

অলংকরণ: রমিত
একটি গণতান্ত্রিক সরকার নানারকম সমস্যা তৈরি করে। তার কিছু, কখনোসখনো, বেশ কঠিন সমস্যা। প্রথমে ধরা যাক, সরকারের কাজ করার সঠিক ক্ষেত্র কী হবে – সেই সমস্যাটি। সেই একসময় যখন গ্রেট ব্রিটেন আর আয়ার্ল্যান্ড একত্রে একখানি সংসদ তৈরি করতো, আইরিশদের মনে হয়েছিল – তারা অবিচারের শিকার। আমার মতে, এমন মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা মেনে চললে, যদিও তখনও গণতন্ত্রই ছিল, কিন্তু গণতন্ত্রের এই সংস্করণে আয়ার্ল্যান্ড চিরকাল সংখ্যালঘু ছিল। সংসদকে নিজেদের কথা শোনানোর একমাত্র রাস্তা ছিল – সংসদের চোখের বালি হয়ে ওঠা।
গ্রেট ব্রিটেন আর দক্ষিণ আয়ার্ল্যান্ডের মতো যেসব জায়গায় বিভাজনের রেখাটি গাঢ়, গণতান্ত্রিক নীতি বলে – প্রতিটি পক্ষই নিজেদের ঘরের ঝামেলা নিজেরাই মেটাবে, অন্য পক্ষটির হস্তক্ষেপ ছাড়াই—সোজা কথায়, অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণ হতেই হবে। এর ভিত্তিতেই আমি মনে করি দক্ষিণ আয়ার্ল্যান্ডের নিজেদের পার্লামেন্টের দাবি সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। অদ্ভুত ব্যাপার হল, ঠিক এই একই যুক্তিতে যখন উত্তরের প্রোটেস্টান্টরা দক্ষিণ আয়ার্ল্যান্ডের থেকে স্বাধীনতা চাইলো, তখন তারা আর সে যুক্তি দেখতেই পেলো না! এ দাবির অস্তিত্বই কখনো দক্ষিণ আয়ার্ল্যান্ড স্বীকার করেনি। আমার মনে হয়, স্পষ্ট ভাষায় না হলেও, অন্তত মানসিকভাবে তাদের যুক্তি হবে, “দ্বিতীয় হেনরির সময় থেকে লয়েড জর্জের সময়াবধি আমরা ইংরেজ নিপীড়ন সহ্য করতে বাধ্য হয়েছি। এবার আমাদের নিপীড়ন করার সুযোগ এলে তা অবৈধ? আর, উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের ওপর নির্যাতন না চালালে আর কার ওপরই বা চালাবো?” এ যুক্তি হয়তো মানবিক, তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি, ঠিক যৌক্তিক নয়।
তবে উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের প্রতি আমার সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে – এমনটা ভাবারও কোনো কারণ নেই। যে অযৌক্তিক আচরণ দক্ষিণ আয়ার্ল্যান্ড তাদের প্রতি চালিয়ে গেছে, সেই একই কাজ উত্তরের আইরিশরা করে ফর্ম্যানা আর টাইরোন কাউন্টির সঙ্গে। আর যদি এই দুই কাউন্টিকে দক্ষিণে যোগ দিতে দেওয়া হয়, তবে তারা নিজেদের প্রোটেস্টান্ট জনগণকেও নিশ্চিত ছেড়ে কথা বলবে না।
এসব ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করা খুব কঠিন, কারণ এটুকু পরিষ্কার – কোনো গোষ্ঠীর আয়তন এক নির্দিষ্ট নিম্নসীমার চেয়ে ছোট হলে, তাকে আর স্বায়ত্ত্বশাসনের অধিকার দেওয়া যায় না। এই আয়তনটি ঠিক কী হওয়া উচিত, তা বিমূর্তভাবে বলা – এককথায় অসম্ভব। সাধারণভাবে বলা যায় – কোনো রাষ্ট্রের এক বড়োসড়ো জনগোষ্ঠী যদি বাকিদের সহমর্মিতা হারায়, তবে গণতন্ত্র দ্রুত তার কার্যকারিতা হারায়—যদি না বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়; তখন আবার প্রভাবশালী বড় গোষ্ঠীটি উগ্র হয়ে ওঠে আর ছোট দলটির মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।
যখন ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠীটি একটি বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ, তখন বিকেন্দ্রীকরণ একটা সমাধান হতেও পারে, কিন্তু যখন তারা গোটা রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তখন সমস্যা আরও অনেক বেশি। যে সব দেশে ইহুদিবিদ্বেষ এক জনপ্রিয় মনোভাব, সেখানে ইহুদিদের অবস্থা ঠিক এইরকম। ভারতে মুসলিমদের আর পাকিস্তানে হিন্দুদের অবস্থাও ঠিক তাই। আমেরিকায় কালো মানুষদের অবস্থাও এরকমই। এই সব ক-টি ক্ষেত্রে ‘ভৌগোলিক’ বিকেন্দ্রীকরণ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব না। এসব ক্ষেত্রে, যদি জনমধ্যে সহিষ্ণুতার বোধ চারিয়ে না যায়, তবে গণতন্ত্রের সাফল্যের কোনো আশা নেই।
গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্যে অনেকভাবেই সহিষ্ণুতা অবশ্য-প্রয়োজনীয়। মানুষ যদি তার নিজের আদর্শ এতটাই তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরতে চায়, যার ফলে তার আদর্শের জন্যে মরতে বা মারতে ইচ্ছে করে, তবে প্রতিটি মতপার্থক্য হয় যুদ্ধে, নয় কু-দে-তা (coup d’état; অভ্যুত্থান)-য় শেষ হবে।
গণতন্ত্র আসলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর সংখ্যাগুরুর প্রতি আনুগত্যের এক জটিল মিশ্রণ দাবি করে। একদিকে তার দাবি – জোরালো রাজনৈতিক ধ্যানধারণা-ওয়ালা ব্যক্তির উচিত তার নিজের মতামতের সপক্ষে তর্ক করা, আর সংখ্যাগুরু যাতে সেই মত মেনে নেয় – সেই চেষ্টায় অবিচল থাকা; অন্যদিকে, সংখ্যাগুরু যদি তখনো অমত হয়, তবে ভদ্রভাবে সেই জনাদেশ মেনে নিতে হবে।
প্রায় কুড়ি বছর আগে এক ছোট্ট দেশে—কোন দেশ, সে আর বলছি না—দুই যুযুধান দল সংখ্যায় প্রায় সমান সমান ছিল। সংসদের অধিবেশন চলাকালীন সংখ্যালঘু দলের সদস্যরা সংখ্যাগুরু দলের যথেষ্টসংখ্যক প্রতিনিধিকে গুলি করে মারে, ফলে তারা নিজেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় [১৩]। ১৯৫০ সালে ইংল্যান্ডে কনজ়ার্ভেটিভ পার্টি বা ১৯৫১-য় লেবার পার্টি কিন্তু এই শর্টকাট নেয়নি।
কোনো সত্যিকারের গোঁড়া অন্ধবিশ্বাসই গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খেতে চায় না। ১৯১৮-য় যখন দেখা গেল রুশ গণ-পরিষদে বলশেভিক-বিরোধীরা সংখ্যাগুরু, সামরিক শক্তি কাজে লাগিয়ে বলশেভিকরা সেই পরিষদ ভেঙে দেয়, আর সেই তখন থেকেই জনমতের নাড়ি না টিপেই তারা দেশ চালায়।
ষোড়শ আর সপ্তদশ শতকের প্রোটেস্টান্ট আর ক্যাথলিক সরকারও একই আচরণ করতো। জার্মানি, ইটালি আর স্পেনের ফ্যাসিস্ট সরকারগুলিও সংখ্যাগুরু-র মতামত নিয়ে উদাসীন ছিল। যখনই জনগণের এক বৃহৎ, গুরুত্বপূর্ণ অংশে এই ধরনের কোনো গোঁড়ামোর চাষ হয়, গণতন্ত্রের টিকে থাকা কঠিন খুবই।
এই কারণেই, গণতন্ত্রে বিশ্বাসীদের সর্বশক্তি দিয়ে যা করা উচিত, তা হল – শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে সহিষ্ণুতার বীজ বপন করা। এ কাজ বর্তমানে মোটেই পর্যাপ্ত পরিমাণে করা হয় না। রাষ্ট্রের মনোমতো বিশ্বাস চতুর্দিকে ছড়ানো হবে, আর যুবকরা সেগুলিকে প্রশ্ন না করে সোনাছেলের মতো গলাঃধকরণ করবে – এইটেই নাকি ঠিক। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত মতামত এই মুহূর্তে – জাতীয়তাবাদ।
এই গ্রহটির স্থলভাগ অনেকগুলি ছোট টুকরোয় ভাঙা, আর তার প্রতিটি খণ্ডের কমবয়সীদের শেখানো হয় – তাদের টুকরোর বাসিন্দাদের থেকে ভালো আর কেউ নেই, আর অন্যান্য খণ্ডের বাসিন্দারা সব বদ, নীচ, খারাপ লোক। এর থেকে কি কখনো বিশ্বশান্তি আসা সম্ভব?
গণতন্ত্র যেসব বিষয়ে সবচেয়ে কম সন্তোষজনক, তার একটি হল জাতীয়তাবাদ। পুরানো সেই দিনে, যখন বংশানুক্রমিকভাবে আর আলাদা আলাদা শাসকের শৌর্য প্রদর্শনের জন্যে যুদ্ধ হত, জনগণের অধিকাংশই সেই যুদ্ধ নিয়ে হয় উদাসীন, নয় অসন্তুষ্ট হয়ে থাকতো।
নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের পুরো সময়কাল জুড়েই, ইংরেজ বিজয়গুলি নিয়ে সমাজের নিম্নশ্রেণীর ইংরেজ জনতার কোনো মাথাব্যথা ছিল না, আর ফরাসীরাও যে ইংরেজদের মতোই ভালো – এ কথা মানতে তাদের বিশেষ আপত্তিও ছিল না। উঁচু শ্রেণীতে কিন্তু গল্প আলাদা – সেখানে এ বিশ্বাস ছিল না। যেমন ধরুন, নেলসন তাঁর জাহাজের নাবিক-ক্যাডেটদের শিখিয়েছিলেন – ফরাসীদের শয়তান-জ্ঞানে ঘেন্না করা উচিত। এদিকে এই উচ্চশ্রেণীই সরকার চালাতো। ফ্রান্সেও, ঠিক একইভাবে, নেপোলিয়নের যুদ্ধজয়ে যারা উৎসাহিত হত – সমাজের সেই অংশটি ছাড়া যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে কারুর তেমন তাপ-উত্তাপ ছিল না। নেপোলিয়ন ক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৮ই ব্রুমের-এ, ‘শান্তি’-র প্রতিশ্রুতি দিয়ে (Brumaire হল ফরাসী প্রজাতান্ত্রিক ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় মাস, সন ১৭৯৯)। ১৯১৭-য় লেনিনও ক্ষমতা দখলের সময় একই প্রতিশ্রুতি দেন।
অতীতে যুদ্ধের তীব্রতায় লাগাম টেনে রাখতো যুদ্ধের কুখ্যাতি। খুব সঙ্গিন অবস্থা তৈরি হলে জন-অসন্তোষ – এমনকি বিদ্রোহও হত। কিন্তু গণতান্ত্রিক এক দেশে এক সাধারণ নাগরিক যে কোনো যুদ্ধকে নিজেরই যুদ্ধ বলে মনে করে। যুদ্ধের সঙ্গে তার অহং এমনভাবে জড়িয়ে যায়, যা কোনো স্বৈরতন্ত্রে সম্ভব না। এর ভালো দিক – এর ফলে গণতন্ত্রের জেতার সম্ভাবনা বাড়ে, কিন্তু একইসঙ্গে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার চাইলে যুদ্ধকে নারকীয় সীমা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে, আর যুদ্ধের আগেও, তাদের গৃহীত নীতিগুলি মারমুখো আর হুমকি-সর্বস্ব হতে পারে। গণতান্ত্রিক সরকারের চৌহদ্দির মধ্যে এই রোগের একটিই চিকিৎসা – রাষ্ট্রগুলির নিজেদের বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা, যাতে মানবজাতির সাধারণ লক্ষ্য হয় – রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে দ্বন্দ্বের বদলে জনমানসে শিক্ষার চলের গুরুত্ব বাড়ানো।
অষ্টাদশ শতকে যুদ্ধব্যাবসা লাভজনক হওয়ার ক্ষমতা রাখতো। শুধু অর্থনৈতিক লাভের কথা ধরলেও, মার্কিন স্বাধীনতার যুদ্ধটি ছাড়া ওই শতকের আর সব যুদ্ধ থেকেই ইংল্যান্ড লাভের কড়ি গুনেছিল। এখন দিনকাল আলাদা। পরপর দুটি যুদ্ধে সম্পূর্ণ ও নিশ্চিত বিজয় লাভ করে অবশেষে আমরা ধ্বংসের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছি, আর তার ফলে, যুদ্ধ যে মোটে ভালো ব্যাবসা না – এ কথা জনসাধারণকে বোঝানো এখন মোটেই কঠিন কাজ নয়। আমেরিকার এই শিক্ষা পেতে যদিও অনেক দেরি আছে।
গণতন্ত্রকে যুদ্ধবাজ না বানিয়ে শান্তিকামী করে তোলা মুখ্যত ইশকুলের কাজ। ইতিহাস পড়ানো হওয়া উচিত এমন – যাতে তা সভ্যতার উত্থানের ইতিহাস হয়, অমুক দেশ বা তমুক রাজ্যের ইতিহাস নয়। নিজের দেশটির ইতিহাসে অনর্থক বেশি জোর না দিয়ে, সমগ্র মানবজাতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই ইতিহাস পড়ানো দরকার। বাচ্চাদের শেখা উচিত – প্রতিটি রাষ্ট্র অন্যায়কারী, অপরাধী, আর সেসব অপরাধের অধিকাংশই আদতে গুরুতর ভুল। তাদের জানা উচিত – কী করে গণ-হিস্টিরিয়া একটা গোটা দেশকে নির্বুদ্ধিতার রাস্তায় টেনে নিয়ে যায়, আর সেই উন্মত্ত হুজুগে যোগ না দেওয়া মুষ্টিমেয় ব্যক্তিকে কীভাবে শাস্তি পেতে হয়। ভিনদেশী অচেনা শিশুদের আনন্দের ধরন যে প্রায় স্বদেশের শিশুদের মতোই, দুঃখের প্রকৃতিও তা-ই – এসব নিয়ে সিনেমা দেখানো উচিত। আলাদা রাষ্ট্রের সরকারগুলি অনুমতি দিলেই UNESCO-র পক্ষেই এমনটা করে ফেলা সম্ভব। গোটা দুনিয়া জুড়ে যদি এ জিনিস করে ফেলা যায়, অবিলম্বে গণতন্ত্রগুলির যুদ্ধের জ্বর অনেকটা নেমে যাবে।