এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

  • বিজ্ঞানের খাতা, অবিজ্ঞানের যা-তা

    সঞ্চারী গোস্বামী
    আলোচনা | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি | ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ৯৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • পর্ব ১ | পর্ব ২


    সে কী তুমুল টানাহেঁচড়া, দড়ি টানাটানি!

    না না, আমাকে বা আপনাকে নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র বা তার প্রতিভূ রাজনৈতিক দলগুলি যে টানাহেঁচড়া করে, তার কথা বলছি না। নাকি, আসলে তার কথাই বলছি! কে জানে! নিজেই গুলিয়ে ফেলি মাঝেমাঝে…

    আসলে সাধারণ মানুষের কথা, তার প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্র বা কর্তাব্যক্তিদের আচরণ, সরকারি বিলিব্যবস্থা, এসবই যুগে যুগে কালে কালে একই রকম।

    একটু বিশদে বলি। সেই যে সমুদ্রমন্থনকালে সুরাসুরের দড়ি টানাটানির খেলায় অনন্ত জলরাশির মধ্য থেকে ভেসে উঠল অঢেল সম্পদ, সেখানে কারা মাথা পেতে দিল? কূর্মরাজ, নাগরাজ বাসুকি আর মন্দর পর্বত। খেয়াল করে দেখুন, এদের সামাজিক স্থান কিন্তু সুরাসুরের নিচে। দড়ি টানাটানির সময় মরল কারা? মন্দর পর্বতের গাছপালা, সেখানে বাসকারী পশু-পাখি, দড়ির ঘষায় আগুন লেগে স্রেফ পুড়ে গেল। সেই জীববৈচিত্র্যের কথা ভাবল কেউ? ভাবল না, কর্তৃপক্ষ কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধির বিষয়েই মগ্ন। মিল পাচ্ছেন? পাবেন, কারণ সব যুগে এটাই স্বাভাবিক।

    কিন্তু না, আজ এই নিপীড়িত প্রাণের আখ্যান-ঝুলি খুলব না। একটু পাশ কাটাই। সমুদ্রমন্থনে অমৃত উঠল, গরল-ও। গরল নিয়ে কারো কোনো আগ্রহ নেই, মাথাব্যথা নেই, কিন্তু অমৃত নিয়ে বিলক্ষণ আছে। তাই কে পাবে সে নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকবেই। অসুররা নিয়ে চলে গেল অমৃতভাণ্ড। দেবতারা বরাবরই পিছিয়ে। কার্যোদ্ধারে সবসময়ের মত এখানে ছলনার আশ্রয় নিলেন তারা। নারায়ণ গেলেন স্ত্রীমূর্তি ধরে এবং বলা বাহুল্য কার্যোদ্ধার করলেন, অমৃত পান করালেন কেবল দেবতাদের। রাহু নামে এক অসুর কিন্তু দেবতার ছদ্মবেশে ততক্ষণে অমৃত পান করে ফেলেছেন। চন্দ্র আর সূর্য তাকে চিনে ফেলে নারায়ণকে বলে দিতেই তৎক্ষণাৎ সুদর্শন চক্রে নারায়ণ তার গলা কেটে ফেললেন। কিন্তু হলে কী হবে! অমৃত তো ততক্ষণে রাহুর গলা অব্দি পৌঁছে গেছিল। সেই থেকেই রাহু গলা অব্দি অমর। চাঁদ আর সূর্যকে টপ করে গিলে ফেললেও গলার নিচ থেকে তাই তারা দুজনেই টুপ করে বেরিয়ে আসে। চন্দ্রগ্রহণ আর সূর্যগ্রহণের পর আবার স্বমহিমায় আকাশের প্রেক্ষাপটে ফিরে আসে তারা।



    লাওক্রু মেগালিথিক মনুমেন্টের কাছে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪০ অব্দের শিলালিপি। সূত্র: Fr. O'Flanagan's History & Heritage Pages, লিঙ্কে গেলে আরও তথ্য পাবেন।


    কী মিল দুজনের! একে তো সেই শিশুকাল থেকে দুইজনকেই মামা বলে আসি আমরা, তদুপরি এই পুরাণকথাতেও তাদের ভবিতব্য একই রকম। কিন্তু এ তো গল্পের কথা। পুরাণ তো আর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়! সেখানে ইতিহাসের সঙ্গে কবিকল্পনা, দর্শন, অলৌকিকতা এমন করে মিশে থাকে, সেখান থেকে আসল ইতিহাসকে চিনতে গেলে খুব সতর্ক থাকা দরকার। অলৌকিকতা বাদ দিলে কিন্তু, মজার কথা, পুরাণের যে অংশটার কথা এখানে উল্লেখ করলাম, সেখানে যে গ্রহণের বিষয়েই বলা হল, তা দিব্যি বোঝা যায়। সেটুকুই ইতিহাস। পরবর্তী ইতিহাস থেকে আমরা জেনেছি অনেক আগে গ্রহণকে মানুষ ভয় পেত, একে অমঙ্গলসূচক মনে করত, কোনো এক অদৃশ্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা না করলে চন্দ্র-সূর্য যে আবার দেখতে পাওয়া যাবে, এমনটা তারা ভাবতেও পারত না। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গল্প ‘প্রাগ্‌জ্যোতিষ’ মনে পড়ছে? চন্দ্রগ্রহণের সূত্রে কেমন করে রাজা বদল হয়ে গেল, কেমন করে বেঁচে গেল মেয়েটি! কিংবা ‘সূর্যদেবের বন্দী’-তে সূর্যগ্রহণের কথা? নেহাতই গল্প, কিন্তু এটুকু তো বুঝতে অসুবিধা নেই, ব্যাপারটা জানা থাকলেও সে সম্পর্কে বা তার কারণের কোনো স্পষ্ট ধারণাই সেসময় ছিল না। বহু প্রাচীন গ্রন্থে বা লেখায়ও গ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়। আয়ারল্যাণ্ডে লাওক্রু মেগালিথিক মনুমেন্টের কাছে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪০ অব্দের শিলালিপিটি (ছবি উপরে) সম্ভবত সর্বপ্রথম সূর্যগ্রহণের কথা বলে; না ঠিক ভাষায় নয়, ছবির ভাষায়। এই গ্রহণের তারিখটিও পাওয়া গেছে, ৩০ নভেম্বর। লিখিত ফর্মে সূর্যগ্রহণের কথা পাওয়া যায় চীনের অ্যানিয়াং প্রদেশের ১২০০ খ্রিস্টপূর্বের একটি লিপিতে। কচ্ছপের খোল ও ষাঁড়ের পিঠের হাড়ে খোদাই করা সেই লিপি (ছবি নীচে)। এখানে লেখা আছে, “সূর্যকে খেয়ে ফেলা হয়েছে” (চীনা লিপি আমি জানি না, তাই যা জেনেছি, তাই মানতে হচ্ছে)। সেই একই খেয়ে ফেলার কথাই আমাদের ভারতবর্ষের পুরাণেও। খ্রিস্টধর্মের লেখালিখিতে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দিনে চন্দ্রগ্রহণ, ইসলাম ধর্মের কোরানে মহম্মদের জন্মদিন ও ইব্রাহিমের মৃত্যুদিনে সূর্যগ্রহণের উল্লেখ আছে। এসবেরই মানে, গ্রহণ কোনো সাধারণ বিষয় নয়, তাই কোনো না কোনো বিশেষ ঘটনার সঙ্গে তাকে যোগ করে দেওয়া হয়েছে।



    বাঁদিকে একটি ওর‍্যাকল হাড় থেকে নেওয়া কালি-ছাপ; ডানদিকে সেই কালি-ছাপ, যাতে গ্রহণের কথা লেখা। বাঁদিকের ছবির সূত্র: Key Concepts in Chinese Thoughts and Culture, ডানদিকের সূত্র: Past, Present and Future of Chinese Astronomy, লিঙ্কে /পেপারে গেলে আরও তথ্য পাবেন।


