রে…….( দ্বিতীয় সুর )
রেবতীর এই সময়টা বড়ো ব্যাস্ততায় কাটে। সন্ধে উৎরে গেলেই নিজেকে আরও সচল হয়ে উঠতে হয়। না হয়েই বা উপায় কি! মোট পাঁচটি মানুষের সংসারে এই মুহূর্তে সেই একমাত্র রোজগেরে। এখন অবশ্য সঙ্গে হাতে হাত লাগাতে দিন কয়েকের জন্য তার দিদি এসেছে গ্রাম থেকে। দিদি অরুন্ধতীই এখন ছোটবোন রেবতীর অনেকটা কাজ সামলে নেয় , তবুও খাটনি তো নেহাত কম নয়!
মাঝে মাঝেই রেবতীর ফেলে আসা সেই দিন গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। আর পড়বেই না কেন? আজ যে পায়ের নিচের মাটি নতুন করে একটু শক্ত হয়েছে তা তো ঐ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া দিনগুলোরই জন্য। নোট বাতিল, করোনা ভাইরাস,লকডাউন,লক আউট – সব কেমন যেন হাত ধরাধরি করে হঠাৎ নেমে এলো মানুষের জীবনে! বলরাম , রেবতীর সোয়ামি, একটা ছোট্ট গ্রীল তৈরির কারখানায় কাজ করতো। ডামাডোলের তালে সেটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন মালিক সুধন্য বসু । সুধন্য অবশ্য ভালোমানুষ। মালিক সুলভ কোনো গুমর নেই। বয়স্ক বুঝদার মানুষ। মন্দার সময়ের বাজারের পড়তি হাল দেখে নিজেই একদিন বলরামদের ডেকে নিয়ে বল্লেন –
“বুঝলি রে বলা,নিতাই,আটুল ! এবার বোধহয় কারখানার ঝাঁপ বন্ধ করে দিতে হবে। বাজার বড্ডো টালমাটাল। তার ওপর এখন চড়া কম্পিটিশন। আমাদের মতো ছোটো কারবারিরা এই লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবে না। তোদের এসব কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। অথচ সত্যিটাকে কতদিন আড়াল করে রাখবো? সামনের মাস থেকেই কারখানা বন্ধ করে দেবো। তোদের কিছু কিছু করে পয়সাকড়ি দেবো যতটা পারি। তোদের ছেড়ে দিতে কষ্ট হবে জানি ; তবে আমি সত্যিই নিরুপায়। যদি বাজারের হাল ফেরে, তাহলে আবার নতুন করে শুরু করবো। তখন আবার তোদের সবাইকে
ডেকে নেবো।” বলরাম সহ আরও চারজন পরিস্থিতির শিকার হতে বাধ্য হলো।
রেবতীর মনে পড়ে, চাকরি হারানোর দিনে বলরাম অনেক রাতে নেশা করে বাড়ি ফিরেছিল। বাড়িতে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিল শাশুড়ি মা ফুল্লরা সহ বাকি চারটি প্রাণি। রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। বলরামের সঙ্গে কাজ করতো নিতাইচরণ, সে এসে বলরামকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে
গেল। রেবতীকে নিতাই বলেছিল – “বৌদি, বকাবকি করোনা বলরাম দারে। এতোদিনের সম্পক্কটা এমন হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল, দুঃখতো হবেই ।”
বলরামের এমন পরিণতি দেখে রেবতীর মনের মধ্যে এক নতুন ঝড় উঠলো। এতোদিন লোকটার সঙ্গে ঘর করছে, কোনোদিন বলরামের এমন হাল দেখেনি। রেবতী বুঝতে পারলো এই কঠিন সময়ে সংসারের হাল তাঁকেই ধরতে হবে। কোথা থেকে শুরু করবে সে কথা ভাবতে ভাবতে তাঁর মাথায় রুটি তৈরি করে বিক্রি করার ভাবনাটা এলো। রেবতী লক্ষ করেছে আজকাল শহর কিংবা শহরতলির বাসিন্দাদের অধিকাংশই আর বাড়িতে রুটি তৈরি করতে চায় না। আটা মাখোরে, ভালো করে তাকে মসটাওরে , লেচি কেটে নিয়ে ঠিকমতো গোল গোল করে বেলে, গরম তাওয়ায় এপিঠ ওপিঠ করে নিয়ে তবে আগুনে সেঁকে ফেললে তৈরি হলো রুটি। একি আর কম হ্যাপার কাজ!প্রথম প্রথম একটু ভয়ে ভয়েই ছিল রেবতী। শেষে মনটাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে নেমেই পড়লো সে। ব্যস্ত রাস্তার পাশের ফুটপাতের ওপর প্লাস্টিক টাঙিয়ে নতুন পথ পাড়ি দিতে নামা।
এই রাস্তার ধারে রুটি তৈরির কারবারের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। মাঝে মাঝে রেবতীর মনে বিস্ময় জাগে – “এতো মানুষ এভাবে সংসার চালাচ্ছে”! - এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই শুরু করা। একটু অন্ধকার হতেই দোকানের সামনে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অফিস থেকে ফেরার পথে অনেকেই রাতের খাবারের জন্য রুটি নিয়ে যায়। এখন বলরামও সামিল হয়ে গেছে এই কাজে। ভিড়ের মধ্যে থেকে আওয়াজ ভেসে আসে – ও মাসি, আটটা রুটি দিও,ও রেবতী দি আমাকে দশটা দিও। কথাগুলো শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যায় বটে, তবে এমনটা না হলে মনের কোণে নতুন আশঙ্কা জন্ম নেয়। অরুন্ধতী ঘাড় গুঁজে সমানে রুটি বেলে যায়, রেবতীর কাজ সেগুলোকে ঠিকঠাক সেঁকে ফেলা।আর বলরাম বিক্রি বাট্টা করে, পয়সা নেয়। মাঝে মাঝে রেবতীর ছেলে রেবন্ত কোচিং থেকে ফেরার পথে ঘুরে যায়। টুকটাক কাজে হাত লাগায়।
– “রেবতী দি, তুমি যদি রুটির সঙ্গে আলুর দম বা ডিমের ডালনা গোছের কিছু একটা করো , তাহলে দেখবে তোমার বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। একবার ভেবে দেখো আমার কথা।” রুটির প্যাকেটটা বলরামের হাত থেকে নিতে নিতে একথাগুলো বলে বরুণ। বরুণ মিত্র– একেবারে প্রথম দিন থেকেই রেবতীর তৈরি রুটির বাঁধা খদ্দের। রেবতীর মাথায় খেলে যায় কথাগুলো। বরুণই এমন কথা প্রথম বললো তেমন নয়। আরও কয়েকজন এর আগে এমন কথা বলেছে। বসুনগরের নমিতা দিতো একদিন হাসতে হাসতে বলেই ফেললেন – “রেবতী, তুমি রুটি তৈরি করছো বলে আমার যে কি সুবিধা হয়েছে তা বলে বোঝাতে পারবো না। আজকাল আর হাত দিয়ে আটা মাখতে পারিনা, অথচ তোমার সুবিমল দা রাতে রুটি ছাড়া আর কিছুই খাবেন না।…. এবার তুমি একটা পাইস হোটেল চালু করো রেবতী! রুটি বিক্রি করে তোমার যা রেপুটেশন, তাতে করে গ্রাহক পেতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমি আর আমার কর্তা মশাই হবো তোমার রেগুলার কাস্টমার ”। এবারও রেবতী মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ে। রেবতী জানে এই পথ অনেক অনেক লম্বা। মনে মনে ইচ্ছে থাকলেও এই মুহূর্তে তেমন চিন্তায় ডুবে যেতে মন সায় দেয় না। স্বর সপ্তকের দ্বিতীয় সুরে সবে মন মজেছে। এখনও যে অনেক চরাই উৎরাই পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হবে তাঁকে, তাঁদের সবাইকে।
রেবতী শুনেছে তৃষিত চাতক পাখির ডাক থেকেই নাকি সরগমের দ্বিতীয় সুর রে এর উৎপত্তি। উজ্জ্বল এক সময়ের দিকে তাই সে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে সকল কাজের মাঝেই।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।