এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • প্রযুক্তি, সমাজমাধ্যম এবং  সংস্কৃতির গণতন্ত্রীকরণ 

    Anirban M লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৪ বার পঠিত
  • ভালো সংস্কৃতি, খারাপ সংস্কৃতি
    আমরা যখন ছোট তখনও পৃথিবীটা বেশ কিছুটা সাদা-কালো ছিল। অর্থাৎ, কিছু জিনিস ছিল ভালো, আর কিছু মন্দ। ভালো মন্দের মাঝখানের যে ধূসর অঞ্চল, তা তখনও আমাদের মনে প্রশ্নের ঝড় তোলে নি। আমরা জানতাম ভালো সংস্কৃতি মানে সন্ধেবেলা গান কিংবা আবৃত্তির চর্চা, পাড়ার ক্লাবে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা, পাড়ার ছেলেদের (কখনো কখনো মেয়েদেরও নাটক) আর পাড়ার লোকেদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যাকে কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমরা ফাংশন বলতাম (ইংরিজি ফাংশন শব্দটার সঙ্গে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। তাও কেন বাঙালিরা কেন ফাংশন শব্দটা ব্যবহার করত জানি না।) সেগুলি ভালো সংস্কৃতির লক্ষণ। আমাদের ছোটবেলায় সবাই যে খুব রবীন্দ্র-নজরুল অনুরাগী ছিলেন তা বলতে পারি না, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও এই ভালো সংস্কৃতির চর্চায় সবাই হাত লাগাতো। এই রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতি (যাকে ব্যঙ্গ করে অনেকে রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল বা রসুন সংস্কৃতি বলেও ডাকেন) ছিল মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি আর সংস্কৃতির শ্রেণী বিভাগের বিচারেও এই সংস্কৃতির স্থান ছিল মাঝামাঝি। ওপরে ছিল শাশ্ত্রীয় সঙ্গীত যা সাধারণের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে আর নিচে ছিল ফিল্মি গানের মেঠো জলসা। আমি যখন বড় হচ্ছি তখন বাংলা গানের বড় তারকারা খোলা জায়গায় অনুষ্ঠান করেন না। তাঁদের দেখা পাওয়া যেতে পারে রবীন্দ্রসদন কিংবা নেতাজী ইন্ডোরের মঞ্চে। একই কথা খাটে বলিউডের বড় শিল্পীদের সম্পর্কে। পাড়ার মেঠো জলসা তখন অধিকার করে রেখেছেন বিভিন্ন মানের কন্ঠী শিল্পীরা – লতা, আশা, কিশোর, রফির গলায় গান গেয়ে যাঁরা বাজার মাতাচ্ছেন। এক কথায়, সংস্কৃতির এই শ্রেণী বিভাজন যেন ছিল একটি  পিরামিডের মত। যে সংস্কৃতির স্থান যত উপরে, তার সমঝদার তত কম। এখানে খুব উল্লেখযোগ্য একটা ব্যাপার হল যিনি সংস্কৃতি সিঁড়ির নিচের ধাপে আছেন , তাঁরাও কিন্তু উচ্চতর ধাপের উচ্চতাকে মান্যতা দিতেন। অর্থাৎ, আমার মত যে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বোঝে না, সেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে সংস্কৃতি পিরামিডের উচ্চতম স্থান দিতে দ্বিধা করে না। একে বলা যায় সাংস্কৃতিক কাঠামোর হেজেমনি। এই পিরামিড মডেল কিন্তু খুব অভিনব কিছু নয়! সংস্কৃতিতে মাস এবং ক্লাসের এই বিভাজন প্রায় সব দেশ-কালে প্রচলিত ছিল বহুকাল ধরে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি এসে এই চিরাচরিত কাঠামোটাকেই দিয়েছে ভেঙ্গে। প্রযুক্তি কিভাবে সংস্কৃতির নির্মাণ করেছে, অর্থনীতির দৃষ্টিতে তা নিয়ে আলোচনাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
    দিনশেষে সবই কন্টেন্ট
    আমার এক বন্ধু সিনেমা পরিচালক। তার ছেলে কলেজ যাওয়া শুরু করেছে, তার উৎসাহ আছে চলচ্চিত্র নির্মাণেও। কিন্তু আমার বন্ধু বলছিল তার ছেলের প্রজন্ম সিনেমা, গান, ভ্লগ এইভাবে আলাদা আলাদা করে বোঝে না। তাদের চোখে সবই কন্টেন্ট (কন্টেন্টের বাংলা বিষয়বস্তু। কিন্তু বিষয়বস্তু বললে সঠিক ভাবে মূল ধারণাটিকে ধরা যাবে না বলে, ইংরিজি শব্দটিই রাখলাম) --
    সিনেমা হয়ত দীর্ঘ কন্টেন্ট, ভ্লগ অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি কন্টেন্ট। আমার বন্ধু কথাটা বলেছিল কিছুটা আপশোষের ঝোঁকে, কারণ তার ছেলের চোখে সিনেমা মাধ্যমের আলাদা কোন কৌলীন্য নেই। কন্টেন্টের সেই অর্থে ভাল মন্দ বলে কিছু নেই, যা ভাইরাল তাই ভালো। হয়ত সেই ভালো তাৎক্ষণিক, কিন্তু চিরায়ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আজকের সময় সম্ভবত ভাবিত নয় আর। কন্টেন্ট আসে সমুদ্রের ঢেউ-এর মত, কোনটা বড় আবার কোনটা ছোট, কিন্তু কোনটাই দীর্ঘস্থায়ী নয় আর। একটু ভেবে দেখলে মনে হতে পারে যে এই প্রবণতা তো নতুন কিছু নয়। সস্তার সংস্কৃতি তো বরাবরই আম জনতার দরবারে বেশি জনপ্রিয় – স্বপন সাহা, অঞ্জন চৌধুরির জনপ্রিয়তা কবেই বা সত্যজিৎ বা ঋত্বিক পেয়েছেন! এই কথাটা ভুল নয়, কিন্তু নতুন সময়ে জনপ্রিয়তার মডেলে একটা মূলগত পরিবর্তন এসেছে। আগের পিরামিড মডেলে, যারা চটুল সংস্কৃতি উপভোগ করতেন, তাঁরাও উচ্চমানের শিল্পকে মান্যতা দিতেন -- লোকে বুঝুক বা না বুঝুক, তাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক, রবীন্দ্রনাথ বা সত্যজিৎ-এর সৃষ্টিকে সমাজ একটা উচ্চ আসন দিত। অর্থাৎ, উচ্চ শ্রেণীর শিল্পের একটা হেজেমনি ছিল সমাজে। নতুন সমাজে সেটা ভেঙ্গে গেছে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় একটু পরে আসছি।
    খাওয়া-না খাওয়ার খেলা
    “পাবলিক কী খাবে” সেই ভেবে তৈরি হয় মসালা ফিল্ম, এরকম আমরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু পাবলিক কী খায়? যাঁরা মসালা ফিল্ম বানান তাঁরা একটা গোদা ফর্মুলা অনুসরণ করেন। বোম্বাইয়ের বোম্বেটেতে ফেলুদা এই ফর্মূলার একটা মানচিত্র দিয়েছিল লালমোহনবাবুকে, “-স্মাগলিং চাই- সোনা হিরে গাঁজা চরস, যা হোক; পাঁচটি গানের সিচুয়েশন চাই, তা মধ্যে একটি ভক্তিমূলক হলে ভাল; দুটি নাচ চাই; খান দু-তিন পশ্চাদ্ধাবন দৃশ্য বা চেজ-সিকুয়েন্স চাই-তাতে অন্তত একটি দামি মোটরগাড়ি পাহাড়ের গা গড়িয়ে ফেলতে পারলে ভাল হয়; অগ্নিকান্ডের দৃশ্য চাই; নায়কের গার্লফ্রেন্ড হিসেবে নায়িকা এবং ভিলেনের গার্লফ্রেন্ড হিসেবে ভ্যাম্প বা খলনায়িকা চাই; নায়কের ফ্ল্যাশব্যাক চাই; কমিক রিলিফ চাই; গপ্প যাতে ঝুলে না পড়ে, তার জন্য দ্রুত ঘটনা পরিবর্তন বা দৃশ্যপট পরিবর্তন চাই; বার কয়েক পাহাড়ে বা সমুদ্রের ধারে গপ্পকে নিয়ে ফেলতে পারলে ভাল, কারণ এক নাগাড়ে স্টুডিওর বদ্ধ পরিবেশে শুটিং চিত্রতারকাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর”। ফেলুদার মুখ দিয়ে সত্যজিৎ যা বলিয়েছেন নি;সন্দেহে হিন্দি মসালা ছবি নিয়ে তাঁরই ধারণার প্রতিফলন এবং এই বিবরণ মোটের ওপর বেশ যথাযথ, এমনকি এখনকার মসালা ছবি ধরলেও। কিন্তু গণ বিনোদন তো আর শুধু ফিল্মে আটকে নেই আর! যাত্রা, থিয়েটারের পাশাপাশি যাবতীয় রিলস, ভ্লগ, সমাজমাধ্যমের পোস্ট সবই এখন গণ-মনোরঞ্জনের মাধ্যম অর্থাৎ কন্টেন্ট অর্থাৎ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দী! এখানে এসে আলোচনার পরিধিও তাই অনেকটা বেড়ে গেল। গণ-মনোরঞ্জনকারী মসালা ছবির ব্যাকরণ আমরা খানিকটা বুঝি। কিন্তু সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয় হয় কোন ধরণের ভিডিও? এই প্রশ্নের উত্তর বোঝার জন্য বেশকিছু খুব জনপ্রিয় বাংলা ইউটিউব চ্যানেলে ঢুঁ মারলাম। জনপ্রিয় মানে যাদের গ্রাহক সংখ্যা ১০ লাখের আশেপাশে। বাংলা জনপ্রিয় চ্যানেলের মধ্যে বেড়ানোর চ্যানেল অন্যতম। তাদের কারো কারো গ্রাহক ১০ লাখের কাছাকাছি। বেড়ানোর প্রতি বাঙ্গালির আগ্রহের ব্যাপারটা তাও বোঝা যায়। কিন্তু জনপ্রিয়তার বিচারে অনেক এগিয়ে আছে যে চ্যানেলগুলি তারা হয় তাদের প্রতিদিনের রান্নাবান্না, বাজারহাট এবং জীবন যাপনের ভিডিও দেখায় অথবা ছোট, ছোট স্কিট (skit শব্দের সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ আমার অজানা। হয়ত কৌতুক নকশা শব্দটি কাছাকাছি যায়) করে দু’জন বা তিনজন কুশীলব নিয়ে। । খারাপ অভিনয়, স্থূল হাস্যরস এবং কিছু চেনা গালাগাল সম্বলিত এই স্কিটগুলিকে কোন ভাবেই খুব একটা উচ্চ রুচির বলা যায় না। আবার সেগুলি যে খুব একটা অশ্লীল, তাও নয়। বলা যায়, পাড়ার মোড়ে, ক্লাবের আড্ডায় লোকে যে ধরণের কথা বলা কওয়া করে স্কিট গুলি সেই ধরণের। অর্থাৎ, এক কথায়, বিপুল জনপ্রিয় এই সব চ্যানেলের কন্টেন্ট সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ যাপনের একটা খন্ডচিত্র দেখায়। চ্যানেল্ গুলির ফলোয়ার, সাবস্ক্রাইবার এর সংখ্যা দেখে বোঝা যায় কন্টেন্ট হিসেবে এই সাধারণত্বের চাহিদা অসাধারণ! এই ধরণের বিষয়বস্তু যে “পাবলিক খাবে” এ কথা সম্ভবত খুব সাম্প্রতিক কালের আগে ভাবেননি কেউই। 
    কিন্তু কেন এই পরিবর্তন? মানুষের ভাবনা চিন্তা পালটে গেল এই শতাব্দীতে এসে? নাকি মানুষ একই রকম আর পরিবর্তনটা অন্য কোথাও এসেছে? আমার বিশ্বাস, পরের সম্ভাবনাই সত্যি; মানুষের চাহিদার খুব কিছু পরিবর্তন হয় নি, কিন্তু নতুন প্রযুক্তি এসে পালটে দিয়েছে সংস্কৃতি উৎপাদনের ব্যয়।
    সংস্কৃতির অর্থনীতি
    অন্য যে কোন জিনিষের মত সংস্কৃতি উৎপাদনও হয় অর্থনীতির নিয়ম মেনে। সেই উৎপাদনের ব্যয় থাকে আবার তার বিক্রি থেকে আয়ও হয়। যেকোন উৎপাদনের একটা স্থির ব্যয় থাকে যেটা মূলত উৎপাদন শুরু করার ব্যয়। যেমন ধরুন, কারখানা স্থাপনের ব্যয়। এই ব্যয় যত বেশি হবে তত খুব বড় ব্যবসায়ী ছাড়া কেউ সেই ব্যবসায়ে ঢুকতে পারবে না। অন্যদিকে উৎপাদনের যে দৈনন্দিন ব্যয় তা যে যত উৎপাদন করবে তার ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণ স্বরূপ রেস্টুরেন্টের কথা চিন্তা করুন। ভাত রান্নার দৈনন্দিন খরচ (চাল, জল আর জ্বালানি) রাস্তার ধারের দোকানেও যা, পাঁচতারা হোটেলেও প্রায় তাই। সেখানে ছোট ব্যবসায়ীরা বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় ফেলে দিতে পারে।  কিন্তু সরকার যদি নিয়ম করে দেয় যে ১০০০ বর্গ ফুটের নিচের কোন খাবারের দোকানকে তারা স্বীকৃতি দেবে না তাহলে ব্যবসা স্থাপনের ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাবে এবং বড় ব্যবসায়ী ছাড়া কেউ ব্যবসা শুরু করতে পারবে না। এই উদাহরণে স্থির ব্যয় বেড়ে গেছে সরকারি নিয়মের কারণে। একই ভাবে প্রযুক্তিগত ভাবেও এই ব্যয় বাড়তে পারে। যেমন ধরুন, গাড়ি উতপাদনের প্রযুক্তিই এমন যে হাজার কোটির বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির জন্য প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ছিল দেড় হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রেও খুব বড় শিল্পপতি ছাড়া উৎপাদন ক্ষেত্রে ঢোকা সম্ভব নয়। আপনি যদি সংস্কৃতির তিনটি প্রধান ক্ষেত্র নিয়ে ভাবেন --  সাহিত্য, সঙ্গীত এবং ফিল্ম – দেখবেন উৎপাদনের স্থির ব্যয় ক্রমশ কমেছে এবং সেই সুযোগে অনেক বেশি বেশি সংস্কৃতি উৎপাদক বাজারে ঢুকেছে। এর ফলে সংস্কৃতির বাজার দামও ক্রমশ নেমে আসছে। উদাহরণ স্বরূপ সঙ্গীতের কথা ভাবুন। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রথমে ছিল শুধু সামনা সামনি উপস্থাপন। সেই সময় রাজা বা জমিদার ছাড়া কারও পক্ষে সেই অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করা সম্ভব ছিল না। এর পরে এল গ্রামোফোন এবং এলপি রেকর্ডের যুগ। তার উৎপাদন ব্যয় এবং দামও যথেষ্ট বেশি। কিন্তু তাহলেও উচ্চবিত্ত মানুষদের পক্ষে সেই সঙ্গীত বাড়িতে কিনে চালানো সম্ভব। সেই সব পার করে এল ক্যাসেটের যুগ। এই সময়ে এসে গান কোম্পানির সংখ্যা বাড়ল অনেকটাই এবং প্রায় ঘরে ঘরে টেপ রেকর্ডারে গান শোনার প্রচলন হল। সেটাও গিয়ে যখন ডিজিটাল যুগ এল তখন সামান্য যন্ত্রপাতির সাহায্যে  বাড়িতেই গান রেকর্ড সম্ভব হয়ে গেল, আর শোনার খরচ নেমে এল প্রায় শূন্যে! একই কথা মূদ্রণ মাধ্যম সম্পর্কেও বলা যায়। এক সময়ে খুব বড় প্রকাশনা ছাড়া বই বা পত্রিকা প্রকাশ ছিল অসম্ভব। সেখানে এখন সাধারণ গৃহস্থ বাড়ির পড়ার টেবিল থেকে সামান্য খরচে বই বা পত্রিকা প্রকাশ করা যায়। এরপরে যদি ইন্টারনেট পত্রিকা বা ই-বুক ভাবেন, তার উৎপাদন খরচ তো প্রায় শূন্যই! অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নতি সংস্কৃতি উৎপাদনের খরচ কমিয়ে দিয়ে বহু নতুন উৎপাদককে বাজারে ঢোকার সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে সাংস্কৃতিক পণ্যের দাম চলে এসেছে প্রায় শূন্যের কাছে।
     এই পরিবর্তনের দুটি দিক আছে। একদিকে লেখক, শিল্পী বা গায়করা আগে যে ভাবে রোজগার করতেন সেই মডেল পালটে গেছে আমূল। কিন্তু আরেকটা দিকেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে শিল্প-সাহিত্যের যোগানদার ছিল হাতেগোনা কয়েকটি সংস্থা। তারাই ঠিক করত কী ছাপা হবে বা কার গান ক্যাসেট বা রেকর্ডে বেরোবে। এখন প্রযুক্তির পরিবর্তন একভাবে সংস্কৃতির গণতন্ত্রীকরণ ঘটিয়েছে। এই গণতন্ত্রীকরণের ভালো খারাপ দুটি দিকই আছে। একদিকে, কারো গান বা কবিতা প্রকাশের জন্য কোন বড় কোম্পানির বড়কর্তা বা বড় পত্রিকার সম্পাদকের অনুমোদনের দরকার নেই আর। যে যা করছেন তাই বাজারে ছাড়তে পারবেন, ভালো মন্দ বিচারের ভার গ্রহীতার ওপর। কিন্তু অন্যদিকে, বাজার এমন অনেক গান, কবিতা বা ফিল্মে ভরে যাবে যা ঠিক আমাদের প্রচলিত নন্দনতত্ত্বের বিচারে শিল্পসম্মত নয়। তার একটা সমস্যা হল, সেই ভিড়ে হয়ত ভালো শিল্প নজরে পড়াই মুশকিল হয়ে যাবে।
     এই আলোচনার সূত্রে আগের সংস্কৃতি উৎপাদনের মডেলের সঙ্গে এখনকার মডেলের পার্থক্যটাও বুঝে নেওয়া দরকার। আগের মডেলেও পিরামিডের নিচের তলায় ছিল গণ-মনোরঞ্জক চটুল সংস্কৃতি। অর্থাৎ, শিল্পসম্মত সংস্কৃতি তখনও পাবলিক খেতে চাইত না! পাবলিকের খিদে মেটানোর জন্য যে মসালা সংস্কৃতির যোগান দেওয়া হত তা চটুল, কিছুটা অশ্লীলও। এখনকার কন্টেন্টের জমানাতেও পাবলিক মূলত যা খায় তা শিল্পসম্মত নয়। কিন্তু পুরোন মডেলের সঙ্গে নতুন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। প্রথমতঃ  আগের মডেলে গণ-মনোরঞ্জনের সংস্কৃতি কিছুটা চটুল বা মোটা দাগের ছিল ঠিকই। কিন্তু এখনকার মত কন্টেন্টের দৈনন্দিন, সাধারণত্ব গণ-মনোরঞ্জনের বিষয় হয়ে ওঠে নি। অর্থাৎ, আজকাল যেমন বাড়ি বসে মুড়ি খাওয়া বা বাজারে গিয়ে আলু-পটল কেনার ভিডিও লাখ, লাখ লোক বুঁদ হয়ে দেখে তেমনটা আগে হত না। এখনকার ভিডিওতে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার আকছার করে থাকে লোকে, কিন্তু সেটার মধ্যে একটা রকের আড্ডা সুলভ স্বাভাবিকতা আছে। সেখানে আগের বি-গ্রেড সংস্কৃতির কন্টেন্ট অনেক বেশি চিত্রনাট্য অনুযায়ী নির্মাণ হত। তাকে নানান সরকারি সেন্সরের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। তাই তার অশ্লীলতাও ছিল ইঙ্গিতবাহী। যাঁরা সেগুলি নির্মাণ করতেন, তাঁরা ছিলেন পেশাদার, তাঁদের একটা ন্যূনতম দক্ষতা থাকতে হত। এখন কিন্তু দর্শক-কুশীলবের সেই ভেদরেখাটি মুছে গেছে। আজ যে দর্শক, কাল সেই মোবাইল ফোন নিয়ে নিজের চ্যানেল খুলে, ভিডিও দিয়ে, সংস্কৃতির উৎপাদক হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়তঃ, আগে যারা উচ্চ সংস্কৃতির সমঝদার ছিলেন না, তাঁরাও উচ্চ-সংস্কৃতিকে সংস্কৃতির শ্রেণী বিভাজনে উচ্চ আসনের মান্যতা দিতেন। এখন, উঁচু-নিচুর এই মান্যতা ভেঙ্গে গেছে। সবই কন্টেন্ট, সবই শেষ বিচারে ভিউ আর সাবস্ক্রিপশন খোঁজে।
       এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে হঠাৎ কেন এখনকার লোকজন এরকম অতি-সাধারণত্বে আসক্ত হয়ে পড়ল? আমার মতে এই ধরণের অতি সাধারণ, অকিঞ্চিতকর কন্টেন্টের চাহিদা ছিল বরাবরই। কিন্তু উতপাদন ব্যয় বেশি থাকার জন্য পত্রিকা সম্পাদক বা রেকর্ড কোম্পানির মালিক বা ফিল্ম প্রযোজকেরা এই সব প্রকল্পে সায় দিতে পারেননি কখনোই। তাঁরা উৎপাদন করেছেন শুধুই উচ্চ বা মধ্য এমনকি চটুল শিল্পও, কিন্তু এখনকার কন্টেন্টের মত নির্বিষ, শিল্পদক্ষতাহীন, অতি-সাধারণ কিছু উৎপাদন কেউ করে উঠতে পারেন নি। প্রযুক্তির ধাক্কায় সেই না মেটা চাহিদাই এখন মিটছে।

    এই দুনিয়ায় সকল ভালো (?)
    কিন্তু এই পরিবর্তন ভালো না খারাপ? সহজ কথায় এর কোন উত্তর নেই। আর ইতিহাস যদি কোন শিক্ষা আমাদের দিয়ে থাকে তা হল এই যে প্রযুক্তির পথ রোধ অসম্ভব। যাঁরা সে চেষ্টা করেছেন – শিল্পবিপলবের লুডাইট থেকে আশির দশকের কলকাতার কম্পিউটার বিরোধী বামপন্থীরা – তারা সবাই সেই লড়াইতে পরাজিত শুধু হন নি, এই লড়াইকে জারি রাখার তাগিদে সমাজকে আরো পিছিয়ে দিয়েছেন। প্রযুক্তিকে আটকানোর চেষ্টা করার থেকে জরুরি হল তাকে বোঝা, তার অনুকুল বৈশিষ্ট্যগুলিকে ব্যবহার করা। নতুন প্রযুক্তির সব থেকে বড় সুযোগ হল তা রাষ্ট্র এবং প্রযোজক, সম্পাদক ইত্যাদিদের অ-রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ কে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর সুযোগ করে দেয়। যার যা ঠিক মনে হচ্ছে সেটাই তিনি বানিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। কবে কোন প্রযোজক, কোন সম্পাদক বা কোন সরকারি কমিটি তাঁকে সেই সুযোগ করে দেবে সেই ভরসায় বসে থাকতে হয় না। কিন্তু এই ব্যবস্থার সমস্যা হল কন্টেন্টের সংখ্যা বহু লক্ষ গুণ বেড়ে যাওয়া। আগে হয়ত কোন একটি পত্রিকায় আপনি পেয়ে যেতেন ভালো লেখার সন্ধান, কোন একটি উৎসবে হয়ত মঞ্চস্থ হত সেই বছরের সব ভালো নাটক বা সিনেমা। কিন্তু এখন তার বাইরেও রয়েছে ভালো শিল্পের বা আপনার পছন্দের শিল্পের (থুড়ি কন্টেন্ট) লুকিয়ে থাকার বিপুল সম্ভাবনা। সেই বিরাট খড়ের গাদা থেকে সুঁচ খোঁজার কাজটি কিন্তু বেশ কঠিনই। সেখানে সার্চ ইঞ্জিনদের হাতে ক্ষমতা থাকে এলগরিদম এর এদিক ওদিক করে তাদের পছন্দের  
    কন্টেন্ট কে আপনার সামনে এনে ফেলার। এই সম্ভাবনা আবার এক নতুন ধরণের সেন্সরশিপের জন্ম দিতে পারে বা দিয়ে চলেছে। কিন্তু সেই আলোচনা এই প্রবন্ধের আলোচনার আওতার বাইরে।
    (কৃতজ্ঞতাঃ এই প্রবন্ধের মূল ভাবনাটি বিকশিত হয়েছে আমার বন্ধু, অর্থনীতিবিদ সৌরভ ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলোচনার সূত্রে। সৌরভকে ধন্যবাদ।)

    (প্রবন্ধটি শব্দ পত্রিকার শারদীয় উৎসব সংখ্যা ১৪৩২ এ প্রকাশিত)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • প্রবন্ধ | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    মাংস - অরিন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন