এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • হিমাচলের ইতি উতি - ৭

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ২৯ মে ২০২৬ | ৫৯ বার পঠিত
  • ৯ তারিখ সকালে ঘুম ভেঙেই দেখি মেক মাই ট্রিপে বুক করা গাড়ির সারথিমশাই ‘স্যার স্যার’’ করে খান চারেক মেসেজ করেছেন। মেসেজগুলো রাত আড়াইটে থেকে ৩টের মধ্যে এসেছে। আজব তো! অত রাত্রে মেসেজ করে উত্তরের আশাও করছিলেন ইনি। সকাল ৯টায় আসতে বলে লাইভ লোকেশান পাঠিয়ে দিলাম। হোটেলের ঘর থেকে পাঠানো লোকেশান গুগল যে আসলে কোথায় দেখাবে খোদায় মালুম। যাকগে ফোন করলে দেখা যাবে।

    নটা নাগাদ তৈরী হয়ে রিসেপশানে যেতে সেই প্রথমদিনের ছোকরা এলো আমায় ওপরে পৌঁছে দিতে। আসলে ওকে দরকার সারথীমশাইকে গাইড করে হোটেলের সামনে আনার জন্য। তা মোটামুটি মিনিট সাতেক ধরে ফোনে গাইড করার পরে তিনি এলেন। শিমলাকে টা টা করে চললাম কাসোলের দিকে। কাসোলে ওডিন হোস্টেলে থাকবো চার রাত। জোস্টেলে ফিমেল ডর্মে জায়গা পাই নি, তাই ওডিন হোস্টেল।

    সারথীমশাই কাল রাতে গাড়ি চালিয়ে এসেছেন গুরগাঁও থেকে। একে কাসোল তায় হোস্টেলে ড্রপ দেখে ধরেই নিয়েছিলেন কোন অল্পবয়সী ছোকরা হবে। রাত আড়াইটে তিনটেয় জেগেই থাকবে ভেবেই মেসেজ করেছিলেন। তার বদলে হাইকিং স্টিক হাতে এক প্রৌঢ়াকে দেখে দৃশ্যতই বিস্মিত। ঘন্টাখানেক চলেই এক জায়গায় দাঁড়ালেন, বেজায় ঘুম পাচ্ছে, কড়া চা আর কিছু খাবার না খেলে চলতে পারছেন না। এদিকে তিনি সারাক্ষণই ফোনে।

    যা বুঝলাম নিজে MMTর হয়ে চালালেও তাঁর নিজেরও গাড়ি ভাড়া দেবার ব্যবসা। অনবরত কারো পিক আপ কারো বা নতুন কোন ট্রিপের প্ল্যান করেই চলেছেন। দু তিনবার বললামও এত ফোন না ধরতে। টিপিকাল জাঠ ভঙ্গীতে জানিয়ে দিলেন কুছ নেই হোগা ম্যাডাম ইধার কোই পোলিস ওলিস নেই রহতা হ্যায়। ধুত্তোর পুলিশ, অ্যাক্সিডেন্ট হবে যে। নাহ সে নাকি সম্ভবই নয়। ১২ বছর বয়স থেকে গাড়ি চালাচ্ছেন ওসব অ্যাক্সিডেন্ট ফেন্ট ওনার হয় নি।

    মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে চুপচাপ বসি, ভুন্টার পেরোন পর্যন্ত এই চলে। মাঝে এক বড় ধাবায় থেমে দুপুরের খাওয়া হয়। আমি একপ্লেট চিকেন চাউমিন নিয়ে অর্ধে খেয়ে বাকীটা প্যাক করিয়ে নিই। রাতে হোস্টেলে খেয়ে নেবো। ভুন্টারের পরে রাস্তা সরু হয়ে আসে, জায়গায় জায়গায় বেশ খারাপ। মেরামতি চলছে। এক জায়গায় টোল নিল ১০০/- টাকা। যদিও MMTতে লেখা ছিল টোলচার্জ, ড্রাইভারের খাওয়া দাওয়া সবই মোট ভাড়ার অন্তর্গত, আলাদা করে যেন কিছু না দিই। তবু ইনিও চাইলেন আমিও দিয়েই দিলাম।


    ভুন্টার থেকে কাসোলের পথে

    কাসোল পৌঁছাতে বিকেল পাঁচটা পেরিয়েই গেল। হোস্টেল থেকে ফোনে বলে দিয়েছিল মেন রাস্তার ওপরেই হোস্টেল, তবে সদ্য শিমলার অভিজ্ঞতায় ‘'রাস্তার ওপরেই' ব্যপারটা নিয়ে আমি একটু সংশয়ে ছিলাম। সারথীমশাই তো লোকেশান এখানেই দেখাচ্ছে বলে একটা পার্কিঙ লটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। নেমে একজনকে জিজ্ঞাসা করে আট দশ পা পিছোতেই পাওয়া গেল ওডিন হোস্টেল। চেকইন করতে গিয়ে জানা গেল ফিমেল ডর্ম চার তলায়।


    ফিমেল ডর্ম

    সইসাবুদ করিয়ে যে ছোকরা ওপরে নিয়ে চলল তার নামটা মজার, নিট্টু ট্রিপি। বয়স জিজ্ঞাসা করায় প্রথমে বলল সতেরো, বলেই বলে না না উনিশ। এদিকে সারথীমশাই সারারাস্তা বিভিন্ন লোককে বলে গেছে ওনাকে কাসোল থেকে ভুন্টার বা কুলু বা চন্ডীগর কোথাও ফেরার ভাড়া যোগাড় করে দিতে। সে না পেয়ে কাসোলের ওয়েদার চেক করে ঘাবড়ে গেছেন, রাতে মাইনাস পাঁচ টাচ হবার কথা। গাড়িতে মোটা কম্বল নেই, ঘুমোবেন কী করে। আমি বলেছিলাম হোস্টেলে বলে দেবো।

    তো নিট্টু বলল কম্বল বা ঘর যাই চাও দেবো, তবে ঘরের ক্ষেত্রে রাতে যাত্রী এলে ছেড়ে দিতে হবে, ফুল বুকড আছে। সারথীমশাই প্রথমে কিছুতে ট্রিপ এন্ড করছিলেন না। এন্ড না করলে আমিও বাকী পেমেন্ট করবো না। তা সেসব করার পরে অ্যাপ চেক করে দেখি উনি যা বলছেন তার থেকে দেড়শো টাকা কম। সেটা দেখিয়ে গুগল পে করছি আর উনি ঘ্যানঘ্যান করছেন পার্কিং দাও, পার্কিং দাও। কিসের পার্কিং ভাই? না শিমলায় কাল রাত্রে পার্কিং চার্জ নিল, সেইটে দাও।


    ওডিন হোস্টেল

    আমার ট্রিপ তো সকাল নটায় শুরু তার আগের রাতের পার্কিং আমার তো নয় ভাই। না ম্যাডাম সবাই দেয়। নিট্টু ওর খাড়া নাকখানা গলিয়ে বলে আরে এরম করলে তোমায় এখানে থাকতে দেবো না, বলেই আমায় তাড়া দেয় চলো চলো উপরে চলো। উঠতে উঠতে বলে ইয়ে হিমাচলি নেহি হ্যায়, ইয়েলোগ যো আপনা হক কা নেহি হ্যায় উয়ো ক্যায়সে মাঙতে রহতে হ্যায়? আজীব! হুম্ম তা বটে। এখানে মোটামুটি আটচল্লিশটা সিঁড়ি, তার মধ্যে শেষ বারোটা কাঠের আর প্রায় খাড়া।


    শেষ কখানা সিঁড়ি

    ফিমেল ডর্মে তিনখানা খাট সাথে একটা করে ছোট ড্রয়ার কাম টেবল আর ঘরের কোণায় পাশাপাশি তিনখানা হাঁটু সমান উঁচু আলমারি, গায়ে চাবি ঝুলছে। এরা নাকি লকার। পরে দেখেছিলাম একটাই লকারে ঠিকঠাক চাবি আটকায়, বাকী দুটোই গোলমেলে। আপাতত আর কোন মহিলা যাত্রী নেই, আমি একাই পুরো ঘরখানার মালিক। যে চার রাত্তির ছিলাম একাই ছিলাম। ওই মাঝ নভেম্বরে আর কোনো মহিলা ডর্মে থাকতে আসেন নি। ট্যাক্স নিয়ে ৬৫০/- টাকা পার নাইট। ঘরের লাগোয়া মস্ত বাথরুম, ইলেকট্রিক গিজারওয়ালা।

    তোয়ালে নিলে ৫০/- টাকা লাগবে। নিয়েই নিলাম। ব্যবস্থা বেশ ভাল। ডর্মের ভাড়ায় পুরো ঘর পেয়ে তো আরোই ভাল। কিন্তু চাদর বালিশ কম্বল তোয়ালে সবই গাঢ় ছাই রঙের। ফলে ঘরের মধ্যে আলো কম লাগে, একটা ভুতুড়ে ডিপ্রেসিং ভাব। হোস্টেলের ক্যাফেটেরিয়া এই চারতলাতেই। সাড়ে আটটা নাগাদ সেখানে গিয়ে দেখি বাপরে কি গাঁজার গন্ধ! ইইক্কসস। তিব্বতী স্টাইলের নীচু নীচু বসার জায়গা, টেবল। সাথে আনা চাউমিন গরম করে একগ্লাস হট চকোলেট নিয়ে খেয়েদেয়ে ঘরে ফিরে ঘুম।


    হোস্টেল ক্যাফেটেরিয়া - ওওই সামনে থেকে রাস্তা আর কাসোল নেচারস পার্কের চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়

    সকালে ঘুম ভাঙতে আটটা বেজে গেল। নটা নাগাদ একেবারে তৈরী হয়ে গেলাম ক্যাফেটেরিয়ায় কফির খোঁজে। কিন্তু নাহ সাড়ে নটার আগে হবে না, কোন লোকই নেই। দিনের বেলায় দেখি একেবারে সামনে এগিয়ে গেলে চমৎকার একখানা বসার জায়গা, সামনে খোলা, যতদূর চোখ যায় কনিফেরাস গাছেদের দেয়াল আর ফাঁক দিয়ে নিষ্কলুষ উজ্জ্বল নীল আকাশ, নীচে কাসোলের প্রধান রাস্তায় গাড়ির সারি, একটা HRTCর বাসও দেখা গেল।


    ঝকঝকে সকাল

    নীচে নেমে হোস্টেলের কাসোল শাখার প্রধানের সাথে আলাপ হল। আশেপাশে ঘোরার ব্যপারে প্রয়োজনীয় খবরাখবর নিয়ে বাইরে বেরোতেই আলো আর হাওয়া দুভাইবোন হইহই করে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। হাওয়া বলে তুমি না চালাল যাবে, চল চল শীগগির। বললাম দাঁড়া বাপু এককাপ কফি না খেয়ে কোথাও যেতে পারবো না। গুগল বলেছে হোস্টেলের কাছেই রিভারসাইড ক্যাফে। ম্যাপ ধরে পৌঁছে দেখি নদীর ধারের ছাউনিটা বন্ধ।

    একটু ভেতরে উঁচু জমিতে একটা হোটেল, তার রিসেপশানে পৌঁছাবার সিঁড়িই পেল্লায় উঁচু উঁচু। এক হাসিখুশী ভদ্রমহিলা সিঁড়ি আর চাতালে সাজানো গাছপালাগুলো ঝাড়ছিলেন, জানালেন বর্ষায় নদীর জল উঠে আসায় নদীর পাড়ে ক্যাফে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন সেটা হোটেলের ছাদে রুফটপ ক্যাফে। অগত্যা সাড়ে তিনতলায় উঠে এককাপ কফি আর একবাটি স্যুপ নুডল খেয়ে আলোকে বললাম এইবারে চ যাই ছালাল। হাওয়া তো সেই কখন পালিয়েছে।

    একে তাকে জিজ্ঞাসা করে করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, বাজার পেরিয়ে নদীর কাছাকাছি পৌঁছানো গেল। কাসোলের প্রধান সড়ক পুরোটাই অবশ্য জমজমাট বাজার, ছোটখাট পাহাড়ি শহরে যেমন হয় আর কি। পার্বতী নদী সত্যিই হিমালয়কন্যা। সেই পিন পার্বতী গিরিপথের ঠিক নীচের মান তালাই হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে এঁকেবেঁকে অতি দ্রুতগতিতে ১৫০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে ভুন্টারে দিদি বিপাশার কোলে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। চলার পথে দুপাশের পাথর ভেঙে ক্ষইয়ে গড়ে তুলেছে অপরূপ পার্বতী উপত্যকা।

    চালাল ৫৩৫৮ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত শান্ত ছোট একটা গ্রাম। শুনেছিলাম কাসোল থেকে দেড় কিমি মত ট্রেক করে যেতে হয়। গিয়ে অবশ্য দেখলাম ট্রেক নয় খুবই সহজ হাইক। কাসোলে আপনি যেখান দিয়েই হাঁটাহাঁটি করুন নদীর কলস্বন আপনার কানে লেগে থাকবেই। কখনো একটু মৃদু, কখনো বা গর্জনের মত। এই গর্জনের মত আওয়াজ শুনেই বুঝলাম নদীর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। চালাল যেতে নদীর উপরে ব্রিজ পেরিয়ে পায়ে হাঁটা রাস্তা ধরতে হবে। লকপকে এই ব্রিজটা কেব্ল সাসপেন্সান ব্রিজ, হাঁটার সময় রীতিমত দোলে।

    https://youtube.com/shorts/d9tzlVGG7UU?si=Qyn3qWxVEfVsaOWj
    গর্জনশীল পার্বতীর উপরে দোদুল্যমান ব্রিজ

    ব্রিজে পা দিতেই হাওয়া দৌড়ে এসেছিল ‘'এসেছ এতক্ষণে! এসো এসো পা চালিয়ে।’’ বলতে বলতেই দু ভাইবোনে নদীর জলে, পাথরভাঙা ফেনায়, পপলারের চিরল পাতার ফাঁকে ফাঁকে লুটোপুটি হুটোপাটি করতে করতে দে দৌড় দে দৌড়। আমি কি আর ওদের সাথে দৌড়ে পারি! চললাম ধীরেসুস্থে আপনমনে পার্বতীর জলে আলোর চিকিমিকি দেখতে দেখতে। এবড়ো খেবড়ো কাঁচা রাস্তা তবে দিব্বি তড়বড়িয়ে হাঁটার মত। রাস্তা ক্রমশ উপরে ওঠে, পার্বতী আরেকটু নীচে চলে যায়, সঙ্গ ছাড়ে না অবশ্য।


    সঙ্গে চলেছে পার্বতী

    একপাশে ক্রমশ নীচে চলে যাওয়া নদী আরেকপাশে উঁচুনীচু পাহাড় মাঝে রাস্তা। মাঝে মাঝেই উল্টোদিক থেকে দৌড়ে নেমে আসছে গলায় ঘন্টা বাঁধা ঘোড়ার দল। দূর থেকে ঘন্টার ঠুনঠুন আওয়াজ পেলেই সভয়ে সরে দাঁড়াই পাথর ঘেঁষে। কোথাও কোথাও রাস্তা এত সরু যে একেবারেই দাঁড়াবার মত জায়গা নেই। সেখানে হাঁচড় পাঁচড় করে দু একটা পাথর বেয়ে একটু উঠে দাঁড়াই। বাপরে আমার যা ব্যালেন্সের ছিরি, আলতো ঠোকা লাগলেও সোওজা পার্বতীর কোলে গিয়ে পড়বোখনে।


    রাস্তার এই অংশটা বেশ চওড়া

    ঘোড়ার দলের নেতা বালক অনাবিল হাসে ‘'কুছ নেহি করেগা বহেনজি’’। উত্তরে ক্যাবলার মত হেসে আবার এগোই। মিনিট দশেক এগোনর পরে পেছন থেকে গাড়ির হর্ন এবং পাশে সরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই একটা মারুতি অমনি এসে পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। হ্যাঁ মশাই, একো নয় অমনিই ওটা। গাড়ির সারথি এক তিরিশ বত্রিশের যুবক মুখ বাড়িয়ে বলে কাঁহা যাওগে? বলি চালাল, তবে গাড়ি লাগবে না। বলে ‘'আররে হম থোড়ি চালাল যা রহে! আ যাও দোস্ত বৈঠ যাও। থোড়া আগে ছোড় দেতা হুঁ।’’

    বলি না না হেঁটেই যাবো। একটু দু:খিত মুখে বলে “ব্যয়ঠো না দোস্ত প্যয়সা নেহি লাগেগা বাবা। কিঁউ ইতনা পায়দল চলোগে। তাকে বলি আরে বাবা পায়ে হাঁটবো বলেই তো এলাম। একগাল হেসে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে বোঁ করে বেরিয়ে যায়। মনে মনে ভাবি গড়গড়িয়ে গাড়ি যাচ্ছে এ তো বাপু ট্রেক রুট নয় কোনমতেই। এদিকে উল্টোদিক থেকে দেখি বাচ্চা কাচ্চা স্যুটকেশ ব্যাগ নিয়ে লোকজন আসছে। এঁরা চালালে এক কি দুইরাত থেকে কাসোল আসছেন।

    কথা বলে জানতে পারি কাসোলে হোটেলের ভাড়া বেশী তাই এঁরা চালালে হোমস্টেতে থেকেছেন। আমি ওঁদের হোস্টেলের খবর দিই। ওঁরা আমাকে চালাল আর তোশের হোমস্টের খবর দেন। আবার এগোন, আবার ঘোড়ার দল। এক জায়গায় মস্তবড় ধ্বসের চিহ্ন। ডানদিকের পাহাড় থেকে নেমে রাস্তা ভেঙে বাঁদিকের তারের জালি ভেঙে সোজা নদীতে নেমেছে। বুঝি একাধিক ধ্বস নেমেছিল। প্রথম ধ্বসের পর তারের জালি দিয়ে বাঁদিকটা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। রুদ্র প্রকৃতি প্রচন্ড রোষে সেই জালিশুদ্ধ ভেঙে নিয়ে গেছে।

    এই জায়গাটা সাবধানে পা টিপে টিপে ডানপাশের ভাঙা পাহাড়ে হাত রেখে পেরিয়ে যাবার পরে আবার দিব্বি রাস্তা। মাঝে মাঝে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম। দুএক জায়গায় পাশে খানিকটা জমি সমান করে স্রেফ একটা চা আর খাবারের দোকান বান৮য়ে রেখেছে। মালিক মালকিনের বাড়ি হয়ত পাহাড়ের অনেকটা উপরে কোথাও। মিনিট পঞ্চাশেক বাদে পৌঁছে গেলাম চালাল। ঠিক গ্রাম বলা যায় না, ছোটখাট পাহাড়ি টাউনের মত। ঢোকার মুখেই পরপর চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্ট।


    ওয়াবি সাবি রেস্টুরেন্ট


    ওয়াবি সাবির ধারণা ব্যাখ্যা করা

    একটা খোলামেলা দেখে খাবার জায়গায় ঢুকে চা বানাতে বলে বসলাম। সবগুলো দোকানই নদীর দিকে, বড়সড় জানলা বা এমনিই ছাদ ঢাকা দুদিক খোলা চত্বরে চেয়ার টেবল পাতা। কাসোল পরিচিত ইজরায়েলি অতিথিদের জন্য। তারাই বেশী সংখ্যক চালাল বা তোশের মত গ্রামগুলোতেও আসে। আর আসে মালানা[১]। তবে মালানায় তো আর বাইরের কাউকে থাকতে দেওয়া হয় না, তাই অন্যান্য গ্রামগুলোতেই থাকে এরা। তা ইজরায়েলিদের আসার উদ্দেশ্যই হল মালানা ক্রিম বা অন্যান্য শুকনো নেশাদ্রব্যের জন্য।


    আআহ একপল দাঁড়ালেই মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়

    যতক্ষণ চা বানানো হচ্ছে আমি ঘুরে ঘুরে ছবি তুলি আর গপ্পো জুড়ি। দোকানি মানুষটি মাঝবয়সী। জানান এই ঘোড়াগুলো সব মালবাহী। ভুন্টার থেকে চাওল আটা দাল আলু পেঁয়াজ ছোটাহাতি বা ওইরকম কোন গাড়িতে আসে কাসোল। সেখান থেকে ঘোড়ায় করে চালাল বা নদীর এই পারের অন্য কটা গ্রামেও যায়। ট্যুরিস্টলোগের জন্য। ফরেনারলোগদের জন্য পাস্তা নুডলস ইত্যাদিও আসে এভাবে। আরো জানান ওঁর কাছে সব রকমের নেশার জিনিষ পেয়ে যাবো আমি। চাইলে সাপের বিষও দিতে পারবেন।

    https://youtube.com/shorts/YF5vV7pYSqE?si=RBZhXUZln5JHbf8k
    এখানে বসে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়া যায়

    বাপরে! একটু সন্দিগ্ধ হয়ে বলি কিন্তু এখন তো শীত পড়ে গেছে। বলেন না না শীতকাল বলে সমস্যা হবে না, যথেষ্ট স্টোর করা আছে। আমি চা খেয়ে আস্তে আস্তে কেটে পড়ি। ইতোমধ্যে রোদ্দুরের তেজ বেড়েছে ভালই। হাওয়া যে কোথায় পালিয়েছে কে জানে! ফিরতি পথ ধরার আগে একটা কোণায় দাঁড়িয়ে পার্বতীর জলে আর নদীর ধারের বনে সিলভার ফারের পাতায় আলোর ঝিকিমিকি খেলা দেখে বললাম চ' এবারে ফিরি। মোটে পাত্তাই দিল না। কটা ছবি তুলে ফেরার পথ ধরি।


    চোখ ফেরাতে পারি না

    আধাআধি নেমে আবার একটা খাবার জায়গায় দাঁড়াই। এটার বেশিরভাগ বসার জায়গাই একদম খোলা, শুধু রান্না আর চা বানানোর জায়গায় মাথার উপরে পাতার ছাউনি দেওয়া। যাবার সময় দেখে গেছিলাম এখানে সিড্ডু পাওয়া যায়। খিদেও পেয়েছে জব্বর। একপ্লেট সিড্ডু শুনে মালকিন একটু ইতস্তত করে বলেন আচ্ছা বোসো দিচ্ছি বানিয়ে, তবে একটু সময় লাগবে। কতক্ষণ? এই আধাঘন্টা চালিস মিনট। বেশ আমার কোন তাড়া নেই। জ্যাকেট খুলে নিশ্চিন্ত হয়ে সিলভার ফারের নীচে পা ছড়িয়ে বসে পড়ি।


    গাছের ছায়ায় খোলামেলা বসার জায়গা


    পাশে আবার বারবিকিউ করার ব্যবস্থা

    তা সিড্ডুটা বানিয়েছিল ভালই। এটা ট্র‍্যাডিশানাল হিমাচলি খাবার। গমের আটা ঈস্ট দিয়ে কয়েক ঘন্টা ফারমেন্ট করে একরকম স্টীমড রুটি বানায়। ভেতরে কড়াইশুঁটি আলু বা আখরোটের পুর দেওয়া থাকে। পুরভরা ভাপানো রুটি তৈরী হয়ে গেলে তাতে গলানো ঘী ঢেলে লাল (টমাটো লঙ্কা) আর সবুজ (পুদিনা) চাটনীর সাথে পরিবেশন করা হয়। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে আখরোটের চাটনি দিয়ে খেতে। এখানে অবশ্য ভেতরে কড়াইশুঁটির পুর আর টমেটো আর পুদিনার চাটনি দিয়ে পরিবেশন করেছিল।


    এই হল সিড্ডু

    ফিরতি পথে ব্রিজে পা দিতেই আবার দৌড়ে উড়ে এলো হাওয়া, পিছু পিছু ঝিকমিক ঝিলমিল করতে করতে হাসিখুশী আলোও। চল চল এবারে মণিকরণ যাই। ট্যাক্সি লাগবে না হেঁটেই যেতে পারো, আমরা সঙ্গে যাবো পথ দেখিয়ে। নাহ এক্ষুণি আমায় একবার হোস্টেলে ফিরতেই হবে। বাথরুম যাওয়া, জলের বোতল ভরে নেওয়া, দুটো বিস্কুটের প্যাকেট ভরা এইসব টুকটাক।
    মণিকরণে এসেছিলাম সেই ১৯৮৯সালে। সেসব গল্প কাল বলবোখনে।


    ফিরতিপথে ব্রিজ থেকে নেমে

    [১] - মালানা - হিমাচলের সাংগ্রি-লা

    (চলবে)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ২৯ মে ২০২৬ | ৫৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন