এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  অর্থনীতি

  • বিশ্বশক্তির অলিখিত নিয়ম ও ডলারের সাম্রাজ্য - পর্ব ৩

    দেবজিৎ ঘোষ
    ধারাবাহিক | অর্থনীতি | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ৬৪১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ছবি: রমিত



     


    চাপের মুখে বৈশ্বিক স্থাপত্য: ইরান সংকট যখন সিস্টেমকে পরীক্ষায় ফেলে 

    যোগসূত্রঃ যেখানে স্থাপত্য বাস্তবের মুখোমুখি হয়
    এই সিরিজের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে এমন একটি কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করার চেষ্টা করেছিলাম যার মাধ্যমে আমরা বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলো সম্পর্কে বুঝতে পারি। আমরা দেখেছি কীভাবে ১৯৭১ সালে নিক্সন 'গোল্ড উইন্ডো' (ডলারের বদলে সোনা দেওয়ার ব্যবস্থা) বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং কীভাবে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটেছিল। এরপর ১৯৭৪ সালে রিয়াদের সাথে কিসিঞ্জারের সেই নিভৃত সমঝোতা কীভাবে ডলারের আধিপত্যের ভিত্তি হিসেবে সোনার বদলে তেলকে দাঁড় করিয়েছিল। আমরা সেই ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের গাণিতিক হিসেব পরীক্ষা করেছি, যা আমেরিকার জন্য ডলারের এই আধিপত্য বজায় রাখাকে কেবল একটি ‘চয়েস’ নয়, বরং তাদের আর্থিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত করেছে। আমরা বিশ্ব পুঁজির নিয়ন্ত্রকদের (Controllers of Global Capital) চিহ্নিত করেছি — সেই সম্পদ ব্যবস্থাপক এবং সার্বভৌম তহবিলগুলো, যারা এখন বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। এবং আমরা দেখেছি কীভাবে সভ্যতাগত ভিত্তিতে খেলা 'প্রিজনার্স ডিলেমা' (Prisoner’s Dilemma) তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করে যে কেন বুদ্ধিমান পক্ষগুলো কেবল নিজেদের স্বার্থ খুঁজতে গিয়ে বারবার এমন ফলাফল তৈরি করে যা সবার জন্য ক্ষতিকর।
    তৃতীয় পর্ব হলো সেই জায়গা যেখানে আমাদের তাত্ত্বিক আলোচনা কাগজের পাতা ছেড়ে বাস্তবের মুখোমুখি হবে। ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহ একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বা চাপের পরীক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে, যেটিকে সিস্টেম অ্যানালিস্টরা বা ব্যবস্থা বিশ্লেষকরা আগের দুই পর্বে বর্ণিত স্থাপত্যের পরীক্ষা বলে অভিহিত করবেন। এই সংকটটি কেবল একটি সামরিক সংঘাত বা পরমাণু ক্ষমতা নিয়ে কোনো আঞ্চলিক বিবাদ নয়। এটি এমন একটি মুহূর্ত যখন প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত কাঠামোগত দ্বন্দগুলো — বিশেষ করে ডলার-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা এবং তার উদীয়মান বিকল্পগুলোর মধ্যেকার দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন — একটি তীব্র সংঘাতের রূপ নিয়েছে। এটি বাস্তব সময়ে ঘটে চলা 'প্রিজনার্স ডিলেমা', যেখানে প্রতিটি বড় পক্ষ এমন সব পদক্ষেপ বেছে নিচ্ছে যা তাদের কাঠামোগত লাভের যুক্তির প্রতিফলন ঘটায়, কোনো একক নৈতিক বিচারের ভিত্তিতে নয়।

    এরপর যা লিখেছি তা মূলত একজন স্ট্রাকচারাল অ্যানালিস্ট বা কাঠামো বিশ্লেষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সংকটকে দেখার একটি চেষ্টা। এখানে কাউকে দোষ দেওয়া বা বিজয়ী ঘোষণা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং ব্যবস্থার কোন অংশগুলো টিকে আছে, কোনটি ভেঙে যাচ্ছে এবং এই ফাটলগুলো ব্যবস্থার ভেতরের আসল নকশা সম্পর্কে আমাদের কী ধারণা দিচ্ছে, তা শনাক্ত করাই মূল লক্ষ্য।

    অধ্যায় ১২: ২০২৬ সালের সংকটের কাঠামোগত যুক্তি


    কেন এই মুহূর্তটি আগে থেকেই অনুমেয় ছিল
     

    এই লেখার প্রথম পর্বটি একটি সতর্কবার্তার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল: পেট্রোডলার ব্যবস্থা যত কার্যকরই হোক না কেন, এর ভেতরে এমন কিছু স্ববিরোধিতা রয়েছে যা কোনো কাঠামোই অনন্তকাল ধরে সইতে পারে না। পেট্রোডলার ব্যবস্থার প্রধান শর্ত হলো — সব গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস বাণিজ্য অবশ্যই ডলার-নির্ভর চুক্তির মাধ্যমে হতে হবে। এই শর্তটি কোনো আন্তর্জাতিক আইনে লেখা নেই। এটি ১৯৭৪ সালে তৈরি করা একটি কাঠামোগত ইনসেন্টিভ এর মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে—বিশেষ করে নিরাপত্তার গ্যারান্টির বিনিময়ে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন করার ব্যবস্থা। এর সাথে জড়িয়ে আছে একটি পরোক্ষ বোঝাপড়া যে, এর বিকল্প খোঁজা অনেক ব্যয়বহুল হবে এবং এই ব্যবস্থাটি বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটিয়েছে। 
    ইরান এক্ষেত্রে একটি বিশেষ উদাহরণ। এটি দেখায় যে, যখন একটি রাষ্ট্র আদর্শের কারণে নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদে এই ব্যবস্থার বাইরে কাজ করার জন্য নিজেদের পরিকাঠামো তৈরি করে, তখন কি ঘটে। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলার-ভিত্তিক আর্থিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইরান বাধ্য হয়েছিল ডলারের বাইরে জ্বালানি কেনাবেচার কৌশলগুলো তৈরি করতে এবং সময়ের সাথে সাথে সেগুলোকে উন্নত করতে। ডিজিটাল ইউয়ান, চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (CIPS), শ্যাডো ফ্লিট নেটওয়ার্ক এবং চীনের সাথে পণ্য বিনিময়ের মতো পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলো কোনো বৈপ্লবিক পরিকল্পনা নয়, বরং এটি হলো ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার একটি খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এটি আসলে আর্থিক স্থাপত্যে প্রয়োগ করা ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ (Tit-for-Tat) নীতি: আপনাকে যে পরিস্থিতি দেওয়া হয়েছে, আপনি ঠিক সেটিরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন।
    প্রথম পর্বে বর্ণিত ডলার-নির্ভর স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যবস্থাগুলোর গুরুত্ব বর্তমানে তাদের আকারের ওপর নির্ভর করে না, বরং তারা যে একটি 'প্রুফ-অফ-কনসেপ্ট' বা সফল মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে—সেখানেই তাদের গুরুত্ব। ডলার ব্যবস্থার বাইরে কেনাবেচা হওয়া তেলের প্রতিটি ব্যারেল একটি সফল উদাহরণ যে এমনটা করা সম্ভব। আর প্রতিটি সফল উদাহরণ পরের পদক্ষেপটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে এবং তার পরেরটিকে আরও বেশি। কাঠামোগত হুমকি কিন্তু ইরানের তেল উৎপাদন নয়, যা বিশ্বের মোট সরবরাহের খুব সামান্য অংশ। আসল কাঠামোগত হুমকি হলো এই নজির বা দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়া এবং ডলার ব্যবস্থার বাইরে টিকে থাকার জন্য যে পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, সেটি।

    প্রতিটি পক্ষের কাঠামোগত স্বার্থ


    একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থার লেন্স দিয়ে এই সংকট বিশ্লেষণ করার অর্থ হলো কাউকে ভালো বা মন্দ হিসেবে দেখার প্রলোভন সামলানো। তার বদলে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত: প্রতিটি পক্ষের স্বার্থের কাঠামো তাদের কাছ থেকে কী দাবি করছে?
    আমেরিকার জন্য স্বার্থের কাঠামোটি ঠিক তেমনই যা প্রথম পর্বে বর্ণনা করা হয়েছে: জ্বালানি বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য রক্ষা করা। কারণ এর বিকল্প অর্থাৎ রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের মর্যাদা সামান্যতম কমে যাওয়া মানেই হলো তাদের ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের কিস্তি মেটানোর খরচ সরাসরি বেড়ে যাওয়া। যেকোনো সংঘাতে এই কাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা পরিস্থিতি, সময় এবং হাতের কাছে থাকা উপকরণের ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু মূল যুক্তিটি সবসময় একই থাকে। যে রাষ্ট্রটি ইতিমধ্যেই ডলারের বাইরে জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষমতা দেখিয়েছে এবং বছরের পর বছর ধরে বড় আকারে সেটি করার পরিকাঠামো তৈরি করেছে, সে রাষ্ট্রটি বর্তমান ব্যবস্থার স্বার্থের যুক্তিতে একটি বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।
    ইসরায়েলের জন্য এই স্বার্থের কাঠামোটি ভিন্ন সময়ের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, তবে এর ভেতরেও এক ধরণের সামঞ্জস্য আছে। 'বেগিন ডকট্রিন' (Begin Doctrine) —অর্থাৎ প্রতিবেশী কোনো শত্রু রাষ্ট্রকে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে না দেওয়ার নীতি। এটি কোনো আবেগপ্রবণ পছন্দ নয়, এটি একটি যৌক্তিক হিসেব। কারণ শত্রুর হাতে পরমাণু শক্তি থাকলে তাদের প্রক্সি বা সহযোগী গোষ্ঠীগুলো এমন একটি সুরক্ষাকবচ পেয়ে যাবে যা বর্তমানে তাদের নেই। কেউ এই যুক্তির সাথে একমত হোন বা না হোন, এর নিজস্ব একটি অভ্যন্তরীণ যুক্তি আছে এবং এটি কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
    ইরানের ক্ষেত্রে চার দশক ধরে কাঠামোগত ইনসেনটিভগুলো তাদের ঠিক সেই পথেই ঠেলে দিয়েছে যা আমরা এখন দেখছি: বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা, সমান্তরাল লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরের শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক। একটি রাষ্ট্র যখন দীর্ঘকাল অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে থাকে, তখন যে ব্যবস্থাটি তাকে বিচ্ছিন্ন করছে তার সাথেই মিশে থাকার বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ থাকে না। শ্যাডো ফ্লিট, ডিজিটাল ইউয়ান লেনদেন, সিআইপিএস (CIPS) ব্যবস্থা—এগুলো হলো একটি বুদ্ধিমান পক্ষের যৌক্তিক পদক্ষেপ যা সে তার প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গ্রহণ করেছে।
    চীনের জন্য কাঠামোগত স্বার্থগুলো ঠিক তেমনই যা দ্বিতীয় পর্বে 'আমেরিকান-চীনা প্যারাডক্স' অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে: বিশ্বের ভোক্তা বাজার এবং ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ প্রবেশাধিকার রাখা এবং একই সাথে সেরা দামে জ্বালানি সরবরাহের সর্বোচ্চ বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা। ইরানের তেল যখন নিষেধাজ্ঞার কারণে সস্তায় পাওয়া যায় এবং এমন চ্যানেলে টাকা দেওয়া যায় যা ডলারের আওতায় পড়ে না, তখন চীনের দুটি লক্ষ্যই একসাথে পূরণ হয়। এটি একটি কাঠামোগত মিল। এটি ব্যাখ্যা করতে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। যখনই স্বার্থ এবং সুযোগের মিল ঘটে, প্রিজনার্স ডিলেমার যুক্তি ঠিক এই ফলাফলই তৈরি করে।
    রাশিয়ার জন্য, যারা ২০২২ সাল থেকে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং যারা ইরানের তৈরি করা এই বিকল্প স্থাপত্যে (বিশেষ করে উত্তর-দক্ষিণ করিডোর যা ইরান হয়ে রাশিয়ার বাজারকে ভারত মহাসাগরের বন্দরের সাথে যুক্ত করে) বড় বিনিয়োগ করেছে, তাদের স্বার্থ হলো এমন একটি পথ রক্ষা করা যা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। আইএনএসটিসি (INSTC) কেবল একটি যাতায়াতের পথ নয়। এটি এমন এক বিশ্ব বাণিজ্যের পরিকাঠামো যেখানে পশ্চিমা আর্থিক মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এই পথে বাধা আসা মানে কেবল ব্যবসা হারানো নয়, বরং একটি কৌশলগত বড় ধাক্কা।
    উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং তাদের প্রতিবেশী) অবস্থান অত্যন্ত জটিল। এই দেশগুলো ইরানের আদর্শ বা ডলার ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার মানসিকতা শেয়ার করে না; বরং তাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত পশ্চিমা আর্থিক কাঠামোর সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। কিন্তু তারা এমন এক সংঘাতের ভৌগোলিক সান্নিধ্যে বাস করে যা তারা শুরু করেনি এবং তাদের পরিকাঠামো এমন জায়গায় অবস্থিত যা যেকোনো উত্তেজনায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের প্রতিক্রিয়া—অর্থাৎ সার্বভৌম পুঁজিকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এবং আর্থিক সম্পর্ককে নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে কাজে লাগানো—দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত সিজিসি (CGC) যুক্তির সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায়। ধৈর্যশীল সার্বভৌম তহবিলের হাতে পুঁজি একটি কৌশলগত হাতিয়ার।

    অধ্যায় ১৩: চোকপয়েন্ট ইকোনমি: চাপের মুখে ভৌগোলিক স্থাপত্য


    বিশ্ব জ্বালানির নকশা 


    ২০২৬ সালের সংকট বোঝার একটি বড় উপায় হলো ভূগোল। হরমুজ প্রণালী তার সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, কিন্তু এখান দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। সারা বিশ্বের মোট এলএনজি (LNG) বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও প্রতি বছর এই পথ দিয়ে যায়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এককভাবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা।

     



    কারা এই প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল, সেই তালিকাটি দেখলে এই সংকটের কাঠামোগত স্বার্থগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়। এই প্রণালী দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৭% যায় চীনে; ভারতে যায় প্রায় ১৫%; দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে যায় আরও ২৩%। অথচ আমেরিকা নিজের দেশে প্রচুর তেল উৎপাদন করায় এই পথ দিয়ে তাদের তেল আসে মাত্র ২%। অর্থাৎ, জ্বালানি নির্ভরতার এই ভৌগোলিক নকশাটি যেকোনো বিপদের ঝুঁকিকে মূলত এশিয়ার দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়। আর এই এশিয়ার দেশগুলোই কিন্তু সেই বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার খুঁটি, যা ডলারের আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে।
    এই ভৌগোলিক বাস্তবতার একটি কাঠামোগত অর্থ আছে যা খুব কমই স্পষ্টভাবে বলা হয় : জ্বালানি চলাচলের এই পথে বাধার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোই কিন্তু পেট্রোডলার ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কারণ তারাই জ্বালানি কেনার জন্য ডলারের চাহিদা তৈরি করে এবং তাদের বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত টাকা আবার ডলারের সম্পদে বিনিয়োগ করে। হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তাদের প্রথমে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করবে ঠিকই, কিন্তু এটি ডলার ব্যবস্থা যে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যকে সচল রাখে, সেই ব্যবস্থাটিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

    করিডোর বিপর্যয়: আইএমইসি (IMEC) এবং আইএনএসটিসি (INSTC)


    এই সংকট একই সাথে দুটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করেছে যা বিকল্প বাণিজ্য পথ তৈরির জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (IMEC), যা ২০২৩ সালে ভারত থেকে ইউরোপকে যুক্ত করার জন্য রেল ও বন্দর নেটওয়ার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটি ইসরায়েলের বন্দর এবং আরব উপদ্বীপের স্থিতিশীল রেল সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে দুটিই এখন সংকটে। অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর (INSTC), যা ইরান হয়ে রাশিয়া ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে পণ্য পাঠায়, সেটিও ইরানের অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।
    দুটি করিডোর একসাথে বাধাগ্রস্ত হওয়া একটি বিষয় প্রমাণ করে: চাপের মুখে কোনো ব্যবস্থার যে বিকল্প পথ (redundancy) থাকার কথা ছিল, তা আসলে স্বাধীন নয়। যখন মূল পথ এবং বিকল্প পথ একই ধরণের ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়, তখন সেই ব্যবস্থার সহনশীলতা কাগজের হিসেবের চেয়ে অনেক কম হয়। ঘনিষ্ঠভাবে আন্তঃসংযুক্ত প্রণালীর এটি একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য; যা বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো থেকে শুরু করে শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খল ও বিদ্যুৎ গ্রিড—সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। 

    অধ্যায় ১৪: সমান্তরাল স্থাপত্য: ছায়া ব্যবস্থা এবং বিকল্প পথ
     

    ফাঁকফোকরের মাধ্যমে চলা একটি ব্যবস্থা

    বর্তমান সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি উন্মোচিত করে দিয়েছে যে, গত দুই দশকে ডলার-নির্ভর ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিয়ে কতটা বড় আকারে একটি সমান্তরাল জ্বালানি ও পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এটি কোনো চক্রান্তমূলক গোপন বিষয় নয়। বরং এটি আর্থিক পরিকাঠামোতে প্রয়োগ করা 'প্রিজনার্স ডিলেমা' এবং 'যেমন কুকুর তেমন মুগুর' নীতির একটি অনুমেয় ফলাফল: যখন একদল পক্ষকে মূল ব্যবস্থা থেকে পদ্ধতিগতভাবে বের করে দেওয়া হয়, তখন পর্যাপ্ত সম্পদ ও সময় পেলে তারা বিকল্প কিছু তৈরি করেই নেবে।
    এই নতুন স্থাপত্যের কয়েকটি অংশ আছে। ইরানের তেল বহনকারী ট্যাঙ্কার জাহাজের একটি নেটওয়ার্ক পশ্চিমা বিমা বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থার বাইরে কাজ করে। তারা নাম পাল্টে, অবস্থান লুকিয়ে এবং এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল তুলে দিয়ে তাদের উৎস গোপন রাখে। চীনের শানডং প্রদেশের স্বাধীন রিফাইনারিগুলো—যারা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর চেয়ে ছোট এবং অস্বচ্ছভাবে চলে—তারা এই তেল গ্রহণ করে এবং অনেক সময় এর উৎস লুকিয়ে ফেলে। পেমেন্টের জন্য ইউয়ান-নির্ভর লেনদেন, পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বা সুইফট (SWIFT) ব্যবস্থার বাইরের পেমেন্ট মেকানিজম ব্যবহার করা হয়।
    বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৫ সালে চীন এই নেটওয়া র্কের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৩.৮ লক্ষ ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে, যা ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০-৯০%। নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া তেলের ওপর যে ছাড় পাওয়া যায় (ব্যারেল প্রতি ৮ ডলার থেকে ৩০ ডলার পর্যন্ত), তার অর্থনৈতিক মূল্য বিশাল। এটি বছরে কোটি কোটি ডলারের একটি কাঠামোগত সুবিধা যা দেশগুলোকে এই নেটওয়া র্কটি টিকিয়ে রাখতে উৎসাহিত করে।
    ব্যবস্থা বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি নয় যে এই সমান্তরাল ব্যবস্থাটি আছে কি না, বরং প্রশ্ন হলো এটি কি এখন একটি প্রকৃত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করার মতো শক্তি অর্জন করেছে, না কি এটি এখনো ডলার ব্যবস্থার একটি ছোট সম্পূরক মাত্র। বর্তমানে মনে হচ্ছে এটি এখনো পুরোপুরি সমান হতে পারেনি, তবে সেই পথেই এগোচ্ছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচারটি বাস্তব – প্রুফ অফ কনসেপ্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই সংকটের পরিস্থিতি এর উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে নাকি সীমাবদ্ধ করবে। বর্তমান ইরান সংকটের উদ্দেশ্য হলো সেই ব্যবস্থাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা, যাতে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।

     



    বিটা টেস্টের যুক্তি


    দ্বিতীয় পর্বে বলা হয়েছে যে গ্লোবাল ক্যাপিটালের নিয়ন্ত্রকরা সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে কাঠামোগত ইনসেনটিভের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। সমান্তরাল এই জ্বালানি স্থাপত্যও একই নীতিতে চলে: ডলার ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন নেই, বরং এটি বারবার প্রমাণ করতে চায় যে বিকল্প ব্যবস্থা সম্ভব। ডলারের বাইরে প্রতিটি সফল লেনদেন পরের লেনদেনের ভয় কমিয়ে দেয়। প্রতিটি সফলভাবে পাচার হওয়া তেল নিষেধাজ্ঞার ভয়কে কমিয়ে দেয়। এই ব্যবস্থার শক্তি এর বর্তমান আকারে নয়, বরং এর এগিয়ে যাওয়ার গতিপথের মধ্যে।
    এটিই বর্তমান কাঠামোর সামনে আসল চ্যালেঞ্জ: এটি এমন কোনো একক শত্রু নয় যাকে এক আঘাতে হারানো যায়, বরং এটি একটি ছড়িয়ে থাকা, খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠা বিকল্প যা কোনো একটি বিন্দুতে ব্যর্থ হয় না। রবার্ট অ্যাক্সেলরড যেমনটি দেখিয়েছিলেন, 'টিট-ফর-ট্যাট' কৌশল অত্যন্ত শক্তিশালী কারণ এটি ছড়িয়ে থাকে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়। সমান্তরাল আর্থিক ব্যবস্থাও সেই একই শক্তিশালী নীতিতে গড়ে উঠেছে।

    অধ্যায় ১৫: কাঠামোগত দোরাস্তায় ভারত
     

    কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সংকট
     

    বর্তমান সংকটে ভারতের অবস্থান মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য একটি কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি ভোক্তা হিসেবে ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৮৫% আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের নির্ভরতা বিশাল। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ভারতের তেলের ৫০-৫২% এবং এলএনজির ৬০% এই প্রণালী দিয়ে আসে। রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপের কারণে এই নির্ভরতা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও বেড়েছে।
     



    ভারতের কৌশলগত স্থাপত্য সম্প্রতি একটি বিশেষ আকার নিচ্ছিল। চাবাহার বন্দর উন্নয়নের মাধ্যমে ইরান হয়ে মধ্য এশিয়া এবং আফগানিস্তানে পৌঁছানোর চেষ্টা ছিল পাকিস্তানের বিকল্প একটি পথ। আবার আইএমইসি (IMEC) করিডোর ছিল ইউরোপের বাজারে পৌঁছানোর পশ্চিমা পথ। এই দুটিই ভারতকে একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছিল যা কোনো একটি পথ বা সঙ্গীর ওপর ভারতের নির্ভরতা কমাবে।
    বর্তমান সংকট এই দুটি পথকেই একসাথে অনিশ্চিত করে দিয়েছে। ইরানের ঘটনাবলির কারণে চাবাহার বন্দরের কার্যক্রমের প্রেক্ষাপট অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে আইএমইসি (IMEC)-এর ভাগ্য ইসরায়েল প্রান্তের স্থিতিশীলতা এবং আরব উপদ্বীপের রেলপথের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা নিজস্ব কিছু ঝুঁকির সম্মুখীন। সংঘাত আরও ঘনীভূত হওয়ার আগেই চাবাহারের জন্য ভারতের পাওয়া ছয় মাসের কার্যক্রম পরিচালনার ছাড়পত্রের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছিল। ভারতের জন্য এখন বড় প্রশ্ন কেবল জ্বালানি সরবরাহ নয়, বরং প্রশ্ন হলো একটি উদীয় মান শক্তি হিসেবে তারা কীভাবে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখবে যখন বড় শক্তিগুলো (পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইউরেশীয় বিকল্পগুলো) মুখোমুখি সংঘাতে লিপ্ত। কোনো এক দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ার খরচ অনেক বেশি।
    এটিই হলো বহুমুখী বিশ্বে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য একটি ফাঁদ। দ্বিমেরু বিশ্বে পছন্দ করা সহজ ছিল। কিন্তু আজকের আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে এটি জটিল। ভারতের যেমন ডলার ব্যবস্থা এবং আমেরিকার বাজার প্রয়োজন, তেমনই তার প্রয়োজন জ্বালানির বৈচিত্র্য এবং মধ্য এশিয়ার সাথে যোগাযোগ। এই চাহিদাগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট জোটের সাথে পুরোপুরি খাপ খায় না।
    ভারতের অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে, ২০২৬ সালের এই স্ট্রেস টেষ্ট কেবল দুটি পক্ষের ঝগড়া নয়। এটি আসলে সেই বিশ্বব্যবস্থার ভেতরের ফাটল যা প্রথম পর্বে বলা হয়েছে—একটি সহজতর বিশ্বের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল কিন্তু বর্তমানের জটিল বাস্তবতায় তা খাপ খাচ্ছে না। কাঠামোগত চাপগুলো এখন আর কেবল দ্বিপাক্ষিক রেখা বরাবর চলে না, বরং এটি একটি আন্তঃনির্ভরশীলতার জাল তৈরি করেছে যেখানে প্রতিটি দেশ একাধিক বিপরীতমুখী শর্তের মধ্যে আটকা পড়ে আছে।

    অধ্যায় ১৬: দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব: চাপের মুখে আসল রূপ
     

    স্ট্রেস টেষ্টের ফলাফল বোঝার চেষ্টা 
     

    প্রকৌশলীরা যখন কোনো কাঠামোর ওপর চাপ দেন, তখন কেবল কাঠামোটি টিকে আছে কি না তা দেখা হয় না, বরং দেখা হয় যে সেই চাপের ফলে কাঠামোর ভেতরের আসল দুর্বলতাগুলো কোথায়। বর্তমান সংকটও বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি স্থাপত্যের ওপর সেই একই কাজ করছে। কয়েকটি প্রভাবের দিকে নজর দেওয়া জরুরি:

    জ্বালানি দামের ফিডব্যাক লুপ
    পেট্রোডলার ব্যবস্থাটি, যা আমি প্রথম পর্বে ব্যখ্যা করার চেষ্টা করেছি, তা এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে জ্বালানি উৎপাদনকারী এবং ডলার প্রদানকারী ক্ষমতার স্বার্থ এক থাকে। যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন এই ব্যবস্থা একটি অদ্ভুত প্রভাব ফেলে: এটি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে ধনী করে যাদের টাকা আবার ডলারের সম্পদেই ফিরে আসে এবং ট্রেজারি মার্কেটকে শক্তিশালী করে। কিন্তু একই সাথে এটি জ্বালানি ব্যবহারকারী জনগণের ওপর করের মতো চেপে বসে। উচ্চমূল্যের জ্বালানি দীর্ঘস্থায়ী হলে মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করে যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গণতান্ত্রিক দেশে এর ফলে এমন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয় যা দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত লক্ষ্যের সাথে নাও মিলতে পারে। 
    বর্তমান সংকটে এই ফিডব্যাক লুপ বা প্রতিক্রিয়া চক্রটি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮২ ডলারে উঠে গেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬৬ ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন এক মাসের বেশি স্থায়ী হলে এই দাম আরও আকাশচুম্বী হতে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা অপরিশোধিত তেলের সিংহভাগ ব্যবহারকারী এশীয় অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এটি একটি তাৎক্ষণিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক (macroeconomic) চাপ। অন্যদিকে, এই অঞ্চলের বাইরের জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এটি একটি অপ্রত্যাশিত আশীর্বাদ বা মুনাফা। এই পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত পরিহাস হলো এই যে—একটি জ্বালানি করিডোর বাধাগ্রস্ত হলে তার সুবিধা পায় বিকল্প সরবরাহকারীরা; যার মধ্যে রাশিয়ার মতো দেশও রয়েছে, যাদের কৌশলগত স্বার্থ সেই পশ্চিমা ব্যবস্থার সাথে মেলে না, যা রক্ষার লক্ষ্যেই আপাতদৃষ্টিতে এই বিঘ্ন ঘটানো হচ্ছে।

    অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অ্যাসিমেট্রিক প্রতিক্রিয়া 
    ২০২৬ সালের এই সংকটটি আরও একটি বিষয় উন্মোচিত করেছে — তা হলো অপ্রতিসম শক্তিগুলো বা অ্যাসিম্যাট্রিক অ্যাক্টরদের (asymmetric actors) পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা এখন প্রথাগত যুদ্ধক্ষেত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে কতটা বিবর্তিত হয়েছে। সাইবার হামলা চালিয়ে জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ গ্রিড বা আর্থিক নেটওয়া র্ক অচল করে দেওয়া এখন অনেক সহজ এবং এর পেছনে কে আছে তা ধরাও কঠিন। 'স্টাক্সনেট' (Stuxnet) থেকে শুরু করে 'সোলার-উইন্ডস' (SolarWinds) অনুপ্রবেশ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার অপারেশনের নথিভুক্ত ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এটি কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র, যা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃশ্যমান দিকগুলোর সমান্তরালেই বিকশিত হচ্ছে। 
    ব্যবস্থা বিশ্লেষণের জন্য এর গুরুত্ব হলো, অ্যাসিমেট্রিক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিশোধের ক্ষমতা প্রিজনার্স ডিলেমার হিসাব বদলে দেয়। যখন একটি দুর্বল পক্ষও সাইবার জগতের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী পক্ষকে বড় ধাক্কা দিতে পারে, তখন শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়। থুসিডাইডিস যেমন বলেছিলেন—শক্তিশালীরা যা পারে তা-ই করে। কিন্তু এখন দুর্বলরা যা করতে পারে তার পরিধি অনেক বেড়ে গেছে।

    জোটের সংহতি এবং সীমাবদ্ধতা
    তৃতীয় যে বিষয়টি ধরা পড়েছে তা হলো জোটগুলোর স্থায়িত্ব। 'টিট-ফর-ট্যাট' কৌশলের জন্য প্রয়োজন হলো পক্ষগুলো একে অপরকে চিনবে এবং ভবিষ্যতের সহযোগিতার মূল্য বুঝবে। কিন্তু যখন জোটের কোনো সদস্যের জন্য সহযোগিতার চেয়ে সরে যাওয়ার লাভ বেশি হয়ে যায়, তখন জোট ভেঙে যাওয়াটাই যৌক্তিক হয়ে দাঁড়ায়।  
    বর্তমান সংকট জোটের সংহতির মধ্যে দৃশ্যমান ফাটল তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন, জ্বালানি নির্ভরতার ভিন্ন ভিন্ন ধরণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এই সংকটে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সাড়া দিয়েছে। সিস্টেমিক বা পদ্ধতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আশ্চর্যজনক নয়: দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, পারস্পরিক প্রত্যাশা এবং কার্যকর প্রয়োগ ব্যবস্থার মতো যে শর্তগুলো বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে টেকসই করে, স্বল্পমেয়াদী নির্বাচনী চক্র এবং বিজাতীয় জাতীয় স্বার্থের কারণে ঠিক সেই শর্তগুলোই বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদী যুক্তি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বল্পমেয়াদী যুক্তির মধ্যে যে 'গণতান্ত্রিক ঘাটতি' (democratic deficit) চিহ্নিত করা হয়েছিল, তা এখানে বাস্তব সময়ে দৃশ্যমান হচ্ছে।

    দীর্ঘমেয়াদী খেলা এবং কৌশলগত ধৈর্য
    চতুর্থ বিষয়টি হলো সেইসব পক্ষগুলোর জন্য নিরপেক্ষতার কৌশলগত মূল্য, যারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকরাই একমাত্র পক্ষ নয় যারা সংকটের সময় ধৈর্যশীল এবং সামরিকহীন (non-kinetic) প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে উপকৃত হয়। যেসব রাষ্ট্রের পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে, তারা কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চেয়ে সংঘাতের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা থেকে অধিক সুবিধা আদায় করতে পারে। 'কৌশলগত ধৈর্য' (strategic patience)-এর পক্ষে যুক্তিটি অত্যন্ত স্পষ্ট: যখন প্রতিদ্বন্দ্বীরা ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানে তাদের সম্পদ খরচ করতে থাকে, তখন সরাসরি যুক্ত না থাকা পক্ষটি সম্পদ ব্যয় না করার মাধ্যমে আপেক্ষিক সুবিধা অর্জন করে। পাশাপাশি, বিদ্যমান সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইনগুলো বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে এমন কিছু বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে যা ধৈর্যশীল পুঁজিকে লাভবান করে।
    এই যুক্তিটি রাষ্ট্র এবং দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত 'গ্লোবাল ক্যাপিটাল কন্ট্রোলার' (CGC) — উভয় পর্যায়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জাতীয় আখ্যানগুলো যেভাবে ভূ-রাজনৈতিক জয়-পরাজয়কে সংজ্ঞায়িত করে, পুঁজি সেভাবে পার্থক্য করে না। পুঁজি কেবল ঝুঁকির বিপরীতে মুনাফার হার (risk-adjusted returns) বিবেচনা করে। সংঘাত একই সাথে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ শ্রেণির (asset classes) জন্য ধ্বংস এবং সুযোগ—উভয়ই তৈরি করে। প্রতিরক্ষা খাত, বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, জাহাজ চলাচলের বিমা প্রিমিয়াম এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সম্পদের (safe-haven assets) প্রতি আগ্রহ — এই সবই সংকটের সময় এমনভাবে সাড়া দেয় যা পুঁজির নির্দিষ্ট মালিকদের লাভবান করে, সেখানে সংঘাতের নৈতিক বা কৌশলগত চরিত্রটি গৌণ হয়ে পড়ে। এটি এই পক্ষগুলোর আচরণের কোনো বিচার নয়; বরং ভূ-রাজনৈতিক চাপের পরিস্থিতিতে বিশ্ব পুঁজি বাজারের ইনসেনটভ কাঠামো কীভাবে কাজ করে, এটি তার একটি কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ।
     



    অধ্যায় ১৭: একটি সুস্থ পরিবর্তনের সম্ভাবনা না কি চরম বিপর্যয়?


    এই স্ট্রেস টেষ্ট আমাদের কী জানাচ্ছে 


    প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব একটি প্রশ্ন দিয়ে শেষ হয়েছিল—আমেরিকা এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা কি একটি শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বহুমুখী ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে, না কি হুট করে সবকিছু ভেঙে পড়বে? বর্তমান সংকট সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি ডেটা পয়েন্ট।
    এই পরীক্ষাটি দেখাচ্ছে যে বর্তমান কাঠামোটি কিছু জায়গায় অনেক বেশি ভঙ্গুর। হরমুজ প্রণালীর মতো ভৌগোলিক পথগুলো অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে। ডলারের বাইরে গড়ে ওঠা বিকল্প ব্যবস্থাগুলো সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। জোটগুলোর সংহতি রক্ষা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। আর জ্বালানি বাজার ও রাজনীতির মধ্যেকার যে ফিডব্যাক লুপ, তা আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে।

    একই সাথে, প্রিজনার্স ডিলেমার মূল শক্তি এখনো টিকে আছে। আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার আন্তঃনির্ভরশীলতা, জ্বালানি উৎপাদনকারী ও ডলার ব্যবস্থার সম্পর্ক এবং পুঁজি ও স্থিতিশীলতার সম্পর্ক এখনও ছিন্ন হয়ে যায়নি। বিশ্বব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার খরচ এখনও প্রতিটি বড় পক্ষের জন্য অসহনীয়। এটাই হলো বর্তমান কাঠামোর এক ধরণের 'রেজিলিয়েন্স' বা টিকে থাকার ক্ষমতা—এটি কোনো মজবুত উপাদানের শক্তি নয়, বরং এটি হলো পারস্পরিক ধ্বংসের ভয়, যা কোনো পক্ষকেই চরম সিদ্ধান্ত নিতে দিচ্ছে না।

    এখনও যে সুযোগ অবশিষ্ট আছে
    এটি যেমন আশার কথা, তেমনই উদ্বেগেরও। এটি আশ্বস্তকারী কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সবচাইতে ভয়াবহ পরিণতিগুলো—যেমন ডলারের আকস্মিক ধস, একাধিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের যুগপৎ বিপর্যয়, কিংবা ২০০৮ সালের চেয়েও বড় কোনো আর্থিক সংকট — চরম আতঙ্কবাদীদের (alarmist) বিশ্লেষণের তুলনায় ঘটার সম্ভাবনা বেশ কম। এই ধরনের পরিণতিগুলোর বিরুদ্ধে কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা (structural deterrence) অত্যন্ত বাস্তব, এবং এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চেয়ে বরং পারস্পরিক স্বার্থ মাধ্যমে কাজ করে, যা একে যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার তুলনায় অধিক শক্তিশালী করে তোলে।
    কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, পারস্পরিক ভয়ের ওপর টিকে থাকা কোনো ব্যবস্থা আসলে সমস্যার সমাধান করে না। এটি কেবল সমস্যাগুলোকে জমিয়ে রাখে এবং পরিবর্তনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে বলা সেই ‘সফট ল্যান্ডিং’ বা সুষ্ঠু পরিবর্তনের সুযোগ চিরকাল খোলা থাকবে না। প্রতিটি সংকট যা আলোচনার বদলে সামরিক শক্তির মাধ্যমে সমাধান করা হয়, তা এই সুযোগকে একটু করে কমিয়ে দেয়।
    এই সিরিজের শুরুতে বলা হয়েছিল—আপনি যদি দেখতে জানেন, তবে পুরো খেলাটি আপনার চোখের সামনেই আছে। ২০২৬ সালের এই পরীক্ষাটি আমাদের এই প্রশ্নই করছে না যে কাঠামোটি বদলাবে কি না; কারণ পরিবর্তন অনিবার্য। আসল প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি পরিকল্পিত হবে না কি বিশৃঙ্খল? এটি কি আলোচনার মাধ্যমে হবে না কি চাপের মুখে হঠাৎ করে ঘটবে? 
    এই প্রশ্নের সমাধান নিজে নিজে হবে না। এর জন্য নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে পুঁজি বিনিয়োগকারী এবং সচেতন নাগরিক—প্রত্যেক স্তরে এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন, যারা এই ব্যবস্থাকে বা সিস্টেমটিকে এতটাই স্বচ্ছভাবে দেখতে সক্ষম যে তারা সততার সাথে এর সাথে যুক্ত হতে পারেন। স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সিস্টেম-স্তরের এই সম্পৃক্ততাই শেষ পর্যন্ত 'প্রিজনারস ডিলেমা'-কে একটি সহযোগিতামূলক খেলায় রূপান্তর করার একমাত্র হাতিয়ার। 
    এই লেখাটি শুরু হয়েছিল বিবর্তনীয় প্রবৃত্তি নিয়ে একটি প্রশ্নের মাধ্যমে: আমাদের আদিম গোত্রীয় প্রতিযোগিতার তাড়না এবং সেই প্রবৃত্তিকে পারস্পরিক ধ্বংসের পরিবর্তে সহযোগিতার দিকে পরিচালিত করার জন্য আমরা যে অসম্পূর্ণ ও ক্রমবর্দ্ধমান কাঠামো তৈরি করেছি, তা নিয়ে। ২০২৬ সালের এই 'স্ট্রেস টেস্ট' আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই কাঠামোগুলি নিজে থেকে টিকে থাকে না। প্রতি প্রজন্মে এমন কিছু মানুষের সুচিন্তিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়, যারা এই ব্যবস্থাটি কী করে কাজ করে তা বোঝেন এবং যা কার্যকর তা সংরক্ষণ করার ও যা অকেজো তা সংস্কার করার ক্ষমতা রাখেন।
    বৈশ্বিক ক্ষমতার এই স্থাপত্য তাদের কাছে গোপন নয় যারা এটি দেখতে ইচ্ছুক। প্রশ্নটি সবসময় এটাই যে—আমাদের মধ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষ কি এটি দেখতে ইচ্ছুক? এবং দেখার পর, আমাদের বিবর্তনীয় তাড়না থেকে উদ্ভূত স্বল্পমেয়াদী যুক্তির পরিবর্তে, এই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে আমরা কতটা প্রস্তুত! 
    [ক্রমশঃ] 
     


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ৬৪১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৯739743
  • চলবে
  • Debanjan Banerjee | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:২২739745
  • লেখককে অনেক ধন্যবাদ সময়োপযোগী ও অত্যন্ত পরিশ্রম করে একটি বৰ্তমান সময়ের জন্যে প্রাসঙ্গিক লেখা উপহার দেবার জন্যে | এই যুদ্ধের মূল কারণটি হচ্ছে লেখকের ভাষাতে "'বেগিন ডকট্রিন' (Begin Doctrine) —অর্থাৎ প্রতিবেশী কোনো শত্রু রাষ্ট্রকে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে না দেওয়ার নীতি। এটি কোনো আবেগপ্রবণ পছন্দ নয়, এটি একটি যৌক্তিক হিসেব।" কিন্তু তাহলে কি যুদ্ধ থামাবার একমাত্র উপায় যাতে ইস্রাঈল এই ধরণের রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় ? কিভাবে সেটি হতে পারে বাস্তব ক্ষেত্রে ? ইরান হয়তো আম্রিকার সঙ্গে একটা ডিল করেও নিতে পারতো হয়তো পেট্রোডলার নিয়েও একটা চুক্তি হতেই পারতো গত দুইবছরে কিন্তু ইসরাইলী নীতির জন্যই সেটি সম্ভব নয় যেটি লেখক বলেছেন | আচ্ছা তাহলে কি শুধুমাত্র ইসরাইলী Begin Doctrineনীতির জন্যেই এই পেট্রোডলারের সিস্টেমের মধ্যে এসব ফাটল দেখা যাচ্ছে এবং এখানে তাহলে এই পেট্রোডলার সিস্টেমের সামনে কি কোন সিস্টেমিক ইনসেনটিভ নেই বা ছিলোনা ইস্রাঈলকে নিরত করবার জন্যে ?
  • dc | 42.*.*.* | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:৪৬739746
  • এই পর্বটাও ভালো লাগলো। দুটো পয়েন্ট মনে হয় আলোচনার যোগ্য।
     
    প্রথম, দেবজিৎবাবু বলেছেন বর্তমান ইরান যুদ্ধ পেট্রোডলার সিস্টেমের স্ট্রেস টেস্টের মতো। আমার মতে তা নয়। আমার মনে একটা প্রশ্ন আসে, ট্রাম্পের বদলে অন্য কোন রিপাবলিকান বা ডেমোক্র‌্যাট প্রেসিডেন্ট কি ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু করতো? আমার মনে হয় না, কারন যেটা প্রায় সকলেই বলছেন, এটা হলো ওয়ার অফ চয়েস। যার জন্য নেটো এই যুদ্ধে আমেরিকার পাশে নেই, সাউথ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশরাও ডাকা সত্ত্বেও যোগ দেয়নি। মানে ওয়েস্টার্ন অ্যালায়েন্স এই যুদ্ধটা চাইছিল না, অ্যামেরিকাতেও থিংক ট্যাংকগুলো বোধায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সেভাবে উৎসাহ দেয়নি। যুদ্ধটা শুরু হয়েছে আর এখনও চলছে শুধুমাত্র ট্রাম্পের ইচ্ছেয়। অন্য কেউ এই যুদ্ধের জন্য প্ল্যান করেনি, এই যুদ্ধ চালিয়েও নিয়ে যেতে চায়না। সেইজন্য, "এটি এমন একটি মুহূর্ত যখন প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত কাঠামোগত দ্বন্দগুলো — বিশেষ করে ডলার-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা এবং তার উদীয়মান বিকল্পগুলোর মধ্যেকার দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন — একটি তীব্র সংঘাতের রূপ নিয়েছে" - এখানে আমি একমত না।
     
    দ্বিতীয় কথা হলো, ইরানের অবস্থান, মানে ইরানের অটোক্রেটিক শাসকদের (আয়াতোল্লাদের) অবস্থান যদি দেখি, তাহলে অনেক দশক ধরেই তারা রিজিওনাল পাওয়ার, আর তারা সেইমতো রিজিওনাল এনফোর্সমেন্ট স্ট্রাকচার তৈরি করেছে। মিডল ইস্টে সৌদি আরব, ইরান, আর ইরাকের সংঘাত বহু দশকের, ইরাক পরাজিত হওয়ার পর সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি আর ইরানের মধ্যে। আর এই পাওয়ার ব্যালেন্সের খেলা নিজেদের পক্ষে টানার জন্য ইরানের শাসকরা বহু দশক ধরে বেশ কয়েকটা প্রক্সি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যেমন হামাস, হেজবোল্লা, হুথি ইত্যাদিরা। সেইজন্য, ২০২৩ সালে ইজরায়েল আর সৌদিরা যখন চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছিল, তখন হামাস ইজরায়েলকে আক্রমন করে। তারপর থেকে প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলের গণহত্যা, আগের বছর ইরানের অ্যামেরিকান বম্বিং, লেবানন ইনকারশান ইত্যাদিগুলো মোটামুটি চেন রিয়্যাকশানের মতো চলছে। কাজেই এখন যে ইরান যুদ্ধ চলছে তার সাথে ওভারল ডলার ডায়নামিক্স আমার মতে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। এই ইরান যুদ্ধ এমনিতেও বোধায় কয়েক মাসের মধ্যে থেমে যাবে। এটাকে স্ট্রেস টেস্ট বলাটা কি ঠিক হবে? বোধায় না।
  • Debanjan Banerjee | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৫৭739748
  • লেখকের প্রতি আরেকটা প্রশ্ন | ইরান ও আম্রিকার মধ্যে ২০১৫ সালেই তো একটা পরমাণু চুক্তি হয়েছিলো যেটিকে হয়তো এক্সটেন্ড করে পেট্রোডলারের মধ্যেও ইরানকে ইন্টিগ্রেট করে নেওয়া যেত | trita parsi তার "Unholy Alliance" বইটাতে এটাই বলেছেন | সত্যি কথা বলতেকি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে সেসময়ে রূহানী প্রশাসনের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা এধরণের চুক্তির পক্ষে ছিলেন | তৎকালীন ওবামা প্রশাসন সেটি করতে পারেনি মূলতঃ ইসরাইলী লবির কারণে পরে ট্রাম্পের উত্থানও ঘটানো হয় মূলতঃ এই ইরান ও আম্রিকার পরমাণু চুক্তি বাতিল করবার জন্যে | এখন ঘটনা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে পেট্রোডলার সিস্টেমের স্ট্রেস টেস্টিংয়ের মূল কারণটাই হচ্ছে ইসরাইলী বেগিন ডক্ট্রিন যেটি মূলতঃ military coercion এর উপরে ভিত্তি করেই তৈরী | তাহলে পেট্রোডলার সিস্টেম এর মূল অন্তর্দ্বন্দ্ব (কন্ট্রাডিকশন) বলতে এমুহুর্তে ইসরাইলী যুদ্ধনীতি কে দায়ী করা যায় ?
  • Debajit Ghosh | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:২৫739749
  • @দেবাঞ্জন

    Thankyou for this careful reading and the question. প্রথম কমেন্ট এর রেপ্লি করছি ইংলিশ এ। বাকি কমেন্ট গুলো কাল রেস্পন্ড করবো (bit tied up rest of the evening)

    I want to gently correct a misreading that the framing may have invited.
    The Begin Doctrine is presented in Part III as one actor's structural incentive within a larger system, not as the root cause of the crisis. The series argues throughout that no single actor, doctrine, or decision produces systemic outcomes. The petrodollar architecture, Iran/China,s parallel payment infrastructure, China's strategic patience, and Israel's security calculus are all simultaneously operative forces. Attributing the crisis to any single one of them would contradict the central argument of all three parts.

    On your deeper question, whether the petrodollar system lacks incentives to restrain Israel, this is genuinely interesting and the answer is: partially. The system has a strong incentive to prevent the kind of prolonged disruption that raises oil above $100 for years and risks a global recession, which is precisely why Brent at $110 and climbing is producing visible anxiety even among those who broadly support the operation. That is the system pushing back through market signals rather than political ones.

    But the system's incentive is stability of denomination and flow, not any particular geopolitical outcome. It can accommodate significant conflict as long as oil continues to move and price in dollars. The threshold at which the system's stabilising logic actively constrains military escalation is higher than most people assume, and we may not have reached it yet.
    Part III does not offer a resolution to this. It maps the structural forces. The question of how those forces ultimately resolve is what Part IV attempts to address, (hopefully coming weekend, courtesy: সুকি )
  • dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:৪১739750
  • "But the system's incentive is stability of denomination and flow, not any particular geopolitical outcome. It can accommodate significant conflict as long as oil continues to move and price in dollars. The threshold at which the system's stabilising logic actively constrains military escalation is higher than most people assume, and we may not have reached it yet." একমত।
     
    আমি আগের পোস্টে বলতে চেয়েছিলাম, অ্যামেরিকা-ইরান যুদ্ধের দুই বেলিজারেন্ট, ট্রাম্প আর আয়াতোল্লা (যে টপকে গেছে আর যে এখন আছে), দুজনেই এক্সিডিংলি ইর‌্যাশনাল। কাজেই এই দুই অ্যাক্টরকে দিয়ে বোধায় পেট্রো-ডলারের স্ট্রেস টেস্টি থিওরি যাচাই করা ঠিক না। আমার মনে হয় এই যুদ্ধটার সেরকম কোন র‌্যাশনাল লজিক নেই, তাই এটাকে আউটলায়ার হিসাবে দেখা যেতে পারে।
     
    (বিটিডাব্লু, প্রিজনার্স ডাইলেমার বা গেম থিওরির যে কোন গেম এর আন্ডারলাইং অ্যাসাম্পশান কিন্তু র‌্যাশনাল অ্যাক্টর্স। এটা নিয়ে ভেবে রেখেছি কিছু লিখবো, তবে এই সিরিজ শেষ হলে।)
  • Debanjan Banerjee | 2409:*:*:*:*:*:*:* | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:২৭739751
  • অনেক ধন্যবাদ দেবজিৎবাবু l আমি মনে করি এটিও একটি সঙ্গত প্রশ্ন যে এই যুদ্ধে কেবলমাত্র ইরানেরই কি rational objectives আছে ? আম্রিকা বা ইস্রাঈল এদের কারুরই যে সেভাবে rational objectives আছে কিনা বোঝাই যাচ্ছেনা l ইস্রাঈল বা ট্রাম্প এই যুদ্ধে eschatological speculation motive দেখাচ্ছে l the tragedy is যে ইরানই কেবল একমাত্র rational motivation দেখাচ্ছে এখানে যুদ্ধ থামবার কোনো সঙ্গত সিস্টেমিক ইনিশিয়েটিভ নেওয়া সম্ভব নয় যেহেতু main belligerents আম্রিকা ইস্রাঈল don't have rational objectives
  • হীরেন সিংহরায় | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৪৬739756
  • dc র প্রশ্নের উত্তরে
    আমার মনে একটা প্রশ্ন আসে, ট্রাম্পের বদলে অন্য কোন রিপাবলিকান বা ডেমোক্র‌্যাট প্রেসিডেন্ট কি ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু করতো? আমার মনে হয় না
     
    ডেমোক্র্যাটরা ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে মুখিয়ে ছিলেন। ইউ টিউবের ক্লিপ এখানে দিতে পারলাম না। তবে সেখানে গিয়ে দেখে নিতে পারেন।
     
     
  • albert banerjee | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৫৬739758
  • হীরেন সিংহরায় | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২১:০০739759
  • আপনার অসাধারণ তথ‍্য পূর্ণ লেখার জন‍্য অশেষ ধন্যবাদ। অনেক কিছু জানতে পারছি।
     
    ফাঁকফোকরের মাধ্যমে চলা একটি ব্যবস্থা
     
    এই পর্বটি আমার কাছে যাকে বলে too close to home!
     
    আটের দশকে আপারথাইডের অপরাধে ব্রাত‍্য দক্ষিন আফ্রিকায় তেল পৌঁছুান হতো ঘুর পথে। কুয়েতের কার্গোর বিল অফ লেডিং হলো সিংগাপুর পোর্টে অফ টেকারের নামে, তারা কাগুজে কমপানি মাত্র, স্রেফ ভাঁওতা। জাহাজ যখন মাঝ সাগরে, সেই বিল হস্তান্তর হলো নতুন ক্রেতার পোর্ট ডারবান। এর চলতি নাম থার্ড কান্ট্রি ট্রেড।
     
    এই ধরনের ট্রান্সফার অত্যন্ত প্রচলিত। তেল বিক্রি হয় ৩০ দিনের ফ্রি ক্রেডিটে। কার্গোর মালিকানা দশবার বদলাতে পারে আইনি ভাবে। কিন্তু দক্ষিন আফরিকার ক্ষেত্রে রীতিমত ধুম্রজাল সৃষ্টি করা হতো।
     
     
  • dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২১:০১739760
  • হীরেনবাবু, এই ক্লিপটা বহু বহু পুরনো, বলছে হিলারি ক্লিন্টন ইরানকে ২০০৮ সালে অ্যাটাক করতে চেয়েছিলেন। তারপর ২০০৯ সালে ওবামা প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন এবং হিলারি সেক্রেটারি অফ স্টেট হয়েছিলেন। ওবামা ইরানের সাথে নিউক্লিয়ার ডিল করতে চেয়েছিলেন, যার তীব্র বিরোধিতা করেছিল রিপাবলিকানরা আর বিশেষ করে ট্রাম্প (সেই বিরোধিতার কিছু যৌক্তিক আর কিছু অযৌক্তিক কারন ছিল, সে অন্য গল্প)। কাজেই হিলারি বা "ডেমোক্র্যাটরা ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে মুখিয়ে ছিলেন" কিনা সেকথা বোধায় জোর দিয়ে বলা যায়না।
     
    ট্রাম্প প্রথম টার্মে কাসেম সুলেমানিকে উড়িয়ে দিয়েছিল, সে অবশ্য ওবামাও অনেককে উড়িয়েছিল।
     
    তবে আমার প্রশ্নটা আজকে, বা ২০২৬ সালের সাপেক্ষে। ২০২৬ এ যদি রিপাবলিকান বা ডেমোক্র‌্যাট কেউ প্রেসিডেন্ট হতেন, তিনি কি ইরান অ্যাটাক করতেন? আমার মতে ৯৯% প্রোবাবিলিটি না। আমার মনে হয় ট্রাম্প ভেনিজুয়েলা অ্যাটাক করেছিল এপস্টিন ফাইল থেকে নজর ঘোরাতে, আর মিডটার্মের আগে নিজের বেসকে এনার্জাইস করতে। ভেনিজুয়েলা অভিযান অসাধারন সফল হওয়ার পর ট্রাম্প ভাবে যে ইরানকেও একই ভাবে দুতিন সপ্তাহের মধ্যে কব্জা করে ফেলতে পারবে, তাই ইরানকেও অ্যাটাক করে।
  • হীরেন সিংহরায় | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২১:১৩739761
  • রুজেভেলট কেনেডি নিক্সন থেকে আর কোন প্রেসিডেন্ট ইসরাইলের সংগে এমন ধারা মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন নি। আজ আইপ‍্যাক লবি অসম্ভব শক্তিশালী। হাওয়া কোনদিকে যতো বলা শক্ত। হিলারির পুরনো ক্লিপ থেকে বোঝা যায় ইরান আক্রমণ করতে তাঁর কোন অনিচ্ছা ছিল না। এপসটাইন ফাইলের অনেক আগেই।
    ওবামাকে ইজরায়েল ভজাতে পারে নি। হিলারি হলে এটা হতো বহু বছর আগেই।
  • dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২১:২৩739764
  • অনিচ্ছা না থাকা আর অ্যাকচুয়াল আক্রমন করা, দুটো এক না :-)
     
    হিলার সেক্রেটারি অফ স্টেট ছিলেন। তিনি কি আরেক সেক্রেটারি অফ স্টেট কন্ডোলিজা রাইস এর মতো হক ছিলেন? আমার মতে না, তবে সেটা আমার মত। তবে ট্রাম্প ছাড়া অন্য কোন প্রেসিডেন্টই, ডেমোক্র‌্যাট বা রিপাবলিকান, ট্রাম্পের মতো ইর‌্যাশনাল না। ট্রাম্প এমনকি নিজের ইনটলিজেন্স ব্রিফিংও শোনে না। কাজেই অন্য কেউ প্রেসিডেন্ট হলে এই ডিসিশান হতো না বলেই মনে হয়।
  • Debanjan Banerjee | 103.*.*.* | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২১:২৮739765
  • আমার নিজের মনে হয় এই পেট্রোডলার সিস্টেমের মূল কন্ট্রাডিকশন হচ্ছে যে এখানে assumption ছিলো যে আম্রিকি লিডারশীপ সবসময়েই rational ডিসিশন মেকিং করবে কিন্তু আম্রিকি প্রেসিডেন্ট যে ট্রাম্পের মত কেউ হবে এবং যার উপরে AIPAC এপস্টিন ফাইলস ইত্যাদির চাপে সে এরকম সারা বিশ্বের আর্থিক সিস্টেমকেই বিপদে ফেলে দেবে কেউই ভাবতে পারেনি | পেট্রোডলার সিস্টেমের নিজের মধ্যে থেকেও AIPAC লবি নেতানিয়াহু বা ট্রাম্পের মত কোনো irrational actor এর কোনো correcting protective mechanism নেই এটাও খুবই নিরাশাজনক ব্যাপার | ট্রাম্প আর নিতানিয়াহু এখন তো পরমাণু বোমা ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছে | আম্রিকি মিলিটারি যদি ট্রাম্পের কথা না শোনে তাহলেই রক্ষা এখন
  • Debanjan Banerjee | 103.*.*.* | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২১:৪০739766
  • আমি হিরেনদার সঙ্গে একমত | হিলারী লিবিয়া আর সিরিয়াতে CIA পরিচালিত গৃহযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন | লিবিয়া সম্বন্ধে হিলারি বলেছিলেন যে, "we came we saw Gaddafi died" ইরানের যুদ্ধের পক্ষেও ছিলেন বলাই বাহুল্য | নেতানিয়াহুর বহুদিন থেকেই জাবোটিনস্কি নীতি iron wall এর উপরে বিশ্বাস যেটাকে লেখক বলছেন বেগিন ডক্ট্রিন | এনিয়ে আমি কয়েকদিন আগেই গুরুতে খেরোর খাতায় লিখেছি | https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=34641
    নেতানিয়াহুর বহুদিন আগে থেকেই প্যাক্স জুডিয়াকা (নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত একটা সাম্রাজ্য তৈরী ) হচ্ছে টার্গেট | আম্রিকি রাষ্ট্রপতিরা যেমন বুশ ট্রাম্প হিলারি নেতানিয়াহুর পক্ষেই কাজ করেছেন | ট্রাম্প অবশ্য সবচেয়ে ভয়াবহ | এখন AIPAC লবি এতো শক্তিশালী যে আম্রিকি রাষ্ট্রপতির পক্ষে অন্য কিছু করাই অসম্ভব
  • Debajit Ghosh | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ২২:২২739790
  • অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক ও চিন্তাশীল মন্তব্যের জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আগামীকাল আমি আমার নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরব। আজ আমি ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম।
  • Debajit Ghosh | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩৯739810
  • প্রিয় সবাই, আপনাদের সমস্ত মন্তব্যের জন্য আবারও ধন্যবাদ। হিরেন বাবু, ডিসি (DC) এবং দেবঞ্জন, এঁদের উত্থাপিত মূল বিষয়গুলোকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:

    ১. "অযৌক্তিক কর্তা" (Irrational Actor) সমস্যা
    মন্তব্যকারীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, বর্তমান সংঘাতটি একটি "ব্যতিক্রমী ঘটনা" (outlier); কারণ এই সংঘাতের প্রধান পক্ষদ্বয়—ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু, মৌলিকভাবেই অযৌক্তিক (Irrational)। আপনারা মত প্রকাশ করেছেন যে, জাতীয় বা অর্থনৈতিক যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য, যেমন "এপস্টাইন ফাইল" সংক্রান্ত বিতর্ক থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া কিংবা পরকালতাত্ত্বিক (end-times) বিশ্বাস দ্বারা তাড়িত হওয়া, এই ব্যবস্থাটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

    ২. কাঠামোগত সুরক্ষাকবচের অভাব (Lack of Systemic Gaurdrails)
    দেবঞ্জন উল্লেখ করেছেন যে, পেট্রোডলার ব্যবস্থাটি এই পূর্বধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, মার্কিন নেতৃত্ব নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সর্বদা যৌক্তিকভাবেই কাজ করবে। তিনি যুক্তি দেন যে, এই ব্যবস্থায় এমন কোনো "অন্তর্নিহিত সংশোধনমূলক বা সুরক্ষামূলক কার্যপদ্ধতি" নেই, যা এমন কোনো নেতাকে প্রতিহত করতে পারে—যিনি কোনো বিশেষ লবির (যেমন: AIPAC) স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে পুরো ব্যবস্থাটিকেই ধ্বংস করে দিতে প্রস্তুত।

    ৩. দ্বিদলীয় হস্তক্ষেপবাদ (Bipartisan Interventionism)
    হিরেন বাবু এবং দেবঞ্জন এই ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিটি কেবলই একটি "ট্রাম্প-কেন্দ্রিক" সমস্যা। তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের ওপর আক্রমণ চালানো কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আকাঙ্ক্ষাটি ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের এবং দ্বিদলীয়ভাবে সমর্থিত একটি প্রবণতা; এর প্রমাণ হিসেবে তাঁরা লিবিয়া ও সিরিয়া প্রসঙ্গে হিলারি ক্লিনটনের অতীতের বাগাড়ম্বর ও গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন।

    যদিও আপনাদের মন্তব্যগুলো মূলত ব্যক্তিগত কর্তাসত্তা (individual agency) এবং অযৌক্তিক (Irrational) আচরণের ওপর আলোকপাত করেছে, তবুও একজন কাঠামোগত বিশ্লেষক হিসেবে, যিনি এই ব্যবস্থারই অভ্যন্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন—আমি যুক্তি দেব যে, এই ব্যবস্থাটিই মূলত ব্যক্তিগত কর্তাদের বা অভিনেতাদের সামনে উপলব্ধ পছন্দের সীমানা নির্ধারণ করে দেয় (The system defines the limit of choice for individual actors)। নিচে আমি ওপরের তিনটি বিষয়, যা আমি আপনাদের মন্তব্য থেকে সারসংক্ষেপ হিসেবে আহরণ করতে পেরেছি, সে সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরব।
  • Debajit Ghosh | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৩739811
  • অযৌক্তিকতা প্রসঙ্গে (On Irrationality of individual actors):
     
    যদিও আমি স্বীকার করি যে, কোনো একক ব্যক্তি বা কর্তা "পরকালতাত্ত্বিক জল্পনা" (eschatological speculation) কিংবা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন, তবুও আমার মূল প্রতিপাদ্য হলো, সম্পর্কচ্ছেদের বা বিচ্ছেদের যে বিপুল মূল্য, তা একটি দৃশ্যমান লাগামের মতোই কাজ করে। আমার যুক্তি হলো, এই ব্যবস্থাটি নেতাদের নৈতিকতার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তাদের উপযোগিতার ওপরই নির্ভরশীল। এমনকি একজন অযৌক্তিক নেতাকেও তার সেনাবাহিনী কিংবা কোনো লবিকে অর্থ প্রদানের জন্য একটি সচল মুদ্রাব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। সেই "অদৃশ্য রেফারিরা" (Invisible Referees) কোনো নেতার মানসিক সুস্থতা বিচার করেন না; তারা কেবল ঋণের সুদের হার বা মূল্য এমনভাবে সমন্বয় করতে থাকেন, যতক্ষণ না ওই নেতার হাতে থাকা বিকল্পগুলোর পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে। একজন "অযৌক্তিক" নেতা হয়তো সেই লাগাম ধরে প্রবল টান দিতে পারেন; কিন্তু যখন বৈশ্বিক আর্থিক "ফাঁস" বা চক্রটি ক্রমশ আঁটসাঁট হতে শুরু করে, অর্থাৎ যখন ঋণের খরচ আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে এবং ডলারের অপরিহার্যতা হুমকির মুখে পড়ে, তখন প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে আলোচিত সেই "অদৃশ্য রেফারিদের" পক্ষ থেকে আসা প্রতিরোধ বা পাল্টা চাপ একটি অটল প্রাচীরে পরিণত হয়।
  • Debajit Ghosh | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৩739812
  • রক্ষাকবচ প্রসঙ্গে (Lack অফ Gaurdrails):
     
    দেবঞ্জন ঠিকই বলেছেন যে একজন অযৌক্তিক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থার কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি রক্ষাকবচ নেই। তবে, এর অনানুষ্ঠানিক আর্থিক রক্ষাকবচ রয়েছে। সংঘাতটি যে "থেমে যায়" বা "অসম্পূর্ণভাবে থেমে যায়" তার কারণ হলো, যখনই কোনো আক্রমণ বিশ্ব বাণিজ্যের প্রকৃত কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে, তখনই অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া চক্র, যাকে আমি "রাজস্ব হিসাব" (Fiscal Arithmatic) বলি, পিছু হটতে বাধ্য করে। এই ব্যবস্থার "সংশোধনমূলক প্রক্রিয়া" হলো সেই যন্ত্রণা যা এটি সংশ্লিষ্ট পক্ষের শাসন করার বা তাদের সামরিক বাহিনীকে অর্থায়ন করার ক্ষমতার ওপর চাপিয়ে দেয়।
     
    এই পর্বে আমি আরও যা বলতে চাই তা হলো, আমরা একটি সমান্তরাল বিশ্বব্যবস্থার পরীক্ষামূলক পর্যায় দেখছি। ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথমবার তেলের একটি বড় প্রবাহ সফলভাবে ডলার এবং পশ্চিমা সুরক্ষাব্যবস্থা (লয়েডস অফ লন্ডন) উভয়কেই বড় আকারে পাশ কাটিয়ে গেছে(Shadow fleets, CIPS, teapot refinery etc as explained in the article)। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে এটি এখনও সেই সীমা অতিক্রম করতে পারেনি, তবে এই লড়াই চলছেই।
  • Debajit Ghosh | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৮739813
  • দ্বিদলীয় ঐকমত্য প্রসঙ্গে (ও Bipartisanship):
     
    হিরেন বাবু যুদ্ধের প্রতি যে দ্বিদলীয় ‘উন্মাদনার’ কথা উল্লেখ করেছেন, তা আসলে আমার যুক্তিকেই প্রমাণ করে। উভয় পক্ষের দশকের পর দশক ধরে চলা বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও, ‘হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্তই রয়ে গেছে এবং তেলের লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ডলারই বহাল আছে। নেতারা হয়তো এই ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে চান; কিন্তু তারা দেখতে পান যে, তাদের সামনে সম্ভাব্য ফলাফলের যে পরিসরটি উন্মুক্ত রয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে যতটা প্রশস্ত মনে হয়, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি সীমিত। তাই তারা পিছু হটেন এবং বিদ্যমান ব্যবস্থাটি অটুটই থেকে যায়।
    এই ব্যবস্থাটি টিকে থাকার মতো যথেষ্ট স্থিতিস্থাপক, যতক্ষণ না এটি ভেঙে পড়ে (তবে সেই সময়টি এখনো আসেনি)।
  • Debajit Ghosh | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০৫739814
  • সবকিছুর উত্তর বাংলায় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কোনো ভুলত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন।
    আজ 'Founding Fuel' এখানে আমার নিবন্ধগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করেছে।
     
    https://foundingfuel.com/article/the-system-holds-until-it-doesnt
    সময় পেলে পড়ে ফিডব্যাক /ক্রিটিক দিলে ভালো লাগবে
  • dc | 171.*.*.* | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:১১739815
  • দেবজিৎবাবু, মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
     
    "কারণ এই সংঘাতের প্রধান পক্ষদ্বয়—ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু, মৌলিকভাবেই অযৌক্তিক (Irrational)"
     
    এখানে একটু ভুল হয়েছে। আমি বলেছি ট্রাম্প এবং খামেনেই, দুজনেই ইর‌্যাশনাল। নেতানিয়াহুকে বলিনি। এমনিতে মানুষমাত্রেই ইর‌্যাশনাল, সে নিয়ে পুরো একটা বিষয়ই আছে (বিহেভিয়রাল ইকনমিক্স), কিন্তু ট্রাম্প আর খামেনেইকে বিশেষভাবে ইর‌্যাশনাল বলেছি, কারন কারন এই দুজনের ডিসিশান নেওয়ার পদ্ধতি সাধারন দেশনেতাদের থেকে অনেকটা অন্যরকম। ট্রাম্প ভয়ানক বেশী ইমপালসিভ, প্রোন টু এক্সেস অফ ইমোশানস, আর এক্সিবিশানিস্ট। ফলে এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা আর কোন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের নেওয়ার সম্ভাবনা কম (রিপাবলিকান বা ডেমোক্র‌্যাট যে দলেরই প্রেসিডেন্ট হোক)। যেমন, কাতারের থেকে ৭৪৭ গিফট নেওয়া, পুটিনকে আলাস্কায় রেড কার্পেট ওয়েলকাম করা - এগুলো অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্শিয়াল অপটিক্স এর পরিপন্থী। এগুলো অ্যামেরিকার লং টার্ম সফট পাওয়ার প্রোজেকশানের বিরুদ্ধে যায়, যার ফলে অন্য কোন প্রেসিডেন্টই এগুলো করতে চাইবে না। সেরকরমই, ট্রাম্পের ইরান অভিযান অন্য কোন প্রেসিডেন্ট হলে হয়তো করতো না, তার কারন ইরানকে অ্যাটাক করার জন্য ট্রাম্প স্পষ্ট কোন কারন দিতে পারেনি, ফলে স্পষ্ট কোন ওয়ার অবজেক্টিভও নেই।
     
    আর খামেনেই, বা ইরানের আয়াতোল্লারা ইর‌্যাশনাল এইজন্য যে তাদের ক্ষমতায় থাকার প্রায় একমাত্র পন্থা হলো "ডেথ টু অ্যামেরিকা" আর "ডেথ টু ইজরায়েল"। আয়াতোল্লারা যদি নিজেদেরকে ইজরায়েলের জন্য এক্সিসটেন্সিয়াল থ্রেট হিসেবে প্রোজেক্ট করতে না পারে, তাহলে তাদের নিজেদের গদি টলে যাবে। নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে আর জনরোষ থেকে বাঁচতে আয়াতোল্লারা মাঝেমাঝেই নিজেদের দেশেরই কয়েক হাজার লোককে মারে। সেই জন্যই সৌদি আরব আর ইজরায়েল যখন ইকোনমিক প্যাক্ট এর জন্য এগোচ্ছিল তখন ইরানের প্রক্সি হামাসকে দিয়ে ইজরায়েলকে আক্রমন করায়।
     
    কিন্তু কথা হলো, অন্যদের তুলনায় বেশী ইর‌্যাশনাল অ্যাক্টর হলেও কি সত্যিই যা খুশী তাই করতে পারে? "এমনকি একজন অযৌক্তিক নেতাকেও তার সেনাবাহিনী কিংবা কোনো লবিকে অর্থ প্রদানের জন্য একটি সচল মুদ্রাব্যবস্থার প্রয়োজন হয়" - এখানে আপনার সাথে একমত। সেইজন্যই, যুদ্ধটা এখন কিছুটা ঝিমিয়ে এসেছে। ট্রাম্প বুঝতে পারছে যে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে মিডটার্মে হার অনিবার্য হয়ে পড়েছে, আর ইরানেও খামেনেইএর ছেলে বা রেভোলিউশনারি গার্ডের নেতৃত্ব চাইছে কিছুটা পুলব্যাক, যাতে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সামলে ওঠা যায়, প্রক্সি টেরর নেটওয়ার্ক আবার মজবুত করা যায়।
     
    আমি বলতে চেয়েছিলাম, আপনার এই প্রবন্ধের মূল বিষয়, অর্থাত ইন্টারন্যাশনাল ডলার হেগেমনি, তার স্ট্রেস টেস্ট বোধায় ইরান যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ খুব একটা বড়ো ইভেন্ট না, খুব বেশীদিন চলবে বলেও মনে হয়না, দুপক্ষই আরও কিছু মিসাইল ছুঁড়ে আর বক্তৃতা দিয়ে ক্ষান্ত দেবে। এর আগের একটা পর্বের কমেন্ট সেকশানে আমি ডলারের গ্রহণযোগ্যতার কিছু কারন লিখেছিলাম। আমার মতে সত্যিকারের স্ট্রেস টেস্ট হওয়ার দিকে আমরা যাবো যখন সেই কারনগুলো দুর্বল হয়ে আসবে, নাহলে নয়। আয়রনিকালি, ট্রাম্পের ডোমেস্টিক পলিসিসমূহ যদি পুরোপুরি ইমপ্লিমেন্ট করা হয়, তাহলে সেই স্ট্রেস টেস্ট এর সময়ও কাছে চলে আসবে :-) নট ওয়ার্স, বাট দ্য অ্যামেরিকান ইকোনমি - বিকজ ইট ইস অলওয়েজ দ্য ইকোনমি :-)
  • dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:৫২739817
  • সংক্ষেপে যদি লিখতে হয়ঃ পৃথিবীর সব স্টেট অ্যাক্টরা নিজেদের মতো করে গেম খেলছে, প্রক্সি যুদ্ধ চালাচ্ছে, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমন করছে তো হামাস ইজরায়েলকে অ্যাটাক করছে। আবার ইজরায়েল প্যালেস্টাইনে গণহত্যা চালাচ্ছে তো ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ইরান আক্রমন করছে। এগুলো সব একটা লেয়ারের খেলা। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম আর ডলারের আধিপত্যকে এগুলো সেভাবে এফেক্ট করে না, কারন গ্লোবাল ফাইন্যান্সের স্কোপ আরও বড়ো, সেটা লং টার্ম ইকোনমিক পারফর্ম্যান্সের সাথে জড়িত। তার চাকা ঘুরতে আরও সময় লাগবে।
  • Debajit Ghosh | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:০৩739818
  • ডিসি
    আপনার শেষ কমেন্ট এর সাথে আমি একমত। পার্ট৪ (শেষ পর্ব )তে আমি এক্সপেকটেড আউট কাম গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি।
  • dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৩২739819
  • চতুর্থ পর্ব পড়ার অপেক্ষায় আছি। আমার মনে হয়, এই প্রবন্ধের একটা মূল প্রেমিস যেহেতু প্রিজনার্স ডাইলেমা, তাই প্রবন্ধের শেষে র‌্যাশনাল বনাম ইর‌্যাশনাল গেমসমূহ নিয়ে আলোচনার হয়তো একটা স্কোপ আছে। দেখা যাক।
  • Debanjan Banerjee | 2409:*:*:*:*:*:*:* | ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:৫০739820
  • অসংখ্য ধন্যবাদ দেবজিৎ বাবু খুবই ধৈর্য ও অধ্যাবসায়ের সঙ্গে উত্তর দেবার l আমি ইরানকে ইর‌্যাশনাল স্টেট মনে করিনা একারণে যে ইরান কিন্তু বারবার চেষ্টা করেছে এই পেট্রোডলার সিস্টেমে integrated হতে তবে নিজের স্ট্র্যাটেজিক অটোনোমি বজায় রেখে অর্থাৎ নিজের বিদেশনীতির ও অর্থ্নীতির উপরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে l চীনের WTO তে অন্তর্ভুক্তি এক্ষেত্রে ইরানের কাছে মডেল l ট্রিটা পার্সি তার "unholy alliance" গ্রন্থে এই ব্যাপারটা বারবার দেখিয়েছেন যে শীতযুদ্ধের শেষ হবার পরপরই আয়াতোল্লাহ মহম্মদ খাতামী যখন প্রেসিডেন্ট বা আরো পরে প্রেসিডেন্ট রুহানীর সময়ে ২০১৫ সালে বা বর্তমানেও এখোন রাষ্ট্রপতি পেজেস্কিয়ানের আমলেও আম্রিকা ও ইরানের মধ্যে বারবারই আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে পেট্রোডলার সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করবার চেষ্টা দেখা গেছে কিন্তু একটা কারণেই সেই চেষ্টা কখনোই সফল হয়নি l সেই কারণটির নাম ........... ইস্রাঈল l ইস্রাঈল জন্মের সময় থেকেই এথ্নিক সুপ্রিমেসিস্ট রেসিস্ট স্টেট্, জাবোটিনস্কি iron wall তত্ত্ব বা পরবর্তীকালে বেগিন ডকট্রিন বা বর্তমানে গাজাতে জেনোসাইড এগুলো আসলে ইস্রাঈলের সেই নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত প্যাক্স জুডায়িকা সাম্রাজ্য তৈরীর দিকে পদক্ষেপ মাত্র l ইস্রাঈল আম্রিকা সম্পর্ক এই পেট্রোডলার সিস্টেমের কন্ট্রাডিকশন কে আরো বাড়ায় যেহেতু সিস্টেমের পক্ষে আম্রিকাকে হয়তো বা কোর্স কারেক্শন করবার মত সিস্টেমিক ইনিশিয়েটিভ আছে যেমন দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী ট্রেজারী বন্ড ইল্ড ইত্যাদি কিন্তু ইসরাঈল এর ইর‌্যাশনাল স্টেট্ বিহেভিয়ার এর কোনো এন্টিডোট এই সিস্টেমে নেই l এই যুদ্ধ শুরু হতেই ইসরাইলে শেয়ার মার্কেট লাফ দিয়ে বেড়ে গেছে কিন্তু সিস্ফায়ারের ঘোষণা আসতেই সেটা পড়ছে l কোনোভাবে ইসরাঈলকে আটকানো যাচ্ছেনা কোনোরকম ভাবেই নয় l
  • Debajit Ghosh | ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:২৮739833
  • @দেবাঞ্জন
     
    এই দৃষ্টিভঙ্গিটি তুলে ধরার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রতিটি যুদ্ধের অর্থায়ন ও সূচনা করেছেন সেইসব মানুষ, যারা বিশ্বের পুঁজি বা মূলধন নিয়ন্ত্রণ করেন। যদিও সময়ের সাথে সাথে এই নিয়ন্ত্রকদের মুখ বা পরিচয় পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও এর নেপথ্যের মূল যুক্তি—অর্থাৎ পুঁজির ওপর মুনাফা অর্জন এবং সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা (Access to resource, Return on investment and continuation of the same system to maintain hegemony) এই ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। এটি সত্য যে, সময়ের পরিক্রমায় এই বিভিন্ন কুশীলবদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং সামগ্রিক জটিলতা পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু এর আদি বা মৌলিক যুক্তিটি একই রয়ে গেছে।
     
    আমরা একে 'ব্রিটিশ ব্যবস্থা' (They started this exploitation, which America perfected later) নামেই ডাকি কিংবা আধুনিক 'ডলার-কেন্দ্রিক কাঠামো' নামেই অভিহিত করি না কেন—এর মূল নীতিটি কিন্তু একই: এই ব্যবস্থাটি টিকে থাকে মূলত বিভিন্ন কুশীলবদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে নিজের অস্তিত্ব বা ধারাবাহিকতার সাথে একীভূত করার মাধ্যমে। এখানে কোনো নৈতিকতা নেই। কোনো নীতিবোধ নেই। নেই কোনো আদর্শ। এর পুরো বিষয়টিই আবর্তিত হয় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কুশীলবদের (যেমনটি দ্বিতীয় পর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে) ব্যক্তিগত স্বার্থকে কেন্দ্র করে এবং কাঠামোগত প্রণোদনাগুলোর প্রতি একটি সুপরিকল্পিত ও হিসাব-নিকাশ করা প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে। আমরা বর্তমানে এক তীব্র 'চাপ-পরীক্ষার' (stress-testing) মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছি। যখন এই ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখার খরচ বা মূল্য, এর প্রধান নিয়ন্ত্রকদের প্রাপ্ত সুফলকে ছাপিয়ে যাবে—ঠিক তখনই আমরা একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার উত্থান প্রত্যক্ষ করব। যতক্ষণ না সেই সংকটসীমাটি অতিক্রম করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ব্যবস্থাটি তার নিজস্ব চক্র বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে এমনকি অত্যন্ত অযৌক্তিক ও আকস্মিক আঘাতগুলোকেও হজম করে চলতে থাকবে। ইরান যুদ্ধবিরতির ঘটনাটিতে আমরা ঠিক এমনটিই ঘটতে দেখেছি।
    ইস্রায়েল এই খেলার একটা প্লেয়ার। তাই আমার মনে হয়। যদিও এই নিয়ে আরো বিশদে আলোচনা করা যায়।
  • Debanjan Banerjee | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৬739845
  • অনেক ধন্যবাদ দেবজিৎ বাবু l আপনার এই কথাটা "যখন এই ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখার খরচ বা মূল্য, এর প্রধান নিয়ন্ত্রকদের প্রাপ্ত সুফলকে ছাপিয়ে যাবে—ঠিক তখনই আমরা একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার উত্থান প্রত্যক্ষ করব।" ভালো লাগলো l ঘটনা হচ্ছে সিস্টেমের পরিবর্তন না করে কি প্রধান নিয়ন্ত্রকদের পরিবর্তন ঘটিয়ে systemic continuity ঘটানো যেতে পারে এবং বিশ্বব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে ? দ্বিতীয়তঃ, ইরানের ক্ষেত্রে আমি আগেও বলেছি যে ইরানের মূল লক্ষ্য ছিলো যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক অটোনোমি বজায় রেখেই পেট্রোডলার সিস্টেমের মধ্যে integration এবঙ গত দু বছর ধরে ইরান সেই চেষ্টা করতে গিয়ে একতরফা ভাবে যুদ্ধের সম্মুখীন হয় l তাহলে কি পেট্রোডলার সিস্টেমের প্রধান নিয়ন্ত্রকদের কাছে যুদ্ধ বাধিয়ে সারা বিশ্বের আর্থিক সঙ্কট ঘটানোটা সহজতর মনে হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে ইরানের সিস্টেমে integration এর চেয়ে ? তৃতীয়তঃ কুশীলবদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে নিজের অস্তিত্ব বা ধারাবাহিকতার সাথে একীভূত করার পদ্ধতি কি ?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন