Faceless_07 এর সাথে কথা চলতে থাকা। প্রথমে ফোরামের ইনবক্সে। আঙুলে আঙুলে লিখতে থাকা। শব্দ গুলো টাইপ হতে হতে যেন মাটির নিচ থেকে গজানো ঘাসের মতো। ওর প্রথম মেসেজের পর উত্তর দেওয়া: "ক্লিক করে। পুরনো। ধুলো জমে।" সাড়া আসতে তো সময়ই লাগে না। যেন ওপার থেকে কেউ বসে আছে। সারাক্ষণ। আমাদের মতোই।
ও বলে, "ধুলো জমে মাস্কে। আমরা সবাই শ্বাস নিই ধুলো।"
একটা থ্যাঁতলানো সিগারেটের মতো বাক্য। ধোঁয়া উঠছে স্ক্রিন থেকে। আমি জিজ্ঞেস করি, "তুমি কোথায়?" প্রশ্নটা নির্বোধের মতো। এই ডিজিটাল জগতে 'কোথায়' বলতে কিছু নেই। আইপি অ্যাড্রেস আছে। লোকেশন ট্যাগ আছে। কিন্তু 'কোথায়' নেই।
উত্তর আসে: "যেখানে ধুলো জমে সেখানে। গ্রামে। শহরে। মনের ভিতরে।" কথাগুলোয় এক ধরনের পাঁচ মিশালি ভাষা। বইয়ের বাংলা, কিন্তু মধ্যে মধ্যে আঞ্চলিক শব্দের ঝাঁজ। "ধুলো" না লিখে "খোশা" লিখছে এক জায়গায়। "মাস্ক" না লিখে "মুখোটা"।
আমার curiousity জাগে। "তুমি কি গবেষণা করো?"
"হ্যাঁ। নাকি বলবো শিকার করি। মানুষের মুখের শিকার। মুখোশের শিকার।"
এরপর একদিন ও বলে, "একটা জায়গায় কথা বলি। এখানে নয়।" একটা অ্যাপের নাম দেয়। সিগন্যাল। নাম দেয়: "প্রক্ষেপণ"। ভারী নাম। "প্রক্ষেপণ মানে?"
"যে আলো পড়ে, যে ছায়া পড়ে, সে কথা। আমরা তো আলো না। আমরা ছায়া। ছায়ার কথাই বলবো।"
ডাউনলোড করি। ইনস্টল করি। নতুন আইডি। নাম দেই: "ছায়াদর্শী"। ওর আইডি: "নির্বাক_৭"।
প্রথম কথোপকথন সেখানে:
নির্বাক_৭: "আচ্ছা, তুমি যেই 'মুখের ভাব' দেখো... সেগুলো কি শুধু শহুরে মুখ?"
আমি: "হ্যাঁ। কলকাতার, ঢাকার। শপিংমলের, কফিশপের।"
নির্বাক_৭: "আমি দেখি গ্রামের মুখ। হাট-বাজারের মুখ। মক্তবের মুখ। ইউনিয়ন পরিষদে ভোট ভাঙতে আসা লোকের মুখ। সেসব মুখেও মাস্ক। আলাদা ধরণের। মাটি মাখা মাস্ক।"
ওর কথায় এক অন্য জগতের ছবি ভেসে ওঠে। আমি যে জগতটা ভুলতে বসেছি। বাবার বাড়ি যে গ্রামে, সেখানে বছর দশেক যাইনি। স্মৃতি ঝাপসা।
নির্বাক_৭ বলে চলেছে: "এখানে মাস্কগুলো ঠাণ্ডা প্লাস্টিকের না। গরম মাটির। গাঁট্টা। কথায় বলে না, 'মুখে মাটি মাখা'? ওইটা লiteral হয় এখানে। মুখে সত্যি মাটি মাখে। কষ্টের মাটি। দারিদ্রের মাটি। তার ওপরে আরেকটা মাস্ক। রাজনীতির মাস্ক। ধর্মের মাস্ক। সস্তা মোবাইল ডেটার মাস্ক।"
ওর কথার ধরণ কেমন যেন... কবিতার মতো, কিন্তু কাঁচা। পাকা বাংলা না। আঞ্চলিক টান। "গাঁট্টা" শব্দটা ব্যবহার করছে। "লiteral" শব্দটাও ফেলছে মধ্যে মধ্যে। আমাদের এই যুগের ভাষা। খিচুড়ি।
আমি জিজ্ঞেস করি, "তুমি কি গ্রামে থাকো?"
"থাকি আর না থাকি, কী আসে যায়? আমি ঘুরি। নদীর পাড়ে পাড়ে। বিলের ধারে ধারে। চা-দোকানের পাটায় বসে বসে রেকর্ড করি। লোকের কথা। না, পারমিসন নিয়া না। নৈতিক সীমানা লঙ্ঘন করি।" ওর স্বীকারোক্তিতে এক ধরনের নিঃশব্দ গর্ব।
"কেন করো?"
"কারণ ওদের মুখের কথা কেউ রাখে না। ওদের মুখের ভাব কেউ পড়ে না। শহুরে বুদ্ধিজীবীরা ওদের 'প্রান্তিক মানুষ' বলে। সংখ্যা দেয়। স্ট্যাটিস্টিক্স দেয়। কিন্তু ওদের মুখের উপর যে হাসি-কান্নার দাগ... সেটার কোনো ডাটা হয় না।"
একটা ফাইল পাঠায়। ভয়েস নোট। খোলা। প্রথমে শব্দ: হাটের গোলমাল। হাঁক-ডাক। "একশ টাকা কেজি! একশ টাকা!" তারপর একটি বুড়ো মানুষের ভাঙ্গা গলার রেকর্ডিং:
"আমার ছইল্যা কল্কাত্যায় চাকরি করে। মাইক্রোফোনে কথা কয়। স্যালারি নাইক্কা বলে। তবে ফোন দিয়া ভিডিও কইরা দেখায়। ফ্ল্যাট। সোফা। ওই ফোনের পর্দায় ছইল্যার মুখ দেখি। হাসে। কিন্তু চোখে... চোখে কী যেন নাই। ফাকা। যেন আমার এই খোঁপার মাছের মতো। চকচকে, ভিতরে পচন।"
আমার গায়ে কাঁটা দেয়। এতো স্পষ্ট। আমারই কথা। শহুরে ছেলের কথা। যে ফোনের পর্দায় হাসে, ভিতরে ফাঁকা।
নির্বাক_৭ মেসেজ করে: "শুনলা? এটাই তো আমার research। 'উত্তর-আধুনিক নগরীতে ব্যক্তির মুখোশ: একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা।' নামটা ফ্যান্সি দেইছি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। আসলে নাম হওয়া উচিত ছিল: 'মুখোশ চুরি: গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত।'"
ওকে জিজ্ঞেস করি, "তুমি কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো?"
"পড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজবিজ্ঞান। কিন্তু ক্লাসে যাই না। স্যাররা যে স্লাইড পড়ায়, তা তো বইয়ে আছে। আমি মাঠে যাই। real data সংগ্রহ করি।"
তারপর একদিন বলে, "তোমাকে কিছু লোকের সাথে কথা বলাই। আমাদের ফ্যাসলেস গ্রুপ না। নাম নেই। শুধু কথা।"
অন্যান্যর সাথে পরিচয় করায়। ফ্যাসলেস_১২। প্রথমেই বলে, "আমি বেকার। আগে ব্লগ লিখতাম। 'নিরস্তর' নামে। এখন বন্ধ।" ওর ভাষা খাঁটি ঢাকাইয়া। "বন্ধ" না বলে "বন্ধু"।
আমি জিজ্ঞেস করি, "কেন বন্ধু?"
"কারণ লিখছিলাম গ্যাস-পানির দামের উপর। ডাটা দিয়াছিলাম সরকারি দাম আর বাজার দামের। তফাৎ দেখাইছিলাম। তারপর একদিন দুজন আসে। পোলাপান। চেয়ার-টেবিলে বসে। বলে, 'আপনার ব্লগে ভুল তথ্য।' আমি বলি, 'ডাটা সোর্স দিছি।' ওরা বলে, 'সোর্সও ভুল।' তারপর চলে যায়। পরদিন হোস্টিং কোম্পানি মেইল করে। ব্লগ বন্ধ। 'রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি'।"
ফ্যাসলেস_১২ এর কথায় এক ধরনের তিক্ত হাসি যেন টাইপ হয়ে আসছে। "রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা! গ্যাস-পানির দামেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে! তাহলে তো আমরা সবাই টেরোরিস্ট!"
