

আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে এমন একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন ৮০টিরও বেশি দেশে ৭৫০টিরও বেশি সামরিক ঘাঁটি রক্ষণাবেক্ষণ করে? এটি এজন্য নয় যে তারা বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক। এটি এজন্যও নয় যে বিশ্ব তাদের কাছে এগুলো চেয়েছে। বরং কারণটি হলো, এগুলো ছাড়া আমেরিকান অর্থনীতি — যা ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে — এমন এক সংকটের মুখোমুখি হবে যা কোনো নির্বাচন দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এই উত্তরটি লুকিয়ে আছে ১৯৭৪ সালে রিয়াদের এক প্রাসাদে হওয়া একটি গোপন চুক্তিতে, ১৯৬০ সালে এক অখ্যাত অর্থনীতিবিদের চিহ্নিত করা একটি গাণিতিক স্ববিরোধিতায়, এবং রবিবার রাতের একটি টেলিভিশন ঘোষণায় যা বিশ্বের মুদ্রা ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আমি যা বলতে যাচ্ছি সেটা কোনো ষড়যন্ত্রের গল্প নয়। এটি একটি কাঠামোর গল্প; এটি সেই বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর গল্প যা মানুষের আচরণকে চালনা করে; এটি সেই গল্প যে কীভাবে বৈশ্বিক খেলার নিয়মগুলো লেখা হয়েছিল, কারা সেগুলো লিখেছিল এবং কেন সেই নিয়মগুলো এখন পরিবর্তন করা অসম্ভব মনে হয়। আশা করছি আপনারা এই প্রথম পর্ব শেষ করার পর মোটামুটি একটা ধারণা পাবেন কেন আমেরিকা ইরাক যুদ্ধে গিয়েছিল, কেন চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কেনা চালিয়ে যায় এবং কেন আপনার জীবনের ওপর সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলা শক্তিগুলো নিয়ে কোনো রাজনীতিবিদ কখনোই নির্বাচনী প্রচার চালান না।
গল্পের সূচনা ভূ-রাজনীতিতে নয় — আমাদের মধ্যেই। আমাদের বিবর্তনগত প্রবণতা — সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার যে জটিল দ্বন্দ্ব — তার ওপর দাঁড়ানো মানবসভ্যতার প্রাতিষ্ঠানিক গঠন থেকেই গল্পের শুরু।
অধ্যায় ১: আদিম সংকেত — কেন আমরা বন্ধন গড়ি, আর সেতু বানানোর আগেই প্রাচীর তুলে ফেলি?
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সভ্যতার আবরণ সরিয়ে ফেললে আপনি মানুষের আচরণের প্রতিটি স্তরে একই চালিকাশক্তি খুঁজে পাবেন: নিজের দলকে রক্ষা করা এবং বাইরের মানুষকে অবিশ্বাস করা। মানব প্রাগৈতিহাসিক যুগের অধিকাংশ সময় জুড়ে এটিই ছিল টিকে থাকার যুক্তি। নিজস্ব গোষ্ঠীর ভেতরে সহযোগিতা; অন্য সব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হিংস্র প্রতিযোগিতা। যারা এভাবে গঠিত ছিল, তারা বেঁচেছিল। যারা ছিল না, অধিকাংশই হারিয়ে গেছে।
সেই তারতম্য এখনো আমাদের শিরায় প্রবাহিত — রাস্তার গ্যাং থেকে জাতিরাষ্ট্র, করপোরেট বোর্ডরুম থেকে আন্তর্জাতিক সম্মেলন — সর্বত্র একই প্রবৃত্তি ফিরে আসে। আমরা একে বলি দেশপ্রেম, জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত প্রতিযোগিতা। এই ভাষার নিচে লুকিয়ে আছে সেই একই প্রাচীন সংকেত: আপনার দলের টিকে থাকা এবং সুবিধাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যান, ধরে নিন অন্য সব দলও ঠিক তাই করছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন।
বিংশ শতাব্দী এক মহাবিপর্যয়কর মূল্যের বিনিময়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিশুদ্ধ আদিম যুক্তি কোথায় নিয়ে যায়। দুটি বিশ্বযুদ্ধ, কোটি কোটি মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মহাদেশসমূহ। ১৯৪৪ সালের মধ্যে বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা এমন এক প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন যার সন্তোষজনক উত্তর আগে কখনো দেওয়া হয়নি: আপনি কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন যা মানুষের আদিম স্বার্থপরতাকে পারস্পরিক ধ্বংসের বদলে সহযোগিতার দিকে পরিচালিত করবে?
নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক হোটেলে তারা যে উত্তরটি নকশা করেছিলেন, তা এক প্রজন্মের জন্য ছিল এক সত্যিকারের বিস্ময়। কিন্তু এর মধ্যে একটি মারাত্মক ত্রুটি ছিল যা কেউ সারানোর সাহস করেনি—যতক্ষণ না সেই ত্রুটি নিজেই নিজেকে সারিয়ে নিল এমন এক উপায়ে যা সবকিছু বদলে দিয়েছিল। তবে তার আগে চলুন সেই 'খেলা'টি সম্পর্কে বুঝি যা সবকিছু ব্যাখ্যা করে।
অধ্যায় ২: বৈশ্বিক পরিসরে ‘প্রিজোনার’স ডিলেমা’ (বন্দীর উভয়সংকট)
সেই খেলা যা সবকিছু ব্যাখ্যা করে
১৯৫০ সালে র্যান্ড (RAND) কর্পোরেশনের গণিতবিদরা একটি কাল্পনিক পরীক্ষার (thought experiment) প্রথাগত রূপ দিয়েছিলেন যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী একক লেন্স হিসেবে পরিচিতি পায়। দুজন সন্দেহভাজনকে আলাদা সেলে আটকে রাখা হয়েছে। প্রত্যেককে একই প্রস্তাব দেওয়া হলো: তোমার সঙ্গীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো এবং মুক্ত হয়ে যাও, আর তোমার সঙ্গী ৫ বছর জেল খাটবে। যদি দুজনেই চুপ থাকো, তবে দুজনেই ১ বছর জেল খাটবে। যদি দুজনেই একে অপরকে ধোঁকা দাও, তবে দুজনেই ২ বছর জেল খাটবে।
এই যুক্তিটি অত্যন্ত কঠোর। আপনার সঙ্গী যা-ই করুক না কেন, আপনার জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করাই লাভজনক। যদি তারা চুপ থাকে, তবে আপনি ১ বছর জেল খাটার বদলে মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। যদি তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে আপনি ৫ বছরের বদলে ২ বছর জেল খাটছেন। যখন আপনি অপর পক্ষকে বিশ্বাস করেন না, তখন বিশ্বাসঘাতকতাই একমাত্র যৌক্তিক পছন্দ হয়ে দাঁড়ায়। ফলাফল হলো এই যে, দুজন যৌক্তিক পক্ষই বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং দুজনেই ২ বছর জেল খাটে, অথচ সহযোগিতা করলে তারা দুজনেই মাত্র ১ বছর জেল খাটতে পারত।
এটি কেবল একটি নীতিকথা নয়। এটি প্রতিটি আন্তর্জাতিক আলোচনা, প্রতিটি অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, প্রতিটি পরিবেশ সম্মেলনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বর্ণনা করে। প্রতিটি পক্ষ তাদের নিজস্ব যৌক্তিক স্বার্থ অনুসরণ করতে গিয়ে এমন সব ফলাফল তৈরি করে যা সামষ্টিকভাবে সহযোগিতার তুলনায় অনেক বেশি খারাপ। এই ‘প্রিজোনার’স ডিলেমা’ হলো আমাদের আদিম আদিবাসী প্রবণতার একটি গাণিতিক প্রকাশ।
সহযোগিতা যখন উদ্ভূত হয় এবং কেন তা ব্যর্থ হয়
চলুন এই গেম থিওরি বা খেলার তত্ত্বকে আরও একটু প্রসারিত করা যাক। ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট অ্যাক্সেলরড একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগীতা চালিয়েছিলেন: যেখানে কম্পিউটার প্রোগ্রামগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার এই প্রিজোনার’স ডিলেমা খেলছিল। সেখানে বিজয়ী হয়েছিল গণিতবিদ আনাতোল র্যাপোপোর্টের জমা দেওয়া সবচেয়ে সহজ কৌশলটি, যার নাম ‘টিট ফর ট্যাট’। প্রথমে সহযোগিতা করো। তারপর অন্য খেলোয়াড় শেষবার যা করেছিল ঠিক তা-ই করো। এটি ছিল ভদ্র, প্রতিশোধমূলক, ক্ষমাশীল এবং স্বচ্ছ।
টিট ফর ট্যাট দেখিয়েছিল যে, সম্পূর্ণ স্বার্থপর পক্ষগুলোর মধ্যেও সহযোগিতা গড়ে উঠতে পারে যদি তারা প্রত্যাশা করে যে তাদের একে অপরের সাথে বারবার দেখা হবে, তারা একে অপরকে চিনতে পারে এবং ভবিষ্যতের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে এতটাই মূল্য দেয় যে তারা স্বল্পমেয়াদী লাভের জন্য তাকে বিসর্জন দিতে চায় না। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক এই শর্তগুলোই তৈরি করার চেষ্টা করে।
কিন্তু এখানেই সমস্যাটি রয়ে গেছে। আধুনিক গণতন্ত্রে রাজনৈতিক নেতারা ৪ বা ৫ বছরের নির্বাচনী চক্রের সম্মুখীন হন। সহযোগিতার সুফল আসার জন্য তারা ২০ বছর অপেক্ষা করার বিলাসিতা করতে পারেন না। এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো বলবৎকারী ব্যবস্থা (enforcement mechanism) নেই। জাতিসংঘ এমন সব প্রস্তাব পাশ করতে পারে যা তারা কার্যকর করতে বাধ্য করতে পারে না। আদালত রায় দিতে পারে কিন্তু তা কার্যকর করার জন্য কোনো পুলিশ নেই। থুসিডাইডিস ২,৪০০ বছর আগে যেমনটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন: "শক্তিশালীরা যা পারে তা-ই করে, আর দুর্বলেরা যা সহ্য করতে হয় তা-ই সয়।"
ব্রেটন উডস ব্যবস্থা এবং পেট্রোডলারের বিন্যাস, যা আমরা একটু পরে আলোচনা করব, সেগুলো ছিল অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এই খেলার কাঠামো পরিবর্তনের এক একটি চেষ্টা — যাতে সহযোগিতার জন্য উৎসাহ এবং দলত্যাগের জন্য ক্ষতি বা ব্যয়ের ব্যবস্থা করা যায়। তারা আংশিকভাবে সফল হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো তৈরি করা হয়েছিল এমন এক পৃথিবীর জন্য যেখানে আমেরিকান আধিপত্য ছিল নিরঙ্কুশ, বাণিজ্যিক ধরণ ছিল সরল এবং আদর্শগত বিভাজন ছিল স্পষ্ট। কিন্তু সেই পৃথিবী এখন মুছে যাচ্ছে।
সমষ্টিগত কর্মতৎপরতার ফাঁদ (The Collective Action Trap)
আমরা দেখব যে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কার না করা হলে আমরা একটি বৈশ্বিক প্রিজোনার’স ডিলেমার মুখোমুখি হব যা ধীরগতিতে কার্যকর হচ্ছে। প্রতিটি জাতি, প্রতিটি পুঁজির ভাণ্ডার, প্রতিটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম তাদের নিজস্ব যৌক্তিক স্বার্থ অনুসরণ করছে। এর সামষ্টিক ফলাফল সবার জন্যই খারাপ: বাণিজ্যিক যুদ্ধ যা সমৃদ্ধিকে সংকুচিত করে, জলবায়ু নিয়ে নিষ্ক্রিয়তা যা বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করে এবং আর্থিক অস্থিতিশীলতা যা পর্যায় ক্রমে কয়েক দশকের গড়ে তোলা সম্পদকে মুছে দেয়।
প্রশ্ন হলো, ব্যবস্থাটি তার নিজের স্ববিরোধিতার ভারে ভেঙে পড়ার আগেই কি সংস্কার সম্ভব? সেই উত্তর পেতে হলে আমাদের বুঝতে হবে যে প্রকৃত খেলোয়াড় কারা, তাদের উৎসাহের কাঠামো কীভাবে কাজ করে, কোন বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো আজও আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোকে শাসন করে এবং আধুনিক পুঁজিবাদের পাটিগণিত কীভাবে তাদের সবার হাত বেঁধে রেখেছে।
অধ্যায় ৩: ব্রেটন উডস—অরাজকতার প্রান্তে শৃঙ্খলা সৃষ্টি
৭৩০ জন প্রতিনিধি এবং একটি মৌলিক প্রশ্ন
জুলাই ১৯৪৪। ডি-ডে ল্যান্ডিংয়ের মাত্র এক মাস হয়েছে। যুদ্ধের ফলাফল তখনো নিশ্চিত ছিল না। তা সত্ত্বেও ৪৪টি দেশের ৭৩০ জন প্রতিনিধি নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডসের মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে জড়ো হয়েছিলেন যুদ্ধ করতে নয়, বরং শান্তির পরিকল্পনা করতে। তারা দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী বছরগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন: মুদ্রার প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়ন, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা এবং একে অপরকে দেউলিয়া করার সেই নীতিগুলো যা শেয়ার বাজারের ধসকে মহামন্দায় এবং সেই মন্দাকে ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধে রূপ দিয়েছিল। তারা সংকল্পবদ্ধ ছিলেন যে এর পুনরাবৃত্তি করবেন না।
যুদ্ধের আগের স্বর্ণমান (Gold Standard) স্থিতিশীলতা দিলেও তার মূল্য ছিল নিষ্ঠুর: যখন একটি দেশ বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়ত, সোনা বাইরে চলে যেত। এর ফলে সেই দেশ সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতো, বেকারত্ব ও মুদ্রাসংকোচন মেনে নিতে হতো এবং তাদের জনসংখ্যাকে কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো যতক্ষণ না মুদ্রাটি আবার প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে। কোনো গণতন্ত্রই ভোটারদের ওপর দীর্ঘকাল এই ঔষধ প্রয়োগ করে টিকে থাকতে পারত না।
কেইনস, হোয়াইট এবং শক্তির স্থাপত্য
ব্রেটন উডসে দুটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিযোগিতা চলছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের প্রতিনিধি জন মেনার্ড কেইনস একটি বিশ্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন যা ‘ব্যানকর’ নামে একটি নতুন মুদ্রা ইস্যু করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি উদ্বৃত্ত এবং ঘাটতি—উভয় ধরনের দেশের ওপরই জরিমানা আরোপ করত। তিনি একটি মৌলিক বিষয় বুঝেছিলেন: বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা সব সময় দুই পক্ষের কারণে তৈরি হয়। শুধুমাত্র দেনাদারকে শাস্তি দেওয়া আর পাওনাদারকে অন্তহীন উদ্বৃত্ত জমা করতে দেওয়া কোনো সাম্যাবস্থা নয়; এটি হলো অর্থনীতির পোশাকে আধিপত্যবাদ।
আমেরিকার প্রতিনিধি হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট এক সহজতর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে এর পেছনে ছিল আমেরিকার তৎকালীন নিরঙ্কুশ শক্তি। হোয়াইটের নকশাই টিকে গেল: সব মুদ্রাকে মার্কিন ডলারের সাথে যুক্ত করা হবে; এবং একমাত্র ডলারই প্রতি আউন্স সোনার বিপরীতে ৩৫ ডলারে রূপান্তরযোগ্য হবে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক এই ব্যবস্থা পরিচালনা করবে, তবে তা হবে আমেরিকার শর্তে। এটি ছিল একই সাথে এক চমৎকার সমঝোতা এবং এক নীরব রাজ্যাভিষেক। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি একক দেশের মুদ্রা সমগ্র বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত হলো।
ট্রিফিন ডিলেমা: চোখের সামনে এক টাইম বোমা
পনেরো বছর ধরে এটি কাজ করেছিল। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছিল। জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৬০ সালে অর্থনীতিবিদ রবার্ট ট্রিফিন একটি কাঠামোগত স্ববিরোধিতা চিহ্নিত করলেন যার কোনো অভ্যন্তরীণ সমাধান ছিল না। বিশ্ব অর্থনীতি বৃদ্ধির জন্য বাজারে আরও বেশি ডলারের প্রয়োজন ছিল। আরও বেশি ডলার সঞ্চালনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাণিজ্য ঘাটতিতে চলতে হতো—অর্থাৎ অর্জনের চেয়ে বিদেশে বেশি ব্যয় করতে হতো। কিন্তু আমেরিকার বাইরে যত বেশি ডলার জমা হতে থাকল, সেই প্রতিশ্রুতি ততটাই দুর্বল হয়ে পড়ল যে সেই সব ডলারকে সোনার বিপরীতে ৩৫ ডলারে রূপান্তর করা যাবে। এই ব্যবস্থাটি সচল রাখার জন্য আমেরিকার প্রয়োজন ছিল তার নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ এই স্ববিরোধিতাকে ত্বরান্বিত করল। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ডি গল আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্সের কাছে থাকা ডলার রিজার্ভকে সোনার বদলে নিতে শুরু করলেন। মার্কিন সোনার রিজার্ভ ১৯৫৭ সালে ২০,০০০ টনের ওপর থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে ১০,০০০ টনের নিচে নেমে এলো।
রবিবার রাত, ১৫ আগস্ট ১৯৭১
প্রেসিডেন্ট নিক্সন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘বোনানজা’র মাঝখানে বাধা দিয়ে একটি ঘোষণা দিলেন যা যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে স্থায়ীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ডলারের বিনিময়ে সোনা দেবে না। ব্রেটন উডস ব্যবস্থা—সেই স্থাপত্য যা তিন দশকের বৈশ্বিক সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করেছিল— তার পতন হল। দুই বছরের মধ্যে বিশ্বের সব বড় মুদ্রা একে অপরের বিপরীতে ভাসতে শুরু করল, যা কোনো ভৌত পণ্যের সাথে যুক্ত ছিল না। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থা চলল পুরোপুরি বিশ্বাসের ওপর। প্রশ্ন ছিল: কিসের ওপর বিশ্বাস?
উত্তরটি কোনো অর্থনীতিবিদের অফিস থেকে আসেনি, বরং এসেছিল এক ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে এবং তা জড়িয়ে ছিল অপরিশোধিত তেলের গন্ধের সাথে।
অধ্যায় ৪: কালো সোনা এবং সবুজ কাগজ—পেট্রোডলারের জন্ম
সংকট যা সুযোগে পরিণত হলো
অক্টোবর ১৯৭৩। মিশর ও সিরিয়া ইসরায়েলের ওপর অতর্কিত হামলা চালাল। ওয়াশিংটন তেল আবিবে সামরিক সরঞ্জাম পাঠাল। এর জবাবে ওপেকের আরব সদস্যরা তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তেলের দাম চারগুণ বেড়ে গেল। আমেরিকানরা পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে বসে থাকল। শেয়ার বাজারে ধস নামল। নিক্সনের সেক্রেটারি অফ স্টেট এবং সম্ভবত আধুনিক আমেরিকান কূটনীতির সবচেয়ে শীতল ও কৌশলগত মস্তিষ্ক হেনরি কিসিঞ্জার এই সংকটের মধ্যে এমন কিছু দেখলেন যা অন্যেরা এড়িয়ে গিয়েছিলেন: ডলারের আধিপত্যের ভিত্তি হিসেবে সোনার জায়গায় তেলকে প্রতিস্থাপন করার এক সুযোগ।
সেই চুক্তি যা কখনো ঘোষণা করা হয়নি
১৯৭৪ সালে কিসিঞ্জার সৌদি আরবের সাথে এক সিরিজের চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন যার শর্তগুলো ছিল মার্জিতভাবে সহজ কিন্তু এর ফলাফল ছিল বিষ্ফোরক। সৌদি আরব তার সমস্ত তেল রপ্তানির মূল্য নির্ধারণ করবে একচেটিয়াভাবে মার্কিন ডলারে। সৌদিরা তাদের বাড়তি তেল রাজস্ব মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজ এবং অন্যান্য আমেরিকান সম্পদে বিনিয়োগ করবে। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরঞ্জাম, উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা এবং সৌদি রাষ্ট্র ও তার তেলের পরিকাঠামো রক্ষার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে।
এই চুক্তিটি আমেরিকান জনগণের কাছে চার দশকেরও বেশি সময় গোপন রাখা হয়েছিল। অবশেষে ২০১৬ সালে ডিক্লাসিফাইড ট্রেজারি নথির ওপর ব্লুমবার্গের একটি তদন্তের মাধ্যমে এটি প্রকাশিত হয়। ১৯৭৫ সালের মধ্যে ওপেকের প্রতিটি সদস্য ডলারে তেলের মূল্য নির্ধারণে একমত হলো। যেকোনো দেশ যার তেলের প্রয়োজন ছিল—এবং প্রতিটি আধুনিক অর্থনীতির জন্য তেলের প্রচণ্ড প্রয়োজন ছিল—তাদের প্রথমে ডলার প্রয়োজন ছিল। রাতারাতি ডলার এক নতুন নোঙ্গর খুঁজে পেল।
এক স্ব-শক্তিশালী চক্র
এই ব্যবস্থার মহিমা নিহিত ছিল এর পরবর্তী ধাপে: পেট্রোডলার রিসাইক্লিং। তেল আমদানিকারক দেশগুলো তেলের জন্য ডলারে মূল্য পরিশোধ করল। সেই ডলারগুলো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাছে গেল। তেল উৎপাদনকারীরা সেই ডলারগুলো আবার মার্কিন ট্রেজারি বন্ড এবং আমেরিকান আর্থিক বাজারে বিনিয়োগ করল। আমেরিকা তার ঘাটতি মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি পেল। সুদের হার স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে থাকল। চক্রটি চলতেই থাকল। এটি এমন এক ব্যবস্থা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উৎপাদনের চেয়ে বেশি ভোগ করার সুযোগ করে দিল। ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী ভ্যালেরি জিসকার্ড দিস্তাঁ একেই বিখ্যাতভাবে ‘অপ্রাপ্য বিশেষাধিকার’ (exorbitant privilege) বলে অভিহিত করেছিলেন—যে অভিযোগ তিনি ব্রেটন উডস আমলেও তুলেছিলেন। অন্যান্য দেশগুলোকে কঠোর পরিশ্রম এবং রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হতো। আর আমেরিকা কেবল তা ছাপিয়েই নিতে পারত।
অধ্যায় ৫: ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের নোঙ্গর—কেন আমেরিকা সততা সহ্য করতে পারে না?
যে সংখ্যাগুলো আপনার ঘুম কেড়ে নেবে
২০২৬ সালের শুরুর দিকে মার্কিন সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ১২০%। শুধু সুদের অর্থ পরিশোধ করতেই বছরে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যা পরিকাঠামো, শিক্ষা এবং অন্যান্য খাতের ব্যয়কে সংকুচিত করছে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস প্রক্ষেপণ করছে যে বর্তমান নীতি অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে এই অনুপাত জিডিপির ১৮০% এ পৌঁছাবে। আর এটি একটি উদার ধারণা যেখানে বড় কোনো যুদ্ধ, মন্দা বা আর্থিক সংকট ধরা হয়নি।
অন্য যেকোনো দেশের জন্য এটি ইতিমধ্যেই একটি সংকট হিসেবে গণ্য হতো। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্য যেকোনো দেশ নয়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে ডলারের রিজার্ভ কারেন্সি স্ট্যাটাস থাকার কারণে আমেরিকা তার স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ০.৫ থেকে ১.০ শতাংশ কম সুদে ঋণ নিতে পারে। ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের ওপর এই পার্থক্যটি বছরে শত শত বিলিয়ন ডলারের সমান। এটিই হলো একটি সহনীয় ঘাটতি এবং ঋণের চক্রের মধ্যেকার পার্থক্য। এটি ছাড়া আমেরিকান রাজস্ব মডেল কাজ করবে না।
তবুও নিরপেক্ষ বিচারের খাতিরে একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রয়োজন। যে ব্যবস্থাটি আমেরিকার স্বার্থ এত কার্যকরভাবে রক্ষা করেছে, সেটিই আবার মানব ইতিহাসে রেকর্ড করা অগ্রগতির সবচেয়ে বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের ভূমিকা এবং একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উন্মুক্ত বাণিজ্যিক স্থাপত্য পণ্য, পুঁজি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মানুষের চলাচলের বাধা কমিয়ে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে মেধাবীদের গ্রহণ করেছে এবং এর বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাগুলো সত্যিকারের বৈশ্বিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা, কম্পিউটিং, যোগাযোগ এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো এসেছে, সেগুলো শুধু সংকীর্ণ অর্থে আমেরিকান অর্জন ছিল না। সেগুলো ছিল এমন এক ব্যবস্থার ফসল যা—তার কাঠামোগত যুক্তি যা-ই হোক না কেন—কৌতূহলকে পুরস্কৃত করত, বিদেশিদের গ্রহণ করত এবং এমন গতিতে আইডিয়াগুলোকে ছড়িয়ে দিত যা আগের কোনো সভ্যতা করতে পারেনি। শত কোটি মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোন, রোগ নির্মূল করা ভ্যাকসিন বা শক্তি ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেওয়া গ্রিন টেকনোলজি—সবকিছুর মধ্যেই এমন এক ব্যবস্থার ছাপ আছে যা স্বার্থকেন্দ্রিক হলেও যার নিয়মগুলো যথেষ্ট উন্মুক্ত ছিল যাতে এর সুফলগুলো বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই অংশটির কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক নকশার কাছে ঋণী, কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ততার কাছে এবং সম্ভবত কিছুটা সেইসব মূল্যের সৌভাগ্যজনক সমন্বয়ের কাছে যা—যত অসম্পূর্ণভাবেই প্রয়োগ করা হোক না কেন—সত্যিকার অর্থে জ্ঞান ও মেধার কদর করত।
টিকে থাকার হিসাব
এই কারণেই ডলারের আধিপত্য ওয়াশিংটনের জন্য কোনো মর্যাদার বিষয় নয়। এটি গাণিতিকভাবে টিকে থাকার বিষয়। ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপর গড় সুদের হার ২% বৃদ্ধি মানে বছরে অতিরিক্ত ৭৬০ বিলিয়ন ডলার সুদ, যা গড় প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি। এই একটি তথ্যই এমন সব আচরণ ব্যাখ্যা করে যা অন্যথায় অযৌক্তিক মনে হতে পারে: কেন আমেরিকা বিশ্বজুড়ে শত শত সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখে এবং কেন কোনো নেতা যখন অন্য মুদ্রায় তেলের দাম নির্ধারণের হুমকি দেয় তখন আমেরিকা কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। কাঠামোগত যুক্তিটি কার্যকরী হওয়ার জন্য জনসমক্ষে বলার প্রয়োজন নেই।
বিশ্বের জন্য প্রয়োজনীয় একটি 'সফট ল্যান্ডিং' (নিরাপদ অবতরণ)
বর্তমান ব্যবস্থাটি চূড়ান্তভাবে টেকসই নয়। কোনো দেশই অনির্দিষ্টকাল ধরে উৎপাদনের চেয়ে বেশি ঋণ নিতে পারে না। কিন্তু ডলার আধিপত্যের আকস্মিক পতন শুধু আমেরিকার জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হবে। যা প্রয়োজন—এবং বিশ্ব যা এখন পর্যন্ত সংগঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছে—তা হলো একটি ‘সফট ল্যান্ডিং’: একটি নিয়ন্ত্রিত ও পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর একটি বহুমুখী মুদ্রাব্যবস্থায়, যেখানে ডলার গুরুত্বপূর্ণ থাকবে কিন্তু অন্যদের সাথে রিজার্ভ স্ট্যাটাস ভাগ করে নেবে। এটি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ স্তরে প্রিজোনার’স ডিলেমা কাটিয়ে উঠতে হবে—পতনোন্মুখ পরাশক্তিকে প্ররোচিত করতে হবে যাতে তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই না করে বরং নিজের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে। ইতিহাস এর কোনো উৎসাহব্যঞ্জক নজির দেয় না। কিন্তু ঝুঁকির মাত্রা এই চেষ্টাকে অপরিহার্য করে তুলেছে।
দ্বিতীয় পর্বে আমরা এই স্থাপত্য থেকে খেলোয়াড়দের দিকে ফিরব: বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকগণ, প্রযুক্তি জায়ান্ট যারা ক্ষমতার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, উদীয়মান এবং সংকুচিত শক্তিসমূহ যারা এই ব্যবস্থাটি পরিচালনা করছে এবং সেই প্রশ্ন—গণতান্ত্রিক সমাজগুলো কি বিশ্ব আমাদের রূপ দেওয়ার আগে বিশ্বকে রূপ দেওয়ার মতো স্বচ্ছভাবে দেখতে পারে?
[ক্রমশঃ]
dc | 2402:e280:2141:1e8:1c97:bab2:e89a:***:*** | ২৩ মার্চ ২০২৬ ২২:৩৫739389
$ | 40.16.***.*** | ২৩ মার্চ ২০২৬ ২৩:১০739391
হিহিহি | 2a03:4000:13:7c3:dead:beef:ca1f:***:*** | ২৩ মার্চ ২০২৬ ২৩:২২739392