যতবারই ভাবি প্রিয় ক্যুজিনগুলোর লিষ্টটা ফাইন্যাল করে ফেলতেই হবে, ততবারই কঠিন সব চ্যালেঞ্জের সামনে পড়ে সেই লিষ্ট আর বানানো হয় না! টপে কে থাকবে সেটা পাল্টায় না – ইতালিয়ান – কিন্তু তার পরের র্যাঙ্কিং নিয়ে দ্বিধায় ভুগি! থাই, মেক্সিকান, ভিয়েতনামিজ, আরবিক, নাকি জাপানিজের পুরোটা না হলেও সুশি – এই সব নিয়ে মন দোলচাল হতেই থাকে। আবার ভালো কোন ডিস খেলে সেই ক্যুজিনেরই প্রেমে পড়তে মন চায় – তা সে ভালো আর্জেনটিনিয়ান স্টেকই হোক, বা ফ্রেঞ্চ ডেসার্ট, বা ইথোপিয়ান, লেবানিজ, সাউথ আমেরিকান কিছু ডিস – যাই হোক না কেন। তাই সব ভেবে দেখলাম লিষ্টি বানিয়ে আর কি হবে! চাপ না নিয়ে খেয়ে দেয়ে মন ভরানো যাক!
চাকুরীর কাজে এদিক ওদিক বেশ ভালোই ঘুরতে হয় – নিজের বেড়াতে যাওয়া তো ছেড়েই দিলাম। তো সব মিলিয়ে নানাবিধ ক্যুজিন এবং রেষ্টুরান্ট ট্রাই করার চান্স কম থাকে না সেই ভাবে দেখলে! ধরুণ তিন সপ্তাহের জন্য গেলাম কোথাও, সেই ২১ দিনে ধরুণ গিয়ে মিনিমাম ১২-১৩টা আলাদা রেষ্টুরান্টে খাওয়া হয়ে যায়। যদি আশেপাশে তেমন রেষ্টুরান্টে থাকে আর কি! এমন সব জায়গায়ও গেছি যেখানে সেই রিসর্টের রেষ্টুরান্ট ছাড়া আশে পাশে আর কিছু নেই! অবশ্য এটা বেশি হয় নিজে কোথাও বেড়াতে গেলে – রিসর্টে থাকলে। বিজনেস ট্রিপে মূল শহরে থাকলে আর যাই হোক আশেপাশে রেষ্টুরান্টের অভাব হয় না তেমন!
আজকে তেমনি একটা বিজেনেস ট্রিপে খাওয়াদাওয়ার কয়েকটা গল্প করা যাক। আমেরিকার হিউস্টন শহরে গেলে প্রতিবারেই যে জাপানি রেষ্টুরান্টে অন্তত একবার হলেও ঢুঁ দিই সেটা হল মেমোরিয়াল ড্রাইভের 'সুসি জিন'। জাপানে গিয়ে সুশি খাওয়া নিয়ে পরে বিস্তারে গল্প করা যাবেক্ষণ – আজকে হিউষ্টন শহরের, তথা আমেরিকার সুশি প্রীতি নিয়ে কিছু কথা হয়ে যাক।
জাপানের কিছু কোম্পানীর সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের কোলাবরেশন আছে। আমেরিকায় একটা বিশেষ কনফারেন্স হয় প্রতি বছর, সেখানে জাপান থাকে ওরা আসে, আমরা যাই নানা দেশ থেকে। তো তাদের সাথে আমাদের কোম্পানীর ট্রাডিশন্যাল ডিনার থাকে একদিন। সেই গল্পও লিখবো একদিন – জাপানীরা অতিথিদের টেক-কেয়ার খুব ভালো ভাবে করে। ওদের রেষ্টুরান্ট চয়েসও অদ্ভূত – সে শহরে আমদের মিটিং হয়, সেই শহরে বিশেষ নামকরা ঐতিহ্যবাহী রেষ্টুরান্টে ব্যবস্থা করে। তেমন কিছু না পাওয়া গেলে জনপ্রিয় কোন রেষ্টুরান্টে যাওয়া হয় একসাথে।
কিছু বছর আগে আমি এমনই এক মিটিং এ হিউষ্টন শহরে বসে আমাদের জাপানি বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা তোমরা জাপানী অথেন্টিক সুশির কাছাকছি যেতে পারে এমন কোন রেষ্টুরান্ট রকমেন্ড করতে পারো? তা ওরাই সন্ধান দিয়েছিল 'সুশি জিন' – এর। পরে দেখলাম আমার হিউষ্টন বাসী কলিগরা অনেকেই এই রেষ্টূরান্টে রেগুলার – এবং তাদের পছন্দেরও বটে। জানা গেল এই ছোট্ট রেষ্টুরান্টটি অনেক দিন ধরেই হিউস্টনবাসীদের মন ভরাচ্ছে!
'সুশি জিন' রেষ্টুরান্টের মালিকের দর্শন বেশ সিম্পল শুনলাম। টোকিওর মাছের বাজার থেকে মাছ ধরার পরের দিনই কিনে সরাসরি এয়ার জাপান ফ্লাইটে হিউস্টনে পাঠানো। অর্থাৎ আপনার প্লেটে যে হামাচি বা স্যামন আসছে, সেটি সমুদ্র থেকে ধরার মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে! হিউস্টনের অনেক সুশি বার সস্তা মাছ দিয়ে কাজ চালায়, কিন্তু সুসি জিনের মালিক সেই পথে যাননি। তিনি চেয়েছিলেন হিউস্টনে খাঁটি জাপানি সুশির স্বাদ তুলে ধরতে, আর সেই লক্ষ্যেই তিনি নিজের মাছ আমদানির ব্যবস্থা করেন এবং চারজন জাপানি সুশি মাস্টার নিয়ে গড়ে তোলেন সুশি জিন। ও আচ্ছা টোকিওর মাছের বাজারের কথা বলতে মনে পড়ল, সেও এক এলাহি ব্যাপার। সেখানেও গেছি – সেই নিয়ে না হয় আরেকদিন লেখা যাবে। গল্প থেকে গল্প আসে – ঘটনা থেকে আরো ঘটনা, সুতোর মত খুলতে থাকে সব। ডাইভার্ট হয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল!
সেদিন 'সুশি জিন' এ কি খেলাম তার বিস্তারে যাবার আগে সুশি এবং আমেরিকায় সুশি নিয়ে কিছু আলোচনা সেরে নেওয়া যাক। সেদিন সুশির মার্কেট কেমন বর্তমান বিশ্বে সেই নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ আমার – যদিও তেমনটা হবার কথা ছিল না। বিশ্বে প্রতিদিন আনুমানিক ৩,৭৭৫ কোটি টাকার সুশি বিক্রি হয় বলে দাবি দেখলাম! জাপানের বাইরে আমেরিকাতেই সুশি শিল্পের বাজারমূল্য সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২২,০০০ কোটি টাকা বছরে! 'সুসি জিন' এ যতবারেই গেছি, ততবারি যে ভীড় আর আমেরিকানদের খাবার বহর দেখেছি তাতে ২২ হাজার কোটির গল্প সত্যি বলেই মনে হয়!
আচ্ছা এটা জানেন তো যে সুশির জন্ম হয়েছিল প্রিজার্ভেশনের প্রয়োজনে, আনন্দের জন্য নয়। শুনতে অবাক লাগলেও এমনটাই নাকি খাদ্য ইতিহাস নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করেন তাঁদের দাবী! আজকের দিনে সুশি রেষ্টুরান্ট জাপানের বাইরে অনেক জায়গাতেই বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই খাবারের শুরু হয়েছিল একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে, মাছ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে। প্রায় ৭০০ থেকে ১০০০ বছর আগে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (সম্ভবত বর্তমান মিয়ানমার বা মেকং নদী অঞ্চলে) জেলেরা আবিষ্কার করেন যে কাঁচা মাছকে ভেজানো ভাতের সাথে মিশিয়ে রাখলে মাছ দীর্ঘদিন ভালো থাকে। ভাতের গাঁজন প্রক্রিয়া মাছকে পচন থেকে রক্ষা করত। একসময় এই ভাত ফেলে দিয়ে শুধু মাছটুকুই খাওয়া হতো।
এই পদ্ধতি ধীরে ধীরে চীন হয়ে জাপানে পৌঁছায়। জাপানে এর নাম হয় নারে-জুশি। শুধু ইতিহাসে নয়, সেই আমলের শাসকদের রাজকীয় করের তালিকায়ও মাছ-ভাতের এই মিশ্রণের উল্লেখ পাওয়া যায়! বুঝতেই পারছেন আমি নিজে সেই হতিহাসের বই পড়ে দেখি নি! যারা এই নিয়ে লিখেছেন তাঁদের লেখায় উল্লেখিত হয়েছে এই ব্যাপারগুলি। জাপানের সবচেয়ে পুরনো সুশি উল্লেখ নাকি পাওয়া যায় ৭১৮ খ্রিস্টাব্দের একটি আইনি দলিলে, সেখানেই রাজকীয় কর হিসেবে আওয়াবি মাছের সুশি দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ সুশির কেস জাপানের সাথে বহুদিন জড়িয়ে আছে।
সুশি-জিন রেষ্টুরান্টের মেনু-র একটা পাতা
এরপর ইদো পিরিওডে (১৬০৩–১৮৬৮), টোকিও তখন ইদো নামে পরিচিত, তখন বন্দরনগরী হিসেবে জাঁকিয়ে বসছে সে। সামুদ্রিক মাছ তখন প্রচুর, আর মানুষের হাতে রান্নার সময় কম। এই সময়েই জন্ম নেয় নিগিরি সুশি - হাতে চেপে তৈরি ভাতের বল, উপরে কাঁচা মাছের পাতলা স্লাইস। সেই যুগে রাস্তার ধারে ঠেলাগাড়িতে বিক্রি হতো, এখন ফাস্টফুডের মতো! সেই ইদোর রাস্তার খাবারই আজ বিশ্বের অন্যতম পরিশীলিত রন্ধনশৈলী হিসেবে পরিচিত।
সুশি নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে একটি ডায়লগ পড়েছিলাম, লিখে রেখেছি, এখানে সেই ফাঁকে কোট করে দিই, "সুশি শুধুমাত্র একটি খাবার নয়, বরং এটি একটি দর্শন। মাছের স্বাদকে সম্মান করা, সময়কে সম্মান করা, প্রকৃতিকে সম্মান করা”। খুব একটা দ্বিমতের জায়গা নেই স্বাদ আর সময় নিয়ে; তবে প্রকৃতি-কে কিভাবে সম্মান করা হয় সেটা একটু ধোঁয়াটে। একটা ব্যাখ্যা হতে পারে যে প্রকৃতি যেভাবে তোমাকে দিয়েছে মাছ, সেইভাবেই খেয়ে ফেল – বেশী কারিকুরি করতে হবে না!
তো সেই সুশি কীভাবে একেবারে জাপান থেকে এসে আমেরিকা জয় করল, তারও গল্প আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় জাপানি অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৬০-এর দশকে লস অ্যাঞ্জেলেসের লিটল টোকিও এলাকায় প্রথম আমেরিকান সুশি বার খোলা হয়। কিন্তু সাধারণ আমেরিকানরা কাঁচা মাছ খেতে রাজি ছিলেন না। তখন এক জাপানি শেফ এক অসাধারণ কাজ করলেন, জন্ম দিলেন ক্যালিফোর্নিয়া রোলের। এই রোলে কাঁচা মাছের বদলে দেওয়া হলো সেদ্ধ কাঁকড়া বা ইমিটেশন ক্র্যাব, অ্যাভোকাডো আর শসা। ভেতরে মাছ, বাইরে ভাত, উলটো করে মোড়ানো, যাকে বলে ইনসাইড-আউট রোল। আমেরিকানরা এটি লুফে নিলেন। ঠিক যেমন ভাবে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে শুরু হয়ে সাহেবরা প্রায় একই সময়ে চিকেন টিক্কা মশালা নিজেদের ঘরে ঢুকিয়ে ফেলছিল নিয়মিত। ক্যালিফোর্নিয়া রোল ছিল সুশির এন্ট্রি-পয়েন্ট যাকে বলে। একবার এর স্বাদ পেয়ে মানুষ ধীরে ধীরে কাঁচা মাছের দিকেও এগিয়ে গেলেন। তো বুঝতেই পারছেন ক্যালিফোর্নিয়া রোল জাপানে উদ্ভাবিত হয়নি, তাই আমি প্রথমবার জাপানে গিয়ে ট্রাডিশনাল সুশি রেষ্টুরান্টে গিয়ে এ জিনিস খুঁজলে কিঞ্চিত ভ্রু-কুঞ্চনের মুখোমুখি হব সেটা বলাই বাহুল্য! তবে কিনা আজকের দিনে চিকেন টিক্কা মশালা যেমন ভারতীয় খাবারের প্রতীক হয়ে গেছে সারা বিশ্বে, ঠিক তেমনই ক্যালিফোর্নিয়া রোলটিও সুশির প্রতীক হয়ে গেছে। এবার একে আপনি সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য কি বলবেন সেটা আপনার বিবেচনায়!
এর পর যা হয় আর কি – আমেরিকার মানুষ মানুষ দুম করে স্বাস্থ্য-সচেতনতার শিকার হতে শুরু করল ১৯৮০ এর দশকে। মানুষকে টের পাওয়ানো হল যে কাঁচা মাছ প্রোটিনে ভরপুর, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ, ক্যালোরিতে কম। সুশি হয়ে উঠল স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতীক। নব্বইয়ের দশকে হলিউডের তারকারা সুশি খেতে শুরু করলেন, আর মিডিয়ায় সুশির জয়জয়কার শুরু হলো। তারপর সোশ্যাল মিডিয়া চলে আসার পর কি হল সেটা বলাই বাহুল্য! আজ আমেরিকায় প্রায় ৪,০০০-এরও বেশি সুশি রেষ্টুরান্ট আছে।
সুশি কেন এত জনপ্রিয় কেন? ক্যালোরি ইত্যাদি নিয়ে যারা মাথা ঘামায় না, এই আমার মত – তাদের কাছেও এত প্রিয় হল কেন? এর পিছনে বিজ্ঞানের কি কারসাজি আছে কিছু? পেটখারাপ আর ওজন বাড়া ছাড়া খাবারের পিছনে বিজ্ঞান খোঁজাও চাপের! তবে চাপ কবে আর মানুষকে এক্সপ্লোর করার থেকে আটকে রেখেছে! সুশির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়াও শুরু হল - কাঁচা মাছে থাকা গ্লুটামেট আমাদের মস্তিষ্কে উমামি সংকেত পাঠায়। ‘উমামি’ হল সেই পঞ্চম স্বাদ, যা মিষ্টি-নোনতা-টক-তেতোর বাইরে। উমামির বাংলা আমি জানি না, তবে দেখলাম কেউ কেউ লিখেছেন বাঙালির চেনা সর্ষে ইলিশ পাতিলেবুর সাথে খেলে নাকি ‘উমামি’ স্বাদ পাওয়া যায়। যাই হোক সুশির ভাতের সামান্য অ্যাসিডিটি মাছের ফ্যাটকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। ওয়াসাবির ঝাঁজ নাকের ভেতর দিয়ে মাথায় পৌঁছায়, যা মাছের সূক্ষ্ম সুবাসকে আরও তীক্ষ্ণ করে দেয়। কোন এক প্রকার সুশি খাবার পর আপনাকে কামড় দিয়ে নিতে হবে গারি বা আদার আচার-এ, যা নাকি আপনার স্বাদগ্রন্থিকে রিসেট করবে।
খাবারের গল্প হবে, ঐতিহ্যের কথা উঠবে আর হালকা কিছু বাড়াবাড়ি বা মিথ জুড়ে থাকবে না, সে কি হয় নাকি! ভাতের সাথে আপনি মাছ মুড়ে দিচ্ছেন, সেই স্কিল অর্জন করতে নাকি বহু বছর কেটে যায়! জাপানে একজন পূর্ণ সুশি শেফ বা ইতামায়ে হতে গেলে ন্যূনতম দশ বছরের প্রশিক্ষণ লাগে। প্রথম দুই বছর শুধু ভাত রান্না শেখা হয়। ভাতের তাপমাত্রা, জলের অনুপাত, ভিনেগারের পরিমাণ – ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় নিখুঁত না হলে বড় শেফ সন্তুষ্ট হন না! তারপর আসে মাছ কাটার কৌশল। একটি টুনা মাছকে পুরোপুরি ব্যবহারের জন্য নাকি তিরিশটিরও বেশি ধরণের কাটার টেকনিক জানতে হয়!
সেদিন ‘সুশি জিন’ রেষ্টুরান্টে সুশির সাথে সাশিমি-ও খেলাম। সাশিমি-কেই আসলে বলা হয় জাপানি রন্ধনশৈলীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ। সুশির সাথে সাশিমির পার্থক্য জানেন তো? সুশির সঙ্গে সাশিমির পার্থক্য হলো, সুশিতে ভাত থাকে, কিন্তু সাশিমি সম্পূর্ণ ভাতমুক্ত। এটি মাছের সবচেয়ে খাঁটি রূপ; শুধু মাছ, আর তার নিজস্ব স্বাদ। জাপানে "সাশিমি-গ্রেড" বলে একটি বিশেষ মান রয়েছে যেখানে মাছগুলো ধরার অল্প সময়ের মধ্যে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়।
সাশিমির ইতিহাস নাকি শুরু হয় জাপানের সেই মুরোমাচি যুগে (১৩৩৬–১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দ)। সেই আমলে জাপানি সমুদ্রতীরবর্তী গ্রামে জেলেরা সদ্য ধরা মাছ কাঁচাই কেটে খেত, না তো রান্না করা, না ছিল কোনো মশলার ব্যবহার। শুধু মাছ আর সামুদ্রিক নুন। সেই সিম্পল ব্যাপারটাই বিবর্তিত হতে হতে আজকের দিনের পরিশীলিত রন্ধনপ্রণালীতে পরিণত হয়েছে।
"সাশিমি" নামটি এসেছে দুটি জাপানি শব্দ থেকে - "সাশি" (ছুরি দিয়ে বিদ্ধ করা) এবং "মি" (শরীর বা মাংস)। পুরনো দিনে মাছ চেনার সুবিধার জন্য কাটা মাছের পাশে তার লেজের পাখনা বা একটি ছোট্ট টুকরো গেঁথে রাখা হতো, আর সেখান থেকেই এই নাম। জাপানি সংস্কৃতিতে সাশিমির মর্যাদা কিন্তু অন্য সব খাবারের চেয়ে আলাদা। কোনো বিয়ে বা কোনো উৎসবে সাশিমি প্রায় থাকবেই। এমনকি জাপানের ঐতিহ্যবাহী কাইসেকি (বহু-পদের আনুষ্ঠানিক রাতের খাবার) মেনুতে সাশিমি সবসময় প্রথম দিকের পদ হিসেবে পরিবেশিত হয়। কনসেপ্ট এই যে, প্রথম দিকে আমাদের স্বাদগ্রন্থি সবচেয়ে সতেজ থাকে, মাছের সূক্ষ্মতম স্বাদটুকুও তাই অনুভব করা যায়।
সাশিমির শুধু খেতে ভালো তাই নয় – সাশিমির প্লেট দেখতেও সুন্দর হয়। সাদা দাইকন র্যাডিশের সরু সুতোর মতো কাটা স্তর (সেন-গিরি কাট), সবুজ শিসো পাতার টুকরো, শসার গোল চাকতি, লেবুর পাতলা ফালি — এই সব উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় যে নকশা, তাকে বলে "কেনসাই"। তবে সাশিমির সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা অন্যভাবে দেখলে আকর্ষণও বলতে পারেন – সেটা হল গিয়ে, এই ডিসে লুকানোর কিছু নেই। কোনো সস বা কারি টাইপের কিছু নেই যা মাছের গন্ধ ঢাকবে, বা আপনি বেশী ভেজে বাসি মাছ চালিয়ে দিলেন, সে সব কিছুই চলবে না। মাছ যদি টাটকা না হয়, যদি মান ভালো না হয়, সাশিমিতে সেটা চট করেই ধরে ফেলা যায়। এই চ্যালেঞ্জের কারণেই সাশিমি তৈরি করা এত কঠিন।
সেদিন ‘সুশি-জিন’ রেষ্টুরান্টে খেলাম তো অনেক কিছুই। আপাতত সাথের ছবিতে সাদা ওভাল প্লেটের সাশিমি প্ল্যাটারে কি কি ছিল সেটা বলে নিই।

স্যামন সাশিমি: কমলা-গোলাপি রঙের পাতলা স্লাইস, মুখে দিতেই যাকে বাঙলায় বলে মাখনের মতো মিলিয়ে গেল। এই স্যামনের টাটকা স্বাদ সত্যিই দারুণ।
টুনা সাশিমি: গাঢ় লাল, পুরু স্লাইস। এটা তো জানেন নিশ্চয়ই যে সুশির দুনিয়ায় টুনা হলো গিয়ে রাজা।
হামাচি/ইয়েলোটেল সাশিমি: হালকা গোলাপি-সাদা রঙের এই মাছটি সামান্য মাখনের মতো টেক্সচারের। টোকিও থেকে ‘সুশি-জিন’ এর মালিক এই মাছ সরাসরি আনে আর তাই তার স্বাদও নাকি অন্যদের থেকে আলাদা।
স্ক্যালপ: প্লেটের উপরেই কাচের বিশেষ বাটিতে দিয়েছিল এটা, হালকা মিষ্টি স্বাদের।
পাশে যেমনটা দেখেছেন, ছিল ওয়াসাবি (সবুজ ঝাঁজালো পেস্ট), গারি (আদার আচার) আর সয়া সস।
পেছনের প্লেটে ছিল দুটি দারুণ খেতে সুশি রোল, একটি ক্রিস্পি টুনা রোল আর একটি সস-ঢালা বেকড রোল। এর উপরে টেরিয়াকি সস আর স্পাইসি মায়োর মিশেলে এক অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ ছড়িয়েছিল। তবে কিনা এই ফিউশন স্টাইল রোলগুলো মূলত আমেরিকান উদ্ভাবন, জাপানে এগুলো এতটা প্রচলিত নয়।
সুসি জিনের প্লেটে যে সাশিমি দেখেছিলাম, সেখানে কিন্তু জাপানি সাশিমির ঐতিহ্য তারা মেনে চলেছিল। স্যামনের কাটের ধরনটা লক্ষ্য করুন ছবিতে — এটি "হিরা-জুকুরি" পদ্ধতি, যেখানে মাছকে সামান্য কোণ করে মোটা করে কাটা হয় যাতে টেক্সচার পুরোপুরি বোঝা যায়। আর টুনার কাটটি ছিল "উসু-জুকুরি", যেটা অত্যন্ত পাতলা, প্রায় স্বচ্ছ।
সেদিনের ‘সুশি জিনে’ মিশে গিয়েছিল একদিকে টোকিও থেকে আনা নিখাদ সাশিমি, অন্যদিকে আমেরিকানভ ভার্শেনের রোল। এবার অনুমান করে নিন কেমন জমেছিল সেদিনের খাওয়া!