    গ্রহণ বিশেষ তো বটেই, কিন্তু অত্যাশ্চর্য কিছু তো নয়, বরং স্বাভাবিক। এতদিনে আমরা তো জানি, গ্রহণ হয়, চাঁদ, পৃথিবী আর সূর্য এক রেখায় এলে। পৃথিবীর দুইপাশে দুইজন থাকলে চন্দ্রগ্রহণ আর চাঁদের একপাশে পৃথিবী, অন্যপাশে সূর্য থাকলে সূর্যগ্রহণ; পুরোটাই আলো-ছায়ার খেলা। বিষয়টা ঠিক এরকম ওয়ান-লাইনার নয়, আসল বিষয়টা অনেকটাই শক্ত, সেই সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পর্যন্ত আসতে সে পথ, তার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল অনেক অনেক আগে।

    গ্রহণের প্রথম বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা যিনি দিয়েছিলেন তার নাম অ্যানাক্সাগোরাস, থাকতেন প্রাচীন গ্রিসের ক্ল্যাজোমেনে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৩ অব্দের কাছাকাছি সময়ে। চাঁদের নিজস্ব আলো নেই, সে আলো যে সূর্যের থেকে ধার করা, এ কথা প্রথম যারা বলছিলেন, তাদের মধ্যে অ্যানাক্সাগোরাস একজন। গ্রহণের মূল কারণ যে ছায়াপাত, সে কথা বুঝেছিলেন তিনি (যদিও কীসের ছায়াপাত, সে কথা স্পষ্ট বলতে পারেননি তিনি)। তিনি বলেছিলেন পৃথিবী সমতল, কোনো শক্তিশালী বায়ুস্তর তাকে ধরে রেখেছে, তার একটু নড়চড় হলেই হয় ভূমিকম্প, সেসব একেবারে ভুল বলে আমরা অনেকদিন থেকেই জানি, কিন্তু গ্রহণের ব্যাপারে অন্তত তার ছায়াপাতের ব্যাখ্যা যে ঠিক ছিল, তা তো স্বীকার করতেই হবে! শুধু গ্রহণ নয়, সূর্য, চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু কী দিয়ে তৈরি সে বিষয়েও তিনি অনেক কথা বলেছিলেন। প্রচলিত পবিত্র ধারণাকে যথেষ্ট সম্মান জানাতে না পারায়, তাকে নির্বাসিত হতে হয়। কারারুদ্ধ অবস্থায়ও বিজ্ঞানচর্চা বন্ধ হয়নি, হীরক রাজার দেশের গায়কের মত বলতে হয়, “জান আছে তো, তাই জ্ঞান-ও আছে”। তিনি সম্ভবত প্রথম গ্রিক, যিনি squaring a circle বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন; একটি বৃত্তের যা ক্ষেত্রফল, সেই সমান ক্ষেত্রফলের বর্গাকার ক্ষেত্র আঁকা, এক্কেবারে ন্যূনতম কয়েক ধাপে, এতে ব্যাবহার হবে কেবল স্কেল ও কম্পাস। এই কাজ আবার করেছিলেন কারাগারে থাকাকালীন। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করেছে, এটা সম্ভব নয়। অ্যানাক্সাগোরাসের আগেই থালেস অফ মিলেটাস খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে একটি গ্রহণের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি হেরোডোটাসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, কিন্তু কীভাবে থালেস এই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তা জানা যায় না। বর্ণনাটির ব্যাখ্যায় কিছু মতান্তরও আছে। অনেক পরে খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতকে ভারতে আর্যভট তার আর্যভটিয়া গ্রন্থে গ্রহণের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহ যে সূর্যের আলোয় আলোকিত হয় এবং চন্দ্রগ্রহণ মানে চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়াপাত আর সূর্যগ্রহণ মানে সূর্যকে চাঁদের ঢেকে ফেলা একথা স্পষ্টই বলেছিলেন তিনি। গ্রহণে ঠিক কতখানি অংশ ঢাকা পড়বে অঙ্ক কষে তা বেশ ভালোমতই দেখাতে পেরেছিলেন তিনি। এবিষয়ে খ্রিস্টপূর্ব ও খ্রিস্টিয় এই দুই সময়ের মাঝেও আরো বহুজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কিছু কিছু অংশিক সত্য সেখানেও ছিল। পরবর্তী সময়ে সেসব গণনা আরো নির্ভুল হয়েছে। এভাবেই বিজ্ঞান গ্রহণ-বর্জন-প্রমাণের পথে মূল সত্যে উপনীত হয়, সে পথে ঠিক ভুল দুইই গুরুত্বপূর্ণ।

    আমরা কি চাঁদ আর সূর্যের এই গ্রহণের মিলটুকু দেখে সন্তুষ্ট থাকব, রোমাঞ্চিত হব, নাকি, আর কোনো মিল খোঁজার চেষ্টা করব! আচ্ছা, নক্ষত্রদের প্রেক্ষাপটে চাঁদের পৃথিবী প্রদক্ষিণকাল তো ২৭১/৩ দিন অর্থাৎ ২৭.৩৩৩… দিন, আগের পর্বে বলেছিলাম এ বিষয়ে। চাঁদের নিজের চারপাশে ঘোরার সময়কাল কত? সেও ২৭ দিন প্রায়, আসলে ২৭.৩ দিন। এই যে নিজের চারপাশে পাক আর পৃথিবীর চারপাশে পাক খেতে একই সময় লাগা, একে বলে Synchronous Rotation । পৃথিবীর মত করে ভাবা যাক। এক বছর হয় পৃথিবী সূর্যের চারপাশে একপাক ঘুরলে, নিজের চারপাশে একবার ঘুরলে হয় একদিন। সেই একইভাবে ভাবলে চাঁদের নিয়মে যা এক দিন, চাঁদের এক বছর সময়ও তাই। Synchronous Rotation -র কারণে আমরা চাঁদের একপিঠই দেখি সবসময়। এ বিষয়টা লিখে পুরোটা বোঝানো একেবারেই অসম্ভব, বুঝতে হলে নাসার সাইটে গিয়ে ভিডিওটা (নীচেও দেওয়া হল) দেখে নিতে পারেন। এই মহাবিশ্বে পৃথিবী সৃষ্টির পরবর্তীকালে চাঁদ সৃষ্টির সময় চাঁদ নিজের চারপাশে অনেক দ্রুত ঘুরত। সেসময় দেখবার কোনো সম্ভাবনা থাকলে পৃথিবী থেকে চাঁদের দুই পিঠই দেখা সম্ভব হত। পরে সেই দ্রুততা কমে গিয়ে এমন হয়েছে, যাতে চাঁদের কেবল একপিঠই আমরা দেখতে পাই।



    টাইডাল লকিং। সূত্র: NASA


    এবার সূর্যের কথায় আসা যাক। মিল কোথায়? সূর্যও কিন্তু নিজের চারপাশে গড়ে ২৭ দিনে একবার পাক খায়। কী আশ্চর্য ব্যাপার ভাবুন! সূর্যের বিষয়টা অবশ্য একটু আলাদা। সূর্য আসলে কোনো কঠিন বস্তু নয়, এর অবস্থাটাকে আমরা বলি প্লাজমা। প্লাজমার বিষয়ে বিশদে যাচ্ছি না, কিন্তু আপাতত সূর্যকে শক্ত কোনো কিছু না ভেবে কোনো থকথকে জিনিস দিয়ে তৈরি ভাবুন। এবার সে যদি বনবন করে লাট্টুর মত পাক খেতে যায়, তাহলে কিছু অংশ ছিটকে আগে যাবে, কিছু অংশ ততটা নড়বে না, এটা ভাবাটা সহজ হবে। সেরকমভাবে সূর্যের মাঝখানটা একপাক ঘোরে ২৫ দিনে আর উপরটা বা নিচটা ৩৩ দিনে। সূর্যের পুরো শরীরের ওপরের হিসাব নিয়ে গড় করলে ব্যাপারটা ২৭ দিনেই দাঁড়ায়।

    চাঁদ-সূর্যের নিজের চারপাশে পাক খাওয়া ছেড়ে এবার পৃথিবীতে আসি। আর্যভটিয়া গ্রন্থে আর্যভটের লেখা ইংরেজিতে তর্জমা করলে পাওয়া যায়,
    “In a yuga, the sun revolves 4320000 times, the Moon 57753336 times, the Earth 1582237500 times eastward...”
    এখানে সূর্যের ঘোরার সংখ্যাটা sidereal years। একটা বিষয় মনে রাখবেন, এই যে সূর্যের ঘোরার কথা বলা হচ্ছে, এটা কিন্তু পৃথিবী থেকে যেমন দেখা যায়, সেটা, অর্থাৎ সূর্যের এই ঘোরাটা আসলে আপেক্ষিক। আমরা জানি, যে সূর্যের চারপাশে পৃথিবী ঘোরে, তাই আমাদের মনে হয় পৃথিবীর চারপাশে সূর্য ঘুরছে। আর্যভটের হিসাব যেহেতু পুরোটাই অবজারভেশন নির্ভর, তাই সেখানে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরার সময়কালকে বছর না বলে, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার হিসেবেই বছরের হিসেব করা হয়েছিল। এবার পরের অংশগুলোর একটু হিসেব করা যাক – ৪৩ লক্ষ ২০ হাজার দিয়ে এই পৃথিবী যতবার ঘোরে বলা হয়েছে , অর্থাৎ ১৫৮২২৩৭৫০০, সেই সংখ্যাটাকে ভাগ করুন। দেখা যাবে ভাগফল মোটামুটি ওই ৩৬৬.২৫৮৬৮-র কাছাকাছি হচ্ছে (দশমিকের পরের অংশ নিয়ে আপাতত ভাবতে হবে না, ৩৬৬ টা দেখুন)। এই ভাগফলটা মানে কী? এক sidereal year-এ পৃথিবী কতবার পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘোরে, অর্থাৎ নিজের চারপাশে কতবার ঘোরে, সেটা। এই সংখ্যাটা হিসেব করে যা বেরোল, তা আমরা যে এক বছরের কথা জানি তার দিনসংখ্যার থেকে সামান্য আলাদা। কেন? সেটা বুঝতে গেলে sidereal year কে বুঝতে হবে, এ আসলে আমাদের হিসেবের এক বছর নয়। তবে আপাতত sidereal year-এর জটিলতায় যাচ্ছি না, বরং একটু সহজ হবে যা বুঝলে সেটায় যাই।

    কথায় আছে, দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর। অতএব আগে আমরা sidereal day বুঝে নেব। মনে করা যাক, আপনি রথের মেলায় নাগরদোলায় চড়েছেন। নাগরদোলা যেভাবে ঘোরে, ভাবা যাক, পৃথিবী ঠিক সেভাবে নিজের চারপাশে ঘুরছে। এবার শুরুতে আপনি ছিলেন নাগরদোলার এক্কেবারে উপরের দোলনায়। মাথার উপরে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছিলেন উপরে লাগানো একটা আলো। এবার নাগরদোলা ঘুরতে শুরু করল। আপনি উপর থেকে নিচে নেমে আবার উপরে একই জায়গায় পৌঁছলেন। এবারেও তাকালে সেই আলোটা দেখতে পাবেন। কিন্তু, মনে করুন, নাগরদোলা যদি ঘুরতে ঘুরতে এগোতে পারত, অর্থাৎ গাড়ির চাকা যেভাবে ঘোরে আবার এগোয়ও, সেভাবে, তাহলে কী হত? তখন কিন্তু আপনি একপাক ঘুরে একই জায়গায় এলেও আলো আর আপনার মাথার ওপর দেখতে পেতেন না, দেখতে হলে আপনাকে নাগরদোলায় বসে আর একটু ঘুরতে হবে। ব্যাপারটা আরেকটু ভালো বোঝা যাবে চিত্র ৩ থেকে। ধরা যাক, পৃথিবীর পেট বরাবর একটা লাল কাঠি লাগানো আছে। সূর্য আর পৃথিবীর কেন্দ্র দুটো যোগ করলে যে রেখা পাওয়া যাবে, সেদিক বরাবর। ক) তে যেভাবে দেখানো সেভাবে পৃথিবী যদি নিজের চারপাশে একপাক ঘোরে, তাহলে লাল লাঠি আবার শুরুতে যেদিকে মুখ করে ছিল সেভাবেই থাকবে। এই ঘোরায় যে সময়টা লাগে, তা হল sidereal day। কিন্তু ততক্ষণে পৃথিবী সূর্যের চারপাশের প্রদক্ষিণ পথে কিছুটা এগিয়ে গেছে। চিত্র খ) এর মত। এবার সেখানে যদি সূর্য আর পৃথিবীর কেন্দ্র দুটো যোগ করা হয়, তাহলে যে রেখা পাওয়া যাবে, সেটা নীল রেখা বরাবর। এই লাল লাঠি নীল রেখার সঙ্গে মিশতে গেলে, পৃথিবীকে আর একটু নিজের চারপাশে ঘুরতে হবে। শুরু থেকে নিয়ে এই পুরো সময়টা আমাদের এক দিন বা solar day। পৃথিবীর নিজের চারপাশে পুরো একপাক ঘোরা মানে ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরা। প্রতি solar day-তে এই ৩৬০ ডিগ্রির পরেও আরো প্রায় ১ ডিগ্রি নিজের চারপাশে ঘোরে পৃথিবী। ৩৬৫ দিনে মোট অতিরিক্ত ঘোরে প্রায় ৩৬০ডিগ্রি, অর্থাৎ ৩৬৫ দিনের ৩৬৫ পাকের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ১ পাক ধরে মোট ৩৬৬ পাক। এবার মিলল আর্যভটের গণনার সঙ্গে?

    এবার চাঁদে আসুন। আর্যভটের হিসেব থেকে চাঁদের পাক খাওয়ার হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, ১ sidereal year-এ চাঁদ নিজের চারপাশে পাক খায় (ভাগ করুন : ৫৭৭৫৩৩৩৬/৪৩২০০০০) মোটামুটি ওই ১৩.৩৭ বার, মানে ১৩ বারের একটু বেশি। এবার ভাবুন, একটু আগে যা বলছিলাম সেটা। আমাদের জানা হিসেব অনুযায়ী চাঁদের নিজের চারপাশে একবার পাক খেতে ২৭.৩ দিন লাগে, তাই ৩৬৫ দিনে চাঁদ নিজের চারপাশে পাক খায় (৩৬৫/২৭.৩) ১৩.৩৭ বার, এটাও এখনকার হিসেবের সঙ্গে মেলে। এ হিসাবগুলো তো যথেষ্ট জটিল, সে সময়ে তেমন ভালো যন্ত্র ছাড়াও এসব মেপে ফেলেছিলেন আর্যভট। কিন্তু, এখানে একটা কথা বলা ভালো। গণনাগুলি খুব ভালো হলেও আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে যে পরিমাপ পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে তফাৎ আছে, আর সেটাই স্বাভাবিক। কেউ বললেও কখনোই বিশ্বাস করবেন না, সবই আর্যভট বলে গেছিলেন। যেমন, এই গ্রহ-উপগ্রহের নিজের চারপাশে পাক খাওয়া ব্যাপারটা আহ্নিক গতি, এই বিষয়ে আর্যভট যা বলেছিলেন, তা মোটামুটি ঠিক। কিন্তু অনেক জায়গায় প্রচারিত হয় সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বের কথা অর্থাৎ সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘোরা, যাকে বার্ষিক গতি বলি আমরা, তাও আর্যভট বলেছিলেন। এটি সম্পূর্ণ ভুল। বার্ষিক গতির কথা আর্যভট বলেননি, তা তো একটু আগেই বললাম।

    ‘দেখা না দেখায় মেশা’ বা, বলা না বলায় মিশে থাকে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিশিয়ে রাখা হয় আমাদের দৈনন্দিন জগতের যেসব তথ্য, সেসবের কথা বলব। 

    পরের পর্বে...


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    পর্ব ১ | পর্ব ২
  • আলোচনা | ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ৯৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন