এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অধ্যায় ৮: মিলা

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ৬৫ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10
    নাচের হলের দিকে হাঁটা। পা নিজে নিজে চলা। পুরোনো পথ। চেনা。কিন্তু আজকে পায়ে একটা টান। মনে হচ্ছে, যাওয়া নয়, টানা। ফেসলেস_জিরোর কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাওয়া: "যেটা টানে, তার গভীরে যাও।" টানে কী? ওই ঝলমলে আলো? ওই গাঢ় গন্ধ? না... ওই ফাঁকা চোখগুলো। যেন এক একটা জানালা, খোলা, কিন্তু ভেতরে অন্ধকার।

    দরজা দিয়ে ঢোকা। একই গরম হাওয়া। একই বেসের ধাক্কা, বুকের পাঁজর কাঁপানো। দরজার পাশের গার্ড চেনা মুখ। ওই জানেন, আমি নিয়মিত। শুধু দেখতে আসা। কোনো ঝামেলা না করা। বিনা বাধায় ঢোকা।

    মঞ্চের দিকে তাকানো। আজকে নতুন মেয়ে। লম্বা, কালো চুল, সাদা জিভের মত দেহ। কিন্তু চোখ... চোখ তো সেই একই জিনিস। দূর দূরান্তে তাকানো। হাত-পা নাড়ছে, কিন্তু কে যেন সূতা দিয়ে নাচাচ্ছে। হঠাৎ ওর দৃষ্টি আমার দিকে আসা। এক সেকেন্ডের জন্য আটকে থাকা। তারপর আবার দূরে সরে যাওয়া। যেন আমি একটা দেয়াল, একটা কলাম।

    পাশের টেবিলে একদল লোক চিৎকার করছে। হাসছে। একজনের হাতে মাইক। জন্মদিনের পার্টি। কেক কাটবে পরে। এখন মদ আর নাচ। ওদের মুখে এক ধরনের খোলামেলা কৃত্রিমতা। সত্যিকারের মত্ততার ভান। ওরা জানে ওরা দেখছে। ওরা চায় দেখাতে।

    আমার চা পানির বোতল নিয়ে বসে থাকা। স্ক্রল করার ইচ্ছা হচ্ছে। ফোন বের করা। কিন্তু ফোনে আজকে ওই অ্যাপটা ডাউনলোড করা। ডিজিটাল সুস্থতা। এখনো ওপেন করা হয়নি। একটা ভয়। খোলা মানেই স্বীকার করা। মানেই ওরা দেখবে। "প্রক্ষেপণ" এ ফেসলেস_জিরোর শেষ মেসেজ: "১২টার পরে।" এখনো ১১। অপেক্ষা।

    হঠাৎ পেছনে শব্দ। একটু অন্য রকম। হেলান দেওয়া চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসা। কানে শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ: "আবার ফিরে এলে যে? শুধু দর্শক, না কিছু চাওয়ার আছে?"

    ঘুরে দাঁড়ানো। ওই মেয়ে। গতবার যে এসেছিল। আজকে ওর পোশাক আলাদা। কালো লেস, কিন্তু তার উপর একটা ঢিলে সুতির শার্ট। পায়ে ফ্লিপ-ফ্লপ। মুখে মেকআপ নয়, শুধু চোখে কাজল। চুল খোলা, ভিজে ভিজে, যেন এইমাত্র শাওয়ার নিয়ে এসেছে।

    "তোমাকে... চিনতে পারছি," বলা। নিজের কণ্ঠস্বর অদ্ভুত শোনানো।
    "বাহ," সে বলল, একটু হেসে। হাসিটা আগের মতো পেশাদার নয়। একটু ক্লান্ত, একটু তিক্ত। "গ্রাহকরা সাধারণত চিনতে পারে না। সবাই একই মনে হয়। কিন্তু তুমি তো গ্রাহক নও। তুমি... কী?"

    কথাটা আটকে যাওয়া। কী আমি? পর্যবেক্ষক? ভোক্তা? উকুন? "আমি... শুধু দেখি," শেষমেশ বলা।
    "কেন?" সে জিজ্ঞেস করল, সরাসরি। তার চোখে এবার ফাঁকা ভাব নেই। একধরনের তীক্ষ্ণতা আছে। "এখানে এত কিছু দেখার আছে নাকি? এই দুর্গন্ধ, এই কোলাহল, এই... ন্যাকামি?"

    "নাচটা... আসল লাগে," ঝুঁকি নিয়ে বলা। "বাকি সব জায়গায় যেভাবে মুখ বদলায় মানুষ... এখানে ওরা বদলায় না। এখানে মুখ একরকম থাকে। ফাঁকা। সত্যি ফাঁকা। বাইরে ওরা ফাঁকা ভান করে। ভেতরে কে জানে কী ভাবছে। এখানে ভেতর-বাইরে একই ফাঁকা। এটাই... সত্যি লাগে।"

    মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকা। তার মুখে এক অদ্ভুত ভাব। যেন কেউ অপ্রত্যাশিত জায়গায় তার ভাষায় কথা বলছে। "তুমি জানো না আমি কী ভাবি," সে শেষমেশ বলল, তবে কণ্ঠে রাগ নয়। ক্লান্তি। "কিন্তু ঠিকই ধরেছ একটা ব্যাপার। এখানে ভান করার দরকার পড়ে না যে খুশি আছি। ওদের (মাথা দিয়ে মঞ্চের দিকে ইশারা করা) মতো নাচালেই হয়। বাকিটা... বাকিটা আমার।"

    তারপর সে একটু থেমে বলল, "আমার নাম মিলা। আসল নাম না। কিন্তু এখানে সেটা কোন ব্যাপার না।"
    "আরিয়ান," বলা। নিজের আসল নাম বলা। কেন বললাম, জানি না।

    "চলো," মিলা বলল, হাত দিয়ে ইশারা করা। "এখানে নয়। পিছনে আমার কামরায়। এখানে বাতাস দম আটকা। আর ঐ জন্মদিনের কেলেঙ্কারী সইবে না।"

    তার পিছনে পিছনে যাওয়া। মঞ্চের পাশ দিয়ে একটা সংকীর্ণ গলি। আলো কম। দেয়ালে স্টিকার, পুরোনো পোস্টার। একটা দরজা। মিলা চাবি বের করে তালা খোলা।

    কামরাটা ছোট। একটা খাট, একটা টেবিল, একটা প্লাস্টিকের চেয়ার। একটা ছোট র্যাক, তাতে কিছু কাপড়। টেবিলে একটা ল্যাপটপ, কয়েকটা বই, একটা মাটির ঘড়া। পাখা চলছে। জানালা নেই। বাতাস চলাচলের জন্য একটা গ্রিল।

    "বসো," সে বলল, খাটের পাশে বসা। নিজে টেবিলের কাছে চেয়ারে বসা। "চা খাবে? আমি নিজে খাই। ইনস্ট্যান্ট। তাতেই হবে।"
    "হ্যাঁ," বলা। কিছু বলতে হবে।

    মিলা একটা কেটলি চালু করা। গরম জল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সে আমাকে দেখছে। "তুমি লেখো," হঠাৎ বলল। তা নয়, জিজ্ঞেসও না, দাবিও না।
    "কীভাবে বুঝলে?" আবারও একই প্রশ্ন।
    "হাত দেখেই বোঝা যায়," সে আর চোখ... তোমার চোখ সবসময় নড়ছে। মানুষের মুখে, হাতে, পোশাকে আটকে আছে। মনে হচ্ছে তুমি মনে মনে নোট নিচ্ছ। টুকে রাখছ সবকিছু। আমার দাদু  কবিতা লিখতেন। ওরও একই চোখ ছিল। সবকিছুকে 'লাইন' বানিয়ে ফেলতেন।"

    আমি নিশ্চুপ। সত্যিই তো। সে ঠিকই ধরেছে। "তোমার দাদু ? এখন?"
    "মারা গেছেন," সে বলল, সরাসরি। কণ্ঠে শোক নেই, শূন্যতা আছে। "গ্রামে থাকতেন। পুকুরপাড়ে বটতলায় বসে লিখতেন। কেউ পড়ত না। আমরা বলতাম,  পাগল। এখন বুঝি... ও নেশায় পাগল ছিলেন না। আসল দুনিয়ার জ্বালায় পাগল ছিলেন।"

    কেটলি ফুটে বাঁশি দেওয়া। মিলার  মগে চায়ের গুঁড়ো দিয়ে জল ঢালা। একটা মগ আমার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া।
    "আমিও একসময় লিখতাম," সে বলল, চা ফুঁ দিতে দিতে। "কবিতা নয়। গল্প। আমাদের গাঁয়ের গল্প। যেদিন বিদ্যুৎ আসল, সেদিনের গল্প। যেদিন প্রথম মোবাইল নিয়ে হারুন চাচা বাজারে গেল, সেদিনের গল্প। কিন্তু গাঁয়ে গল্পের দাম কই? সবাই টাকার কথা ভাবে। বাবা অসুস্থ পড়লেন। হাসপাতালে নিতে হবে। টাকা লাগবে一। গল্প লিখে টাকা আসে না। আসে এই দেহ দেখালে।"

    তার কথা শুনে গলা শুকিয়ে আসা। চা পান করা। গরম।
    "তুমি... কীভাবে এল এখানে?" জিজ্ঞেস করা।
    "একটা বান্ধবীর মাধ্যমে। সে আগে থাকত। বলল, 'মিলা, তোর রূপ আছে। এটা use কর। গাঁয়ে থেকে কী করবি? ধান ভানবি? বেগুন চাষ করবি? একটু টাকা রোজগার কর, তারপর বের হয়ে পড়।' তাই এলাম," সে বলল, যেন অন্য কারো গল্প বলছে। "প্রথম দিন কান্না পেয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমি মরে গেছি। তারপর... অভ্যাস হয়ে গেল। মনকে আলাদা করে ফেললাম। দেহটা ওখানে, মঞ্চে। মনটা এখানে, এই কামরায়। মাঝে মাঝে বই পড়ি। তোমার মতোই মানুষের মুখ দেখি। তবে আমি শুধু মুখ দেখি না, কথা শুনি। ওরা কী বলে, সেটা শুনি।"
     
    "ওরা কী বলে?" আমি জানতে চাই।
    "বেশিরভাগই বাজে কথা," সে বলল, একটু ঠোঁট উল্টিয়ে। "তাদের স্ত্রীর কথা বলে, বাসের কথা বলে, রাজনীতির কথা বলে। কেউ কেউ তাদের childhood নিয়ে বলে, how তারা poor ছিল, এখন rich হয়েছে। আসলে ওরা সবাই একজিনিস খোঁজে – validation। যে কেউ ওদের কথা শুনবে, ওদের 'সফলতা' দেখে হিংসা করবে। আমি শুনি। হ্যাঁ বলি। হাসি। এটাই আমার কাজের一। শুধু নাচ না, শোনাও।"

    তারপর সে হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি কিন্তু আলাদা। তুমি কিছু চাও না। শুধু দেখো। একটু ভয়ের মতো দেখো, আবার একটু কৌতূহলের মতো দেখো। যেন তুমি একটা জানোয়ার দেখছ jungle থেকে, দূরে থেকে।"

    আমি লজ্জা পাই। সে আমাকে এত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। "আমি... আমি জানি না কী চাই," স্বীকার করা। "সবকিছুই fake লাগে। শুধু এখানকার এই... এই emptiness টা real লাগে।"

    "Emptiness?" মিলা কথাটা নিজের মধ্যে ঘোরানো। "হ্যাঁ... emptiness সত্যি। কিন্তু এটা কিনে নেওয়ার জিনিস না, আরিয়ান। এটা আমার survival। তোমার জন্য entertainment, আমার জন্য routine।"

    মিলা তার মগে চা শেষ করে টেবিলে রাখা। তারপর তার ল্যাপটপ খোলা। স্ক্রিনে একটা ফোল্ডার। "দেখো," সে বলল, আমাকে দেখাতে। ফোল্ডারে ছবি। গ্রামের ছবি। পুকুর, ধানখেত, আমগাছ। একটা কুকুর। এক বৃদ্ধা, সম্ভবত তার দাদী, হাসছেন।
    "এগুলো আমি তোলা," সে বলল। "যখন খুব কষ্ট হয়, তখন দেখি। মনে করি, আমি ওই পুকুরে সাঁতার কাটছি। আমার দাদু  বটতলায় বসে আছেন। তিনি লিখছেন। আমি তার পায়ের কাছে বসে আছি।"

    তার চোখে এক ধরনের স্বপ্ন দেখা ভাব। খুব ক্ষণিকের জন্য। তারপর আবার কঠিন হয়ে যাওয়া। "কিন্তু reality এই," সে বলল, ল্যাপটপ বন্ধ করে দিয়ে। "এখানে আমাকে মুখোশ পরে থাকতে হয়। তোমার মতো।"

    "আমার মতো?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।
    "হ্যাঁ, তোমারও মুখোশ আছে," সে বলল, নিশ্চিতভাবে। "তুমি যখন ক্লাসে বসে থাকো, যখন বাবা-মায়ের সাথে কথা বলো, যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দাও... তখন তুমি অন্য মুখ দেখাও। শুধু এখানে এসে তুমি সেটা খুলে রাখো। কারণ এখানে কেউ judgement করবে না। এখানে সবাই নিজের মুখোশ নিয়েই ব্যস্ত।"

    সে ঠিক বলছে। আমি কখনো ভাবিনি এভাবে।
    "তোমার লেখাগুলো... সেগুলো মুখোশ না?" মিলা জিজ্ঞেস করে।
    "সেগুলো... সেগুলো মুখোশ খোলার চেষ্টা," আমি বলি, আস্তে করে। "কিন্তু ভয় হয়।"
    "কিসের ভয়? যে ধরবে? যে শাস্তি দেবে?"
    "হ্যাঁ। আর... আর এটাও ভয় যে, মুখোশ খুলে ফেললে কী হবে? নিচে যদি কিছু না থাকে? যদি আমি শুধু... একটা ফাঁকা জায়গা হই?"

    মিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "আমিও একই ভয় পেয়েছিলাম প্রথম নাচতে উঠার সময়। ভেবেছিলাম, সবাই তো দেখবে। কিন্তু দেখ know what? ওরা কিছুই দেখে না। ওরা শুধু নিজের fantasy দেখে। তুমি যদি মুখোশ খোল, ওরা ভাববে এটা আরেকটা মুখোশ। তুমি যদি সত্যি কথা বল, ওরা ভাববে এটা একটা performance। তাই ভয় কিসের? যতদিন তুমি ওদের entertain করছ, ততদিন ওরা কিছু বলবে না। problem তখনই, যখন তুমি entertain বন্ধ করে দেবে। যখন তুমি seriously নেবে।"

    তার কথা আমার মাথায় ঢোকার চেষ্টা করা। এত clarity । যেন সে এই ব্যবস্থাকে এতটাই বুঝে ফেলেছে যে ভয় কেটে গেছে।
    "তোমার লেখাগুলো কাউকে দেখাও?" সে জিজ্ঞেস করে।
    "না," আমি মাথা নাড়ি। "কেবল... অনলাইনে কিছু অচেনা লোক।"
    "অনলাইন..." সে কথাটা বলল যেন কোন বিষের নাম শুনছে। "সেখানেও তো সবাই মুখোশে। তুমি জানো না কে আছে। হয়তো ওদের মধ্যেই কেউ তোমার বিপক্ষে যাবে। আসল জগতে দেখাও। কাগজে ছাপাও। হাতে হাতে দাও।"

    "সে কি সম্ভব?" আমি জিজ্ঞেস করি, অবিশ্বাস নিয়ে। "কেউ ছাপবে না। ধরিয়ে দেবে।"
    মিলা একটু হাসল। "আমার দাদুর একটা বন্ধু আছেন। ছাপাখানার কাজ করেন। ছোটখাটো বই ছাপেন। সাহসী লোক। আমি কথা বলতে পারি। যদি তোমার ইচ্ছা হয়।"

    আমার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হওয়া। সম্ভবনা? একটা রাস্তা?
    "কিন্তু... কেন? তুমি কেন সাহায্য করবে?"
    মিলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "কারণ আমি প্রতিদিন ওই মঞ্চে গিয়ে মুখোশ পরে নাচি। কারণ আমি আমার দাদুর কবিতাগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হয়েছিল medicine কিনতে পারমিশন পাওয়ার জন্য। কারণ আমি চাই... আমি চাই কেউ একজন, somewhere, সত্যি কথা বলুক। মুখোশ না পরে। যদি তুমি পারো, তাহলে আমি সাহায্য করব। এটা আমার... redemption।"

    রিডেম্পশন। কথাটা বাতাসে ঝুলে থাকা। আমি কিছু বলতে পারছি না।

    বাইরে থেকে ডাক আসে। "মিলা! তোর turn! দেরি করছিস কেন?"
    মিলা উঠে দাঁড়ায়। তার মুখে আবার সেই পেশাদার ভাব ফিরে আসে। "তোমার চিন্তা করো," সে বলে, দরজার দিকে যেতে যেতে। "আমি কাল থাকব না। পরশু এসো। উত্তর দিও।"

    সে চলে যায়। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আমি একা পড়ে থাকি সেই ছোট কামরায়। পাখার শব্দ। চায়ের মগটা এখনো গরম। মিলার দাদুর কবিতার কথা মনে পড়ে। কেউ পড়ত না। তবুও লিখতেন।

    আমার ফোনে সময় দেখা। ১২টা বেজে গেছে। "প্রক্ষেপণ" এ ফেসলেস_জিরোর জন্য সময় হয়েছে। কিন্তু আজকে মিলার কথাই মনে জমা হচ্ছে। "মুখোশ না পরে।"

    ফোন বের করা। অ্যাপ খোলা। ফেসলেস_জিরো online আছে।
    লিখতে শুরু করা: "একজন মুখোশধারীর সাথে দেখা হলো। সে বলে, সবাই মুখোশ পরে। সে বলে, মুখোশ খোলার ভয় নেই। কারণ কেউ আসলে দেখে না।"
    কিছুক্ষণ পরে উত্তর আসে: "সে ভুল বলছে। কিছু মানুষ দেখে। আমরা দেখি। কিন্তু দেখার জন্য প্রথমে খুলতে হবে। তুমি কি খুলবে?"

    আমি উত্তর দিই: "আমি জানি না কীভাবে।"
    উত্তর আসে: "লেখা দিয়ে শুরু করো। তারপর ছাপাও। তারপর বিতরণ করো। ধাপে ধাপে।"
    আমি জিজ্ঞেস করি: "তুমি কি কখনো মুখোশ খুলবে?"
    লম্বা pause। তারপর: "আমার মুখোশই হলো anonymity। এটা খুললেই আমি বিপদে পড়ব। আমার research আছে। সংগ্রহ আছে। আমি তোমাকে দেব soon। তোমার দায়িত্ব সেটা রক্ষা করা। প্রকাশ করা।"

    সেই রাত, বাসায় ফিরে, আমি লেখা শুরু করি নতুন করে। শুধু আমার observation নয়। মিলার কথা। তার দাদুর কথা। গ্রামের কথা। ফেসলেস_জিরোর anxiety। সবকিছু একসাথে জড়ানো শব্দ দিয়ে, যে শব্দগুলো শহরে মরে গেছে – "পানকৌড়ি", "হুক্কা", "ঝুমুর", "আঁচিল", "গ্যাংশুট"। মিলার কথা মেশানো – "দেহ বিক্রি করি, আত্মা বাঁচাই।" "শহরে আলো এত, তারার আলো দেখা যায় না।" "গ্রামের হাওয়ায় গন্ধ থাকে মাটির। এখানে হাওয়ায় গন্ধ মানুষের ঘামের।"

    লিখতে লিখতে ভোর হয়ে যায়। স্ক্রিনের আলোয় চোখ জ্বালা করে। কিন্তু থামতে পারি না। যেন একটা বাঁধ ভেঙে গেছে। মুখোশের নিচে মুখ আছে। শুধু সাহস চাই খুলে ফেলার।

    পরশু আবার নাচের হলে যাওয়ার আগে, আমি মিলার জন্য একটা ছোট চিরকুট লিখি। "আমি রাজি। সাহায্য চাই।"

    এটা নিয়ে যাওয়া। তার হাতে দেওয়া। সে চিরকুট পড়ে, মুখে একটা ক্ষীণ হাসি ফোটানো। "ভালো," সে শুধু বলে। "রাইস কাকুর সাথে কথা বলব। তিনি prepare করবেন। তুমি লেখা শেষ করো।"

    সেইদিন থেকে, নাচের হল আমার জন্য শুধু observation spot নয়। হয়ে যায় একটা connection। একটা underground railroad-এর স্টেশন। যেখানে মুখোশের নিচের মুখগুলো একে অপরকে চিনতে পারে। এবং কিছুক্ষণের জন্য, সেগুলো খুলে রাখতে পারে।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া দিন