অধ্যায় ৬: অদৃশ্য সুতো
স্ক্রল করতে থাকা। আঙুল উঠানো-নামানো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দিনের পর দিন। প্রতিটি নোটিফিকেশন একটা সুতো, অদৃশ্য, পাতলা, মস্তিষ্কের কর্টেক্সের সাথে জুড়ে দেওয়া। টানছে। আমি নামছি। নামতেই থাকছি।
ডকুমেন্টটাই কিন্তু বাড়তে থাকছে। "Notes_for_Project.txt"-এর ভিতরে "Faces_1", "Market_1", "Edu_1"... এভাবেই ফোল্ডারের পর ফোল্ডার। একটা গোপন সংগঠন পদ্ধতি। আমার নিজের প্রাইভেট ইন্টারনেট। আমার নিজের ডার্ক ওয়েব, একটা পেনড্রাইভের গভীরে, ধুলো জমা কেসের তলায়।
একদিন, রাতের দিকে, স্ক্রলিং করতে করতে হঠাৎ আঙুল থেমে যাওয়া অন্য কিছুর উপর। একটা ফোরাম। লুকানো না, কিন্তু বিশেষ। সাহিত্যের ফোরাম মনে হলো। হেডলাইন: "অসমাপিকা: অসম্পূর্ণ গদ্যের জন্য এক ঠাঁই।"
ভিতরে ঢোকা। পোস্টগুলো লম্বা, খণ্ডখণ্ড, প্রথম পুরুষে। জীবনের টুকরো। বিরক্তি, উল্লাস, হতাশা, নিঃশব্দ প্রতিবাদের গুঞ্জন। কিন্তু সিধাসাদা না। রূপকের আড়ালে। ছায়ার আড়ালে। আমারই মতো।
একটা পোস্টে চোখ আটকে যাওয়া। শিরোনাম: "সিলিং ফ্যান।" লেখা: "ফ্যান ঘুরতাছে। আলো-ছায়া কাটতাছে মুখে। মুখটা কেডার? আমার? নাইবা ওই ছায়ার? যে ছায়া আমি পরি ঘর থেকে বের হবার আগে। ঘর থেকে বের হওন। রাস্তায় হাঁটা। প্রত্যেকটা মুখই একেকটা মাস্ক। কে কয় মাস্কের নিচে আলো-ছায়া আছেক? নাইবা শুধু আরেকটা মাস্ক?"
শ্বাস আটকে আসা। এটা... এটা তো আমার কথাই। অন্য ভঙ্গিতে। অন্য শব্দে। কিন্তু একই গুঞ্জন। একই ফ্যানের আওয়াজ।
নিজেকে সামলানো। একটা জবাব দিতে চাওয়া। আঙুল কাঁপা। লিখা: "আমার ফ্যানও ঘুরতাছে। ছায়া কাটে ঠোঁটে। কথা কওনে বাধা দেয়।" পোস্ট করা। ডিলিট বাটনের দিকে তাকিয়ে থাকা।
পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। কোনো জবাব না আসা। হতাশা। কেউ পড়লো না হয়তো। হয়তো...
তারপর একটা নোটিফিকেশন। ফোরাম থাইকা। প্রাইভেট মেসেজ।
"তোমার ফ্যানের আওয়াজ কি ক্লিক করে? নাইবা শুধু গুঞ্জন?" – পাঠক: Faceless_07।
বুক ধড়াস করে ওঠা। জবাব দেওয়া: "ক্লিক করে। পুরনো। ধুলা জমছে।"
প্রায় তরতরিয়ে জবাব: "ধুলা জমছে মাস্কে। আমরা সবাই শ্বাস লই ধুলা।"
একটা সংযোগ তৈরি হওয়া। এক অদৃশ্য সুতো, আরেক ধরনের। নজরদারির সুতো না। বোঝাপড়ার সুতো।
কিছুদিন যেতে না যেতেই Faceless_07-এর সাথে নিয়মিত কথা হওয়া শুরু। প্রথমে ফোরামের ইনবক্সে। তারপর একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে। সিগন্যাল। অ্যাপের নাম দিলাম "প্রক্ষেপণ"।
সে একজন ছাত্রী। অন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজবিজ্ঞান পড়ে। কিন্তু পড়া না, পর্যবেক্ষণ করে। তার পেপারের বিষয়: "উত্তর-আধুনিক নগরীতে ব্যক্তির মুখোশ: এক নৃতাত্ত্বিক গবেষণা।" সে তথ্য সংগ্রহ করে। মানুষের কথাবার্তা রেকর্ড করে (নৈতিক সীমানা লংঘন করে, সে মানে)। সে বলে, "তুমি লেখো মুখের ভাব। আমি লেখো মুখের অস্তিত্ব। আমরা একই পয়সার দুই পাট।"
একদিন মেসেজ আসে: "তোমার অবস্থান কোথায়? শহরে?"
জবাব দেওয়া: "হ্যাঁ। কংক্রিটের জঙ্গলে। তোমার?"
"আমি ওই জঙ্গলেরই এক প্রান্তে। কিন্তু আমার গোড়াপত্তন গ্রামে। হাওরপারের ধারে।"
গ্রামের নাম জিজ্ঞেস করিনি। বিপদ। সে-ও বলে না।
সে বলে, "গ্রামেও এখন মাস্ক পরা শুরু হইছে। তবে সেখানে মাস্কটা শারীরিক না, মানসিক। বড়ভাইরা যা কয়, তা শুনতে হবে। সমাজ যা ভাবে, তাই ভাবতে হবে। কথা বলতে গেলে, লোক বলবেক, 'মুখ্যাটারে দেখো, কেমন চালাকি কথা কয়!'"
তার টাইপিংয়ের ভঙ্গিতে আঞ্চলিকতার ছাপ। "বলবেক", "কই", "হইছে"। আমারও মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। বাড়ি, টিনের চালা, বৃষ্টির শব্দ। সেখানেও কি এখন মুখোশ?
Faceless_07 কয়, "আমার গবেষণার জন্যে গ্রাম-শহর দুই জায়গারই মুখের ভাব সংগ্রহ করতাছি। শহরের মুখোশ পাতলা, শিনশিনে, কিন্তু নিচে কিছু নাই। গ্রামের মুখোশ মোটা, মাটির রং, কিন্তু নিচে হয়তো একটা গভীর দাগ-ছোপ আছেক। দুঃখের দাগ। ক্ষুধার দাগ।"
একদিন সে একটা ভয়েস নোট পাঠায়। তার নিজের গলায় কথা না। রেকর্ড করা দুই বুড়ির কথোপকথন, হাটে। এক জন কয়, "কালকে আমার ছাওয়াল ফোনে এত রাত পর্যন্ত কথা কইতাছে, হাসতাছে... পরীর সাথে কথা কয় নাকি?" অন্যজন জবাব দেয়, "পরী না রে বোন, পর্দার পরী। ওই পর্দাতেই এখন সবাই বাস করে। আসল মুখ দেখা যায় না।"
ভয়েস নোট শুনে শিউরে উঠি। ঠিক সেই কথাই তো আমি লিখছি শহরের জন্যে। তারাও একই কথা বলছে মাটির ঘরের আঙিনায় বসে।
Faceless_07 অন্য মুখহীনদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। একদিন একটা গ্রুপ চ্যাট তৈরি করে। নাম: "ছায়ামন্ডলী"।
Faceless_12 প্রথম কথা বলে। সে একজন বেকার সাংবাদিক, তার ব্লগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এক সরকারি প্রকল্পের সমালোচনা করাতে। সে টাইপ করে দ্রুত, রাগান্বিত শব্দে: "আমার তো সব গেছে। চাকরি গেছে। ব্লগ গেছে। এখন শুধু লুকিয়ে লুকিয়ে টাইপ করি। আমার বাড়ি বারাসাতে। এখানে এখন খাল কাটার নাম করে জমি দখল। আমি ছবি তুলছি। লিখছি। কিন্তু কইরো না, পাব্লিশ করো না। তারা নাম্বার নিবে। 'মেইনটেইন' করবে।"
Faceless_33 পরে যোগ দেয়। সে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, শহরের গলিতে অফিস। সে লেখে শান্ত, পরিসংখ্যানের ভাষায়: "আমি সংখ্যার পিছনে মানুষ হারায় ফেলছি। কোম্পানির ব্যালেন্স শিটে লাল অঙ্ক দেখি, কিন্তু মালিকের চোখে ভয় দেখি না। সে ভয়টা আসলে কোথায়? নিশ্চয়ই মানুষের মুখের ভাবেই। আমি ফেসলেস হয়েছি কারণ আমার চেহারা এখন এক্সেল শিটের গ্রিড।"
