এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  •  অধ্যায় ১০: মুখোশের নিচে মুখ

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ৬০ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12
    "তোমার ফোন ফেলে দাও।"

    মিলার কথাটা কানের ভিতর ঢুকে গেলে, পুরো ঘরটাই যেন হঠাৎ চুপসে যায়। ফ্যানের আওয়াজ, রাস্তার হর্ন, দূরের টিভির শব্দ—সব মিলিয়ে একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ। দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়, তার মুখের দিকে তাকিয়ে। সে এক হাতে সিগারেট ধরেছে, অন্য হাতটা পাছায় । তার চোখে কোনো ভাঁজ নেই। সোজা কথা।

    "পাগল নাকি? সবকিছু তো এতে।" বলতে গিয়ে গলাটা একটু চিপে যায়। ফোনটা  থেকে বের করে তাকানো। কালো স্ক্রিনে নিজের মুখের অস্পষ্ট ছায়া দেখা।  না, ওটাই তো আমি?

    মিলা একটা ধোঁয়া ছাড়ে। "সবকিছুই তারা এতে রাখে। তোমার স্মৃতি, তোমার যোগাযোগ, তোমার ভয়। ফোন কিনো। ক্যামেরা ছাড়া। শুধু কলের জন্য। সিম দিয়ে। পুরানো ধাঁচের।"

    "কিন্তু ছাড়া কীভাবে?" কথাটা বারান্দা থেকে নিচের রাস্তায় পড়ে যাওয়ার মতো। "আমি কি অ্যালার্ম বন্ধ করতে পারব? ম্যাপ দেখাব না? নোটিফিকেশন পাব না? বন্ধুরা মেসেজ করলে?" এক নিঃশ্বাসে সব জিজ্ঞেস করে ফেলা। "আমি কি তখন থাকব? নাকি শুধু একটি খালি দেহ হবো?"

    সে সিগারেটটা নিভিয়ে দেয়। ছাইদানি ঠেলে দেয়। "তুমি আসলে কিনা, সেটার প্রমাণ ফোনে থাকে না আরিয়ান। তুমি যে খাও, যে শ্বাস নাও, যে দেখো... এগুলোতেই থাকা উচিত।"

    বাতাসে একটা গন্ধ আসে। পাশের বাসার করলার খোসা পোড়ানোর গন্ধ। তীব্র, কাঁটালে ঘাঁ। মিলার কথায় কেমন যেন একটা সোজাসাপ্টাভাব আছে। সে যে বলে "খাও", "শ্বাস নাও"—এগুলো ভাষা না। ওর মুখে একটা খাঁটি,  উচ্চারণ।

    "আমি কিন্তু ভাবছিলাম... Faceless_07 যা বলছে..." কথা শুরু করি।

    "ওই গ্রুপের কথা আর বলো না আমার সামনে," মিলা কেটে দেয়। "ওরা সবাই ডিজিটাল গর্তে লুকানো ইঁদুর। তুমি আসলে চাও কি? অনলাইনে আরেকটা মাস্ক পরতে? নামহীন হওয়া? না, নাম বলতে হবে। মুখ দেখাতে হবে।"

    "তোমার তো সাহস বেশি," বলি একটু রাগ করেই। "তুমি তো নাচাও। লাইটের নিচে দাঁড়াও। সবাই দেখে।"

    "হ্যাঁ, দেখে," মিলা বলে, ঠোঁটে একটু বাঁক। "কিন্তু ওরা যা দেখে, তা আমার পুরোটা না। একটা টুকরো। আমি নিয়ন্ত্রণ করি কতটুকু দেখাব। এখানে, এই ঘরে, এই বারান্দায়, আমি যে কথা বলছি, এটা কেউ রেকর্ড করছে না। তুমি আর আমি। আসল জিনিস এটা।"

    ওর কথা শুনে মনে পড়ে যায়, কয়েকদিন আগের ঘটনা। ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপটা হঠাৎ একটা নোটিফিকেশন দিয়েছিল। "আপনি আজ একটি বইয়ের দোকানের নিকটে ছিলেন। পড়ার অভ্যাস চমৎকার!" সেদিন আমি মিলার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বইয়ের দোকান? হ্যাঁ, ওই যে পুরোনো দোকানটা, যেখানে মালিকটা চশমা পরে বসে থাকে, সেটার পাশ দিয়ে হেঁটেছিলাম মাত্র। দোকানের ভিতরে ঢুকিনি। তাহলে?

    অ্যাপটা কি শুধু লোকেশনই ট্র্যাক করে না? নাকি ওই এলাকার ল্যান্ডমার্ক চিনে রাখে? "বইয়ের দোকান" হিসেবে ট্যাগ করে রাখে? যদি তাই হয়, তাহলে তো... তারা জানে আমি কী ধরনের জায়গায় যাই। কী ধরনের পরিবেশ পছন্দ করি। কী ধরনের মানুষের কাছাকাছি থাকি।

    মিলা আমার মুখের ভাব দেখে বলে, "কিছু হয়েছে?"

    সব কথা খুলে বলি। অ্যাপের নোটিফিকেশন। লোকেশনের ব্যাপার। সে শুনে মাথা ঘামায়। "তাই নাকি? তাহলে তো বড়ই গোলমেলে অবস্থা। তারা তোমার চলাফেরার প্যাটার্ন শিখছে।"

    "শিখছে?"

    "হ্যাঁ, যন্ত্রগুলো শেখে। আগামীকাল যদি তুমি আরেকটা বইয়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাও, তারা লিখবে—'আহা, এই ছেলেটা তো বইপোকা!' তারপর বিজ্ঞাপন দেবে—'বই কিনুন ৫০% ছাড়ে!' জীবনটাকে তারা এভাবেই... সাজাতে চায়। একটা নির্দিষ্ট খাঁচার ভিতরে।"

    খাঁচা। শব্দটা বারান্দার উষ্ণ বাতাসে যেন লটকে থাকে।

    সেইদিন সন্ধ্যায়, কলেজে ঢুকতেই সহপাঠীটা এসে ধরে। যে নৃত্যের হলে দেখেছিল। তার নাম শুভ। শুভর মুখে এক ধরণের কৃত্রিম আড্ডার ভাব। "কি হে আরিয়ান!! প্রায়ই তো তোমাকে দেখা যায় না nowadays!"

    "ব্যস্ততা আছে," বলি সংক্ষেপে।

    "ওই ব্যস্ততা..." সে হাসে। তার হাসিতে কিছু কৌতুক মেশানো। "তুমি যে প্রায়ই ওই পুরোনো বাজারটার দিকে যাও... সাবধান থাকো ভাই। সেখানে তো নাকি অপরাধী চক্র কাজ করে। চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই... আরও কত কি!"

    কথাগুলো বলার সময় তার চোখ আমার চোখের ভিতর ঢোকার চেষ্টা করে। আমি চোখ নামাই। "শুভ, তুমি তো গুপ্তচর নাকি? আমার যাতায়াতের খবর রাখো?"

    "আরে না না!" সে হাত উড়িয়ে দেয়। "সে কী! আমি শুনেছি। লোকমুখে। আমরা তো চাই না তুমি কোনো সমস্যায় পড়ো।"


    লোকমুখ।           কথাটা শুনে গা শিরশির করে।                 লোকমুখ এখন শুধু মুখে মুখে ঘোরে না।               ডিজিটাল মুখে ঘোরে। গ্রুপে গ্রুপে।                  মেসেজে        
     
                    মেমেতে।


    ক্লাস শেষে বের হওয়ার সময় শুভ আবার বলে, "একটা কথা বলি। তুমি কিছু লিখো নাকি? কবিতা-গল্প-সাহিত্য সেসব?"

    হৃৎপিণ্ডটা যেন একসেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। "কীভাবে জানলে?" প্রশ্নটাই যেন স্বীকারোক্তি।

    "তোমার আঙুল,"

    আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটি। পিছনে তার কথাগুলো বাতাসে ভেসে আসে। "লিখতে হলে সাবধান হয়ে লিখো ভাই... আজকাল তো কাগজ-কলমেও নিরাপদ না!"

    সেই রাত। ফ্ল্যাটে একা। কম্পিউটারের সামনে বসে Faceless_07 এর সাথে চ্যাট খোলা। ওর শেষ মেসেজ কয়েকটা পড়ি। ও একটু বেশি সতর্ক হয়ে গেছে। বারবার বলছে, "তারা আমাদের প্যাকেট ইনস্পেক্ট করছে। আইএসপি লেভেলে।"

    আমি লিখি: "কিন্তু আমরা তো এনক্রিপশন ব্যবহার করছি।"

    উত্তর আসে দ্রুত: "এনক্রিপশন ভাঙার মেশিন এখন অনেকের হাতে। শুধু টেকনোলজি না, মনস্তত্ত্বও কাজ করে। তারা দেখবে কে কখন কতক্ষণ অনলাইনে থাকে। কার সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্যাটার্ন এনালাইসিস।"

    আমি লিখি: "মিলা বলে, আমি ফোন ছেড়ে দিই।"

    কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর: "মিলা ঠিক বলছে। কিন্তু তুমি পারবে?  সবাই এই ডিজিটাল হাত-পা নিয়ে এত বেড়ে উঠেছি যে, এগুলো কেটে ফেললে মনে হবে জীবনটাই অচল।"

    "তোমার কী অবস্থা?" জিজ্ঞেস করি।

    "আমার রুমের সামনে আজ অচেনা গাড়ি। দুই দিন ধরে। একটা সাদা । কেউ আসে না, যায় না। শুধু গাড়ি। আমি বাড়ি থেকে বের হয় না। আমার গবেষণার সব নথি... আমি তোমার কাছে পাঠাচ্ছি। একটা লিংক। ২৪ ঘণ্টা পর অটো-ডিলিট হবে।"

    "কেন? তুমি কী করবে?"

    "আমি হয়তো...  চলে যাব। একটুখানি শ্বাস নিতে। যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিকঠাক কাজ করে না। যেখানে মানুষ মুখোমুখি বসে গল্প করে। যেখানে মুখোশের দরকার পড়ে না, কারণ সেখানে মুখই এমনিই মাটির সঙ্গে মিশে থাকে।"

    কথাটা আমার মনকে টানে। আমারও খালপাড়ের বাড়ি। যেখানে  মশারির ভিতর শুয়ে শুনতাম  । যেখানে টিভি ছিল না। স্মার্টফোন তো দূরের কথা। এখন? বাড়িটা কি এখনও আছে? নাকি সেটাও "ডেভেলপমেন্ট"-এর ভিতরে চলে গেছে? শপিংমল, ফ্ল্যাট, পার্কিং?

    Faceless_07 লিখছে: "তোমার কাজ হলো সংগ্রহ রাখা। আমাদের গল্পগুলো রাখা। ছড়ানো। যদি আমি না থাকি... তুমি রেখো। আমাদের মুখের কথা লিখো। শুধু বিরক্তি না। আশাও আছে। যে আশাটা নিভু নিভু করে, তাকেও লিখো।"

    একটা ঝাঁকুনি লাগে। "না থাকার কথা বলো না।"

    "আমি আশাবাদী। কিন্তু প্রস্তুত থাকতে হবে। দ্যাখো, আমাদের দেশের মানুষগুলো কি মজার না? ওরা মুখে বলে 'জয় বাংলা', 'জয় বঙ্গবন্ধু', কিন্তু ভিতরে ভিতরে শুধু টাকার পিছনে ছোটে। গন মাধ্যমগুলো ধর্মের গান বাজায়, আর বিজ্ঞাপন দেয় 'লোন নিন, সুখী হোন!' শিক্ষা বেসরকারি হয়ে গেছে, মানে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট। আর আমরা... আমরা বসে বসে মুখের ভাব দেখি। এটাই আমাদের প্রধান কাজ হয়ে গেছে। কিন্তু এই দেখাটাই তো সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ। কারণ যে দেখে, সে প্রশ্ন করে।"

    ফাইল ট্রান্সফারের বার দেখা যায়। ৫%... ১০%... নাম: "Masks_Off.rar"। সাইজ বিশাল।

    "এটা কী?" জিজ্ঞেস করি।

    "আমার সবকিছু। ছাত্র-জীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত। সাক্ষাৎকার। রেকর্ডিং। ফিল্ড নোট। ছবি। কিছু ভিডিও। এগুলো শুধু ডাটা না। এগুলো মানুষ। ওই যে রিকশাওয়ালা, যে বলেছিল, 'স্যার, আমার মুখে হাসি নাই, পেটে ভাত নাই। তবুও আমি টিভিতে দেখি দেশ উন্নত হইতেছে।' ওই যে ফ্যাক্টরির মেয়ে, যে বলেছিল, 'আমরা দিনে বারো ঘণ্টা সেলাই করি, পরবাসে কাপড় পড়ি।' এদের গল্প। এদের মুখোশের নিচের মুখ।"

    ট্রান্সফার ৫০%। হঠাৎ আমার ইন্টারনেট একসেকেন্ডের জন্য ছেঁটে যায়। মনটা দ্রুত স্পন্দিত হয়। আবার ফিরে আসে।

    "আরিয়ান," Faceless_07 লিখে, "তুমি একটা কাজ করো। গ্রামে যাও। একবার। শহরের এই নকল চকচকে মুখগুলো থেকে দূরে যাও। সেখানে গিয়ে দেখো, সেখানকার মানুষদের মুখ কী রকম। ওরা কি আমাদের মতোই নকল চকচকে? নাকি ভাবেই না? শুধু বেঁচে থাকে?"

    "কীভাবে যাব? কলেজ, পরিবার..."

    "একটা ছুতনা  বানাও। প্রজেক্ট ওয়ার্ক। ফিল্ড ভিজিট। তুমি সমাজবিজ্ঞান পড়ো না? পারবে। দরকার হলে আমি একটা ফেক লেটার হেড বানিয়ে দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের।"

    ট্রান্সফার ৯০%। শেষের দিকে।

    "তোমার আসল নামটা জানতে পারি?" লিখি শেষবারের মতো।

    কিছুক্ষণ না answered। তারপর: "নাম দিয়ে কী হবে? আমি যদি হারিয়ে যাই, নামটা শুধু একটা শব্দ হয়ে থাকবে। আমার কাজ, আমার সংগ্রহ—ওটাই আমার মুখ। তুমি সেটা দেখিয়ো। বাকিটা... ।"

    ফাইল ট্রান্সফার সম্পূর্ণ। ১০০%।

    তারপর, চ্যাট উইন্ডোতে একটা লাইন আসে: "তোমার সাথে কথা করে ভালো লাগলো, মুখের ভাব দেখা মানুষ। মনে রেখো, দেখাটাই প্রথম ধাপ। দেখানোটাই আসল কাজ।"

    এক মুহূর্তের মধ্যে, Faceless_07 এর প্রোফাইল picture চলে যায়। নামটা grey out হয়। status: offline। চ্যাট হিস্টরিতেও সব মেসেজ ধীরে ধীরে fade out হতে থাকে। auto-delete।

    আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসি। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আলোয় ঘরটা নীলচে দেখায়। জানালার বাইরে শহরের লাইটগুলো জ্বলজ্বল করছে। মনে হয়, এই শহরটা একটা বিশাল প্রাণি, যে অসংখ্য চোখ দিয়ে আমাকে দেখছে। আর আমি, একজোড়া চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছি।

    মিলার কথা মনে পড়ে। "ফোন ছেড়ে দাও।"

    দাঁড়াই। ব্যালকনি দিয়ে নিচের রাস্তায় তাকাই। এক তরুণী হেঁটে যাচ্ছে, হেডফোন কানে, মুখে হাসি। একজন ফেরিওয়ালা "এই  এই  আলুর দাম কমালাম!" চিৎকার করছে। একটা গাড়ি হর্ন বাজাচ্ছে। সবাই কোনও না কোনও মুখোশ পরে আছে। হেডফোনটাও একটা মুখোশ। হর্ন বাজানোটাও।

    ফিরে এসে ফোনটা হাতে নেই। ওটা শুধু একটা যন্ত্র না। ওটা আমার prolongation। আমার extended mind। ওটা কেটে ফেললে কি আমি পঙ্গু হয়ে যাব? নাকি মুক্ত হব?

    মিলা তো বলে, "তুমি খাও, তুমি শ্বাস নাও।" এই সরল কাজগুলোই কি তখন বেশি intense হয়ে উঠবে? যখন কোনো নোটিফিকেশন আসবে না বলে মাথা ঘামাতে হবে না? যখন লোকেশন শেয়ার করতে হবে না বলে আমি যেখানে খুশি যেতে পারব?

    কিন্তু সেখানে যেতে পারব তো? শুভ তো ইঙ্গিত দিয়েছে। "অপরাধী চক্র।" এটা কি সতর্কতা? নাকি threat? তারা কি আমাকে monitor করছে? আমি যে লিখি, সেটা কি তারা টের পেয়েছে? Faceless_07 এর সাথে আমার যোগাযোগ?

    হঠাৎ একটা ভয়ানক চিন্তা আসে। যদি Faceless_07 already ধরা পড়ে যায়? যদি তার ফোন বা ল্যাপটপ seized হয়ে যায়? তাহলে তো আমার আইডিও ওদের হাতে। আমাদের কথোপকথন। ফাইল ট্রান্সফারের রেকর্ড।

    গলাটা শুকিয়ে আসে। পানি খাই। ঠাণ্ডা পানি গলা বেয়ে নামে। কিন্তু ভিতরের উত্তাপ যায় না।

    আমি ফাইলটা খুলি। "Masks_Off.rar"। পাসওয়ার্ড দিই। ভিতরে অসংখ্য ফোল্ডার। সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো। "Urban_Poor_Interviews", "Rural_Migration", "Student_Anxiety", "Digital_Divide", "Religious_Hypocrisy"।

    একটা ফোল্ডার ওপেন করি: "Voices_From_The_Field"। ভিতরে অসংখ্য অডিও ফাইল। নামগুলো: "rickshaw_pullar_01.mp3", "garment_worker_12.mp3", "street_vendor_55.mp3"।

    একটা ক্লিক করি। হেডফোন লাগাই।

    একটা কর্কশ, বয়স্ক কণ্ঠস্বর। গ্রামীণ accent। "কী বলব ভাইসাহেব... জীবন তো নিয়া বেড় আইছে। হাউজে চারটা মুখ। কাজ নাই। জমি নাই। ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ে। টাকা লাগে। টিভিতে দেখি, দেশ এগুইতাছে। কই আমার এগুনি? আমার তো পিছুনি। মুখে হাসি দিয়া রাখি, নইলে মানুষ কী ভাববে? ভাববে, হতদরিদ্র।"

    আরেকটা ভয়েস। মেয়ের কণ্ঠ। নরম, কিন্তু ক্লান্ত। "আমরা দিনে দশ ঘন্টা সেলাই করি। আঙুল ফুলে যায়। মালিক বলে, তোমরা ভালকপালে , কর্ম  পাইছো। শহরে থাকো। কিন্তু এই শহর আমাদের না ভাই। আমাদের  বাড়িটাই মনে পরে। যেখানে সন্ধ্যায় হাস মাছ ধরতে যাইতাম। এখন? এখন হাস দেখলে শুধু রেস্টুরেন্টের মেন্যুতে।"

    কান থেকে হেডফোন খুলে রাখি। চোখ বন্ধ করি। এই voices গুলো আমার মাথার ভিতর ঘুরপাক খায়। এরা শুধু ডাটা না। এরা জীবন্ত মানুষ। যারা মুখোশ পরে, কিন্তু মুখোশের নিচে রক্ত-মাংসের মুখ আছে। যারা ভাবে, কাঁদে, হাসে।

    Faceless_07 এই voices গুলো জড়ো করেছে। risk নিয়েছে। কেন? শুধু একাডেমিক গবেষণার জন্য? না। deeper reason আছে। প্রমাণ করার জন্য যে, আমরা exist করি। আমাদের গল্প important।

    মিলার কথা মনে পড়ে। "নাম দিতে হবে। মুখ দেখাতে হবে।"

    কিন্তু ভয়? ভয়টা আসলে কী? শারীরিক নির্যাতন? জেল? না... তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু। oblivion। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। ডিজিটাল দুনিয়া থেকে delete হয়ে যাওয়া। যেমন Faceless_07 delete হয়ে গেল। এমনভাবে মুছে যাওয়া যে, কেউ জানবেই না আমি ছিলাম।

    তাহলে? লুকিয়ে থাকব? নাকি মুখোমুখি হব?

    ডেস্কের দেরাজ থেকে একটা পুরনো নোটবুক বের করি। কাগজের। একটা কলম নেই। একটা পেন্সিল খুঁজে পাই। প্রথম পাতায় লেখা: "ক্লাস নোট।"

    আমি একটা নতুন পৃষ্ঠা উল্টাই। পেন্সিলের ডগা কাগজের উপর রাখি। প্রথম লাইন লিখি: "আমি দেখছি।"

    তারপর থামি। কি লিখব? Faceless_07 এর voices গুলোর কথা? মিলার কথা? শুভর threat এর কথা?

    না। নিজের কথা লিখব। আমার দেখা মুখগুলোর কথা। বারিস্টার মেয়েটির ক্লান্ত হাসির কথা। বইয়ের দোকানের মালিকের silent warning এর কথা। অধ্যাপকের irritated মুখের কথা। নৃত্যের হলের মেয়েদের blank দৃষ্টির কথা।

    লিখতে শুরু করি। 

    "জেগে উঠা। স্ক্রিন দেখা। লাল বিন্দু দেখা। স্ক্রল করা। কেনাকাটার temptation দেখা। রাস্তায় হাঁটা। মানুষের মুখ দেখা। হাসি দেখা। ক্লান্তি দেখা। কলেজে যাওয়া। শিক্ষকের মুখোশ দেখা। বন্ধুদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মুখ দেখা। নৃত্যের হলে যাওয়া। দেহের ভাষা দেখা। ফাঁকা চোখ দেখা। ফিরে আসা। লিখতে বসা। ভয় পাইয়া থামা। আবার লিখা।"

    হাতে লেখার সময় একটা strange feeling হয়। কিবোর্ডে টাইপ করার মতো না। পেন্সিলের খসখস শব্দ। কাগজের texture। এটা more real। এটা trace রাখে। ডিলিট করলেও দাগ থাকে।

    ঘন্টাখানেক লিখি। হাত ব্যথা করে। থামি।

    মোবাইল ফোনটা আবার হাতে নেই। একটা urge হয় চেক করার। কী happening? কে মেসেজ দিছে? notification কী আসছে?

    Resist করি। বারান্দায় যাই। গভীর শ্বাস নেই।

    মিলার কথা মনে পড়ে। "একটা সাধারণ ফোন কিনো।"

    কাল সকালেই কিনব। আর এই smartphone টা... কী করব? ফেলে দেব? না, keep করব। কিন্তু switch off করে রাখব। emergency এর জন্য।

    ফিরে এসে কম্পিউটারে Faceless_07 এর ফাইলগুলো backup করি। একটা external hard drive এ। আরেকটা কপি cloud এ encrypt করে রাখি। কয়েকটা পেনড্রাইভে কপি করি।

    একটা পেনড্রাইভে লেবেল লাগাই: "Masker Mukh" (মুখোশের মুখ)।

    রাত হয়। শহরের noises কমে যায়। শুধু দূরের কোনও ট্রেনের আওয়াজ。

    আমি জানালার পাশে দাঁড়াই। কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখি। কি expression? ভয়? uncertainty? determination? ঠিক বুঝতে পারি না।

    এই মুখটাই তো আমার প্রধান asset। এই মুখ দিয়েই আমি দেখি। এই মুখ দিয়েই আমি দেখাব।

    মিলা right। Faceless হওয়া যাবে না। নাম দিতে হবে। মুখ দেখাতে হবে।

    আর Faceless_07... সে হয়তো already gone। কিন্তু সে যা রেখে গেছে, তা দিয়ে কাজ  করতে হবে।

    একটা decision নেই। কাল থেকে change start করব। ফোন change করব।  যাবার plan করব। আর... লিখব। properly। বই আকারে।

    ভয় আছে। প্রচণ্ড ভয়। কিন্তু ভয়ের মধ্যেও একটা excitement আছে। একটা liberation এর feeling。

    কারণ, যদি মুখোশের নিচে মুখ থাকে, তাহলে সেটা দেখানোর চেষ্টা না করলে, মুখোশটাই permanent হয়ে যাবে।
     


     মুখোশ      permanent                          হতে দেওয়া                                                                                                              যাবেনা ।
     


    জানালা বন্ধ করি। লাইট নিভাই。

    বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করি। চোখের সামনে countless মুখ ভেসে উঠে। হাসি মুখ। কান্না মুখ। blank মুখ।

    আর তাদের পিছনে, Faceless_07 এর কথাগুলো ঘুরপাক খায়: "তোমার কাজ হলো দেখানো।"

    হ্যাঁ। দেখাবো।

    শুরু করব কালই।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন