এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • কবি রবীন্দ্রনাথ যখন সেকেন্ড গড। 

    লতিফুর রহমান প্রামানিক লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ মে ২০২৬ | ৮৫ বার পঠিত
  • কয়েক বছর আগের ঘটনা। আমি তখন প্রতিলিপিতে নিয়মিত ছিলাম। অনেক লেখকদের সাথে জানাশোনার সুযোগ ঘটে যারা সিংহভাগই ভারতীয় বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ। মাঝে মাঝে টপিক নিয়ে আলোচনা হতো, যুক্তি হতো, তর্ক হতো। সেই লেবেলের আলোচনা সমালোচনা। যদি ও আমি ছিলাম সবচেয়ে নবীন আর অজ্ঞ। কিন্তু সবার স্নেহময় হয়ে উঠে পড়ি দ্রুত। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে আমি কোন এক লেখকের পোস্টে রবীন্দ্রনাথের ভারত ভাগ নিয়ে খোঁচা দেই। তারপর যা দেখলাম সেটা আমার জানার বাহিরে ছিলো এতকাল। মুহুর্তের মধ্যে আরো কয়েকজন ঝাপিয়ে পড়ে আমার উপর। তারপর তীর্যক আলোচনা চলে রবীন্দ্রনাথের উপরে। ভারতীয় বাঙ্গালীদের মনে প্রানে রবীন্দ্রনাথের যে স্থান তা তাদের সাথে আলোচনা না করলে জানা যায় না। বলা যায় সেকেন্ড গড রবীন্দ্রনাথের স্থান। বাংলা ভাষার পুর্ন জন্মদাতা বা বিকাশে রবীন্দ্রনাথের যে অবদান তার গল্প শুনলে মুগ্ধ হতে হয়। কিন্তু নজরুল কে ঠিক সেভাবে তারা ভাবেন বলে মনে হয় না। এটা সন্দেহের উর্ধে নিঃসন্দেহে যে, রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের যে ভিত্তি রচন করে গিয়েছেন তা কখনো তুচ্ছ করার বা ভাবার কারণ নেই। কবিতা, গল্প, নাটক কোথায় রবীন্দ্রনাথের কলম হাসেনি তা খুঁজে পাওয়া দুস্কর। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি যে সঠিক সিদ্ধান্ত তা অন্তত ভারতীয় বাংলা ভাষার মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন। সাহিত্য কর্ম নিয়ে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের সাথে অন্য কারো তুলনা করা সমীচীন নয়। নিজ গুণে রবীন্দ্রনাথ অম্লান। এবার ভিন্ন কথায় আসি। বৃটিশ শাসন এর পুরো সময়ে একজন সমাজ সংস্কারক আবির্ভাবের বাসনাই তখনকার ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশী জরুরি বলে তাগিদ ছিলো। মহাত্মা গান্ধী, তিতুমীর, টিপু সুলতান, হাজী শরীয়তুল্লাহ

    চিত্তরঞ্জন দাশ বা সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মানুষের হাতে প্রত্যাশার আলো খুঁজে পেয়েছিল সেই সময়ের ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রবীন্দ্রনাথ রাজপথে না থাকিলেও সমাজ সংস্কারক হিসেবে, সমাজের অনাচার নিয়ে সোচ্ছার ও কম ছিলো না। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে জোরালো এবং বিশ্বব্যাপী আলোচিত প্রতিবাদ ছিল ১৯১৯ সালে। পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ার কর্তৃক নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান 'নাইটহুড' উপাধি বর্জন করেন। ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা তাঁর সেই চিঠিটি আজও প্রতিবাদের ইতিহাসে এক অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। সবকিছুর মুলে অবিভক্ত ভারতের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কাজেই তেমন দেশপ্রেমিক কবির জন্য এগিয়ে বা আগ বাড়িয়ে গলা ফাটানো অন্যায় নয়। আমি সেই সময়ের অবিভাজ্য ভারতের অনুভূতির সাথে একমত। কিন্তু পরবর্তীতে ঘটনার পরিক্রমায় অনেক কিছু ঘটে যায় ইতিহাসের ঘড়িতে। বৃটিশ সরকার সেটা কল্যানেই হোক আর অকল্যাণকর হোক বা ক্ষমতা দীর্ঘ করার নতুন ষড়যন্ত্রের নক্সা হোক ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এক নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। পিছিয়ে পড়া পুর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সুচনা হিসাবে বঙ্গভঙ্গ আবির্ভূত হতে থাকে। আর বিপত্তিটা সেটাই। কার্যত দীর্ঘদিন একসাথে থাকা ভারতীয় জনতা নিজেদের মধ্যে বিভক্তি, বৈষম্য বৃদ্ধির নিয়ামক হিসাবে চিন্তিত হয়ে উঠে। আর এভাবেই ভারত পরবর্তী কালে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটো আলাদা রাস্ট্র হিসেবে জন্ম লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ ই সর্বপ্রথম ভারত বিভক্তির সুচনা হিসাবে আবির্ভূত হতে থাকে। পূর্ববঙ্গ ও আসাম: ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিভাগ এবং আসাম নিয়ে এই নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। এর রাজধানী করা হয় ঢাকা। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া পুর্ব বঙ্গের মানুষ জন অর্থনৈতিক উন্নতির আশায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। যদি ও বৃটিশদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা। 'ভাগ কর ও শাসন কর' (Divide and Rule) নীতির মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রবিন্দু কলকাতাকে গুরুত্বহীন করাই ছিল তাদের আসল লক্ষ্য। যা সত্যি তাই হয়। কোলকাতার আইনজীবী সমাজ প্রতিবাদে যোগ দেয় রদ আন্দোলনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বসে ছিলেন না বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে দেশপ্রেমের জোয়ার আসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভাজনের প্রতিবাদে 'রাখীবন্ধন' উৎসবের ডাক দেন এবং তাঁর বিখ্যাত গান 'আমার সোনার বাংলা' (যা বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত) এই সময়েই রচিত হয়েছিল। এতেই বিভক্তি শুরু হয়। সেই আন্দোলন শুধু ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে নয় তা যে পুর্ব পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক অসামাজিক উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা বুঝতে পেরে পূর্ববঙ্গ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাদের প্রতিপক্ষ হিসাবে ধারণা করা শুরু করে। ঠিক এমনই ক্ষুদিরামের ফাসীর ঘটনা ও সেই সুত্রে বাধা।
    ভারতীয় জনতার চোখে রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণ করলে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজ বিরোধী ভুমিকার সাথে পূর্ববঙ্গের স্বার্থকে মেলানো সম্ভব নয় তা বুঝতে পারি এবার। কবি সার্বজনীন, কবি জগতের। কোন দেশ বা জাতীর নয় সেটা নিয়ে আমার দ্বিধা নেই কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সেই সময়ের ভুমিকা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। যার ফলে ইংরেজ রা বাধ্য হয়ে বঙ্গভঙ্গ রদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যার ফলে পুনরায় অবহেলিত পূর্ববঙ্গ আরেক বার ধাক্কা খেয়ে পিছনে পড়ে থাকে দীর্ঘদিন। ইতিহাসের ক্ষত থাকে, ইতিহাসের নায়ক যখন কারো কাছে অপর পাড়ে নিশ্চয়ই ভিলেনের ছবি দেখা দোষের নয়। সেই নিয়ে দীর্ঘ যুক্তি তর্ক সমালোচনা থাকতে পারে, ইতিহাসের এই বিশ্লেষণ যুগের পর যুগ চলবে।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ১২ মে ২০২৬ ২২:৫৮740624
  • আবার কাল্ট। গড কি? তার আবার সেকেন্ড আর ফার্স্ট
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন