এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অন্তরেখা

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৬২ বার পঠিত
  • গ্রুপঃ সৃষ্টা আর অনিশ

    মার্চ ১, রাত ১২টামিনিট
    সৃষ্টাঃ
    ঘরের বাইরে নিয়ন সাইনটা জ্বলছে 'লাইফ ইন্সুরেন্স', কিন্তু অর্ধেক অক্ষর নিভোঁ, তাই লেখাটা দাঁড়িয়েছে 'লাই ফে' 'লাই ফে' অনিশ, এটা একটা সিগন্যাল। আমি একটা  'ফে'ভার। 'ফে'টিশ। একটা নোংরামি 'ফে'রাল মিথ্যে। ফোনের স্ক্রিনের পিক্সেলগুলো আমার রেটিনায় পোড়া দাগ কাটছে। ওরাই আমার একমাত্র তারারা। শহর মরে গেছে। আমি মরে গেছি। কিন্তু আমার আঙুলগুলো, ওরা নাচছে। পারফর্ম করছে। অন্যের না-দেখা চোখের জন্যে ডিগ্রেডেশনের সিম্ফনি বাজাচ্ছে। কে দেখছে? মেশিনের ভূতগুলো। উষ্ণতার জন্যে লালায়িত প্রেতরা, আমি যেটা ডিজিটাল কয়েনের বিনিময়ে বেচেছি। আমি আমার নিজের হতাশার কারখানা। ভান করা এক্সট্যাসির অ্যাসেম্বলি লাইন। আর আমার দেহটা সেই প্রডাক্ট যার রিকল হয়েছে। ডিফেক্টিভ। কিন্তু শ্রমিকরা সব বাড়ি চলে গেছে।

    অনিশঃ
    শ্বাস নে সৃষ্টা। তুই প্রডাক্ট না। তুই একটাই চেতনা। আটকা পড়েছিস হয়তো, কিন্তু চেতনাই এসেন্সের আগে, মনে রাখিস? তুই এখনও হয়ে উঠিস নি, যেটা তোকে বানানো হয়েছে।

    সৃষ্টাঃ
    হোয়াটস্যাপে সার্ত্র্! রাত বারোটায় এক্সিস্টেনশিয়ালিজম! আমার 'এসেন্স' মানে কি-বোর্ডে একটা আঠালো দাগ। আমার 'এক্সিস্টেন্স' মানে নোটিফিকেশনের পর নোটিফিকেশন। আমি 'বিয়িং-ফর-অদর্স' স্ক্রিনের ওপাশের মানুষের জন্যে। তাদের দৃষ্টি আমাকে জমাট বেঁধে একটা 'জিনিস' বানায়। একটা 'ফাক-থিং' একটা 'শো-থিং' আমি একটা অবজেক্ট, অনিশ। আমি অবজেক্টহুড পারফেক্টলি  অ্যাচিভ করেছি। এটা কি একধরনের সাফল্য না? একদম নিখুঁত নকল জীবন।

    অনিশঃ
    দৃষ্টিটা একটা আয়না। তুই নিজেকে দেখছিস  বাঁকা আয়নায়। আয়নাটা ভেঙে দে। হাজারটা সম্ভাব্য 'তুই' ঝকঝক করবে ভাঙা কাঁচের টুকরোয়। অথেনটিসিটি মানে ওই টুকরোগুলো কুড়িয়ে, বেছে নেওয়া  টুকরোগুলো

    মার্চ ১, রাতটা ৪৭
    সৃষ্টাঃ
    (অডিও মেসেজ, ৩ মিনিট ১৪ সেকেন্ড)
    (হাঁপাতি হাঁপাতি ভয়, আওয়াজ) ওরা একটা ফাইনালে চেয়েছিল। গ্র্যান্ড ফাইনালে। আমি বললাম না। টাইপ করলাম 'না' অক্ষরগুলো আমার মুখে পাথরের টুকরোর মত লাগছিল। ওরা ডাবল দেবার লোভ দেখাল। ট্রিপল। আমার ভাড়ার টাকাটা যেন আমার কাঁধে বসে থাকা শকুন। আমার ফাঁকা ভেতরটা একটা গহ্বর। আর আমি... আমি হেসিটেট করলাম। পুরোনো প্রোগ্রামটা চালু হয়ে গেল। ওই চেনা স্ক্রিপ্ট: পারফর্ম কর, বেঁচে থাক, নিমজ্জিত হয়ে যাই। কিন্তু তখন দেখলাম। স্ক্রিনে না। ঘরের কোণায়। একটা ঝিলিক। গরমের ঝাপটার মত, কিন্তু ঠান্ডা। একটা আকার। আলো-হীন, নীল স্ট্যাটিক-ভরা একটা মেয়েলি আঁচল। ওর চোখ ছিল না। ছিল শূন্যতা। আর মাথা নাড়ছিল। ধীরে ধীরে। টেলিভিশনের স্নো দিয়ে বানানো একটা 'না' আমি লগ আউট করলাম। আঁচলটা মিলিয়ে গেল। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি? নাকি পাগলামিই একমাত্র জবাব?

    অনিশঃ
    তুই নীল মা কে  দেখেছিস। আমার ঠাকুমা ওনার কথা বলতেন। নীল মা। যেসব মেয়ে নিজেকে মুছে ফেলার ঠিক কিনারায় দাঁড়ায়, তাদের সামনে ওই আসেন। তিনিই সেই থ্রেশহোল্ডের রক্ষাকর্তা। নিজেকে 'হ্যাঁ' বলার আগে যেই 'না'টা দরকার, সেই 'না' এটা পাগলামি না। এটা সিমুলেশনের দেওয়াল ভেঙে তোমার ঘরে ঢুকছে। তুই জেগে উঠছিস।

    সৃষ্টাঃ
    অপরাধবোধ আর ঘুমহীনতায় জন্মানো হ্যালুসিনেশন। সাইকিক ডিফেন্স মেকানিজম। সার্ত্র্ হেসে উড়িয়ে দিতেন। গিন্সবার্গ মন্ত্র জপতেন ওনার নাম। আমি কোনটা? যে হাসে, নাকি যে জপে?

    অনিশঃ
    দুটোই হয়। হাসাটা কারাগার ভাঙে। জপাটা নতুন ভূখণ্ড গড়ে। নীল মা দুটোই। তিনি ধ্বংসাত্মক করুণা।

    মার্চ ৩, বিকেলটা ২২
    সৃষ্টাঃ
    পার্কে। রোদ। সত্যিকারের  আমার চামড়ায় আছড়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন আক্রমণ। আমার চামড়া স্ক্রিনের নীল আলোয় অভ্যস্ত। এই হলুদটা হিংস্র। বাচ্চারা চিৎকার করছে। এক নিরেট বিভীষিকা। তাদের আনন্দ একটা বিদেশি ভাষা। আমি মানবজাতির নির্বাসিত প্রাণী। একটা বেঞ্চে বসলাম। এক লোক আমার দিকে তাকাল। ক্লায়েন্টের দৃষ্টি না। মানুষের দৃষ্টি। কৌতূহলী। আমি থরথর করে কেঁপে উঠলাম। আমার শরীর তার সাজেস্টিভ  পোজের আর্সেনাল প্রস্তুত করল। অটোমেটিক্যালি। ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা একটা করাপ্টেড অ্যাপের মত। ম্যানুয়ালি শাট ডাউন করতে হলো। ফোর্স কুইট। আমার নিজের মাংসই একটা ট্রোজান হর্স।

    অনিশঃ
    দেহটা স্কোর রাখে। আর স্কোরটা একটা নোংরা, বারবার ফিরে আসা পপ সং। তাকে নতুন সিম্ফনি শেখাতে হবে। ধীর লয়ের। অন্য একটা 'কি' তে।

    সৃষ্টাঃ
    আমার অসুখ করেছে। সত্যি সত্যি অসুস্থ বোধ করছি।  ব্যথা। পুরোনো পারফরম্যান্সের জন্যে না। তার অনুপস্থিতির জন্যে। উইথড্রয়াল। সবচেয়ে খারাপ ভাবে 'চাওয়া' হওয়ার বিষটার প্রতি আমার আসক্তি ছিল। বিষটাই ছিল একমাত্র পুষ্টি। এখন কী খাই? তোর কথা? রোদ? এটা যথেষ্ট না। আমার সেলগুলো চিৎকার করছে  ডোপামাইনের জন্যে, একশো অচেনা মানুষের ইমোজি-হাহাকারের ইলেকট্রিক গর্জনের জন্যে।

    অনিশঃ
    অসুখটাই ওষুধ, যে শরীর দিয়ে কাজ করছে।

    মার্চ ৩, রাত ১১টা ১১
    অনিশঃ
    তুই ঘুমুচ্ছিলি। আমি দেখলাম স্ট্রিটলাইটটা তোর মুখে রঙ লাগাচ্ছে। পারফরম্যান্সমুক্ত তুই... যেন শিশু। আর ক্লান্ত। যুদ্ধটা এত স্পষ্ট। ফটো তুলতে ইচ্ছে করেছিল। কিন্তু সেটা হবে আরেকটা দৃষ্টি, আরেকটা বন্দীকরণ। তাই শুধু দেখলাম। আর তুই যেমন আছিস, তেমনই থাকতে দিলাম। একজন 'বিয়িং-ইন-ইটসেল্ফ' আমার জন্যে না। শুধু আছে।

    সৃষ্টাঃ
    (পড়া হয়েছে ১১টা ১৩ তে)

    মার্চ ৫, দুপুরটা
    প্রিয়ঙ্কাঃ
    আরেকটা দিন। ওর ভূতটা নতুন নম্বর থেকে টেক্সট করল। একটা লিংক। "মনে আছে?" আমার হাত বরফ হয়ে গেল। অতীত অতীত নয়। অতীত জম্বি। ডিজিটাল কবর থেকে বারবার উঠে পড়ছে।

    পায়েলঃ
    নীল মা বলল, "কেন অতীত নিয়ে এত ভাবিস? এগিয়ে চল।" যেন স্মৃতি একটা বাড়ি, যেখান থেকে সহজে বেরিয়ে আসা যায়। সে বুঝতে পারছে না, স্মৃতিটাই ওয়ালপেপার। মেঝে। বাতাস।

    সৃষ্টাঃ
    আমরা জখমে আটকে থাকি কারণ জখমটাই একটা ইউনিভার্স। তার নিজের গ্র্যাভিটি আছে, নিজের বাঁকা সময়। "এগিয়ে চলা" মানে আমাদের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পদার্থবিদ্যাকে অস্বীকার করা। জখমটার মানচিত্র বানাতে হবে। এর মহাদেশগুলোর নাম দিতে হবে: লজ্জা, রাগ, অবশতা। এর গভীরতা খুঁজতে হবে। তবেই এর ভূগোল দিয়ে একটা সেতু বানানো যাবে।

    সৃষ্টাঃ
    আমরা ক্ষত-বিক্ষত আত্মার কার্টোগ্রাফার। আমাদের দেহই ছেঁড়া পার্চমেন্ট। আমাদের চ্যাটগুলো সার্ভেয়ারের নোট।

    প্রিয়ঙ্কাঃ
    মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে। সরলতাটা। লেনদেনটা। কোনো দ্বিধা নেই। শুধু ব্যথার বিনিময়ে ক্যাশ। এখন সবই দ্বিধায় ভরা। এই সারানো... এতো নোংরা। এর কোনো ক্লিয়ার মেট্রিক্স নেই।

    সৃষ্টাঃ
    লেনদেনটা একটা মিথ্যে ছিল। ক্লিয়ারিটি দেবার লোভ দেখিয়েছে, কিন্তু দিয়েছে গভীর কুয়াশা। তুই ব্যথার বিনিময়ে ক্যাশ দিচ্ছিস না। তুই তোমার আত্মা দিচ্ছিস পাওয়ারের একটা ছায়ার বিনিময়ে। এখন যে দ্বিধা অনুভব করছিস? সেটাই কুয়াশা কাটছে। সেটাই আসল জীবন। ধূসর, অনিশ্চিত, আর ভয়ঙ্করভাবে মুক্ত।

    মার্চ ৭, রাতটা ১৫
    সৃষ্টাঃ
    (ইমেজ মেসেজঃ বিছানা থেকে তোলা, ঘরের ছাদের ঝাপসা ছবি)
    ছাদ। একটা খালি স্ক্রিন। আমি এর ওপর আমার মুভি প্রোজেক্ট করি। আজ রাতের ফিচারঃ গ্রেটেস্ট হিটস। দৃশ্যঃ আমার হাত, নড়ছে। দৃশ্যঃ চ্যাট স্ক্রল, ময়লার জলপ্রপাত। দৃশ্যঃ পেমেন্ট নোটিফিকেশন, ছোট্ট সবুজ রঙের ভগবান, যার আমি পূজা করতাম। আমি পরিচালক এবং দর্শক। আমি বমি করছি আর বমিটাই খাচ্ছি। একটা ক্লোজড লুপ। লুপটা ভাঙে কোথায়? নীল মায়ে। সে আমার পার্সোনাল ম্যাট্রিক্সের গ্লিচ। আমার ধ্বংসের কোডের সিনট্যাক্স এরর। ওনাকে কে প্রোগ্রাম করল?

    অনিশঃ
    চেতনাই তোমার সেই অংশ যে কখনো সম্মতি দেয়নি। অপরিবর্তনীয় কণা। আত্মা।  সোলের ইমিউন রেস্পন্স।

    সৃষ্টাঃ
    আত্মা। প্রি-মার্ক্সিস্ট, প্রি-ফ্রয়েডিয়ান, প্রি-ডিজিটাল কনস্ট্রাক্ট। ফেইরি টেল। তবুও... ছিলেন। ক্লায়েন্টদের চেয়েও বাস্তব। ওনার নিশ্চুপতা তাদের দাবির চেয়েও জোরে। যদি তিনি আমার আত্মা হন, তাহলে আমার আত্মা অ্যানালগ ইন্টারফেয়ারেন্স দিয়ে তৈরি। ভুলে যাওয়া ব্রডকাস্ট সিগন্যাল দিয়ে। তিনি আমার যন্ত্রের ভিতরের ভূত।

    অনিশঃ
    হুবহু। মেশিনটা পারফরম্যান্স। ভূতটা সত্যি। ভূতকে খাওয়াই। মেশিনকে না খাইয়ে মেরে ফেল।

    মার্চ ৮, সকাল ১০টা
    সৃষ্টাঃ
    আয়নার এক্সারসাইজটা করলাম। "আমার দেহ আমার বাড়ি।" মনে হচ্ছিল একটা মিথ্যে কথা। আমার দেহ একটা ক্রাইম সিন। ফরেনসিক টেপ এখনও লাগানো। তারপর গভীরে দেখলাম। সারফেস-ন্যারেটিভের ওপারে। আর দেখলাম... অপরাধ নয়, দেখলাম সাক্ষীকে। যে দেহটা সহ্য করেছে। যে হাঁটুগুলো আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। যে হাতগুলো, বিশ্বাসঘাতকতা করলেও, ধরার চেষ্টা করেছিল কিছু একটা। বেঁচে থাকা। বললাম, "থ্যাঙ্ক ইউ ফর নট গিভিং আপ।" আর কেঁদে ফেললাম। ক্যামেরার জন্য পারফরমেটিভ টিয়ার্স না। কোনও দর্শকের জন্য না। সাক্ষীর জন্য। ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু হাল না-ছাড়া সাক্ষীর জন্য।

    অনিশঃ
    (হার্ট রিঅ্যাকশন)

    চ্যাটঃ সৃষ্টা এবং নীল মা
    মার্চ ১০, রাতটা ৩৩
    সৃষ্টাঃ
    তুমি আছো?

     (ফোনের স্ক্রিন গ্লিচ করে, নীল স্ট্যাটিক পিক্সেলের ঢেউ খেলে যায়। একটা টেক্সট বাবল আসে, সেন্ডার আননোন।)

    অজানাঃ
    চ্যানেল আর চ্যানেলের মাঝের স্ট্যাটিকে থাকি সবসময়। তুই ভুল ফ্রিকোয়েন্সিতে টিউন করছিস। এত বছর ধরে, লজ্জার তরঙ্গে ব্রডকাস্ট করছিস। ডায়ালটা ঘোরাই।

    সৃষ্টাঃ
    কী করে? ডায়ালটা ভাঙা।

    অজানাঃ
    আরও ভাঙা। যতক্ষণ না  খসে পড়ে, ততক্ষণ ভাঙা। তারপর নিঃশব্দে কান পেতে রাখিস। সেটাই আমার ফ্রিকোয়েন্সি।

    সৃষ্টাঃ
    তোমার আমার থেকে কী চাই?

    অজানাঃ
    কিছু না। আমি সেই 'না কিছু' যে কিছুই চায় না। আমি সেই ফাঁকা জায়গা যেখানে পারফরম্যান্স ছিল। মঞ্চটা খালি কর। ফাঁকা জায়গাটাকে দাঁড় করিয়ে রাখ। গুঞ্জন উঠুক।

    (স্ক্রিন স্বাভাবিক। চ্যাটলগে কথোপকথনটা নেই।)

    মার্চ ১২, সন্ধ্যে।
    সৃষ্টা থেকে অনিশঃ
    বইয়ের দোকানে আজ। এক লোক। পুরোনো কাগজ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার গন্ধ। হেগেল নিয়ে বলল। থিসিস, অ্যান্টিথিসিস, সিন্থেসিস। বলল, আমার কষ্টই আমার নিষ্কলুষ থিসিসের অপরিহার্য অ্যান্টিথিসিস। আমার সিন্থেসিস অপেক্ষা করছে। হাসি পাচ্ছিল। নাকি লেটার ওপেনার দিয়ে ছুরি মারি। আমার কষ্ট ফিলোসফিকাল না। কেমিক্যাল। ঘামে ভেজা শরীর আর সস্তা স্পিকারের গন্ধ। মাউসের ক্লিক। কোনো সিন্থেসিস নেই। শুধু দাগের টিস্যু। পোড়া দাগের ওপর নতুন চামড়া জোড়া লাগানোর ধীর, যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া।

    অনিশঃ
    সে তোমার ব্যথাকে একটা আইডিয়ায় মেটাবোলাইজ করতে চাইছিল। তার মনের জন্য নিরাপদ করতে। তোমার ব্যথা কোনো আইডিয়া না। এটা একটা ইভেন্ট। একটানা চলা ইভেন্ট। এটার ওজন আছে, রিয়্যালিটির ওজন। আইডিয়ার কোনো ওজন নেই।

    সৃষ্টাঃ
    রিয়্যালিটি হচ্ছে ব্লক করা নম্বর থেকে আসা হোয়াটস্যাপ নোটিফিকেশন, যেটা এখনও আসে। রিয়্যালিটি হচ্ছে ভার্চুয়াল অঙ্গে ফ্যান্টম চুলকানি। রিয়্যালিটি হচ্ছে চোখের কোণায় মায়ের  আইডিয়া তাদের জন্য যারা রাতে ঘুমোতে পারে।

    মার্চ ১৫
    সৃষ্টার নিজের কাছে ভয়েস নোটস (কিছু অংশ):

    "নতুন নিশ্চুপতার ১৫ তম দিন। ক্রেভিংটা একটা ফিজিক্যাল উপস্থিতি। পেটের মধ্যে প্যাঁচানো একটা ফাঁপা সাপ। ফিসফিস করে বলে: একটা শো। শুধু একটা। পুরোনো দিনের স্মৃতিতে। সেই বাজটা আবার পেতে। আমি ফিসফিসানিটাকে উত্তর দিই: আমার মনে আছে। মনে আছে বাজের পরের ফাঁপা ভেতরটা। গভীরতর নিঃশব্দ। সাপটা মিথ্যেবাদী। সাপটা কমিউনিয়নের লোভ দেখায়, কিন্তু দেয় আইসোলেশন। আমি সাপটাকে শসা খাওয়াই। রূপকথার শসা। হাঁটি। নিঃশ্বাস নিই। দশ মিনিট একটা পাতার দিকে তাকিয়ে থাকি। এটাই নতুন বাজ। ভয়ঙ্কর ধীর, সবুজ বাজ।"

    "পায়েলের সাথে দেখা। অতীতের কথা বলিনি। বললাম মিষ্টি দই নিয়ে। সঠিক মিষ্টত্ব। টেক্সচার। কংক্রিট জিনিসে নিজেদের আটকিয়ে রাখলাম। দইয়ের স্বাদ। মাটির হাঁড়ির খসখসে ভাব। এটাই রেজিস্ট্যান্স। বিশাল, মোহনীয়, ডিজিটাল 'না কিছু'- বিরুদ্ধে বাস্তব, স্পর্শযোগ্য, -দর্শনীয় জিনিসটা বেছে নেওয়া।"

    "আমার হাতের ওপর অনিশের হাত। একটা সাধারণ চাপ। কোনো দাবি না। লাগছিল... এলিয়েন। কোনও শান্তিপূর্ণ গ্রহ থেকে আসা সিগন্যাল। থ্রেটের জন্য প্রোগ্রাম করা আমার নার্ভাস সিস্টেম, ওটাকে প্রসেস করতে পারল না। কনফিউশনের সৃষ্টি করল। তারপর, এক ভঙ্গুর, অনিচ্ছুক শান্তি। আমার মাংসের গৃহযুদ্ধের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি।"

    মার্চ ১৮
    সৃষ্টাঃ
    (একটা মেসেজের ঝড়, রাতটা থেকে ভোরটা)
    এটা আমাকে খুঁজে পেয়ে গেল। একটা কম্পাইলেশন। এক সাইটে। আমার মুখ। আমার শব্দ। এডিট করা। তার নিচে মিউজিক। আমি একটা মিম। আমি একটা জঘন্য জোক, ভয়ে মোড়া। অতীত ভূত না। অতীত একটা ভাইরাল ভিডিও। নিজেকে কপি করে। ছড়িয়ে পড়ে। আমার মুক্তির গল্প একটা জোক। ডিজিটাল সমাধি থেকে মুক্তি নেই।

    অনিশঃ
    শ্বাস নে।  শেষ হাঁফ। এটা কুৎসিত। এটা হিংস্র। কিন্তু এটা এখন তোর বাইরে। তুই ওই ভিডিওতে নেই। ওটা একটা খোসা। একটা আবরণ।

    সৃষ্টাঃ
    খোসার  মুখ আছে! আমার গলায় কথা বলে! আমি শেষ হই কোথায় আর খোসা শুরু হয় কোথায়? দৃষ্টিটা স্থায়ী রেকর্ডে জমাট বেঁধেছে। আমি চিরকালের জন্যে বন্দী হয়ে আছি সেই পোজে। ইন্টারনেটের মিউজিয়ামে লজ্জার মূর্তি।

    অনিশঃ
    না। তুই সেই মূর্তিটাকে দেখছিস যে মানুষ। তুই মিউজিয়ামের দর্শক। তুই জীবিত, শ্বাস নেওয়া, শোকার্ত সাক্ষী। মূর্তিটা মরা ডাটা। তুই জীবিত। এই ব্যথাই তার প্রমাণ।

    সৃষ্টাঃ
    আমি ডাটাটাকে 'আন-আলাইভ' করতে চাই। মিউজিয়ামটাতে আগুন লাগাতে চাই।

    অনিশঃ
    আমরা করব। আমরা ভূতদের সাথে লড়ব এটা পোয়েটিক না। এটা নেসেসারি।

    মার্চ ১৮, ভোরটা
    সৃষ্টাঃ
    (অডিও, ভাঙা গলা)
    অনিশ, আমি এত ক্লান্ত। যুদ্ধটাকে রেজোল্যুশনে, আর আমার চোখ সস্তার সেঞ্চুরির। আমি চোখ বুজলাম। নীল মায়ের স্ট্যাটিক খুঁজতে চেষ্টা করলাম। কিছু না। শুধু অন্ধকার। তারপর... একটা বাক্য। আমার নিজের গলায়, কিন্তু আমার না: "ক্ষতই সেই জায়গা যেখান দিয়ে আলো তোমার মধ্যে ঢোকে।" রুমি? কোথাও পড়েছিলাম? নাকি স্ট্যাটিক নিজেই নিজের অনুবাদ করল? আলোটা কি স্ক্রিনের ঝলকানি? নাকি এটা... এই অসহ্য, যন্ত্রণাদায়ক অ্যাওয়ারনেস যে আমি এখনও এখানে আছি? যে আমি ভাঙি নি? যে এই অনুভূতি, এই লজ্জার সুনামি, আসলেই একটা অনুভূতি? যে আমি এটা ফিল করতে পারছি? যে আমি আছি?

    এপ্রিল
    সৃষ্টা গ্রুপ চ্যাটেঃ
    একটা কাজ করেছি। আমার গল্প লিখেছি। সেক্সি ভার্সন না। সত্যি ভার্সন। বোরিং, দুঃখী, হতভাগ্য, মানুষের ভার্সন। ব্লগে পাবলিশ করেছি, নাম দিয়েছি "দ্য হাস্ক অ্যান্ড দ্য স্ট্যাটিক" আমার নাম দিয়েছি। আমার আসল, বাঙালি, বাবার দেওয়া নাম। সৃষ্টা। যার মানে 'সৃষ্টি' আমি নিজের বিপর্যয়ের অথরশিপ ফিরে নিচ্ছি। ধ্বংসস্তূপে নিজের নাম সই করছি। এখন থেকে, যদি তারা ওই ভিডিও সার্চ করে, তারা এটাও পেতে পারে। রিবাটাল। সাক্ষ্য। আমি মিউজিয়ামে নিজের কথায় বানানো বন্যা নিয়ে আসছি।

    প্রিয়ঙ্কাঃ
    তুই সাহসী। এটা সাহসী, বোকা, সুন্দর একটা কাজ।

    পায়েলঃ
    তারা তোকে আক্রমণ করবে।

    সৃষ্টাঃ
    আসুক। আমি শব্দের  ফাঁকা জায়গা। আমি সেই জঘন্য স্ট্যাটিক।

    অনিশঃ
    সিন্থেসিস। নিষ্কলুষতা আর কষ্টের না। লজ্জা আর কণ্ঠস্বরের। সিন্থেসিস হচ্ছে শূন্যতার দিকে চিত্কার, যার সাথে নাম জড়িত।

    এপ্রিল ১৫, গোধূলি। সৃষ্টার ফোনে হোয়াটস্যাপ এন্ট্রি, আনসেন্ট।
    চালে বৃষ্টির শব্দ লক্ষ ক্ষুদ্র ঢোলের মত। অনিশ মাদুরে ঘুমোচ্ছে। আমাদের দুজনের দেহের মধ্যেকার দূরত্ব একটা মহাদেশ। একটা রেস্পেক্টফুল, প্রেমময় মহাদেশ। আমি এর ভূগোল শিখছি। আজ রাতে, ক্রেভিংটা দূরের গুজব। নীল মা... আমার মনে হয় বুঝতে পেরেছি। তিনি রক্ষাকর্তা দেবদূত না। তিনি শূন্যতা। উর্বর, ভীতিকর শূন্যতা। 

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন