এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • রাষ্ট্র, পরিচয় ও রুটি রুজির রাজনীতি

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৬ বার পঠিত
  • রাষ্ট্র, পরিচয় ও রুটি–রুজির রাজনীতি
     
    অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
    এই সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনীতিকে আর শুধু ‘উন্নয়ন বনাম দুর্নীতি’—এই সরল অঙ্কে বোঝা যায় না। মানুষের খিদে আজ শুধু পেটের নয়; খিদে পরিচয়ের, স্বীকৃতির, দৃশ্যমান হওয়ার। অর্থনীতির পরিসংখ্যান আর রাজনীতির স্লোগানের মাঝখানে একটা গভীর ফাঁক তৈরি হয়েছে—যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে খুঁজছে।
     
    অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বহু আগেই আমাদের সাবধান করেছিলেন—উন্নয়ন মানে শুধু আয়ের বৃদ্ধি নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতা—সে কী হতে পারে, কী করতে পারে, কীভাবে বাঁচতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—এই সব মিলিয়েই মানুষের জীবন। সেনের এই ‘capability’ ভাবনায় একটা মৌলিক প্রশ্ন ছিল: রাষ্ট্র কি মানুষকে শুধু বাঁচিয়ে রাখছে, না মানুষকে নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ দিচ্ছে?কিন্তু আজকের রাজনীতিতে আমরা দেখছি, সেই সক্ষমতার প্রশ্নটা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে জায়গা নিচ্ছে পরিচয়ের প্রশ্ন। মানুষ জানতে চাইছে—“আমি কে?” “আমাকে কীভাবে দেখা হচ্ছে?” “আমার অপমানের দায় কার?”
     
    এই বদলের দিকটা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা বিশ্লেষণ করেছেন সাম্প্রতিক কালে। তাঁর মতে, আধুনিক রাজনীতিতে মানুষের মূল চালিকা শক্তি আর শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, বরং স্বীকৃতির দাবি—সম্মানের দাবি। যখন রাষ্ট্র বা সমাজ মানুষের সেই স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষোভ জমে, এবং সেই ক্ষোভ সহজেই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিতে রূপ নেয়। জাত, ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি—সবই তখন রাজনীতির অস্ত্র হয়ে ওঠে।
     
    এখানেই প্রশ্নটা জটিল। কারণ অর্থনৈতিক বঞ্চনা একেবারে উধাও হয়ে যায়নি। বরং বহু ক্ষেত্রে তা আরও তীব্র। কাজ নেই, কাজের নিরাপত্তা নেই, মজুরি স্থির, শিক্ষা ব্যয়বহুল, স্বাস্থ্য অনিশ্চিত। অথচ এই বাস্তব প্রশ্নগুলো অনেক সময় সরাসরি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসে না। তার বদলে সামনে আসে আবেগ, পরিচয়, গৌরব, অতীতের গাথা।
     
    ভারতীয় প্রেক্ষিতে এই প্রবণতাকে বোঝার জন্য কৌশিক বসুর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বারবার দেখিয়েছেন—শুধু বাজার বা প্রবৃদ্ধির ভাষায় সমাজকে চালানো যায় না। অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে নৈতিকতা, প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বাসের সম্পর্ক গভীর। যখন মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন তারা কেবল রুটি–রুজির হিসাব করে না; তারা নিরাপত্তা খোঁজে, স্থায়িত্ব খোঁজে, এমন এক পরিচয় খোঁজে যেটা তাদের “আমরা” বলে ডাকতে পারে।এই ‘আমরা’ তৈরি করার রাজনীতি খুব শক্তিশালী। কারণ এখানে প্রশ্ন কম, অনুভূতি বেশি। এখানে যুক্তির চেয়ে স্মৃতি বেশি কাজ করে। অতীতের আঘাত, অপমান, গৌরব—সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের মানসিক অর্থনীতি তৈরি হয়। এই অর্থনীতি টাকা দিয়ে মাপা যায় না, কিন্তু ভোটে তার প্রভাব প্রবল।
     
    ফলে দেখা যায়, উন্নয়নের পরিসংখ্যান একদিকে, আর মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা আরেকদিকে। রাষ্ট্র বলে—জিডিপি বেড়েছে। মানুষ বলে—আমার জীবন বদলায়নি। এই ফাঁকটাই রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। কারণ এই ফাঁকে দাঁড়িয়েই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি মানুষের হতাশাকে ভাষা দেয়।
     
    এটা শুধু ভারতের গল্প নয়। ফুকুইয়ামা দেখিয়েছেন, ইউরোপ ও আমেরিকাতেও একই প্রবণতা—যেখানে বিশ্বায়নের ফলে লাভবান হওয়া আর পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে বিভাজন বেড়েছে। অর্থনৈতিক অসাম্য যখন রাজনৈতিক ভাষা পায় না, তখন তা সাংস্কৃতিক বা পরিচয়ভিত্তিক ভাষা খুঁজে নেয়।
     
    অমর্ত্য সেনের ভাবনায় ফিরে গেলে দেখা যায়—এই সংকট আসলে সক্ষমতার সংকট। মানুষ শুধু আয় চায় না, সে চায় মর্যাদা, অংশগ্রহণ, কথা বলার অধিকার। যখন রাষ্ট্র সেই পরিসর সংকুচিত করে, তখন মানুষ অন্য কোথাও আশ্রয় খোঁজে।
     
    এই কারণেই আজকের রাজনীতিতে প্রশ্নটা শুধু “কতটা উন্নয়ন” নয়, প্রশ্নটা—কার জন্য উন্নয়ন, কীভাবে উন্নয়ন, এবং কার কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে। যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অর্থনীতি ও রাজনীতি একসঙ্গে না দেয়, তাহলে পরিচয়ের রাজনীতি আরও তীব্র হবে।
    এবং তখন রাষ্ট্র শুধু প্রশাসনিক কাঠামো থাকে না—তা হয়ে ওঠে আবেগের মঞ্চ। সেখানে যুক্তির জায়গা কমে, বিশ্বাসের জায়গা বাড়ে। 
     
    এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির মধ্যে নতুন সংলাপ তৈরি করা। যেখানে মানুষের জীবন শুধু সংখ্যায় নয়, অভিজ্ঞতায় মূল্য পাবে।কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়। রাজনীতি হলো—মানুষ নিজের জীবনের গল্পটা কোথায়, কীভাবে বলতে পারছে—তার লড়াই।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Pustak Biswas | 2409:40e0:1027:b836:8000::***:*** | ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৯737910
  • সবঠিক, কিন্তু সম্মান ও স্বীকৃতির জন্য সামাজিক কাঠামোটা কী? কোন কাঠামোর মধ্যেদিয়ে এই স্বীকৃতির সঠিক বন্টন সম্ভব? যদি সঠিক বন্টন নাহয়। তাহলে এই স্বীকৃতি, শুধুমাত্র কাদের গলার আওয়াজ হয়েদাড়াবে?

    ব্যক্তি কি কথা বলতেচায় এবং তারভিত্তিতে ব্যক্তি-মর্জাদা, কোন অর্থনৈতিক বিষয় নয়। অর্থনীতির মূলকাজ 'বন্টন'। আমি অর্থনীতিবিদ হয়ে ডাক্তারি করতে পারিনা। চিকিতৎসাকে চিকিৎসা-বিজ্ঞান দিয়েই বিশ্লেষন করাযায়। অর্থনীতিবিদরা কেবল চিকিৎসার বন্টননিয়ে আলোচনা করতেপারে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন