এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  জাদু দুনিয়া

  • এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও রাত আকাশ ।

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | জাদু দুনিয়া | ১০ জুলাই ২০২৬ | ২১ বার পঠিত
  • এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও রাত আকাশ।
     
    ‘এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজম’ ব্যাপারটা কি একদম নতুন ? অন্তত আমাদের দেশে? মোটেই তেমন নয় – এমনটাই জানালেন আমার এক বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ বন্ধু। তবে রাত আকাশ পাঠের বহু পুরনো সাবেকি ব্যাপারটাকেই আপাদমস্তক বাণিজ্যিক মোড়কে মুড়ে পরিবেশনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে বিদেশের পাশাপাশি আমাদের দেশেও। একথা মানতেই হবে যে সারা দুনিয়া জুড়েই এখন পর্যটন শিল্পের রমরমা। এই ক্ষেত্রের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ ঘটছে দেশে দেশে। দেশের মানচিত্র ঢুঁড়ে খুঁজে আনা হচ্ছে নিরিবিলি এবং অপরিচিত কোনো ঠিকানা, আর তারপরেই তড়িঘড়ি করে পরিকাঠামোর উন্নয়ন ও সংস্কার করা হচ্ছে যাতে র‌ইসদার পর্যটকদের বেড়াতে বেরিয়ে সামান্যতম অসুবিধা না হয়, ঘরের বাইরে বেরিয়েও তাঁরা যেন নিয়ত অনুভব করেন নিজেদের বাড়িতে থাকার অখণ্ড নিরাপত্তা ও আনন্দ, সুখ ও বিলাস।
     
    এটা তো গেল এই শিল্পের সাম্প্রতিক বিকাশধারার একটা দিক। আরও একটা দিক এর‌ই পাশাপাশি আলোচ্য, তা হলো পর্যটনের উদ্দেশ্যগত ভাবনার পরিবর্তন। কেমন ব্যাপারটা? একটু খুলেই বলি। ধরুন আপনি দিল্লি যাচ্ছেন ঘুরতে। কেন যাবেন দিল্লি ? আপনার সামনে অনেক অনেক পছন্দের জানালা খুলে যাবে – দেশের রাজধানী, ঐতিহাসিক স্থাপত্য দর্শন, পাশাপাশি আপনি ঘুরে আসতে পারেন দিল্লির যমুনা পাড়ের ঘিঞ্জি বস্তিতে, দেখে আসতে পারেন সেখানে থাকা সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তরের মানুষজনের নিবিড় লড়াকু জীবন যাপনের অমলিন ছবি। অনুভব করতে পারেন তাঁদের আশা -আকাঙ্খা, স্বপ্ন - ভবিষ্যতের খণ্ডচিত্রকে। অনেক অপশনের মধ্য থেকে আপনি আপনার পছন্দের একটিকে বেছে নিতে পারেন। অনেক কাল আগে শুনেছিলাম টেলর মেড ট্যুরিজমের কথা। এটা বোধহয় তেমনি একটা ব্যবস্থা।
     
    এভাবেই সময়ের হাত ধরে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বদলে বদলে যাচ্ছে দর্শনীয় বস্তুর অভিমুখ। আমাদের নিয়মের ঘোরাঘুরির চেনা ছন্দ – গেলাম - ঘুরলাম - দেখলাম- খেলাম- মস্তি করলাম গোছের ট্যুরিজম এখন অনেক বেশি করে বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক হয়ে উঠছে। যেমন ধরুন আপনি খুব কাছ থেকে পাখিদের দেখতে পছন্দ করেন বা রাত আকাশের তারাদের সঙ্গে পরিচিত হতে চান – সেই অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন আপনার বেড়ানোর জায়গাকে। আর এখান থেকেই উঠে আসছে পর্যটনের নতুন ধারনা বা কনসেপ্ট। এই পর্যন্ত করা আলোচনাকে এখানেই থুক করে রেখে, অন্য একটি বিষয় নিয়ে কথা কয়ে নিই।
     
    বছর কয়েক আগের কথা। খবরের শিরোনামে উঠে এলো এক নতুন ধারার খবর। লিওনয়েড মিটিওর শাওয়ার হবে ব্যাপক মাত্রায়। সহজ কথায় সিংহ রাশি থেকে উল্কা পাতের ঘটনা ঘটবে, প্রতি ঘন্টায় প্রায় পঁচিশটি করে। ব্যস্! লাগাতার প্রচারের ঠেলায় চেগে উঠলাম সকলে। অচিরেই টেলিভিশনের পর্দার দখল নিলেন এই ব্যাপারে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞেরা। এমন উল্কাপাতের ঘটনা আকাশমণ্ডলে নতুন নয়, তবে সেবার ছিল বিশেষ জো ! ধূলি ধূসরিত কলকাতার আকাশে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মিলবে না বুঝেই জনা কুড়ি ছাত্রকে বগলদাবা করে নিয়ে আমরা তিন মাস্টারমশাই ছুটলাম কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকা এক জনপদের উদ্দেশ্যে। সারারাত জেগে,সবাই আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে থেকে ঘাড়ে ব্যাথা নিয়ে যখন ভোরের ট্রেনে বাড়ি ফিরে এলাম তখন সবার মুখেই ফ্লপ স্টার শো- এর কথা। সেবার সবথেকে হতাশার শিকার হয়েছিল টেলিমিডিয়ার মানুষজন। তবে রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের একটা মানসিকতা রাতারাতি বেশ চাগিয়ে উঠেছিল আপামর জনসাধারণের মধ্যে। এটাও কিন্তু মোটেই কম পাওয়া নয়। যদিও সেই হুজুগ সুদূরপ্রসারী হয় নি।
     
    অথচ নিয়মিত রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের অভ্যাস বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে। রাতের আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখেই মানুষ এককালে ঠিক করেছে স্থানান্তরে গমনের সঠিক কাল, কৃষির পত্তনের পর ফসল বোনার উপযুক্ত সময় এই সব। প্রাচীন ভারতীয়দের সাথে সাথে গ্রীক, রোম, মিশর, চিন প্রভৃতি দেশের মানুষের ভেতরে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের এক আশ্চর্য পরম্পরা গড়ে উঠেছিল। অসীম নিষ্ঠায় ও অন্তহীন ধৈর্য্য নিয়ে সেইসব নাম গোত্রহীন মানুষেরা একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন আকাশলিপির পরিচিতি। আজ‌ও সেই খোঁজার কাজ জারি রেখেছেন জ্যোতির্বিদরা।
     
    আকাশচিত্র পাঠের কথাই যখন উঠে এলো তখন আমাদের ঠাকুর কবির বাল্য স্মৃতির কথা ভুলি কি করে?
    “ বয়স তখন হয়তো বারো হবে …. পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়েছিলুম ড্যালহৌসি পাহাড়ে, সমস্ত দিন ঝাঁপানে করে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছুতুম ডাকবাংলায়। তিনি চৌকি আনিয়ে আঙিনায় বসতেন। দেখতে দেখতে, গিরি শৃঙ্গের বেড়া- দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যান্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন।’’
     
    জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সখেদে বলেন শহরের রাত আকাশ চুরি হয়ে গেছে আলোকাসুরের দাপটে। রাতের আঁধার দূর করতে শহরে শহরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বালাবার ধূম যত বেড়েছে তত‌ই আমাদের দৃষ্টি সীমার আড়ালে চলে গেছে দূরলোকের গ্রহ নক্ষত্রেরদল। এই সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে লেখা হয়েছিল একটি বিশেষ নিবন্ধ – আলোয় দূষণ ভরা। আমাদের দেশে শহরবাসী মানুষেরা এই ব্যাপারে খুব একটা সচেতন না হলেও, বিদেশের মানুষজন কিন্তু এই বিষয়ে বেশ সচেতন। আর হয়তো এই অভাববোধ থেকেই খুব দ্রুত প্রসার লাভ করছে এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের মতো পর্যটনের সম্পূর্ণ নতুন ধারনা। পকেটের পয়সা খরচ করে প্রাণ মন ভরে অপার বিস্ময়ে ভরা রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য ছুটছে দূরে আরও দূরে। আর এই সূত্রেই বেড়ে চলেছে এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের জনপ্রিয়তা। পর্যটনের এই বিশেষ ধারাটিকে ডার্ক স্কাই ট্যুরিজম বা আঁধার আকাশ পর্যটন নামেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দুনিয়া জুড়েই। আমাদের মাথার ওপর থাকা আকাশপটের দৃশ্য ক্ষণে ক্ষণেই যায় বদলে; ফলে তা সবসময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনা নিয়ে সচেতন, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের চিরন্তন আগ্রহ ডার্ক স্কাই ট্যুরিজমকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে অতিমারির সময়ে মানসিক চাপ ও অবসন্নতাকে কাটাতে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষজন এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের পথে হাঁটতে শুরু করেন অনেকটাই নিরুপায় হয়ে। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে রাত আকাশ পর্যবেক্ষণের প্রতি নতুন করে অনুরাগ জন্মায়। এঁরাই এই ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে মান্যতা পেয়েছেন পরবর্তীতে।
     
    এদেশে আকাশ পর্যবেক্ষণের পরম্পরা যে সুপ্রাচীন এবং গৌরবময় সে কথা আগেই বলেছি। যন্তর মন্তরের কথা চিন্তা করুন। সেই কবেই রীতিমতো রাজকীয় উদ্যোগে ‘খ’ শাস্ত্র চর্চার আয়োজন করা হয়েছিল আমাদের দেশে। রাজপুত রাজা সোয়াই জয় সিং ১৭৩৪ সালে এই মানমন্দির তৈরি করান। বর্তমানে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত এই মানমন্দিরটি হলো পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি চর্চার এক‌ বিশিষ্ট কেন্দ্র। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সূর্যঘড়ি এখানেই স্থাপন করা হয়েছিল। যন্তর মন্তরের প্রতিষ্ঠা ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এক‌ উজ্জ্বল স্মারক।
     
    ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এক সুপ্রাচীন ও গৌরবময় পরম্পরা রয়েছে। দূরের আকাশকে নিয়ে ভারতীয়দের নিবিড় আগ্রহ ও চর্চার ইতিহাসতো সুপ্রাচীন। দলবেঁধে পর্যটনের সূত্রে আকাশ চর্চা নয়। নিজের ঘরে থেকেই খালি চোখে অথবা সামান্য কিছু উপকরণের সাহায্য নিয়ে চলেছে তাঁদের রাত আকাশ পাঠের নিমগ্ন সাধনা। এমনি একজন নিমগ্ন জ্যোতির্বিদ ছিলেন পাঠানি সামন্ত। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসে তিনি আকাশকে তাঁর একান্ত গবেষণার বিষয় করে তুলেছিলেন। জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির প্রচলিত সূত্রকে কাজে লাগিয়ে তিনি জ্যোতিষ্কদের দূরত্ব নির্ণয় করেছেন নিখুঁত ভাবে। বাঁশ আর কাঠের সাহায্যে তিনি তৈরি করেছিলেন বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র যা ছিল তাঁর নিমগ্ন সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সময় গণনার কাজের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন এক বিশেষ ধরনের সূর্যঘড়ি। নিজের আবিষ্কার ও সিদ্ধান্তের কথা তিনি লিখে গেছেন তাঁর লেখা সিদ্ধান্ত দর্পণ নামের বিখ্যাত গ্রন্থে। দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন অগণিত সংখ্যক নিভৃত জ্যোতির্বিদদের কথা বলতে গেলে এই নিবন্ধটির পরিসর অনেকটাই বেড়ে যাবে। তাই মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।
     
    কথা শুরু করেছিলাম এ্যাস্ট্রো ট্যুরিজমের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে। বিষয়টি এদেশে এখনও পর্যন্ত শৈশব অবস্থায় থাকলেও পশ্চিমি দেশগুলোতে এই নতুন নৈশ অভিযান রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারতে ট্যুর অপারেটররা ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য কয়েকটি জায়গাকে বেছে নিয়েছেন রাত আকাশ পাঠের আসর বসানোর জন্য। যদিও এই তালিকা একেবারে সর্বসম্মত এমন নয়। পর্যটন শিল্পের মতো একটি লাভজনক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সকলেই চাইবেন নতুন নতুন নিরিবিলি পরিবেশে এই রাত আসর পাততে। পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পছন্দের জায়গা হিসেবে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি জায়গার নাম। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এমন জায়গাগুলোর নাম।
     
    ১. স্পিতি উপত্যকা – এখানে পৌঁছনো বেশ কষ্টসাধ্য। তবে একবার এই আশ্চর্য উপত্যকায় পা রাখলে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা হবে রাত আকাশের সান্নিধ্যে।
     
    ২.চুমাথানজেরি – হিমালয়ের বুকে থাকা লাদাখের আরও এক আস্তানা যেখান থেকে রাত আকাশ দেখা এক অবিস্মরণীয় আনন্দের উৎস।
     
    ৩. সার্চু ক্যাম্প – একবার পৌঁছলে আর ফিরে দেখতে হবেনা। এটিও লাদাখে।
     
    ৪.ইয়েরকদ – দক্ষিণ ভারতের এখানে এলে রাত‌ আকাশকে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে ফেলবেন।
     
    ৫.লেহ্ – আবার সেই লাদাখেই ফিরতে হবে তারাদের তাড়নায়।
     
    ৬. মাহুলি – মহারাষ্ট্রের থানে জেলার অত্যন্ত পরিচিত এই জায়গায় বহু পর্যটকের নিয়মিত আনাগোনা হাইকিং এর উদ্দেশ্যে। ক্লান্ত শরীরে সন্ধ্যার পর ওপরের দিকে তাকালেই সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যাবে।
     
    ৭. কুর্গ – কুর্গের খ্যাতি খুব সুস্বাদু খাবার আর গার্ডেন ফ্রেশ কফির জন্য। সন্ধের পর আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে উপভোগ করতে পারবেন রাত সামিয়ানার সৌন্দর্য।
     
    ৮.রাজস্থান – বর্ষার মেঘের চাদর যখন ঢেকে দেয় ভারতের বাকি অংশের আকাশ, তখন পৌঁছে যান রাজপুতানায়। রাতের আকাশ আপনার মন ছুঁয়ে যাবে।
     
    ৯.গোয়া – রাত আকাশের টানে একবার ঘুরেই আসা যায়।
     
    ১০. ভূপাল – ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভূপালে এসে রাত আকাশ না দেখে যাবেন না।
     
    এখানেই তালিকায় ইতি এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। আরও অনেক জায়গায়, যেখানে এখনও আলোর দাপট সেভাবে নেই, রাত আকাশের অপার ঐশ্বর্যের শরিক হতে পারবেন আপনারা। কেবল একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, আর তা হলো এই বিষয়ে জানার ইচ্ছে ও আগ্রহ।
     
    আজ থেকে সাড়ে পাঁচ দশক আগে এমন‌ই ইচ্ছে আর আগ্রহে ভর করে আমরা হাজির হয়েছিলাম এক রাতের ক্লাসে। তখন আমাদের সপ্তাহে পাঁচদিন করে ক্লাস হতো, শনি আর রবিবার ছিল ছুটির দিন। একদিন শুক্রবার ক্লাস শেষের আগে আমাদের শনিবার বিকেলে হাজির হতে হবে। উপলক্ষ রাতের ক্লাস। স্কুল ছুটির পর হাজারো জল্পনা করতে করতে দলবেঁধে বাড়ি ফিরলাম আমরা। …..
     
    বাতাসে এখন হালকা শীতের আমেজ। জল ঝরানোর পর্ব শেষ করে বর্ষা বিদায় নিয়েছে। মেঘমুক্ত আকাশ এখন মখমলি কিংখাবের মতোই উজ্জ্বল। অসংখ্য জ্যোতিষ্কের দ্যুতিতে আকাশ এখন দীপ্যমান। জলদগম্ভীর কন্ঠে হেডমাস্টার মশাই তার কথকতা শুরু করেন –
    “রাতের আকাশে তারা দেখা একটা সুন্দর খেয়ালী অভ্যাস। তারাদের সাথে পরিচয় হতে হতে অবাক বিস্ময়ে মন চলে যায় লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এক আশ্চর্য জগতে! ভাবতেও যেন কেমন শিহরণ জাগে শরীরে!...... আকাশে আমরা যে সব তারাদের খালি চোখে দেখতে পাই তাদের সংখ্যা দু- হাজারের মতো এবং সারা বছরে সব মিলিয়ে মোটামুটি পাঁচ থেকে ছয় হাজারের মতো তারা দেখা যায়।…. আজকে এই রাতের তারা দেখার আসরে তোমাদের ডেকে আনার উদ্দেশ্য‌ই হলো তোমাদের মধ্যে এই ইচ্ছে আর ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলা যাতে করে অনন্ত দূরত্বে থাকা ওই অগণিত জ্যোতিষ্কদের সাথে তোমরা আত্মার সম্পর্ক, আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পার।”
     
    গুটিসুটি মেরে আমরা সকলেই গায়ে গা লাগিয়ে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সকলেই উৎসুক হেডমাস্টার মশাই এরপর কী বলেন তা শোনার জন্য।……এমন অভিজ্ঞতা উপস্থিত সকলের কাছেই একেবারে নতুন।
     
    হেডমাস্টার মশাইয়ের কন্ঠ আবার সরব হয়ে ওঠে। হাতের লম্বা টর্চটা জ্বালিয়ে আকাশপটে নিক্ষেপ করে তিনি নতুন করে কথা শুরু করেন – “অক্টোবর মাসের আকাশের পূর্ব দক্ষিণ ভাগ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সিটাস বা জলদানব। এর পশ্চিমে দেখা যাচ্ছে কুম্ভ রাশিকে। উত্তর পশ্চিম আকাশে দেখতে পাবে হারকিউলিস নক্ষত্র মণ্ডলীকে। ড্রাকো বা ড্রাগনের মাথায় পা দিয়ে মহা যোদ্ধা হারকিউলিস দাঁড়িয়ে আছেন বিজয়ীর উদ্ধত ভঙ্গিমায়।”
    কথা বলতে বলতে হেডমাস্টার মশাই টর্চ নেড়ে আকাশপট উজ্জ্বল করে উদ্ভাসিত নক্ষত্রমন্ডলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন আমাদের। আমাদের নজর এখন উত্তর পূর্ব আকাশে। সেখানে দিগন্তের সামান্য উপরে একখণ্ড হীরের দ্যুতিতে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ক্যাপিলা বা ব্রহ্মহৃদয়,অরিগা মণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার‌ই সামান্য কিছু দূরে আকাশের পূর্ব কোল ঘেঁষে একগুচ্ছ তারা ভিড় করে রয়েছে। এটিই হলো কৃত্তিকা নক্ষত্রমন্ডলী। …..
     
    …… আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। অপলক দৃষ্টিতে ঘাড় উঁচিয়ে সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে চলেছি আমরা। এতোদিন ব‌ইয়ের পড়ায় মন আটকে ছিল আমাদের। রাতের এই ক্লাসের হাতধরে আমরা পৌঁছে গেলাম সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের আঙিনায়। তারকা লেখনি পাঠ আমাদের কাছে এক নতুন অজানা জগতের দুয়ার খুলে দিল।
     
    কথায় কথায় রাত বেড়েছে, কঠিন হয়েছে হিমের কামড়। তবে এইসব চলতি অনুভবের সীমানা এড়িয়ে আমাদের মন তখন পৌঁছে গিয়েছে অন্য এক অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভূতির জগতে। হুঁশ ফিরে এলো হেডমাস্টার মশাইয়ের কথাতে – “ আজকের এই রাতক্লাসে তোমাদের ডেকে এনেছি কেবলমাত্র একটা অচেনা, অজানা জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব বলে। …. কেবল ব‌ইয়ের পাতাতে নয়, এই বিপুলা পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র বিস্ময়। মনের ক্ষুদ্র সীমাকে টপকে এই অসীম জ্ঞানের জগতে ঢুকে পড়াই হলো মানুষের জীবন সাধনার মহত্তম লক্ষ্য। তোমাদের মন যাতে সেই অসীমের সাধনায় মগ্ন হবার জন্য উন্মুখ হয় সে জন্যই আমরা তোমাদের এই রাতের আসরে ডেকে এনেছি।”
    হেডমাস্টার মশাই তাঁর কথা শেষ করেন। তারপর এক সময় উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন –
     
    আকাশ ভরা, সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ
    তাহার‌ই মাঝখানে, আমি পেয়েছি মোর স্থান
    বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান ……..
     
    হেডমাস্টার মশাইয়ের সুরে সুর মেলাই আমরা সকলে। আমাদের মিলিত কন্ঠের সুর চেনা জগতের ব্যস্ত সীমানা ছাড়িয়ে দূর থেকে দূরান্তরে সেই সুদূর জ্যোতিষ্কলোকের আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে। হেডমাস্টার মশাইয়ের হাত ধরে, রাতের তারা দেখার ক্লাসের মধ্যে দিয়ে,জানার মাঝে অজানাকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা সকলেই সুরলোকের দিশারী, সুদূরের পিয়াসী হয়ে উঠি।
     
     
    ** এই নিবন্ধটি বন্ধুবর জ্যোতির্বিদ শ্রী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের করকমলে উৎসর্গ করা হলো।
     
    ** তথ্য সূত্রের জন্য ঋদ্ধি পত্রিকার “গ্রহ তারা” সংখ্যার সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আমার ঋণ স্বীকার করছি বিনম্রতার সঙ্গে।
     
     
     
    সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
    জুলাই ১০.২০২৬.
    শুক্রবার।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ১০ জুলাই ২০২৬ | ২১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    শাকিরা - Srimallar
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরিন | ১০ জুলাই ২০২৬ ১৩:২৫741677
  • চমৎকার লিখেছেন। প্রথমবার যখন এখানে নিজের বাড়ি থেকে ছায়াপথ দেখতে পেলাম সে যে কি অদ্ভুত আনন্দ হল কি বলব, কিন্তু সে দেখতে গেলে আপনাকে একদম গাঢ় অন্ধকারে নির্মেঘ রাতে অজস্র তারার মাঝে দেখতে হবে, সে আর কলকাতায় কোথায় পাওয়া যাবে ? নাহলে টেলিস্কোপ নিয়ে Dark sky Reserve এ গিয়ে দেখতে হবে , ভারতে দেখলাম লাদাখ চাংথাং উপত্যকায়,কুর্গে, পেঞ্চ আপনিও বেশ কয়েকটি জায়গার নাম দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে বা সিকিমে কোথাও Dark Sky Reserve থাকলে ভাল হত।
  • সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় | ১০ জুলাই ২০২৬ ১৩:৫৫741678
  • চমৎকার। অনেক জায়গার কথা নতুন জানলাম। গুণীজন যেখানেই হাত দেন, সেখানেই সোনা ফলান। এই লেখাটিও তাই।
    সোয়াই জয় সিং এর পাঁচটি মানমন্দিরের মধ্যে চারটি এখনও টিকে আছে। সেগুলোও সুন্দর জ্যোতি-ভ্রমণক্ষেত্র হিসেবে ধরা যেতে পারে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন