বলাগড় : একটি নীরবতার খসড়া
অয়ন মুখোপাধ্যায়
পুকুরের জলে আমার অবয়ব ভেসে উঠলে মুখটা আকাশের দিকে সরে যায়—
জল নিচে থাকে, আকাশ ওপরে, আমি মাঝখানে কেবল অস্পষ্ট একটি নথি।
যেন কোথাও কিছুই ঘটেনি কোনোদিন—এইভাবেই নিচু স্বরে বলাগড়ে বিকেল নামে,
অঘোষিত, অথচ স্থায়ী।
এখানে একটি গাছ ছিল। এখন তার জায়গায় আলো পড়ে সোজাসুজি।
আচমকা কাটা পড়লে মাটির ভেতর গাছেদের দীর্ঘশ্বাস জমে থাকে—যেন ভূগর্ভস্থ কোনো সাক্ষ্য।
শেকড়ের ভাঙা শব্দ বলাগড়ের মাটি তাড়াতাড়ি শুষে নেয়, কারণ প্রকাশ্যে শোক রাখা এখানে নিয়মবিরুদ্ধ।
মৃত কাঠের গুড়িতে হাত রাখলে শিরা-উপশিরায় শৈশবের শুকনো রক্তের মতো কিছু দেখি।
মনে হয়, আমি-ই যেন নিজের ভিতর থেকে উচ্ছেদ হয়েছি—নাম আছে, জমি নেই।
চল্লিশ বিঘের যে বাগানটির পোশাকি নাম ছিল ডাক্তার বাগান,
সেই নাম উচ্চারণ করলে প্রাচীন প্রবাদগুলো সামান্য কেঁপে ওঠে; পাতারা নিজেদের নাম ভুলে যায়,
কারও কারও ঠিকানা বদলে যায় চুপচাপ—নতুন সীমানা আঁকা হয়, পুরনো ছায়া মুছে ফেলে।
সুশীলা প্রাইমারি স্কুলের ঘরে এখনও বিকেলের আলো ঢোকে—সরকারি নিয়ম মতে।
কেউ খাতা খুলে বসে না; ধুলো- অক্ষর গুলো কে ,নীরবে পাহারা দেয়,
যেন পাঠ্যসূচির বাইরে থাকা ইতিহাস ,নিজেই নিজেকে বাতিল করেছে।
এই শব্দহীন ক্ষয়ে যাওয়া ,আমার ভেতরেও ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়।
বলাগড় আমার রক্তের ভেতর থেকে কোথাও যায় না—কিন্তু মানচিত্র বদলালে রক্তের রংও কি অক্ষত থাকে?
আমি অল্প অল্প করে সরে যাই তার ভূগোল থেকে—কেউ যেনো আমাকে মুছে দেয়নি, আমি নিজেই প্রমাণস্বরূপ অনুপস্থিত।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।