তারপর ফ্যাসলেস_৩৩। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। ভাষা একদম প্রফেশনাল, শুদ্ধ। কিন্তু মধ্যে মধ্যে হঠাৎ মুসলমানি টান: "আল্লা" বলে। "হয়তো" বলে "হইতো"।
ও বলে, "আমি সংখ্যার পিছনে মানুষ খুঁজি। ট্যাক্স রিটার্নের কলামে, ব্যালেন্স শীটের ফাঁকে ফাঁকে যে মানুষগুলো হারায়, তাদের খুঁজি। একজন ব্যবসায়ীর ফাইল ছিল। তিন বছর ধরে লস দেখাচ্ছে। কিন্তু তার lifestyle... গাড়ি, বাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ। আমি ডাটা এনালাইসিস করলাম। প্যাটার্ন বের করলাম। ফাঁকি। সব ফাঁকি। কিন্তু যখন রিপোর্ট দিলাম, সে হাসল। বলল, 'তুমি তরুন, কিছু বুঝ না। এদেশে হিসাবের বই আর আসলের বই আলাদা।' তার মুখটা আমার মনে আছে। এত আত্মবিশ্বাস। এত নির্মম সত্যি বলার সাহস। ওই মুখটাই আসল মাস্ক। যে মাস্ক বলে, 'নিয়ম কানুন শুধু কাগজে। বাস্তবতা আলাদা।'"
আরেকজন আসে। ফ্যাসলেস_১৮। একজন হাউসওয়াইফ, ভাষায় নরম টান। "আমি সুপারশপের আলোয় জীবন কাটাই। সকালে বাচ্চা স্কুলে দেই। তারপর সুপারশপ। ঠাণ্ডা এয়ারকন্ডিশন। উজ্জ্বল আলো। শেল্ফে সাজানো জিনিস। আমি কার্ট হাতে ঘুরি। কি কিনবো, তা ভাবি না। শুধু ঘুরি। মানুষের মুখ দেখি। ওরা সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। তালিকা নিয়ে ছোটে। আমার কোনো তালিকা নাই। আমি দেখি ওদের মুখের tension। দুধ নিতে যেই লাইন, সেখানে মুখের ভাব দেখি। eggs এর কাউন্টারে ভিড় দেখি। লাইন বাঁধা মানুষগুলোর চোখে এক ধরনের যুদ্ধের ভাব। 'আগে আমি যাবো।' এই ভাব। সুপারশপের বাহিরে যে সমাজ, সেখানে যুদ্ধ নাই। কিন্তু ভিতরে, ডিটারজেন্ট আর নুডলসের শেল্ফের সামনে, নীরব যুদ্ধ চলে। আমি সেই যুদ্ধের নীরব পর্যবেক্ষক।"
আমি আশ্চর্য হই। এতো বিভিন্ন মানুষ। বিভিন্ন ভাষা। কিন্তু অভিযান এক। পর্যবেক্ষণ। মুখোশ শিকার।
নির্বাক_৭ বলে, "দেখলা? আমরা 'মুখহীন সংঘ' না। আমাদের কোনো নাম নাই। আমরা শুধু কথা বলি। গল্প শেয়ার করি। আমাদের পর্যবেক্ষণ।
আমরা একটা গ্রুপ চ্যাট শুরু করি। এনক্রিপ্টেড। সময় ঠিক করে নেই। রাত ১১টার পর। যখন বিশ্ব একটু নিশ্চুপ হয়। নোটিফিকেশনের ভিড় কমে।
একদিন আমার লেখার কিছু অংশ শেয়ার করি। সরাসরি। "বেশ্যা খানাই যাওয়া... মেয়েদের উলঙ্গ নাচানো..."
ফ্যাসলেস_১২ সঙ্গে সঙ্গে: "ওহো! এটা তো ভারী রaw। ভারী সরাসরি। এটা বিপদে ফেলতে পারে।"
ফ্যাসলেস_৩৩: "Agree। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট dangerous। তুমি কি প্রকাশ করার চিন্তা করো?"
আমি লিখি: "ভাবি না। ভাবতে ভয় পাই। শুধু জমানো। আর্কাইভ করা। বাস্তবতার আর্কাইভ।"
নির্বাক_৭ তখন বলে, "আর্কাইভই সবচেয়ে dangerous। স্মৃতি dangerous। তারা চায় আমরা ভুলে যাই। স্ক্রল করি। সামনে এগোই। অতীত না। পুরান কথা না। কিন্তু আর্কাইভ হলো অতীতের ডকুমেন্ট। সেটাই বিপজ্জনক।"
তার কথায় এক গভীর সত্যি। আমরা প্রতিদিন স্ক্রল করি। আগের পোস্ট, আগের ছবি, আগের কথাও ভুলে যাই। অ্যালগরিদম আমাদের শুধু 'এখন' এ রাখে। 'এখুনি' এ রাখে। আর্কাইভ করা মানে সেই চক্র ভাঙা।
তারপর একটা দিন আসে। ফোনে একটা notification। সরকারি একটা অ্যাপ। "ডিজিটাল সুস্থতা"। description এ লেখা: "আপনার ডিজিটল জীবনকে সুস্থ ও প্রোডাকটিভ করুন। স্ক্রিন টাইম ম্যানেজ করুন। পজিটিভ কন্টেন্ট খুঁজুন।" বাধ্যতামূলক না, কিন্তু "অত্যন্ত সুপারিশকৃত"। লোকে কী মনে করবে? সরকারি অ্যাপ ডাউনলোড না করলে?
গ্রুপে পোস্ট করি। ফ্যাসলেস_৩৩ সঙ্গে সঙ্গে replies: "ডাউনলোড কর। না করলে ট্যাক্স অডিটের ঝুঁকি। তারা connect করতে পারে।" ওর হিসাবের দিকটা মাথায় আছে। "ওরা বলবে না যে এই অ্যাপ না দেওয়ায় শাস্তি। কিন্তু ট্যাক্স ফাইল করার সময় suddenly তোমার রিটার্ন 'সিলেকশনে' পড়বে। audit হবে। হয়রানি হবে।"
ফ্যাসলেস_১২: "এটা spyware। কিন্তু open spyware। legal spyware।"
নির্বাক_৭: "তোমাদের গ্রামে একটা কথা আছে: 'জানোয়ারের ভয়ে বাড়িতে আলো জ্বালাইতে হয়।' এটাও সেই আলো। তারা দেখবে, আমরা আলো জ্বালাচ্ছি। তাই তারা ভয় পাবে না। অন্ধকারে কী হচ্ছে, সেটাই ভয়ের।"
কথাটা গ্রাম্য, কিন্তু অর্থ গভীর। আমি ডাউনলোড করি। ইনস্টল করি। অনুমতি দিই সব। লোকেশন, কন্ট্যাক্ট, মেসেজ, এমনকি কি-স্ট্রোক লগ পর্যন্ত। একটা অস্বস্তি। যেন ঘরে কেউ ঢুকে আমার ডায়েরি পড়ছে। কিন্তু সেই 'কেউ' তো রাষ্ট্র। আইন।
অ্যাপটা প্রথম দিনেই রিপোর্ট দেয়: "আপনার স্ক্রিন টাইম গড়ের চেয়ে ৪০% বেশি। আপনি ২ ঘণ্টা social media এ কাটিয়েছেন। ৩০ মিনিট gaming এ।" gaming? আমি তো গেম খেলি না। হয়তো সেই ফোরাম ব্রাউজ করাকে gaming ধরেছে। অ্যাপ suggestions দেয়: "এই ভিডিওগুলো দেখুন: 'দেশের উন্নয়নের গল্প।' 'যুবাদের সফলতার কথা।' 'ধ্যান ও মনোনিবেশের উপায়।'"
গ্রুপে লিখি: "এটা আমার কি-স্ট্রোক monitor করছে মনে হয়।"
ফ্যাসলেস_৩৩: "নিশ্চয় করছে। keyword scan করবে। risky keyword পেলে flag করবে।"
ফ্যাসলেস_১২: "তাইলে এখন থেকে risky কথা 'প্রক্ষেপণে' বলবো। রাত ১১টার পর। ওই সময়টায় অ্যাপের মনিটরিং কম হতে পারে। assumption।"
নির্বাক_৭: "না, কমবে না। বাড়বে। কারণ রাতের বেলা risky activity বেশি হয়। কিন্তু আমাদের choice নাই।"
রাত ১১টার পর আমরা কথা বলি। "প্রক্ষেপণ" অ্যাপে। আমাদের কথাগুলো এনক্রিপ্টেড। কিন্তু কি-স্ট্রোক? মাইক্রোফোন? ক্যামেরা? সেসবের কোনো নিশ্চয়তা নাই।
একদিন নির্বাক_৭ একটা ভয়েস নোট শেয়ার করে। গ্রামের এক মক্তবের teacher এর কথা। বুড়ো teacher, দাড়ি white। ছাত্রদের কুরআন পড়া শেখাচ্ছেন। তারপর break এ ছাত্রদের বলছেন: "কালকে শহর থেকে এক ভাই আসবেন। mobile দিবেন। free। তাতে Qur'an এর app থাকবে। কিন্তু সেখানে অন্য app গুলো delete করে দিবেন। শুধু Qur'an এর app রাখবেন। কারণ বাকি app গুলোতে শয়তানের ফাঁদ। video দেখাবে। music শুনাবে।" তারপর teacher এর গলার tone বদলায়। confidential হয়ে বলে: "আর সেই mobile এ একটা বিশেষ app auto install হইবে। সেটা তোমাদের location track করবে। যদি কোথাও যাও, তাহলে আমরা জানতে পারবো। এটা তোমাদের নিরাপত্তার জন্য।"
নির্বাক_৭ বলে, "শুনলা? এখানে 'নিরাপত্তা'র নামে surveillance। ধর্মের নামে control। গ্রাম level এ।"
ফ্যাসলেস_১৮ বলে, "আমার এখানে সুপারশপে এখন digital payment। একটা app দিতে হবে। fingerprint দিতে হবে। তারপর একদিন দেখি, আমার কেনাকাটার history থেকে suggestions আসে। 'আপনি প্রতি শুক্রবার ডিম কেনেন। আজ কি কিনবেন?' ভয় লাগে। তারা জানে আমার habit। আমার রুটিন।"
ফ্যাসলেস_১২ যোগ করে, "আর সেই data তারা বিক্রি করে দেবে। মার্কেটিং কোম্পানিকে। insurance কোম্পানিকে।"
আমাদের গ্রুপের কথাবার্তা গভীর হয়। আমরা শুধু নিজেদের সমস্যা না, system এর নকশা বুঝতে চাই। এই নজরদারির জাল কীভাবে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত, সেটা বুঝতে চাই।
নির্বাক_৭ বলে, "আমি research করতে করতে একটা জিনিস বুঝছি। আগে গ্রামের মানুষের মুখোশ ছিল সাদাসিধা। ভান করার capacity কম ছিল। এখন সস্তা smartphone, cheap data দিয়া ওদেরকেও sophisticated মুখোশ পরানো হচ্ছে। religious content, nationalist content, আর entertainment এর মিশ্রণ দিয়া ওদের মনও wash করা হচ্ছে। 'ভালো মানুষ' হওয়ার definition change করা হচ্ছে। ভালো মানুষ মানে এখন যার social media profile clean। যার পোস্টে flag নাই। যার location history নির্দোষ।"
একটা রাতে, ফ্যাসলেস_৩৩ একটা গল্প শেয়ার করে। ওর ক্লায়েন্ট, একজন garment factory owner। তার factory তে worker দের জন্য একটা app বাধ্যতামূলক। app এ worker রা তাদের attendance mark করে। leave apply করে। কিন্তু সেই app এ worker দের location track করা হয়। after office hours ও। যদি worker রা worker union meeting এ যায়, তাহলে location data থেকে ধরা পড়ে। তারপর তাদের subtle ভাবে harass করা হয়। overtime দেওয়া হয় না। bonus কাটা হয়।
ফ্যাসলেস_৩৩ বলে, "এই data দেখে আমি কিছু বলতে পারি না। কারণ client confidential। কিন্তু মনটা ভারী হয়। আমি সংখ্যার পিছনে মানুষ খুঁজি, আর যখন পাই, তখন দেখি মানুষটা আর মানুষ নাই। একটা data point।"
আমি নিজের কথা যোগ করি। "আমার ফোনটা এখন আমার extended mind। আমি কিছু মনে রাখি না। ফোনে রাখি। calendar, reminder, note সব। তারা আমার mind এর map জানে। আমার anxiety জানে। যখন আমি depressed থাকি, তখন আমার screen time বাড়ে। তখনই ads আসে mental health service এর। meditation app এর। তারা আমার emotion track করে। আমার vulnerability তে business করে।"
নির্বাক_৭ responds করে: "আর আমরা সেই track হওয়া মানুষ। আমাদের গল্পগুলাই proof। আমাদের conversation ই data। কিন্তু এই data আমরা নিজেরা collect করছি। এইটাই difference। আমরা নিজেদের উপর surveillance করছি। নিজেদের উপর research করছি। এইটাই resistance।"
এই কথাটা মাথায় দাগ কাটে। আমরা নিজেরাই নিজেদের গবেষক। নিজেদের নৃতত্ত্ববিদ। এই observation ই আমাদের weapon।
তারপর একদিন, ফ্যাসলেস_১২ alarming message দেয়: "আমার আইপি resolve হয়েছে মনে হয়। আজকে দুইটা unknown number থেকে call আসছে। pickup করলে কাটা যায়। আমি 'প্রক্ষেপণ' ছাড়তাছি। কিছুদিনের জন্য silence mode এ যাবো।" তার profile picture যায় ডিলিট হয়ে। last seen: ৭ দিন আগে।
ফ্যাসলেস_৩৩: "আমার tax audit notice আসছে। coincidence না। আমি ও silence mode এ যাবো। data backup নিছি।"
নির্বাক_৭ বলে: "তাদের tools আছে। কিন্তু আমাদের words আছে। আমাদের stories আছে। তোমার collection বাড়াও। প্রকাশের way খোঁজো। printed অক্ষরে।"
আমি জিজ্ঞেস করি, "printed অক্ষরে? কাগজের বই?"
"হ্যাঁ। সেই প্রাচীন জিনিস। যে জিনিসের screen নাই। notification নাই। tracking নাই। যে জিনিস শুধু words ধরে রাখে। সময়ের মুখোশ ছাড়া।"
আমি ভাবতে থাকি। কাগজের বই। এই ডিজিটাল যুগে, সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হয়তো সেটাই। যে জিনিস ডিলিট হয় না। burn করতে হয়। ban করতে হয়। physically destroy করতে হয়।
নির্বাক_৭ শেষ মেসেজ করে সেই রাতে: "আমাদের মুখোশের নিচে মুখ আছে। সেই মুখ কথা বলতে চায়। তুমি সেই কথা লিখো। আমরা silent হয়ে যাবো, কিন্তু আমাদের words থামবে না।"
তারপর ওর status changes হয়: "Last seen: রাত ২:৩৪"।
আর কখনো online আসে না।
আমি আমার রুমে বসে থাকি। ফোনের screen জ্বলে। ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপ notification দেয়: "রাত হয়ে গেছে। ঘুমানোর সময়। ভালো ঘুম হোক।" আমি অ্যাপটা open করি। স্ক্রিন টাইম graph দেখি। একটা spike দেখি exactly সেই সময় যখন আমি 'প্রক্ষেপণ' অ্যাপ ব্যবহার করছিলাম। অ্যাপটা সেটা monitor করেছে। কিন্তু content টা পড়তে পারে নি, কারণ এনক্রিপ্টেড।
তবু ভয়। একটা অস্বস্তি। যেন আমার প্রতিটি টাইপ করা অক্ষর কারো না কারো স্ক্রিনে live feed হয়।
আমি ফোনটা বন্ধ করি। জানালার দিকে তাকাই। বাইরে শহরের আলো। দূরের কোনো বিলবোর্ডে একটা মুখ হাসছে। toothpaste এর ad। নিখুঁত সাদা দাঁত।
আমি মনে মনে কথাগুলো repeat করি। নির্বাক_৭ এর কথাগুলো। ফ্যাসলেস_১২, ফ্যাসলেস_৩৩, ফ্যাসলেস_১৮ এর গল্পগুলো। এইসব গল্প জমানো শুরু হয়। একটা ফোল্ডারে। নাম দিই: "মুখহীনদের আর্কাইভ"।
আর বুঝতে পারি, এই আর্কাইভই হয়তো আমাদের একমাত্র সত্যি মুখ। যেখানে মুখোশ নাই। যেখানে খোশা জমা হয় নি। যেখানে কথাগুলো কাঁচা, অসমাপিকা, কিন্তু সত্যি।
কারণ সমাপ্তির অর্থই হলো শেষ। আর আমাদের কথা কখনো শেষ হবে না। শুধু চলে যাবে। এক মুখ থেকে অন্য মুখে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে। এক কাগজ থেকে অন্য কাগজে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।