রায় দুই লক্ষ তিরিশ হাজার ডলার বেশী রোজগার করেন গড়পড়তা-থেকে-কম-দেখতে সহকর্মীর তুলনায়। শতাংশের হিসেবটা ছোট – দু-তিন-চার শতাংশ – কিন্তু তিরিশ বছর ধরে জমলে আর ছোট থাকে না। সুন্দর লোকেরা চাকরী বেশী পান, প্রোমোশন বেশী পান, ব্যাঙ্কে লোন পান সহজে, সুদটাও তাঁদের দিতে হয় একটু কম। এ জিনিসও আমি নিজে সামনা সামনি দেখেছি – পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরতে গিয়ে কত জিনিসের ডিসকাউন্ট পেয়েছি কেনার সময়, অনেক সময় না চাইতেই, কেবল সাথে সুন্দরী একজন ছিল বলে! ... ...
আমি এখন এমন এক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি যেটাকে আমি সবসময়ই আমার জন্য বেশ সম্ভব বলে মনে করতাম, যদিও আমি সাধারণত এর সম্ভাবনা ১০:১-এর বিপরীতে ধরতাম। আমি শীঘ্রই এক তরুণ পুরুষের সাথে যৌন অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হতে চলেছি। ব্যাপারটা কীভাবে ফাঁস হয়ে গেল তা একটা দীর্ঘ ও মনোগ্রাহী ঘটনা, যেটা নিয়ে একদিন একটা ছোটগল্প লিখে ফেলতে হবে - কিন্তু এখন তোমাকে সেটা বলার সময় নেই। সন্দেহ নেই যে এই সব মিটে যাবার পর আমি একজন ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠব, কিন্তু সেই ভিন্ন মানুষটা ঠিক কে হবে সেটা এখনো জানি না। ... ...
সুশির জন্ম হয়েছিল প্রিজার্ভেশনের প্রয়োজনে, আনন্দের জন্য নয়। শুনতে অবাক লাগলেও এমনটাই নাকি খাদ্য ইতিহাস নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করেন তাঁদের দাবী! আজকের দিনে সুশি রেষ্টুরান্ট জাপানের বাইরে অনেক জায়গাতেই বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই খাবারের শুরু হয়েছিল একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে, মাছ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে। প্রায় ৭০০ থেকে ১০০০ বছর আগে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (সম্ভবত বর্তমান মিয়ানমার বা মেকং নদী অঞ্চলে) জেলেরা আবিষ্কার করেন যে কাঁচা মাছকে ভেজানো ভাতের সাথে মিশিয়ে রাখলে মাছ দীর্ঘদিন ভালো থাকে। ভাতের গাঁজন প্রক্রিয়া মাছকে পচন থেকে রক্ষা করত। একসময় এই ভাত ফেলে দিয়ে শুধু মাছটুকুই খাওয়া হতো। ... ...