এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ‘ছায়া ও মুখশ্রী’

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ৫৪ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4
    দোকানের ভিতরে ঢোকার ঝোঁক সংবরণ করা। মালিকের দিকে শুধু তাকানো। একটা বুড়ো মানুষ। মোটা চশমার পিছনে চোখ, জলের মতো। তিনি জানেন। তিনি অনেক কিছু দেখেছেন। তিনি কিছু বলেন না। শুধু একটা ইঙ্গিত, একটা ম্লান হাসি: চুপ থাকা। মুখের ভাব বজায় রাখা। নিরাপদ থাকা।

    ফিরে যাওয়া বাসার দিকে। রাস্তায় মানুষের ভিড়। সবাই দ্রুত হাঁটছে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। সবাই নিজের গন্তব্যে। সবাই নিজের ফোনে।

    হঠাৎ একটা শিশুর কান্না শোনা। একটা মা শিশুটিকে কোলে নিয়ে আদর করছে। শিশুর মুখে আসল কান্না। আসল আবেগ। কোনো মুখোশ নেই। কোনো ভান নেই। শুধু বিশুদ্ধ পাওয়া না পাওয়ার হিসাব।

    দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকা। মা নজর দেখে এক আমাকে। আবার শিশুর দিকে মনোযোগ দেওয়া। আমি আমার ফোন বের করি। ছবি না। শুধু দেখতে থাকা। আসল মুখ। আসল আবেগ, না পাওয়ার হাসি- না প্রকাশ করার অধিকার।

    কিছুক্ষণ পর শিশু শান্ত হওয়া। মা তাকে নিয়ে চলে যাওয়া। আমি দাঁড়িয়ে থাকি। মনে হয় আমি একটা মুহূর্ত দেখলাম যা কোনো ফিল্টার দিয়ে যায়নি। কোনো স্ক্রিনে ক্যাপচার হয়নি। শুধু চোখে দেখা। শুধু মনে থাকা।

    বাসায় ফেরা। দরজা বন্ধ করা। নিঃশব্দতা, শুধু ফ্রিজের গুঞ্জন। কম্পিউটার চালু করা। পুরনো যন্ত্র, ফ্যান ঘুরতে থাকার শব্দ। একটা ফাঁকা ডকুমেন্ট খোলা। সাদা পৃষ্ঠা। কার্সারটা ফাঁকা সাদা জায়গায় ঝিকিমিকি, হার্টবিটের মতো।

    আঙুল কি-বোর্ডের উপর। ক্লিক করার শব্দ। প্রথম  লেখা: "আজ একটা শিশুর কান্না দেখলাম।"

    তারপর থেমে যাওয়া। কি লিখব? কি বলার সাহস আছে? কি বলার না? কোন শব্দগুলো নিরাপদ? কোন বাক্যগুলো বিপজ্জনক?

    মনে পড়া গণমাধ্যমের মুখদের কথা। প্রাইম টাইম নিউজের অ্যাঙ্কর। তাদের মসৃণ কথাবার্তা। তাদের নিখুঁত চুল, টাইয়ের গ্রন্থি। তারা বলছে: "দেশ উন্নতির পথে। নতুন উচ্চতায়।" "আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মূল্যবোধ রক্ষা করা হচ্ছে শক্ত হাতে।" কিন্তু একই চ্যানেলে, একই স্বরে, সংবাদ স্ক্রলে চলে আসে: "নাগরিকদের অনলাইন নিরাপত্তা আইন মেনে চলতে হবে। গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে।" "রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত আরও পাঁচজন আটক।" "বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে ব্লগ বন্ধ।"

    কি "বিভ্রান্তিকর"? কি "রাষ্ট্রবিরোধী"? কি "গুজব"? কে নির্ধারণ করে? সেই মুখগুলো? যারা টাই বাঁধে? যাদের কথার স্বর কখনো বদলায় না?

    আমার নিজের কথাগুলো পড়া। "আজ একটা শিশুর কান্না দেখলাম।" এই কি বিভ্রান্তিকর? এই কি বিপজ্জনক? এই কি একটা গুজব, যে একটা শিশু কেঁদেছিল?

    তবু লিখতে থাকা। আঙুল চলতে থাকা। অসমাপিকা ক্রিয়ায়। কারণ এটাই আমার বাস্তবতা। অসমাপ্ত। চলমান। একটা অর্ধেক গল্প, যার সমাপ্তি আমার হাতে নেই।

    "আজ একটা শিশুর কান্না দেখলাম। শহরের রাস্তায়। তার মা তাকে আদর করছিল। শিশুর মুখে কোনো মুখোশ ছিল না। কোনো ভান ছিল না। শুধু বিশুদ্ধ কান্না। আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম। ছবি তুলিনি। শুধু মনে রাখলাম। হয়তো এই একটা মুহূর্তই আসল। বাকি সব ছায়া।"

    উইন্ডো বন্ধ করার আগে, ডকুমেন্টটা সংরক্ষণ করা। নাম দেওয়া: "Real_Moment_1.txt." একটা নিরীহ নাম। তারপর সেটাকে জিপ ফাইল করে, পাসওয়ার্ড দেওয়া। তারপর সেই জিপ ফাইলটাকে আরেকটা ফোল্ডারে, গেমস বা সফটওয়্যারের ফোল্ডারে লুকিয়ে রাখা। একটা গভীর, নিরীহ কবরে।

    বিছানায় শুয়ে পড়া। ছাদের ফ্যান আবার ঘুরতে দেখা। ক্লিক ক্লিক শব্দ। আজকের মুখগুলো মনে পড়া। বারিস্টার মেয়েটির পেশাদার হাসি, তার ট্যাটুর আংশিক দৃশ্য। বইয়ের দোকানের মালিকের চাপা সতর্কতা, তার জলের মতো চোখ। শিশুটির কান্না, তার ভেজা চোখ। মায়ের আদর।

    এই সব মুখ। এই সব ভাব। এই সব ছায়া, যা আমরা পরি। এই সব মুখোশ, যা আমরা বদলাই পরিস্থিতি অনুযায়ী।

    আমি কি তাদের থেকে আলাদা? আমি কি আমার মুখের ভাব বজায় রাখি না?
    হ্যাঁ। আমি করি। আমরা সবাই করি। এটাই আমাদের মুদ্রা। এটাই আমাদের বেঁচে থাকার উপায়, এই নজরদারির যুগে। একটা নিখুঁত, নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তি। একটা শান্ত, অনুমোদিত মুখ।

    তবু ভিতরে কিছু প্রতিবাদ করছে। একটা ক্ষুদ্র, নিরব কণ্ঠ, যা ফিসফিস করে। লিখতে চাইছে। চিৎকার করতে চাইছে। দেওয়ালে লিখতে চাইছে। বলতে চাইছে: "এই দেখ, এই আমাদের জীবন। এই দেখ, এই আমাদের কারাগার, যার দরজা নেই। এই দেখ, আমাদের মুখ, যা আমরা ভুলে গেছি কেমন।"

    চোখ বন্ধ করা। ফ্যানের শব্দ দূর হয়ে যাওয়া। স্বপ্ন দেখতে শুরু করা।

    স্বপ্নে, আমি একটা বড়, গোলাকার হলরুমে আছি। সিলিং । সবাই দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবাই তাদের মুখে একটা মসৃণ, শিন শিন করা মাস্ক পরেছে, হাসির ছবি আঁকা। হঠাৎ, একজন তার মাস্ক খুলে ফেলছে। নিচে ফেলে দিচ্ছে। ক্র্যাক শব্দ। তারপর আরেকজন। আরেকজন। সবাই খুলে ফেলছে। নিচে পড়ে যাওয়া মাস্কের শব্দ। তাদের প্রকৃত মুখ দেখা যাচ্ছে। ক্লান্ত। ভয়ঙ্কর। সুন্দর। কাঁচা। তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। প্রথমে ভয়। তারপর বিস্ময়। তারপর হাসি। প্রকৃত হাসি, চোখে কুঞ্চনসহ। তারা কাঁদছে। অঝোরে। তারা কথা বলছে। জোরে। কোনো স্ক্রিন নেই। কোনো নোটিফিকেশন নেই। শুধু মুখ। শুধু মানুষ। শুধু কণ্ঠ।

    তারপর একটা অ্যালার্ম বাজতে থাকা। কাঁপুনি। জেগে ওঠা।

    সকাল। ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠা। : ৭:৩০। নতুন নোটিফিকেশন: ১২টি।

    আবার শুরু।

    স্ক্রল করতে শুরু করা।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন