সিলেবাসের ভেতর সিলেবাসের বাইরে
অয়ন মুখোপাধ্যায়
ক্লাস ইলেভেনের লাস্ট পিরিয়ড ঘরটা অদ্ভুতভাবে জেগে ছিল। কালো বোর্ডে চক-এর ধুলো লেগে আছে, জানালার বাইরে গাছের পাতায় বিকেলের আলো আটকে পড়েছে। কয়েকজন জানালার দিকে ঝুঁকে, কেউ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, কেউ আবার বেঞ্চে নখ আঁচড়াচ্ছিল—শেষ পিরিয়ডের সেই চেনা অস্থিরতা।
ক্লাসে ঢুকতেই রাহুল জিজ্ঞেস করল,
— স্যার, পড়াশোনা করে কী হবে? চাকরি তো আর কেউ পাচ্ছে না।
আমি তাকালাম ওর দিকে। চেনা প্রশ্ন, বহু পুরনো ক্লান্তি।
— তুই কী পরছিস বলো তো?
— ইতিহাস, স্যার। কত সাল, কত যুদ্ধ, কত রাজা। মাথার ভেতর গুদাম হয়ে গেছে।
পেছনের বেঞ্চ থেকে ইরা হেসে উঠল,
— গুদামে আগুন ধরলে কেমন হয় স্যার?
ক্লাসটা হঠাৎ চুপ করে গেল।
আমি হেসে বললাম,
— আগুন নিয়েই তো এত সমস্যা। আগুন ধরলে জ্বললে তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— তাহলে সত্যিটা কী?
আমি বোর্ডে লিখলাম একটা মাত্র লাইন—
“যে প্রশ্ন মনের মধ্যে আগুন জ্বালায়, সেটাই পড়াশোনা।”
পরদিন স্কুলে হইচই। বোর্ডে লেখা সেই লাইন কেউ মুছে দেয়নি। বরং কেউ তার নিচে লিখেছে—
“স্যার, গতকাল বাবার সঙ্গে প্রথমবার তর্ক করলাম।”
প্রধান শিক্ষক আমাকে ডেকে পাঠালেন।
— আপনি ছাত্রদের উসকে দিচ্ছেন কেন? গার্জেনরা বলছে ছেলেমেয়েরা সিলেবাসের বাইরে এত প্রশ্ন করলে পরীক্ষায় নম্বর কম পাবে। আপনি ঠিক সময় সিলেবাসটা শেষ করুন।
তিনি কথা বলার সময় আমার দিকে তাকালেন না—ফাইলটাই দেখছিলেন।
আমি বললাম,
— নম্বর কম বেশি নিয়ে কী হবে স্যার? আসলে মানুষ কমে যাচ্ছে।
তিনি ফাইল বন্ধ করতে করতে বললেন,
— আপনাকে আর ইলেভেনের ক্লাস নিতে হবে না। আজকেই শেষ দিন। এবার থেকে অন্য ক্লাস নেবেন। আমি বলে দেবো। আমি আর কি করবো? হেড স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে। ইলেভেনের ক্লাসে গেলাম।
শেষ ক্লাসে ঢুকে বললাম,
— আজ কিছু পড়াবো না।
রাহুল বলল,
— কেন স্যার?
আমি বোর্ডের দিকে পিঠ ফিরিয়ে চকটা ভেঙে ফেললাম।
— আজ শুধু সত্যিটা লিখে রেখে যাচ্ছি। তথ্য তোরা বইতেই পেয়ে যাবি।
বোর্ডে ধীরে ধীরে লিখলাম—
“তথ্য বইয়ে আছে।
প্রশ্ন করার দায়িত্ব তোমার।”
চকের শব্দ থেমে গেলে ঘরটাও যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল।
কেউ খাতা খুলল না, কেউ কথা বলল না।ঘণ্টা পড়ার আগেই আমি বেরিয়ে গেলাম সবাই বেরিয়ে গেল।
শেষে রাহুল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
— স্যার, আপনি কি কিছু পড়িয়েছিলেন আজ?
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— না ,আমি তো আজকে কিছু পড়াইনি
একটু থেমে যোগ করলাম,
— আমি শুধু আগুনটা দেখিয়ে দিয়েছি।
দরজাটা বন্ধ হলো।কালো বোর্ডে আর কিছু লেখা নেই।
ঘরের ভেতরে শুধু আগুনের উত্তাপ।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।