Faceless_18 শেষে আসে। একজন গৃহিণী, শহরের এক বহুতলে। সে লেখে ধীরে, ভাঙা ভাঙা: "আমার কাজ সুপারশপে যাওয়া। সেখানের আলোয় জীবন কাটে। ফ্রিজের কোলের আলো, ডিটারজেন্টেরর আলো। মানুষের মুখ দেখি শপিং কার্ট ঠেলতে। কার্টে কি আছে? খাবার, পাউডার, sorrow। sorrow কেনে না, কিন্তু কার্টে জমা হয়। আমি মুখ দেখি। তারা কেউ কাউকে দেখে না। আমি শুধু দেখি। আমার বউন হওয়ার পর থেকে এই দেখাই আমার কাজ।"
আমি নিজেকে পরিচয় দিই: "আমি শুধু দেখি। লিখি। বিরক্ত।"
Faceless_07 জবাব দেয়: "আমরা সবাই দেখি। তবে এখন একসাথে দেখব। একত্রিত দৃষ্টি।"
কিন্তু এই "ছায়ামন্ডলী" স্থায়ী হয় না। এক সপ্তাহ পর Faceless_12 লিখে: "আমার আইপি ট্র্যাক করছে মনে হয়। আমার রাউটার আজকে তিনবার রিস্টার্ট নিছে। আমি বের হই।" তারপর তার আইডি ডিলিট হয়ে যায়। তার শেষ কথাগুলো: "গ্রামে বাড়ির পেছনে আমড়া গাছের ডালে একটা পোড়ো কাকের বাসা। ওখানে কিছু লুকানো আছে। যদি কখনো..."
Faceless_33 কিছুদিন পর লিখে: "ট্যাক্স অডিটের নোটিশ আসছে। আমার ক্লায়েন্টদের ফাইল ঘাঁটছে। তারা কি খোঁজে? শুধু টাকা না, আমার চিন্তাও কি তাদের দরকার?" সেও চলে যায়।
শুধু থাকে Faceless_07 আর Faceless_18। আর আমি।
Faceless_07 তখন আমাকে একটা প্রস্তাব দেয়। "তোমার লেখাগুলো, আর আমার সংগ্রহ, আর বাকিদের টুকরো - সব একত্রিত করি। একটা সংগ্রহ তৈরি করি। নাম দেই 'মুখোশের পালা'।"
কিন্তু ভয়। আমার ফোনে নতুন অ্যাপ আসছে। সরকারি "ডিজিটাল সুস্থতা" অ্যাপ। বাধ্যতামূলক না, কিন্তু "খুব সুপারিশকৃত"। এটা স্ক্রিন টাইম মাপে, "অস্বাস্থ্যকর" কন্টেন্ট ফ্ল্যাগ করে, "মনোরম" কন্টেন্ট সাজেস্ট করে। Faceless_07 বলে, "ডাউনলোড কর। না করলে ঝামেলা।" আমি ডাউনলোড করি। সব পারমিশন দিই।
এখন থেকে "প্রক্ষেপণ" অ্যাপ শুধু রাত এগারোটার পর ব্যবহার করি। ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপ রিপোর্ট দিতে থাকে: "আপনার স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে।" "আপনি আজ ১০টি ইতিবাচক আর্টিকেল পড়েছেন।" মজার ব্যাপার, আমি একটা ইতিবাচক আর্টিকেলও পড়িনি।
একদিন Faceless_18 একটা লম্বা মেসেজ দেয়। তার জীবনকাহিনী। কীভাবে সে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে বিয়ের পরে। কীভাবে স্বামী দিনের পর দিন চাকরি খোঁজে আর না পায়। কীভাবে সে সুপারশপের আলোয় নিজেকে হারায়। সে লেখে: "আমার মায়ের মুখ মনে পড়ে। গ্রামের বাড়ির রান্নাঘরে ধোঁয়ার মধ্যে তার মুখ। কখনো হাসি, কখনো চোখে পানি। এখন আমার মুখটা কি? ফ্রিজের দরজায় প্রতিফলিত একটা অস্পষ্ট ছায়া। আমি Faceless_18 হইছি কারণ আমার আসল নামটা আমি নিজেই ভুলে যাই। ডিউটির সময় নাম্বার '১৮' ডাকা হয়। 'মিসেস ১৮'।"
তার লেখা পড়ে আমার চোখে পানি আসে। আমি লিখি: "তোমার মায়ের মুখের কথা লিখো। বিস্তারিত। ধোঁয়ার মধ্যে কেমন দেখাত?"
সে পরের দিন একটা বিশাল টেক্সট পাঠায়। কবিতার মতো। গদ্যের মতো। আঞ্চলিক শব্দে ভরা। "মায়ের মুখ... গালে মাটি লেগে থাকত মইঠা দেবার সময়। ঠোঁটের কোণায় তেঁতুলের আচারের দাগ। চোখে সন্ধ্যার আকাশের রং, মেটে, হলুদ, বেগুনি। আর হাসি... ওই হাসিতে পুরা গাঁয়ের দুঃখ-সুখ মিশে থাকত। এখন আমার হাসি? সুপারশপের ডিমের ক্যার্টনের ছবির মতো ফ্যাকাশে।"
এই টেক্সটটা আমি সেভ করে রাখি। "Mothers_Face.txt"।
Faceless_07 এর সংগ্রহ ব্যাপক। সে শুধু কথাই রেকর্ড করে না, ছবি তুলে। কিন্তু মানুষের মুখের ছবি না। পেছনের ছবি। হাটে বাজারে ফেলে দেওয়া পলিথিন, যার উপর মানুষের পায়ের দাগ। চায়ের দোকানের দেয়ালে ঠেসা দেওয়া মানুষের পিঠ। স্কুলের বেঞ্চের উপর খোদাই করা প্রেমের কথা, যার উপর এখন কেউ বই রেখেছে। সে বলে, "মুখ দেখাব না। মুখের ছায়া দেখাব।"
একটা ছবি আসে। একটা পুরনো সাইকেল, তার ব্যাগের ধারে কাদা মাখা। Faceless_07 ক্যাপশন দেয়: "এই সাইকেলটা একজন কৃষকের। সে হাটে যেত পাট বিক্রি করতে। এখন সাইকেলটা আছে, মানুষটা নাই। শহরে গেছে কনস্ট্রাকশনে কাজ করতে। তার মুখ? আমি জানি না। কিন্তু তার সাইকেলের কাদায় তার জীবনের গন্ধ আছে।"
আরেকটা ভয়েস নোট। একজন কামারের দোকানে আওয়াজ। হাতুড়ির শব্দ। নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর কামারের গলার আওয়াজ: "এই লোহার মতোই মানুষ। আগুনে পুড়াই, পিটাই, ঠাণ্ডা করি। শেষ পর্যন্ত কি হয়? একটা খাঁচা তৈরি হয়। নিজের খাঁচা নিজেই বানাই।"
Faceless_07 বলে, "ওই কামার মাস্টার এখন মরে গেছে। দোকান বন্ধ। এই রেকর্ডিংটাই শেষ সাক্ষ্য।"
এই সব জিনিস আমি আমার আর্কাইভে জমা করি। একটা ভার্চুয়াল সমাধি। মৃত ও জীবিত মুখের স্মৃতি।
ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপ একদিন সতর্কবার্তা দেয়: "অস্বাভাবিক ডাটা ট্রান্সফার সনাক্তকরণ। আপনার নেটওয়ার্ক নিরাপদ রাখতে সাহায্য চান?" একটা হেল্পলাইন নম্বর।
ভয় পাই। Faceless_07 কে মেসেজ করি।
সে জবাব দেয়: "তারা জানতে চায় আমরা কি সংগ্রহ করছি। সংগ্রহ বিপজ্জনক। সংগ্রহ মানে স্মৃতি। স্মৃতি মানে তুলনা। তুলনা মানে প্রশ্ন।"
আমি জিজ্ঞেস করি: "কি করব?"
"সংগ্রহ বাড়াও," সে বলে। "তোমার নিজের গাঁয়ের কথা মনে পড়ে? দাদু-দাদীর মুখ? পাড়ার সেই পাগল কাকুর কথা, যে সবাইকে গালি দিত কিন্তু রাস্তায় কুকুরছানাকে দুধ খাওয়াত?"
মনে পড়ে যায়। আমি জন্মেছি শহরে, কিন্তু প্রত্যেক ছুটিতে দাদুর বাড়ি যেতাম। নড়াইল। সেখানে পাগল কাকু ছিল না, ছিল ক্ষেমটুদ্দি। এক বৃদ্ধা, যে কথা বলত না, শুধু গুনগুন করে গান গাইত। লোক বলত, যৌবনে প্রেমিক মারা গেছে, পাগল। তার মুখটা আমার এখনও মনে আছে। শুষ্ক, তামাটে, কিন্তু চোখে একটা অসামান্য নরম আলো।
লিখতে বসে যাই। ক্ষেমটুদ্দির মুখ। তার গুনগুনানি। লোকেরা তার পিছনে কথা বলত: "উহার কিছু নাই। খালি গাইতাছে।" কিন্তু আমি একবার দেখছি, একটা ছোট মেয়েকে, যে রাস্তায় কাঁদতেছিল, ক্ষেমটুদ্দি তার কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, গুনগুন করছিল। মেয়েটি থেমে গিয়েছিল।
এই গল্পটা টাইপ করি। Faceless_07 কে পাঠাই।
সে জবাব দেয়: "এই সেই মুখ। যে মুখ সমাজের বাইরে, কিন্তু মানুষের ভিতরে। এই মুখের কোনো মাস্ক নাই। কারণ এটা 'পাগল'। পাগলরা শুধু সত্যি মুখ দেখায়।"
এক সপ্তাহ চলে যায়। Faceless_18 হঠাৎ একদিন লেখে: "আমার স্বামী আজ আমারে জিগায়ছিল, 'তুমি এত সময় ফোনে কি করো?' আমি ভয় পাইছি। আমি কইছি, 'কিছু না।' কিন্তু তার চোখে সন্দেহ দেখছি। হয়তো সে আমার ফোন চেক করবে। আমি হয়তো আর লিখতে পারব না।"
তারপর সে চলে যায়। তার শেষ কথাগুলো: "আমার মায়ের মুখের গল্পটা রাখিও। আমার নাম নয়, শুধু মুখটা।"
এখন শুধু আমি আর Faceless_07। সে বলে, "সংখ্যা কমছে। কিন্তু যারা আছে, তাদের কণ্ঠ জোরালো হওয়া দরকার।"
সে আমাকে একটা লিংক পাঠায়। একটা ফাইল শেয়ার। পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড। বলে, "এটাই আমার সব সংগ্রহ। গ্রাম-শহরের মুখের ভাব। নদীর পাড়ের কৃষকের হতাশা। শহরের ফ্ল্যাটের যুবকের উদ্বেগ। রিকশাওয়ালার স্বপ্ন। এগুলো তুমি রেখো।"
ফাইলটা ডাউনলোড করতে সময় লাগে। ২ জিবি। নাম: "Chhaya_Mukh.zip"।
ডাউনলোড শেষ হলে, Faceless_07 লিখে: "আমার রুমের সামনে আজ অচেনা গাড়ি। দুইদিন ধরেই আছেক। আমার মনে হয় তারা জানে। আমি এই আইডি ছাড়ব। হয়তো অন্য কোনভাবে দেখা হবে। আমাদের সংগ্রহ বাড়াও। মুখের কথা লিখো। শুধু বিরক্তির না, আশারও। কারণ আশার মুখও আছে। লুকানো, কিন্তু আছে।"
আমি জিজ্ঞেস করি: "তুমি কি নিরাপদ?"
জবাব আসে: "নিরাপত্তা একটা মুখোশ। আমি এখন সেটা খুলব।"
তারপর তার স্ট্যাটাস অফলাইনে চলে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দিনের পর দিন। আর কখনো অনলাইনে আসে না।
আমি একা। আমার সামনে বিশাল একটা ডিজিটাল সংগ্রহ। Faceless_07, Faceless_12, Faceless_33, Faceless_18-এর দেওয়া সব টুকরো। আমার নিজের লেখা। সবাই মিলে এক হয়ে যাওয়া।
ফাইলটা খুলি। ভিতরে ফোল্ডারের পর ফোল্ডার। "Village_Voices", "City_Whispers", "Market_Faces", "Educational_Masks"। ভয়েস নোট, টেক্সট, ছবি। একটা সম্পূর্ণ নৃতাত্ত্বিক আর্কাইভ।
একটা টেক্সট ফাইল খুলি: "Fisherman_Tales.txt"। একজন জেলে বলছে: "আগে নদীতে মাইলা পইড়া জাল ফেলতাম। এখন নদীতে পলিথিন। মাছ নাই। যেই মাছ থাকে, তাও বিষটুস। আমাদের মুখ এখন শুধু অপেক্ষার মুখ। কবে সরকার আসবে, কবে নদী ঠিক করবে। কিন্তু সরকারের মুখ আমরা দেখি না। শুধু টিভিতে দেখি। তারা হাসে। আমরা কাঁদি।"
আরেকটা ফাইল: "Rickshaw_Diary"। একজন রিকশাওয়ালা তার দিনলিপি: "আজকে একটা মেমসাহেব উঠল। মোবাইলে কথা কইতাছে। আমারে জিগায় নাই কোথায় যাব। আমি শুনছিলাম। তার কথা... 'ওহো, স্যরি, আই এম স্টাক ইন ট্র্যাফিক। দিস রিকশাওয়ালা ইজ স্লো।' আমি স্লো না ভাই, ক্ষুধার জ্বালায় পেটে আগুন। মুখে বলতে পারি নাই। শুধু হাল চালাইছি।"
এই সব কথা পড়তে পড়তে আমার নিজের বিরক্তি গাঢ় হতে থাকে। এটা শুধু আমার ব্যাপার না। এটা সবার। শহরে, গ্রামে, রিকশায়, অফিসে, সুপারশপে, নদীর পাড়ে... সবাই মুখোশ পরে আছে। কেউ ডিজিটাল, কেউ মানসিক, কেউ সামাজিক।
আমি একটা নতুন ফোল্ডার তৈরি করি: "Unmasking_Project"। এখানে সব টুকরো জোড়া দেব। একটা কোলাজ তৈরি করব। মুখের কোলাজ।
কিন্তু আগে ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপের হাত থেকে বাঁচতে হবে। একটা সাধারণ ফোন কিনি। শুধু কল আর এসএমএসের জন্য। সিম কার্ডটা পুরনো ফোন থেকে বদলাই। নতুন ফোনে "প্রক্ষেপণ" অ্যাপ ইনস্টল করি না। শুধু নোটস অ্যাপ আছে।
লিখতে শুরু করি নতুন জায়গায়। পুরনো ফোনটা বালিশের নিচে রাখি। শুধু মাঝে মাঝে চেক করি নোটিফিকেশন আছে কিনা। আছে। প্রতিদিন। "আপনার আজকের ডিজিটাল হেলথ রিপোর্ট।" "আপনি আজ ৮ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম কাটিয়েছেন।" মজার বিষয়, আমি তো সেটা ব্যবহারই করছি না। তাহলে? তারা কি অনুমান করছে? নাকি আমার পুরনো স্ক্রিন টাইম ডাটা দেখাচ্ছে?
যাই হোক, এখন আমি একটু মুক্ত। নতুন ফোনে লিখি। আঞ্চলিক শব্দ মিশাই। ক্ষেমটুদ্দির গল্প লিখি স্থানীয় ভাষায়: "ক্ষেমটুদ্দি গাইত, 'ফাগুনে পাগল হইয়া বন্ধু, নাইওর যায়...' তার গলায় ভাঙা সুর, কিন্তু গাঁয়ের সব দুঃখ যেন ওই সুরে মিশে নদীতে বইয়া যাইত।"
Faceless_07-এর সংগ্রহ থেকে উদ্ধৃতি যোগ করি। জেলের কথাটা লিখি: "নদী এখন শুধু স্মৃতি। মাছ এখন শুধু স্বপ্ন। আমাদের মুখ এখন শুধু ধুলো জমা কাঁদুনি।"
রিকশাওয়ালার ডায়েরি থেকে লাইন: "আমার রিকশার হরন কত জনের মুখ বহন করে? কেউ হাসে, কেউ কাঁদে, কেউ ফোনে কথা কয়। কিন্তু কেউ আমার মুখ দেখে না। আমি শুধু একটা হাতল। একটা ড্রাইভিং সিট।"
এই সব লিখতে লিখতে একটা বইয়ের আকৃতি মনের মধ্যে ফুটে উঠে। শুধু আমার গল্প না। আমাদের গল্প। শহর-গ্রাম মিলানো, আঞ্চলিক-মান্য ভাষা মিশানো, বিরক্তি-আশা মিশানো।
একটা নাম মনে আসে। Faceless_07-এর দেওয়া নামটাই ঠিক: "ছায়া ও মুখশ্রী"। কিন্তু উপটাইটেল দিই: "গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মুখোশের পালা"।
আমি Faceless_07-কে খোঁজার চেষ্টা করি। তার আইডি তো অফলাইন। তার দেওয়া গ্রামের নামটা মনে পড়ে না। সে শুধু বলেছিল "হাওরপারের ধারে"। বাংলায় কত হাওর! কত গ্রাম!
হঠাৎ মনে পড়ে Faceless_12-এর শেষ কথা: "গ্রামে বাড়ির পেছনে আমড়া গাছের ডালে একটা পোড়ো কাকের বাসা। ওখানে কিছু লুকানো আছে।"
এটা কি কোড? নাকি সত্যি? আমি জানি না। কিন্তু এই অজানা সূত্রটাই এখন একমাত্র সংযোগ।
রাত হয়। নতুন ফোনে লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। পুরনো ফোন থেকে একটা নোটিফিকেশন আসে। ভাইব্রেট হয় বালিশের নিচে।
সকালে দেখি: "আপনার ডিজিটাল সুস্থতা স্কোর কমেছে। আপনি গতকাল শুধু ২টি ইতিবাচক আর্টিকেল পড়েছেন। অনুগ্রহ করে আরো পড়ুন। আপনার মেন্টাল হেল্থ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।"
আমি হাসি। তারা জানে না যে আমি তাদের সিস্টেমের বাইরে একটা জীবন শুরু করেছি। তারা এখনও পুরনো ফোনটাকে ট্র্যাক করছে, যে ফোনটা এখন একটা জাল স্ক্রিনে পরিণত হয়েছে।
আমি নতুন ফোনে লিখি: "অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ছিলাম। এখন সুতো কাটছি। কিন্তু সুতোটা নিজের হাতে ধরি নাই। অন্য একজনের হাতের ইশারায় কাটছি। যে হয়তো এখন অন্ধকারে। তার মুখ আমি দেখি নাই। কিন্তু তার কণ্ঠ শুনছি। আঞ্চলিক ভাষায়, গ্রামীণ উপভাষায়, শহরের কোলাহলে লুকানো বেদনায়। এই কণ্ঠই এখন আমার লেখার শক্তি। এ এখন একা না। অনেক মুখের সম্মিলিত যাত্রা।"
এটা শেষ না। শুরু মাত্র। কারণ সংগ্রহ এখনও অসম্পূর্ণ। মুখ এখনও অদৃশ্য। সুতো এখনও ছিঁড়ে শেষ হয় নাই।
আর Faceless_07? সে হয়তো কোন এক গ্রামের আমড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে, মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। অথবা শহরের কোন এক গলিতে, নতুন একটা মাস্ক পরে, নতুন একটা পরিচয়ে। যে যেখানেই থাকুক, তার দেওয়া সংগ্রহ এখন আমার হাতে। আমাদের হাতে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।