এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অধ্যায় ৯: সংযোগ এবং ফিসফিস ধ্বনি

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ৯৮ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12
    মিলার সাথে দেখা করতে থাকা। শুধু নৃত্যের হলে নয়। কখনো একটি পার্কে। বেঞ্চে বসা। তার পাশে বসা। ঝাউগাছের নিচে। পাতার শব্দ। শহরের আওয়াজ দূরে মৃদু হয়ে আসা।

    সে বলে তার গল্প। গ্রামের নামটা বলতে তার ঠোঁট কাঁপা। "আমার বাড়ি...  এক গাঁয়। নদীর পাশে। পাহাড় দেখা যায় দূর থেকে। ঘরটা টিনের। বৃষ্টির সময় তারপর টুপটাপ শব্দ। "

    তার কথায় আঞ্চলিক শব্দ মিশে আসা। "গাঁয়", "পিঠা", "তারপর" শব্দগুলো আমার কানে নতুন লাগা। শহুরে স্ট্যান্ডার্ড বাংলার চেয়ে ভিন্ন। মোটামুটি। কাঁচা। গোঁফালে।

    আমি জিগাই, "গ্রাম ছাইড়া আইছো ক্যান?"

    সে তাকাই আমার দিকে। অবাক হই। আমি কেন আঞ্চলিক ভাষায় জিগাইলাম? হয়তো তার মুখের টান আমাকে টানি দিছে।

    সে হাসি। "টাকা লাগবে। বাবা অসুস্থ। হাসপাতালে নিতে হবে। দাইখন... শহরে কাজের সুযোগ বেশি। কলেজের এক বন্ধুর কথা শুনছি। নাচের কাজ আছে। প্রথমে ভাবছিলাম, পারবো না। লাজ লাগত। তারপর মনে হইল, শরীরের ভাষাও তো ভাষা। কবিতা লিখতে পারি শরীর দিয়ে।"

    তার মুখে এক ধরনের মিশ্রণ। আঞ্চলিক শব্দ আর শহুরে ভাব। দুই জগতের মানুষ। দুই মুখোশ।

    আমি আমার গল্প বলতে শুরু করি। বিরক্তির কথা। নজরদারির কথা। মুখের ভাব পড়ার নেশার কথা।

    সে মন দিয়ে শুনে। মাঝে মাঝে মাথা নড়ায়। "হুঁ" বলে। "তা তো। সবাইকে তো দেখি মিছা মুখোশ পরে। আমাদের গাঁয়েও লাগে। বিয়ের সময়, শোকের সময়... মানুষ মুখে এক কথা, মনে আরক।"

    আমি তাকে Faceless গ্রুপের কথা বলি না। ভয় পাই। তাকে বিপদে ফেলতে চাই না। তার জীবনেই তো যথেষ্ট ঝুঁকি।

    সে বলে, "তোমার লেখাগুলো... কাউকে দেখাও না?"

    "ভয় লাগে।"

    "ভয় লাগবেই। কিন্তু  একা একা লিখলে হয় না। মানুষের দিলে পৌঁছাতে হবে।"

    "কিন্তু যদি কেউ বুঝতে না পারে? যদি দিলে না পৌঁছে?"

    "তা হোক। চেষ্টা করতে হবে। আমি যখন প্রথম নাচতে শিখি... স্টেজে উঠলে পা কাঁপত। মনে হইত, সবাই আমাকে খারাপ চোখে দেখত। তারপর একদিন দেখলাম, এক ভদ্রলোক চোখের পানি ফেলতেছেন মঞ্চের পাশে। আমার নাচে তার কি স্মৃতি জাগিয়া উঠছিল, কে জানে। সেই দিন বুঝলাম, আমার শরীরের ভাষা কারো দিলে পৌঁছাইছে।"

    তখনই আমার ফোনে একটি নোটিফিকেশন আসে। ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপ থেকে। "আপনার আজকের স্ক্রিন টাইম রিপোর্ট: ৫ ঘন্টা ৩২ মিনিট। গড়ের চেয়ে ১৮% বেশি। আপনার মেন্টাল হেলথের জন্য 'গ্রিন টাইম' সুপারিশ করা হচ্ছে। পার্কে থাকাকালীন গাছপালা দেখুন, ফোন নয়।"

    মিলার দিকে তাকাই। সে আমার মুখের ভাব দেখে কিছু বুঝতে পারে। "কি হইছে?"

    "ফোন... তারা দেখছে।"

    "কে তারা?"

    "যারা। অ্যাপ। সরকার। কোম্পানি। সবাই।"

    সে আমার হাতের ফোনটা নেয়। দেখে। "এটাতে অন করিয়া রাখছো সব? লোকেশন? মাইক্রোফোন?"

    "হ্যাঁ। না করলে অনেক অ্যাপ কাজ করে না।"

    "তুমি পাগল নাকি? নিজের গলায় নিজে ছুরি দিয়া ফালাইছো?"

    সে রাগ করে। তার চোখে সত্যিকারের রাগ। গ্রাম্য মেয়ের রাগ। সরল। তীক্ষ্ণ।

    "কিন্তু কী করব? সবাই তো করে।"

    "সবাই করলে তুমিও করবা? সবাই যদি নদীতে ঝাঁপ দিয়া পড়ে, তুমিও পড়বা?"

    আমি নিশ্চুপ হই। তার কথায় একটি মাটির শক্ত গন্ধ পাওয়া যায়। গ্রামের কথায় এমন একটা জোর আছে, যা শহুরে বুলিতে নাই।

    পরের কয়েক দিন, প্রতিদিন সকালে অ্যাপ থেকে রিপোর্ট আসে। "আপনার ব্রাউজিং প্যাটার্ন মূল্যবান। আপনি একজন জ্ঞানপিপাসু নাগরিক।" কিন্তু সমস্যা হলো, আমি ব্রাউজ করি নিষিদ্ধ সাইট না, নোট প্যাডে লিখি। তারা কি ট্র্যাক করতে পারে আমি কি লিখছি? কি-লগার আছে নাকি?

    একদিন বিকেলে, মিলা আমার বাসায় আসে। প্রথমবার। সে আমার রুম দেখে। বই। ল্যাপটপ। ফোন চার্জারে। তার মুখ শক্ত হয়।

    "এখানে বসিয়া তুমি লিখো?"

    "হ্যাঁ।"

    "তোমার ফোন... এখানেই থাকে?"

    "হ্যাঁ।"

    "এখনই বন্ধ করো মাইক্রোফোন। লোকেশন। সব।"

    "কিন্তু—"

    "না কোন 'কিন্তু' নাই। করো।"

    আমি সেটিংসে ঢুকি। একে একে সব পারমিশন বন্ধ করি। মাইক্রোফোন। লোকেশন। কন্ট্যাক্ট। ক্যালেন্ডার। ফাইল এক্সেস। প্রতিটি টগল বন্ধ করতে গেলে একটা সতর্কবার্তা আসে। "এই ফিচার ছাড়া অ্যাপটি সঠিকভাবে কাজ করবে না।" আমি ইগনোর করি।

    মিলা বলে, "ল্যাপটপেরও ক্যামেরা টেপ দিয়ে ঢাইকা দাও।"

    আমি টেপ খুঁজি। একটা কালো ইলেকট্রিক্যাল টেপ পাই। ল্যাপটপের ক্যামেরায় লাগাই। একটা কালো বিন্দু হয়ে যায়।

    সে বলে, "এখন কিছুটা নিরাপদ। কিন্তু তারা আরও উপায় বাহির করবে।"

    হঠাৎ আমার ফোনে একটি সতর্কতা আসে। "সন্দেহজনক কার্যকলাপ: এনক্রিপ্টেড ট্র্যাফিক সনাক্তকরণ। আপনার ডিজিটাল সুস্থতা বাড়াতে সাহায্য চান?" একটি হেল্পলাইন নম্বর। ৯৯৯৯।

    মিলা বলে, "দেখ্ছো? তারা ইতিমধ্যে সন্দেহ করতেছে।"

    আমার বুক ধড়ফড় করছে। "কী করব?"

    "লুকাতে হবে। সহজ ভাষায় কথা বলতে হবে। কিন্তু লিখতে হবে কঠিন ভাষায়। তারা সহজ কথার মধ্যে বিপদ খুঁজে না।"

    সেই রাতে, আমি "প্রক্ষেপণ" অ্যাপ খুলি। Faceless_12 অনলাইনে। সে মেসেজ করে: "ভাই, আমার আইপি রেজোলিউশন হইছে গতকাল। দুইটা অফিসার আইছিলো আমার বাসায়। জিগাইছে, আমি কি 'বিপদজনক কন্টেন্ট' শেয়ার করি। আমি মিছা কথা কইছি। বলছি, হ্যাক হইছে আমার অ্যাকাউন্ট। তারা বিশ্বাস করছে কিনা কে জানে। আমি 'প্রক্ষেপণ' ছাড়তেছি। সাবধান থাকবেন।"

    তার প্রোফাইল এক মিনিটের মধ্যে ডিলিট হয়ে যায়। সব মেসেজ অটো-ডিলিট। আমার হাত ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

    Faceless_33 মেসেজ করে: "আমার ট্যাক্স অডিটের নোটিশ আইছে। কাকতালীয় না। আমি সাইলেন্ট মোডে যাইতাছি। সংখ্যার ভাষায় কথা বলতে হবে এখন। ২+২=৪। এর বেশি না।"

    সে-ও অফলাইনে চলে যায়।

    শুধু Faceless_07 রয়ে যায়। সে মেসেজ করে: "তাদের টুলস আছে। এডভান্সড। কিন্তু আমাদের শব্দও আছে। আমাদের গল্প। কষ্টের কথা। সত্যের কথা। তুমি তোমার সংগ্রহ বাড়াও। বেশি করে লিখো। কিন্তু এখনই প্রকাশ করো না। পথ খোঁজো। কাগজে ছাপার পথ। ছাপার অক্ষরে কথা বলা যায়। ডিজিটাল জমানায় কাগজই এখন সবচেয়ে বিপ্লবী জিনিস।"

    আমি লিখি: "কিন্তু কাগজে ছাপাবো কীভাবে? কে ছাপাবে?"

    সে উত্তর দেয়: "ছোট প্রেস আছে। সাহসী মানুষ আছে। যারা মেশিন চালায়। পুরান জমানার মানুষ। তাদের খুঁজে বাহির করতে হবে। মুখের ভাষায় কথা বলতে হবে। ডিজিটাল ট্র্যাক ছাড়া।"

    আমি মিলাকে জিগাই পরের দিন। "তুমি জানো কাগজে বই ছাপানোর লোক?"

    সে ভাবে। "আমার এক চাচাbroken heart আছে। তিনি পুরান এলাকায়  থাকেন। ছাপাখানা চালান। ছোট্ট। কিন্তু তিনি সাহসী মানুষ। একবার সরকার বিরোধী পোস্টার ছাপাইছিলেন। জেল খাইছিলেন ছয় মাস। এখনো করেন। কিন্তু খুব গোপনে।"

    "তিনি কি সাহায্য করবেন?"

    "জানা যায় না। দেখা করলে বলা যায়। কিন্তু বিপদ আছে।"

    "তোমার চাচার বাড়ি যাওয়া যায়?"

    "যায়। কিন্তু সাবধানে। ফোন ছাড়া যেতে হবে। পুরান  গলি। সিসি ক্যামেরা কম।"

    আমরা পরিকল্পনা করি। শনিবার সকালে যাওয়া হবে। ফোন বাড়িতে রাখা হবে। মিলা আমাকে নিয়ে যাবে।

    কিন্তু মধ্যরাতে, আমার ইমেইলে একটি মেসেজ আসে। Anonymous থেকে। বিষয়: "তোমার লেখালেখি সম্পর্কে।" ভেতরে লেখা: "আমরা তোমার সৃজনশীলতা লক্ষ্য করছি। তোমাকে একটি বিশেষ লেখক শিবিরে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। শর্ত: নির্দিষ্ট থিমে লেখা। নির্দিষ্ট সীমানা মেনে চলা। আগ্রহী হলে এই লিংকে ক্লিক করুন।"

    মিলাকে ফোন করি।

    সে বলে, "এটা ফাঁদ। তোমাকে নিয়া তারা ট্র্যাপ করবে। ক্লিক করো না।"

    "কিন্তু যদি সত্যিই সুযোগ হয়?"

    "সুযোগ? লেখার সুযোগ? তারা তোমাকে সুযোগ দিবে যেই লেখা লিখতে বলবে, সেই লেখা তো তোমার মনের কথা না। তাদের কথাই তুমি লিখবা। আরেকটা মুখোশ।"

    সে ঠিক বলে। আমি ডিলিট করে দিই মেসেজটা। কিন্তু ভয় রয়ে যায়। তারা ইতিমধ্যে আমার লেখালেখির খবর রাখে। আমি যতই গোপন করি, ডিজিটাল ছায়া তো রয়েই যায়। সার্চ হিস্টরি। ক্লাউডে অটো-সেভ। কি-স্টোক প্যাটার্ন।

    পরের দিন কলেজে, আমার সেই সহপাঠীটি (নৃত্যের হলে দেখা ছেলে) আমার কাছে আসে।  সে হাসিমুখে বলে, "কি অবস্থা আরিয়ান? লেখালেখি চলছে?"

    আমি থতমত খাই। "কিসের লেখালেখি?"

    "ওই যেই... ব্লগ ? আমি শুনছি তুমি লেখো খুব। আমাকে দেখাতে পারো?"

    "না, আমি তেমন কিছু লিখি না।"

    "অ্যাঁ? আমার তো মনে হয় তুমি নোট নাও অনেক। ক্লাসে। মানুষের মুখ দেখো। তুমি তো পর্যবেক্ষক। স্টাইল।"

    তার কথায় একটি খোঁচা আছে। সে জানে। কিন্তু কতটুকু জানে?

    আমি হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিই। "পর্যবেক্ষণ করি মাত্র। স্টাডির জন্য।"

    "তোমার স্টাডি তো অনেক গভীর। নাইট লাইফ পর্যন্ত যায়।" সে চোখ টিপে। "সাবধান থেকো ভাই। ওই এলাকায় অনেক সময় বিপদে পড়তে পারো। পুলিশের নিয়মিত চেকআপ হয়। তোমার মতো ভালো ছেলে... কালেকশনে চলে যাবে।"

    একটি সুস্পষ্ট হুমকি। আমি মুখের ভাব বজায় রাখি। "ধন্যবাদ সাবধান করার জন্য।"

    সে চলে যায়। আমি টয়লেটে গিয়ে মুখ ধুই। আয়নায় নিজের মুখ দেখি। ভয় দেখাচ্ছে। কেমন যেন ফ্যাকাশে। এই মুখটা কি আমি চিনি? এই ভয়গ্রস্ত মুখটা কার?

    মিলার সাথে দেখা করি পার্কে। তার কাছে সব কথা খুলে বলি।

    সে গম্ভীর হয়ে যায়। " সে তোমার পেছনে লাগবে। সে নিশ্চয় কোনো এজেন্সির জন্য কাজ করে। পার্ট-টাইম ইনফর্মার। টাকার জন্য। আমাদের গ্রামেও ছিল এমন লোক। যারা দালালি করত।"

    "কী করব এখন?"

    "আরও সাবধান হতে হবে। শনিবারের প্ল্যান থাকছে। কিন্তু তার আগে, তোমার সব লেখা ব্যাকআপ নাও। এক জায়গায় না। কয়েক জায়গায়। পেনড্রাইভে। ডিস্কে। হয়তো... মাটির নিচে পুঁতে রাখার দরকার হবে।"

    "মাটির নিচে?"

    "হ্যাঁ। আমাদের গ্রামে পুরান মানুষরা করত। দরকারি কাগজপত্র একটা মাটির হাড়িতে ভইরা পুঁতিয়া রাখত। বন্যার সময়ও নষ্ট হইত না।"

    আমি ভাবি। ডিজিটাল যুগে মাটির নিচে লেখা পুঁততে হবে। কী পরিহাস।

    সেই রাতে, আমি আমার সব লেখা তিনটি পেনড্রাইভে কপি করি। একটি আমার বইয়ের মধ্যে রাখি। একটি মিলাকে দিই। একটি আমার পুরান জুতার বাক্সে লুকাই। আর প্রিন্ট আউট করে একটা ফাইল তৈরি করি। সাদা কাগজ। কালো অক্ষর। স্পর্শ করা যায়। কাগজের গন্ধ নেওয়া যায়। ডিলিট বাটন নাই।

    মিলা বলে, "তোমার লেখায় আঞ্চলিক ভাষা দাও কিছু।"

    "কেন?"

    "কারণ তাদের অ্যালগরিদম স্ট্যান্ডার্ড ভাষা শনাক্ত করতে পারে। আঞ্চলিক শব্দ, ভাঙা ব্যাকরণ... এগুলো তাদের জন্য জঙ্গল। হারিয়ে যাবে।"

    আমি চেষ্টা করি। লিখি: "ওই দিন হাটে গেছিলাম। মানুষের মুখ দেখলাম। হাটের মানুষগুলার মুখে ভাব অইলো একরকম। কেউ বেচাকেনা করতাছে। কেউ গপ্প করতাছে। কেউ চিন্তায় মগন। কিন্তু সবাইকার মুখে একটা জিনিস কমন—থাকার কষ্ট। শহরের মুখের মতো ফাঁকা না। গাঁয়ের মুখের কষ্টটা ভিন্ন। পেটের কষ্ট। বাচ্চার কষ্ট। জমির কষ্ট।"

    লিখতে লিখতে মনে পড়ে আমার  বাড়ির কথা। চর বীরপুর গ্রাম। নদী। সেই মুখ। তারা এখন কোথায়? তারা কি এই ডিজিটাল নজরদারির জগতে আছে? নাকি তাদের কষ্ট এখনও প্রাচীন, মাটির, বৃষ্টির, ফসলের?

    Faceless_07 মেসেজ করে: "তুমি যদি কাগজে ছাপাও, কিছু কপি গ্রামে পাঠাইও। গ্রামের লাইব্রেরিতে। মাদ্রাসায়। ছাত্র হোস্টেলে। সেখানে ইন্টারনেট কম। বই বেশি দিন টিকে।"

    আমি উত্তর দিই: "তুমি কোথায়? নিরাপদ আছো?"

    কোনো উত্তর না আসা। দশ মিনিট। আধা ঘন্টা। তারপর একটি মেসেজ: "আমার রুমের সামনে আজ অচেনা গাড়ি। সাদা। নম্বর প্লেট নাই। আমি আমার সব গবেষণার নথি তোমার কাছে পাঠাইতাছি। একটি লিংক। ২৪ ঘণ্টা পর অটো-ডিলিট হইয়া যাবে। ডাউনলোড করো। সংগ্রহ রাখো। আমাদের মুখের কথা... সবাইকে জানাও।"

    একটি ড্রপবক্স লিংক আসে। আমি তড়িঘড়ি ল্যাপটপে ঢুকি। ডাউনলোড শুরু করি। ফাইল বিশাল। ২ GB। নাম: "Masks_Off.rar"।

    ডাউনলোড চলতে থাকে। আমি জানালার বাইরে তাকাই। রাস্তায় একটা সাদা গাড়ি দাঁড়াইয়া আছে। সাধারণ। কিন্তু জানালা কালো। ভিতরে কে আছে দেখা যায় না।

    মিলাকে ফোন করি। "তারা আমার বাসার সামনেও আছে মনে হয়।"

    সে বলে, "বের হইয়া পড়ো। এখনই। দরজা বন্ধ করো। পেছনের সিঁড়ি দিয়ে। আমার বান্ধবীর ফ্ল্যাটে চলে আইসো। মনে আছে?"

    "হ্যাঁ।"

    "ফোনটা ফেলে আইসো।"

    "কিন্তু—"

    "ফেলো। তারা ট্র্যাক করতেছে।"

    আমি ফোনটা বিছানার নিচে রাখি। চার্জারে লাগানো। ল্যাপটপ বন্ধ করি?  ডাউনলোড চলতেছে। বন্ধ করলে বিচ্ছিন্ন হইবে। risk নিই। চলতে দিই।

    একটা ব্যাকপ্যাক নিই। ভিতরে পেনড্রাইভ, প্রিন্ট আউট কপি, কিছু কাপড়, জল। দরজা বন্ধ করি। পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নামি। গা ঘিনঘিন করতেছে। প্রতিটি পদশব্দ নিজের কানে বোমার মতো শোনায়।
     
    নিচে নামিয়া গলিতে প্রবেশ করি। অন্ধকার। বিড়ালের চোখ জ্বলজ্বল করতেছে। হাঁটতে থাকি। মিলার বান্ধবীর ফ্ল্যাটের দিকে। শহর এখন ভিন্ন দেখায়। প্রতিটি গলি বিপদ মনে হয়। প্রতিটি মুখ শত্রু মনে হয়।

    ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপ থেকে আমার শেষ নোটিফিকেশনটা কি ছিল? "আপনার আজকের সংযোগ মূল্যবান। আগামীকাল আরও ভালো হবে।"

    আরও ভালো। তারা জানতেই চায় না আমার কি খারাপ লাগছে। তারা চায় আমি স্ক্রল করি। ক্রয় করি। মুখের ভাব বজায় রাখি।

    মিলার বান্ধবীর ফ্ল্যাটে পৌঁছাই। দরজা খোলে মিলা। তার চোখে রিলিফ। ভেতরে টান। "ভিতরে আইসো।"

    ভেতরে ঢুকি। দরজা বন্ধ হয়। একটি নিরাপদ ঘর। ছোট। কিন্তু কোনো ফোন নাই। কোনো ল্যাপটপ নাই। শুধু একটি রেডিও। পুরান জিনিস।

    মিলা বলে, "ডাউনলোড হইছে?"

    "হয়ে যাচ্ছিল। ল্যাপটপ ছাড়া আসছি।"

    "বেশি ক্ষতি নাই। Faceless_07 এর ফাইল হয়তো পাবে তারা। কিন্তু সে পাসওয়ার্ড দিবে না আশা করি।"

    আমি জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাই। নিচে রাস্তা খালি। কোনো সাদা গাড়ি নাই। হয়তো তারা এখনও আমার বাসার সামনে অপেক্ষা করতেছে। ফোনের লোকেশন দেখতেছে। আমি সেখানে নাই, কিন্তু আমার ফোন আছে। তারা কি বুঝতে পারবে?

    মিলা চা বানায়। হাতে বানায়। গ্যাসের স্টোভে। "গ্রামের মতো করিয়া বানাইতাছি। লিকার। দুধ নাই। চিনি আছে।"

    আমি চা নিই। গরম। ধোঁয়া উঠছে। আমি সেই ধোঁয়ার মধ্যে নিজের মুখ লুকাই। চোখ বন্ধ করি।

    মিলা বলে, "তোমার মুখ এখন কেমন?"

    "ভয়ে ভরা।"

    "ভয় ভালো। ভয় থাকলে বাঁচার ইচ্ছা থাকে। ভয় নাইলে মানুষ আত্মহত্যা করে।"

    "তুমি ভয় পাইও না?"

    "পাই। কিন্তু আমার ভয় আলাদা। আমার ভয় টাকার না পাওয়ার। বাবাকে হারানোর। তোমার ভয়... তোমার ভয় নিজেকে হারানোর। কণ্ঠ হারানোর।"

    সে ঠিক ধরেছে। আমার ভয় হলো আমি চুপ হয়ে যাব। মুখোশ পরে যাব। স্ক্রল করতে থাকব। বিরক্তি ভুলে যাব। শুধু একটা উপভোক্তা হব।

    সেই রাতে, মিলার বান্ধবীর ফ্ল্যাটের মেঝেতে শুইয়া, আমি ভাবি। আমার ল্যাপটপ এখন কী করতেছে? ডাউনলোড শেষ হইয়াছে? তারা কি হ্যাক করিতে পারতেছে? Faceless_07 এর কি হইছে? সে কি আটক হইয়াছে? নাকি পালাইতে পারতাছে?

    ভোরবেলা, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিই।  আমি লিখব।  বেশি লিখব আঞ্চলিক ভাষায়। গ্রামীণ উপভাষায়। শহুরে স্ল্যাংয়ে। ভাঙা বাংলায়।  অ্যালগরিদম যেন ধাঁধায় পড়ে।

    মিলা জাগে। বলে, "কাল শনিবার। চাচার বাড়ি যাইবো?"

    "যাবো। কিন্তু আরও সাবধান হইয়া।"

    "তুমি লিখা শুরু করো আজ থেইকা। যা দেখছো, যা শুনছো, সব লিখো। শুধু ডিজিটালে না। কাগজে। হাতে।"

    আমি একটা নোটবুক নিই। কলম নিই। প্রথম লাইন লিখি: "আজ ভোরে পাখির ডাক শুনছি। শহরে এই ডাক শোনা যায় না। শুধু হর্ণের শব্দ। মানুষের চিৎকার। কিন্তু এই ফ্ল্যাটে,  একটা বুলবুলি ডাকছে। মনে হইতেছে সে আমার  কথা বলছু ।"

     লিখতে একটা শান্তি পাই। ডিজিটাল স্ক্রিনের চেয়ে কাগজে কলমের দাগ।.....  বেশি সত্যি লাগে। মুছে ফেলা যায় না। ভ্যালে থাকা  যায়।

    মিলা হাসে। "তোমার মুখ এখন একটু আলাদা দেখাচ্ছে।"

    "কেমন?"

    "জীবন্ত। ভয়ের মধ্যে ও একটা জ্যান্ত ভাব আছে। আগে তো ফাঁকা ছিলা।"

    ফাঁকা। হ্যাঁ, আমি ফাঁকা হইয়া গেছিলাম। নোটিফিকেশনের ফাঁকা। স্ক্রলের ফাঁকা। মুখের ভাব পড়ার ফাঁকা।

    এখন, এই ভয়ংকর মুহূর্তে, আমি ভর্তি হইয়া উঠতাছি। ভয়ে। আশায়। মিলার কথায়। ফাঁকা জায়গাগুলো ভরাট হইতাছে সত্যি অনুভূতিতে।

    বাইরে, সূর্য উঠছে। শহর জেগে উঠছে। নজরদারি । কিন্তু এই ছোট ঘরে, একটা মানুষ লিখতাছে। আরেকটা মানুষ রক্ষা করতাছে। দুইটা মুখোশ ।

     শনিবারের জন্য অপেক্ষা করতেছে।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন