সিলেবাসের ভেতর সিলেবাসের বাইরে অয়ন মুখোপাধ্যায় ক্লাস ইলেভেনের লাস্ট পিরিয়ড ঘরটা অদ্ভুতভাবে জেগে ছিল। কালো বোর্ডে চক-এর ধুলো লেগে আছে, জানালার বাইরে গাছের পাতায় বিকেলের আলো আটকে পড়েছে। কয়েকজন জানালার দিকে ঝুঁকে, কেউ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, কেউ আবার বেঞ্চে নখ আঁচড়াচ্ছিল—শেষ পিরিয়ডের সেই চেনা অস্থিরতা। ক্লাসে ঢুকতেই রাহুল জিজ্ঞেস করল,— স্যার, পড়াশোনা করে কী হবে? চাকরি তো আর কেউ পাচ্ছে ... ...
ভালোবেসে যে মানুষ বদলে যায় অয়ন মুখোপাধ্যায় তোমাকে ছোঁয়ার আগে ঘরটা নিজের নাম ভুলে যায়।আলোর সুইচ বন্ধ করলেই ভেতরে কেউদেয়ালে নখ বোলাতে থাকে। তুমি বলো—এভাবে থাকলেই ঠিক আছে।আমি দেখি, আয়নায় আমাদের ছায়া মিলছে না। তোমার ঠোঁট থেকে পড়ে যায় একটা নিষিদ্ধ শব্দ,মেঝের ফাটল দিয়ে সেটা গড়িয়ে চলে যায়। কোনো এক পুরোনো দেবতা বিছানার নীচে শুয়ে,আমাদের নিঃশ্বাস গুনে রাখে—ঘুমের ভেতরও তার হিসেব চলে। আমরা প্রেম করি—মাঝখানে একটা অশ্রুত চিৎকার।তোমার শরীর জানে, আমার আত্মা জানে না।রক্তের মতো গাঢ় হয়ে আসে রাত,আমি তোমাকে ডাকি, তুমি আরেকজন হয়ে ওঠো। ভোর হলে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে জানি,তবু প্রতিবার ভালোবাসার পরযে মানুষটা আমাকে ভালোবাসে- সে আমি নই। ছবি হিরন মিত্র ... ...
অনুগল্প: আলোর কর্মচারীঅয়ন মুখোপাধ্যায় কুমির মোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান সনৎ ঘোষ। লাইব্রেরিতে বইয়ের অভাব ছিল না—অভাব ছিল পাঠকের। ছাত্রছাত্রীদের কাছে লাইব্রেরি মানে ছিল বন্ধ দরজার একটি ঘর, যেখানে ধুলো জমা বই গুলো নীরবে পড়ে থাকে। কখন ও আবার সেই ঘরটাই হয়ে উঠত রিহার্সাল রুম। কিন্তু সনৎ ঘোষ বিশ্বাস করতেন—লাইব্রেরি যদি আলো না ছড়ায়, তবে তার অস্তিত্বের মানেই বা কী?প্রতি দিন তিনি বইগুলো ধুলো ঝেড়ে যত্ন করে সাজিয়ে রাখতেন। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন একটি করে বই হাতে নিয়ে দাঁড়াতেন লাইব্রেরির দরজার সামনে। যে ছাত্রছাত্রীকে দেখতেন, তাকেই বলতেন—“আজ এই গল্পটা পড়ে দেখবে? ভালো লাগবেই।”শুরু তে কেউ পাত্তা দিত না। কিন্তু সনৎ ঘোষ হাল ছাড়েননি। একদিন ... ...
জননায়ক না উত্তরাধিকার—পপুলিজমের নামে ক্ষমতার পুনরুৎপাদন। অয়ন মুখোপাধ্যায় বাংলার রাজনীতিতে আজ কিছু শব্দ অস্বাভাবিক ভাবে বেশি শোনা যায়—‘জনগণ’, অসমিতা’, ‘বাংলার লড়াই’। এই শব্দগুলো শুনলে মনে হয় রাজনীতি বুঝি মানুষের হাতেই ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই শব্দগুলোর বেশিরভাগই আর মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে না। এগুলো এখন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছুড়ে দেওয়া রাজনৈতিক স্লোগান মাত্র। যে রাজনীতির নাম পপুলিজম, তা এখানে আর নিচ থেকে উঠে আসা কোনও প্রতিরোধ নয়; বরং উপর থেকে আরোপিত এক সুচারু আবেগ ব্যবস্থাপনা। দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই—এই কথাটা শুনতে বেশ ভালো লাগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দিল্লির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নামে কলকাতায় কি নতুন কোনও দিল্লি তৈরি হয়নি? ক্ষমতার কেন্দ্র কি ... ...
ক্ষমতার আগাম বিনিয়োগ: ২০০৬-এর পর বাংলার রাজনীতিতে ঝুঁকি, লোভ ও নৈতিক পতনের দর্শন অয়ন মুখোপাধ্যায় কিছু সময় রাজনীতির ইতিহাস কে বোঝা যায় সংখ্যায়। যেমন—২৩৫। ২০০৬ সালে এই সংখ্যা টাই ছিল বাংলার রাজনীতির আপাত নিশ্চয়তার প্রতীক। ২৩৫টি আসন নিয়ে বামফ্রন্টের ক্ষমতা তখন প্রায় অচলায়তনের মতো—নড়ানো যাবে না, ভাঙা যাবে না, অন্তত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়—এমনটাই ধরে নিয়েছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। অথচ ঠিক সেই সময় থেকেই রাজ নীতির মাঠে দেখা যাচ্ছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য—যা সংখ্যার অঙ্ক মানছিল না, যুক্তির সাধারণ ব্যাখ্যাও মানছিল না। আমি দেখেছিলাম বহু মানুষকে—যাঁরা কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ প্রতিষ্ঠিত পেশায়, কেউ আবার বাম রাজনীতির ছায়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ছিলেন—হঠাৎ করেই নিজেদের ক্যারিয়ার, সামাজিক ... ...
১ যে ঘরে ট্রেন ঢোকে নাঅয়ন মুখোপাধ্যায় ঢাকুরিয়া বস্তির মেয়েটি জানে—রেললাইনের গা ঘেঁষে থাকা টালির ঘরেতার মায়ের হাত, আজও রান্না করছে।আর সে,চুল বেঁধে বসে আছে—একা। মাঝরাতে সে চোখ রাখে বইয়ের ভেতর।চুপচাপ সিলেবাসের কবিতাগুলো পড়তে পড়তেমাঝে মাঝে ফিসফিস করে নাম ধরে ডাকে বাবা বাবা যিনি আকাশের ওপারে কোথাও আছেন। দু’ লাইনের ওপর দিয়ে ছুটে যায় ক্যানিং লোকাল।ছোট্ট পায়ের ছাপে স্বপ্নের গতি পায়।কামরার জানলা ভেঙেআলো ঠিকরে পড়েবস্তির ছাদে। এক মুহূর্তে মেয়েটি ভাবে—সে যেন পরী।ঠিক তখনইপরীর কানে ঢুকে পড়েট্রেনের হর্ন। যে শব্দে রাত্রি নামে,সে বুঝে যায়—আলো থাকলেওসব ঘরে আলো জ্বলে না। ২লাইন টপকে বসন্ত অয়ন মুখোপাধ্যায় শীতের শেষে বসন্ত ঢুকে পড়েভাঙা বস্তিতে।বিনোদিনী গার্লসের নতুন শাড়ি-পড়া মেয়েগুলোদল বেঁধে লাইন টপকায়—তাদের পেছনে উড়ে যায়আকাশের ... ...
সিঙ্গুর: যৌথ ধ্বংসের রাজনীতি ও শিল্প-ভণ্ডামির পুনরাবৃত্তি অয়ন মুখোপাধ্যায় সিঙ্গুর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সিঙ্গুর কোনও দুর্ঘটনাও নয়। সিঙ্গুর হলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক মডেল—যেখানে শিল্প ধ্বংসকে আন্দোলনের নামে বৈধ করা হয়, আর সেই ধ্বংসকেই পরে ভোটের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখানে ভুল ছিল না, ছিল হিসেব। এখানে আবেগ ছিল না, ছিল কৌশল। এখানে কৃষক ছিল প্রতীক, শিল্প ছিল বলি, আর ক্ষমতা ছিল একমাত্র লক্ষ্য। ২০০৬ থেকে ২০০৮—টাটা ন্যানো কারখানা সিঙ্গুরে আসার কথা ছিল। সেটা কেবল একটি গাড়ির কারখানা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত ছিল হাজার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ... ...
জ্যোতি বসু: একজন কমিউনিস্ট যিনি বিপ্লব করলেন না। অয়ন মুখোপাধ্যায় এই লেখায় জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক অনুশীলনকে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে রেখে বোঝার চেষ্টা করেছি জ্যোতি বসু একজন কমিউনিস্ট, যিনি বিপ্লব করলেন না তারই তাত্বিক অনুসন্ধান। প্রশ্নটা ব্যক্তিগত কৌতূহল থেকে আসেনি; এসেছে ইতিহাসের ভেতর থেকেই—একজন কমিউনিস্ট হয়েও তিনি কেন বিপ্লবের পথে হাঁটলেন না। সংসদীয় রাজনীতি, রাষ্ট্রতত্ত্ব, ভূমিসংস্কার, নকশাল আন্দোলন ও শিল্পায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আলোকে সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান ... ...
নৃশংস হত্যার বিরুদ্ধে কে পথে, আর কে লুকিয়ে খুঁজে নিন আপনি।অয়ন মুখোপাধ্যায়বাংলাদেশের শ্রমিক দিপু দাসকে যেভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে, অপমান করে, শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে—তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটি ভয়াবহ ভাবে স্পষ্ট সংখ্যালঘু শ্রমিকের জীবন এখানে সস্তা, আর ধর্মীয় উন্মাদনার সামনে মানবতা পরাজিত। এই হত্যা কাণ্ডের পর তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—এই বর্বরতার বিরুদ্ধে কে দাঁড়াল, আর কে দাঁড়াল না?পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র সংগঠিতভাবে, গোটা রাজ্যজুড়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে সিপিআইএম। মিছিল হয়েছে ... ...
রাষ্ট্র, পরিচয় ও রুটি–রুজির রাজনীতি অয়ন মুখোপাধ্যায় এই সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনীতিকে আর শুধু ‘উন্নয়ন বনাম দুর্নীতি’—এই সরল অঙ্কে বোঝা যায় না। মানুষের খিদে আজ শুধু পেটের নয়; খিদে পরিচয়ের, স্বীকৃতির, দৃশ্যমান হওয়ার। অর্থনীতির পরিসংখ্যান আর রাজনীতির স্লোগানের মাঝখানে একটা গভীর ফাঁক তৈরি হয়েছে—যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে খুঁজছে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বহু আগেই আমাদের সাবধান করেছিলেন—উন্নয়ন মানে শুধু আয়ের বৃদ্ধি নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতা—সে কী হতে পারে, কী করতে পারে\ ... ...