এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • দ্য প্যারাডাইস

    Anirban M লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • “A spectre is haunting Europe — the spectre of communism.” Communist Manifesto, Karl Marx

    পূর্বকথা
    অনিমেষ বোঝে মাথা থেকে সুড়সুড়ি দিতে দিতে যা  নামছে, সেগুলো পিঁপড়ে নয়, রক্তের ধারা। একটু আগে যখন তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে কনস্টেবল তিওয়ারি পায়ের হাড়গুলো একটা একটা করে ভাঙছিল, বা তারও আগে তার হাতের নখে যখন পিন ফোটাচ্ছিল সাব ইন্সপেক্টর দাস, তখন ভয়াবহ সব যন্ত্রণা স্নায়ু বেয়ে মাথায় ধাক্কা মারছিল। এখন এই যন্ত্রণাগুলো আর শরীরে নেই, তারা একটা ভাসমান মেঘের মত তার শরীরের ওপরে ভেসে বেড়াচ্ছে – অনিমেষ দেখতে পায়। তবে কি এটাই মৃত্যু? তার জীবন এখানেই শেষ? মরার আগে নাকি গোটা জীবন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।  তেমন কিছু হচ্ছে না তো! শুধু প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠ মনে পড়ছে, সে আর সুবিনয় – ওরা ভেবেছিল গবেষণা করতে হলে বার্কলি তেই যাওয়া উচিত! সুবিনয় নিশ্চয়ই চলে গেছে এতদিনে, নতুন সব দিগন্ত খুলে দিচ্ছে নিশ্চয়ই পদার্থবিজ্ঞানে। কিন্তু অনিমেষ? অনিমেষ কি করল তাহলে? এই যে একটা অন্ধকার ঘরে, বমি-পেচ্ছাপ-রক্তের গন্ধ মাখা ঘরে আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে অনিমেষ, তার বদলে মানুষের মুক্তি আসবে নিশ্চয়ই, আসবে না?
    এর মিনিট দশেক বাদে সাদা পোশাকের যে অফিসার অনিমেষ বডিটা পা দিয়ে বডিটা একটু নেড়ে বলবেন  “ দাস, বডি তা ডিসপোস করার ব্যবস্থা কর” তিনি খুব অভিজ্ঞ অফিসার বলে পরিচিত – বডি জীবিত না মৃত তিনি পা দিয়ে নেড়েই বলতে পারেন – নাড়ী দেখার দরকার পড়ে না।
    পঞ্চাশ বছর পরে
    সাফল্য
    শহরতলীর আঁকাবাঁকা রাস্তায় যারা অটো চালায় তারা হয়ত ছোটবেলায় কৃশানু দে হওয়ার স্বপ্ন দেখত, যে শরীরের ভাঁজে ডিফেন্ডারদের ছিটকে ফেলে খুলে দেবে গোলের দরজা। একটা লরি আর বাস এর মধ্যের ফুট চারেক ফাঁকের মধ্যে দিয়ে যখন সায়নদের অটোটা গলে যাচ্ছিল তখন সায়ন এটাই ভাবছিল। অটো চালানোর দৈনন্দিন একঘেয়েমির মধ্যে এই মৃত্যুর সাথে চু কিত কিত খেলাটাই হয়ত অটোওয়াওলার একমাত্র রোমাঞ্চ, হয়ত এটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই অটোটা এসে দাঁড়ায় একটা নতুন এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সামনে। এ জায়গাটা সায়ন আগেও দেখেছে, কিছুদিন আগেও এটা ছিল ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা একটা পুরনো, ভাঙ্গাচোরা বাংলো বাড়ি আর এখন সেখানে বেশ বড়সর একটা আবাসন – এখানেই সায়নের নতুন ঠিকানা – ফ্ল্যাট ডি ৩। সেই জঙ্গুলে বাড়িটার বাইরে প্রায় বিবর্ণ একটা নামফলক ছিল –  দ্য প্যারাডাইস। সাধারণত কোন জায়গায় ফ্ল্যাট উঠে যাওয়ার পরে তার আগে কী ছিল সায়ন মনে করতে পারে না। কিন্তু সেই বাড়ি আর দ্য প্যারাডাইস লেখা নামফলক কিভাবে সায়ন এর মনে রয়ে গেল সেটা সায়নও ঠিক জানে না। আজকের এই ঝকঝকে দ্য নেসট এর কোথাও অবশ্য সেই প্যারাডাইসের কোন চিহ্ন নেই। মনেই হবে না এই মার্বেল লাঞ্ছিত, রঙ্গিন বহুতলের জায়গায় কোনদিন কোন ভাঙ্গা বাগানবাড়ি ছিল। গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার পরে অবশ্য আলো আর মার্বেলে মাখামাখি নেস্ট কখন যে  সায়নের মনে থেকে প্যারাডাইসের স্মৃতিকে মুছে নিয়েছে সায়ন খেয়াল করে নি।  চাবি দিয়ে নতুন কেনা ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে খুলতে সায়ন ভাবে এই ফ্ল্যাট আসলে থাকার জায়গা না। থাকার জায়গা কেনার চল বহুদিন উঠে গেছে। এখন যা কেনা হয় তা হল সাফল্য। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই উজ্জ্বল আলো আর এনামেল পেন্ট মাখা সাফল্য চুঁইয়ে ঢুকতে থাকে সায়নের নাক, কান, মুখ দিয়ে। দক্ষিণ কলকাতার চোদ্দশো স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট তার মালিকানায় -- এই ভাবনাটার একটা কিক আছে, যেটা কোন ভাল স্কচের চেয়ে কম নয়। সাফল্যের নেশা অন্য যে কোন নেশার মতই আসলে, ভাবতে ভাবতে সায়নের মুখে একটা হালকা  হাসি ফুটে ওঠে। সায়নের নিজের মেধা নিয়ে একটা গর্ব আছে, যে মেধা তাকে প্রথমে ইঞ্জিনিয়ার  আর তারপরে ম্যানেজার বানিয়েছে। আজ সে সেই মেধার চূড়ান্ত পরিণতির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছুঁয়ে দেখছে – ইট, লোহা, সিমেন্ট, মার্বেলে বানানো চোদ্দোশো স্কোয়ার ফিট, দক্ষিণ কলকাতায়। আজ থাকা যাবে না এখানে, আসবাব কেনা হয় নি এখনো। আরও খানিকক্ষণ তাড়িয়ে তাড়িয়ে সাফল্য উপভোগ করে  সায়ন বেড়িয়ে পড়ে  আবার একটা অটো নেয়, যা সায়নের আর্থিক অবস্থার সাথে বেমানান।এই হাউসিং এর সব বাড়ির মালিকের নিশ্চয়ই গাড়ি আছে। কিন্তু দুটো নীতির ব্যাপারে সায়ন নিজের কাছে খুব পরিষ্কার -- সায়ন কোনদিন গাড়ি কিনবে না আর কলকাতা ছেড়ে যাবে না।

    কফিশপ
    কফিশপে নীতাদির সামনে বসে সায়নের অস্বস্তি হতে থাকে। পার্ক স্ট্রীটে সন্ধে নামছে তখন। আস্তে আস্তে আলো জ্বলে উঠে আরও মোহময়ী (রাস্তা যে স্ত্রীলিঙ্গ এরকম কোন কথা ব্যাকরণে নেই। তবু রাতের পার্ক স্ট্রীট নারীই, অন্তত পুরুষের কল্পনায়) হয়ে উঠছে পার্ক স্ট্রীট। কফিশপের ঠাণ্ডা কাচের  দেওয়ালে লেগে জলীয় বাষ্প একটা অনচ্ছ আবরণ তৈরি করেছে, যার মধ্যে দিয়ে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বাইরের ফুটপাথে কিছু আদুর গায়ের ভিখিরি বাচ্চার অবয়ব। অন্য সময় সায়ন কাচের দেওয়ালের ওধারে থাকা ওই সব বাচ্চা ভিখিরিদের নিয়ে খুব তাড়িত হয় না। একটা অস্বস্তি থাকে কিন্তু সেটা অনেকটা পুরনো ফুটে থাকা কাঁটার মত যা সামান্য খচখচের সাথে থেকে যায়। কিন্তু আজ নীতাদির সামনে সায়ন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। নীতাদি -- একসময়ের নামকরা নকশাল নেত্রী আর তারও আগে প্রেসিডেন্সির চোখ ধাঁধানো ছাত্রী, যে পুলিশের অত্যাচারে তার ডান চোখ হারিয়েছে চিরদিনের মত, হারিয়েছে তার স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ – যে কারণে সে এক হাতে চায়ের কাপ ধরতে পারে না এখনো। শুধুমাত্র মানুষের কথা ভেবে জীবন উৎসর্গ করে দেওয়া, সত্তরোর্ধ নীতাদির সামনে বসে সায়ন এক প্রবল অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়। সেই অপরাধবোধ অন্যদিনের মত গলায় ফুটে থাকা কাঁটা নয়, বরং একটা অক্টোপাস যে ক্রমশ সায়ন কে তার শূঁড়ে জড়িয়ে নিতে থাকে। শূঁড়ের চাপ আরও বাড়তে থাকে যখন কফিশপের ছেলেটি মেনু রেখে যায় আর নীতাদি মন দিয়ে মেনু দেখতে থাকেন। কফিশপের কাচের দেওয়ালের এপার আর ওপারের পৃথিবীর ফারাক ক্রমশ স্পষ্টতর হতে থাকে আর শূঁড়ের চাপ আরও বেড়ে যায়। নীতাদির সাথে সায়নের পরিচয় একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যেখানে মূলত গণ আন্দোলন ভিত্তিক তথ্যচিত্র দেখানো হচ্ছিল। সেখানেই সরোজ দত্তের একটি তথ্যচিত্রে আলোচক হিসেবে ছিলেন নীতাদি। নীতাদি, সরোজ দত্তকে ব্যক্তি জীবনে চিনতেন, সেই সব অভিজ্ঞতাই ভাগ করে নিয়েছিলেন সবার সাথে। সিনেমা দেখানোর পরে সায়ন দেখা করে নীতাদির সাথে, কথা বলে, অনেকটা হয়ত বোঝার তাগিদেই যে কীভাবে ঊজ্জ্বল প্রতিষ্ঠার হাতছানি কে উপেক্ষা করতে পেরেছিল সত্তরের এই ধারালো যৌবন। গ্যাজেট লাঞ্ছিত জীবনযাপনের একটা পাপবোধ মাঝে মাঝেই আক্রমণ করে সায়ন কে, যদিও তা থেকে পরিত্রাণের কি পথ সে জানে না। নীতাদির সাথে কথা বলা বা নীতাদির জন্য কিছু করাটা কে সায়ন তার কফিশপ-বিদেশভ্রমণ-দামী মদ খচিত যাপনের একটা প্রায়শ্চিত্ত করা হিসেবেই ভাবে। সেদিনের পরে সায়ন আরও অনেকবার নীতাদির বাড়ি গেছে, কথা বলেছে; সেই সময়ের পত্রপত্রিকা, বইপত্র নেড়েচেড়ে দেখেছে। সায়নের আগ্রহ ততটা  নকশালবাদ নিয়ে নয়, যতটা নকশালদের নিয়ে। একদল প্রবল বুদ্ধিমান ছেলেমেয়ে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতির সম্ভাবনা ছেড়ে দিয়ে কিসের টানে চলে গিয়েছিল গ্রামে, সায়ন ভাবার চেষ্টা করেছে অনেকবার -- ভেবে উঠতে পারে নি। বিশেষত তার চারপাশের ছেলেমেয়েদের এবং নিজের দিকে তাকালে গোটাটাই একটা অলীক স্বপ্ন মনে হয়।
         কফিশপে আসার প্রস্তাবটা নীতাদির। নইলে বিলাসিতার অন্দরমহলে সায়নের স্বচ্ছন্দ যাতায়াতের কথা সায়ন নীতাদির কাছে গোপনই রাখে। সায়ন ভেবেছিল নীতাদি হয়ত সায়নের ওপর বিরক্তই হবে কফিশপের রকম সকম দেখে। কিন্তু সায়ন দেখে শিশুর সারল্যে নীতাদি ওয়েটারের কাছে জেনে নিচ্ছে ক্যাপুচিনো আর আমেরিকানোর তফাত, এস্প্রেসো বানানোর পদ্ধতি এরকম আরও অনেক কিছু। অর্ডার দেওয়ার কিছুক্ষণ পরে কালো কফি এসে গেল দুজনের জন্যই। কফিতে চুমুক দিয়ে নীতাদি একটা তৃপ্তির শ্বাস ছাড়েন “ আহ! চমৎকার কফি! তোমার জন্যই আমার আসা হল সায়ন। নইলে এসব জায়গায় আমার আসার সাধ্য, সামর্থ কোনটাই নেই।“ বাইরে, পার্ক স্ট্রীটে তখন সন্ধে জাঁকিয়ে বসছে, ভিখিরিরা কিছু সাহেবের হাত ধরে টানছে বেলুন বিক্রির নাছোড় প্রচেষ্টায়। সায়নের হঠাৎ মন খারাপ লাগতে থাকে। বাড়ি কেনার কথাটা আর বলে উঠতে পারে না নীতাদি কে।
    ফ্ল্যাট ডি ৩
    ঘর গরম (হাউস ওয়ার্মিঙ –এর এই বাংলা সায়নের বন্ধু জাগরীর অবদান) পার্টি শেষে বন্ধুরা চলে গেছে অনেকক্ষণ হল। সায়ন দশতলার জানলা দিয়ে নিচের দিকে তাকায় – এই শহর থেকে তার মুক্তি নেই। কোন শান্ত শীতল গ্রাম, কোন অকৃপণ প্রকৃতি তার আশ্রয় নয়। এই শহরের পাকস্থলীর মত অলিগলি জুড়ে ঘুরে বেড়ানই তার নিয়তি। শহরটাকে তার একটা বিশাল তিমি মাছের মত লাগে, যার পাচক রসে সে এবং তার মত অনেকেই প্রতিনিয়ত জারিত হয়ে, একটু একটু করে তিমিমাছের  পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই দশতলার ওপর এসে সে কি তিমিমাছের ওপরে উঠে এসেছে? নাকি ওপরে উঠলেও আসলে সে এখনো তিমি মাছেরই অংশ? বন্ধুদের সাথে সামান্য মদ্যপান করেছিল সায়ন, হয়ত তাই এসব এলোমেলো চিন্তা মাথায় ভাসতে থাকে। একটা প্রজেক্ট রিপোর্ট ফাইনাল করার ছিল, কিন্তু আজ আর ভাল লাগছে না। বুকের ভেতর থেকে একটা কষ্ট উঠে আসছে, কিসের তা সায়ন জানে না। এই কষ্টটা নিয়েই সায়ন কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারেনি। ঘুম ভাঙল একটা আওয়াজে। সায়ন ঘর অন্ধকার করে শোয়। কিন্তু ইনসোমনিক মহানগরীর আলো কিছুটা হলেও পর্দার ফাঁক চুঁইয়ে ঘরে ঢোকে। সেই অল্প আলোয় সায়ন দেখতে পেল একটা ছায়ামূর্তি, একটা সাদা অবয়ব যেন। সে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে। সায়ন ভয় পেয়ে যায়। এতো সিকিউরিটি পেরিয়ে, দশতলার ওপরের  ঘরে কিভাবে কেউ ঢুকতে পারে সায়ন ভেবে উঠতে পারে না। লোকটা তার টিভি, ও অন্যান্য সরঞ্জামের ওপর হাত বুলিয়ে দেখছে সায়ন বুঝতে পারে। এ কি চোর? কিন্তু একটা দশতলা বাড়ি থেকে একটা ৪৮ ইঞ্চি টিভি চুরি করে পালানো কি সম্ভব? তাহলে কি এ খুনি? সিরিয়াল কিলার? সায়ন খুব দ্রুত ভাবতে থাকে। যদি এ চোর হয়, আর সঙ্গে অস্ত্র থাকে তাহলে চুপচাপ শুয়ে থাকাই ভাল। বাড়িতে টাকাপয়সা খুব বেশি নেই, গয়না তো নেই-ই। টিভি, ফ্রিজ চুরি করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এ যদি সিরিয়াল কিলার হয় তাহলে প্রতিআক্রমণে যাওয়াটাই হয়ত শ্রেয়। কিন্তু কলকাতায় সিরিয়াল কিলার রাত তিনটের সময় তার ঘরে? এটাই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? সন্ধের মদ, রাত তিনটের ভেঙে যাওয়া কাঁচা ঘুম, সবমিলিয়ে সায়ন ভালো বুঝতে পারে না তার কি করা উচিত। বুঝতে না পেরে সে আলো জ্বেলে দেয়। আলো জ্বালার পরে সে দেখে কিছুই নেই। ফাঁকা ঘরে একটা বড় টিভি আর একটা বোসের মিউজিক সিস্টেম ঝিমোচ্ছে! সায়ন আলো জ্বেলে লিভিং রুমে আসে। সেখানেও একলা ফ্রিজ মৃদু নাক ডেকে ঘুমচ্ছে। সায়ন জল খায়, বাথরুম যায় একবার তারপর মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। হয়ত গোটাটাই স্বপ্ন, মনের ভুল। অফিসে অনেক চাপ যাচ্ছে। সায়ন এরপর শোয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বাকি রাতটা এপাশ, ওপাশ করেই কেটে যায়। এর পর দুতিনদিন কাজের চাপে সে রাতের কথা মনে ছিল না সায়নের। কিন্তু এর ঠিক দুদিন পরে আবার ঠিক তিনটের সময় সায়নের ঘুম ভেঙ্গে যায়। একটা অস্বস্তি নিয়ে ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসে অন্ধকারে চোখ সইয়ে নেওয়ার পর সায়ন বুঝতে পারে তার শোয়ার ঘরের চেয়ারে একটা অবয়ব বসে আছে। আরেকটু ভাল করে তাকিয়ে বুঝতে পারে অবয়বটি একটি অল্প বয়সী ছেলের, রোগা লম্বা, প্যান্ট শার্ট, মনে হয় চোখে যেন একটা চশমা রয়েছে। সায়ন চেঁচানোর চেষ্টা করে কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বর বেরয় না। সাদা অবয়বটি আগের দিনের মতই ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে, একবার যেন জানলা দিয়ে নিচে তাকায়। সায়ন প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বেড সুইচ জ্বালিয়ে দেয় আর সঙ্গে সঙ্গে সাদা আলোর বন্যায় ঘর ভেসে যায়। কিন্তু সায়ন কোথাও কাউকে দেখতে পায় না। সায়ন বুঝতে পারে এসি র হিমঠান্ডা উপেক্ষা করে তার সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে উঠছে। বাকি রাত সায়ন আর ঘুমোতে পারে না।
    বার
    পরের দিন শুক্রবার, খুব কষ্ট করে অফিস গেল সায়ন। সারা রাত ঘুম না হওয়ার ক্লান্তির সাথে একটা অদ্ভুত আতঙ্ক। অফিসে সায়নকে দেখে অনেকেই চমকে গেলেও ভদ্রতা বশত দু-একজন বাদ দিয়ে কেউই জিজ্ঞেস করে নি ঠিক কি হয়েছে। শুক্রবার কাজের পরে কোন বারে বসা সায়নের অনেক দিনের অভ্যেস। সায়ন বেশী মদ খায় না, খুব বেশী হলে দু পেগ হুইস্কি বা অল্প বিয়ার। সায়নের নিয়মিত পানসঙ্গী অশোকদা। মধ্য পঞ্চাশের এই ভদ্রলোক সরকারি চাকুরে, সায়নের মত কর্পোরেট নন। সায়নের থেকে প্রায় তিরিশ বছরের বড় অশোকদার সাথে সায়নের ঠিক কিভাবে পরিচয় সেটা আর সায়নের মনে পড়ে না। কিন্তু সায়নের মতই ইনি কলকাতা নামক এই বিরাট তিমি মাছের পেটে আটকা পড়েছেন আর তার অন্ত্র আর পাকস্থলীর মধ্যে পথ খুঁজে চলেছেন। মধ্য কলকাতার ঈষৎ পোড়ো এই পানশালাটিও সায়নকে চিনিয়েছেন অশোকদাই। কলকাতার মতই এই পানশালারও এক সময় জৌলুস ছিল, আভিজাত্য ছিল জলসাঘরের বিশ্বম্ভর রায় এর মত। হাল ফ্যাশানের দামী রেস্তোরার রোশনাই এখন সরে গেছে কলকাতার দক্ষিণ আর পূর্ব দিকে। কালের অনিবার্য গতিকে প্রাণপণে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে চলেছে মধ্য কলকাতার যে কটি বার, এই বারটিও তাদেরই একজন। এই অসম লড়াইতে তার সৈন্য বলতে কিছু ন্যুব্জ ওয়েটার, এক ঝিমন্ত ক্যাশিয়ার আর অশোক, সায়নের মত কিছু নাগরিক যারা কলকাতার উজ্জ্বল বিচ্ছুরণ থেকে দূরে, তার অন্ত্রজালে আশ্রয় খোঁজে।
    সায়ন যে অশোকদার সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসে তার একটা বড় কারণ অশোকদা জাতীয়, রাজ্য বা অফিস রাজনীতি  নিয়ে গালভরা বুলি আওড়ান না, যদিও অশোকদার সমাজবোধ খুব প্রখর। এছাড়া অশোকদা, সায়ন কেন বিয়ে করছে না সেই জাতীয় প্রশ্নে ঢুকতেও পছন্দ করেন না। মোটের ওপর অশোকদার সাথে বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা বলা যায় যেটা বলার লোক আজকাল বিরল হয়ে যাচ্ছে।  অশোকদার সাথে সায়নের সবচেয়ে ভালো আড্ডা জমে সায়নের তা হল টেস্ট ক্রিকেট আর পুরনো হিন্দি ছবির গান। কিন্তু আজ আড্ডা তেমন জমছিল না। কাল রাতের কথা ভেবে সায়ন বার বার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কথাটা অশোকদাকে বলতে একটু সঙ্কোচই হচ্ছিল তার। মদ পেটে পড়লে ভেবেচিন্তে কথা বলতে আর ইচ্ছে করে না সায়নের আর অশোকদাও ওকে সেই স্পেসটা দেন। দু পেগের পড়ে তাই বলেই ফেলল সায়ন, “আপনি ভুতে বিশ্বাস করেন?” ঠিক সেই মূহুর্তে অশোকদা ব্রায়ান লারা আর সচিন তেন্ডুলকারের ব্যাটের ব্যাক লিফটের একটা তুলনামূলক আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছিলেন। প্রশ্ন শুনে একটু থমকালেন, তারপরে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “ভূত থাকার সপক্ষে তেমন জোরালো প্রমাণ তো পাইনি। কেন? তুমি পেয়েছ নাকি?” “ঠিক জানিনা অশোকদা। আসলে খুব অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আপনাকে হয়ত বলা হয় নি, আমি একটা ফ্ল্যাট কিনেছি। সমস্যাটা সেখানেই।“ এরপর সায়ন যা দেখেছে অশোকদাকে বলল। সায়ন কাউকে বলে নি এই ভেবে যে লোকজন হাসাহাসি করবে। অশোকদা কিন্তু খুব মনে দিয়ে শুনলেন। তারপর হাতের পেগটা শেষ করে বললেন, “দেখো, তুমি যা বলছ তার নিশ্চয়ই একটা মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যা সম্ভব। তোমার চাকরি, কাজের চাপ, ক্লান্তি সব মিলে হ্যালুসিনেশন অসম্ভব নয়। তবে...” একটু কৌতুকমাখা মুখে বললেন অশোকদা, “দেয়ার আর মেনি থিংগস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ, হোরেশিও….।” সায়ন ঠোটের কোণে একটা হাসি খেলিয়ে মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল, “কিন্তু আমার বাবা তো ডেনমার্কের রাজা নন, অশোকদা! তাছাড়া তিনি তো বেঁচে, হালিশহরে থাকেন।” অশোকদা এবার হেসে ফেললেন। তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “শুধু জন্মদাতা বাবাই তো আমাদের বাবা নয়, সায়ন। আমাদের আরও অনেক বাবা আছে। সায়ন একটু অবাক হয়েই অশোকদার দিকে তাকিয়ে থাকে। অশোকদা গভীর ভাবে সায়নের দিকে তাকিয়ে বলেন, “কিছুক্ষণের জন্য ধরে নেওয়া যাক তোমার ফ্ল্যাটে অশরীরী আত্মার আবির্ভাব হয়েছে। এও নাহয় ধরা যাক সে হ্যামলেটের বাবার মত সেও তোমাকে কিছু বলতে চায়। তাই একটা পথ হতে পারে ডেনমার্কের রাজার সাথে কথা বলা। এরপর বৈজ্ঞানিক সমাধান অর্থাৎ মনোচিকিৎসক দেখিয়ে স্ট্রেস কমানোর ওষুধ খাওয়া তো রইলই।” সায়ন চুপ করে ভাবতে থাকে।
    কথোপকথন ১
    গত দু’রাত ধরে সায়ন সেই ছায়ামুর্তি’র অপেক্ষায় বসে থেকেছে কিন্তু কিছু হয়নি। পুরোটাই মনের ভুল ধরে নিয়ে আজ ঘুমিয়েই পড়েছিল এমন সময় খুটখাট শব্দে ঘুম ভাঙল। উঠে দেখল সেই ছায়ামূর্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরময়।অন্যদিনের মত আলো জ্বালালো না সায়ন, খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?” কোন উত্তর এলো না। ছায়ামূর্তি ঘুরে বেড়াতে লাগল, কখনো জানলার সামনে দাঁড়ায়, কখনো টিভি তে হাত বোলায়। সায়ন আবার প্রশ্ন করে, “আপনি কে?” ছায়ামুর্তি একটু থমকে দাঁড়ায়, তারপর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে সায়নের দিকে মুখ করে বসে বলে, “আমি অনেকদিন আগে মারা যাওয়া একজন মানুষ।” সায়ন তার শিরদাঁড়ায় বয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা স্রোতকে উপেক্ষা করে, খানিকটা ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করে, “কিন্তু আপনি এখানে কি করছেন?” “সেইটাই ভাল মনে করতে পারছিনা, জানো? মারা যাওয়ার পর, সব শেষ। মানে অন্ধকারও নয়, কারণ অন্ধকার দেখার জন্যও কাউকে থাকতে হয়, তাই না? কিন্তু মরে যাওয়ার পরে তুমি তো নেই। তাহলে অন্ধকারই বা দেখবে কি করে? যাই হোক এভাবেই চলেছে অনেকদিন, কিন্তু হঠাৎ দেখছি আমি তোমার ঘরে। যে ঘরে একটা চমৎকার জানলা আছে আর অনেক যন্ত্র। তার কিছু সব যন্ত্র আমার জীবদ্দশায় অন্যরকম ছিল, আর কিছু যন্ত্র যা আমি দেখি নি। এটা কি আমেরিকা?” “না, এটা ভারত, কলকাতা।” সায়ন বোঝে তার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসছে।
    --“এটা কোন বছর?”
    --“২০২৩”।
    -- অনেক বছর কেটে গেছে তার মানে।  পঞ্চাশ বছর প্রায়। পৃথিবী অনেক পাল্টে গেছে তার মানে। তোমার বাড়িটা খুব সুন্দর। তুমি একাই থাকো এখানে?”
    -- হ্যাঁ, এই কিছুদিন হল কিনেছি।
    ছায়ামূর্তি উঠে বসে, জানলার সামনে গিয়ে জানলার কাচে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, “তোমাকে দেখে মনে হয় না তোমার বয়স তিরিশের বেশি। তুমি এই বয়েসে এত বড় ফ্ল্যাট কিনতে পেরেছ! তুমি কি অনেক বড়লোকের ছেলে? আচ্ছা, তোমাকে কি বলে ডাকবো আমি?” “আমার নাম সায়ন। না, না, আমার বাবা সরকারি অফিসার ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। তবে যে দেশের মানুষের গড় আয় দশ হাজার টাকা, সে দেশের তুলনায় তো উচ্চবিত্ত বটেই। তবে বড়লোক বলতে যা বোঝায় সেরকমকিছু আমরা নই। স্বচ্ছল বলতে পারেন। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছি যাদবপুর থেকে, তারপর ম্যানেজমেন্ট। এখন একটা ভাল চাকরি করি, তাই লোন নিয়ে কিনেছি।” সায়ন হঠাৎ বুঝতে পারে পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীটা অনেক পালটে গেছে। ও ছায়ামূর্তিকে যা বলছে, তা ছায়ামূর্তি বোধহয় ঠিকঠাক ধরতে পারছে না। এই ভাবনার মধ্যে সায়ন আবিষ্কার করল ছায়ামূর্তির নাম জানা হয় নি। নাম না জানলে কারও সঙ্গে ঠিক যেন যোগাযোগ স্থাপন করা যায় না, সে নাম ব্যাপারটা যতই আরোপিত হোক না কেন। সায়ন জিজ্ঞেস করেই ফেলে, “আপনার নাম কী?” “অনিমেষ”, ছায়ামূর্তি জানায়। তারপর প্রশ্ন করে, “আচ্ছা, দেশে কি সবাই তোমার মত বাড়িতে থাকে? দারিদ্র্য, অসাম্য এসব চলে গেছে?” সায়নের ভেতরের অপরাধবোধ ফিরে আসতে থাকে, “না। দারিদ্র্য যায় নি, অসাম্যও নয়। আমি আসলে মাটি থেকে অনেকটাই উঁচুতে থাকি। আক্ষরিক এবং আলংকারিক, দুটো অর্থেই। তবে দারিদ্র্য হয়ত আগের থেকে কমেছে কিছুটা, কিন্তু অসাম্য বেড়েছে।” সায়নের স্বর কিছুটা ম্লান হয়ে আসে। তারপর সে জানতে চায়, “আপনার মৃত্যুর আগের কথা কিছু কি মনে আছে? মানে মারা যাওয়ার আগে কী করতেন, কী ভাবতেন? আপনি কি সমাজ নিয়ে ভাবতেন খুব, যেমন আমি ভাবি?” অনিমেষ নামক ছায়ামূর্তি কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। “সমাজ, মানুষ আমাকে খুব ভাবাতো। আমি রাজনীতি করতে শুরু করি ছাত্র থাকতে থাকতেই। আমি কমুইনিস্ট পার্টি করতাম। তুমি কি নকশালবাড়ি আন্দোলন সম্পর্কে কিছু জানো? আমি নকশাল ছিলাম”। সায়ন শিহরিত হয়। সে নকশালবাড়ির প্রেতের সাথে কথা বলছে! নাকি এই পুরোটাই তার কল্পনা? কিন্তু পঞ্চাশ বছর আগে মানে ১৯৭৩। সায়নের চোখের সামনে সরোজ দত্তের নাম ভেসে ওঠে, তিমির, ময়দানে উত্তম কুমার...... সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, “আপনার মৃত্যু হয়েছিল কি করে?” “পুলিশ পিটিয়ে মেরেছিল”, অনিমেষের উত্তরের আপাত ভাবলেশহীনতা সায়নের বুকে ধাক্কা মারে। আবছা অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মুখে কোন আবেগ আসে কিনা বোঝার চেষ্টা করে সায়ন। কিন্তু ছায়ামূর্তির আদৌ কোন মুখ আছে কিনা অন্ধকারে বোঝা যায় না। “তুমি নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে জানো?” “জানি। সবাই জানে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পড়া ছাড়াও, আমি আপনাদের একজন সহযোদ্ধাকে চিনি -- নীতা সেন। উনিও পুলিশি অত্যাচারের ভিক্টিম। আপনি চেনেন?” “নাহ! কত ছেলেমেয়ে ছিল! আমি কজনকেই বা চিনতাম”। “আসলে আজকের সময়ে আপনার মত আদর্শবাদী লোকদেরই প্রয়োজন, যারা নিজের কেরিয়ার থেকে দেশের মানুষ নিয়ে বেশি ভাববে”। গ্যাজেট শোভিত, হাজার স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের দেওয়ালগুলো ব্যঙ্গের হাসি হেসে কথাগুলোর প্রতিধ্বনি সায়নকে ফিরিয়ে দিলে কথা কটা সায়নের নিজের কানেই খুব ক্লিশে হয়ে বাজলো। অন্ধকারে সায়নের মনে হল অনিমেষ একটু যেন বিরক্তি নিয়েই তার দিকে তাকালো। “আচ্ছা, তুমি কি ফিজিক্সের খবর রাখো?” সায়ন একটু অবাক হয়। তারপর মাথা নাড়ে, “না”। “আসলে খবরটা ঠিক ফিজিক্সের নয়, ফিজিসিস্টের। তুমি কি জানো, সুবিনয় বোস বলে কোনও বৈজ্ঞানিক ভাল কাজ করছে কিনা?” অনিমেষ বলে যান, যেন উনি সায়নের উত্তর শুনতেই পান নি। সায়ন একটু ভেবে বলে, “আমি জানি না। তবে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি”। “বেশ জানিও আমাকে। আমি পরে আবার আসব”। এই বলে কিছুটা আচমকাই ছায়ামূর্তি উধাও হয়ে যায়। সায়ন বোঝে পর্দার ওপারে আলো ফুটছে, ঘড়িতে সকাল চারটে।
    অফিস
    আগের দিনের রাতের অভিজ্ঞতা সায়নের চোখেমুখে একটা গভীর ছাপ ফেলেছিল, যা অনেকক্ষণের ধারাস্নান আর তিন চার কাপ কফিতে মোছা যায় নি। কাল রাতে যখন কথোপকথন চলছিল, তখন সেটা সত্যি বলে মনে হচ্ছিল। আজ, দিনের আলো ফোটার পরে, সেক্টর ফাইভের ঝলমলে কফিশপে বসে সবটাই স্বপ্ন হচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি স্বপ্ন দেখছিল সায়ন? কিন্তু এত বাস্তব স্বপ্ন সে কখনো দেখে নি – এতটাই বাস্তব যেন চোখ বন্ধ করলে ছোঁয়া যাবে।তাহলে কি সায়ন পাগল হয়ে যাচ্ছে? এই কফিশপে তাদের অফিসের অনেকেই আসে যেহেতু এটা অফিসের একদম পাশে। কিন্তু এই কথা কাকে বলা যায়? ভুল হাতে পড়লে এই কথা অফিস গসিপের বিষয় হয়ে উঠতে পারে, এমনকি বসের ক্যানে গেলে মানসিক অসুস্থতার অজুহাতে তার প্রোমোশন আটকে যেতে পারে।  অশোকদাকে বলা যেত, কিন্তু তিনিও হিমালয়ে বেড়াতে গেছেন, ফিরবেন দিন পনের পরে। হঠাৎ সায়ন দেখে কফিশপে  স্যাম ঢুকছে। স্যাম বাঙ্গালি মেয়ে, ভাল নাম সম্পূর্ণা। স্যামের সাথে সায়নের দু একবার শরীর দেওয়া নেওয়া হয়েছে, কিন্তু মনের ব্যাপারটা তারা ভাল বুঝতে পারে নি। তাই তাদের সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিক পথে এগোয় নি। স্যাম সায়ন কে দেখে আসে, “ হোয়াটস আপ ডুড? একি চেহারা করেছিস? কি হয়েছে?” সায়ন কফি হাতে দাঁড়িয়ে পড়ে। স্যামকেই বলবে, কিন্তু এখানে না। অফিসের একটা ছোট ছাদ আছে যেখানে লোকে বিকেলের দিকে সিগারেট খেতে যায়। জায়গাটা সকালের দিকে খালি থাকে। সেখানেই কথা বলা যায়। এখানে বড্ড বেশী অফিসের লোক, কেউ শুনে ফেলতে পারে। সায়ন বলে, “ছাদে চল, বলছি”। স্যাম ইয়ার্কি মেরে বলতে চায় কেন, প্রোপোস করবি নাকি? কিন্তু সায়নের মুখ চোখ দেখে বলে উঠতে পারে না। ফাঁকা ছাদে গিয়ে সায়ন সব বলে স্যামকে। স্যাম খানিকক্ষণ ভাবে, তারপর বলে, “এটা হ্যালুসিনেশন ছাড়া আর কিছু নয়। তুই নকশাল আন্দোলন নিয়ে ফিক্সেটেড। তার ওপর অফিসের স্ট্রেস। সব মিলিয়ে এসব উলটোপালটা স্বপ্ন দেখছিস। ছুটি নিয়ে কদিন ঘুরে আয় বরং”। “তুই ঠিক বুঝতে পারছিস না। স্বপ্ন এরকম হয় না।” ছাদের পাঁচিলে ভর দিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত কলকাতা দেখতে দেখতে সায়ন বলে। আকাশে দুটো চিল উড়ছে, কাক ডাকার একটা মৃদু ক্যাকোফনি বেজে যাচ্ছে আবহ সঙ্গীতের মত। স্যাম বুঝতে পারে সায়ন রেগে যাচ্ছে। সে নিশ্চিত যে সায়নের ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। কিন্তু সে যদি সায়নের বিশ্বাস অর্জন করতে না পারে তাহলে কখনওই সে সায়নকে ডাক্তার দেখানর জন্য রাজি করাতে পারবে না। স্যাম সায়নের কাছে এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখে। “আচ্ছা, কিছুক্ষণের জন্য ধরে নেওয়া যাক যে তুইই ঠিক। তোর ভুত বাবাজি, সরি, আই মীন, অনিমেষ, সেইড সামথিং অ্যাবাউট এ ফিজিসিস্ট, রাইট? লেটস গুগল হিম”। এই প্রস্তাব সায়নের মনে ধরে। মোবাইলে ঝুঁকে পড়ে দুজনে মিলে গুগলকে আদেশ করে সুবিনয় বোস নামে কোন পদার্থবিদের খবর আনতে। খবর আনতে বেশীক্ষণ সময়ও লাগে না। সুবিনয় বোস সত্যি একজন প্রথম সারির পদার্থবিদ, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির পিএইচডি। আমেরিকার বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সাথে পড়িয়েছেন। কিন্তু তিনি মারা গেছেন কিছুদিন আগে। তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্ররা তাঁর স্মৃতিতে একটা ওয়েবপেজ করেছে, সেখান থেকেই জানা গেল এসব কিছু। এই আবিষ্কারের পড়ে স্যাম আর সায়ন দুজনেই খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। নীরবতা ভাঙল স্যামই, “কিন্তু, সায়ন, তুই হয়ত এনার কথা অন্য কোন জায়গা থেকে জেনেছিলি, সেটাই তোর সাবকনসাশে…ইউ নো, হোয়াট আই মীন। তারপর ধর এই যে অনিমেষ নামটা। এটা তো কালবেলার চরিত্র আর সেই কারণে ইট বিকেম সিনোনিমাস উইথ টরচারড নকশাল ইয়ুথ”। সায়ন ওর দিকে একবার তাকায়। এসবই যুক্তির কথা, অকাট্য, জোরালো যুক্তি। দুদিন আগে হলে ও এভাবেই ভাবত। এমনকি সকাল থেকে এই যুক্তিগুলোকে এভাবেই মনের মধ্যে সাজিয়েছিল সায়ন। কিন্তু যত সময় গড়াচ্ছে, সায়ন বুঝতে পারছে যুক্তির প্রতি ওর বিশ্বাসের মাটি একটু একটু করে ঝরে যাচ্ছে। এই মাটি ঝরে যাওয়া হয়ত সংক্রামক। সায়নের সঙ্গে ছাদের আধ ঘণ্টায় স্যামও বুঝতে পারে একটু আগে যে জোরের সাথে সে ভাবছিল সে সায়নকে তার মত করে ভাবাতে পারবে, সেটা আর নেই। গতকাল অবধিও দুজনে একই যুক্তিবাদী বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে পেরেছে তাই কথা বলা সম্ভব ছিল। এখন হঠাৎ দুজনেরই বিশ্বাসের জমিতে ফাটল ধরে আলাদা হয়ে গেছে, যেমন ভূমিকম্পে হয়। ফাটলের দুপাশে অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত উপায় নেই। সায়ন আর স্যাম চুপ করে ছাদ থেকে  কলকাতা দেখতে থাকে।
    কথোপকথন ২
    সায়ন খেয়াল করে দেখেছে অনিমেষের আসার সময় রাত দুটো থেকে তিনটে। কিন্তু ঠিক কিভাবে অনিমেষ আসে সেটা সায়ন কোনদিন দেখতে পায় নি। ওই সময়টা সায়নের চোখে ঘুম লেগে যায়। আজো তার ব্যাতিক্রম হল না। সায়ন যখন চোখ তুলে তাকালো তখন অনিমেষ নামের ছায়ামূর্তি তার ঘরের চেয়ারে বসে আছে। কথা শুরু করে অনিমেষ, “ দেখেছিলে সুবিনয় কি করছে?” “দেখেছি। উনি মারা গেছেন কিছুদিন আগে। কিন্তু উনি খুব নামকরা পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন। বার্কলি থেকে পিএইচডি। তারপর আমেরিকার অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন, গবেষণা করেছেন”। “আচ্ছা, সুবিনয় কি নিয়ে গবেষণা করেছিল জানো?” সায়নের ফিজিক্সের জ্ঞান বেশিদূর নয়। সে মোবাইলে সুবিনয় বোসের মেমোরিয়াল সাইটটা খুলে কিছু পেপারের নাম পড়ে শোনায়, সুবিনয় বোসের অবদান নিয়ে তাঁর ছাত্রদের লেখা পড়ে শোনায়। অনিমেষ মন দিয়ে শোনেন তারপর মন্তব্য করেন, তার মানে আমরা যা ভাবছিলাম ও সেই পথে অনেকটা এগিয়েছিল”। “আপনারা যা ভেবেছিলেন? আপনি সুবিনয় বোসকে কিভাবে চিনতেন?” সায়ন গভীর ভাবে কৌতূহলী হয়। “সুবিনয় প্রেসিডেন্সীতে আমার সহপাঠী ছিল। আমরা সেই সময় স্বপ্ন দেখতাম ফিজিক্সে নতুন দিগন্ত খুলে দেব। সুবিনয় সেসব পথে অনেকটা এগিয়েছিল। আমি আর কি করলাম বল। ব্যর্থ জীবন একটা”। অনিমেষের গলায় গভীর বিষাদ, যা সায়নকেও আক্রান্ত করে এবং ভেঙ্গে দেয়।  অনিমেষ এর জীবন সায়নের না হতে পারা জীবন – এক মেধাবী ছাত্র যে কেরিয়ার ভুলে ঘর ছেড়েছিল সমাজের জন্য। সেই আইডলের বিষাদ সায়নকে তীব্র ভাবে আক্রমণ করে। “কি বলছেন অনিমেষদা!” সায়নের অগোচরেই ছায়ামূর্তি অনিমেষদা হয়ে ওঠে, “আপনার, মানে আপনার মত মানুষ এখনও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আরও, আরও অর্থহীন ভোগের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে এখনো যে ভেতরে কোথাও মানুষের দুঃখ ঘা দেয় তার কারণ তো আপনার মত মানুষেরা। আমি কিছুই পারিনি এই জীবনে শুধু কিছু টাকা রোজগার ছাড়া। খুব বেশী হলে কিছু শ্রমিক আন্দোলনে অর্থসাহায্য, ফেসবুকে দুচারটে শেয়ার, বন্ধুদের সাথে রাস্তার দু একটা বাচ্চাকে পড়ানো। কিন্তু তবু যে এখনো বেঁচে আছি সে তো শুধু আপনারা কখনো এই কলকাতা শাসন করতেন বলে”। অন্য কোন সময় হলে এই আবেগী মনোলগ সায়নের নিজের কানেই ক্লিশে শোনাত। কিন্তু এই মধ্যরাতে সবকিছুই পরাবাস্তব, সেখানে পুরনো ধারণাগুলো ভেঙ্গে যায়। অনিমেষ মনে হয় যেন একটা বড় শ্বাস নেয়, তারপর বলে “তুমি যা বলছ তা আসলে ফাঁপা রোমান্টিসিসম, সায়ন। তুমি যা করতে চেয়েছিলে তা করেছ, পেয়েছ। আমি ভেবেছিলাম ফিজিক্সে নতুন দিক খুলে দেব সুবিনয়ের সাথে। আমি যে খুব ভুল ছিলাম না সে তো সুবিনয়ের জীবন দেখেই বুঝতে পারছ। ও পেরেছিল সায়ন। আমি পারি নি। ভেবেছিলাম সমাজ পালটাবো। অসম্ভব যন্ত্রণা পেয়ে মরার আগে এটুকু সান্ত্বনা পেয়েছিলাম যে হয়ত আমার আর আমার মত অনেক মৃত্যুর বিনিময়ে দেশে গরিব লোক থাকবে না। কিন্তু কি হল বল? তার থেকে কি গবেষণা করাই উচিত ছিল না? মহাবিশ্বের রহস্য উদ্ঘাটনে আমারও কিছুটা অবদান থাকতো। আমরা হেরে গেছি সায়ন। হেরো লোকেদের নিয়ে রোমান্টিসাইজ কোর না”। “হারজিত খেলার নিয়মের ওপর নির্ভর করে অনিমেষদা। আপনি যাকে হার ভাবছেন তা আসলে হার নয়। আপনার ধারায় আন্দোলন এখনো সচল আছে, কিন্তু সেসব লড়াই আমাদের দৈনন্দিন থেকে অনেক দুরে, জঙ্গলে, শুখা জমিতে, চূড়ান্ত গরিবদের মধ্যে আছে। আমি তার কথাও বলছি না।আমি আমার কথা বলছি। আমার মাথা একটা যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে একপক্ষ ক্রমাগত বাড়ি কিনতে বলছে, গাড়ি, ফোনে কিনতে বলছে, কিছু না ভেবে শুধু রিচুয়াল এর মত আরও, আরও কিনে যেতে বলছে, বলছে এটাই তো মোক্ষ। আমি কিনি, কিন্তু কোথাও একটা অপরাধবোধ, একটা খচখচ থাকে, পুরনো কাটার মত। ওই কাঁটাটাই আপনাদের জিতে যাওয়া”। “এতগুলো মৃত্যু, এতগুলো জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রাপ্তি শুধু এটুকুই? আমি জানি না সায়ন। আমার মনে হয় আরেকটু বেঁচে থাকলে হয়ত সমাজের আরেকটু বেশী উপকার হত। অন্তত, আমি একটা স্বস্তি নিয়ে মরতে পারতাম যে যে কাজটা আমি ভালবেসেছিলাম সেটার জন্য কিছু করা হল না”। সায়ন কিছুতেই তার নায়কদের একজনের এই পরাজয়বোধ মেনে নিতে পারে না, “কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনি কি পেলেন সেটা দিয়ে কি আপনার কাজের যথার্থ বিচার হয়? ধরুন মৃত্যুর প্রায় চল্লিশ বছর পরে যদি ফিরে আসতেন জিওরদানো ব্রূনো, দাঁড়াতেন গ্যালিলিওর মৃত্যু শয্যার পাশে, উনি কি আপনার মতই নিজেকে ব্যর্থ ভাবতেন না? কিন্তু সেটাই কি শেষ কথা?” অনিমেষ চুপ করে যান। তারপর আস্তে আস্তে বলেন, “ বেঁচে থাকলে তোমার কথা শুনতে ভালই লাগত। নিজেকে মহান ভাবার তো একটা মোহ থাকেই। কিন্তু মৃত্যু মানুষকে মোহ থেকে মুক্তি দেয়। তোমার কথার একটা যুক্তি তোমার জীবন যাপনের দিক থেকে আছে। তুমি আমাদের জীবন কাহিনীতে আশ্রয় খুঁজছ। কিন্তু আমি তো ভূত, আমার তো অতীত ছাড়া আর কিছু নেই।   তোমার কথা শুনতে ভালো লাগলেও, আমার জীবন পঞ্চাশ বছর আগেই থেমে গেছে। যখন থেমেছে, তখন অন্য একটা স্বপ্ন ছিল। আজ সেই স্বপ্ন তৈরি হয়নি দেখে কষ্ট হচ্ছে। তুমি জন্মেছ একটা অন্য পৃথিবীতে, তাই তুমি স্বপ্নটাও তৈরি করেছো অন্য ভাবে। তোমার কষ্ট আছে আমি বুঝি, কিন্তু আমার মত আশাভঙ্গ নেই”। সায়ন চুপ করে থাকে। সব তর্কে শেষ কথা বলে দিতে ভালো লাগে না। খানিকক্ষণের নিস্তব্ধতার পরে সায়ন বোঝে ঘরে সে একাই আছে। অনিমেষ নেই। পর্দার বাইরে আরেকটা ভোর হচ্ছে।
    ডাক্তার
    ডক্টর সেন এর চেম্বার এ একটা অদ্ভুত সাদা আলো। অনেকদিন আগে সায়ন হলিউডের একটা সিনেমা দেখেছিল। সেখানে মৃত্যুর পরে একটা লোক (বা তার আত্মা) এরকম সাদা আলো দেওয়া একটা ঘরে আসে। সব কিছু মুছে নেওয়ার মত সাদা। সিনেমার সাইকিয়াট্রিস্টদের ঘর কিন্তু এরকম হয় না। সেখানে আলো আর কথার মধ্যে একটা মৃদু সন্মোহন থাকে, যা মানুষকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সায়ন ভাবছিল সাইকিয়াট্রিস্টরা একধরনের জাদুকর যারা কাউন্টার জাদু দেখায়। জাদু মানুষকে অবাস্তবে বিশ্বাস করায় আর মনোচিকিৎসকরা জাদু ভেঙ্গে মানুষকে বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। ডক্টর সেন নতুন কিছু বললেন না। সায়ন জানত দুটো সম্ভাবনা আছে – এক, সে সত্যি ভূত দেখছে আর দুই, সে নিজেকে দেখছে অনিমেষ নামে। সে এটাও জানত ডক্টর সেন দ্বিতীয় সম্ভাবনার পক্ষে মত দিয়ে কোন ওষুধ দেবেন যাতে নিজের সঙ্গে দেখা হওয়াটা বন্ধ হয়। সেটাও হল। শুধু ডক্টর সেন সংশয় প্রকাশ করলেন শুধু একটাই ব্যাপারে, “ দেখুন সায়নবাবু, ওষুধ আমি দিয়ে দিছি। আপনি ঠিক হয়ে যাবেন। কিন্তু কি থেকে ব্যাপারটা ট্রিগারড হল সেটা বোঝা যাচ্ছে না। একটা হতে পারে অফিসের স্ট্রেস, আরেকটা হতে পারে কোনও সম্পর্কের টানাপোড়েন। তবে ট্রিগার যাই হোক, আপনি অনিমেষ বলে যাকে দেখছেন সে আপনারই অন্য একটা দিক। তবে এই দুটো দিক নিয়ে চলা তো মুশকিল। তাই আমি ওষুধ দিচ্ছি, আপনার এই সব হ্যালুসিনেসন চলে যাবে”। সায়ন ডাক্তারবাবুকে যেটা বলতে পারে নি সেটা হল কি থেকে এই সমস্যাটা হঠাত এলো সেটা সে জেনে গেছে। সায়ন কিছুদিন আগে নীতাদির বাড়িতে গেছিল । নীতাদির বাড়িতে ছড়ানো ছিটানো বইপত্রের একটা অগোছালো ভাব আছে, যা পুরোটা ঠিক কেওস নয়। নীতাদি কিছুক্ষণের জন্য রান্নাঘরে গেছিলেন বীণা কে রান্না করার কথা বলার জন্য – বীণা, নীতাদির বাড়িতে রান্না করে। সায়ন সেদিন বসে পুরোনো বই উল্টেপাল্টে দেখছিল। ভেবেছিল নীতাদিকে বলবে অনিমেষের কথা। এভাবেই সায়নের হাতে আসে একটা পুরনো পত্রিকা। সেখানেই লেখা ছিল কলকাতার কয়েকটা বাড়ির কথা যেটা লালবাজার নকশাল আমলে ব্যবহার করতে ইন্টেরোগেশন তথা টর্চার সেল হিসেবে। সেই বাড়ির দু একটার নামও দেওয়া ছিল সেই লেখাটাতে – তারই একটা দ্য প্যারাডাইস। লেখাটা পড়ে গিয়ে সায়ন বোঝে এই প্যারাডাইস ভেঙ্গেই তার ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ হয় অনিমেষ মারা গিয়েছিল এই প্যারাডাইসে এবং তার ভুত আসছে সায়নের বাড়ি, অথবা এই লেখাটা আগেও কখনো পড়েছিল সায়ন নীতাদিরই বাড়িতে, আর প্যারাডাইসের ইতিহাস তার অবচেতনে গাঁথা হয়ে গেছিল। তারপর প্যারাডাইসের জায়গায় তৈরি ফ্ল্যাটে যাওয়া তার পুরনো স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। আজ ডক্টর সেন এর সাথে কথা বলতে বলতে সেটাই মনে পড়ছিল সায়নের। কিন্তু ডক্টর সেনকে কিছু বলেনি তার আবিষ্কার সম্পর্কে। কি লাভ? সে ততক্ষণে ঠিক করে ফেলেছে সে ওষুধেই বিশ্বাস করবে, মুছে দেবে অনিমেষকে তার জীবন থেকে। সেটা সবদিক থেকেই সুবিধেজনক। এখন অনেক কিছু বাকি এই জীবনে – অন্তত একবার ইউরোপ তো যেতেই হবে। অনিমেষকে মুছতে না পারলে সেসব কিছুই হবে না। এর কিছুক্ষণ বাদে সায়ন হাতে একটা প্রেসক্রিপশন নিয়ে বেড়িয়ে আসে।
    উপসংহার
    রাত প্রায় বারোটা। ডিনার হয়ে গেছে সায়নের। এবার ডক্টর সেনের দেওয়া ওষুধটা খেয়ে শুয়ে পড়তে হবে। তাহলেই নিশ্চিন্ত ঘুম, কাল নতুন সকাল। অনিমেষ চিরকালের জন্য মুছে যাবে জীবন থেকে। কিন্তু গত আধ ঘণ্টা ধরে ওষুধ আর জলের গ্লাস নিয়ে নাড়াচাড়া করছে সায়ন। নিয়ম আর যুক্তিসঙ্গত ভাবে যেটা করার, অর্থাৎ ওষুধ খাওয়া, সেটা করে উঠতে পারছে না। বারবার মনে হচ্ছে অনিমেষের সঙ্গে আরও কিছু কথা বাকি ছিল তার। কিছু প্রশ্ন যেগুলো জিজ্ঞেস করা একান্ত দরকার। অনিমেষ ভুত হলেও দরকার, তার সত্তারই আরেকটা অংশ হলেও দরকার। ওষুধটা খেয়ে নিলে সায়ন আরও জোরালো পায়ে তার জীবনের দিকে এগিয়ে যাবে যেখানে নতুন ফ্ল্যাট থাকবে, ইউরোপ ভ্রমণ থাকবে আবার শ্রমিক আন্দোলনে চাঁদা দেওয়াও থাকবে। না খেলে থাকবে কিছু উত্তর না থাকা প্রশ্ন আর চূড়ান্ত অস্থিরতা। এই নির্বাচনটা সহজ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সায়ন কিছুতেই ওষুধ খাওয়ার সহজ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। রাত একটা অবধি বসে থাকার পরে সায়ন ওষুধ আর জলের গ্লাস নামিয়ে রেখে, আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ওষুধ, সে কাল থেকে খাবে।

    …………………………………………………………..  ………………………………………………………………

    (প্রায় বছর আষ্টেক আগে এই গল্পটা লিখেছিলাম। ছোটবেলার পর সেই প্রথম।  প্রথমে পাঠিয়েছিলাম দেশ পত্রিকায়। তারা ছাপল না। তারপর ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম বলে একটি অনলাইন পত্রিকায়। তারাও বাতিল করল। শেষমেষ গল্পটা ছাপা হল চিন্তা পত্রিকায়। তবে সে পত্রিকার সম্পাদক আমার বন্ধু। নাহলে ছাপা হত কিনা কে জানে! তবে এটা আমি দেখেছি কোন এক কারণে সম্পাদক দেবতা আমার ওপর খুব একটা সুপ্রসন্ন নন। এখন একাডেমিক লেখালিখি যারা করেন তাঁরা জানবেন সম্পাদক ও রিভিউয়ারদের হাতে 'লাঞ্ছনা' আমাদের নিত্য সঙ্গী। কিন্তু বাংলা লেখা আমার প্রাণের আরামের জন্য। সেখানে এত চাপ আর নিতে পারি না। তাই গুরুচন্ডালির হরিদাস পাল বিভাগ পেয়ে বেজায় মজা হল আমার। তাই সম্পাদকরা আমন্ত্রণ না জানালে, বা সম্পাদকের ওপর আমার কিছুটা বিশ্বাস না থাকলে সম্পাদিত বিভাগে আমি আর লেখা দিই না। যা লেখার ব্লগে লিখি আর বই করে ছাপি নিজের টাকায়। সেই ভাবেই আমার একটি গল্পের বই হয়েছে। সেই বইয়ের সব লেখাই গুরুর হরিদাস পাল বিভাগে প্রকাশিত শুধু এই গল্পটি ছাড়া। তাই ভাবলাম এটাই বা বাকি থাকে কেন। তবে এর পরেও যদি আমার গল্পের বই "লকডাউন ও অন্যান্য গল্প" কিনতে চান, তাহলে বইমেলার প্রকৃতি ভালোপাহাড়ের স্টলে চলে যেতে পারেন কলকাতা বইমেলায়।)

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন