এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অনুভবে রবীন্দ্রগান- আনন্দধারা বহিছে ভুবনে

    সৌরাংশু লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ৩০ বার পঠিত
  • | | | | | | | | প্রথম পর্ব | প্রথম পর্ব
    এই গানের সর্বনাশ করে দিয়ে গেছেন শ্রদ্ধেয় পঙ্কজ কুমার মল্লিক। পঙ্কজ কুমার মল্লিক এই কাণ্ড এর আগে 'দিনের শেষে'র সঙ্গেও করেছেন। এমনভাবে সুরটা দিয়েছেন যে অজ্জিনাল ভদ্রলোকও সেটা করতে পারতেন কি না প্রশ্ন থেকে যায় (অপরাধ নেবেন না)। যদিও ১৯৩৭এ 'মুক্তি' সিনেমার জন্য ব্যবহৃত 'শেষ খেয়া' কবিতার শেষাংশ নিয়ে রবি ঠাকুর একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু গানটি শোনার পর আপত্তি করেননি। বরং 'চোখের জল ফেলতে হাসি পায়' জায়গাটি উনি পরিবর্তন করে দেন নিজে থেকেই, 'অশ্রু যাহার ফেলতে হাসি পায়'!

    অথবা ওই গানগুলো চিন্তা করুন, বাণী ঠাকুরের প্রযোজনায়, মহালয়ায় বিশেষত দুটি গানের কথা। 'ইয়া চণ্ডী' আর 'জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনী'। এই দুটো স্তোত্র প্রচলিত সুরে শুনে দেখবেন। তার পাশে পঙ্কজ বাবুর করা সুর বসালে বুঝবেন যে কোথায় তুলে নিয়ে চলে গেছেন! সাধারণ ধর্মীয় 'চ্যান্ট'কে তিনি এক অনিন্দ্য সৌন্দর্যময় সুরচ্ছটায় ভরিয়ে দিয়েছেন।

    এই কাজটা ওই ১৯৭২এর শঙ্কু মহারাজের লেখা, হীরেন নাগের নির্দশনায় 'বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা' উপন্যাসটি বা সিনেমাটির ক্ষেত্রেও করেছেন। 'চরৈবেতি' গানটি ওঁর নিজের কণ্ঠে শুনে 'মহিষাসুরমর্দিনী'র কোন গানটির সঙ্গে মিল পাবেন সেটা খুঁজে দেখুন।

    তবে সর্বনাশ বলছি কারণ, 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে' গানে মৃদঙ্গ এবং চৈনিক সুরের একটা আবহরের অভিঘাত যেটি ধরেছেন, সেটি সিনেমার সিচুয়েশনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিলে যায়। আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আইকনিক' কণ্ঠে সেটা অশোকস্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে আছে গানের ওপারে।

    অথচ গানটির কথা এবং মিশ্র মালকোষের সুরপ্রয়োগ দেখুন। সিনেমার সিচুয়েশনের বাইরে গিয়ে ভাবুন। দেখুন, রাত্রি দ্বিপ্রহরে কেমন লগন লাগে!
    'পান করে রবিশশি অঞ্জলি ভরিয়া
    সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি' অমাবস্যা পূর্ণিমা রাত্রি দিন এক অমোঘ লক্ষ্যের মতো জেগে থাকে অক্ষয়জ্যোতি।

    সামান্য মনুষ্য স্বার্থের বাইরে বেরিয়ে চারিদিকে চাহিয়া দেখিলে দেখিতে পাইবে আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে। তাই দুঃখকে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ জ্ঞান করে জীবনে প্রেম ভরিয়া লইলেই, আনন্দধারা ভুবনে, জীবনে বইতে দেখা যাবে।

    এই গানটি প্রচলিত কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানটির বাইরে রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবহে ওঁরই রেকর্ড করা ১৯৫৬র রেন্ডিশনটি শুনে দেখবেন। কিছুটা আন্দাজ পাবেন একে কীভাবে গাইতে হত। পূর্ণ যুবক কবি হয়তো হিমালয়ভ্রমণকালেই এই গান রচনা করেছিলেন, কোন মধ্য বা ভোররাতে আলো অন্ধকারে। মূল গানটি

    "লাগি মোরে ঠুমক পলঙ্গনা,
    রে ননদিয়া থর বিরণ মোহে
    কহত পাল, বাজে ঘুঙরিয়া॥"
    কিন্তু রবিগানের বিশেষত্ব হল তার সঞ্চারী। সুধীর দাশগুপ্ত উদ্ধৃত করছেন সঙ্গীত রসজ্ঞ সুভাষ চৌধুরীর কথা, ‘সঞ্চারীযুক্ত হল বলেই গানটির খেয়ালের ছাঁচটি সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল গানটির মেজাজটিও। বাংলায় হিন্দুস্থানির বিশেষ পরিবর্তন ঘটতে ঘটতে একটি নতুন সৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল- যা প্রাণবান, গতিবান।’
    মালকোষ তীব্র রাত্রির রাগ, তার গাম্ভীর্য অন্যরকম। তবুও এই গানের স্রোত আপনাকে মালকোষ রাগের গাম্ভীর্য থেকে তুলে নিয়ে এক অজস্র সহস্র ধারার মধ্যে ফেলে দেবে। সেখানে গমকের গুরুগম্ভীরতা নেই, নেই কালোয়াতির কেরদানি। এক সমাহিত চিত্তের গান, যেখানে কম স্বরে স্পর্শ করে করে রস সঞ্চারিত হয়।

    ভুবন, মনন, জীবন সিক্ত করার গান। পঙ্কজ মল্লিক থেকে দূরে সরে ভাবা প্রায় অসম্ভব। সেখানেই চলচ্চিত্রে সুদক্ষ সঙ্গীত নির্দেশকের কেরামতি। কিন্তু গানটিকে সঙ্গী করে তার বাইরে বেরোন। দেখুন না একবার প্রকৃত আনন্দ, পার্থিব-স্বর্গীয় আনন্দ কী ভাবে স্পর্শ করতে পারবেন! 'আ', 'ন' আর 'ধা'তে গম্ভীর স্বরের প্রয়োগ, 'ভুবনে'র বিস্তারে কোমল স্বর, 'অনন্ত গগনে'তে শিখ ছুঁয়েই আবার ফিরে আসা। দেখবেন এক আশ্চর্য শীতল অনুভূতি শরীর মনে ছড়িয়ে যাবে।

    গানের কথা হল হাল আর সুর হল পাল। পালে হাওয়া লাগলে হালও টলোমলো হতে পারে। পালে যদি লাগল হাওয়া হাল যেন না ছেড়ে যায় হাত। সেভাবেই রবীন্দ্রগানকে ধরা যাবে, হাওয়া লাগবে মনে! আনন্দ ধারা বহিবে ভুবনে!

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | | প্রথম পর্ব | প্রথম পর্ব
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন