এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • সা রে গা মা পা ধা নি (তৃতীয় সুর)

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • গা….( তৃতীয় সুর )
     
    গান্ধারী মুর্মু, গান্ধারী মুর্মু… খেনো গলায় হেঁকে চলে ঝড়ু।
     
    আজ সেটেলমেন্ট অফিসের বাইরে লোকজন একেবারে গিজগিজ করছে। মেলা বসে গেছে যেন। মহুলতলির মানুষজনের ভিড়ে মুখরিত গোটা চত্বর। দেখে মনে হয় যেন করম পরবের জমায়েতে সামিল হয়েছে সবাই। আসলে সরকারি জমির পাট্টা বিলির কাজ চলছে গত সাত দিন ধরে। খাস জমির বিলি বন্দোবস্ত অবশ্য আগেই হয়ে গেছে, এখন মালিকানা হস্তান্তরের পালা। আজকাল জঙ্গলের আইনেও বিস্তর বদল হয়েছে। অথচ এইসব আদিবাসী,বনবাসী মানুষজন জন্ম ইস্তক জঙ্গলের সঙ্গে নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। জঙ্গল এইসব মানুষদের কাছে পরম আশ্রয়, ভালোবাসার ভাবনা। নিজেদের সন্তানের মতো বুক চিতিয়ে এই জঙ্গলকে আগলে রেখেছে এতো কাল। সরকারের আঁড়কাঠিরা গেরামে গেরামে ঘুরে ঘুরে খোঁজ নিয়ে ফেরে কোথাও একটু ফাঁক ফোকর পায় কিনা! গান্ধারী মুর্মু ওদের বলে আবর্জনার বাসিন্দা। এমন কথা শুনেও মানুষগুলোর কোনো হেলদোল নেই। দেখে মনে হয় এমন সম্বোধন‌ই ওদের প্রাপ্য। 
     
    সেটেলমেন্ট অফিসের পিওন ঝড়ু, লম্বা লিকপিকে ঢেঙা চেহারা। মাথায় বাবরি চুলের বাহার। খাটো করে পড়া ধুতি আর খাকি রঙের জামায় তাকে দেখে মনে হয় ঠিক যেন নরকের প্যাদা। আমদানির গন্ধ পেলেই ধূর্ত শিয়ালের মতো ছুকছুক করতে থাকে। ওকে দেখলেই গান্ধারী তেড়ে ওঠে। 
    তুলনায় সেটেলমেন্ট অফিসের বড় সাহেব অনেক ভালো। অল্প বয়স, কেমন যেন মায়াময় চোখ দুটো। নামটাও যেন একটু অন্যরকম – চিরাগ মুর্মু। এর আগে বার দুই গান্ধারী এই সেটেলমেন্ট অফিসে এসেছে বটে, তবে অফসর বাবুর সঙ্গে দেখা হয়নি। দূর থেকে এক নজর দেখা।আজকেই প্রথম মোলাকাত হবে। আজকেই জমির দলিল আর পাকা পরচা মিলবে। কতোদিন ধরে এই এক চিলতে জমির জন্য অপেক্ষা করেছে গান্ধারী। মনে মনে বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে সে। 
     
    ঝড়ু পিওন আবারও তার খেনো গলায় হেঁকে ওঠে – “গান্ধারী মুর্মু, গান্ধারী মুর্মু। ই লোকগুলার কোনো হুঁশ লাই। দেখো গিয়া, লেশা ক‌ইরে কুথায় ডুবকে আছে ! গা…।”
     
    ঝড়ু পিওন কথা শেষ করতে পারে না। জটলার ভিতর থেকে বলিষ্ঠ কণ্ঠে জবাব ভেসে আসে।
    – হ,ইতো হাকাহাকি ক‌ইরছো কেনে আমার নামটো লিয়ে? আমিতো সেই তুখন থেইকে ব‌ইসে আছি ওই ডবকা মহুল গাছটোর লিচে। হুথায় হামার মরদটাও তো বুইসা আছে সেই সকাল থিকে। এতুক্ষণে তুমাদের হুঁশ হ‌ইলো?
     
    – ও, তুই ! তুকে তো আমি বিলকুল চিনি। তা এতুক্ষণ হাঁক পাড়ছি তুয়ার সাড়া লাই কেনে? ইবার সাড়াটো না পেইলে তুয়ার নামটো কেইটে দিতাম।
    – হ হ, তুয়ার দৌড় তো আমি জানি। কত্তো বড় হিম্মত তুয়ার! আমার নামটো কেইটে দিতি। দেখ না কেনে চেইষ্ঠা করে।
     
    গান্ধারীর কথা শুনে একটু যেন গুটিয়ে যায় ঝড়ু। গান্ধারী সেটা টের পায়। তারপর গলা উঁচিয়ে হাঁক দেয় – “ও ফাগো মাস্টর, কুথায় গেলে বাপ। হামাদের ডাক আইসছে। হেথায় আসি পড়ো বটে! ফাগো মাস্টর… পা চালাই আসো কেনে।
     
    ফাগো মাস্টর এই মহুলতলির মানুষজনের কাছে খুব পরিচিত নাম। মহুলতলিতে তখন‌ও এখনকার মতো প্রাইমারি স্কুল গড়ে ওঠেনি। নিতান্তই পিছিয়ে পড়া একটা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতি এলাকা, সেখানে স্কুল তৈরি করবে কেন? ফাগো মুর্মু সেই অন্ধকারে ঢাকা বনবস্তিতে প্রথম আলো জ্বাললো, শিক্ষার আলো। গান্ধারী গেরামের ঘরে ঘরে ঘুরে সবাইকে বোঝাতো তাঁদের ছেলে মেয়েদের ফাগো মাস্টরের পাঠশালায় পাঠানোর জন্য। গান্ধারী খুব ভালো ঝুমুর গান বাঁধতে পারতো। করম পরবের সময় যখন এই এলাকার সমস্ত মানুষ এসে ভিড় করতো মহুলতলিতে। তখন ঝুমুর গান গেয়ে সে প্রচার করতো নতুন আলো জ্বালবার কথা, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবার কথা।     
     
      শুনগো তুরা শোন,মন লাগায়ে শোন,
      লিখা পড়া শিখতে হবে, তুরা পাঠশালাতে চল,
      শিক্ষা আনে চেতনা, মনে জোগায় নতুন বল।
      সবাই পাঠশালাতে চল।
     
    ঝড়ু পিওন আবারও তাড়া দেয় – “আরে,তুরা কত্তো সময় লিবি? তুদের লিগা কি ছ্যার বুইস্যা থাইকবে? জল্দি করো কেনে। তুদের লেগে টিপিনের সময়টো বরবাদ হ‌ইয়া গেল।
     
    গান্ধারী মুর্মু কোনো কথা বলে না। সে জানে বাবুর তুলনায় তাঁর পারিষদরা অনেক অনেক বেশি কথা বলে। চুপচাপ তাঁরা পর্দা সরিয়ে সেটেলমেন্ট অফিসারের ঘরে ঢোকে।
     
    “মাস্টারমশাই আপনি? নামটো দেখে আমার একবার সন্দেহ হয়েছিল বটে। আসেন,আসেন। বসেন কেনে। ঝড়ু! পাশের ঘরটো থিকে একটা চেয়ার এনে দাও দিদিমণির জন্য।”– সেটেলমেন্ট অফিসার ব্যস্ত হয়ে পড়েন দুই গ্রামীণ আদিবাসী মানুষের আপ্যায়নে। ছ্যারের এমন কাণ্ড দেখে অবাক হয় ঝড়ু পিওন। সবথেকে অবাক হয় ফাগো মাস্টর আর গান্ধারী।
    এতোকাল তুই,তোকারি শুনতে অভ্যস্ত গান্ধারী বুঝতে পারেনা এই পরিবর্তনের পেছনের কারণটা।
     
    “ আপনি আমাকে চিনতে পারেন নাই মাস্টারমশাই। আমি চিরাগ, বুধন মুর্মুর ছেলেটো বটে। আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি মহুলতলির ফাগো মাস্টরের পাঠশালায়। আমি আপনার স্টুডেন্ট বটে। কেমন আছেন আপনারা?”-- চিরাগ মুর্মুর গলা ধরে আসে। কোনো কথা বলতে পারে না।
     
    চোখের জলে ভিজে ওঠে ফাগো মাস্টর আর গান্ধারী - দুজনেই। এই আনন্দের মধ্যেও গান্ধারীর মনে পড়ে যায় নিজের হারিয়ে যাওয়া ছেলে সুরজের কথা। সমাজের সব অন্ধকার দূর করতে পথে নামা সুরজ কোন পথের বাঁকে যে হারিয়ে গেল তা আজ‌ও জানেনা তাঁরা।
     
    জমির পরচা আর দলিল ফাগো মাস্টরের হাতে তুলে দিয়ে চিরাগ প্রণাম করে দুজনকে। তারপর ধরা গলায় বলে –”আজ একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন। আমি পাশে থাকবো।”
     
    দলিলটা মাথায় ঠেকায় ফাগো আর গান্ধারী। তারপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। অনেক অনেক লড়াইয়ের পর আজ ওঁরা দুজনেই যেন সত্যি সত্যিই জয়ী হয়েছে।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন