জাতপাত আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, এই দুটিই আমাদের দেশের ভয়ানকতম ক্ষত, সে এমন ক্ষত যা সারবে এমন আশাও দুরাশা। তবুও, সংবিধান যখন লেখা হচ্ছে, আম্বেদকর জানতেন সেই ব্যধির প্রতিষেধক না থাক, অন্তত, কিছু প্রতিরোধক্ষমতা দরকার যাতে একদিন সেই অসুখ সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের গ্রাস না করে। তবে, উনি বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন, জানতেন সংবিধানের ক্ষমতা ততটুকুই, যতটা ক্ষমতাসীন লোকের অভিপ্রায়। ১৯৪৯ সালে, দিল্লিতে একটি বক্তৃতায় আম্বেদকর বলছেন, “(H)owever good a Constitution may be, it is sure to turn out bad because those who are called to work it, happen to be a bad lot.”“আ ব্যাড লট!” এখন, এই ২০২৬ সালে, দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝেই খবরে বা অ্যাক্টিভিস্টদের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে বা সমমনস্ক বন্ধু/সাথীদের আলোচনায় শুনি, অমুক কাজটা তো “অসাংবিধানিক”, শুনি, তারপর যে যার কাজে চলে যাই। “অসাংবিধানিক” শব্দটার আর কোনো ভার-ই নেই প্রায়, সংবিধান ব্যাপারটা রাস্তার ধারে স্পিড লিমিটের মত, বা “এখানে পিক ফেলবেন না”-র মত প্রায়। এস-আই-আর অসাংবিধানিক কি না, ইসিআইয়ের সাম্প্রতিক ট্যুইট সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করে কী না সেই আলাপে ঢুকবো না। সেইসব আদালতের ব্যাপার, আমরা তো সামান্য লোক। আমরা “ব্যাড লট” হলে জেলে যাবো, এফ-আই-আর খাবো, জেলে পচবো। আর ওঁরা জয়মাল্য পরে হাত নাড়বেন আমাদের দিকে। তাই, ক্ষমতাহীন আমরা অতীতের দিকে তাকাই, ইতিহাস পড়ি, আর ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভয় পাই। আর ভাবি এই প্রক্রিয়া কী আমাদের চেনা নয়? অন্য দেশে স্বৈরাচারী শাসকের প্লেবুকেও কী এই এক-ই প্রক্রিয়া দেখিনি?
ভাবুন আমেরিকার কথা-ই। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়ে গেলো একসময়, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়েই। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ ভোটাধিকার অর্জন করলেন, আমরণ সংগ্রাম করেই। এমন কী, একদিন দেখা গেলো কৃষ্ণাঙ্গ একজন মানুষ রাষ্ট্রপতি হয়েছেন সে দেশে। আমরা দূর দেশে বসে জানতে পারলাম, ‘আমেরিকা হ্যাজ় সলভড রেসিজ়ম’, আমরা প্রবেশ করলাম এখন যাকে ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিকরা বলেন বর্ণান্ধ যুগ - কালারব্লাইণ্ড এরা। কিন্তু, রেসিজ়মের ব্যাধির বীজ রয়ে গেলো সমাজের শোণিতে, ক্যান্সারের মত।
কী করে সে বীজ ডালপালা মেললো, ভেবে দেখুন। দাসপ্রথা বেআইনিই, যেমন বেআইনি কারুর সাথে গাত্রবর্ণের বা জাতির ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণ করা - সন্দেহ নেই, এক যদি না তুমি জেলখাটা আসামী হও, “ফেলন” হও – একবার ফেলন চিহ্নিত হলে, এক কোপে চলে যাবে ভোটাধিকার, না তুমি পাবে চাকরি, না পাবে ফুড স্ট্যাম্পের মত সামাজিক সুরক্ষা বা ভাতা, নাকচ হয়ে যাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বল্পমূল্য আবাসন - ইত্যাদি বিভিন্ন সুযোগ, চলে যাবে আজীবন জুরিতে বসার অধিকার। অতএব, একটি গোষ্ঠির লোককে যদি ছুতোয়-নাতায়, পুলিশ-প্রশাসন থেকে আইনের বেড়াজাল সবকিছু কাজে লাগিয়ে একবার “ফেলন” তকমা লাগানোর ব্যবস্থা করা যায়, বা দাগিয়ে দেওয়া , তাহলেই সেই সব বৈষম্যমূলক নীতি তার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা জায়েজ, যার সুযোগ অন্যথায় হবে না
[1]। বিশাল, ম্যাসিভ স্কেলে এই কাজ করা তো রাষ্ট্রের পক্ষে সামলানো চাপ – সে যুদ্ধে যাবে, না লোককে ধরে জেলে পুরবে? তাই, ক্যাপিটাল আবিষ্কার করে ফেলবে অন্যতম লাভজনক ব্যাবসা – “মাস-ইনকারশারেশন”
[2] এবং, “ফর-প্রফিট প্রিজ়ন”, রাষ্ট্রের পোষা মিলিশিয়া ঘুরবে রাস্তায়, ক্র্যাক-কোকেনের রমরমা হবে ইনার-সিটিজ়ে। এবং, সেই “ফেলন”দের অধিকার নিয়ে চিন্তিত হবেন না সমাজের আলোকিত অংশ। কিন্তু, ফেলনি তো অপরাধ, অপরাধ না করলেই তো পারে, তাই না? কিন্তু যদি আইন নিজেই বায়াসড, বৈষম্যমূলক হয়? তা হলেও, নির্দোষ কেউ শাস্তি পেলেও, বা লঘুপাপে গুরুদণ্ড হলে নিশ্চয়ই আইন-আদালত তাকে রক্ষা করবে। দেশে কী আইন বলে কিছু নেই? সে যদি আদালতের দ্বারস্থ হয় … পাবে না সুরাহা?
এর উত্তর আছে আমেরিকার অস্বস্তিকর ইতিহাস ও ঘটমান বর্তমানে। তবে অত দূর না গেলেও, উত্তর আছে আপনার চারপাশেও। ফেলনি-র জায়গায় বসিয়ে দিন “রোহিঙ্গা” বা “অনুপ্রবেশকারী” বা “বাংলাদেশি” বা “ঘুসপেটিয়া”, আদালতের জায়গায় বসিয়ে দিন “ট্রাইবুনাল” … গল্পটা এক-ই। আসলে, ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হোক না হোক, অন্ত্যমিল বজায় রেখেই নিষ্ঠুর ছড়া কাটে। ঘুমপাড়ানি ছড়াই বোধহয়। কারণ ঘুম তো ভাঙতে দেখছি না বৃহত্তর সমাজের।
এই প্রক্রিয়া নতুন না, অভিনব-ও না, এবং এতো জায়গায় এতো রকম রূপে এই জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে যে মোটামুটি ফর্মুলায় ফেলে দেওয়া যায় একে। যেমন, এই আমেরিকাতেই, “ফেলন”-এর বদলে “ইললিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট” – আর ফর-প্রফিট প্রিজন কেটে ডিটেনশন সেন্টার বসিয়ে দিন। দেখবেন খাপে খাপ, মণ্টার বাপ। ওঃ হ্যাঁ, আজকাল “ফেলন” বলে না, বলে “ফর্মারলি ইনকার্সারেটেড”, আর “ইললিগ্যাল”-ও বলে না, বলে “আনডকুমেণ্টেড”। আমাদের ইসিআই অবশ্য রেন-মার্টিন পড়া বাবু, এরা বলেন, অ্যাডজুডিকেটেড, বলেন আনম্যাপড।
যা হোক, তো সেই ফর্মুলা কেমন? মোটের উপর তিনটে ধাপ।
১) শাসকের বা প্রশাসকের লাগামহীম ক্ষমতা / Unbridled Discretion
২) আইনি প্রতিকারের বঞ্চনা / Denial of Judicial Remedy
৩) বঞ্চিত মানুষের সামাজিক অধিকার খর্ব করা / Civil Exclusion, Disenfranchisement
এইবার এই ফর্মুলায় ফেলুন এস-আই-আর-কে। এস-আই-আরের ক্ষেত্রে, প্রথম ধাপটা ঐ, কমিশনের "লাগামহীন ক্ষমতা", যাকে ইচ্ছে বাদ দাও - লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির নামে ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ করো, সফটওয়্যার পাল্টাও সকাল-বিকেল, আদেশ-নির্দেশ জারি হোক হোয়াটস-অ্যাপে, গণ্ডা-গণ্ডা লোক মরছে মরুক, কোত্থাও কোনো গার্ড-রেইলস নেই। রিপোর্টার্স কালেক্টিভের আয়ুষী কর যেমন লিখেছেন, "অ্যাজ় ইট ডিমড ফিট" ... এর পরের ধাপে ট্রাইবুনাল নামের ঢপেচ্চপ হবে, কে যাবে কোথায় যাবে কী করবে বুঝতে না বুঝতে ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গন। তারপর একেবারে মাস-স্কেলে ডিসএনফ্র্যাঞ্চাইজ়মেন্ট, ৯০ লক্ষ লোক ভ্যানিশ। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু, এর পর কী? চাকরির সুযোগ, বাড়ি কেনা বা ভাড়া? পড়াশুনোর সুযোগ, ভাতা, চিকিৎসা? ঠিক কী কী অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে এক্ষুণি বলা শক্ত। ইতোমধ্যে সে সব শুরুও হয়ে গেছে, বাহুল্য বলা। তবে, মহামান্য ই-সি-আই আশা করি ট্যুইট করেই দেবেন।
মিশেল যা দেখেছেন আমেরিকায়, সেই এক-ই ছবি আমি দেখছি আমার দেশে। জাতি ও শ্রেণির ভিত্তিতে যে বৈষম্য বহু বছর ধরে পূঞ্জীভূত হয়ে ছিলো আমাদের দেশে, আশঙ্কা হয়, এস-আই-আর সেই জাতিভেদ ও পাহাড়প্রমাণ অসাম্যকেই নতুন সূক্ষ্ম একটি রাজবস্ত্র পরিয়ে দিলো। অসাম্য দূরীকরণ তো বাদ-ই দিন, বরং সামাজিক ভেদাভেদকে একটা আপাত-নিরপেক্ষ আইনের আদল দিলো, আমাদের চোখের সামনেই। আমরাও দেখে গেলাম, “চোপ আদালত চলছে”। বামপন্থীরা কেউ হিন্দি গানের সাথে রিলস বানালেন, কেউ প্রথমে দুহাত তুলে স্বাগত জানিয়ে পরে বেগতিক বুঝে অল্প মৃদু তিরস্কার করলেন, কেউ বললেন, ও কিছু না, গ্রোয়িং পেইন। কেউ কেউ চেঁচালেন, বিশেষ কেউ শুনলেন না।
তাও, আজ যদি কেউ শোনেন, তাই, তথ্যসূত্র উল্লেখ করা উচিত। আমেরিকায় এই নির্মম ইতিহাস ও বর্তমানের বিস্তৃত বর্ণনা পাবেন Michelle Alexander-এর বইতে, The New Jim Crow: Mass Incarceration in the Age of Colorblindness। উনি দেখাচ্ছেন, এইভাবেই হয়ে এসেছে, এই বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া। তবে, যেমন উপরে লিখলাম, তাতে ল-এনফোর্সমেন্ট, ওয়র-অন-ড্রাগস ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিষ জড়িয়ে। পড়ে অবশ্য খুব একটা লাভ নেই। আর কী হবে পড়ে? বরং, ধুরন্ধর-১/২ দেখে আসুন, না হলে ঐ দিগন্তে আরেক রণবীরের সিজিআই রামায়ণ আসছে।
সন্দীপন লিখেছিলেন না, “বুটপরা শ্রীরামচন্দ্রের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, তার বগলে এস এল আর”? আমরা দূরে বসেও সেই বুটের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি স্পষ্ট, শুধু এই যাত্রায় তাঁর বগলে এস-আই-আর।
----
[1] মিশেল আলেকজ়াণ্ডার লিখেছেন, “বর্ণবাদের নামে বৈষম্য করা এখন আর সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, তাই আমরা সেটা করি না, বদলে "ফেলন" তকমা লাগাই, কারণ ফেলনদের বিরুদ্ধে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, চাকরি-বাড়ি-শিক্ষা-ভাতা থেকে বঞ্চিত করা, সবই আইনসম্মত। আমেরিকায় বর্ণবৈষম্যমূলক জাতিভেদের অবসান হয়নি, শুধু নতুন পোশাক পরেছে।“
[2] এক-ই বইয়ের অন্যত্র, মিশেল লিখছেন, “আমেরিকায় কারাবন্দীর হার পৃথিবীর সর্বোচ্চ, সভ্য দেশগুলির সবার থেকেই বেশি তো বটেই, এমন কী দমননীতির চূড়ান্ত বলে যাদের গণ্য করা হয় সেই রাশিয়া, চীন, বা ইরানের থেকেও অনেকটাই বেশি। জার্মানিতে প্রতি লক্ষে ৯৩ জন কারাবন্দী, আমেরিকায় সেটা প্রায় আট গুণ, ৭৫০। আর এই কারাবন্দীদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের অনুপাত এতটাই যে অ্যাপারথেইডের চূড়োয় থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়েও বেশি শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিককে কারাগারে পুরেছে তথাকথিত সভ্য দেশ আমেরিকা। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে চারজন তরুণ কৃষ্ণাঙ্গের মধ্যে তিনজনই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কারাগারে যাবেন বলে অনুমান।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।