এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ‘ছায়া ও মুখশ্রী’

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ৬১ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2
    ফিরে এসে ফোন ধরতে হবে। আবার স্ক্রল করতে হবে। ব্রেনওয়াশ চলতে থাকবে। একটা অদৃশ্য নলের মাধ্যমে চোখে ঢোকা। মগজে পৌঁছানো। তারা বলে বাকস্বাধীনতার কথা। গণমাধ্যমের পর্দায় লাল-নীল লোগোওয়ালা চ্যানেলে পরিপাটি মুখের কথা বলা। টাই পরা। চুল আঁচড়ানো। মাইক্রোফোন হাতে বলতে থাকা: "আমরা মুক্ত। আমরা উন্নত। আমরা প্রতিবাদী।"

    কিন্তু একই চ্যানেলে, একই সুরে, নিচে টিকার টেপে চলে আসা আরেক খবর। একটা ছাত্র আটক। সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের জন্য। একটা বই নিষিদ্ধ। "সমাজের মূল্যবোধের পরিপন্থী"। একটা লেখার বিরুদ্ধে মামলা। "মতবিরোধ নয়, বিদ্বেষ"। মুখ না বদলানো। একই সুর। একই পেশাদার হাসি। একই শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি।

    মনে পড়া গ্রামের কথা। বাবার মুখ। মায়ের হাত। নদীর পাড়। সেখানে গণমাধ্যম বলতে একটা রেডিও। খবর বলতে গ্রামের মাতব্বরের মুখের কথা। সেখানে বাকস্বাধীনতা মানে গাছতলায় বসে রাজনীতি নিয়ে তর্ক করা। হাসি-ঝগড়া করা। সেখানে নজরদারি বলতে পাশের বাড়ির পিসি মাসির কৌতূহল। এখন? এখন সব বদলে গেছে।

    বেশ্যালয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়া। "খানায়" যাওয়া নয়, সেই শব্দটা খুব রুক্ষ, খুব কাঁচা। দর্শক হওয়া। পর্যবেক্ষক হওয়া। মেয়েদের উলঙ্গ নাচাতে দেখতে ভালো লাগা। তাদের দেহের নড়ন, মাসেলের টান, চামড়ায় আলোর গড়ন। কিন্তু তাদের চোখেও সেই ফাঁকা ভাব। পেশাদারি ফাঁকা ভাব। দেহ বিক্রি করা নয়, দেহের ছায়া বিক্রি করা। আমি শুধু ছায়া কিনতে থাকা। সেক্স না করা। শারীরিক সংস্পর্শ না চাওয়া। শুধু দেখতে থাকা। একজন নির্বাক, নিষ্ক্রিয় দর্শক হওয়া। আরেকটা পর্দার সামনে বসা।

    শিক্ষার কথা মনে পড়া। বাবার টিউশন ফির চেক কাটা। মাসের পর মাস। ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপে টাকা পাঠানো। রসিদ জমা দেওয়া। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চকচকে ব্রোশার হাতে পাওয়া। "গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড"। "ওয়ার্ল্ড ক্লাস ফ্যাকাল্টি"। কিন্তু পাঠ্যক্রমে কী আছে? শুধু পাস করার উপায়। চাকরির ইন্টারভিউর প্রস্তুতি। চিন্তার নয়। সমালোচনার নয়। প্রশ্ন করার হুঁশিয়ারি নয়। শুধু মুখের ভাব বজায় রাখা। পরীক্ষার খাতায় সঠিক উত্তর দেওয়া। শিক্ষকের প্রিয় পাত্র হওয়া। সিভিতে আরেকটা সার্টিফিকেট যোগ করা।

    রাতের কথা মনে পড়া। ফেরার পথে ফোন আবার চেক করা। স্ক্রিনটাইম রিপোর্ট দেখতে পাওয়া: "আপনি গড়ের চেয়ে ৩০% বেশি সময় স্ক্রিনে কাটিয়েছেন"। একটা ছোট, সবুজ হাসিমুখ আইকন। আমাকে অভিনন্দন জানানো। আরো বেশি সময় কাটানোর জন্য। আরো বেশি নোটিফিকেশন দেখার জন্য। আরো বেশি ক্লিক করার জন্য।

    শুয়ে পড়া। ছাদের ফ্যান ঘুরতে দেখা। সিলিংয়ে আলো-ছায়ার খেলা। মাথার ভিতর শব্দ। অ্যালগরিদমের গুঞ্জন। বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল। নিজেকে প্রশ্ন করা: আমি কি আসলে কিছু চাই? নাকি তারা আমার জন্য যা চায়, তাই আমি চাইতে শেখা? আমার ইচ্ছাগুলো কি আমার? নাকি ইচ্ছা তৈরির কারখানায় প্রস্তুতকৃত?

    একটা গল্প লেখার ইচ্ছা জাগা। এই সব কিছু নিয়ে। নজরদারি, মুখের ভাব, ভোগ্যপণ্য, শিক্ষার বাণিজ্য, বেশ্যালয়ের নিঃশব্দ চুক্তি, নেতাদের দ্বিমুখী বুলি। কিন্তু ভয় পাওয়া। গলা শুকিয়ে আসা। কি হবে যদি তারা পড়ে ফেলে? যদি অ্যালগরিদম ধরে ফেলে? যদি আমার কথাগুলো "সংবেদনশীল," "বিভ্রান্তিকর," বা "রাষ্ট্রবিরোধী" ট্যাগ পায়? কি হবে যদি আমার আইপি ঠিকানা ট্র্যাক করে? যদি আমার ফোনের মাইক্রোফোন শুনে ফেলে?

    তবু লিখতে শুরু করা। এই ডায়েরি। এই শব্দগুলো। একটা এনক্রিপ্টেড নোট-অ্যাপে। অসমাপিকা ক্রিয়ায়। কারণ জীবনও কি অসমাপিকা নয়? শুরু আছে, শেষ নেই। শুধু চলতে থাকা। স্ক্রল করতে থাকা। দেখতে থাকা। নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করতে থাকা।

    লিখতে বসা: "আমি বিরক্ত। আমি বুঝতে পারছি আমার স্মার্ট ফোন আমাকে নজর রাখে। প্রতিদিন আমার ব্রেন অয়াস করার চেষ্টা করে ভোগ্যপণ্য যাআমার দরকার নেই তাই কেনার জন্য। আমি কাজ করিনা আমি শুধু মানুষের মখের ভাব দেখি। আমার দেশর গন মাধ্যাম ধর্মতান্ত্রাতিক মতবাদ প্রকাশ করে টাকার বিনিময়ে।শিক্ষাবাবস্থা প্রায় বেসরকারি। আমি শুধু মুখের ভাব দেখে যাই। মানুষের মুখের। বেশ্যাখানাই যাই, সেক্স করি না। মেয়েদের উলঙ্গ নাচাতে আমার ভালো লাগে। দেশের নেতারা বাকসাধিনতার পক্ষে বলে কিন্তু তারাই আবার কালাকানুন লাগু করে কথা বললে।"

    হাত কাঁপা। শব্দগুলো যেন নিজে নিজে বেরিয়ে আসা। থামতে না পারা। আঙুল কি-বোর্ডে দ্রুত চলা। পুরোনো কথা মনে পড়া। দাদুর কথা। তিনি বলতেন: "যা দেখছো, তাই লিখো। যা বলতে চাও, তা বলো। নইলে ভিতরে পচে যাবে।"

    কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে। এখন কথা বলতে গেলেই বিপদ। এখন লিখতে গেলেই শঙ্কা। এখন দেখতে গেলেই সন্দেহ।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন