আচ্ছা, আপনি তো বেশ লেখাপড়া জানা মানুষ। বলুন তো, গণতন্ত্র কাকে বলে? না না, অ্যাঁ ওঁ করলে হবে না। কী হল, পারলেন না তো? ঠিকাছে, আমিই বলে দিই – গণতন্ত্র হল সেই জিনিস যখন ছাগল নিজেই বেছে নেয় কোন বাঘ তাকে খাবে। পছন্দ হল? বেশ, এবার বলুন পুলিশ মানে কী? আবার আমতা আমতা করছেন? তাহলে শুনুন, পুলিশ হল এক সংগঠিত সশস্ত্র বাহিনী, যারা শাসক দলের হয়ে কাজ করতে সব সময়েই রেডি।… হেঁ হেঁ… এগুলো মেটেদার কথা।
না না, আমি মেটেদা নই। আর এই গোলমেলে অভিধানও আমার লেখা নয়। ক্লাস সিক্সে পড়া মেয়েকে ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ টাইপের বাংলা রচনা লিখে দিতেই তো কলম ভেঙে যায় আমার। সেকেন্ড ডিভিশনে বি-কম পাশ ক’রে মেজমামার কানেকশনের জোরে বড়বাজারের একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি করি। এই সব আঁকাবাঁকা মানে করা আমার কম্মো নয়। এসব মেটেদার ব্যাপার।
মেটেদা কে? ক্যানেস্তারাখালি রোড রেল স্টেশন চেনেন তো? স্টেশনের পশ্চিমদিকে যে সাইকেল স্ট্যান্ড আছে, তার পাশেই ন্যালার চায়ের দোকান। সোম থেকে শনি, সন্ধ্যা সাড়ে ছটা-সাতটা থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত ওই দোকান আলো করে বসে থাকেন বছর পঁয়ষট্টির মেটেদা। ওই আড়াই তিন ঘণ্টায় ন্যালার দোকানের সেলও বেড়ে যায়, কারণ অনেকেই চা-এর সঙ্গে মেটেদার বচনামৃত পান করার জন্য সেখানে ঢুঁ মারেন।
ওনার আসল নামটা কী? এর উত্তরে মেটেদা বলে থাকেন, “যে নামে লোকে চিনতে পারবে সেটাই তো আসল নাম। রবীন্দ্রনাথ তো বলেই গেছেন—নামে কি আসে যায়।” যদি বলেন, ওটা তো মনে হয় শেকসপিয়ারের বাণী, মেটেদা তখন মাথার বাঁদিকটা চুলকে, মুখটা সামান্য নামিয়ে, ভুরু দুটো একটু তুলে (ওনার ট্রেডমার্ক) মুচকি হাসেন।
উচ্চমাধ্যমিক পাশ মেটেদা বহু ঘাটের জল খাওয়া মানুষ। জীবনে নানা কাজ করেছেন—মাথায় গাঁটরি ভরে সায়া-ব্লাউজ বেচেছেন উত্তর কলকাতার অলিগলিতে, বড়বাজারের দোকানেও চাকরি করেছেন, কাজ করেছেন ছোটখাটো কোম্পানিতেও। তবে কোথাও বেশি দিন টিঁকে থাকা মেটেদার পোষাত না; তিনি নিজেই নাকি ছেড়েছুঁড়ে দিতেন। কেবল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার অফিসে অসাংবাদিক কর্মী হিসেবে টানা দশ বছর ছিলেন। সেখান থেকেই বছর পাঁচেক আগে অবসর নিয়েছেন। ওনার নিজের কথায়, “আমি বলতাম কম, শুনতাম বেশি, পড়ার চেষ্টা করতাম আরও বেশি।”
এখন ন্যালার দোকানে ওনার দৌলতে সন্ধ্যাবেলায় যে ভিড় হয়, তা অন্য চা দোকানের মালিকদের গাত্রদাহের কারণ। মেটেদার কথা শোনার জন্য দু-তিনটে স্টেশন আগে বা পরে নেমে লোক ন্যালার দোকানে চলে আসে—এমন ঘটনাও ঘটে। অবশ্য ন্যালা চা-টা বানায়ও ভালো।
সকালের দিকে মেটেদা সাইকেল করে আশেপাশের গ্রামগুলোতে টিউশন করতে যান। তবে মাগনায় নয়—ছাত্রছাত্রীরা ধান-চাল, লাউ-চালকুমড়ো, পঞ্চাশ-একশ টাকা—যে যা দেয় তাতেই তিনি খুশি। স্ত্রী মারা গেছেন, নিজের ছেলেমেয়ে নেই। একটা অনাথ ছেলেকে মানুষ করেছিলেন তাঁরা দুজন মিলে। সে রোজগার শুরু করার পর তার বিয়েও দিয়েছেন। এখন সকালবেলা টিউশন, সন্ধ্যায় ন্যালার দোকান আর বাকি সময় আড়াই বছরের নাতনীর সঙ্গে খেলা করেই দিন কাটে মেটেদার। সামান্য কিছু চাষের জমিও আছে।
তাহলে অভিধান কোথা থেকে এল?
একদিন দেখি মেটেদার কথা এক ভদ্রলোক মোবাইলে রেকর্ড করছেন। লোকটাকে চিনি না—এদিককার নয়। মাঝপথে নামা কেউ হবে। ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রামে রিলসও দেবে হয়তো। তারপর থেকে ইন্টারেস্টিং কিছু হলে আমিও রেকর্ড করতে শুরু করি। অফিসের লোকজনকে শোনাই। একদিন একজন বলল, এসব কথা লিখে রাখা উচিত। সেই সূত্রেই ধীরে ধীরে একটা ডিকশনারির কথা মাথায় আসে। মাঝে মাঝে মেটেদাকে খুঁচিয়েও কথা বার করতে হয়েছে।
একশোটা শব্দ বাছাই করার পর গোটা পাঁচেক ভাগে ভাগ করে ওনাকে দেখালাম। প্রথমে তো আমার পাগলামি দেখে হেসেই খুন। তারপর বললেন, “তুই তো আমায় অমর করে দিবি রে।” বললাম, মানে? মেটেদার উত্তর: “হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সুবল মিত্র—এনারা অমর নন?” এনারা যে কারা, তা অবশ্য তখন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
এই ডিকশনারি মেটেদাকেই উৎসর্গ করতে চেয়েছিলাম। উনি রাজি হলেন না। যা বললেন, সেই অনুযায়ীই “মেটেদার গোলমেলে অভিধান” আপনাদের হাতে তুলে দিলাম।
প্রথম ভাগ
ক্ষমতা আর রাজনীতি টাজনীতি (ভোটের কৌশল আর ক্ষমতার কেরামতি)
অগ্রগতিঃ
যার বাইরেটা চোখে দেখা যায়, ভেতরটা অন্ধকারে থাকে।
আইনসভাঃ
এক উচ্চমানের ব্যায়ামাগার, যেখানে চেঁচামেচি করে গলার, আর জিনিসপত্র ছোঁড়াছুঁড়ি করে শারীরিক কসরত চালানো হয়।
আদর্শঃ
একটি সোনার পাথরবাটি। তবে বেশ নরমসরম, মানে ক্ষমতায় টিঁকে থাকার জন্য বা সেখানে পৌঁছবার জন্য যাকে প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁকিয়ে চুরিয়ে নেওয়া যায়।
ইডিঃ
অবাধ্য নেতাকে বশে রাখার এক দাওয়াই; তবে দল বদলে ফেললে ওষুধের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। [মেটেদা চায়ে চুমুক দিয়ে বলেছিলেন, "এই জুজুর অন্য নাম সিবিআই।"]
ইস্তাহারঃ
কাগজের ওপর ছাপানো দিবাস্বপ্ন, যার মেয়াদ ভোটের দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
উন্নয়নঃ
নেতাদের ভাষণে যার সুগন্ধ পাওয়া যায়, দলের কর্মীরা যার ভাগ পায়, আর বিরোধীরা যাকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
ঊর্ধসীমাঃ
যা নেতারা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময়ে পেরিয়ে যান আর পালনের সময়ে খুঁজে পান না।
একতাঃ
এর আর এক নাম বল, তাই একে নিজের কোর্টে রাখতে চায় সব দলই।
ওয়াশিং মেশিনঃ
নতুন পার্টি, যেখানে যোগ দিলে পুরনো পাপ ক্ষালন হয়ে নেতারা শুভ্র-সুন্দর, প্রীতি-উজ্জ্বল হয়ে নির্মল জীবনে ফিরে আসেন। [মেটেদার মতে, “একে গঙ্গাস্নানও বলা যায়।“]
কমিশনঃ
এক রকমের 'অদৃশ্য গ্রিজ' যা না মাখালে সরকারি ফাইলের চাকা ঘোরে না।
কর্মীঃ
নিহত মানুষের পরিচয়, সব দলই যাকে আপন ঘরের লোক বলে।
কাটমানিঃ
উন্নয়নের পথের 'টোল ট্যাক্স', যা না দিলে কিছুই আপনার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছয় না।
কেলেংকারিঃ
যা নিয়ে থানা পুলিশ আইন আদালত চলতেই থাকে, চলতেই থাকে, চলতেই থাকে।
ক্লাবঃ
সরকারের কাছ থেকে নেতার কাছে ক্যাশ এবং কাইন্ড যাওয়ার মাধ্যম।
গিরগিটিঃ
নেতাদের রং বদল দেখে যিনি লজ্জা পান।
চোরঃ
যে তকমা সব পার্টি অন্য দলের নেতাদের দেয়; আর প্রয়োজন বুঝলে তাদের নিজের পার্টিতেই নেয়।
ঝড়ঃ
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা নেতার পৌষ মাস আর জনতার সর্বনাশ। [মেটেদার মতে, “ওটাই আয়ের মরসুম।”]
জমিঃ
এমন ভূখণ্ড (বাড়ি বা ফ্ল্যাট সহও হতে পারে), যার ওপর নেতাদের ‘উন্নয়নমূলক’ নেকনজর সবচেয়ে বেশি থাকে।
জোটঃ
এমন এক বিয়ে যেখানে পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না, কিন্তু গিফটের লোভে মালাবদল করেছে।
ঠ্যাংঃ
রাজনীতিতে বিরোধীদের ভেঙে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি হুমকি পাওয়া অঙ্গ। [মুচকি হেসে মেটেদার মন্তব্য, “ভোট এলে প্লাস্টার পুরু, ফল বেরোলেই দৌড় শুরু।”]
ঢাকঃ
সমর্থকদের যা পেটাতে শুনে ভিআইপিরা নিজেদের সঙ্গীতে সরস্বতী, পাণ্ডিত্যে পাণিনি আর কাব্যে কালিদাস বলে ভাবেন।
ণত্ব-ষত্বঃ
নেতাদের হাবিজাবি বক্তৃতা শুনে যে ব্যাকরণ জ্ঞানটি পটল তুলেছে ভেবে জনতা হাসাহাসি করে। [“আর আসল বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যায়,” মেটেদা উবাচ।]
তফসিলি জাতি/উপজাতিঃ
যাদের দুঃখে নেতারা রাতে ঘুমোতে পারেন না। [মেটেদা বললেন, “এদের ঘরে নেতাদের খেতে দেখলেই বুঝবি ভোট আসছে।”]
তেলঃ
এক রকম তরল পদার্থ যা নেতার কান, পা আর নাক সচল রাখতে সাহায্য করে।
থানাঃ
শাসক দলের সবচেয়ে বড় শাখা সংগঠনের অফিস। [মেটেদা উবাচ: “দুর্জনেরা রক্ষক-ভক্ষক নিয়ে কী যেন একটা গোলমেলে প্রবাদ এখানকার লোকদের জন্য বরাদ্দ করেন।”]
দারিদ্রঃ
এক ধরনের মানসিক অবস্থা যাকে দূর করার চেষ্টা চলছে চলবে।
দেওয়ালঃ
ভোটের আগে যা নিয়ে কাড়াকাড়ি হয়, কিন্তু পার্টি যার লিখন অনেক সময়েই পড়তে পারে না।
দুর্নীতিঃ
সরকার চালানোর অপর নাম।
নেতাঃ
যিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেন, রাজনীতির জন্য পার্টি করেন, আর বিপদ এলে পার্টি বদলান। [মেটেদার মতে, “ঠাকুর তো বলেইছিলেন - যত মত তত পথ।”]
প্রতিশ্রুতিঃ
নেতাদের দেওয়া মিষ্টি, যা ভোটাররা হজম করতে করতে পরের নির্বাচন এসে পড়ে। [মেটেদার মতে, “খাওয়া ফ্রি, দামটা পরে ওঠে।”]
ফাঁসানোঃ
নেতার বিরুদ্ধে মামলা হলেই তিনি বিরোধী দল তাঁকে যা করেছে বলে দাবি করেন।
ব্যাংকঃ
যেখান থেকে ধার নিয়ে বড়রা দিব্যি থাকেন, আর ছোটদের ঘুম উড়ে যায়। [মেটেদার মতে, “ধারের অঙ্ক যত বড়, লজ্জাটা তত ছোট।”]
বুদ্ধিজীবীঃ
যিনি ক্ষমতার হাওয়ার দিক বুঝে বুদ্ধিকে জীবিকার কাজে লাগান।
ভাতাঃ
যা লোককে আনন্দ দেয়, পার্টির ভোট আনে, আর দেশের ক্ষতি করে।
মঞ্চঃ
যেখানে বক্তা যা বলে তা নিজেই বিশ্বাস করে না, আর শ্রোতারা না শুনেই হাততালি দেয়।
মতাদর্শঃ
এক রকম চশমা, যা নিজের দলের দুর্নীতিকে ‘সংস্কার’ আর অন্য দলের ভালো কাজকে ‘ষড়যন্ত্র’ দেখায়।
মিছিলঃ
যেখানে কাজের দিনে রাস্তা আটকে লোকে দলে দলে হাঁটে, কিন্তু অনেকেই কারণ জানে না।
রাজনীতিঃ
মানুষের জন্য কাজ যা করতে গিয়ে নেতার পকেট ভরে।
লজ্জাঃ
শাস্ত্রমতে যা থাকলে রাজনীতিতে আসতে নেই।
দ্বিতীয় ভাগ
মিডিয়ার চিৎকার চেঁচামেচি মাথাব্যথা (সত্যি-মিথ্যের গোলকধাঁধা)
ইমেজঃ
আমি আসলে যা নই, আপনাকে তা বিশ্বাস করানোর শিল্প।
কান্নাঃ
যে সম্পদ আড়ালে রাখতে হয়, বাইরে এলে টিআরপি বাড়ে। [মেটেদার ভাষায়, "আসল কথা শুধু বালিশ জানে, যা রোজ রাতে একা ভেজে।"]
খবরের কাগজঃ
যে কাগজে সত্যি, মিথ্যে, মতামত আর বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, কিন্তু যাদের আলাদা করা যায় না। [মেটেদা চশমাটা একবার মুছে নিয়ে বললেন, “আগে লোকে কাগজ পড়ত খবর জানতে, এখন পড়ে কেচ্ছা শুনতে।”]
গুজবঃ
শিক্ষিত লোকেরা যা “আমি অবশ্য নিশ্চিত নই” বলে ফরোয়ার্ড করে।
ছবিঃ
যাকে ব্রাজিল থেকে তুলে এনে বর্ধমানের বলে চালানো হয়; আর উত্তেজিত পাবলিক পাশের বাড়ির লোকের ঘাড় মটকাতে যায়।
টুইটঃ
কঞ্চি সাইজের পোস্ট যা প্রায়ই বড় বাঁশে পরিণত হয়।
ট্রোলঃ
যুক্তি শেষ হলে যে যুদ্ধ শুরু হয়, আর সৈন্যরা বেনামে লড়ে।
নিউজ চ্যানেলঃ
যেখানে পাঠক একই খবর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনন্ত কাল ধরে বলে চলেন।
প্যানেল ডিসকাশনঃ
পাড়ার চায়ের দোকানের ঝগড়া যখন টিভিতে দেখা যায়। [মেটেদা বলেন, “বিজ্ঞাপন বিরতির সময়ে কী হয়, তা কিন্তু কেউ জানে না।”]
বইঃ
তিন পাতা পড়ার পর যা আলমারির পিছনে চলে যায়। [মেটেদার মতে, “বই কেনা আর বই পড়া -- দুটো আলাদা শখ।”]
মিডিয়াঃ
লাউডস্পিকার, যা সাধারণের কান্না চাপা দিয়ে ক্ষমতাশালীর গুণগান করে।
সাংবাদিকঃ
যিনি খবর খুঁজে বার করেন, তারপর মালিকের মর্জি অনুযায়ী তাকে পালটে লেখেন।
তৃতীয় ভাগ
সমাজ আর 'সমোসকিতি' (ওই যা হয় আর কি)
আদালতঃ
একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে সুলভে তারিখ পাওয়া যায়।
ইস্তফাঃ
ঘাড়ধাক্কা খাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে সসম্মানে সরে যাওয়ার এক ভব্য অভিনয়।
ঈশ্বরঃ
যিনি সব জায়গাতেই আছেন, তবু যাঁকে নির্দিষ্ট কক্ষের ভিতর পুরে না ফেললে অ্যাজেন্ডা সম্পূর্ণ হয় না।
ঋষিঃ
যাঁর কথা আমরা ফেসবুক আর হোয়াটস্যাপে কোট করি, নিজের জীবনে ব্যবহার করি না।
কথাঃ
যা বলা হয় অনেক, শোনা হয় অল্প, আর রাখা হয় আরও কম।
দেশঃ
কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা ভূখন্ড, মাইনাস তার মধ্যে যারা আছে।
দেশপ্রেমঃ
এক রকম গান, যা অপকর্ম ঢাকতে আর অন্যকে চুপ করাতে কাজে লাগে। [মেটেদার মতে, “সুর যত চড়া, হিসেব তত গোলমেলে।”]
ধর্মঃ
যা সর্বদাই ‘খতরে মে’ থাকে, ক বা খ যাই হোক না কেন।
লেখকঃ
এক অদ্ভুত জীব, যে স্বপ্ন দেখে তার কাল্পনিক দুঃখ অন্যে পয়সা দিয়ে কিনবে।
শিক্ষাঃ
হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরে যার অস্তিত্ব নেই।
শিল্পকলাঃ
যে জিনিস না বুঝলে বেশি প্রশংসা করতে হয়।
সংস্কৃতিঃ
যা দিয়ে কুকীর্তিকে লাইফস্টাইল বলা হয়, আর ভাল কাজকে না দেখেই লাইক দিতে হয়।
চতুর্থ অধ্যায়
মানুষ আর তার ভাব (মানে, আবেগ আর তার বেগ)
খ্যাতিঃ
যা প্রতিটি মানুষ চায়, যারা পায় তারা বিড়ম্বনায় ভোগে।
জনতাঃ
পাঁচ বছর ঘুমিয়ে থাকা কুম্ভকর্ণ; যাদের আবার ঘুম পাড়াতে এক ঠোঙা মুড়ি কিংবা একটা ভয়ের গল্পই যথেষ্ট।
দাম্পত্যঃ
এমন এক সম্পর্ক যা দু’জনকে কাছে আনে লড়াই করার জন্য, আর শেষে ভালোবাসা জিতে যায়।
ভক্তঃ
যুক্তি যাঁর মগজে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।
ভদ্রতাঃ
যা আমরা সাধারণত বাইরের লোকদের দেখাই।
ভয়ঃ
এক অদৃশ্য শেকল যার জন্য মানুষ অনেক কাজ অনিচ্ছায় করে।
ভালোবাসাঃ
যে কারণে মানুষ জেনেবুঝে অনেক বোকামিও হাসিমুখে করে। [মেটেদার মতে, “ভালবাসা হল সমুদ্র; আরে প্রেম তার ওপর দিয়ে ডিঙি চালানো।“]
ভিআইপিঃ
যাঁর জন্য লাইন থাকে, কিন্তু যাঁকে লাইনে দাঁড়াতে হয় না।
যোগ্যতাঃ
যা দেখে লোককে কাজে নেওয়া হয়, আর পরে যার হদিস মেলে না।
রাগঃ
যা মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলে, কিন্তু আসলে কোনো কাজে আসে না। [মেটেদা বলেন, “এই আগুন পোয়ানো গরিবের সাজে না, নিজেরই ঘরই পোড়ে।“]
হাসিঃ
মুখের এমন ভাব, যার সঙ্গে মনের সম্পর্ক সব সময় এক হয় না। [মেটেদার ভাষায়, "ওটা হল ছদ্মবেশ; কেউ কষ্ট লোকায়, কেউ ছুরি।"]
হিংসাঃ
প্রতিবেশীর ভালো দেখলে যা নিজের ভেতর কামড়ায়।
পঞ্চম ভাগ
জীবন আর যাপন (রোজকার ঘ্যানঘ্যান)
অভিজ্ঞতাঃ
ভুলকে যে সম্মানজনক নামে ডাকা হয়। [মেটেদা চায়ে চুমুক দিয়ে হেসে বলেছিলেন, “আমি খুব অভিজ্ঞ মানুষ রে।”]
অ্যালার্মঃ
ঘড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকা শত্রু, যাকে প্রতিদিন সকালে চড় মেরে আরও পাঁচ মিনিট চুপ করাতে হয়। [মেটেদার মতে, “দিনের প্রথম যুদ্ধ যার সঙ্গে হয়।”]
আয়নাঃ
এক রকম কাঁচ যার সামনে বয়স আর বিবেক লোকানো যায় না।
আড্ডাঃ
বিনা পুঁজিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দখল করার মহড়া।
ইতিহাসঃ
এক কালে লেখা গপ্পো, যা পছন্দ না হলে অন্যকালে বদলে ফেলা যায়।
উপদেশঃ
অন্যের সমস্যার সহজ সমাধান, যা নিজের জীবনে প্রয়োগ করা কঠিন।
ঐতিহ্যঃ
যার দোহাই দিয়ে বর্তমানকে অস্বীকার করা হয়।
খাবারঃ
যে জিনিসের জন্য আমার আর আপনার মধ্যে খেয়োখেয়ি বাধে।
খেলাঃ
ছোটবেলায় যা মাঠে হয়, আর বড়বেলায় জীবনে।
ঘুষঃ
ন্যায্য পাওনা পাওয়ার জন্য দেওয়া ‘উপহার’। [মেটেদার ভাষায়, "কর্তারাও তো মানুষ, আদর করে দেওয়া জিনিস তাঁরা আর ফেরান কী করে!"]
চাঃ
যার জন্য আকবর বাদশা আর হরিপদ কেরানি পৃথিবীর শেষ গ্রামটিতেও একসঙ্গে যান।
ছেলেমেয়েঃ
ছোটবেলায় যাদের বড় করতে ব্যস্ত থাকি, আর বড় হলে যাদের বুঝতে ব্যস্ত থাকি।
ছুটিঃ
বসের মতে আপনি ‘অকম্মার ঢেঁকি’; কিন্তু যেটা চাওয়ামাত্রই বোঝা যায় আপনাকে ছাড়া অফিস অচল।
জীবনঃ
এক সুন্দর যাত্রা, যার পথ কখনও উঁচু, কখনও নিচু।
টাকাঃ
প্রায় ঈশ্বরের মতই শক্তিশালী এক জিনিস, যার দাম পড়ে গেলেও আকর্ষণ কমে না
ট্রেনঃ
এমন এক গাড়ি যা সময় মত এলে আমরা অবাক হই।
ডায়েটঃ
জিভ আর পেটের মধ্যে চলা চিরকালীন যুদ্ধ, যেখানে তেলেভাজা আর রসগোল্লাই জেতে।
ডেডলাইনঃ
একটা তারিখ, যা পার হয়ে যাওয়ার পরই দারুণ দারুণ আইডিয়া মাথায় আসে।
পরিবারঃ
যেখানে ভালোবাসা থাকে, সঙ্গে একটু ঝগড়া আর অনেকটা মানিয়ে নেওয়া।
পেটঃ
মেরেকেটে এক বিঘত লম্বা আর দু বিঘত চওড়া একটা জায়গা যার জন্য পৃথিবীর বেশির ভাগ লড়াই হয়েছে।
পোশাকঃ
যা মানুষকে ঢাকে, আর অনেক সময় মানুষকে বানায়।
বাজারঃ
যেখানে গেলে পকেটের মূল্য বোঝা যায়।
মোবাইলঃ
এমন যন্ত্র যা নাকি মানুষের সময় কমানোর জন্য বানানো হয়েছিল।
যুক্তিঃ
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে যার খোঁজ করা হয়।
রিলসঃ
যা দেখে দেখে আঙুল ব্যথা হয়, সময় ক্ষয়ে যায়, আর পোস্টদাতার লাভ হয়।
ডিকশনারি দেখা শেষ করে মেটেদা বললেন, “এখানে যা যা লেখা আছে, তার সব সত্যি নাও হতে পারে; কিন্তু মিথ্যেও বলিনি। সব কি আর পরিষ্কার সাদা বা কালো হয়, রে পাগল?”
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।