লোকমুখ। কথাটা শুনে গা শিরশির করে। লোকমুখ এখন শুধু মুখে মুখে ঘোরে না। ডিজিটাল মুখে ঘোরে। গ্রুপে গ্রুপে। মেসেজে
মেমেতে।
ক্লাস শেষে বের হওয়ার সময় শুভ আবার বলে, "একটা কথা বলি। তুমি কিছু লিখো নাকি? কবিতা-গল্প-সাহিত্য সেসব?"
হৃৎপিণ্ডটা যেন একসেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। "কীভাবে জানলে?" প্রশ্নটাই যেন স্বীকারোক্তি।
"তোমার আঙুল,"
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটি। পিছনে তার কথাগুলো বাতাসে ভেসে আসে। "লিখতে হলে সাবধান হয়ে লিখো ভাই... আজকাল তো কাগজ-কলমেও নিরাপদ না!"
সেই রাত। ফ্ল্যাটে একা। কম্পিউটারের সামনে বসে Faceless_07 এর সাথে চ্যাট খোলা। ওর শেষ মেসেজ কয়েকটা পড়ি। ও একটু বেশি সতর্ক হয়ে গেছে। বারবার বলছে, "তারা আমাদের প্যাকেট ইনস্পেক্ট করছে। আইএসপি লেভেলে।"
আমি লিখি: "কিন্তু আমরা তো এনক্রিপশন ব্যবহার করছি।"
উত্তর আসে দ্রুত: "এনক্রিপশন ভাঙার মেশিন এখন অনেকের হাতে। শুধু টেকনোলজি না, মনস্তত্ত্বও কাজ করে। তারা দেখবে কে কখন কতক্ষণ অনলাইনে থাকে। কার সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্যাটার্ন এনালাইসিস।"
আমি লিখি: "মিলা বলে, আমি ফোন ছেড়ে দিই।"
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর: "মিলা ঠিক বলছে। কিন্তু তুমি পারবে? সবাই এই ডিজিটাল হাত-পা নিয়ে এত বেড়ে উঠেছি যে, এগুলো কেটে ফেললে মনে হবে জীবনটাই অচল।"
"তোমার কী অবস্থা?" জিজ্ঞেস করি।
"আমার রুমের সামনে আজ অচেনা গাড়ি। দুই দিন ধরে। একটা সাদা । কেউ আসে না, যায় না। শুধু গাড়ি। আমি বাড়ি থেকে বের হয় না। আমার গবেষণার সব নথি... আমি তোমার কাছে পাঠাচ্ছি। একটা লিংক। ২৪ ঘণ্টা পর অটো-ডিলিট হবে।"
"কেন? তুমি কী করবে?"
"আমি হয়তো... চলে যাব। একটুখানি শ্বাস নিতে। যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিকঠাক কাজ করে না। যেখানে মানুষ মুখোমুখি বসে গল্প করে। যেখানে মুখোশের দরকার পড়ে না, কারণ সেখানে মুখই এমনিই মাটির সঙ্গে মিশে থাকে।"
কথাটা আমার মনকে টানে। আমারও খালপাড়ের বাড়ি। যেখানে মশারির ভিতর শুয়ে শুনতাম । যেখানে টিভি ছিল না। স্মার্টফোন তো দূরের কথা। এখন? বাড়িটা কি এখনও আছে? নাকি সেটাও "ডেভেলপমেন্ট"-এর ভিতরে চলে গেছে? শপিংমল, ফ্ল্যাট, পার্কিং?
Faceless_07 লিখছে: "তোমার কাজ হলো সংগ্রহ রাখা। আমাদের গল্পগুলো রাখা। ছড়ানো। যদি আমি না থাকি... তুমি রেখো। আমাদের মুখের কথা লিখো। শুধু বিরক্তি না। আশাও আছে। যে আশাটা নিভু নিভু করে, তাকেও লিখো।"
একটা ঝাঁকুনি লাগে। "না থাকার কথা বলো না।"
"আমি আশাবাদী। কিন্তু প্রস্তুত থাকতে হবে। দ্যাখো, আমাদের দেশের মানুষগুলো কি মজার না? ওরা মুখে বলে 'জয় বাংলা', 'জয় বঙ্গবন্ধু', কিন্তু ভিতরে ভিতরে শুধু টাকার পিছনে ছোটে। গন মাধ্যমগুলো ধর্মের গান বাজায়, আর বিজ্ঞাপন দেয় 'লোন নিন, সুখী হোন!' শিক্ষা বেসরকারি হয়ে গেছে, মানে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট। আর আমরা... আমরা বসে বসে মুখের ভাব দেখি। এটাই আমাদের প্রধান কাজ হয়ে গেছে। কিন্তু এই দেখাটাই তো সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ। কারণ যে দেখে, সে প্রশ্ন করে।"
ফাইল ট্রান্সফারের বার দেখা যায়। ৫%... ১০%... নাম: "Masks_Off.rar"। সাইজ বিশাল।
"এটা কী?" জিজ্ঞেস করি।
"আমার সবকিছু। ছাত্র-জীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত। সাক্ষাৎকার। রেকর্ডিং। ফিল্ড নোট। ছবি। কিছু ভিডিও। এগুলো শুধু ডাটা না। এগুলো মানুষ। ওই যে রিকশাওয়ালা, যে বলেছিল, 'স্যার, আমার মুখে হাসি নাই, পেটে ভাত নাই। তবুও আমি টিভিতে দেখি দেশ উন্নত হইতেছে।' ওই যে ফ্যাক্টরির মেয়ে, যে বলেছিল, 'আমরা দিনে বারো ঘণ্টা সেলাই করি, পরবাসে কাপড় পড়ি।' এদের গল্প। এদের মুখোশের নিচের মুখ।"
ট্রান্সফার ৫০%। হঠাৎ আমার ইন্টারনেট একসেকেন্ডের জন্য ছেঁটে যায়। মনটা দ্রুত স্পন্দিত হয়। আবার ফিরে আসে।
"আরিয়ান," Faceless_07 লিখে, "তুমি একটা কাজ করো। গ্রামে যাও। একবার। শহরের এই নকল চকচকে মুখগুলো থেকে দূরে যাও। সেখানে গিয়ে দেখো, সেখানকার মানুষদের মুখ কী রকম। ওরা কি আমাদের মতোই নকল চকচকে? নাকি ভাবেই না? শুধু বেঁচে থাকে?"
"কীভাবে যাব? কলেজ, পরিবার..."
"একটা ছুতনা বানাও। প্রজেক্ট ওয়ার্ক। ফিল্ড ভিজিট। তুমি সমাজবিজ্ঞান পড়ো না? পারবে। দরকার হলে আমি একটা ফেক লেটার হেড বানিয়ে দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের।"
ট্রান্সফার ৯০%। শেষের দিকে।
"তোমার আসল নামটা জানতে পারি?" লিখি শেষবারের মতো।
কিছুক্ষণ না answered। তারপর: "নাম দিয়ে কী হবে? আমি যদি হারিয়ে যাই, নামটা শুধু একটা শব্দ হয়ে থাকবে। আমার কাজ, আমার সংগ্রহ—ওটাই আমার মুখ। তুমি সেটা দেখিয়ো। বাকিটা... ।"
ফাইল ট্রান্সফার সম্পূর্ণ। ১০০%।
তারপর, চ্যাট উইন্ডোতে একটা লাইন আসে: "তোমার সাথে কথা করে ভালো লাগলো, মুখের ভাব দেখা মানুষ। মনে রেখো, দেখাটাই প্রথম ধাপ। দেখানোটাই আসল কাজ।"
এক মুহূর্তের মধ্যে, Faceless_07 এর প্রোফাইল picture চলে যায়। নামটা grey out হয়। status: offline। চ্যাট হিস্টরিতেও সব মেসেজ ধীরে ধীরে fade out হতে থাকে। auto-delete।
আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসি। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আলোয় ঘরটা নীলচে দেখায়। জানালার বাইরে শহরের লাইটগুলো জ্বলজ্বল করছে। মনে হয়, এই শহরটা একটা বিশাল প্রাণি, যে অসংখ্য চোখ দিয়ে আমাকে দেখছে। আর আমি, একজোড়া চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছি।
মিলার কথা মনে পড়ে। "ফোন ছেড়ে দাও।"
দাঁড়াই। ব্যালকনি দিয়ে নিচের রাস্তায় তাকাই। এক তরুণী হেঁটে যাচ্ছে, হেডফোন কানে, মুখে হাসি। একজন ফেরিওয়ালা "এই এই আলুর দাম কমালাম!" চিৎকার করছে। একটা গাড়ি হর্ন বাজাচ্ছে। সবাই কোনও না কোনও মুখোশ পরে আছে। হেডফোনটাও একটা মুখোশ। হর্ন বাজানোটাও।
ফিরে এসে ফোনটা হাতে নেই। ওটা শুধু একটা যন্ত্র না। ওটা আমার prolongation। আমার extended mind। ওটা কেটে ফেললে কি আমি পঙ্গু হয়ে যাব? নাকি মুক্ত হব?
মিলা তো বলে, "তুমি খাও, তুমি শ্বাস নাও।" এই সরল কাজগুলোই কি তখন বেশি intense হয়ে উঠবে? যখন কোনো নোটিফিকেশন আসবে না বলে মাথা ঘামাতে হবে না? যখন লোকেশন শেয়ার করতে হবে না বলে আমি যেখানে খুশি যেতে পারব?
কিন্তু সেখানে যেতে পারব তো? শুভ তো ইঙ্গিত দিয়েছে। "অপরাধী চক্র।" এটা কি সতর্কতা? নাকি threat? তারা কি আমাকে monitor করছে? আমি যে লিখি, সেটা কি তারা টের পেয়েছে? Faceless_07 এর সাথে আমার যোগাযোগ?
হঠাৎ একটা ভয়ানক চিন্তা আসে। যদি Faceless_07 already ধরা পড়ে যায়? যদি তার ফোন বা ল্যাপটপ seized হয়ে যায়? তাহলে তো আমার আইডিও ওদের হাতে। আমাদের কথোপকথন। ফাইল ট্রান্সফারের রেকর্ড।
গলাটা শুকিয়ে আসে। পানি খাই। ঠাণ্ডা পানি গলা বেয়ে নামে। কিন্তু ভিতরের উত্তাপ যায় না।
আমি ফাইলটা খুলি। "Masks_Off.rar"। পাসওয়ার্ড দিই। ভিতরে অসংখ্য ফোল্ডার। সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো। "Urban_Poor_Interviews", "Rural_Migration", "Student_Anxiety", "Digital_Divide", "Religious_Hypocrisy"।
একটা ফোল্ডার ওপেন করি: "Voices_From_The_Field"। ভিতরে অসংখ্য অডিও ফাইল। নামগুলো: "rickshaw_pullar_01.mp3", "garment_worker_12.mp3", "street_vendor_55.mp3"।
একটা ক্লিক করি। হেডফোন লাগাই।
একটা কর্কশ, বয়স্ক কণ্ঠস্বর। গ্রামীণ accent। "কী বলব ভাইসাহেব... জীবন তো নিয়া বেড় আইছে। হাউজে চারটা মুখ। কাজ নাই। জমি নাই। ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ে। টাকা লাগে। টিভিতে দেখি, দেশ এগুইতাছে। কই আমার এগুনি? আমার তো পিছুনি। মুখে হাসি দিয়া রাখি, নইলে মানুষ কী ভাববে? ভাববে, হতদরিদ্র।"
আরেকটা ভয়েস। মেয়ের কণ্ঠ। নরম, কিন্তু ক্লান্ত। "আমরা দিনে দশ ঘন্টা সেলাই করি। আঙুল ফুলে যায়। মালিক বলে, তোমরা ভালকপালে , কর্ম পাইছো। শহরে থাকো। কিন্তু এই শহর আমাদের না ভাই। আমাদের বাড়িটাই মনে পরে। যেখানে সন্ধ্যায় হাস মাছ ধরতে যাইতাম। এখন? এখন হাস দেখলে শুধু রেস্টুরেন্টের মেন্যুতে।"
কান থেকে হেডফোন খুলে রাখি। চোখ বন্ধ করি। এই voices গুলো আমার মাথার ভিতর ঘুরপাক খায়। এরা শুধু ডাটা না। এরা জীবন্ত মানুষ। যারা মুখোশ পরে, কিন্তু মুখোশের নিচে রক্ত-মাংসের মুখ আছে। যারা ভাবে, কাঁদে, হাসে।
Faceless_07 এই voices গুলো জড়ো করেছে। risk নিয়েছে। কেন? শুধু একাডেমিক গবেষণার জন্য? না। deeper reason আছে। প্রমাণ করার জন্য যে, আমরা exist করি। আমাদের গল্প important।
মিলার কথা মনে পড়ে। "নাম দিতে হবে। মুখ দেখাতে হবে।"
কিন্তু ভয়? ভয়টা আসলে কী? শারীরিক নির্যাতন? জেল? না... তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু। oblivion। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। ডিজিটাল দুনিয়া থেকে delete হয়ে যাওয়া। যেমন Faceless_07 delete হয়ে গেল। এমনভাবে মুছে যাওয়া যে, কেউ জানবেই না আমি ছিলাম।
তাহলে? লুকিয়ে থাকব? নাকি মুখোমুখি হব?
ডেস্কের দেরাজ থেকে একটা পুরনো নোটবুক বের করি। কাগজের। একটা কলম নেই। একটা পেন্সিল খুঁজে পাই। প্রথম পাতায় লেখা: "ক্লাস নোট।"
আমি একটা নতুন পৃষ্ঠা উল্টাই। পেন্সিলের ডগা কাগজের উপর রাখি। প্রথম লাইন লিখি: "আমি দেখছি।"
তারপর থামি। কি লিখব? Faceless_07 এর voices গুলোর কথা? মিলার কথা? শুভর threat এর কথা?
না। নিজের কথা লিখব। আমার দেখা মুখগুলোর কথা। বারিস্টার মেয়েটির ক্লান্ত হাসির কথা। বইয়ের দোকানের মালিকের silent warning এর কথা। অধ্যাপকের irritated মুখের কথা। নৃত্যের হলের মেয়েদের blank দৃষ্টির কথা।
লিখতে শুরু করি।
"জেগে উঠা। স্ক্রিন দেখা। লাল বিন্দু দেখা। স্ক্রল করা। কেনাকাটার temptation দেখা। রাস্তায় হাঁটা। মানুষের মুখ দেখা। হাসি দেখা। ক্লান্তি দেখা। কলেজে যাওয়া। শিক্ষকের মুখোশ দেখা। বন্ধুদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মুখ দেখা। নৃত্যের হলে যাওয়া। দেহের ভাষা দেখা। ফাঁকা চোখ দেখা। ফিরে আসা। লিখতে বসা। ভয় পাইয়া থামা। আবার লিখা।"
হাতে লেখার সময় একটা strange feeling হয়। কিবোর্ডে টাইপ করার মতো না। পেন্সিলের খসখস শব্দ। কাগজের texture। এটা more real। এটা trace রাখে। ডিলিট করলেও দাগ থাকে।
ঘন্টাখানেক লিখি। হাত ব্যথা করে। থামি।
মোবাইল ফোনটা আবার হাতে নেই। একটা urge হয় চেক করার। কী happening? কে মেসেজ দিছে? notification কী আসছে?
Resist করি। বারান্দায় যাই। গভীর শ্বাস নেই।
মিলার কথা মনে পড়ে। "একটা সাধারণ ফোন কিনো।"
কাল সকালেই কিনব। আর এই smartphone টা... কী করব? ফেলে দেব? না, keep করব। কিন্তু switch off করে রাখব। emergency এর জন্য।
ফিরে এসে কম্পিউটারে Faceless_07 এর ফাইলগুলো backup করি। একটা external hard drive এ। আরেকটা কপি cloud এ encrypt করে রাখি। কয়েকটা পেনড্রাইভে কপি করি।
একটা পেনড্রাইভে লেবেল লাগাই: "Masker Mukh" (মুখোশের মুখ)।
রাত হয়। শহরের noises কমে যায়। শুধু দূরের কোনও ট্রেনের আওয়াজ。
আমি জানালার পাশে দাঁড়াই। কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখি। কি expression? ভয়? uncertainty? determination? ঠিক বুঝতে পারি না।
এই মুখটাই তো আমার প্রধান asset। এই মুখ দিয়েই আমি দেখি। এই মুখ দিয়েই আমি দেখাব।
মিলা right। Faceless হওয়া যাবে না। নাম দিতে হবে। মুখ দেখাতে হবে।
আর Faceless_07... সে হয়তো already gone। কিন্তু সে যা রেখে গেছে, তা দিয়ে কাজ করতে হবে।
একটা decision নেই। কাল থেকে change start করব। ফোন change করব। যাবার plan করব। আর... লিখব। properly। বই আকারে।
ভয় আছে। প্রচণ্ড ভয়। কিন্তু ভয়ের মধ্যেও একটা excitement আছে। একটা liberation এর feeling。
কারণ, যদি মুখোশের নিচে মুখ থাকে, তাহলে সেটা দেখানোর চেষ্টা না করলে, মুখোশটাই permanent হয়ে যাবে।
মুখোশ permanent হতে দেওয়া যাবেনা ।
জানালা বন্ধ করি। লাইট নিভাই。
বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করি। চোখের সামনে countless মুখ ভেসে উঠে। হাসি মুখ। কান্না মুখ। blank মুখ।
আর তাদের পিছনে, Faceless_07 এর কথাগুলো ঘুরপাক খায়: "তোমার কাজ হলো দেখানো।"
হ্যাঁ। দেখাবো।
শুরু করব কালই।