এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্কুলের খাতা

  • শমিতা মিস্ এর ডায়রি। (  প্রথম পর্ব )

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    স্কুলের খাতা | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ২২ বার পঠিত
  • শমিতা মিস্ এর ডায়রি। ( প্রথম পর্ব )
     
    শমিতা সেই সময় বাড়ি ছিলনা। বিন্নিদের বাড়ি গিয়েছিল। বিন্নি শমিতার ছাত্রী। ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করতে না করতেই হাতে এপয়েন্টমেন্ট লেটার পৌঁছে যাওয়ায় সকলেই বেজায় খুশি। পোস্ট অফিসের পিওন দিদি ঢাউস সাইজের খামটা শমিতার মা প্রমিতার হাতে তুলে দিয়ে একগাল হেসে বলেন –" খুশির খবর বয়ে নিয়ে এসেছি দিদি! আজ আর শুকনো মুখে যাবনা। মিষ্টি মুখ করে যাবো । ইমলি বাড়ি নেই বুঝি?" শমিতার ডাক নাম ইমলি। পাড়াপড়শিরা ঐ নামেই ওকে ডাকে।
     
    গোপীনাথের দোকানের দুটো পেল্লাই সাইজের নতুন গুড়ের রসগোল্লা খেয়ে পিওন দিদি বিদায় নিলেন। অনেক হাঁটাহাঁটি করতে হয় তাঁকে। প্রমিতা হেঁসেল সামলানোর ফাঁকে চিঠিটা নিয়ে আসনে থাকা ঠাকুরের সামনে রেখে আসেন।শত হলেও প্রথম এপয়েন্টমেন্ট লেটার। খামের ওপর বড়ো বড়ো করে লেখা স্কুলের নাম দেখে বেশ সম্ভ্রম জাগে। মেয়ে চাকরি করবে শুনে প্রমিতা আর আপত্তি করেনি। খালি বলেছিলেন – "স্কুলে চাকরি পেলে বাপু আমার কোনো আপত্তি নেই। ইমলিরে , তুই স্কুলেই বরং চেষ্টা কর।"-- সেই চেষ্টাই বোধহয় এবার ফলবতী হতে চলেছে।
     
    ২.
    এখনকার নতুন স্কুলগুলোকে কেমন কর্পোরেট হাউস বলে মনে হয় প্রমিতার। নিজে তো বটেই,মেয়ে ইমলিকেও সরকারি স্কুলেই পড়িয়েছেন। চেনা পরিচিতদের ছেলেমেয়েরা যখন টাই আর ব্লেজার গায়ে চাপিয়ে স্কুলে যেত,ইমলি তখন মোটা দুটো বিনুনি দুলিয়ে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে সরকারি স্কুলের পথে। প্রমিতার আক্ষেপ, এসবের জন্য‌ই বোধহয় মেয়েটা সাদা মাটাই রয়ে গেছে। হাল আমলের ভাষায় ফ্যাশন দুরস্ত হয়ে উঠলো না। সেই মেয়ে এখন দিদিমণি হয়ে পড়াতে যাবে সাহেবি কেতার লার্নিং হাউসে। রীতিমতো রোমাঞ্চ অনুভব করেন প্রমিতা। এক ফাঁকে খুশির খবরটা নির্মাল্যকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন । নির্মাল্য‌ও খুব খুশি হয়েছেন মেয়ের কথা শুনে। 
     
    ৩.
    বেশ কয়েকমাস কেটে গেল শমিতার দিদিমণি থুড়ি মিস্ জীবনের। এর মধ্যেই শমিতা ভেতরে ভেতরে অনেকটাই যেন বদলে গেছে। বিষয়টা মা প্রমিতার নজর এড়ায়নি। ইদানিং কেমন যেন একটা অস্থিরতা লক্ষ করছেন মেয়ের মধ্যে। সরাসরি ইমলি কে একথা জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি। এসব ঠারেঠোরে নির্মাল্যর কানে তুলতেই সে হেসে উঠেছে – “আরে বাপু, তুমি খামোখা চিন্তা করেছো। এটা তো তোমার আমার সেকেলে কুমুদিনী স্মৃতি বিদ্যাপীঠ নয় , এ হলো স্কুল চেইনের ব্যাপার! অত চিন্তা করোনা।”
     
    ৪.
     
    চিন্তার মজা হলো একবার কোনোরকমে মাথায় ঢুকলে তা সহজে মাথা ছাড়েনা। স্নানের আগে শমিতার বিছানাপত্র গুছিয়ে রাখতে গিয়ে বালিশের নিচে একটা নতুন ডায়রি নজরে আসে প্রমিতার। একটু দ্বিধা নিয়েই ডায়রির পাতা খুলে পড়তে শুরু করেন – 
    “ যেদিন আমি প্রথম বারের জন্য এই স্কুলে এলাম তখন যে অনুভব আমাকে ঘিরে ছিল, আজ মাসখানেক পরে তা যেন অনেকটা বদলে গেছে। এরজন্য আমিই দায়ী কিনা জানিনা। প্রথম মাস দুয়েক আমি আমার পড়ানোর বিষয়ে খুব সতর্ক ছিলাম। স্টুডেন্টদের কাছে একটা অন্যরকম ভালোলাগা তৈরি করাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য। আমার এই উদ্যোগ আমার সহকর্মীদের কাছ থেকেও, বিশেষ করে যাঁরা আমার সিনিয়র কলিগ , তাঁদের কয়েকজনের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে। তাঁরা উৎসাহ দিয়েছেন। আমার স্কুলবেলার দিদিদের কথা খুব মনে পড়ে - প্রজ্ঞা দি, সুবর্ণা দি, বায়োলজির ছোটো অপরাজিতা দি- এঁদের দেখেই তো আমার টিচার হ‌ওয়ার ইচ্ছেটা মনের মধ্যে চাগিয়ে উঠেছিল। আমি অবচেতনে তাঁদের অনুসরণের চেষ্টা করতে শুরু করেছিলাম। আমাদের স্কুলের বড়দির কথাগুলো খুব মনে পড়ে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর পর আমাদের বিদায়ী অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেছিলেন – “আমরা আশা করি তোমাদের অনেকেই হয়তো শিক্ষিকা হবে। আগামী দিনে এই কাজটি কিন্তু আজকের তুলনায় অনেক কঠিন, চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। শিক্ষা মানে কতগুলো পুঁথির কথা ছেলেমেয়েদের মাথায় গুঁজে মুখস্থ করানো নয় , তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে অমিত সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে তার পূর্ণ উন্মীলন‌ই হলো শিক্ষা। এই সংজ্ঞার কোনোদিন পরিবর্তন হবে না। হলে জানবে,তা কখনোই শিক্ষা নয় । তোমাদের প্রতি……….।”
    ঘড়ির কাঁটা ঢং করে একবার বেজে উঠতেই প্রমিতার হুঁশ ফেরে। এখনও মেলা কাজ পরে রয়েছে । সেই কাজগুলো সেরে ফেলার জন্য প্রমিতা ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
     
    ৫.
     
    শমিতা স্কুল থেকে ফিরে জামা কাপড় ছেড়ে ঘরে এসে বসতেই প্রমিতা জলখাবার এনে সামনে দাঁড়ান। আজ একটু ঘুগনি বানিয়েছেন। এটা শমিতার বড়ো পছন্দের। বাটি থেকে ঘুগনি মুখে তুলতে তুলতে শমিতা নিজে থেকেই বলে ওঠে – "জানো মা,আজকে না একটা মজা হয়েছে! আজ গানের ক্লাস নিলাম। নেহাৎ স্কুলে দময়ন্তী দি আমাদের খুব যত্ন করে গান শিখিয়েছিলেন ,তাই দিব্যি উৎরে গেলাম। স্টুডেন্টরাও খুব খুশি।” “ ওমা! স্কুলে মিউজিক টিচার আছেন না?” – প্রমিতা প্রশ্ন করেন। “আর বলোনা, ওসব খাতা কলমের খেলা। বিজ্ঞাপনে একগাদা আয়োজনের কথা বলা থাকে বটে তবে আসলে অত সংখ্যক স্পেশালিস্ট টিচার‌ই নেই স্কুলে। মাঝে মাঝে কুমীর ছানা দেখানোর মতো করে দু- একজনকে নিয়ে আসে বটে, তবে আসলে আন্ডার স্টাফড এই স্কুলের অধিকাংশ । অথচ বছর বছর বাড়তি পয়সা আদায়ের কোনো বিরাম নেই। আজ আমি না হয় প্রক্সি দিলাম,রোজ রোজ তো আর এটা সম্ভব নয়।” – একটানে অনেক মনের কথা বলে ফেলে শমিতা। প্রমিতার‌ওএসব শুনতে ভালো লাগে।“মা, আরেকটু ঘুগনি থাকলে দিয়ো তো! বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে “। “আনছি”-- বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যান প্রমিতা। শমিতা ডায়রি খুলে বসে।
     
     
     
    ** আগামী পর্বে সমাপ্য।
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • স্কুলের খাতা | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ২২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন