জননায়ক না উত্তরাধিকার—পপুলিজমের নামে ক্ষমতার পুনরুৎপাদন।
অয়ন মুখোপাধ্যায়
বাংলার রাজনীতিতে আজ কিছু শব্দ অস্বাভাবিক ভাবে বেশি শোনা যায়—‘জনগণ’, অসমিতা’, ‘বাংলার লড়াই’। এই শব্দগুলো শুনলে মনে হয় রাজনীতি বুঝি মানুষের হাতেই ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই শব্দগুলোর বেশিরভাগই আর মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে না। এগুলো এখন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছুড়ে দেওয়া রাজনৈতিক স্লোগান মাত্র। যে রাজনীতির নাম পপুলিজম, তা এখানে আর নিচ থেকে উঠে আসা কোনও প্রতিরোধ নয়; বরং উপর থেকে আরোপিত এক সুচারু আবেগ ব্যবস্থাপনা।
দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই—এই কথাটা শুনতে বেশ ভালো লাগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দিল্লির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নামে কলকাতায় কি নতুন কোনও দিল্লি তৈরি হয়নি? ক্ষমতার কেন্দ্র কি সত্যিই মানুষের হাতে গেছে, না কি কিছু পরিবার, কিছু অনুগত গোষ্ঠী আর প্রশাসনিক দলীয় যন্ত্রের হাতে কুক্ষিগত হয়েছে?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কে ‘সার্থক উত্তরসূরি’ হিসেবে প্রজেক্ট করা মানেই মনে রাখতে হবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু কোন রাজনীতি আর সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় তৈরি হয়নি, তৈরি হয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে। পপুলিজম যদি হয় ‘পিপল বনাম এলিট’-এর লড়াই, তাহলে অভিষেক কোন দিকে দাঁড়িয়ে? তিনি কি স্কুলশিক্ষকের চাকরি হারানো যুবকের পাশে? নাকি কয়লা পাথর বালির সিন্ডি কেটে নাম উঠে আসা এক নতুন এলিট শ্রেণির প্রতীক?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যদি মাটির কাছাকাছি দাঁড়াতেন তাহলে বেশ কিছু পরিস্থিতির উত্তর দিতে পারতেন না।
— কেন গ্রামে গ্রামে পঞ্চায়েত মানেই ভয়?— কেন সরকারি প্রকল্প মানেই কাটমানির গল্প?— কেন দল মানেই স্থানীয় দাদাগিরি?— কেন বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে দমন?এই বাস্তব প্রশ্নগুলোর উত্তর ‘অসমিতা’ দিয়ে ঢেকে দিলে রাজনীতি হয় না, হয় কৌশলী আবেগ-বাণিজ্য।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির মধ্যে একসময় রাস্তার গন্ধ ছিল—আন্দোলনের ক্লান্তি, পুলিশের লাঠি, অনশন, অনিশ্চয়তা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর রাজনীতিতে সেই ঝুঁকি নেই, সেই অনিশ্চয়তা ও নেই। আছে সংগঠনের উপর দখল, প্রশাসনের সঙ্গে মসৃণ সমঝোতা আর ‘ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী’ হওয়ার আগাম প্রচার।
এই রাজনীতির আরেকটি গুরুত্ব পূর্ণ দিক হলো তার পরিকল্পিত নির্মাণ। আই-প্যাকের মতো কর্পোরেট রাজনৈতিক পরামর্শ সংস্থা দিয়ে ভোটব্যাঙ্ক, পরিচয়, আবেগ ও সামাজিক বিভা জনের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করা হচ্ছে। এখানে রাজনীতি আর স্বতঃস্ফূর্ত নয়—এটা ডেটা চালিত সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নির্ভর। জনগণ এখানে অংশগ্রহণ কারী নয়, জনগণ এখানে একটা টার্গেট গ্রুপ’।
আর এখানেই পপুলিজমের মুখোশ খুলে পড়ে।এটা আর জনগণের নতুন আত্মপরিচিতি তৈরি করছে না, বরং জনগণকে এক নিরব দর্শকে পরিণত করছে—যাদের কাজ শুধু হাততালি দেওয়া, প্রশ্ন না করা।
“বাংলাকে ভেনেজুয়েলা বানাতে দেব না”—এই বাক্য আসলে ভয় দেখানোর রাজনীতি। ভেনে জুয়েলা নয়, ভয়টা অন্য জায় গায়—বাংলা যেন ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় না পৌঁছয়, যেখানে নির্বাচন আছে কিন্তু বিকল্প নেই, নেতা আছে কিন্তু নেতৃত্ব নেই, স্লোগান আছে কিন্তু ন্যায় নেই।
পপুলিজম যদি সত্যিই নিচে থেকে উঠে আসে, তাহলে তার প্রথম শর্ত হলো ক্ষমতার কেন্দ্রী ভবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অথচ আজকের বাংলায় আমরা দেখছি ঠিক তার উলটোটা—ক্ষমতার উত্তরাধিকারকে ‘জনতার ইচ্ছা’ বলে, আধুনিক মার্কেটিং আর সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মোড়কে, বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
জননায়ক ঘোষণা দিয়ে তৈরি হয় না।তিনি তৈরি হন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।আর যে প্রশ্ন এড়িয়ে যায়, সে যতইঅসমিতা’র কথা বলুক, শেষ পর্যন্ত সে ক্ষমতারই আরেক নাম।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।