লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা
রচনাকাল : ১১ মে, ২০২৬
কলকাতা শহরের এক জীর্ণ বস্তির শেষ প্রান্তে ছোট একটি ঘর। স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের চারপাশ জুড়ে কেবল বই আর খাতার স্তূপ। ঘরের ভেতর এক চিলতে হলুদ আলোয় বসে আছেন বৃদ্ধ শিক্ষক “সরোজ ভট্টাচার্য”। হুগলী জেলার আরামবাগ মহকুমার আরান্ডি গ্রাম থেকে আসা সেই জেদি তরুণটি আজ সত্তরোর্ধ্ব এক অভিজ্ঞ মানুষ। আশুতোষ কলেজের স্নাতক সরোজবাবু গত পঞ্চাশ বছর ধরে এই বস্তির নিরক্ষর অন্ধকারের মাঝে জ্বালিয়ে রেখেছেন শিক্ষার প্রদীপ।
বিগত কয়েক দশকে বাংলার রাজনীতিতে অনেক বসন্ত এসেছে এবং গেছে। কিন্তু সরোজবাবুর মতো প্রশিক্ষিত ও যোগ্য শিক্ষকদের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। পিটিটিআই (PTTI) ট্রেনিং থাকা সত্ত্বেও বিগত দুই সরকার তাঁর মতো যোগ্য মানুষকে শ্রেণিকক্ষে স্থান দেয়নি। যোগ্যতার মাপকাঠি যখন তোষামোদ আর দলীয় আনুগত্যে পর্যবসিত হয়, তখন সরোজবাবুদের মতো মেরুদণ্ডী মানুষেরা আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হন।
সেদিন বিকেলে সরোজবাবুর ঘরে বসে ছিল অর্জুন আর রহমত। দশম শ্রেণির জীবনবিজ্ঞান বইটা সপাটে বন্ধ করে সরোজবাবু গর্জে উঠলেন, "এসব কী হচ্ছে? শিক্ষার নামে এই প্রহসন আর কতকাল চলবে?"
অর্জুন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন দাদু? বইটা তো বেশ রঙিন!"
সরোজবাবু চশমাটা টেবিলের ওপর আছাড় দিয়ে বললেন, "রঙিন হলেই কি তা জীবনমুখী হয় রে? বিগত কয়েক বছরে যে সিলেবাস তৈরি হয়েছে, তা তোদের মেধা বিকাশের জন্য নয়, বরং তোদের তোতা পাখি বানানোর জন্য। প্রতিটি পাতায় তথ্যের পাহাড়, কিন্তু নেই কোনো সৃজনশীলতার লেশ। বিজ্ঞানের গভীরে না গিয়ে তোদের শেখানো হচ্ছে নম্বর পাওয়ার কৌশল। যারা এই পাঠ্যক্রম তৈরি করেছেন, তাঁরা কি সত্যিই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য জানেন? নাকি উদ্দেশ্য একটাই—একদল মেরুদণ্ডহীন কর্মসংস্থানহীন যুবক তৈরি করা, যারা কেবল ওপরতলার নির্দেশের অপেক্ষা করবে?"
ঠিক সেই সময় ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল বিমল। এলাকার নতুন প্রভাবশালী নেতা। হাতে চওড়া একটি খাম। বিমল হেসে বলল, "সরোজ বাবু, ২০২৬ সালে বঙ্গ রাজ্যে নতুন সরকার এসেছে। এবার তো আপনার কপাল খুলতে পারে। আগের সরকারগুলো তো আপনাকে বঞ্চিত করেছে। আপনি যদি একটু আমাদের হয়ে কলম ধরেন, তবে আপনার পুরনো ফাইলের ধুলো ঝেড়ে আপনাকে কোনো একটি সরকারি পর্ষদে বসানোর ব্যবস্থা করা যায়।"
সরোজবাবু স্মিত হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে ছিল আগুনের শিখা। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "বিমল, আরান্ডি গ্রাম থেকে যখন কলকাতায় এসেছিলাম, তখন পেটে খিদে নিয়ে এই বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। পঞ্চাশ বছর বিনা পয়সায় নিরক্ষরদের পড়িয়েছি। চকের ধুলোয় আমার ফুসফুস আজ সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু আমার বিবেকটা কোনোদিন সাদা কাগজে লিখে কোনো সরকারের কাছে বিক্রি করিনি। তোদের তোষামোদি আর তাবেদারির এই সংস্কৃতিই তো বাংলার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে।"
তিনি আরও জোরালো স্বরে বললেন, "বিগত শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখ—যোগ্যতা থাকলেও শিক্ষক নিয়োগে চলেছে দুর্নীতির মহোৎসব। ক্লাসরুমে পঠনপাঠনের চেয়ে রাজনীতির চর্চা হয়েছে বেশি। সিলেবাসের পর সিলেবাস পরিবর্তন হয়েছে কেবল তাত্ত্বিক স্বার্থে, প্রায়োগিক জীবন সেখানে অবহেলিত। আমি নিজের ভাগ্যকে আর দোষ দিই না বিমল। কিন্তু আমি দোষ দিই সেই মানসিকতাকে, যা শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করেছে।"
সরোজবাবু বিমলের মুখের ওপর দরজাটা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে অর্জুনদের দিকে ফিরে বসলেন। তিনি বলতে লাগলেন, "আমি চাই এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে একটা ছেলে পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত যা শিখবে, তা দিয়ে সে যেন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের জীবিকা খুঁজে নিতে পারে। শিক্ষা যদি কেবল মুখস্থবিদ্যার অন্ধকার হয়, তবে তা দাসত্ব শেখায়। আমি আজ এই কলমের মাধ্যমেই মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আরজি জানাব—আপনারা সমাজের মঙ্গল চিন্তা করুন। গোল্ডেন সিলেবাসের জাঁতাকলে শিশুদের শৈশব পিষবেন না।"
তিনি খাতা টেনে নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে লিখতে শুরু করলেন—
> "মাননীয় মহোদয়গণ, আমি জীবনের শেষ প্রান্তে। নিজের জন্য কিছুই চাই না। কিন্তু আগামী প্রজন্মের সন্তানরা যেন বিদ্যালয় থেকে সত্যিকার শিক্ষার স্বাদ পায়। পাঠ্যক্রম হোক আধুনিক কিন্তু শেকড়-সংলগ্ন। যদি তারা প্রকৃত শিক্ষা পায়, তবে জীবিকা তারা ঠিক খুঁজে নেবে। আমি তার জ্বলন্ত উদাহরণ—শূন্য হাতে শুরু করেও আজ আমি মানুষের ভালোবাসা আর আদর্শ নিয়ে বেঁচে আছি। আপনাদের ক্ষমতার দম্ভ যেন শিক্ষার মেরুদণ্ডকে আরও দুর্বল না করে।"
বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সরোজ ভট্টাচার্যের কলম কিন্তু থামেনি। তিনি এক অবিনাশী সৈনিক, যিনি চকের ধুলোয় স্বপ্নের বীজ বুনে চলেছেন। তাঁর এই প্রতিবাদ যেন কেবল এক বৃদ্ধের প্রলাপ নয়, বরং হাজার হাজার বঞ্চিত শিক্ষকের কণ্ঠস্বর হয়ে আগামী বাংলার ভোরের অপেক্ষায় রইল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~